মোচ্ছব ( ছোট গল্প ) - শুকদেব চট্টোপাধ্যায়, রহড়া | "MOCHCHAB" Short Story by Sukdeb Chatterjee (WBRi Bengali Online Magazine)

SUKDEB CHATTOPADHYAY"Mochcab" by Sukdeb Chatterjee of Rahara is a short story in unicode Bangla font published in WBRi Bengali Online Magazine section.
About the author:

নাম - শ্রী শুকদেব চট্টোপাধ্যায়
শিক্ষা - এম.কম
পেশা - ব্যাঙ্ক কমর্চারি
নেশা - খেলা দেখা, গান শোনা, একটু আধটু লেখা ও পড়া, বাগান করা, আড্ডা ও  প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভাবে সমাজ কল্যাণ মূলক কাজের সাথে অল্প স্বল্প যুক্ত  থাকতে চেষ্টা করা।
নিবাস - ৪৬৬, ওল্ড ক্যালকাটা রোড, (১৮১নঃ রেশন দোকানের পাশে), পোঃ রহড়া, জেলা-২৪ পরগণা(উ), পিন-৭০০১১৮. 
ফোন--     ৯০৫১২৫৯০৭৫ এবং  ০৩৩-২৫৬৮৭৮০২.
ওয়াশিংটন বাংলা রেডিও, দেশ বিদেশ, মাধুকরী, আনন্দ লিপি ইত্যাদিতে বেশ কিছু লেখা প্রকাশিত হয়েছে।
একটি সুন্দর যৌথ পরিবারের সদস্য।  

You can send your creative writing to submissions@washingtonbanglaradio.com for consideration towards publication.


মোচ্ছব

শুকদেব চট্টোপাধ্যায়, রহড়া


সকাল সাড়ে ছটা নাগাদ বাচ্চুর থেকে খবরটা পেলাম। নরেনদা মারা গেছেন। বয়স হয়েছিল। বহুদিন ধরে ভুগছিলেন। ফলে আকস্মিক কোন ঘটনা নয়। আজ নয় কাল প্রত্যাশিতই ছিল। তবু মনটা খারাপ হয়ে গেল। মাত্র কয়েক বছরের পরিচয়। বয়সেও  অনেকটাই বড়। কিন্তু আমাদের সাথে বন্ধুর মত মিশে গিয়েছিলেন। কয়েকদিন আগে আমি আর দিলীপ গিয়েছিলাম দেখা করতে।  শীর্ণ শরীর, বিছানাতে প্রায় মিশে গেছেন। আমাদের দেখে কি আনন্দ। গলা দিয়ে আওয়াজ বেরোচ্ছে না। কুঁই কুঁই করে বৌদিকে চা করতে বললেন। আড্ডাবাজ মানুষ। শরীরে শতেক জ্বালা যন্ত্রণা। কিন্তু সব থেকে বড় যন্ত্রণা ঘরে আবদ্ধ হয়ে থাকা। শরীরে যখন একটু ক্ষমতা ছিল তখন ডাক্তারের মানা সত্ত্বেও ক্লাবে বা এদিক ওদিক মাঝে মাঝেই বেরিয়ে পড়তেন। এখন সে ক্ষমতাটুকুও নেই।

ফিরে আসার সময় বললাম—কটা দিন ডাক্তারের কথামত একটু সাবধানে থাকুন। একটু ভাল হলেই ক্লাবে নিয়ে যাব।

উনি অসুস্থ হলে দেখতে গিয়ে প্রতিবারই মানসিকভাবে চাঙ্গা করতে একই ধরণের কথা বলি। শুনে খানিকটা খুশিও হন।

এবারে শুধু বললেন—টিকিট কাটা হয়ে গেছে ভাই। ট্রেনের অপেক্ষায় আছি।

সময় যে ফুরিয়ে এসেছে হয়ত বুঝতে পেরেছিলেন।

নার্সিং হোম থেকে মৃতদেহ এনে বাড়ির সামনে রাখা হয়েছে। শববাহী গাড়িও রেডি। আত্মীয় পরিজনেরা এক এক করে আসছে। কিছু আসা তখনও বাকি। সামনে গিয়ে একটু ফুল দিলাম। স্বাভাবিক চেহারা। এত কষ্ট পেয়েছেন তা মুখ দেখে বোঝার উপায় নেই। অল্প স্বল্প কান্নাকাটি হচ্ছে। তার মধ্যে কিছু লোক দেখানো। এটাও একটা আর্ট। মনে বেদনার লেশমাত্র না থেকেও কেমন নিখুঁতভাবে কান্না পরিবেশন করছে।

একই ক্লাবের সভ্য হওয়ার ফলে অনেক সময় একই জায়গায় আমাদের নেমন্তন্ন থাকত। চেনা জানা কোন বাড়িতে কেউ কোন বিপদে পড়লে বা মারা গেলে আমরা কয়েকজন চেষ্টা করি পাশে গিয়ে দাঁড়াতে। কিছুটা সেই কারনেই শ্রাদ্ধের নেমন্তন্ন তুলনামূলকভাবে আমাদের একটু বেশিই থাকত।  কেউ কেউ নানান অজুহাতে শ্রাদ্ধবাড়িতে খান না। অবশ্য ইদানীং মৎসমুখির দিনে নেমন্তন্ন করার প্রবণতা বাড়ায় শ্রাদ্ধে না খাওয়ার লোকের সংখ্যা অনেক কমে গেছে। আমারও কখনই শ্রাদ্ধবাড়িতে খেতে ভাল লাগে না। একজন মারা গেছে, তার মৃত্যু উপলক্ষে ভোজ। ভাবলেই কেমন লাগে। কি রীতি। খুব কমই দেখেছি কারো মৃত্যুর পর মৃতের পরিবারে কোন স্মরণ সভা হচ্ছে (অফিস বা ক্লাব ছাড়া)। ভাল না লাগলেও আমার লোকের মুখের ওপর যাব না বলতে বাধে। মনে হয় লোকটা হয়ত আঘাত পাবে।

একবার এক শ্রাদ্ধবাড়িতে গিয়েছি। সঙ্গে কমল আর নরেনদা ছিল। অবস্থাপন্ন পরিবার। এলাহি আয়োজন। আলো, প্যান্ডেল, খাওয়া দাওয়ার আয়োজন যে কোন ভাল বিয়ে বাড়িকে ম্লান করে দেবে।

যাঁর মৃত্যু উপলক্ষে এই আয়োজন সেই মহিতোষ বাবু আমার অনেক দিনের চেনা। পাশের পাড়ায় থাকতেন। রাস্তায় বা বাজারে দেখা হলে অনেকক্ষণ গল্প হত। ওনার এক ছেলে এক মেয়ে। ছেলে চন্দন আই টি সেক্টারে কাজ করে। কোলকাতা, হায়দ্রাবাদ, চেন্নাইয়ে কয়েক বছর রগড়াবার পর সেই যে বিদেশ চলে গেছে আর ফেরার নামটি করেনি। দোতলা বড় বাড়ি। থাকার লোক মাত্র দুজন। বাড়ির পিছনে বাগানের কোনায় একটা আউট হাউস মত আছে। ওখানে সপরিবারে একজন মালি কাম দারোয়ান থাকে। বিপদে আপদে ওই ভরসা। মহিতোষ বাবুর মেয়ে নন্দিতারা এলাহাবাদে থাকে। সুযোগ পেলে বছরে এক আধবার এসে বাবা মায়ের খবরা খবর নেয়। মেয়ে জামাই দুজনেই ওনাদের নিজের কাছে নিয়ে গিয়ে রাখতে চেয়েছে। মহিতোষ সস্ত্রীক এক আধবার ঘুরেও এসেছেন। কিন্তু পাকাপাকিভাবে এ বাড়ি ছেড়ে ওখানে গিয়ে থাকতে সম্মত হননি। আত্মসম্মানে বেধেছে।

মহিতোষের শরীর স্বাস্থ ভালই ছিল। বরং ওনার স্ত্রী প্রায়ই ভোগেন। ওঁদের বাড়ি যতবার গিয়েছি তার বেশিরভাগটাই ওনার স্ত্রীর অসুস্থতার কারণে। সেই মানুষটাকে একা ফেলে বুকে একটা ধাক্কার সামান্য অজুহাতে কয়েকদিন হাস্পাতাল ঘুরে মহিতোষ চলে গেলেন।

বাড়িতে ঢোকার মুখে ছেলে চন্দন আমাদের দেখতে পেয়ে এগিয়ে এল। শ্রাদ্ধের কাজ দুদিন আগে মিটে গেছে। ওইদিন মৎসমুখি। পুজো পাঠের ঝামেলা নেই, ঝাড়া হাত পা।
—আসুন আসুন। আসুন ভেতরে সোফায় বসুন। আগে একটু চা বা সরবত খান তারপর খাওয়া দাওয়া করবেন। বসে খাওয়া আর বুফে দুরকমেরই ব্যবস্থা আছে। নামি  ক্যাটারারকে দিয়েই কাজটা করাচ্ছি। মা হারুদার কথা বলছিল। কিন্তু পাড়ার ক্যাটারারকে ঠিক ভরসা করা যায় না।

একটানা কথাগুলো বলে আমাদের ভেতরে পাঠিয়ে চন্দন অন্যদিকে চলে গেল। চেহারায় শোকের লেশমাত্র নেই। বাবা বা মাকে নিয়ে কোন কথা নেই। আচরণে বাড়ফাট্টাই ভাব।

অতিথি অভ্যাগতর কুশল বিনিময়, রঙ্গ রসিকতা আর হাহা হিহির কোরাসে চারিদিকে বেশ একটা উৎসবের আমেজ।

-- কিগো নতুন মাসি, চিনতে পারছ ?

-- মুনিয়া না ? কতদিন পরে দেখলাম । কত বড় হয়ে গেছিস। তোর মার সাথেও তো দেখা হল। মনটা আনন্দে ভরে গেল রে। এই জন্যই খুব কাজ না থাকলে চেষ্টা করি অনুষ্ঠান বাড়িগুলোতে আসতে। কতজনের সাথে দেখা হয়। তোদের.....

গল্প করতে করতে দুজনে আনন্দের পরবর্তী উপকরণ ভোজ এর দিকে এগোলেন।

আমাদের সঙ্গে আনা মালা গুলো মহিতোষের ছবিতে পরাতে হবে।  কিন্তু ছবি কোথায় ? বিস্তর খোঁজাখুঁজির পর কোনার দিকে একটা ঘরে তার সন্ধান পাওয়া গেল। মাঝারি সাইজের ছবি। একটা টেবিলে সাদা চাদর পেতে তার ওপর রাখা। লোকের আনা দুটো মিষ্টির বাক্স দিয়ে সামনেটায় ঠেকা দেওয়া আছে যাতে মালার চাপে ছবিটা হড়কে না যায়। অনেক আগের ছবি। মহিতোষের পাশে কেউ ছিল। হয়ত বৌদি। সেটা কাঁচা হাতে এডিট  করা হয়েছে। পাশের জনকে বাদ দিতে গিয়ে মহিতোষের একপাশটা বাহুমূল থেকে বাদ চলে গেছে। এই প্রথম কোন ছবিতে বগলে  চন্দনের ফোঁটা লাগান দেখলাম। আসলে কাটা হাত ম্যানেজ করার জন্য চন্দনের ফোঁটা মহিতোষের মুখ থেকে বগল অব্দি টানা হয়েছে, যদিও তাতে লাভ হয়নি। ওই দিকটা বে আব্রুই থেকে গেছে। মহিতোষের চোখে তিযর্ক চাউনি। যেন বলতে চাইছে “কেমন বুঝছ”!

শোকের বাড়িতে নামী ক্যাটারার দিয়ে এলাহি খানাপিনার আয়োজন করলেও একটু ভাল স্টুডিও থেকে বাবার একটা ভাল ছবি করানোর মত অপব্যয়ে হয়ত এদের মন সায় দেয়নি। আর তাই যে মানুষটার স্মরণে এই অনুষ্ঠান তার ছবি সামনের কোন জায়গায় না রেখে রাখা হয়েছে নিভৃত এক কোনে।

পাশের ঘরে মহিতোষের স্ত্রী আশালতার দেখা পেলাম। বড় খাটের একধারে বসে আছেন। মহিতোষ মারা যাওয়ার দিন ছাড়াও আরও দু এক দিন এ বাড়িতে এসেছিলাম খবরা খবর নিতে। ছেলে তখনও এসে পৌঁছায়নি। আশালতা খুব ভেঙ্গে পড়েছিলেন। এখন অনেকটা স্বাভাবিক। জীবনের বাকি দিনগুলোর কথা ভেবে হতেই হবে। সন্তানকে মায়ের থেকে বেশি আর কে চেনে। চন্দন কোন দুঃখ কষ্ট থেকেই যে তাঁকে বঞ্চিত করবে না তা তার জানা। আমাদের দেখতে পেয়ে ওনার মুখে একটু খুশির ভাব লক্ষ্য করলাম। কিছুক্ষণ কথা বলে ওঠার সময় বললাম—যে কোন দরকারে ডাকতে সংকোচ করবেন না।

-- তোমরা ছাড়া আমার আর কে আছে বল ?

সারা চত্বরে এইটুকু জায়গা বোধহয় মহিতোষকে স্মরণ বা শোক জ্ঞাপনের জন্য ছাড় দেওয়া আছে। ওখান থেকে উঠে খাবারের জায়গায় এলাম। আবার সেই হৈ হুল্লোড় উৎসবের পরিবেশ। চন্দন তদারকি করছে।

-- ঠিক মত খেয়েছেন তো কাকা !

-- খেয়েছি মানে। হাঁ করলে খাবার দেখতে পাবে। বহুদিন বাদে এত ভাল খেলাম। ইলিশটা মনে হয় পদ্মার, তাই না।

--(আত্মতুষ্টির সঙ্গে) ওই জন্যই তো বড় ক্যাটারারকে দেওয়া। মা খালি বলছিল ‘রাখালকে ক্যাটারিংটা দে।‘ রাখালের কোন টেস্ট আছে ? মার কথা শুনলে হয়েছিল আর কি।

মহিতোষের যে কোন আপদে বিপদে আমরা আসতে পারি কি না পারি, রাখাল সন্তানের মত বুক দিয়ে আগলেছে। আর শেষের কদিন তো নিজের সমস্ত কাজকর্ম ফেলে মহিতোষের সাথে হাস্পাতালেই কাটিয়েছে। এমন একজনের জন্য আশালতার সুপারিশ ধোপে টেকেনি। মায়ের ঋণে সন্তানের কিসের দায়। অবশ্য পরে জেনেছি মহিতোষের ছেলের এই দেখনদারি, বাড়ফাট্টাই, কোনটাই নিজের পয়সায় নয়। সবটাই মায়ের থেকে  আদায় করা।

বাড়ি ফেরার সময় কমল বলল—বাড়িতে জানিয়ে দেব, আমি মারা গেলে যেন কোন রকম লোক লৌকিকতা, পুজো পাঠ না হয়।

নরেনদা সম্মতি জানালেন—সত্যি, এগুলো বন্ধ হওয়া উচিৎ। শোকের বাড়িতো নয় যেন মোচ্ছব হচ্ছে।

সেই নরেনদার মৎসমুখিতে আমরা নিমন্ত্রিত। খাওয়া দাওয়ার ব্যবস্থা ক্লাবেই। নরেনদা অতটা অভাগা নয়। দুই ছেলে। ছেলেরা সাধ্যমত বাবাকে দেখেছে। হলে ঢোকার মুখে বাঁদিকে নরেনদার বড় একটা ছবি রাখা হয়েছে। ওইখানেই কিছুদিন আগেও আমরা একসাথে বসে আড্ডা মেরেছি। ভাবলেও কেমন লাগে। যদি কোন দরকারে লাগি তাই সকাল থেকেই ছিলাম। সকালে যখন নরেনদার স্ত্রী সন্তানেরা আসে তখন পরিবেশটা বেশ থমথমে ছিল। লোক আসার সাথে সাথে শোকের গুমোট ভাবটা ধীরে ধীরে কেটে গেল। ফুরফুরে মেজাজে গল্প গুজব হচ্ছে। মাঝে মাঝে হাসির আওয়াজ রাস্তার ওপার থেকেও শোনা যাচ্ছে। খাওয়ার আয়োজনে বৈভবের প্রকাশ না থাকলেও ‘দারুন খেলাম’ এমন কথা বেশ কয়েকজনের মুখেই শুনলাম। ফিরে আসার সময় নরেনদার ছবিটার দিকে চোখ গেল। বেশি পুরোনো নয়, হালফিলের ছবি। মালায় অনেকটাই ঢেকে গেছে। কাছে গিয়ে একটু দাঁড়ালাম।

‘নরেনদা, আজ তোমার মৃত্যুকে কেন্দ্র করেও মোচ্ছব হচ্ছে। আর সেই মোচ্ছবে অংশগ্রহণ করার জন্য আমিও নিমন্ত্রিত।‘

বিপদে লোকের পাশে সহানুভূতির সাথে একটু দাঁড়ানর ফল স্বরূপ আমার শ্রাদ্ধ বাড়িতে নিমন্ত্রণের সংখ্যাটা বিয়ে বাড়ির মতই বা হয়ত কিছু বেশিই হবে। দু একটা ব্যতিক্রম বাদ দিলে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দুটোর পরিবেশে খুব একটা তফাৎ করতে পারিনি।

মানুষের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে ধর্মের অছিলায় বিনোদনের এই আসরের ঔচিত্য, কোন ধর্ম, সংস্কৃতি, শিক্ষা দিয়ে প্রতিপাদন করা যায় না। তবু এই মোচ্ছব আজ ঘরে ঘরে।