গঙ্গাদেবী ও ব্রতীনের অহঙ্কার Gangadevi and the Proud Bratin - Bengali Short Story by Ratan Lal Basu WBRi Online Bengali Magazine

NOTE: This is a short story in Bengali (Bangla) language written in a unicode Bengali font.
Washington Bangla Radio Online Magazine


গঙ্গাদেবী ও ব্রতীনের অহঙ্কার

রতন লাল বসু

হায়ার সেকেণ্ডারী পাশ করেই দুর্দ্ধর্ষ সাঁতারু ব্রতীন বেরাকে কোলাঘাট ছেড়ে কলকাতা চলে আসতে হল। রেজাল্ট বেশ ভালোই ছিল। সহজেই জয়পুরিয়া কলেজে বি.কম. অনার্সে সুযোগ পেয়ে গেল। ওর বাবা ভোলানাথ বেরার নিমতলা ঘাটে কাঠগোলা, নূতন বাড়ি করেছেন আহিরীটোলায়। মেদিনীপুরের বাড়ি তালা বন্ধ করে ওর মাও চলে এলেন। ছোটবোন রীনা বেথুন স্কুলে ভর্ত্তি হওয়ার পর থেকে বাবার কাছেই থাকে। মা আর দাদাকে কাছে পেয়ে ওর আনন্দ আর ধরেনা।

ব্রতীনের মন কিন্তু বেশ খারাপ হয়ে গেল। বর্ষায় উন্মত্ত রূপনারায়ণ আর দামোদরে সাঁতার কাটতে কাটতে কত স্বপ্ন দেখেছে ইংলিশ চ্যানেল পার হবে। সব স্বপ্নকি এভাবে জলাঞ্জলি দিতে হবে? নাঃ, বি.কম. পাশ করেই আবার সাঁতারে নেমে পড়তে হবে। মাত্রত তিনটে বছর। দেখতে দেখতে তর তর করে কেটে যাবে।

পাড়ায় বন্ধু জুটল সুবীর, বিখ্যাত বৈষ্ণব দেব গোস্বামীর একমাত্র ছেলে। রোগা, ভীষণ ফর্সা, গোবেচারা ছেলেটা সহজেই ব্রতীনের মন কেড়ে নিল। মাথায় একরাশ উষ্ক খুষ্ক চুল আর কি মিষ্টি কথাবার্তা। হায়ার হেকেণ্ডারীতে স্ট্যাণ্ড করে দর্শনে অনার্স নিয়ে প্রেসিডেন্সী কলেজে ভর্ত্তি হয়েছে অথচ একটুও অহঙ্কার নেই। ছেলেটার জ্ঞানও অসাধারণ। ব্রতীন মুগ্ধ হয়ে গেল ওর সাথে আলাপ করে আর অল্প সময়ের মধ্যেই দশাসই চেহারার ব্রতীন এই শীর্ণ ছেলেটাকে গুরু বলে মেনে নিল।

সুবীর রোজ ভোরে গঙ্গায় স্নান করে। ভীষণ ভক্তি ওর গঙ্গা দেবীর ওপর। গঙ্গায় রোজ পবিত্র মনে স্নান করলে নাকি সব রোগ আর সব পাপ মুক্ত হওয়া যায়। ব্রতীন জল দূষণের কথা তুলতেই সুবীর এক বিখ্যাত পরিবেশ বিদের লেখা দেখাল। তিনি লিখেছেন যে কলকাতার আশপাশে গঙ্গায় যে পরিমাণ দূষিত পদার্থ নিক্ষিপ্ত হয় তাতে গঙ্গার জল যে পরিমাণ দূষিত হওয়ার কথা ছিল, প্রকৃত দূষণ তার দশ শতাংশও নয়। এমনি মাহাত্ম গঙ্গা দেবীর।

একদিন সুবীর সলজ্জ ভাবে বলল, ব্রতীন, আমার খুব ইচ্ছা করে গঙ্গা সাঁতরে পার হয়ে সালকিয়া যাই কিন্তু সাহস হয়না। তুমিত বড় সাঁতারু। আমার সাথে গঙ্গা পার হবে? তুমি পাশে থাকলে আমি ভরসা পাই।

তোমার মত বন্ধুকে সাহায্য করবনা এটা হতে পারে?

এর পর থেকে রোজ ভোরে দুজনে গঙ্গা পারাপার করে। সুবীর ক্লান্ত হয়ে পড়লে চিত্সাঁতার কাটে আর ব্রতীন পাশে থেকে সাহস যোগায়। ব্রতীনের বেশ ভালো লাগে। প্রিয় বন্ধুর মনে আনন্দ দেওয়া হচ্ছে আবার সাঁতারের অভ্যাসটাও বজায় থাকছে।

একদিন কথায় কথায় ব্রতীন বলল, জান সুবীর আমি কত দুরন্ত নদীতে সাঁতার কেটেছি বর্ষার দামোদর, রূপনারায়ণ, কেলেঘাই। এই ম্যাড়মেড়ে গঙ্গায় সাঁতার কেটে আর মন ভরেনা।

সুবীর আতঙ্কিত হয়ে বলল, ছিঃ, দেবী গঙ্গা সম্বন্ধে ওসব কথা বলতে নেই। আর জান, বানের সময় গঙ্গা কি ভয়ঙ্কর রূপ ধরেন? সেবারত একটা পুরো জেটি উড়ে গেল আর জেটির মোটা মোটা রেল গুলো বেঁকে চাকার মত হয়ে গেল।

তাহলেত এবার বানের সময় গঙ্গায় নাবতে হচ্ছে।

না-না, ওসব করতে যেওনা, আতঙ্কিত হয়ে সুবীর বলল।

আচ্ছা তুমি যখন বারণ করছ করবনা।

সুবীরের ভয় কিছুতেই যায়না। ব্রতীনের অনুপস্থিতির সুযোগ নিয়ে ওর বাবা-মাকে সব জানাল। শুনেত ওর মা কেঁদে আকুল। দেব বাবু বললেন, কেঁদনা। আমি ব্যবস্থা করছি।

বন্ধু থানার ও.সি. কে ফোন করে বললেন, মিহির বাবু, আমার ছেলেকে একটু থানায় ডেকে কড়কে দিনত।

.সি. অবাক হয়ে বললেন, আপনার ছেলে আবার কি করল? শুনেছিত খুব ভালো ছেলে।

আসলে ও পরিকল্পনা করছে বানের সময় গঙ্গায় সাঁতার কাটবে। শুনেত ওর মা কাঁদতে শুরু করেছে।

সর্বনাশ! পাগল নাকি? ঠিক আছে, আপনারা দুঃশ্চিন্তা করবেননা, আমি ব্যবস্থা করছি।

পরের রবিবার সকালে ব্রতীনদের বাড়ী এক কনস্টেবল এসে হাজির। ব্রতীনের নাম ধরে ডাকতেই ওর ত প্রাণ খাঁচা ছাড়া। ছোটবেলা থেকেই ওর পুলিশে ভীষণ ভয়। কাঁচুমাচু হয়ে বলল, কেন আমাকে কি দরকার?

পুলিশটা গম্ভীর স্বরে বলল, আপনাকে আমার সাথে থানায় যেতে হবে, বড়বাবু ডেকেছেন।

কেন? ব্রতীনের প্রায় কেঁদে ফেলার যোগাড়।

সে আমি জানব কি করে? চলুন, না হলে ধরে নিয়ে যাব।

ব্রতীনের বাবা বেরিয়ে এসে বললেন, মিহির বাবু যখন ডেকেছেন যা না। হয়ত ওঁর ছেলে মেয়ে কাউকে প্রাইভেট পড়াতে হবে।

বাবার কাছথেকে আশ্বাস পেয়ে ব্রতীন নির্ভয়ে থানায় চলল।  মিহির বাবু ওকে বসতে বললেন। পড়াশুনা সম্বন্ধে দু একটা কথা জিজ্ঞাসা করার পর হঠাত্বলে উঠলেন, ইনফর্মারদের কাছে খবর পেয়েছি তুমি নাকি বানের সময় গঙ্গায় সাঁতার কাটার পরিকল্পনা করছ। মরতে চাও?

ব্রতীনের বুকের ভিতর হাতুড়ি পিটতে শুরু করেছে। ইনফর্মাররা ওদের কথা তাহলে শুনে ফেলেছে। কাঁদো কাঁদো গলায় ব্রতীন বলল, মরব কেন, আমিত খুব ভাল সাঁতার কাটতে পারি। অনেক ......

ওকে থামিয়ে দিয়ে ও.সি. বললেন, জলে ডুবে না মরলে আমি তোমার ব্যবস্থা করব। মেরে আধমরা করে চোর ছ্যাঁচ্চড়দের সাথে গারদে পুরে দেব। এমনি সময় সাঁতার কাটতে পার। জোয়ার আর বানের সময় যেন তোমাকে গঙ্গার ধারে দেখা না যায়। ভাগো এবার।

মিহির বাবু অনেক কষ্টে হাসি চেপে অন্য কাজে মন দিলেন। পুলিশের ভয়ে ব্রতীনের বানের গঙ্গায় সাঁতার কাটা আর হলনা। 

§§§

দেখতে দেখতে সরস্বতী পূজো এসে গেল। পাড়ার মোড়ে মোড়ে, অলিতে গলিতে অজস্র পুজো। সুবীরদের ক্লাবেও বেশ বড়সড় একটা পুজো হচ্ছে। ব্রতীন ওদের পুজোয় অনেক সাহায্য করল। দুদিন বাদে আহিরীটোলা ঘাটে প্রতিমা বিসর্জন দিতে গেল টেম্পো করে। ঘাটে প্রচণ্ড ভীড়। অজস্র ঠাকুর এসেছে আর অধিকাংশই ঘাটের ধারেই বিসর্জন দিচ্ছে। প্রতিমা গঙ্গায় ছুঁড়ে ফেলতেই কয়েকটা আদুল গা ছেলে জলে নেমে প্রতিমা গুলো তুলে নিচ্ছে। ওরা পালেদের লোক, ফ্রেমগুল নতুন ঠাকুর গড়তে লাগবে। এতে খরচ অনেক কম পড়ে। 

সুবীরদের নৌকা ভাড়া করা ছিল। ওরা ঠিক করল ভীড় কমলে নৌকা করে মাঝ গঙ্গায় গিয়ে ঠাকুর বিসর্জন দেবে। অন্য ছেলেদের জিম্মায় ঠাকুর রেখে ব্রতীন আর সুবীর ঘুরতে বেরোল। ছেলেগুলো সব পালা করে হোটেলে গিয়ে রাতের খাওয়ার খেয়ে নিল। ভীড় হাল্কা হতে হতে রাত প্রায় একটা হয়ে গেল। ভীষণ শীত করছে। ব্রতীন ভাবল একটা সোয়েটার আনলে ভালো হত, বড্ড ভুল করে ফেলেছে।

ভীড় সম্পূর্ণ কমে গেছে। কয়েকটা মাত্র নৌকা ঠাকুর নিয়ে ভেসে চলেছে। ওরা মাঝ গঙ্গায় ঠাকুর বিসর্জন দিল। ব্রতীনের মাথায় হঠাত্খেয়াল চাপল। সে বলে বসল, তোমরা ফিরে যাও, আমি সালকিয়ার দিক থেকে একটু ঘুরে আসি। এই ঠাণ্ডা জলে সাঁতার কাটতে সবাই বারণ করল কিন্তু ব্রতীন নাছোড়। অবশেষে সুবীরের কথায় সবাই মত দিল। সুবীর বলল, বেশী দেরি কোরনা কিন্তু, আমরা তোমার জন্য পাড়ে অপেক্ষা করছি।

ব্রতীন সার্ট প্যান্ট ছেড়ে জলে ঝাঁপিয়ে পড়ল আর দ্রুত সাঁতার কেটে চলল। কি ঠাণ্ডা জল, ব্রতীন আরো দ্রুত সাঁতার কাটতে লাগল। কিন্তু এ কি, তার হাত পা সব অসাড় হয়ে আসছে কেন! ব্রতীন অনুভব করল জলের অতলস্পর্শী গভীরতা। মনে হল নিকষ কালো অন্ধকার যেন সম্মোহনী শক্তিতে তাকে এক অতল গহ্বরের দিকে আকর্ষণ করছে। দূরে সালকিয়া ঘাটের আলোর বিন্দু গুলো কেমন মায়াজাল ছড়াচ্ছে। ব্রতীন বুঝতে পারছেনা সে কোথায় ভেসে চলেছে। তার সব শক্তি ফুরিয়ে আসছে। সে চিত্সাঁতার কাটতে শুরু করল। অন্তত ভেসে থাকাত যাবে। শুক্ল সপ্তমীর চাঁদ মেঘে ঢাকা পড়েছে। উপরে নিকষ কালো অন্ধকার আর নিচে অতলান্ত গভীরতা। চারিদিকে কারা যেন নড়ে চড়ে বেড়াচ্ছে। আড় চোখে চেয়ে দেখল একদল কুমীর (গঙ্গা দেবীর বাহন মকর) দন্ত বিকশিত করে মহা উল্লাসে তার দিকে ধেয়ে আসছে। ব্রতীন আতঙ্কে চিত্কার করে উঠল, মা গঙ্গা আমাকে ক্ষমা কর, আমাকে বাঁচাও।

হঠাত্চারিদিক আলোয় আলোময় হয়ে উঠল। পুষ্পশোভিত স্বর্ণ রথে চড়ে আবির্ভূতা হলেন অপরূপা সুন্দরী এক নারী। বললেন, ভয় পেওনা বত্স। তোমার আকুল প্রার্থনা আমি শুনেছি।

গঙ্গা দেবী হাসলেন আর সে হাসি চতুর্দ্দিকে ছড়িয়ে দিল এক অনৈসর্গিক সঙ্গীতের অনুরণন। বললেন, বত্, অহংকার মহাপাপ। অহঙ্কারীকে শাস্তি পেতে হয়। আমি নিজেও বহুবার অহঙ্কারের জন্য শাস্তি পেয়েছি। শোন সে কাহিনী।

দেবর্ষি নারদের বিকৃত স্বর সাধনায় সব রাগ-রাগিণী মুমূর্ষু হয়ে পড়ল। তারা দরবার করল ভগবান বিষ্ণুর কাছে। বিষ্ণু তাদের নিয়ে কৈলাসে মহাদেবের কাছে উপস্থিত হলেন। বিষ্ণুর অনুরোধে রাগ-রাগি্ণীদের উজ্জীবিত করতে মহাদেব সংগীত শুরু করলেন। সেই সুরলহরী ছড়িয়ে পড়ল সমগ্র বিশ্বে। সারা জগত্উদ্বেল হয়ে উঠল আনন্দে। গাছে গাছে ফুটে উঠল ফুল, পাখির কলরবে দিকদিগন্ত মুখরিত হয়ে উঠল, মানব সমাজে নেমে এল সুখ-সম্মৃদ্ধি। সুরের আবেশে বিহ্বল বিষ্ণুর পদযুগল থেকে এক বিপুল জলরাশি রূপে জন্ম হল আমার। সেই বিপুল জলরাশির আঘাত থেকে বিশ্বকে রক্ষা করতে ব্রহ্মা তাঁর মন্ত্রপূত কমণ্ডলুতে আমাকে আবদ্ধ করলেন।

এদিকে মহা পূণ্যবান সগর রাজা শুরু করেছেন অশ্বমেধ যজ্ঞ। যজ্ঞের ঘোড়া নিয়ে ষাট হাজার রাজপুত্র বেরিয়েছেন বিশ্ব ভ্রমণে। ঘোড়া ফিরে এলে তাকে যজ্ঞস্থলে বলী দেওয়া হবে। প্রমাদ গণলেন কূটবুদ্ধি দেবরাজ ইন্দ্র। যজ্ঞ সুসম্পন্ন হলে সগর মহা পরাক্রমশালী হয়ে পড়বেন। এদিকে নানান অপকর্মের জন্য শিব ও বিষ্ণু ইন্দ্রের প্রতি অসন্তুষ্ট। তাঁকে সরিয়ে সগরকে স্বর্গের সিংহাসনে বসিয়ে না দেন। যে করেই হোক পণ্ড করতে হবে সগরের যজ্ঞ। খলবুদ্ধি ইন্দ্র যজ্ঞের ঘোড়া চুরি করে সমুদ্রতটে মহাজ্ঞানী বিষ্ণুর অবতার কপিল মুনির আশ্রমে তাঁর ধ্যানস্থলের কাছে বেঁধে রাখলেন।

হারান ঘোড়া খুঁজতে খুঁজতে সগর পুত্ররা এসে পৌঁছলেন কপিলের আশ্রমে আর ধ্যানমগ্ন মুনির সামনে ঘোড়া বাঁধা দেখে তাঁরা সমস্বরে চিত্কার করে উঠলেন, মুনি ঘোড়া চোর, তাকে শাস্তি পেতে হবে।

সেই ভয়ঙ্কর শব্দে মুনির ধ্যান ভঙ্গ হল আর ক্রুদ্ধ মুনির দুচোখ থেকে নির্গত অগ্নিশিখায় ভষ্মীভূত হলেন সগরের ষাট হাজার পুত্র আর তাঁদের আত্মা বন্দী হল ভষ্মরাশির মাঝে।

সগরের বংশধরেরা বহু প্রচেষ্টা করেও আবদ্ধ আত্মাদের মুক্ত করতে পারলেননা। অবশেষে রাজবংশ পুরুষশূন্য হয়ে পড়ল। এক মুনির পরামর্শে দুই রাণী সংগমে মিলিত হলেন এবং জন্ম হল ভগীরথের [ভগ শব্দের অর্থ নারীর যোনি; পুরুষের সংগম ছাড়া শুধু যোনি থেকে জন্ম বলে নাম হল ভগীরথ]। পুরুষের ঔরসের অভাবে তাঁর দেহ হল অস্থিহীন। একদিন মহা পরাক্রমশালী বিকৃতদেহ অষ্টাবক্র মুনি ভগীরথকে দেখে ভাবলেন তিনি তাঁকে অনুকরণ করে ব্যঙ্গ করছেন। তিনি ভযঙ্কর ক্রুদ্ধ হলেন। কিন্তু অবশেষে যখন বুঝতে পারলেন ভগীরথ সত্যিই বিকলাঙ্গ তখন তাঁর রাগ প্রশমিত হল এবং তিনি ভগীরথকে আশীর্ব্বাদ করলেন। তাঁর আশীর্ব্বাদে ভগীরথ স্বাভাবিক দেহ পেলেন। মুনি জানালেন যে ভগীরথ যদি ব্রহ্মার তপস্যা করে আমাকে মুক্ত করে পৃথিবীতে আনতে পারেন তাহলে আমার স্পর্শে তাঁর পূর্বপুরুষদের অভিশপ্ত আত্মারা মুক্তি পাবে।

ব্রহ্মলোকে গিয়ে কঠোর তপস্যা করে ভগীরথ ব্রহ্মাকে রাজি করালেন আমাকে মুক্তি দিতে। কিন্তু আমার ভারেযে স্বর্গ-মর্ত-পাতাল বিধ্বস্ত হবে। কে ধারণ করবে আমার মহাভার? এগিয়ে এলেন বাঘছাল পরিহিত জটাজুট ধারী এক তপস্বী। তাঁকে দেখেত আমি হেসে বাঁচিনা। এই সামান্য তপস্বী ধারণ করবেন আমাকে! ভাবলাম তাঁকে নাকানি চুবানি খাইয়ে একটু মজা করি। গর্বে মদমত্ত হয়ে অট্ট হাস্য করতে করতে ঝাঁপিয়ে পড়লাম তাঁর উপর। কিন্তু এ কি! মুহূর্তে সমস্ত জগত্তাঁর জটাজালে আবৃত হল। গভীর অন্ধকারে আমি তাঁর জটাজালে আবদ্ধ হলাম। গম্ভীর কণ্ঠে সেই পুরুষ বললেন, আমি দেবাদিদেব মহাদেব। গঙ্গে, তোমার বড় অহঙ্কার। আমি তোমাকে শাস্তি দিলাম।

আমি কাতর হয়ে বললাম, আমাকে ক্ষমা করুন প্রভু। আমাকে যে অভিশপ্ত আত্মাদের মুক্ত করতে হবে।

মহাদেব রূঢ় কন্ঠে বললেন, অহংকার করার সময় একথা মনে ছিলনা? থাকো অনন্তকাল আমার জটায় বন্দী হয়ে।

বিপন্ন ভগীরথ শুরু করলেন শিব বন্দনা। অবশেষে মহাদেবের মন গলল। আমি মুক্তি পেয়ে তিন ধারায় প্রবাহিত হলাম স্বর্গে মন্দাকিনী, পাতালে ভোগবতী আর মর্তে অলকানন্দা। আমার মর্তের ধারাকে শঙ্খনাদে পথ দেখিয়ে নিয়ে চললেন মহামতি ভগীরথ।

আমার স্পর্শে মর্তলোক আনন্দে মুখরিত হয়ে উঠল। বন-বনানী পুষ্পে শোভিত হল, পাখির কলরবে চতুর্দিক মুখরিত হল, মরুভূমি হয়ে উঠল শস্য শ্যামলা, মানুষেরা পূজা-আরতি-উলুধ্বনি-শঙ্খরব আর সংগীতে আকাশ বাতাস মুখরিত করে তুলল। শিবের নির্দ্দেশ ভুলে আমি আবার গর্বে মদমত্ত হয়ে উঠলাম।

পথ চলতে চলতে ভগীরথ বক্র পথ নেওয়ায় আমি প্রশ্ন করলাম তিনি কেন ঘুর পথে চলেছেন। বিনয়ে বিগলিত হয়ে রাজপুত্র বললেন যে সামনে এক মুনির আশ্রম। সোজা পথে গেলে আশ্রমের ক্ষতি হবে। আমি গর্বভরে বললাম, হোক ক্ষতি, আপনি সোজা পথেই চলুন।

অগত্যা অনিচ্ছা সত্বেও ভগীরথ সোজা পথে চলতে থাকলেন আর আমি মহা উল্লাসে মুনির আশ্রম আর মুনিকে ভাসিয়ে দিলাম। ধ্যানভঙ্গ হল মুনির আর নিমেষে তিনি এক গগনচূম্বি রূপ ধারণ করে এক চুমুকে আমাকে শুষে নিলেন আর আমি আবার বন্দী হলাম।

আবার শুরু হল ভগীরথের প্রার্থনা এবং অবশেষে মুনি তার জানু ছেদন করে আমাকে মুক্তি দিলেন। সেই থেকে আমার আর এক নাম হল জাহ্নবী। আবার শুরু হল আমাদের পথ চলা।

পথ চলতে চলতে আবার আমার মন অহংকারে কলুষিত হল। দেবর্ষি নারদ এসে বিষ্ণুর সাবধান বাণী শুনিয়ে গেলেন কিন্তু আমি তা গ্রাহ্য করলামনা। তারপর একদিন ভগীরথ পথের দিশা হারালেন। বিপন্ন হয়ে শুরু করলেন বিষ্ণুর প্রার্থনা। আবির্ভূত হলেন শঙ্খ-চক্র-গদা-পদ্ম ধারী জগতের পালক ভগবান বিষ্ণু। সে অপরূপ মুর্তি দেখে আমার জীবন ধন্য হল।

বিষ্ণু বললেন, গঙ্গে, এখন থেকে তোমার রাজসিক আর তামসিক সত্ত্বা এই নুতন পথে প্রবাহিত হবে আর তোমার সাত্ত্বিক সত্ত্বা মূল ধারায় প্রবাহিত হয়ে কপিল মুনির আশ্রমে পৌঁছবে।

তারপর ভগিরথকে বললেন, তুমি এই নদীপথ অনুসরণ করে পিছুপানে ফিরে যাও। পথের দিশা আবার খুঁজে পাবে আর সেই পথে গঙ্গার সাত্ত্বিক ধারাকে নিয়ে মুনির আশ্রমে পৌঁছবে।

ভগীরথ ফিরে গিয়ে আমার সাত্ত্বিক ধারাকে নিয়ে মুনির আশ্রমে পৌঁছলেন আর আমার স্পর্শে মুক্তি পেলেন তাঁর পুর্বপুরুষদের আত্মারা। ভগীরথের নাম থেকে আমার সাত্ত্বিক ধারার নাম হল ভাগীরথী আর পুবের রাজসিক-তামসিক ধারার নাম হল পদ্মা। কৈলাশে মহাদেবের পদধৌত ব্রহ্মপুত্র মিশল পদ্মায় আর ভারতবর্ষের উত্তরাপথের সব প্রবাহ এসে মিশল আমার দুই ধারায়। আমার দুই ধারা সৃষ্টি করেছে সুন্দরবন ব-দ্বীপের। সেখানকার কাহিনী তুমি পরে জানতে পারবে।

জীবনে আর কখনো গর্ব করবেনা।

একথা বলেই গঙ্গা দেবী অন্তর্হি্তা হলেন।

§§§

এদিকে অনেকক্ষণ ব্রতীন না ফেরায় সুবীর আর ক্লাবের ছেলেরা উত্কণ্ঠিত হয়ে পড়ল। ব্রতীনের খোঁজে অসংখ্য নৌকা নেমে পড়ল গঙ্গায়। কিন্তু কোথায় ব্রতীন? উত্কণ্ঠিত হয়ে থানার ও.সি. ফোন করলেন পোর্ট কমিশনারের অফিসে। অবশেষে ওদের স্পিড-বোট ভোরের দিকে ব্রতীনকে আবিষ্কার করল বজবজের কাছে। সে তখন গঙ্গাবক্ষে চিত্হয়ে শুয়ে দুহাত জোড় করে সুবীরের কাছ থেকে শেখা গঙ্গা স্তোত্র আবৃত্তি করে চলেছে।

§§§

বিশ্বের মহানতম নদী গঙ্গা। ভারতীয় সভ্যতার প্রাণকেন্দ্র এই মহান নদী দেবীসদৃশা। আসুন আমরা এই মহান নদীকে কলুষ মুক্ত রাখি আর ব্রতীনের সাথে কণ্ঠ মেলাইঃ

দেবি সুরেশ্বরী ভগবতী গঙ্গে, ত্রিভূবনতারিণি তরলতরঙ্গে।

শঙ্করমৌলিনিবাসিনি বিমলে, মম মতিরাস্তাং তব পদকমলে।।


Dr.Ratan Lal BasuRatan Lal Basu, Ph.D. (Economics) is an ex-Reader in Economics and Teacher-in-Charge, Bhairab Ganguly College, Kolkata, India. Dr. Basu has written & edited several books on Economics.

Apart from his passion for the field of Economics, Dr. Basu's other interests are Boxing & Small Game Hunting (gave up the nasty games during college life); Swimming in Turbulent Rivers (physically impossible now); Himalayan Treks, Adventure in Dense Forests, Singing Tagore Songs and also writing travelogues and fiction in Bengali and English.

Dr. Ratan Lal Basu can be reached at rlbasu [at] rediffmail.com.