উপহার - শুকদেব চট্টোপাধ্যায়, রহড়া | "Upohaar" (Presents) by Sukdeb Chatterjee (WBRi Bengali Online Magazine)

SUKDEB CHATTOPADHYAY"Upohaar" by Sukdeb Chatterjee of Rahara is an essay in unicode Bangla font published in WBRi Bengali Online Magazine section.  About the author:

নাম - শ্রী শুকদেব চট্টোপাধ্যায়
শিক্ষা - এম.কম
পেশা - ব্যাঙ্ক কমর্চারি
নেশা - খেলা দেখা, গান শোনা, একটু আধটু লেখা ও পড়া, বাগান করা, আড্ডা ও  প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভাবে সমাজ কল্যাণ মূলক কাজের সাথে অল্প স্বল্প যুক্ত  থাকতে চেষ্টা করা।
নিবাস - ৪৬৬, ওল্ড ক্যালকাটা রোড, (১৮১নঃ রেশন দোকানের পাশে), পোঃ রহড়া, জেলা-২৪ পরগণা(উ), পিন-৭০০১১৮. 
ফোন -     ৯০৫১২৫৯০৭৫ এবং  ০৩৩-২৫৬৮৭৮০২
ইমেল- Sukdeb.fhs@gmail.com, Sukdeb_rah@rediffmail.com
ওয়াশিংটন বাংলা রেডিও, দেশ বিদেশ, মাধুকরী, আনন্দ লিপি ইত্যাদিতে বেশ কিছু লেখা প্রকাশিত হয়েছে।
একটি সুন্দর যৌথ পরিবারের সদস্য।  

You can send your creative writing to submissions@washingtonbanglaradio.com for consideration towards publication.


উপহার

শুকদেব চট্টোপাধ্যায়, রহড়া


আমাদের ক্লাবে পুজোর আগে এলাকার গরিব ছেলেমেয়েদের নতুন পোশাক বিতরণ করা হয়। প্রায় বছর কুড়ি ধরে কাজটা হচ্ছে। প্রথম বছর থেকেই ক্লাবের এই সমাজসেবা মূলক কমর্কান্ডের সাথে প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত থাকার সৌভাগ্য আমার হয়েছে। পুজোর মাস খানেক আগে থেকে গ্রামের আনাচে কানাচে ঘুরে ঘুরে দুঃস্থ মানুষজনের সন্ধান করা হয়। সঙ্গে থাকে টেপ, খাতা  আর কলম। জামাকাপড় যাতে ঠিক মাপমত হয় তার জন্য টেপ দিয়ে ঝুলটা মেপে নিয়ে খাতায় বাচ্চাদের নামের পাশে লেখা থাকে। বাচ্চাদের দেওয়া হয় একটা কুপন। মাপ নেওয়ার পালা শেষ হলে প্রয়োজন মত জামাকাপড় হাট থেকে কিনে এনে প্রতিটা জামায় মাপ অনুযায়ী বাচ্চার নাম কাগজে লিখে  আটকে দেওয়া হয়। এর ফলে বিতরণ করা জামাকাপড় ছোট বড় খুব একটা হয় না।

এই কাজে আমার বহুদিনের সঙ্গী বাচ্চু আর নিতাই। প্রতি বছর যে একই দিকে যাওয়া হয় তা নয়। কারণ গত বছর যেখানে কুপন দিয়েছি এবার হয়ত তাদের আর অতটা প্রয়োজন নেই। কয়েকটি বাড়ির অভিভাবকেরা এও বলেছেন যে “ আমাদের ছেলেমেয়েদের এবার এক আধটা জামাকাপড় কিনে দিতে পেরেছি। ঐ দিকটায় ওদের কিছুই নেই”।

নিজেরা না নিলেও দরমার বাড়ির দাওয়ায় যত্ন করে বসিয়েছেন। ডেকে এনেছেন আরো গরিব প্রতিবেশীর ছেলে মেয়েদের। কাপে করে তিন জনের  জন্য এসেছে লিকার চা আর সঙ্গে নোনতা বিস্কুট । মন ভরে গেছে মানুষগুলোর এই মনোভাব, আপ্যায়ন আর ভালবাসায়।

এই কাজ করতে গিয়ে বিভিন্ন সময়ে অনেক বিচিত্র ঘটনার সম্মুখীন হয়েছি। ভাল মন্দ দুইই আছে।

একবার জামা পাওয়ার পর একটি বাচ্চার মাকে বলতে শুনেছি- এই তো জামার ছিরি তার জন্যে কত কায়দা।

বিতরণের জামাকাপড়  অবশ্যই উন্নত মানের নয়। কিন্তু যার কিছু নেই তার কাছে ওটাই অনেক। বুঝলাম আমাদের নিবার্চন সঠিক হয়নি।

আমাদের ক্ষমতা অনুযায়ী একটা নির্দিষ্ট সংখ্যায় জামাকাপড় দেওয়া হয়। চাহিদা তার থেকে বহুগুণ বেশি। ক্লাবেও অনেকে মাপ দেওয়ার জন্য আসে। সকলকে সন্তুষ্ট করা সম্ভব হয় না। না পাওয়াদের মধ্যে থেকে এক আধবার শোনা গেছে — চল চল, এরা চেনা লোক ছাড়া দেয় না।

হয়ত পরের বারই সেই ছেলে বা মেয়ে জামা কাপড় পেয়ে হাসিমুখে ক্লাব ছেড়েছে। তবে এগুলো সব ব্যতিক্রমী ঘটনা। সুখ স্মৃতি অনেক বেশি।

অনেকদিন আগের একটা ঘটনা এখনও ভুলতে পারিনি। কোন একটা জায়গায় বসে মাপ নিচ্ছিলাম। বাচ্চারা খবর পেয়ে এদিক ওদিক থেকে সেখানে জড় হয়েছে। আগে নেওয়ার জন্য অনেকে হুড়ো হুড়ি করছে। যদিও মানা সম্ভব হয় না তবু ওখানে বলে দেওয়া হচ্ছিল যে পরিবার পিছু একজন বাচ্চাকে পোশাক দেওয়া হবে। এক পরিবারের একাধিক বাচ্চা এলে, কাকে দেওয়া হবে জিজ্ঞেস করলে সব বাচ্চাই ‘আমাকে দাও’ আমাকে দাও’ বলে চেঁচায়। শিশুদের ক্ষেত্রে এটাই স্বাভাবিক। কুপন দেওয়া প্রায় শেষ হয়ে এসেছে। হঠাত চোখ গেল পাশে একটু তফাতে থাকা কয়েকজনের দিকে। অধর্নগ্ন এক মহিলা তার তিন সন্তানকে নিয়ে এসেছে। বড়টি মেয়ে, ন দশ বছর বয়স। বাকি দুটি ছেলে। মায়ের অঙ্গে শতচ্ছিন্ন ময়লা একটা শাড়ী। যা দিয়ে কোনভাবেই লজ্জা ঢাকা সম্ভব নয়। মেয়েটি কেবলমাত্র একটা ইজের পরা আর ছেলে দুটি উলঙ্গ। দেখে বড় কষ্ট হল। মেয়েটি কাছে এগিয়ে এসে  বলল—কাকু, বাড়ি পিছু একজনকে দিচ্ছ ত। আমাদের লাগবে না। আমার মাকে একটা শাড়ী দেবে!

মার শাড়ির ব্যবস্থা করা হবে এই আশ্বাস দিয়ে জিজ্ঞেস করলাম - এবার তোমাদের মধ্যে কাকে দেব বল ?

- পারলে ভাই দুটোকে দাও।

ওদের দেখে কষ্ট তো হচ্ছিলই, স্তম্ভিত হয়ে গেলাম ওইটুকু মেয়ের মানসিকতা দেখে।  ঐ পরিবারের সকলের জন্যই সে বার জামা কাপড়ের ব্যবস্থা করা হয়েছিল।

আমাদের বাড়িতে তখন ছেলে মেয়েরা কার কটা জামা হল, আর কাকা, মামা, পিসি, মাসিদের কাছ থেকে আরো কটা পাবে তার হিসেব নিকেশে ব্যস্ত।
অষ্টমীর সন্ধ্যাবেলায় পুজো প্যান্ডেলে বসে আছি। হঠাত ‘কাকু’ বলে কেউ ডাকল। তাকিয়ে দেখি সেই মা আর তিন ছেলে মেয়ে নতুন জামা কাপড় পরে  ঠাকুর দেখতে বেরিয়েছে। অনাবিল আনন্দে ভরা মুখগুলি। বাচ্চা গুলোকে আদর করলাম। আমার কাছে একটু দাঁড়িয়ে চলে গেল অন্য একটা ঠাকুর দেখতে। কত অল্পেই পূর্ণ হয় এদের চাহিদার পাত্রগুলি। তবু সমাজের এই হতভাগ্যদের প্রায়শই তা শূন্যই থেকে যায়।

দীনহীন পরিবারের ক্ষণিকের ঐ আনন্দ পুজোয় আমার জীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ প্রাপ্তি।