দিব্যদৃষ্টি - তারক ঘোষ (ছোট গল্প) Dibyadrishti: Bengali Short Story by Tarak Ghosh (WBRi Bengali Online Magazine)

"Dibyodrishti" by Tarak Ghosh of Kolkata is a short story in unicode Bangla font published in WBRi Bengali Online Magazine section. Tarak is a writer and a journalist, managing editor of NEWS3, and former journalist for the Bartaman, the Telegraph and other dailies and journals.

You can send your creative writing to submissions@washingtonbanglaradio.com for consideration towards publication.


Tarak Ghoshদিব্যদৃষ্টি

তারক ঘোষ



ডাক্তারবাবু মাথা নাড়তে নাড়তে ঘর থেকে বেড়িয়ে গেলেন। যেন বুঝিয়ে দিয়ে গেলেন সময় শেষ হয়ে আসছে।বাইরের পৃথিবীতে সময় এখনও প্রবহমান। দিনের খেয়া পার হয়ে সূয এখন পশ্চিম আকাশে। এক্তু পরেই হেসে উঠবে পশ্চিমের দেশে,ভোরের ফুল ফুটিয়ে।বাইরে এখন আলোছায়ার খেলা।আঁধারের দিকে দুহাত বাড়িয়ে এগিয়ে চলেছে পড়ন্ত বিকেলের লম্বা ছায়ারা।ঘড়িতে এখন বিকাল পাঁচটা।আর ঘরের মধ্যে সময় গেছে থমকে। ডাক্তারবাবু জানিয়ে গেলেন সময় শেষ হয়ে আসছে।বিছানার উপর নিজীব শুয়ে দিবাকর,দিবাকর রায়। একসময় যার হাঁকডাকে তটস্থ হয়ে থাকত সারা বাড়ি। তার সেই হাঁকডাকে ছেলেমেয়েরা কোথায় গিয়ে ্যে লুকোবে ভেবে পেত না।
কিন্তু জীবনের জাদুকর কোন এক মন্ত্রবলে চুরি করে নিয়েছে তার সব শব্দ। এই শব্দময় জগতে দিবাকর আজ শব্দহীন………… ভাষাহীন। তার মুখের চামড়ায় সময়ের শিল্পকর্ম। খোলা চোখের দৃষ্টি আজ আর স্পর্শ করছে না স্থাবর অস্থাবরকে।দিবাকর চোখ দুটো একবার বন্ধ করলেন।চোখের কোণ বেয়ে গড়িয়ে পড়ল দু ফোঁটা জল।ছোটবেলায় চোখের জল পড়লে ছুটে আসতেন মা, বুকে চেপে আঁচল দিয়ে মুছে দিতেন চোখ দুটো। তারপর সোনা মুখের উপর একটা মিষ্টি চুমো দিয়ে বলতেন, ‘তোমায় কে মেরেছে সোনা? ওকে আমি বকে দেব। এবার হাসি মুখটা একবার দেখি। এই তো………….. মায়ের সেই হাত আজ বহুদূরে। আগুনের লেলিহান শিখা জ্বালিয়ে পুড়িয়ে পঞ্চভূতে বিলীন করে দিয়েছে সেই হাত,সেই শরীর,সেই ভালবাসা।

দিবাকর নিজের হাতটা একবার তোলার চেষ্টা করলেন। পারলেন না,জীবন নদীর কিনারায় পৌঁছে গেলে হয়ত শরীর থেকে মনটা আলাদা হয়ে যায়।

দিবাকর যে ঘরে শুয়ে আছেন তার ঠিক পাশের ঘরেই সরমা।দীর্ঘ ষাট বছর দিবাকরের দাম্পত্যসঙ্গী। এখন রোগশয্যায়,দিন তিনেক আগে বিছানা নিয়েছেন।একসঙ্গে পৃথিবীতে আসা হয়নি, তাই হয়ত একসঙ্গে ফিরে যাওয়ার ইচ্ছা।দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে সোম আর আরতী।দুজনের মুখেই বিষাদের ছায়া।ডাক্তারবাবুকে বেরোতে দেখে সোম শশব্যস্তে এগিয়ে যায়।

-কিছু করা যাবে না ডাক্তারবাবু?

ডাইনে বাঁয়ে ঘাড় দোলালেন ডাঃ বাগচী।‘উনি এখন সব চিকিৎসার বাইরে।বাকিটা ঈশ্বরের হাতে’। ডাঃ বাগচী বেরিয়ে গেলেন। শুনিয়ে গেলেন বিদায়বার্তা।

এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা।বাড়ির সামনে নিম গাছটায় একঝাঁক পাখি। প্রতি সন্ধ্যায় ওদের চিৎকারে কান পাতা দায় হত। বিরক্ত দিবাকর প্রায়ই গাছ লক্ষ্য করে ঢিল ছুড়তেন। প্রথম প্রথম পাখিগুলো ভয় পেত,উড়েও যেত।পরে আর উড়ত না,হয়ত ভেবে নিয়েছিল,সন্ধ্যার নিশ্চিত আকাশে উড়ে যাওয়ার চেয়ে … সামান্য দু একটা ঢিল,  লাগতে তো না ও পারে।

আজ ওরাও নিশ্চুপ।

একদিন তো ভয়ঙ্কর রেগে গিয়েছিলেন দিবাকর। সবেমাত্র বইটা নিয়ে বারান্দায় বসেছেন। আর তক্ষুনি ঘরে ফেরা পাখিদের তুমুল আনন্দধনি। পাখিদের সেই  আনন্দ কোলাহল যে কতো বিরক্তিকর হতে পারে, পড়ন্ত বিকেলে গাছের কাছে না এলে ঠিক বোঝা যায় না।
মহাখাপ্পা হয়ে গিয়েছিলেন দিবাকর। গাছটার দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে বলেছিলেন,’দাঁড়া, গাছটা কেটে তোদের সবকটাকে এবার বাস্ত্যুচ্যুত করে ছাড়বো। তখন বুঝবি কত ধানে কত চাল।সব ট্যাঁ ফুঁ বেরিয়ে যাবে’।

আজ সেই দিবাকরই বাস্তুচ্যুত হতে চলেছেন।যে বাড়িটা ছিল যৌবন থেকে বার্ধ্যকের  ঠিকানা,যে বাড়িটা সারানো নিয়ে হরদম তর্ক লেগে থাকত বাড়িওয়ালার সঙ্গে, সেই বাড়িই আজ তিনি ছেড়ে যাচ্ছেন।বাড়িওয়ালার হুমকিতে নয়,সর্বশক্তিমান  বিধাতার কলমের এক আঁচড়ে।দিবাকরের মন বলে,কে যে বাড়িওয়ালা, আর কে ই বা ভাড়াটে, জীবদ্দশায় কেউই তা বোঝেনা।

বাইরে এখন নীল অন্ধকার,মৃত্যুশীতল বিষণ্ণ আঁধারে ঢেকে যাচ্ছে বাইরের কর্মক্লান্ত চরাচর।ঘড়িতে সন্ধ্যা ছ’টা,শেষা শীতের ঠান্ডা বাতাসে শরীরে কাঁপন ধরে।

সোম স্ত্রীকে বলে,’বাবার ঠান্ডা লাগবে,লেপটা একটু টেনে দিয়ে এসো।‘

আরতী দিবাকরের পায়ের কাছ থেকে লেপটা গলা পর্যন্ত টেনে দেয়, তারপর আস্তে করে ডাকে, ’বাবা’।

ডাকটা কানে আসে দিবাকরের। মনের মধ্যে কত কথা, কিন্তু কন্ঠে স্বর নেই।শুধু চোখ দুটো মেলে দেখার চেষ্টা।কিন্তু দৃষ্টি নেই। নেই বর্তমান, নেই ভবিষ্যত।আছে শুধু অতীত।আনন্দ-বেদনা জড়ানো এক নীরব অতীত।সেই অতীত এখন দিবাকরের মনের পর্দায় বড্ড আবছা।

স্বার্থপর,আত্মমুখী পুত্র-পুত্রবধূ—ইনিয়ে বিনিয়ে-  এখানে ওখানে! কী পেলেন ? সম্পর্কের আমোঘ টানকে উপেক্ষা করে সীমারেখা টেনে দিয়ে কী পেলেন দিবাকর ?সবই তো  রইল পড়ে।

সোম আর আরতী। দারিদ্র্যের সঙ্গে তাদের নিত্য লড়াই। তারা আজও জানে না কোন স্বার্থ

চরিতার্থ করতে গিয়ে দিবাকরের চোখে তারা আজ স্বার্থপর। আরতী শাশুড়ীর ঘরে ঢোকে।শাশুড়ীর ঘরে এখন সোম।সো্মের দু পাশে অরিত্র আর সোমা।

জীবন থেমে থাকে না।মৃত্যু যেমন সব হিসাব বুঝে নেয়,জীবনও তাই।তারপর একদিন বেলা শেষে সবকিছু তুলে দেয় সেই যাদুকরের হাতে। শুরু হয় নতুন খাতা।নতুন ভাড়াটে,নতুন সংসার,নতুন হাসি, নতুন কান্না।বাইরের রাস্তায় সেই অমৃতময় মানুষের একই আনাগোনা,বাজারে-দোকানে জীবনধারণের সেই একই লড়াই। টিভিতে ক্রিকেটের উত্তেজনা।উত্তেজনা উষ্ণতার আলিঙ্গনে।

তবু বদলায়। বদলায় সাল তারিখ।বদলায় চেনা ছাঁচের মুখগুলো।বদলায় জীবনের আলোছায়া,সম্পর্কের ওঠাপড়া ।

সরমা চোখ তুলে তাকাল। জড়ানো স্বরে সোমকে জিজ্ঞাসা করল,’তোর বাবা আছে?’

সোম ঘাড় নেড়ে সায় দেয়। আবার নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে পরে সরমা। এই এক অদ্ভুত মানুষ সরমা। সারাটা জীবন শুধু স্বামীকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হয়ে চলেছে। জীবনের পানপাত্রে যে কত রকমের সম্পর্ক ছড়িয়ে রয়েছে চেখে দেখার চেষ্টাই করল না জীবনভর।

সোম দেখে এসেছে বাবা থাকলেই মা খুশি।দিনভর একই প্রশ্ন,’তোর বাবা কোথায়?ফিরেছে?এখনো ফেরেনি?’ এ ধ্রণের অজস্র প্রশ্ন। মৃত্যুর চোরাগলিতে হারিয়ে যাওয়ার মুহুর্তেও সেই একই প্রশ্ন আঁকড়ে জীবনের জাল বুনে যাওয়া……..’তোর বাবা আছে?’
কিন্তু এরপর?........বাড়ি নেই, অর্থ নেই,সম্পর্ক নেই……….তখন সরমা কি করবেন?

সোম ভাবে এতাই কি সেই অমোঘ প্রশ্ন, যার উত্তর খুঁজতে গিয়েই এই সংসার,এই সমাজের সৃস্টি।।.. শুধু দু মুঠো খাওয়া। এটাই তো বেঁচে থাকা। এটাই তো জীবন, না কি জীবনের মরীচিকা? তাহলে সম্পর্কটা কি? মানুষ কি সম্পক ছাড়া বেঁচে থাকতে পারে?

সোম জানে দিবাকরের জীবনে ‘সম্পর্ক’ তেমন কিছু মুল্যবান ছিল না। কিন্তু সোম কি পারবে সম্পর্ককে উপেক্ষা করতে? শূন্যের মাঝে যার বাস, দিনের চাকা ঘুরলে যেখানে আরেকটা অভাবের রাত,কি উত্তর দেবে সোম মায়ের প্রশ্নের? বলবে, ‘রাত্রি শেষের অপেক্ষায় আছি মা।‘

রাত নামার আগেই হাঁক পাড়তেন দিবাকর………………..কই গো আলোটা জ্বেলে দিয়ে যাও। তারপর টিভি খুলে ছবি দেখা। আজও রাত হয়ে আসছে। কিন্তু দিবাকরের ঘর থেকে ভেসে আসে না সেই কন্ঠস্বর……………… কই গো আলোটা………
হ্যা, আলো চাই।বড় আঁধার চারিদিকে। তোমার জন্য,আমার জন্য,সম্পর্কের ডালপালা আর জীবনের খাঁজে আটকে থাকা শিকড়টাকে খুঁজে বের করার জন্য এক আকাশ আলো চাই।

দিবাকরের কানের কাছে কে যেন বলে,তুমি আমাকে একমুঠো ভালবাসা দাও দিবাকর, আমি তোমাকে দেব এক আকাশ আলো। সাত্যিই বড় অন্ধকার চারিদিকে।কেউই আলো জ্বালতে চায়না।দেখনি,তোমার বারান্দায় আলো পরবে বলে তোমার পড়শী গোপালবাবু রাতভর তার বারান্দার আলো নিভিয়ে রাখতেন। আর তুমি? বারান্দার আলোটাই নিভিয়ে রাখলে,পাছে গোপালবাবু বিনা পয়সায় আলো পেয়ে যান।
দিবাকর,এটাই জীবন। বয়ে যাওয়া জীবনের রন্ধ্রে রন্ধ্রে অহঙ্কারের অন্ধকার। সারাজীবন আলোটা জ্বালতেই বলে এলে। নিজে কোনদিন জ্বালতে চেয়েছ ! যদি চাইতে,দেখতে পেতে জীবন কত সুন্দর।সম্পর্ক কত নির্ভরতার।বিশ্বাস কত আনন্দের।চেয়ে দেখ দিবাকর,তোমার পাশে তোমারই উত্তরপুরুষ।কি বলবে ওদের?.....’ জীবনের সব আলো নিভিয়ে দাও ! না দিবাকর্, না। তোমার বুকের ভালবাসাকে প্রদীপ করে জ্বালিয়ে দাও।পূর্বপুরুষের চৌকাঠ থেকে সেই আলো ছড়িয়ে পড়ুক উত্তরপুরুষের ঘরে ঘরে। জ্বলে উঠুক সেই অনির্বাণ শিখা। তুমিও জ্বলে ওঠো দিবাকর,  …..শেষবারের মত। আলোয় আলোয় ভরিয়ে দাও সমস্ত ভুবন।উজ্বল সূয়টার দিকে তাকিয়ে শেষ বারের মত বলে ওঠো দিবাকর……….ওঁ জবাকুসুম শঙ্কাশং…………….

পাশের ঘর থেকে সরমা বলে ওঠেন, ‘ তোর বাবা আছে?’

ওঘর থেকে সোম আর্তনাদ করে ওঠে, ‘ না মা, বাবা নেই’।



Enhanced by Zemanta