স্বপ্ন - রতন লাল বসু: পঞ্চম অধ্যায় | Shopno - A Bengali Novel by Dr. Ratan Lal Basu - Chapter 5 | WBRi Bangla Online Magazine

"Shopno" is a novel by Dr. Ratan Lal Basu published serially in the WBRi Bangla Magazine section in unicode Bangla font. Links to previous and following chapters are posted at the bottom of every episode.


স্বপ্ন

রতন লাল বসু

পঞ্চম অধ্যায়


কলকাতার উপর দিয়ে আরো একটা শীতকাল চলে গেল। দু-চার দিনের বাসন্তি হাওয়ার পর কয়েক মাস জুড়ে দারুণ গ্রীষ্ম। তারপর এল জল কাদায় একাকার বর্ষা। বর্ষাও ফুরিয়ে গেল। ভাদ্রের গুমোট গরমের পর এল মন কেমন করা শরৎ, এল পূজোর মাসের জাঁকজমকপূর্ণ উৎসব আর হেমন্তের শেষে আবার নামল শীত। চুঁইয়ে চুঁইয়ে মিষ্টি শীত এল কলকাতায়।

অনেক আশা নিয়ে পশ্চিমবঙ্গের মানুষ যুক্তফ্রন্টকে ক্ষমতায় এনেছিল। কোনো প্রত্যাশাই তারা পূরণ করতে পারেনি, এমনকি চেষ্টাও করেনি। জিনিস-পত্রের দাম বেড়েছে হুহু করে, বেকার সমস্যা আরো ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। পশ্চিমবঙ্গের মানুষ অনেক ধৈর্য ধরে ছিল। কিন্তু সে ধৈর্যের বাঁধ ক্রমে ক্রমে ভেঙ্গে পড়ছে। মানুষের মনে কেবল হতাশা। যুক্তফ্রন্টের অন্তর্ভূক্ত দলগুলো কেবল ক্ষমতা দখল নিয়েই ব্যস্ত; শরিকে শরিকে লড়াই তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে। সে লড়াই শ্রমিক-কৃষক, ছাত্র সব শ্রেণির মধ্যে ছড়িয়ে পড়ছে। কারখানায় কারখানায় ঘেরাও, স্ট্রাইক, লকআউট, লে-অফ, ছাঁটাই। সমাজের শ্রেণিবিভাগটা যেন আর অর্থনৈতিক নয়। শ্রেণিবিভাগটা রাজনৈতিক দল কেন্দ্রিক হয়ে পড়েছে। শরিকী কোন্দলের ফলে যুক্তফ্রন্ট সরকারের পতনের পর প্রফুল্ল ঘোষের পি.ডি.এফ. কিছুদিন থাকার পর সে সরকারেরও পতন হয়ে পশ্চিমবঙ্গে রাষ্ট্রপতির শাসন জারি হয়েছে।

ওদিকে নকশালরাও নিজেদের আরো সংঘবদ্ধ করেছে। চারু মজুমদার (সি.এম.)-এর নেতৃত্বে গঠিত হয়েছে নতুন বিপ্লবী দল, কমিউনিস্ট পার্টি অব ইন্ডিয়া-মার্ক্সবাদী-লেনিনবাদী (CPI-ML) যাতে প্রথমে সারা ভারতের অধিকাংশ নকশাল আন্দোলন সমর্থকরা যোগ দিয়েছিলেন। অবশ্য চারু মজুমদারের সাথে মতভেদের ফলে কানাই চ্যাটার্জী মাওবাদী কমিউনিস্ট সেন্টার (MCC) নামে এক নতুন দল গঠন করেন। সি.এম. এর উগ্র নীতি মেনে নিতে না পারায় ধীরে ধীরে আরো অনেকেই তাঁর দলথেকে বেরিয়ে আসতে থাকেন। এঁদের মধ্যে তরিমালা নাগি রেড্ডি, কোদাপল্লি সীতারামাইয়া, সত্যনারায়ণ সিং, নাগভূষণ পট্টনায়ক, বিনোদ মিশ্র প্রমুখ বিভিন্ন নামে নিজ নিজ দল গঠন করতে থাকেন এবং এই দলগুলো ভেঙে আবার নতুন নতুন উপদল গড়ে উঠতে থাকে। এভাবে কিছুদিনের মধ্যে সারা ভারতে অসংখ্য নকশালপন্থী দল-উপদল গড়ে ওঠে।

এই দল-উপদল গুলো নিজেদের মধ্যে মারামারি ও ঝগড়াঝাঁটিতে জড়িয়ে পড়ে এক চূড়ান্ত অরাজকতার সৃস্টি করে। পশ্চিমবঙ্গে অবশ্য সি.এম. এর দলই সবচেয়ে বেশি শক্তিশালী হয়ে ওঠে। সি.এম. ঘোষণা করেন যে ভারতের বিপ্লব চীনের পদ্ধতিতে হবে, এবং তাঁর মত অনুসরণ করে সি.এম. পন্থী নকশালরা পোস্টার দিতে থাকে ‘চীনের চেয়ারম্যান (মাও-সে-তুং) আমাদের চেয়ারম্যান চীনের পথ আমাদের পথ’।

এসব ব্যাপার সমরের মনে সামান্য রেখাপাত করেনা। এম.এ. তে ভর্ত্তি হওয়ার পর সমর হোস্টেলে থাকে। পার্ট-টুর রেজাল্টও খুব ভালো হয়েছে। পার্ট-ওয়ান পার্ট-টু মিলে ফার্স্ট ক্লাশের কাছাকাছি নম্বর আছে। এম.এ. তে ফার্স্ট ক্লাশ পাওয়ার জন্য সমর এখন বদ্ধ পরিকর। বি.এ. তে ভালো রেজাল্ট করার ফলে সমরের মনের জোর এখন অনেক বেড়ে গেছে। তা ছাড়া হোস্টেলে পড়াশুনা করারও অনেক সুবিধা। এখন সমরের ঘরে আরো দুজন ছেলে থাকে-বিপিন আর তড়িৎ। একজন ফিজিক্সের আর একজন বোটানীর। দুজনেরই বাড়ি মেদিনীপুরে। দুজনেই সবসময় পড়াশুনা নিয়ে ব্যস্ত থাকে। ছেলেদুটো একটু গোবেচারা গোছের। মাঝে মাঝে সমর ওদের পিছে লাগে। সমরের দুষ্টুমী ওরা হাসি মুখেই মেনে নেয়। ওরা মেদিনীপুরের গ্রামের কলেজ থেকে পাশ করে সবে কলকাতা এসেছে। ওদের ধারণা সমর খুব চালু ছেলে, কলকাতার পথঘাট হালচাল সব জানে। তাই কোথাও যেতেহলে বা কোন কিছু করতে হলে ওরা প্রথমেই সমরের পরামর্শ নেয়। সমরদের ঘরটা দোতলায়। জানালার পাশেই একটা আমড়া গাছ। জানালা দিয়ে হাত বাড়িয়ে ঝোপড়া গাছটার পাতা ছোঁয়া যায়।

তড়িৎ আর বিপিন দুজনেই খুব গোছানো ছেলে। সবসময় জামাকাপড় বই খাতা সব গোছগাছ করে রাখে। এদিকে সমরের সব জিনিসপত্র বিছানায়, টেবিলে আর কাপড় ঝোলানোর দড়িতে এলোমেলো ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকে। দিদির বাড়িতে থাকতে এসব বিষয় নিয়ে একদম ভাবতে হতনা। যখন যা দরকার তা দিদির কাছে চেলেই পেয়ে যেত। জামাকাপড় সব দিদিই কেচে দিতেন আর সবকিছু গোছগাছ করে রাখতেন। হোস্টেলে আসার পর জামাকাপড় কাচতে সমরের খুব অসুবিধা হত। এখন অবশ্য অনেকটা অভ্যাস হয়ে গেছে। তবে বই খাতা গুছিয়ে রাখতে পারেনা।

খাওয়ার টেবিলে সবাই মিলে একসঙ্গে খেতে খুব ভালো লাগে। খেতে খেতেই গল্পগুজব চলে। ছেলেরা সব অশ্লীল কথার ফুলঝুরি ছোটায়। রাস্তায় কে কোথায় সুন্দরী মেয়ে দেখেছে তার ফলাও বর্ণনা চলে। কে কোথায় প্রেম করছে, কে কার পিছনে লাইন দিল তাই নিয়ে আলোচনা চলে। ঘরে ঘরে আড্ডার আসরও বসে, তাস খেলা চলে। সমরও মাঝে মাঝে তাসের আসরে বসে যায়। তড়িৎ বেশ ভালো দাবা খেলে। সমর মাঝে মাঝে তড়িতের সাথে দাবা খেলে এবং সব সময়ই হেরে যায়। তবে তড়িতের সাথে খেলে সমর অনেক ভালো ভালো দাবার চাল রপ্ত করে ফেলে। কখনোবা হোস্টেলের অন্যান্য বন্ধুবান্ধবদের সাথে শিয়ালদা স্টেশন বা রাজাবাজারে আড্ডা মারে। কখনো ছাতের জলের ট্যাঙ্কের মাথায় একা বসে সিগারেট টানে। ফেলে আসা দিনের কথা মনে পড়ে যায়। রত্নার কথা ভুলতে পারেনি সমর। অবশ্য সময়প্রবাহ যন্ত্রণার উপর একটা অসাড়তার প্রলেপ বুলিয়ে গেছে।

তাড়াতাড়ি রাতের খাওয়া শেষ করে সমর ছাতে গিয়ে দাঁড়াল। বেশ শীত পড়েছে। ছাতে অন্য কোনো ছেলে নেই। চাদরটা ভালো করে গায়ে জড়িয়ে নিয়ে সমর সিগারেট টানতে লাগল। চারিদিকে ঝলমলে আলোর রোশনাই, সারকুলার রোড দিয়ে ঘড়ঘড় শব্দ তুলে ট্রামবাস ছুটে চলেছে। ঘরে ফিরেই আজকের ক্লাশনোটা ভালো করে লিখে ফেলতে হবে। তারপর রেফারেন্স বই দেখে নোটটাকে আরো ভালো করার চেষ্টা করতে হবে। এভাবে পড়াশুনা নিয়ে মেতে থাকলে সময়টা বেশ কেটে যায়। তা না হলেই রত্নার কথা মনে পড়ে যায়। এক অসহনীয় কষ্ট হতে থাকে। কেমন একটা দমবন্ধ করা ব্যথা আস্টে পৃষ্ঠে চেপে ধরে। কি হবে আর রত্নার কথা ভেবে! রত্নাত আর কখনো ফিরে আসবেনা। মানুষের সত্তা কি মৃত্যুর পরও টিকে থাকে। হিন্দু শাস্ত্রে বলে মানুষের আত্মা অবিনশ্বর। রত্নার আত্মাও কি আজ কোনো এক অজানা জগতে বিরাজ করছে? সমরের কথা ভাবছে? ধুর ওসব বাজে কথা। একটা সান্ত্বনার কথা মাত্র। কেউই জানেনা মৃত্যুর পর মানুষের কি হয়। হয়ত মরে গেলেই মানুষের সব শেষ হয়ে যায়। নাঃ, এসব আবোল তাবোল ভেবে কোনো লাভ নেই। এম.এ. পরীক্ষায় ফার্স্ট ক্লাশ পেতেই হবে। তারপর বিদেশের কোনো ভালো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডক্টরেট করতে হবে। সমর ঠিক করে ফেলেছে সে এডুকেশন লাইনেই থাকবে। ব্যাঙ্কের অফিসার, আই.এ.এস. ওসব চাকরির উপর সমরের কোনো মোহই নেই। ওসব কাজে বড় বেশি খাটুনি। তা ছাড়া সাধারণ মানুষের জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়তে হয়।

শীতটা বড় কনকনে, চাদর ভেদ করে শরীরে বিঁধছে। সমর সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে আসে। ঘরে ফিরে দেখে বিপিন আর তড়িৎ ফিরে এসেছে। সমরকে দেখে তড়ৎ বলে, ‘সমর তোমাকে খুঁজছিলাম, এই ফিরলে বুঝি?’

সমর হেসে বলে, ‘না, অনেকক্ষণ ফিরেছি, ছাতে একটা জব্ব্রর মেয়ের সাথে প্রেম করছিলাম’।

ওরা দুজনেই হাসতে হাসতে বলে, ‘তুমি সব সময় মজা করে কথা বল, এই জন্যেই তোমাকে আমাদের এত ভালো লাগে’।

সমর প্রশ্ন করে, ‘এবার চটপট বলে ফেল কি বিশেষ দরকার’।

‘এক ভদ্রলোক বিকেলে তোমাকে খুঁজতে এসেছিলেন। অনেকক্ষ্ণণ তোমার জন্য বসে ছিলেন। এই চিঠিটা রেখে গেছেন’।

চিরকুটটা হাতবাড়িয়ে নিয়ে খুলতেই সমরের সমস্ত শরীরে আনন্দের শিহরণ খেলে গেল। চিঠির নিচে সুবলের নাম। সমর বিশ্বাসই করতে পারছেনা। বিছানায় বসে তাড়াতাড়ি চিঠিটা পড়তে লাগলঃ

Dear সমর

আজ তোর হোস্টেলে এসে অনেকক্ষণ অপেক্ষা করেও তোর দেখা পেলামনা। কয়েকদিন হল কলকাতা এসেছি। তোর দিদির বাড়িতে গিয়ে জানলাম তুই হোস্টেলে থাকিস। কাল সকালে হোস্টেলে থাকবি। আমি দশটার মধ্যেই আসব। ইতি-সুবল

পরদিন রবিবার। সকাল নটার মধ্যেই সুবল এসে পড়ল। সমর সবে চা খাচ্ছিল। সুবল সমরের সামনে এসি সেই চির পরিচিত মিষ্টি হাসি ছড়িয়ে বলল, ‘গুরু কেমন আছিস বল্’।

সুবলের স্বাস্থ্য আগের চেয়ে অনেক ভালো হয়েছে। চোখ দুটো আরো উজ্জ্বল হয়েছে। সমর ক্যান্টিনের নারায়ণকে ডেকে আর এক কাপ চা আর কেক দিতে বলল। সুবল ইতিমধ্যে বিছানার উপর গ্যাঁট হয়ে বসে পড়েছে। সমর কপট রাগ দেখিয়ে বলল, ‘তুই কেমন ছেলেরে, তিন চার বছর উধাও হলি, কোনো খোঁজ খবর নেই। একটা চিঠি অন্ততঃ দিতে পারতিস’।

সুবল মুখটাকে মজাদার করে বলল, ‘অজ্ঞাতবাস যাপন করে ফিরলাম’।

সুবলের কথা শুনে বিপিন আর তড়িৎও হেসে উঠল। সুবল বলল, ‘গুরু, দারুণ পড়াশুনা করছ শুনলাম। তাহলে এবার কিন্তু ফার্স্ট ক্লাশ পাওয়া চাইই’।

সমর ওকে থামিয়ে দিয়ে বলল, ‘তুই এতদিন কি করলি সেটা আগে বল্। পাটনায় কত মেয়ের সতীত্ব নাশ করলি সেটা আগে বল’।

‘হবে হবে গুরু। ধীরে ধীরে সব বলব। বাইরে চল। কোনো রেস্তোরাঁর যাওয়া যাক। তুমিত গুরু খুব চালু হয়ে গেছ শুনলাম। প্রতি মাসে একটা করে নিরীহ মেয়ের পেট বাধিয়ে দিচ্ছ’।

সুবলের কথা শুনে তড়িৎ আর বিপিন হাসিতে ফেটে পড়ল। হাসতে গিয়ে বিপিনের নাকে গরম চা উঠে গেল।

মৌচাক রেস্তোরাঁয় কচুরি খেতে খেতে সুবল তার কাহিনী বলল। কলেজ থেকে বিতাড়িত হওয়ার পর সুবলের মন হতাশায় ভরে ওঠে। বীতশ্রদ্ধ হয়ে পড়ল কলকাতার উপর। স্কটিশ চার্চ কলেজে ভর্ত্তি হয়েছিল। ভেবেছিল পাটনায় থেকে মন ভালো করে কলকাতায় ফিরে আবার পড়াশুনা শুরু করবে। পাটনায় গিয়ে সুবলের সিদ্ধান্ত বদলে গেল। মেসোমশাই সরকারী কনট্রাক্টর। কনস্ট্রাকশনের কাজ করেন। সুবলও সে ব্যবসায় ঢুকে পড়ল। পড়াশুনা করে আর কি হবে।

কাজের মাধ্যমে সুবল বিহারের নানান জায়গায় ঘুরেছে। বিহারের সাধারণ মানুষ পশ্চিমবঙ্গের চেয়েও অনেক গরীব আর অত্যন্ত সাধাসিধে। নানান রকম ধর্মীয় কুসংস্কারে আচ্ছন্ন ওদের মন। জাত-পাতের বিচার খুব তীব্র। তবে প্রাদেশিকতা বা বাঙালীবিদ্বেষ সাধারণ মানুষের মনে তেমন নেই। প্রথম দিকে কলকাতার জন্য সুবলের মন কেমন করত। তারপর পাটনার জীবনের সাথে নিজেকে খাপ খাইয়ে নিল। কলকাতার স্মৃতি ধীরে ধীরে ম্লান হয়ে এল।

ব্যবসার কাজে ঘুরতে ঘুরতে সুবলের বিচিত্র অভিজ্ঞতা হয়েছে। টাকার যে কি মাহাত্ম সুবল তা বার বার প্রত্যক্ষ করেছে। টাকার বিনিময়ে এমন কোনো কাজ নেই যা করিয়ে নেওয়া যায়না। এ দেশটাকে, এ দেশের মানুষকে টাকাই চালাচ্ছে। শুধু আমাদের দেশ কেন, সারা পৃথিবীইত চলছে টাকার দাসত্ব করে।

এরমধ্যে অনেক রোমান্টিক ঘটনাও ঘটেছে সুবলের জীবনে। যেখানে গেছে সেখানেই মেয়েদের মাঝে জনপ্রিয়তা পেয়েছে। এক ইঞ্জিনীয়ারের বউ এর সাথে রোমান্স অনেক দূর গড়িয়েছিল। সুবল কলকাতায় আবার চলে আসবে, পাটনায় আর ফিরবেনা শুনে ভদ্র মহিলা অনেক কান্নাকাটি করেছেন। চিঠি দিতে বলেছেন। সুবল চিঠি দেবেনা ঠিক করেছে। সুবল মেয়েদের সাথে হাল্কা ভাবে বন্ধুত্ব করতে চায়, কিন্তু প্রেমে পড়তে নারাজ। মেয়েদের জন্য পিছুটান থাকলেই বিপদ। সুবলের সেসব বালাই আদৌ নেই।

সমর প্রশ্ন করে, ‘তাহলে তুই এখন থেকে কলকাতাতেই থেকে যাবি?’

‘আর কে বিহারে ফিরছে। অনেক অভিজ্ঞতা হয়েছে। ব্যাঙ্কে ভালো টাকাও জমিয়েছি। সুদ থেকে খরচ চলে যাবে। তা ছাড়া কয়েকটা ভালো টিউশনিও পেয়েছি। কলকাতা ছেড়ে থাকতে কতদিন ভালো লাগে বল’।

‘তাহলে কি আবার পড়াশুনা শুরু করবি?’

‘ধুর, পড়াশুনা করে আর কি হবে? তাছাড়া অনেকগুলো বছর নষ্ট করেছি। আর পড়াশুনা হবেনা। বিহারে থাকতে থাকতে কাজের ফাঁকে ফাঁকে নাটক নিয়ে অনেক পড়াশুনা করেছি। কিছু প্রগতিশীল একাঙ্ক নাটকও লিখেছি। ইচ্ছে আছে পুরোনো ক্লাবের বন্ধুদের নিয়ে একটা নাটকের ক্লাব করব। এখন প্রগতিশীল নাটকের খুব প্রয়োজন। তোকে আমাদের ক্লাবে যোগ দিতে বলতাম। তবে এখন থাক আগে ভালো করে এম.এ. পরীক্ষা দিয়ে নে। ফার্স্ট ক্লাশ ফার্স্ট হওয়া চাই’।


হোস্টেলের অবিনাশ একতলায় একটা সিঙ্গল সিটেড ঘর পেয়েছে। রান্না ঘরের ঠিক পাশে। আসপাশে অন্য কোনো ঘর নেই। সমর, অর্ধেন্দু আর তারাশঙ্কর ঠিক করল, রাত্রে অবিনাশকে ভূতের ভয় দেখাবে। রাত্রে সকলে শুয়ে পড়ার পর, তিন ঘর থেকে তিন বন্ধু সুড়সুড় করে নিচে নেমে এল। দরজার ফাঁক দিয়ে দেখে অবিনাশ টেবিল ল্যাম্প জ্বেলে পড়ছে। সমর দরজায় একটা জোর টোকা দিয়ে রান্না ঘরের দিকে সরে গেল। ‘কেরে শালা’ বলে অবিনাশ দরজা খুলে বাইরে উঁকি মেরে কাউকে না দেখতে পেয়ে আবার দরজা বন্ধ করে পড়তে বসল। এবার তিন বন্ধু তিন দিক থেকে ফিসফাস আওয়াজ করতে লাগল। অবিনাশ যেই পড়া ছেড়ে মুখ তোলে অমনি সব আওয়াজ থেমে যায়। অবিনাশ বেশ ভয় পেয়েছে বোঝা গেল। এদিকে তড়িৎ পেচ্ছাপ করতে বেরিয়ে সমরদের দেখে ওদের দলে ভিড়ে গেছে। সমরদের কাণ্ড কারখানা দেখে তড়িৎ হাসি সামলাতে পারলনা। তড়িতের হাসি শুনে অবিনাশ এক লাফে দরজা খুলে ‘বাঞ্চত তোরা’ বলে হাসতে হাসতে বেরিয়ে এল। ‘শালা তোর জন্য সব ভেস্তে গেল’ বলে তারাশঙ্কর তড়িতের চাদর চেপে ধরল। তড়িৎ চাদর ছেড়ে ঐ শীতের মধ্যে শুধু গেঞ্জি গায়ে ছুটে পালাল।

এবার চারজনে রান্নাঘরে ঢুকে বেগুন পুড়িয়ে খেল। এসব করতে করতে রাত তিনটে বেজে গেল। সমর বলল, ‘আমাদের যখন ঘুম হলনা আয় চোর চোর বলে চিৎকার করে সবার ঘুম ভাঙ্গাই’। সবাই ব্যাপারটায় খুব মজা পেল আর অল্প সময়ের মধ্যে ওদের পরিকল্পনা ঠিক হয়ে গেল।

পরিকল্পনা মত সমর, তারাশঙ্কর আর অর্ধেন্দু দোতলায় উঠে প্রস্তুত হল। অবিনাশ নিজের ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে কাঁপা কাঁপা গলায় ‘কে, কে, চোর চোর’ বলে চিৎকার করে উঠল। সঙ্গে সঙ্গে ওরা তিনজন দোতলার দরজায় ধুপধাপ শব্দ করে, সিঁড়ি দিয়ে ভাঙ্গা বাল্তি গড়িয়ে ফেলে ‘চোর চোর’ বলে চিৎকার করতে নিচে ছুটে এল। তারপর সমস্ত হোস্টেল জুড়ে সে এক এলাহী কাণ্ড। সবাই ঘর থেকে বেরিয়ে টর্চ হাতে হোষ্টেলের আনাচে কানাচে চোর খুঁজে বেড়াতে লাগল। একজন বলল দেয়াল টপকে চোরকে পালাতে দেখেছে। চোরের সংখ্যা নিয়েও মতপার্থক্য দেখা দিল। তারপর কোথায় কে কি রকম চোর দেখেছে, চোরেরা কি রকম বুদ্ধিমান হয় তাই নিয়ে গালগল্প চলল। এভাবে একসময় ভোরের আলো ফুটে উঠল। রাঁধুনি কয়লার উনুনে আঁচ দিল। আর চোরের ভয় নেই দেখে সবাই যে যার ঘরে ফিরে গেল।

সমর রুটির টুকরোতে ইঁদুর মারা বিষ মাখিয়ে বাথরুমের কাছে রেখেছিল। পরদিন দুটো মরা ইঁদুর পাওয়া গেল। মরা ইঁদুর দেখে তড়িতের সে কি ভয়! সমর একটা ইঁদুরের লেজ ধরে তুলে তড়িৎকে তাড়া করল। তড়িৎ বারান্দা দিয়ে পড়িমরি করে দৌড় লাগাল। সিঁড়ি দিয়ে নেমে ছুটতে লাগল। সমরও ইঁদুর হাতে সিঁড়ি দিয়ে দৌড়ে নামতে লাগল। মাঝপথেই সুবলের সাথে দেখা। সমর খেয়াল না করে প্রথমে পাশ কাটিয়েই যাচ্ছিল। সুবল সমরের হাত চেপে ধরে বলল, ‘কি গুরু ইঁদুর হাতে কোথায় চললি, তোদের হোস্টেলে ইঁদুরও খাওয়ায় নাকি?’

সমর হাসতে হাসতে বলল, ‘একটা ছেলেকে তাড়া করেছিলাম। এত বড় ছেলে তবু ইঁদুর দেখলে দারুণ ভয় পায়’।

‘ছিটিয়াল ছেলেত। আজ তোর সেরকম দরকারী ক্লাশ না থাকলে চল ঘুরে আসি। তার আগে এক কাপ চা খাওয়া’।

কলেজ ষ্ট্রীট অঞ্চলে একটা গলির মধ্যে সুবলদের স্ফুলিঙ্গ ক্লাব। অলোকদের বাড়ির নিচের তলার একটা ঘরে ওরা ক্লাব করেছে। বিকেলের দিকেই সাধারণতঃ রিহার্সাল হয়। এখন ওরা নকশালবাড়ির কৃষক আন্দোলন নিয়ে একটা নাটকের প্রস্তুতি চালাচ্ছে। নাটকটা সুবলই লিখেছে। অলোক বেশ বড় দাড়ি রেখেছে। সমর প্রথমে অলোককে চিনতেই পারেনি। দোতলায় অলোকের ঘরে বসে সমর ওদের নাটক ক্লাবের উদ্দেশ্য সম্বন্ধে সব কথা শুনল। সুবল পরিচালনার ব্যাপারে অনেক নতুন পদ্ধতি শিখেছে। স্ট্যানিশ্লাভস্কি, ব্রেখ্ট প্রমুখের পদ্ধতি গুলোর সাথে বাংলা যাত্রা আর পাঁচালির পদ্ধতি যোগ করে এক নিজস্ব পদ্ধতি তৈরি করেছে। এসব নাটক সাধারণ মানুষকে দেখাতে হবে। তাদের মধ্যে প্রগতিশীল শিক্ষার প্রচার ও প্রসার ঘটিয়ে সচেতনতা জাগিয়ে তুলতে হবে। তাই উপকরণের ব্যাপারে যতটা সাধাসিধে হওয়া যায় সুবল সেদিকে নজর রেখেছে। অলোক আর ইঞ্জিনীয়ার মিহির ছাড়াও সুবলের দলে বেশ কিছু অল্প বয়সী উৎসাহী ছেলেও জুটেছে। এদের সবার বয়স কুড়ির নিচে।

অলোক সমরকে উদ্দেশ্য করে বলল, ‘সমরবাবু আপনিও আসুননা আমাদের ক্লাবে’।

সমর হেসে বলল, ‘প্রস্তাবটা শুনে আমি খুব খুশি হলাম। তবে আমার অভিনয়ের ব্যাপারে বিশেষ অভিজ্ঞতা নেই। অবশ্য যতদূর সম্ভব আপনাদের সাহায্য করব। তবে আমার একটা বিষয়ে একটু সংশয় আছে। নাটক করে সাধারণ মানুষের মনে আপনারা কতদূর সাড়া জাগাতে পারবেন?’

‘আপনি আমার কথা বিশ্বাস করুন, দারুণ সাড়া জাগবে এর ফলে। এটাইতো সাধারণ মানুষকে সচেতন করে তোলার সবচেয়ে সহজ আর এফেকটিভ উপায়। আমরা নাটকের মাধ্যমে গ্রামের কৃষকদের সমস্যা সহরের মানুষদের সামনে তুলে ধরতে পারব আবার গ্রামের মানুষদের মধ্যে বিপ্লবী চেতনা ছড়াতে পারব’।

‘কিছু মনে করবেননা, আমি একটা বিষয় একটু জানতে চাই। চারু মজুমদারের সি.পি.আই. (এম.এল.) এর সাথে আপনাদের কোনো সম্পর্ক আছে কি?’

‘না, প্রত্যক্ষ কোনো সম্পর্ক নেই। তবে আমরা একই রাজনীতি অর্থাৎ কৃষি বিপ্লবে বিশ্বাস করি’।

‘তাহলেতো সরকার আপনাদের এ ক্লাবকে ভালো চোখে দেখবেনা’।

‘সরকার কখনোই আমাদের বরদাস্ত করবেনা। তবে এখনতো দেখছেন সব রকম নকশাল একটিভিটি ওপ্নলি চলছে। এই অবস্থা যতদিন থাকে আমরা ক্লাবের কাজকর্ম ওপ্নলি চালাব। তবে আমার দৃঢ় বিশ্বাস কিছুদিনের মধ্যেই পুলিশের সুনজর পড়বে আমাদের উপর। তখন আমাদের আর ওপ্নলি কাজ করা চলবেনা। তবে যতদিন পারি ওপ্নলি ক্লাবের কাজ চালিয়ে যাই’।

সেদিন অলোকের ঘরে বসে আরো অনেক গল্প হল। দুপুরে অখানেই খেয়ে বিকেলের দিকে নাটকের রিহার্সাল দেখল। সমরের তেমন ভালো লাগলনা। শুধু রাজনৈতিক প্রচারে ভরা গোটা নাটক। কেমন কাটখোট্টা রসকষহীন। তবুও সুবলের পরিচালনার গুণে আর ছেলেগুলর সুন্দর অভিনয়ের দৌলতে কিছুটা চলনসই হয়েছে। কিন্তু এই রাজনৈতিকবক্তব্যসর্বস্ব শিপ্লগুণহীন নাটককি সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে গ্রামের কৃষকদের মনে আদৌ রেখাপাত করবে!’

রিহার্সাল শেষ হলে সুবল আর অলোককে সমর তার মতামত জানাল। সমরের ছেলেবেলা গ্রামে কেটেছে। গ্রামের কৃষকদের জীবনের সাথে সমরের অনেক ঘনিষ্ঠ পরিচয়। সুবলদের নাটকে একটা সম্পূর্ণ মনগড়া ধারণা থেকে, একটা বিশেষ রাজনৈতিক মতবাদের ছাঁচে ঢেলে কৃষকদের আঁকা হয়েছে। বাস্তব কৃষকের সাথে তার কোনো মিলই নেই। কৃষকরা হয়ত এ নাটক দেখলে নিজেদের মধ্যে হাসাহাসি করবে।

সুবল স্বীকার করল যে কৃষকদের জীবন সম্বন্ধে ওর সব ধারণা পুঁথিগত। তবে অভিজ্ঞতা আর সমরের আজকের সমালোচনার মত গঠন মূলক সমালোচনা থেকে শিক্ষা নিয়ে নাটককে যথা সম্ভব বাস্তবের কাছাকাছি নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করবে।

অলোক বলল, ‘সমরবাবু, আপনার বাস্তব অভিজ্ঞতা দিয়ে আমাদের সাহায্য করুননা’।

সমর বলল, ‘আমি যথাসাধ্য চেষ্টা করব’।

হোস্টেলে ফিরে সমর ভাবল সুবলদের নাটক ক্লাবের সাথে ওভাবে জড়িয়ে পড়া ঠিক হবেনা। একদিন না একদিন ওদের ক্লাব পুলিশের কূনজরে পড়বেই। তখন সমরও রেহাই পাবেনা। তবে গ্রামের মানুষ সম্বন্ধে যেটুকু জানে তা সুবলকে ব্যক্তিগত ভাবে জানিয়ে দেবে। তাতে সুবলের নাটক অনেক বাস্তব সম্মত হবে। তা না হলে সব চেঁচিয়ে উঠবে ‘রিএকশনারী’। নকশালদের দেখতে দেখতে সমরের ওদের সম্বন্ধে একটা ধারণা জন্মে গেছে। বেশিরভাগই মার্কস-লেনিন-মাও এদের তত্ত্ব সম্বন্ধে পড়াশুনা আদৌ করেনা। কেবল আবেগের বশে চলে। সমর আজকাল ওদের কুসংস্কার আর অন্ধবিশ্বাস দেখে অবাক হয়ে যায়। অথচ মার্কসীয় তত্ত্ব সমস্ত কুসংস্কার আর অন্ধবিশ্বাসের বিরুদ্ধে জেহাদ ঘোষণা করেছে। বলেছে বৈজ্ঞানিক যুক্তি দিয়ে সব বিচার কর। তাহলে নকশালদেরও উচিত আগে আমাদের দেশের অবস্থা ভালো করে জেনে যুক্তি দিয়ে বিচার বিবেচনা করে নীতি নির্ধারণ করা। তা না করে ওরা চীনের বিপ্লবকে ভিত্তি করে একটা বিপ্লবী মতবাদ খাঁড়া করেছে। এবার আমাদের দেশের সব কিছুকে সেই ছকে ফেলে বিচার করার চেষ্টা করছে ও নীতি নির্ধারণ করছে। যা ছকে পড়বেনা তা সত্যি হলেও তাকে অস্বীকার করবে। এওতো এক ধরণের অন্ধ বিশ্বাস, কুসংস্কার। আর রয়েছে কতগুলো বাঁধা বুলি – বুর্জোয়া, পাতিবুর্জোয়া, প্রতিক্রিয়াশীল, প্রতিবিপ্লবী ইত্যাদি। নকশালদের বিভিন্ন উপদল আজকাল একে অপরকে এই সব সম্বোধনে ভূষিত করছে। কে সঠিক আর কে বেঠিক সেটাই বোঝা দায়।


হোস্টেলে প্রতিমাসে একবার ফিস্ট হয়। জোর খাওয়াদাওয়া চলে। মাছ, মাংশ, দু ধরণের ভালো তরকারি, স্যালাড, চাটনি, দই, মিষ্টি, কোকাকোলা, পান আর সিগারেট। যেন বিয়ে বাড়ির ভোজ। রেগুলার বোর্ডারদের এর জন্য অতিরিক্ত টাকা কিছু দিতে হয়না। একমাত্র কেউ যদি বাইরের থেকে গেষ্ট আনে তাহলে অতিরিক্ত টাকা দিতে হয়। বিরাট হলঘরে সতরঞ্চি পেতে সবাই একসাথে খেতে বসে। পরিবেশন করা হয় নিমন্তন্ন বাড়ির মত কলাপাতায়। হৈ-হল্লা আর আমোদে মেতে ওঠে সারা হোস্টেল। ভোজপর্ব শেষ হলে গানের আসর বসে।

সমর এবারের ফিষ্টে সুবলকে নিমন্তন্ন করল। প্রথম খেপেই সমর আর সুবল খেতে বসল। সুবল খেতে খেতেই চুটকি শুরু করল। সবাই হেসে অস্থির। হাসির চোটে দু-এক জনের নাকে মুখে খাওয়ার উঠে এল। ভোজ শেষে সুবলকে কেউ আর ছাড়তে চায়না। সবাই আবদার ধরে আরো চুটকি শোনাতে হবে। বিশেষ করে মেয়ে ঘটিত আদি রসাত্মক চুটকি। সুবলকে এই জটলা থেকে কোনোক্রমে উদ্ধার করে সমর বাইরে নিয়ে এল। রাত এগারোটা বেজে গেছে। রাস্তায় লোক চলাচল অনেক কমে এসেছে। সারকুলার রোড দিয়ে স্বল্প কয়েকজন মাত্র যাত্রী নিয়ে ট্রামগুলো ঘড়ঘড় করে ছুটে চলেছে। শিয়ালদা সাউথ স্টেশনে একটা নিরিবিলি বেঞ্চে বসল দুই বন্ধু। স্টেশনে এখন যাত্রীর ভিড় আর নেই। দুচারজন যাত্রী শেষ ট্রেন ধরার জন্য প্ল্যাটফর্মে ঘোরাঘুরি করছে। প্ল্যাটফরমের স্থায়ী বাসিন্দারা থামের কোণে কোণে ছেঁড়া কম্বল গায়ে দিয়ে কুকুরকুণ্ডলী হয়ে শুয়ে পড়েছে।

সমর সুবলদের ক্লাব সম্বন্ধে ওর মতামত এবার বিশদ ভাবে জানাল। সেদিন অবশ্য সংক্ষেপে জানিয়েছিল।

সব শুনে সুবল বলল, ‘আমিও এখন এসব বিষয় নিয়ে সিরিয়াসলি ভাবছি। নাটকের মধ্য দিয়ে আমাদের সমাজতান্ত্রিক দৃষ্টিকোণ থেকে অর্থনৈতিক ও সামাজিত সমস্যাগুলোকে তুলে ধরতে হবে।বুর্জোয়া নাটকের সাথে এখানেই আমাদের নাটকের মূল পার্থক্য। কিন্তু মুশকিলটা কি জানিস, নকশালদের নানান গ্রুপ আর পত্রপত্রিকা, সি.পি.আই., সি.পি.এম., আর.এস.পি., এস.ইউ.সি., ওয়ার্কার্স পার্টি সবাই দাবি করছে তারাই সাচ্চা, আর বাকিরা সব ভুল। কিন্তু কে সাচ্চা তা বিচার করব কোন মানদন্ডে?’

‘তুই ঠিক বলেছিস সুবল। আমারও এই কথাটাই বার বার মনে হয়’।

‘দেখ সমর, আমাদেরও তো যথেষ্ট বুদ্ধি আছে। আমরা কেন অন্যের কথা অন্ধ ভাবে মেনে নেব?’

‘আর প্রত্যেক দলেইতো পড়াশুনা করা পণ্ডিত লোক রয়েছেন। কোন পণ্ডিতের বক্তব্য সঠিক সেটা ঠিক করাওতো একটা সমস্যা’।

‘আয়না এক কাজ করি। আমরা মার্কস, এঙ্গেলস, লেনিন, স্তালিন, মাও এদের প্রধান লেখাগুলো একটু একটু করে পড়ে ফেলি’।

‘কিন্তু আমারযে সামনে এম.এ. পরীক্ষা’।

‘তোকে আমি পরীক্ষার পড়ার ক্ষতি করে এসব পড়তে বলছিনা। তবে পরীক্ষার পড়ার ফাঁকে ফাঁকেও তো কিছু অবসর পাস, তাস খেলিস, গল্পের বই পড়িস। সেই সময়টা এসব বই পড়ার কাজে লাগানা’।

‘ঠিক আছে যখন পরীক্ষার পড়া পড়তে পড়তে ক্লান্ত বোধ করি তখন এসব বই পড়ব। তা ছাড়া এম.এ. পরীক্ষা হয়ে গেলে তো অনেক সময় পাব’।

‘শুধু পড়লে হবেনা, আমরা দুজনে আলোচনা করব এসব নিয়ে। এর মধ্য দিয়ে আমাদের বিচার বিশ্লেষণের যুক্তিবাদী, সংস্কারমুক্ত দৃষ্টিকোণ তৈরি করে নিতে হবে। আর একটা কথা আমি প্রগতিশীল সাহিত্য আর নাটক নিয়েই ব্যস্ত থাকতে চাই এবং তা কোনো বিশেষ দলের প্রচারের জন্য নয়’।

‘তার মানে তুই এখন কোনো বিশেষ রাজনৈতিক দলকে সমর্থন করতে চাসনা’।

‘সেকথা বলি কি করে? যদি বিচার বিশ্লেষণ করে কোনো বিশেষ দল সমর্থনযোগ্য বলে মনে হয় তাকে অবশ্যই সমর্থন করব’।

‘প্রত্যক্ষ রাজনীতিও করবি তাহলে?’

‘তুই রাজনীতি করা বলতে যা বুঝাচ্ছিস সেভাবে রাজনীতি হয়ত করবনা তবে সাহিত্য-নাটকের মধ্যদিয়েওতো রাজনীতি করা যায়’।

‘কি রকম?’

‘শোষক শ্রেণির হাতে তো শুধু পুলিশ-মিলিটারীই নেই। ওরা সাহিত্য, দর্শ্ন, সংস্কৃতি সব কিছুর মধ্য দিয়েই এই অন্যায় শোষণভিত্তিক আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থাটাকে স্থায়িত্ব দানের চেষ্টা করছে। তাই কালচারাল ক্ষেত্রেও শোষিত শ্রেণিকে সমানে লড়াই চালিয়ে যেতে হবে। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে আমার প্রগতিশীল নাটক রচনাও প্রকৃতপক্ষে শ্রেণিসংগ্রাম তথা রাজনীতিতে অংশগ্রহণ বই আর কিছু নয়। তোর হোস্টেলের গেট হয়ত এতক্ষণে বন্ধ করে দিয়েছে। আজ রাতে আমাদের বাড়িতেই থেকে যা।

‘সেটা মন্দ হয়না’।

সার্কুলার রোড সম্পূর্ণ নির্জন। মাঝে মাঝে দু একটা ট্রাক ফাঁকা রাস্তা দিয়ে দুরন্ত গতিতে ছুটে চলেছে। ফুটপাথের উপর পথবাসীরা ছেঁড়া কাঁথা মুড়ি দিয়ে সার বেঁধে ঘুমিয়েছে। হোটেলগুলোর সামনে দুএকজন দেহপসারিনী খদ্দেরের আশায় এদিক ওদিক ঘুরঘুর করছে।

সমর আর হোস্টেলে ফেরেনা। নির্জন গলিপথ দিয়ে দুজনে সুবলের বাড়ির দিকে হেঁটে চলে। সুবল একটা সিগারেট ধরায়। সমরের দিকেও একটা সিগারেট বাড়িয়ে দিতে সমর বলে, ‘এখন খাবনা, তোর বাড়িতে গিয়ে ধরাব’।

নির্জন রাস্তায় লাইটপোস্টের টিমটিমে আলো ছায়া ফেলেছে। সুবল বলে, ‘দেখেছিস সমর কলকাতা এখন কেমন সুবোধ ছেলের মত ঘুমোচ্ছে? একে এখন দেখে কে বলবে ঘুম ভাঙতেই দুরন্তপনা জুড়ে দেবে?’

সমর দোতলায় একটা সিঙ্গল-সিটেড ঘর পেয়ে গেল। এখন পড়াশুনা করতে অনেক সুবিধা হয়। সমর মাঝে মাঝে তড়িতের পিছে লাগলেও তড়িৎ সমরের ভক্ত হয়ে পড়েছে। মাঝে মাঝেই সমরের ঘরে এসে গল্প করে, নানান বিষয়ে পরামর্শ নেয়। অন্যন্য ছেলেরাও সমরের ঘরে এসে আড্ডা মেরে যায়। সমরও ইচ্ছা হলেই অন্যদের ঘরে গিয়ে আড্ডা মেরে আসে। রাতের দিকেই পড়ায় ভালো মন বসে। সুবল মাঝে মাঝে আসে। মার্কসীয় তত্ত্ব নিয়ে দুজনে আলোচনা করে। সমরও অবসর পেলেই মার্কসীয় সাহিত্য পড়ে। সুবল এর মধ্যে আর নতুন কোনো নাটক তৈরি করেনি। এখন ওদের ক্লাবটা একটা মার্কসীয় তত্ত্বের স্টাডি সার্কেলে পরিণত হয়েছে। সুবল ঠিক করেছে যেসব বিষয়ে নিজের বাস্তব অভিজ্ঞতা নেই শধুমাত্র পুঁথিগত জ্ঞানের উপর নির্ভর করে সেসব বিষয়ে কিছু লিখবেনা। কলকাতার মধ্যবিত্ত জীবনের সমস্যা নিয়েও অনেক কিছু লেখা যায়। বাস্তব জ্ঞান থেকেই তা লেখা যায়। সুবল এখন এসব সমস্যা নিয়েই নতুন নাটক লিখছে।


পশ্চিমবঙ্গে রাষ্ট্রপতির শাসন শেষ হয়ে আবার নির্বাচন হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের মানুষ কিছুটা হতাশ হলেও এখনো যুক্তফ্রন্টের উপর আশা সম্পূর্ণ হারায়নি। তাই এবারও যুক্তফ্রন্ট ক্ষমতায় এসেছে। এবারও মুখ্যমন্ত্রী হয়েছেন বাংলা কংগ্রেসের অজয় মুখার্জী আর সি.পি.এম. এর জ্যোতি বসু আবার উপ-মুখ্যমন্ত্রী হয়েছেন। সি.পি.এম. এবার গতবারের তুলনায় অনেক বেশি ভোট পেয়েছে। এবার তারা একক ভাবে সংখ্যা গরিষ্ঠ দল। ১৯৬৭ সালে যুক্তফ্রন্ট সবমিলিয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠ দল হলেও এককভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠ দল ছিল কংগ্রেস। কিন্তু এবার তারা গতবারের তুলনায় অর্ধেকেরও কম আসন পেয়েছে।

কিছুদিন আগেই গোটা দেশে কংগ্রেস দ্বিখণ্ডিত হয়ে আরো দুর্বল হয়ে পড়েছে। কংগ্রেসের দ্বিখণ্ডিত হওয়ার ইতিহাস অনেকটা এরকম। জওহরলাল নেহেরুর মৃত্যুর পর গুলজারিলাল নন্দ অস্থায়ীভাবে কিছুদিন প্রধানমন্ত্রী থাকার পর স্থায়ী প্রধানমন্ত্রী হলেন লালবাহাদুর শাস্ত্রী। ছোটখাটো অতি সাধারণ চেহারার মানুষটা ১৯৬৫ সালে ভারত পাকিস্তান যুদ্ধে যথেষ্ট দৃঢ় ব্যক্তিত্বের পরিচয় দিলেন। তাসখন্দে রাশিয়ার মধ্যস্থতায় ভারত-পাকিস্তান আলোচনায় অংশগ্রহণ করার পর তাসখন্দেই রহস্যজনক ভাবে মৃত্যু হল শাস্ত্রীজির। সমস্যা দেখা দিল এরপর কে প্রধানমন্ত্রী হবে তাই নিয়ে। কামরাজ, পাতিল, অতুল্য ঘোষ প্রমুখ কংগ্রেসের বড় বড় নেতারা পরামর্শ করে প্রধানমন্ত্রীর পদে বসালেন নেহেরুর কন্যা ইন্দিরা গান্ধীকে। ইন্দিরা গান্ধী প্রধানমন্ত্রী হওয়ার সাথে সাথেই স্বমূর্তি ধারণ করলেন। কংগ্রেসের সংগঠনের সাথে তাঁর বনিবনা হলনা। রাষ্ট্রপতি নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সে বিরোধ চূড়ান্ত আকার ধারণ করল। ইন্দিরার প্রচেষ্টায় হেরে গেলেন কংগ্রেসের প্রার্থী আর জিতলেন ইন্দিরা সমর্থিত ভি.ভি. গিরি। কংগ্রেস এবার দ্বিখণ্ডিত হল। একদিকে ইন্দিরার নেতৃত্বে শাসক কংগ্রেস ও অন্যদিকে কামরাজের নেতৃত্বে সংগঠক কংগ্রেস বা আদী কংগ্রেস। অবশ্য খুব অল্প সময়ের মধ্যেই কংগ্রেসের অধিকাংশ ব্যক্তিত্ব ইন্দিরার দলে ভিড়লেন।

নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গের মানুষ কোনো কংগ্রেসকেই পাত্তা দিলনা। তারা আবার যুক্তফ্রন্টকে ক্ষমতায় বসাল। তারা যুওক্তফ্রন্টকে আবার সু্যোগ দিতে চায় ভালো কাজ করার। গতবার শরিকী সংঘর্ষ আর কংগ্রেসের চক্রান্তে মাত্র আট মাসের মাথায় অবসান হয়েছিল যুক্তফ্রন্ট এর শাসনের। যুক্তফ্রন্টের অন্তর্গত দলগুলো বিশেষ করে সি.পি.এম. তাদের কাজ করতে না পারার নানান অজুহাত দিয়েছিল। এবার লোকে আবার দেখতে চেল তারা সুযোগ পেলে ভালো কাজ করে কিনা। তবে সি.পি.এম. এর এত বেশি আসন পাওয়া নিয়ে শধু কংগ্রেসই নয় যুক্তফ্রন্টের অন্যান্য দলগুলোও নানা কথা বলতে লাগল। তাদের মতে সি.পি.এম. অনেক আসনই জিতেছে স্বতঃস্ফুর্ত জনসমর্থনের মাধ্যমে নয়, হয় বুথ দখল করে নয় লোককে গুণ্ডা বাহিনীর মাধ্যমে ভয় দেখিয়ে। একথা সত্যি যে প্রথম যুক্তফ্রন্ট এর সময় থেকেই সি.পি.এম. ভারতের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে গুণ্ডা ও সমাজ বিরোধীদের সংগ্রহ করে এক বিশাল গুপ্ত সেনা বাহিনী গড়ে তুলতে শুরু করেছিল। রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলার সুযোগে তারা এতদিনে সে বাহিনীকে আরো সংগঠিত ও শক্তিশালী করে তুলেছে। তারা এই বাহিনীর সাহায্যে শুধুমাত্র কংগ্রেসের প্রভাবাধীন এলাকা দখল করেই ক্ষান্ত থাকেনি, যুক্তফ্রন্ট এর অন্যান্য শরিকদের এলাকাও দখল করেছে। তাদের লক্ষ্য ভবিষ্যতে একাই পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় আসা। যে সব এলাকা এই বাহিনীর কব্জায় এসে পড়েছে সেখানে নির্বাচন প্রকৃতপক্ষে প্রহসনে পর্যবসিত হয়েছে। সি.পি.এম. এর এই বাহিনী এলাকা দখলের সময় নির্বিচারে লুটপাট, বাড়িতে অগ্নিসংযোগ ও মেয়েদের ধর্ষন চালিয়েছে। তাদের নৃশংশ কাজকর্মের জন্য সাধারণ মানুষ এদের ‘হার্মাদ বাহিনী’ নাম দিল। হার্মাদ হল একধরণের নৃশংশ পর্তুগীজ জলদস্যু।


মে মাসের দুরন্ত গরম। সারা কলকাতা গরমে ধুঁকছে। ঘাম ঝরছে গল গল করে। মাত্র কয়েক বছরের মধ্যে ট্রামে বাসে ভিড় অনেক বেড়ে গেছে। সমর আর সুবল একটা ভিড় ঠাসা ট্রামে গুঁতোগুঁতি করে উঠে পড়ে ঘামতে ঘামতে হাওড়ায় চলেছে। সুবল বলেছে সমরকে আজ একটা নতুন জায়গায় নিয়ে যাবে। সমর বারবার প্রশ্ন করেও জানতে পারেনি সুবল তাকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে। সুবল রহস্যমাখা হাসি ছড়িয়ে বলেছে, ‘চল্না দেখতে পাবি’। সমরের কৌতূহল উত্তোরোত্তর বেড়েই চলেছে। অথচ সুবল কিছুতেই খুলে বলবেনা রহস্যটা কি।

কলেজ স্ট্রীটের কাছে সামান্য ট্র্যাফিক জ্যাম। একটা ট্যাক্সি টানা রিক্সার পিছনে ধাক্কা মেরেছে। বিহারী ট্যাক্সি ড্রাইভার চিৎকার করে বলল, ‘শালা রিক্সা হঠ্যা, না হলে চাপা দিয়ে দেব’। সুবল বিচিত্র মুখভঙ্গি করে বলল, ‘বড় মাছ খায় ছোট মাছকে’। ট্রাম শুদ্ধ লোক হো হো করে হেসে উঠল। সুবলের মুখ গম্ভীর। শুধু মুখের ভাঁজে ভাঁজে সামান্য হাসির ঝিলিক।

ট্রামের মধ্যে দুজন লোক রাজনীতি নিয়ে জোর আলোচনা করছে। এবারের যুক্তফ্রন্ট কতদূর কি করতে পারবে তাই নিয়ে জোর আলোচনা। একজন ভদ্রলোক মন্তব্য করলেন, ‘শালা অজয় মুখার্জী কিছু করতে দেবেনা। বাংলা কংগ্রেস জোতদার-কালোবাজারীদের দালাল। ওদের সাথে সি.পি.এম. কেন যে ফ্রন্ট করতে গেল?’

দ্বিতীয় ভদ্রলোক বললেন, ‘না করে উপায় কি? এখন প্রধান শত্রু হল কংগ্রেস। কংগ্রেসকে কোণঠাসা করতে হলে সমস্ত কংগ্রেস বিরোধীদের এককাট্টা হতে হবে’।

প্রথম ভদ্রলোক বললেন, ‘সি.পি.এম. নিজেওতো ঠিকপথে চলছেনা। কংগ্রেস আর অন্যান্য দলের গুণ্ডারা হুহু করে সি.পি.এম. এ ঢুকে পড়ছে। সি.পি.এম. এর ক্যাডাররা গলায় লাল রুমাল ঝুলিয়ে সাধারণ মানুষের উপর জুলুম চালাচ্ছে, জোর করে পার্টির চাঁদা আদায় করছে। কংগ্রেসের আমলেওতো এতটা জুলুমবাজী ছিলনা’।

‘ঠিকই বলেছেন দাদা। সি.পি.এম,. এখন থেকে নিজের ঘর সামলাতে না পারলে যুক্তফ্রন্ট কোনো ভালো কাজই করতে পারবেনা। আমাদের দেশের লোকগুলোই সব ডিসঅনেষ্ট। রক্তে ঘূণ ধরে গেছে। যে পার্টিই ক্ষমতায় আসুকনা কেন, শেষমেশ একই হাল হবে। যে যায় লঙ্কায় সেই হয় রাবণ। এখন দরকার মিলিটারী শাসনের’।

সুবল এবার মন্তব্য করল, ‘মিলিটারীওতো কোরাপ্ট। তা ছাড়া মিলিটারী শাসনে এ পর্যন্ত কোনো দেশের কোনো প্রকৃত উন্নতিই হয়নি। দেখুননা পাকিস্তান আর দক্ষিণ আমেরিকার দেশগুলোকে। মিলিটারী শাসনে দেশের মানুষের কোনো আর্থিক উন্নতিতো হয়ইনি বরং মানুষ কথা বলার, প্রতিবাদ করার স্বাধীনতাটুকুও হারিয়েছে’।

সুবলের কথায় সায় দিয়ে দ্বিতীয় ভদ্রলোক বললেন, ‘এখন সুভাষ বোসের মত লোকের দরকার। অনেকেত বলছে তিনি এখনো বেঁচে আছেন। সময় হলে ঠিক ফিরে এসে দেশের হাল ধরবেন’।

সুবল হেসে বলল, ‘নেতাজীকে নিয়ে জল্পনা করে কি লাভ। তিনি যে এখনো বেঁচে আছেন তার কোনো প্রমাণ নেই। আর নেতাজী সত্যি কিছু করতে পারতেন কিনা তা বোঝা যেত তিনি যদি বাস্তবে দেশটাকে চালানোর সুযোগ পেতেন একমাত্র তাহলেই’।

সুবলের কথায় যাত্রীরা অনেকে কটমট করে তাকালো। এ জাতীয় মন্তব্যে অনেকেই বেশ ক্ষুব্ধ হয়েছে বোঝা গেল। বাস থেকে নেমে সমর বলল, ‘তোর কি দরকার ছিল কঠিন বাস্তব সত্যকে তুলে ধরে মানুষের স্বপ্নে আঘাত দেওয়ার। সুভাষ বোস কোনোদিন দেশ চালাবেনওনা আর তার তাঁর অক্ষমতা থাকলে সেটাও কোনোদিন আর প্রমাণিত হবেনা। তাই মানুষের মনে এইটুকু সান্ত্বনা অন্ততঃ থাক যে আর কেউ না হোক নেতাজী অন্ততঃ দেশটাকে সঠিকভাবে চালাতে পারবেন আর তাঁর ফিরে আসার অলীক স্বপ্ন নিয়েই কঠিন বাস্তবের নির্মম আঘাত থেকে আত্মরক্ষা করতে পারবে’।

সুবল বেশ অবাক হয়ে বলল, ‘গুরু তুইতো দারুণ কথা বলেছিস। আমিত এভাবে কোনোদিন ভেবে দেখিনি’।

সমর বলে, ‘আমি ভেবে দেখেছি, বাস্তব যেমন সত্যি স্বপ্নওতো তেমন সত্যি। এত কষ্টের মধ্যেও যে মানুষ বেঁচে আছে, হাসতে পারছে সেতো এই স্বপ্নের দৌলতেই’।

হাওড়া স্টেশনে পৌঁছে সমরের পুরোনো দিনের কথা মনে পড়ে গেল। কলেজে পড়ার সময় রোজ এখান দিয়ে যাতায়াত করত। সকাল-সন্ধ্যা-দুপুর, শীত-গ্রীষ্ম-বর্ষা-শরতে হাওড়া স্টেশনকে কত নতুন নতুন রূপে দেখেছে। জীবনের ফেলে আসা অধ্যায়ের শত-সহস্র স্মৃতি জড়িয়ে আছে এই হাওড়া স্টেশনের সাথে।

সমর সুবলের দিকে চেয়ে বলল, ‘এবার আমাদের কোথায় যেতে হবে?’

সুবল বলল, ‘তোকে তাহলে সব খুলে বলতে হয়। আমি একটা মেয়ের প্রেমে পড়েছি’।

‘সেত তুই হামেশাই পড়িস’।

‘এটা সম্পূর্ণ আলাদা ব্যাপার। একদম ডুবে যাওয়া যাকে বলে।আমি নিজেও বুঝতে পারছিনা কেমন করে এটা ঘটল। আমি মেয়েটাকে বিয়ে করব। তবে এখানে একটু থিতু হয়ে নিয়ে’।

সুবলের কথা শুনে সমর বুঝতে পারল সুবল ঠাট্টা করছেনা, তাই বিস্ময়মাখা চোখে সুবলের দিকে চেয়ে থাকল। এই সেই সুবল যে সবসময় বলত, ‘মেয়েদের জন্য কোনো পিছুটান রাখতে নেই’। অনেক সুন্দরী বড়লোকের মেয়েকে সুবলের প্রেমে পড়ে অবশেষে হতাশ হতে হয়েছে। সেই সুবল সত্যি একটা মেয়ের প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছে, বিয়ে করতে চায়। কে সেই ভাগ্যবতী? মেয়েটাকে দেখার জন্য সমরের কৌতুহল তীব্র হয়ে ওঠে।

সুবল বাদাম ভাজা কিনে সমরের দিকে এগিয়ে দিল। বলল, ‘মেয়েটা হাওড়া গার্লস এ পড়ে। নাম বীণা। বাড়ি শিবপুরে। হাওড়া স্টেশনের কফি কর্ণারে হঠাৎ একদিন আমার সাথে আলাপ হয়ে যায়। তারপর কোথা দিয়ে যে কি হয়ে গেল। তোকে আজ বীণাদের বাড়ি নিয়ে যাওয়ার জন্যই এনেছি। চল শিবপুর যাওয়া যাক’।

দু তিনটে ভিড় বাস ছেড়ে দিয়ে ওরা একটা ৫৫ নম্বর বাসে বসার জায়গা পেল। সমর জানলার ধারের সিটে বসল। সুবল একটা সিগারেট ধরিয়ে আর একটা সমরের দিকে এগিয়ে দিল। হাওড়া বাস স্ট্যাণ্ড দিবানিদ্রার পর এবার জেগে উঠছে। আগের দুটো ৫৫ নম্বর বাস ছেড়ে দিয়েছে। ওদের বাসটাও আস্তে আস্তে যাত্রীতে ভরে উঠছে।

বাস ছেড়ে দিতেই ওরা সিগারেট পা দিয়ে চেপে নিভিয়ে জানলা দিয়ে ফেলে দিল। বাসটা বাঁক নিয়ে ফ্লাই ওভারের উপর উঠল। এখান থেকে হাওড়া স্টেশনটাকে অপূর্ব লাগে। লোকাল ট্রেন, মালগাড়ি, পরস্পর সংলগ্ন রেল লাইনের সারি। প্ল্যাটফরমে প্ল্যাটফরমে যাত্রীদের ছুটোছুটি। হাওড়া ময়দান পেরিয়ে বাসটা সংকীর্ণ জি.টি. রোড (সাউথ) এ ঢুকল। দুধারে রাস্তার গা ঘেঁষে ঘিঞ্জি দোকানপাট, রাস্তার ধারে ধারে তুম্বু করা জঞ্জাল, শ্রমিকদের ভিড়। দুটো বাস পাশাপাসি চলা দায়। ওপাশের বাসকে রাস্তা করে দিতে মাঝে মাঝেই সমরদের বাসকে অপেক্ষাকৃত চওড়া জায়গায় থেমে দাঁড়াতে হচ্ছে।

বাস শিবপুর ট্রাম ডিপো পার হওয়ার পর সুবল বলল, ‘এবার নামতে হবে’। শিবপুর বাজার স্টপে নেমে ওরা ডানদিকে শিবপুর বাজারের সংকীর্ণ গলিপথ দিয়ে হাঁটতে থাকে। দুধারেই পসারিরা সবজি ও অন্যান্য জিনিসপত্র নিয়ে বসেছে। মাঝখান দিয়ে অজস্র মানুষের প্রবাহ। প্রচণ্ড ভিড় ঠেলে হাঁটতে লাগল দুই বন্ধু। চারিদিকে মানুষের কলকাকলি, পচা তরিতরকারির দুর্গন্ধ। অনেকটা হাঁটার পর ওরা একটা মোড়ে পৌঁছল। একটা শিব মন্দিরের পাশে ফলওয়ালারা ঝাঁকায় ফল নিয়ে বসে আছে। চারদিকে চারটে গলি চলে গেছে। দুএকটা সাজানো গোছানো দোকান, ড্রেনের কালো ঘোলা জল দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে, আবর্জনার ঢিবি ইতস্ততঃ ছড়ানো। একটা তেলেভাজার দোকানে বেদম ভিড়। ড্রেন আর আবর্জনার পচা দুর্গন্ধ অগ্রাহ্য করে সব আমেজে তেলেভাজা খেয়ে চলেছে।

সমর বলল, ‘আর কতদূর সুবল?’

সুবল আঙুল দিয়ে দেখিয়ে বলল, ‘ঐতো সামনের গলিটা’।

একটা বাচ্চা ছেলে ছুটে যেতে গিয়ে সমরের গায়ে ধাক্কা খেয়ে পড়ে গেল। সমর ওকে টেনে তুলে ওর গায়ের ধুলো ঝেড়ে দিতে দিতে বলল, ‘খোকা লাগল নাতো?’

ছেলেটার হাঁটু একটু ছড়ে গেছে। কিন্তু সেদিকে ওর কোনো ভ্রূক্ষেপই নেই। ওর করুণ দৃষ্টি এক ভদ্রলোকের হাত থেকে ছিটকে পড়া অর্ধ্বভূক্ত চপটার দিকে। একরাশ এঁটোকাটা আর পরিত্যক্ত ভাঙা চায়ের ভাঁড়ের স্তুপের মধ্যে চপের টুকরোটা পড়েছে।

‘সুবল একটু দাঁড়া’ বলে সমর ছেলেটার হাত ধরে চপের দোকানে নিয়ে দুটো চপ কিনে ওর হাতে দিল। ছেলেটা চপদুটো নিয়ে বিস্ময়ভরা চোখে সমরের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকল, তার পর ছুটে পালিয়ে গেল। অজস্র কৌতুহলী চোখের দৃষ্টি অগ্রাহ্য করে সমর আর সুবল নির্দিষ্ট গলিটার মধ্যে ঢুকে গেল।

ভাঙাচোরা দাঁত বেরকরা দেয়ালের মাঝে ছোট কাঠের দরজা। সুবল দরজার কড়া নেড়ে ‘বীণা’ বলে ডাকল। দরজা খুলে একটা মেয়েলী স্বর বলল, ‘আরে সুবলদা! ভেতরে এস’। সমরকে দেখে মেয়েটা একটু জড়সড় হয়ে পড়ল, নিচু স্বরে প্রশ্ন করল, ‘কে?’

সুবল বীণার সাথে সমরের পরিচয় করিয়ে দিল, ‘আমার বন্ধু সমর, এখন এম.এ. পড়ছে’।

সমর দরজার কাছে এগিয়ে যেতেই মেয়েটা বলল, ‘আরে আরে মাথা নিচু করে ভেতরে ঢুকুন, নাহলে মাথায় ঠোকা খাবেন, দরজাটা ছোট’।

আর একটু হলেই সমর মাথায় ঠোক্কর খেত। অনেক কষ্টে সামলে নিল। উঠনে পা দেওয়ার আগেই মেয়েটা হেসে বলল, ‘এবারো সাবধান হতে হবে, উঠোন ভীষণ পিছল। ভাবছেন বন্ধু আপনাকে কি ঝামেলার মধ্যেই না নিয়ে এল। পদে পদে বিপদ!’

সমর এবার মেয়েটাকে ভালো করে দেখল। কথা বলার সময় গজদন্ত স্পষ্ট হয়ে উঠছে। নীলচে রঙের উপর ষ্ট্র্যাপ দেওয়া আটপৌরে শাড়ি, রোগা হাতে কয়েকগাছা রঙ্গিন প্লাস্টিকের চুড়ি। মাথায় একরাশ অগোছাল চুল। তাড়াতাড়ি উঠে আসতে গিয়ে হয়ত চুল ঠিক করার কথা ভাবতে পারেনি। চোখদুটো সুন্দর। লম্বাটে মেদহীন মুখ আর টিয়েপাখী নাক একটা ব্যক্তিত্বের আভাস ফুটিয়ে তুলেছে। বয়স বড়জোর সতের আঠারো। চোখেমুখে এখনো কৈশোরের ছাপ রয়ে গেছে।

উঠোনের একপাশে বাঁধান ইঁদারা। তার পাশেই বাথরুম। ভাঙাচোরা কূয়োর শরীরে শ্যাওলা আগাছার সমারোহ। পাশের বাথরুমের দেয়ালে যত্রতত্র পানের পিকের ছোপ। কূয়োর বাঁধান পাড়ের উপর বাথরুমের দেয়ালের কোণে গাদাকরা শাড়ি-ব্লাউজ-ব্রা-গেঞ্জি-পাজামা। পিছল জায়গাটা সাবধানে পেরিয়ে ওরা ঘরের বারান্দায় পৌঁছল। বারান্দার কোণের ঘর থেকে একটা বউ আর বাচ্চা ছেলে ওদের আড় চোখে দেখছে। বউটার চাহনীতে কৌতুকের ছাপ। বারান্দার শেষ প্রান্তে একটা রান্না ঘর। তার পাশে কাঠের বাক্সে কয়লা, ঘুঁটে, গুল; বঁটির চারপাশে তরিতরকারির খোসার রাশ। কয়লার আঁচ দেওয়া হয়েছে। এখনো ধোঁয়ার গন্ধ ভেসে আসছে। ঝুড়িতে আলু, বেগুন, লাউডাঁটা। রান্না ঘর থেকে তেলচিটে শাড়ি পরা এক প্রৌঢ়া উঁকি দিলেন। তারপর নিজের কাপড়ের দিকে তাকিয়ে তাড়াতাড়ি সমরের দৃষ্টিপথ থেকে নিজেকে সরিয়ে নিলেন। বারান্দার তারে ঝোলান সায়াটার শীতল স্যাঁতস্যাঁতে ছোঁয়া লাগল সমরের কপালে।

ওরা একটা ছোট ঘরে ঢুকল। ঘরের একপাশে একটা চৌকির উপর বিছানা বালিশ গাদা করা। খাটের খালি অংশকে ঢেকে রেখেছে একটা চাটাই। সমর আর সুবল খাটের একপাশে বসার পর বীণা রঙচটা ট্রাঙ্কের উপর থেকে হাতপাখা নিয়ে ওদের বাতাস করতে লাগল। সুবল ওর হাত থেকে পাখাটা কেড়ে নিয়ে বলল, ‘যাও চা করে আনো’। বীণা ঘর থেকে বেরিয়ে বারান্দা দিয়ে রান্না ঘরের দিকে গেল। জানলা দিয়ে সমর ওকে দেখল। বুকের দিকটা সুন্দর, সুপুষ্ট। রুগ্ন হাত মুখ দেখে বোঝা ভার।

রান্নাঘর থেকে বীণার গলা শোনা গেল, ‘সোনা, তোর পা ধোয়া হলরে?’

মাথার চুল মুছতে মুছতে বাথরুম থেকে বেরিয়ে এল তের চোদ্দ বছরের এক কিশোরী। বেশ গোলগাল মিষ্টি মুখ। চোখদুটো বোকা বোকা। বলল, ‘কিরেদিদি ডাকছিস কেন?’

‘একটু এদিকে শুনে যা। চট্করে একটু দোকান যা না। সুবলদা এক বন্ধুকে সঙ্গে করে এসেছেন’।

সুবল চেঁচিয়ে উঠল, ‘বীণা’।

বীণা আর সোনা দুজনেই ঘরে ঢুকল। সোনার চুল মোছা তখনো শেষ হয়নি। গায়ের রঙ বীণার মতই ফর্সা। বীণা সুবলের সামনে এসে বলল, ‘কি বলবে বল’।

‘ওকে দোকানে পাঠাচ্ছ কেন?’

‘মা বললেন। তোমার বন্ধুতো আজ নতুন এসেছেন’।

‘নতুন এলেও আমার খুব ইন্টিমেট ফ্রেণ্ড। শুধু চা করে আন’।

সোনার দিকে ফিরে সুবল বলল, ‘তোমার সেই ছবির বইটা নিয়ে এস দেখি’।

বীণা সমরের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘বাড়িতে বিস্কুট আছে। তাতেও আপনার বন্ধু আপত্তি তুলবে না তো?’

সমর হেসে বলল, ‘সুবল আপত্তি তুললে কে শুনছে। আমি চায়ের সাথে বিস্কুট খাব’।

বীণা হাসতে হাসতে চলে গেল। কাঠের ছোট বুক শেল্ফের একদঙ্গল বইএর জটলা থেকে সোনা ছবির বই খুঁজতে লেগে গেল। বইএর শেলফের পাশেই আলনা। জামাকাপড় বেশ পরিপাটি করে গোছানো। আলনার নিচে দুতিনটে জুতোর ব্রাশ। পাশের টেবিলে দুই থাক বই খাতা, একটা চশমার খাপ, কালির দোয়াত, তিন চারটে পেন, ওষুধের দাগ দেওয়া শিশিতে তিন দাগ লাল রঙের মিক্সচার ওষুধ। প্লাস্টিকের টেবিল ক্লথে জায়গায় জায়গায় হলদে ছোপ লেগে রয়েছে।

সোনা অবশেষে বইটা খুঁজে পেল। খাটের উপর বসে সুবলকে ছবি দেখাতে লাগল। সুবল মজা করে ছবিগুলোর আবোল তাবোল ব্যাখ্যা দিতে লাগল। সোনা রেগেমেগে বলল, ‘তুমি কিস্সু জাননা’।

ঘরের দেওয়াল জুড়ে অজস্র ক্যালেন্ডার। দেবদেবী-মহাপুরুষদের ছবি, ফুলের ছবি, সিনেমার অর্ধনগ্না নায়িকার ছবি সনই আছে। কোথাও দু-তিনটে ক্যালেন্ডার একের উপর আর এক লাগানোর ফলে বেশ মোটা কলেবর ধারণ করেছে। কোথাওবা ক্যালেন্ডারের পাতায় বাজারের হিসাব লেখা। দরজার উল্টো দিকের দেওয়ালে হুকের উপর কাঠের থাক। তাকের উপর পুরানো খবরের কাগজ আর কাপড়ের পোঁটলা।

দুহাতে চায়ের কাপপ্লেট নিয়ে বীণা ফিরে এল। সুবল আর সমরের দিকে এগিয়ে দিতে দিতে বলল, ‘কিরে সোনা তুই খালি গল্পই করে চলেছিস। আমাকে একটু সাহায্য করতে পারিসতো’।

সুবল বলল, ‘ওকে আবার বকছ কেন। বাচ্চা মেয়ে করুকনা একটু গল্প’।

সুবল খাটের কোণে একটা খবরের কাগজের টুকরো পেতে তার উপর চায়ের প্লেটটা রাখল। সমরও তার পাশে নিজের প্লেটটা রাখল। সমরের দিকে চেয়ে বীণা বলল, ‘আপনার কথা সুবলদার কাছে আগে অনেক শুনেছি’।

সমর চায়ে চুমুক দিতে দিতে বলল, ‘আপনার কথা আমি কিন্তু আজই প্রথম শুনলাম’।

বীণা লাজুক হেসে বলল, ‘আগে বলেনি বুঝি? সুবলদা ওরকমই। চায়ে দুধ একটু কম হয়ে গেছে। বাড়িতে দুধ ছিলনা তাই। আপনার খারাপ লাগছেনাতো?’

সমর হেসে বলল, ‘ওতে কিছু যায় আসেনা। আমিতো মাঝে মাঝে দুধ ছাড়া শুধু লিকারই খাই। আপনি দাঁড়িয়ে আছেন কেন? বসে কথা বলুননা’।

সমর একটু সরে গিয়ে বীণাকে বসার জায়গা করে দিল।

বীণা বলল, ‘আমি দাঁড়িয়েই কথা বলছি। আমাকে আবার আপনি করে বলছেন কেন?’

‘যাক, এখন থেকে তুমি করেই বলব। আপনি, মানে তুমি কোন ইয়ারে পড়?’

‘এখন ফার্স্ট ইয়ার চলছে’।

‘কোন স্কুল থেকে পাশ করেছ?’

‘হিন্দু বালিকা বিদ্যালয়’।

‘বাজারের মধ্যের স্কুলটাতো?’

‘আপনি জানলেন কি করে?’

‘আমিত বি.এ. পড়ার সময় কাছেই দিদির বাড়িতে থাকতাম। এসব জায়গা তাই আমার খুব পরিচিত’।

বীণা বিস্মিত হয়ে বলল, ‘সুবলদাত কিছু বলেনি। কোথায় আপনার দিদির বাড়ি?’

‘কাজি পাড়া লেনএ। চেন?’

‘চিনবনা মানে? ওখানেত বেশিরভাগ মুসলমান?’

‘ঠিকই বলেছ। আমার দিদিদের বাড়ি ছাড়া আর দুটো বাড়ি মাত্র হিন্দুদের’।

‘আজ এত কাছে এলেন, নিশ্চই দিদির বাড়ি দেখা করে যাবেন?’

‘সেরকম ইচ্ছা আছে। আজ অখানে থেকেও যেতে পারি’।

সোনা আবার সুবলের সাথে গল্প জুড়েছে। সোনা হঠাৎ হাততালি দিয়ে চেঁচিয়ে উঠল, ‘কি মজা কি মজা, টিকটিকির লেজ খসে পড়েছে’।

দেয়ালে লেজকাটা টিকটিকি হাঁ করে এক উড়ন্ত পোকার দিকে তাকিয়ে ছিল। সোনার হাততালিতে সচকিত হয়ে ছুটে ছাঁতের দিকে চলে গেল।

সমর খালি কাপটা রাখার জায়গা খূঁজছিল। ‘আমাকে দিন’ বলে বীণা হাত বাড়িয়ে কাপপ্লেট নিল। সুবলের কাপের দিকে হাত বাড়াতেই সুবল বলল, ‘ওটা নিওনা, এসট্রে বানাতে হবে’। বীণা হেসে ফেলল। সমরের কাপটা টেবিলে রেখে দরজা আর বারান্দার দিকের জানলা ভেজিয়ে দিল। সুবল আর সমর সিগারেট ধরাল। সমর দেশলাইএর জ্বলন্ত কাঠিটা বাইরের দিকের জানলা দিয়ে ছুঁড়ে ফেলল। গলির জলে পড়ে কাঠিটা ছ্যাঁক শব্দ করে নিভে গেল। টিউবওয়েলের কাছের লোকটা কলটেপা বন্ধ করে ফিরে তাকাল। তারপর আবার বালতিতে জল ভরায় মন দিল। লোকটা লুঙ্গির মত করে ধূতি পরেছে। তেলচিটে গেঞ্জির বগলের কাছটা ছিঁড়ে গেছে। মুখে খোঁচা খোঁচা সাদাপাকা দাড়ি। মুখেচোখে যতরাজ্যের বিরক্তি।

সমর পায়ের উপর পা তুলে আরাম করে বসে বীণাকে প্রশ্ন করল, ‘তোমাদের কলেজটা এখন কেমন?’

‘মোটামুটি’।

‘তোমার অনার্স আছে?’

‘দুর্, আমার আবার অনার্স নেওয়া! অগা মেয়ে। কোন রকমে থার্ড ডিভিশনে উৎরে গেছি’।

ওদিক থেকে সুবল প্রতিবাদ জানাল, ‘ফাইন্যাল পরীক্ষার আগে মায়ের অসুখের জন্য একদম পড়াশুনা করতে পারনি, সেজন্যই রেজাল্ট খারাপ হয়েছে। স্কুলের পরীক্ষায় ভালো নম্বর পেয়ে প্রতিবছর ফার্স্ট হতে সেকথা বলছনা কেন?’

‘এখন অসব কথা বলে আর কি লাভ!’

জানলার বাইরে টিউবওয়েলের কাছে একটা বাচ্চা মেয়ে হাতল ধরে লাফিয়ে লাফিয়ে পাম্প করে বালতিতে জল ভরার চেষ্টা করছে। প্রতিবার খুব সামান্যই জল পড়ছে। পাশেই আটপৌরে শাড়ি পরে পিতলের কলসী কাঁখে একটা মোটাসোটা বউ দাঁড়িয়ে।

বউটা হেসে বলল, ‘রিনি, তুই দেখছি রাত কাবার করে দিবি। সর আমি তুলে দিচ্ছি’।

বীণা টেবিলের উপর একটা বই এর পাতা খুলছে আর বন্ধ করছে আর সমানে পায়ের পাতা নাচিয়ে চলেছে। সমর ওকে উদ্দেশ্য করে বলল, ‘আপনার, সরি তোমার বাবাকেতো দেখলাম না’।

‘বাবার ফিরতে সন্ধ্যা সাত-আটটা হয়ে যাবে। ট্রাম কোম্পানিতে কন্ডাকটরের কাজ করেন’।

‘তোমরা  মোট কয় ভাইবোন?’

‘এক ভাই তিন বোন। দিদির রিসেন্টলি বিয়ে হয়েছে, বেতাই তলার কাছে। দাদা কলেজ থেকে ফিরে আড্ডায় বেরিয়েছে। দীনবন্ধু কলেজে পড়ে। বাংলায় অনার্স নিয়ে। আপনিত কলেজটা চেনেন’।

‘খুবই চিনি। কলেজে পড়ার সময় ওই কলেজের সামনের স্টপ থেকেইতো বাস ধরতাম। সোনা কোন ক্লাশে পড়ে?’

‘ক্লাশ এইটে। হিন্দু বালিকাতেই’।

‘তোমার মার সাথে আলাপ করিয়ে দিলে নাতো’।

‘মা নোংরা শাড়ি পরে আছেন। আপনার সামনে আসতে লজ্জা পাচ্ছেন। শাড়ি বদলে নিলে আবার রান্নার কাজের অসুবিধা হবে’।

‘ধুর তাতে কি হয়েছে। আমার মাওতো আটপৌরে শাড়ি পরে রান্না করেন। আমাদের সিগারেট খাওয়া শেষ হলে তোমার মা কে ডেকে আনো’।

সিগারেটে শেষ টান দিয়ে সমর টুকরোটা জানলা দিয়ে বাইরে ছুঁড়ে দিল। কাপ-ডিশ নিয়ে বীণা দরজা খুলে চলে গেল। রান্নাঘর থেকে বীণা আর ওর মায়ের অস্পষ্ট কথোপকথনের আওয়াজ ভেসে আসছে। মা বার বার আপত্তি জানাচ্ছেন। ওদিকে সুবল আর সোনা ধাঁধাঁর লড়াই শুরু করেছে। এতক্ষণ ওরা অনেক হাসির গল্প করে নিয়েছে।

সুবল সোনাকে বলল, ‘আচ্ছা বলোতো একটা পাঁচ বছরের বাচ্চা ছেলের মুখে চিনি পুরে দিলে কি হবে’।

সোনা নির্বিকার চিত্তে বলল, ‘কি আর হবে, বাচ্চাটার চিনি খেতে মিষ্টি লাগবে’।

সমর আর সুবল হো হো করে হেসে উঠল। সমর বলল, ‘তুমি খুব চালাক মেয়েত। আমার সাথেত একটুও আলাপ করলেনা। তোমাদের ছাতে যাওয়া যায়?’

সোনা সোৎসাহে বলল, ‘আপনি ছাতে যাবেন?’

বীণা ঘরে ঢুকে সমরকে উদ্দেশ্য করে বলল, ‘মা এভাবে আপনার সামনে আসতে ভীষণ লজ্জা পাচ্ছেন। বললেন পরের দিন আলাপ করবেন’।

সমর বলল, ‘ঠিক আছে। সোনা চল আমরা ছাত থেকে ঘুরে আসি’।

ছাতে যাওয়ার সিঁড়ির নিচে সিমেন্টের বস্তা। সোনা বলল, ‘বাড়িওয়ালা কূয়োর পাড় সারানোর জন্য সিমেন্ট এনে রেখেছে’।

ছাতে টবে রজনীগন্ধা আর চন্দ্রমল্লিকা। সোনা বলল, ‘এগুলো আমি গেড়েছি। সুমিদের বাড়ি থেকে এনেছি’।

‘সুমি কে?’

‘আমার সাথে একই ক্লাশে পড়ে। ঐত লাইব্রেরীর পাশে ওদের বাড়ি’।

সন্ধ্যা নামছে। শিবপুর বাজেরের টিমটিমে আলোগুলো সব জ্বলে উঠেছে। বাজারে গিজগিজে ভিড়। তেলেভাজার দোকান জমজমাট। সামনের রকে বসা ছেলেগুলোকে দেখিয়ে সোনা বলল, ‘ঐ ছেলেগুলো, টুকাই, মাধু ওরা খুব পাজি। আমাকে বাজে গালাগাল দেয়। আমি সাধনদার সাথে কথা বলি বলে যা তা বলে’।

‘সাধনদা কে?’

‘সুমিদের বাড়ির পাশে থাকে। হাওড়া জেলা স্কুলে পড়ে। ফার্স্ট হয়। খুব ভালো ছেলে। সিগারেট খায়না, বাজে আড্ডা মারেনা, খারাপ কথা বলেনা’।

সমর হাসি চেপে গম্ভীর স্বরে বলল, ‘তাহলেতো দারুণ ছেলে। ঐ বদ ছেলেগুলো সাধনদা আর তোমার সম্বন্ধে কি বলে?’

সোনা লজ্জা পেয়ে টবের দিকে ছুটে গেল। সমরের প্রশ্নের কোনো উত্তর না দিয়ে টব থেকে আগাছা তোলায় মন দিল।

একটা বিশালাকৃতি ষাঁড় বাজারের মধ্যদিয়ে হেলেদুলে চলেছে। গীটার হাতে করে একটা মেয়ে চলেছে। পরনে টুকটুকে হলুদ রঙের শাড়ি। পিঠের উপর দিয়ে সরু বেণি দুটো দুলছে। রকের ছোকরাগুলো মেয়েটার দিকে নিষ্পলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। নিজেদের মধ্যে কি বলাবলি করছে।

‘চল্সমর এবার আমাদের ফিরতে হবে’। সুবলের ডাকে সমরের সম্বিৎ ফিরল। নিচে নেমে বীণাদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে ওরা বেরিয়ে পড়ল। সুবল বলল, ‘তুই কি আজ দিদির বাড়ি যাবি?’

সমর বলল, ‘নাঃ, আজ আর তেমন ইচ্ছা করছেনা। চল্বরং হাওড়া স্টেশনে কফি কর্ণারে বসে কিছুক্ষণ গল্প করা যাক’।


পরদিন তড়িৎ সমরের ঘরে এল। বলল পাড়ার নিউ রয়্যাল হলে দারুণ একটা হিন্দি বই চলছে। ওর নাইট শোতে সিনেমাটা দেখার খুব ইচ্ছা। সমর গেলে ও অনেকটা ভরসা পায়। সমর ওর প্রস্তাবে এক কথায় রাজি হয়ে গেল।

তাড়াতাড়ি রাতের খাওয়া শেষ করে হলে গিয়ে দেখে হাউসফুল। টিকিট পাওয়ার কোন সম্ভাবনা নেই। দুএকজন ব্ল্যাক টিকিট বিক্রেতাকে চোখে পড়ল। সমর ওদের চেনে। ওরা বলল ওদেরও স্টক শেষ। পরের দিন আসলে ওদের জন্য টিকিট রেখে দেবে। সমর বলল, ‘সে রকম দরকার পড়লে পরে জানাচ্ছি’।

তড়িৎ ক্ষুণ্ণ স্বরে বলল, ‘আমার বোকামীর জন্যই এরকম হল। নাইট শোতে এত ভিড় আগে জানলে এডভান্স টিকিট কেটে রাখতাম’।

সমর আশ্বাস দিয়ে বলল, ‘কোনো চিন্তা করিসনা। আমি ম্যানেজ করছি’।

টিকিট কাউন্টারের লোকটা সমরকে চেনে। সমর কাউন্টারের সামনে গিয়ে নিচু স্বরে বলল, ‘দুটো এক্সট্রা টিকিটের ব্যবস্থা করে দিন’।

‘কোন ক্লাশের দেব?’

‘পঁচাত্তর পয়সার’।

লোকটা দুটো থার্ড ক্লাশের টিকিট দিয়ে দেড় টাকা গুনে নিয়ে বলল, ‘বাঁ পাশের দরজা দিয়ে চুপচাপ ভেতরে এসে এখান থেকে একটা বেঞ্চ নিয়ে সামনের দিকের সিটের পাশে বসে যান’।

সিনেমা হলটায় সিটের পাশ দিয়ে অনেকটা ফাঁকা জায়গা রয়েছে। একটা বেঞ্চ অনায়াসে ধরে যায়। সমর আর তড়িৎ কাউন্টারের ভেতরে ঢুকে একটা ভালো দেখে বেঞ্চ নিয়ে পেছন দিকের সিটের পাশে আড়াআড়ি করে পেতে বসে গেল। তড়িৎ বলল, ‘ফার্স্ট ক্লাশের পাশে বসলামতো। যদি কিছু বলে’।

সমর বলল, ‘দুর্, কে আর অত দেখতে যাচ্ছে। আমি কতদিন এভাবে সিনেমা দেখেছি’।

তড়িৎ সমরের দিকে প্রশংসাপূর্ণ দৃষ্টিতে চেয়ে বলল, ‘গুরু তুমি ওস্তাদ আছ’।সারা হলে লুঙ্গি পরা মুসলমানদের ভিড়। সবাই রাজাবাজার অঞ্চলের অশিক্ষিত দরিদ্র মুসলমান। তবে লোকগুলো খুবই সরল আর সাধাসিধে।একটু ভালো ব্যবহার পেলে চিরদিন কৃতজ্ঞ হয়ে থাকে। সমর আর তড়িতের পরনে পাজামা আর খদ্দরের পাঞ্জাবি। সমর গম্ভীর স্বরে বলল, ‘এই হলে নাইট শো দেখার নিয়ম কি জান? লুঙ্গি পরে হলে ঢুকতে হবে, লুঙ্গিতে পানের পিকের দাগ থাকতে হবে। তেমন তেমন সিন আসলে মুখে আঙ্গুল পুরে সিটি মারতে হবে। না হলে হল থেকে বের করে দেবে। তবে আমরা ছাত্র বলে পোশাকের ব্যাপারে কিছুটা ছাড় আছে। কিন্তু সিটি মারতেই হবে। সিটি মারতে পারিসতো?’

তড়িৎ ঠাট্টা বুঝতে পেরে হোহ করে হেসে উঠল। পাশের কয়েকজন লোকও কিছু না বুঝেই হাসিতে যোগ দিল।

সিনেমা শুরুর আগে বিজ্ঞাপন। বিশ্বসুন্দরী প্রতিযোগিতার খবর দেখাচ্ছিল। বিশ্বসুন্দরী কথাটার মানে বুঝতে না পেরে একজন পাশের বন্ধুকে প্রশ্ন করল, ‘এ কিয়া হায়?’

লোকটা বিজ্ঞের মত উত্তর দিল, ‘উও লেড়কি আসসল মাগী বন গয়ী’।

কথাটা শুনে সমর আর তড়িৎ সশব্দে হেসে উঠল। এই হলে সিনেমা দেখার বিশেষ করে নাইট শোতে, এই একটা সুবিধা। হাসা যায়, গল্প করা যায়। কেউ কিছু আপত্তি করেনা।

‘ফর্জ’। জিতেন্দ্র আর ববিতার জমজমাট গরম প্রেমের বই। সারা হল মাঝে মাঝেই চিৎকার আর হাত তালিতে ফেটে পড়ছে। সমরও মুখে দু আঙ্গুল পুরে দু একবার সিটি মারল। গম্ভীর স্বরে তড়িৎকে বলল, ‘সিটি মার নাহলে হল থেকে বের করে দেবে’।

তড়িৎ হেসে বলল, ‘দুর্, তাই নাকি!’

‘সত্যি বলছি’। সমরের স্বর এবার আরো সিরিয়াস। তড়িৎ দু একবার সিটি মারতে চেষ্টা করেও বিফল হল। সমর বলল, ‘ঠিক আছে, আজ প্রথম দিন, এটুকুতেই চলবে। তবে এরপর আসার আগে ভালো করে সিটি মারা প্র্যাকটিশ করে নিও’।

পাশের সিটের লোকটা যে ‘আসসল মাগী’ বলেছিল সে ফিরে তাকিয়ে হেসে বলল, ‘আপ ঘাবড়াইয়ে মত। বাবু মজাক্কুড়াতা হায়’।

ফেরার পথে ওরা দেখে ফিফ্থ ইয়ারের অনিরুদ্ধ, প্রকাশ আর বাদল একটা বাড়ির দেয়ালে ময়দার আঠা দিয়ে নকশালদের ‘দেশব্রতী’ পত্রিকা সাঁটছে। আসপাশেই সি.পি.এম. এর ‘গণশক্তি’ আর সি.পি.আই. এর ‘কালান্তর’ সাঁটা রয়েছে। বাদলের সুন্দর মুখে একরাশ দাড়ি। তিনজনেই বিড়ি ফুকতে ফুকতে কাজ করে চলেছে। বাদল সমরদের দেখে বলল, ‘সমরদা আসুননা আমাদের পত্রিকাটা একটু পড়ুন, তাহলে একটা করে বিড়ি খাওয়াব’। ওর কথায় সবাই হেসে উঠল। সমর বলল, ‘বিড়ি খাওয়াতে হবেনা। এমনিই পড়ছি’।

বাদল বলল, ‘আপনাকে অনেক ধন্যবাদ। দেখেনত কি মুশকিল! সব লোক ভিড় করে গণশক্তি আর কালান্তর পড়ে। আর আমাদের সাপোর্টাররা ভয়ে ভয়ে দূর থেকে আড় চোখে তাকায়। ইচ্ছে থাকলেও কাছে এসে পড়বেনা। যদি পুলিশের খাতায় নাম উঠে যায় সেই ভয়। তা ছাড়া সি.পি.এম. এর গুণ্ডাদের ভয়তো আছেই’।সমর বলল, ‘তোমাদের দলেওতো অনেক গুণ্ডা ঢুকে পড়েছে। তোমাদের ছেলেরাওতো সি.পি.এম. এর সাপোর্টারদের মারছে’।

প্রকাশ বলল, ‘একথা ঠিক যে আমাদের দলেও কিছু মস্তান ঢুকে পড়েছে। তবে আমরা তাদের মস্তানি করতে দিইনা। পলিটিকালাইজ করার চেষ্টা করি। আর মারামারিতো সি.পি.এম.ই আগে শুরু করেছে’।

সমর বলল, ‘কে আগে মারামারি শুরু করেছে সেটাত বিতর্কের বিষয়। প্রমাণ করা অসম্ভব। আর আমিতো শুনেছি কংগ্রেস আর সি.পি.এম. থেকে অনেক মস্তান তোমাদের দলে ঢুকে পড়েছে চাইনিজ আর্মস পাওয়ার লোভে’।

‘ওসব অপপ্রচারে বিভ্রান্ত হবেননা’।

বাদল বলল, ‘ধুর সমরদা, ওদের সঙ্গে বাজে তর্কে সময় নষ্ট না করে আজকের দেশব্রতীটা পড়ে ফেলুন। পড়ে দেখুন আমাদের আন্দোলন কেমন নতুন নতুন জায়গায় ছড়িয়ে পড়ছে’।

সমর পত্রিকাটা পড়তে শুরু করল। নানান জায়গায় জোতদারের মাথা কাটা হয়েছে আর সেসব জায়গায় নাকি লাল মুক্ত এলাকা গড়ে উঠেছে।

সমর বলল, ‘জোতদারদের মাথা কাটতে কাটতেই কি তোমরা রাজনৈতিক ক্ষমতা দখল করতে পারবে?’

বাদল বলল, ‘নিশ্চয়ই’।

‘কি করে বুঝিয়ে বলো’।

‘জোতদার খতম সাধারণ কৃষকদেরই শ্রেণিঘৃণার চূড়ান্ত রূপ। এরপর পুলিশ আসবে, লোকের উপর অত্যাচার করবে। জোতদারদের যারা খুণ করবে তাদের নিয়েই ছোট ছোট গেরিলা দল গড়ে উঠবে’।

‘আমি ব্যপারটা ঠিক বুঝতে পারছিনা’।

‘আর কিছুদিন পর বুঝতে পারবেন। তবে আমাদের ওপ্নলি কাজ করার দিন ফুরিয়ে আসছে। অল্পকিছুদিনের মধ্যেই গ্রামে পালাতে হবে’।

ফেরার পথে তড়িৎ বলল, ‘নকশাল ছেলেগুলো এমনি কিন্তু খুব ভালো। কিন্তু কি হবে এভাবে ক্যারিয়ার নষ্ট করে, পুলিশের ভয়ে পালিয়ে বেড়িয়ে’। সমর বলল, ‘দেখো তড়িৎ, সবার জীবনের উদ্দেশ্যতো একরকম হয়না। আমরা যেমন নিজের ক্যারিয়ারের উন্নতি করে আনন্দ পাই অনেকে আবার তেমনি আত্মত্যাগ করে আনন্দ পায়’।

‘কিন্তু ওদের এই আত্মত্যাগতো আত্মহত্যারই সামিল। এতে দেশের কি উপকার হবে? বরং ওরা যদি ক্যারিয়ার করে বড় কিছু হতে পারত তাহলে দেশের কত কাজে লাগত ওদের প্রতিভা’।

‘আসলে ব্যাপারটা কি জানো, কি থেকে দেশের সত্যি উপকার হবে তা আমরা কেউই সঠিকভাবে জানিনা। আমরা প্রত্যেকে কোনোনাকোনো বিশ্বাসকে আঁকড়ে ধরে আছি। সেটা সঠিক কিনা তা যাচাই করাতো প্রথমেই সম্ভব নয়। অথচ আমাদের একটা কিছুকে, কোনো বিশ্বাসকে আঁকড়ে ধরে থাকতেই হবে। আর দেখো, দেশেত বড় বড় প্রতিভাবান মানুষ কম জন্মাননি। তাতে কি দেশের সাধারণ মানুষের খুব একটা উন্নতি হয়েছে। বলত, এই সব বিশ্ব বরেন্য প্রতিভারা সাধারণ মানুশের দুর্দশা কতটা দূর করতে পেরেছেন। আসলে হয়ত নিজেদের খ্যাতি নিয়েই তাদের চিন্তা, সাধারণ মানুষের কথা ভাববার তাঁদের সময় নেই, অথবা ভাবার কোনো ইচ্ছাই নেই। আর একটা কারণে এই আত্মত্যাগ কারী ছেলেগুলোকে আমি ওই সব তথাকথিত বড় বড় লোকদের চেয়ে অনেক উপরে স্থান দিই।

‘কেন ওকথা বলছ?’

‘ভেবে দেখো, ঐ সব বড় বড় লোকরা নিজেদের নাম প্রচারের জন্য, খ্যাতি, আর্থিক প্রতিপত্তি এসবের জন্য নিজেদের বড় করে তুলেছেন। তাতে দেশের লাভ হোক বা না হোক, আত্মত্যাগের অন্ততঃ কোনো প্রয়োজন হয়নি। তাদের অনেকেই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভাবে দেশের অনেক উপকার করেছেন। কিন্তু তার জন্য তারাত নিজেদের কোনো ভাবে বঞ্চিত করেননি। বরং তারা নিজেদের স্বার্থ সিদ্ধি করতে গিয়েই দেশের জন্য কিছু করে থাকলেও থাকতে পারেন। আর ওই ছেলেগুলোকে দেখো। নিজেদের সব কিছু বিলিয়ে দিয়ে মানুষের ভালো করার চেষ্টা করে চলেছে। ওরা ভুল করছে কিনা সেটা ইতিহাস প্রমাণ করবে। কিন্তু ওদের এই আত্মত্যাগ ব্যাপারটাকে তুমি শ্রদ্ধা না করে পারবেনা। আচ্ছা নেতাজীও তো বিফল হয়েছিলেন, কিন্তু দেশের লোক তাঁকে শ্রদ্ধা করে কেন?’

‘তাঁর আত্মত্যাগের জন্য’।

‘ঠিক বলেছ। আর এই ছেলেগুলোও একই কারণে শ্রদ্ধা পাওয়ার দাবী রাখে’।


Next: Chapter 6 >

Previous: Chapter 4 >


Dr.Ratan Lal BasuRatanlal Basu, Ph.D. (Economics) is an ex-Reader in Economics and Teacher-in-Charge, Bhairab Ganguly College, Kolkata, India. Dr. Basu has written & edited several books on Economics.

Apart from his passion for the field of Economics, Dr. Basu's other interests are Boxing & Small Game Hunting (gave up the nasty games during college life); Swimming in Turbulent Rivers (physically impossible now); Himalayan Treks, Adventure in Dense Forests, Singing Tagore Songs and also writing travelogues and fiction in Bengali and English.

Dr. Ratan Lal Basu can be reached at rlbasu [at] rediffmail.com.