স্বপ্ন - রতন লাল বসু: চতুর্থ অধ্যায় | Shopno - A Bengali Novel by Dr. Ratan Lal Basu - Chapter 4 | WBRi Bangla Online Magazine

"Shopno" is a novel by Dr. Ratan Lal Basu published serially in the WBRi Bangla Magazine section in unicode Bangla font. Links to previous and following chapters are posted at the bottom of every episode.


স্বপ্ন

রতন লাল বসু

চতুর্থ অধ্যায়


ছোটবালা থেকেই সমর নকশালবাড়ির নাম শুনেছে। কাটিহার লাইনে শিলিগুড়ির একটু পরেই ছোট্ট স্টেশনটা। মেল ট্রেন ওখানে থামেনা। সেই নকশালবাড়ি হঠাৎ বিখ্যাত হয়ে উঠল, খবরের কাগজের হেড লাইন হয়ে পড়ল। ওখানে দারুন গন্ডগোল চলছে। কৃষকরা অনেক জোতদার ও বড় জমির মালিককে মেরে ফেলেছে। তীর ধনুক নিয়ে ওরা লড়াই শুরু করেছিল। প্রথমে সি.পি.এম. পুলিশ পাঠানোর ব্যাপারে কিছুটা আপত্তি জানিয়েছিল কারণ ওখানকার আন্দোলনের নেতারা সি.পি.এম. এর লোক। কিন্তু তারপর যুক্তফ্রন্ট সরকারে নিজেদের অবস্থার কথা ভেবে দলের পক্ষ থেকে আন্দোলনপন্থী নেতাদের নিরস্ত হতে ও আন্দোলন তুলে নিতে নির্দেশ দেওয়া হয়। কিন্তু চারু মজুমদার, কানু সান্যাল, সৌরীন বসু প্রমুখ নেতারা দলের নির্দেশ মানতে চাননা। তাদের দল থেকে বহিস্কৃত করা হয় ও সি.পি.এম. এর তত্বাবধানে যুক্তফ্রন্ট এর পক্ষ থেকে আন্দোলন দমন করতে এক বিশাল পুলিশ বাহিনী পাঠানো হয়। তীর ধনুক নিয়ে পুলিশের রাইফেলের সামনে কৃষকরা বেশিক্ষণ টিকে থাকতে পারেনা। তাই অবশেষে তারা হার স্বীকার করতে বাধ্য হয় এবং তাদের প্রধান নেতারা আত্মগোপন করেন। শোনা যাচ্ছে অনেক কৃষক সংঘর্ষে মারা গেছে, কয়েকজন পুলিশও মারা গেছে।

নকশালবাড়ী আন্দোলন ও পুলিশ দিয়ে তা দমনকে কেন্দ্র করে সি.পি.এম. দলের ভিতরে তীব্র দ্বন্দ্বের সূত্রপাত হল। দলের কেন্দ্রীয় কমিটি বলল এই আন্দোলন একটি অতি বামপন্থী নৈরাজ্যবাদী আন্দোলন। অন্যদিকে ছোটবড় অনেক নেতাই দাবি করলেন এটা কৃষক বিপ্লবের সূত্রপাত এবং পুলিশ দিয়ে এই আন্দোলন দমন করা অন্যায় হয়েছে। সি.পি.এম. এর উচিত সংসদীয় রাজনীতির মোহ পরিত্যাগ করে যুক্তফ্রন্ট সরকার থেকে বেরিয়ে আসা ও কৃষক আন্দোলনকে সমর্থন করা। অবশেষে অনেক নকশালপন্থী নেতাকে সি.পি.এম.থেকে বের করে দেওয়া হল, অনেকে আবার নিজেরাই দল থেকে বেরিয়ে এলেন নতুন বিপ্লবী দল গঠনের জন্য।

কলকাতার ছাত্র মহলেও নকশালবাড়ি নিয়ে জোর আলোচনা ও বিতর্কের সূত্রপাত হল। এর ফলে এস.এফু.ও দুভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ল, একদল সি.পি.এম. এর অনুগত এবং আর একদল নকশালপন্থী। বেচুরা আগে থেকেই সি.পি.এম. এর উপর বিক্ষুব্ধ ছিল। তারা নকশালবাড়ির আন্দোলনকে পূর্ণ সমর্থন জানাল। তাদের মতে সি.পি.এম. মূল আদর্শ থেকে সরে গিয়ে শোধনবাদী নীতি গ্রহণ করছে। আন্দোলনের পথ ছেড়ে, বিপ্লবের নীতি থেকে বিচ্যূত হয়ে তারা পার্লামেন্টারী গণতন্ত্রের পথকে বেছে নিয়েছে। সি.পি.এম. এর নেতারা মন্ত্রীত্বের গদীর মোহে আচ্ছন্ন হয়ে আদর্শ থেকে সরে গিয়েছেন। সুতরাং বেচুরা ঠিক করল তারা সি.পি.এম. এর সংস্পর্শ পরিত্যাগ করবে ও যোগদেবে বিপ্লবী দলে যা নির্বাচনের মধ্যদিয়ে ক্ষমতা দখলের ভ্রান্ত পথ পরিত্যাগ করে কৃষি বিপ্লব ও গেরিলা যুদ্ধের মাধ্যমে চীনের কমিউনিষ্টদের মত ক্ষমতা দখলের পথে অগ্রসর হবে।
সমর কলকাতার যেখানেই যায়, নকশালবাড়ি নিয়ে কিছুনাকিছু আলোচনা ও তর্কবিতর্ক শুনতে পায়। অবশ্য সাধারণ মধ্যবিত্ত বাঙালীর মনে নকশালবাড়ি আন্দোলন বিশেষ সাড়া জাগাতে পারেনা। একটা ছোট্ট জায়গায় অমন তীরধনুক নিয়ে লড়াই করে কি রাষ্ট্র ক্ষমতা দখল করা যায়! বরং এতে যুক্তফ্রন্ট সরকার বিপদে পড়বে এবং এই সুযোগে জনবিরোধী কংগ্রেস আবার ক্ষমতায় ফিরে আসবে। নকশালবাড়ির ঘটনাকে কেন্দ্র করে যুক্তফ্রন্টের অন্যান্য শরীকরা সি.পি.এম. এর বিরুদ্ধে সক্রিয় হয়ে উঠেছে। কেন্দ্রের কংগ্রেস সরকার যুক্তফ্রন্টের পতন ঘটিয়ে রাষ্ট্রপতির শাসন জারির অজুহাত খুঁজছে। সি.পি.এম. নেতারা বলছেন ভারতে বিপ্লবের পারিপার্শিক অবস্থার এখনো সৃস্টি হয়নি। শ্রমিক-কৃষকরা এখনো সচেতন ও সংঘবদ্ধ হয়ে উঠতে পারেনি। তাই এখন ধীর পদক্ষেপে চলতে হবে, শ্রমিক-কৃষক-নিম্ন মধ্যবিত্ত শেণি সমূহকে বিপ্লব-সচেতন ও সংঘবদ্ধ করে তুলতে হবে। যুক্তফ্রন্ট এর মধ্যে থেকে সি.পি.এম. এই কাজটাকে সহজে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারবে। নির্বাচন সম্বন্ধে সাধারণ মানুষের মনে এখনো মোহ আছে। নির্বাচিত সরকারে অংশগ্রহণ করে প্রমাণ করে দিতে হবে যে এ পথে দারিদ্র্য ও শোষণের অবসান ঘটান সম্ভব নয়। বিপ্লবের পথই একমাত্র পথ। যতদিন সাধারণ মানুষ তা ভালোভাবে বুঝতে না পারছে ততদিন নির্বাচনে অংশ গ্রহণ না করলে কমিউনিষ্টরা সাধারন মানুষ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে। সি.পি.এম. বিশ্বাস করে বিপ্লবই অন্যায় অবিচার শোষন থেকে মুক্তির একমাত্র পথ। কিন্তু সেই সময় আসতে এখন ঢের দেরি। এসময় হঠকারীতা করলে বামপন্থী আন্দোলনই ক্ষতিগ্রস্থ হবে। আর কোনো লাভ হবেনা।

বেচুরা ও অন্যান্য সমস্ত নকশালপন্থীদের মতে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে নির্বাচন সম্বন্ধে সাধারণ মানুষের মোহভঙ্গ করা যাবেনা। বরং নতুন থেকে নতুনতর মোহে জড়িয়ে পড়বে কমিউনিষ্টরা। তাছাড়া ভারত একটা আধা-সামন্ততান্ত্রিক আধা-ঔপনিবেশিক দেশ। এখানে উন্নয়নে আঞ্চলিক অসমতা জনিত কারণে, শ্রমিকশ্রেণির আপেক্ষিক অনুপাত নগণ্য হওয়ার জন্য সারা দেশ জুড়ে একইসাথে বিপ্লব কখনো সম্ভব হবেনা। গেরিলা যুদ্ধের মাধ্যমে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অঞ্চলে ঘাঁটি স্থাপন করতে হবে, ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অঞ্চলে ক্ষমতা দখল করতে হবে। গ্রামগুলোই পুলিশ মিল্টারীর নিয়ন্ত্রণ থেকে দূরে। তাই প্রথমে গ্রামগুলোতে ক্ষমতা প্রতিষ্ঠা করে শেষে গ্রাম দিয়ে শহর ঘেরাও করতে হবে। তাই ভারতের বিপ্লব হবে দীর্ঘস্থায়ী, ঠিক চীন-ভিয়েতনামের মত। নকশালবাড়ি আন্দোলন এমনি এক গেরিলা যুদ্ধের পথিকৃত। তাই বেচুরা নকশালবাড়ি আন্দোলনকে সমর্থন করে।

পশ্চিমবঙ্গের বাইরে বিশেষ করে অন্ধ্রপ্রদেশ, ওরিশা ও বিহারের বহু সি.পি.এম. নেতা নকশাল ধাঁচের আন্দোলনকে সমর্থন করে সি.পি.এম. থেকে বেরিয়ে এলেন। যারা নকশালবাড়ি আন্দোলনকে সমর্থন করলেন তাঁরা সংক্ষেপে নকশাল বা নকশালাইট নামে পরিচিত হলেন। সুশীতল রায়চৌধুরী, নাগি রেড্ডি, নাগভূষণ পট্টনায়ক প্রমুখ বড় বড় সি.পি.এম. নেতারা দল ছেড়ে বেরিয়ে নকশালবাড়ি আন্দোলনকে সমর্থন করলেন।

একদিন অভীকের সাথে সমরের হঠাৎ দেখা। অভীক বলল, ‘নকশালবাড়ি আন্দোলন নিয়ে কি ভাবছেন?’
সমর নির্বিকার ভাবে উত্তর দিল, ‘বিশেষ কিছুই ভাবছিনা। পার্ট-টু পরীক্ষা নিয়েই আমি এখন ব্যস্ত। কলেজে কোন ক্লাশ হচ্ছেনা। তাই নিজেই পড়তে হচ্ছে। ভীষন চাপ পড়ে গেছে’।

রত্নার সাথে মাঝে মাঝে দেখা হয়। দুজনেই পরীক্ষার পড়া নিয়ে ব্যস্ত বলে একসাথে বেড়ানোর অবসর মেলেনা। সামান্য কিছু কথাবার্তা হয় মাত্র। সমরের পরীক্ষার আগে আর দেশের বাড়ি যাওয়া হয়না। কলেজে ক্লাশ না হওয়ায় কলকাতায় লাইব্রেরি ঘুরে ঘুরে পড়াশুনা করতে হয়। মা মাঝে মাঝে বাড়ি যাওয়ার জন্য আবেদন জানান। সমর জানিয়ে দেয় একেবারে পরীক্ষা শেষ করে তারপর বাড়ি যাবে।
সমর আর রত্না দুজনেরই পার্ট-টু পরীক্ষা বেশ ভালই হল। রত্নাকে সমর জানাল এবার বাড়ি চলে যাবে, অনেকদিন মা-বাবার সাথে দেখা হয়না। একদম পার্ট-টুর রেজাল্টের সময় ফিরবে। রত্না বলল, ‘চল একদিন বেশ কিছু ভালো সিনেমা দেখে নেওয়া যাক’। ওরা কয়েকদিনের মধ্যে বেশ কিছু ভালো সিনেমা দেখে নিল। গ্লোব সিনেমায় অড্ড্রে হেপবার্ণ ও গ্রেগরী পেকের ‘রোমান হলিডে’ চলছে। সমর এডভান্স টিকিট কেটে রেখেছে। ঠিক ছিল রত্নার জন্য নিউ মার্কেটের উল্টো দিকে নির্ধারিত জায়গায় যে আগে আসবে সে অপেক্ষা করবে। হাওড়া ব্রীজে ট্র্যাফিক জ্যাম থাকায় ৬ নম্বর বাসটা কিছুটা দেরি করে ফেলল। গ্লোবের কাছে পৌঁছে সমর আঁতকে ঊঠল। সিনেমা আরম্ভ হতে আর মাত্র দশ মিনিট বাকি। রত্না নিশ্চয় রেগে টং হয়ে আছে। হন্ত দন্ত হয়ে নির্দিষ্ট জায়গায় পৌঁছতে অনেক লোককে ধাক্কা মেরে গালাগালি শুনতে হল। রত্না হাওড়া ব্রীজে ট্র্যাফিক সমস্যার কথা মনে রেখা সমরকে একটু আগে রওনা দিতে বলেছিল। সমর বেরোতে দেরি করায় এই বিপত্তি। রত্নার রাগ কি ভাবে ভাঙাবে সেকথা ভাবতে ভাবতে সামনে তাকিয়ে দেখে রত্নার কোনো পাত্তা নেই। তাহলে রত্না কি রাগ করে হলের মধ্যে ঢুকে গেছে! কিন্তু তাও বা হবে কি করে? টিকিটতো সমরের কাছে। সমর ভেতরে ঢুকে কাউন্টারের আসপাশে ঘুরে দেখল। কিন্তু কোথাও রত্নার পাত্তা নেই। এদিকে সিনেমা আরম্ভ হতে চলেছে। অবশ্য প্রথমে ট্রেলার চলবে। আসল সিনেমা আরম্ভ হওয়ার এখনো অনেকটা সময়। রত্না রাগ করে চলে যাবে এটা সম্ভব নয়। আগেও একবার সমর দেরি করে ফেলেছিল। রত্না শেষ পর্যন্ত অপেক্ষা করেছিল। হয়ত কোথাও রত্না আটকে পড়েছে।

যাই হোক সমরত একা একা সিনেমা দেখতে পারেনা। রত্নার সেরকম দেরি হলে আজ না হয় টিকিট দুটো নষ্ট হবে এবং পরে একদিন সিনেমাটা দেখা যাবে। তাই সিনেমা হলে ঢোকার সময় অতিক্রান্ত হওয়ার পরও সমর রত্নার জন্য অপেক্ষা করতে থাকল। সমর নিশ্চিন্ত মনে চলমান যানবাহন আর জনস্রোত দেখতে থাকল। এক মেম আর সাহেব চলেছে ছোট বাচ্চা সঙ্গে করে। বাচ্চাটা মিষ্টি ইরেজীতে মা-বাবাকে অনর্গল প্রশ্ন করে চলেছে। কি সুন্দর বাচ্চাটা! একটা এমব্যাসেডর গাড়ির বনেটে হেলান দিয়ে সুন্দরী পাঞ্জাবী মহিলা কাপ থেকে তুলে তুলে আইসক্রীম খাচ্ছে। জরির কাজ করা ফিকে সবুজ স্বচ্ছ শাড়ির নিচে ফুলকাটা ঘীয়ে রঙের ব্লাউজ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ফর্সা রঙ, উন্মুক্ত কোমরে কিছু মেদাধিক্য। অপূর্ব দেখতে মহিলাকে।
বাইরে সন্ধ্যা নামছে। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে সমর চমকে ওঠে। আরতো অপেক্ষা করার কোনো মানে হয়না। রত্না তাহলে আজ আর আসবেনা। ও তো ভুলে যাওয়ার মেয়ে নয়। তাহলে নিশ্চয় ইচ্ছা করেই আসেনি। সমরের হঠাৎ মনে হতে থাকে কয়েকদিন যাবত রত্নার মধ্যে কেমন যেন একটা এড়িয়ে যাওয়ার ভাব লক্ষ্য করেছে। তাহলে রত্না কি অন্য কোনো ছেলের প্রেমে পড়েছে। রাগে দুঃখে সমর কি করবে ভেবে পায়না। এলোমেলো হাঁটতে থাকে। এভাবে একসময় সামনে একটা হাওড়ার বাস পেয়ে উঠে পড়ে।

সমরের রাত্রে ভাল ঘুম আসেনা। রত্নার সঙ্গের টুকরো টুকরো স্মৃতি ভেসে ওঠে। রত্নাকি সমরকে নিয়ে খেলা করল! কিন্তু রত্নাকে দেখে কোনোদিনতো এমন মনে হয়নি। তাহলে কি অন্য কোনো কারণে রত্না আসতে পারেনি। হয়তো বাড়িতে কোনো আত্মীয় হঠাৎ এসে পড়েছে অথবা বাবা-মা কেউ হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। এসব নানা সম্ভাবনার কথা ভাবতে ভাবতে সমর ভোরের দিকে ঘুমিয়ে পড়ে। দিদির ডাকে ঘুম ভাঙল। দেয়াল ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখে ৯টা বেজে গেছে। বাইরে ঠা-ঠা রোদ। সারা শরীরে ম্যাজম্যাজে ভাব। উঠতে একদম ইচ্ছা করছেনা। দিদি বললেন, ‘সমর, তাড়াতাড়ি উঠে পড়্। তোর কলেজের একটা মেয়ে গাড়ি নিয়ে এসেছে, বলছে তোকে ভীষন দরকার’।

সমর তাড়াতাড়ি উঠে পড়ে। মনে আশা জাগে রত্না হয়ত কাল আসতে পারেনি বলে আজ ওর বাবার গাড়িটা নিয়ে জানাতে এসেছে। সমর বাইরের ঘরে এসে সোফার উপর শিলাকে বসে থাকতে দেখে অবাক হয়ে যায়। শিলা সমরকে দেখেই সরাসরি বলে, ‘তাড়াতাড়ি রেডি হয়ে নিন, আমার সাথে এখনি বেরোতে হবে’। সমর অবাক হয়ে প্রশ্ন করে, ‘কেন?’
শিলা বলে, ‘রত্নাদির শরীরটা হঠাৎ খারাপ হয়ে পড়েছে’।
সমর উৎকণ্ঠার সাথে বলে, ‘কোন এক্সিডেন্ট হয়েছে নাকি?’
‘না না, শরীরটা হঠাৎ একটু খারাপ হয়েছে। রেডি হয়ে আসুন, গাড়িতে বসে সব বলছি’।
সমর তাড়াতাড়ি বাথরুমে চলে যায়। নানান দুশ্চিন্তা সমরকে বিব্রত করে তোলে।
গাড়িতে বসে সমর শিলাকে প্রশ্ন করে ‘ঠিক কি হয়েছে বলত?’

শিলা বলে, ‘আমিও সঠিক জানিনা। কাল সন্ধ্যার দিকে রত্নাদি ফোন করে জানাল আপনার সাথে যোগাযোগ করে আজ যদি আপনাকে ওদের বাড়ি নিয়ে যেতে পারি তাহলে খুব ভালো হয়। আমি রাজি হয়ে যাই। কারণ জানতে চেলে বলল যে কাল নাকি আপনার সাথে সিনেমায় যাওয়ার কথা ছিল। বেরোনোর সময় হঠাৎ পায়ে খুব ব্যথা হতে থাকে। হাঁটতে ভীষণ অসুবিধা হতে থাকে। আপনাকে জানানোর কোন উপায় না দেখে সন্ধ্যার দিকে আমাকে ফোন করে সব জানায়। আরো বলেছে আপনি যেন কোন চিন্তা না করেন। ডাক্তার দেখে বলেছে পায়ের কাফ মাস্লে ক্র্যাম্প হয়েছে। কয়েকদিন বিশ্রাম নিলেই সব ঠিক হয়ে যাবে’।
‘আমার দিদির বাসা চিনলে কি করে?’
‘রাস্তাটার কথাতো আপনার কাছেই শুনেছিলাম। রাস্তার মোড়ের রেশন দোকানে আপনার জামাইবাবুর নাম বলতেই ওরা বাসাটার হদিস জানিয়ে দিল’।

সংকীর্ণ জি.টি. রোদ দিয়ে গাড়ি খুব জোরে চালান সম্ভব হচ্ছিলনা। তাই সমরের উৎকণ্ঠা বেড়েই চলেছিল। সমর ভাবছিল কখন রত্নাদের বাড়ি পৌঁছবে। আবার ভয় হচ্ছিল ওখানে গিয়ে কি জানি কি দেখবে। শিলা কি সত্যি কথা বলেছে! না কি রত্নার কোন এক্সিডেণ্ট বা অন্য কোন বড় কিছু অসুখ হয়েছে। হাওড়া ব্রীজ পেরিয়ে শিলা বলে, ‘এরপর আর আমি কিন্তু চিনিনা। এবার বলে দিন কিভাবে যেতে হবে’।
সমর শিলাকে বাঁদিকে গাড়ি ঘুরিয়ে স্ট্র্যান্ড রোডে ঢুকতে বলে। স্ট্র্যান্ড রোডে বেজায় ভিড়। মালবাহী কুলিরা সব মাথায় বস্তা নিয়ে এদিক ওদিক চলেছে, কোথাও বা রাস্তার মাঝে লরী দাঁড় করিয়ে মাল নামানো হচ্ছে।

ওরা অবশেষে রত্নাদের বাড়ির সামনে এসে পৌঁছয়। সমরের বুক দুরু দুরু করতে থাকে। শিলা রাস্তার পাশে একটা প্রসস্ত জায়গা দেখে গাড়ি গ্যারেজ করায়। সমর এতক্ষণ  চোখ বন্ধ করে ছিল। চোখ মেলতেই রত্নাকে দেখতে পায়। বাইরের বারান্দায় চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে ওদের দিকে চেয়ে মিটি মিটি হাসছে। সমরে মনের সব ভয় আর উৎকণ্ঠা নিমেষে কেটে যায়।

রত্নাদের চাকর দরজা খুলে দেয়। ওর মাও এগিয়ে আসেন, বলতে থাকেন, ‘মেয়েটার যে হঠাৎ কি হয়ে গেল? কাল দুপুর পর্যন্ত সম্পূর্ণ সুস্থ ছিল’।
রত্নার মা সমরদের নিয়ে দোতলায় যান, বড়ঘরটার মধ্যদিয়ে বারান্দার কাছে আসতেই রত্না হাসিমুখে ওদের অভ্যর্থনা জানায়। উঠে দাঁডিয়ে খোঁড়াতে খোঁড়াতে ওদের দিকে এগিয়ে আসে আর তারপর দেয়ালে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে যায়। শিলা রাগ করে বলে, ‘তোমাকে উঠতে কে বলেছিল?’ তারপর রত্নাকে ধরে চেয়ারে বসিয়ে দেয়। রত্না একটু ম্লান হেসে মৃদু স্বরে শিলাকে ধন্যবাদ জানায়। সমর উৎকণ্ঠার সাথে বলে, ‘তোমার কি হয়েছে?’

রত্না হেসে বলে, ‘তেমন কিছুই না। মাস্ল এ একটু টান ধরেছে। ডাক্তার বলেছে দু-চারদিন বিশ্রাম নিলেই সব ঠিক হয়ে যাবে’।
সমরের কয়েকদিন আগের একটা ঘটনার কথা মনে পড়ে যায়। হাঁটতে হাঁটতে রত্না সেদিন বলেছিল ওর পায়ের নিচের দিকে একটা চিনচিনে ব্যথা করছে, হাঁটতে ভীষণ অসুবিধা হচ্ছে। সমর বলেছিল, ‘আজ খুব বেশি হাঁটাহাঁটি করার জন্য মনে হয় এমন হচ্ছে’। রত্নাও সমরের কথায় সায় দিয়েছিল। ব্যাপারটাকে বিশেষ গুরুত্ব দেয়নি। তাহলে তখন থেকেই কি রত্নার পায়ের ব্যাধির সূত্রপাত; রত্নাকি সেদিনের কথা মনে রেখে ডাক্তারকে সব জানিয়েছে? সমরের মুখে দু;শ্চিন্তার রেখ দেখা দেয়।

শিলা সমরের মুখের অবস্থা দেখে হেসে বলে, ‘দেখ রত্নাদি তোমার অসুস্থতার কথা ভেবে সমরদা কেমন হয়ে পড়েছে! একেই বলে ভালোবাসা’।
রত্না কপট রাগ দেখিয়ে বলে, ‘তোর গালে মারব কসে একটা থাপ্পড়’।

ওরা দুজনে হো-হো করে হাসতে থাকে আর সমর লজ্জা পেয়ে মুখ নিচু করে।

ওরা রত্নাকে ধরাধরি করে নিয়ে বাইরের ঘরে গিয়ে বসে। শিলা বলে, ‘সমরদা এত সামান্য ব্যাপারে ঘাবড়ে গেলেন কেন? এরকম মাস্ল পেইন সবারই কমবেশি হয়ে থাকে আবার নিজে থেকেই সেরে যায়। সেবার বাথরুমে পড়ে গিয়ে আমার কোমরে কি ব্যথা! বাড়ির সবাই ব্যতিব্যস্ত হয়ে আমার আপত্তি সত্বেও এক্স-রে করালেন। কিছুই পাওয়া গেলনা আর ব্যথাও দু চার দিন বাদে সম্পূর্ণ সেরে গেল’।
রত্না বলল, ‘আজ তোমরা দুজন এখানেই খাওয়া দাওয়া করবে। শিলা তুমি ফোন করে বাড়িতে জানিয়ে দাও আর সমর তুমি কি দিদির বাড়িতে জানিয়ে এসেছ?’

‘হ্যাঁ বলে এসেছি এক সহপাঠিনী খুব অসুস্থ, দুপুরে হয়ত ফিরতে পারবনা’।

রত্না খুশি হয়ে বলল, ‘তাহলেত আর কোন সমস্যাই থাকলনা’।

রত্নার মা চা আর মুড়িমাখা নিয়ে এলেন। উনি প্রথমে লুচি-তরকারি দিতে চেয়েছিলেন কিন্তু সমর আর শিলা দুজনেই লুচির বদলে মুড়িমাখা খেতে চেয়েছে। চা মুড়ি খেতে খেতে আড্ডা জমে ওঠে। গল্প করতে করতে সমরের মনের সব উৎকণ্ঠা কেটে যায়। গ্রামোফোন চালিয়ে ওরা অনেক গান শোনে। দুপুরের খাওয়ার পর ওরা কিছুটা বিশ্রাম নিয়ে আবার আড্ডা জমায়। বিকেলের দিকে শিলা সমরকে গাড়ি করে পৌঁছে দেয়।
সমর বাড়ি যাওয়ার আগে একটা ভালো টিউশনি পেয়ে যায়। ফার্স্ট ইয়ার অনার্সের ছাত্র, মৌলানা আজাদ কলেজে পড়ে। তাই দেশের বাড়িতে সপ্তাহ খানেক কাটিয়ে আবার কলকাতা ফিরে আসে।

রত্নার পায়ের ব্যথা দিনের পর দিন বেড়ে চলতে থাকে। প্রথম দিকে অমানুষিক সহ্যশক্তি দিয়ে ব্যাপারটাকে চেপে রেখেছিল। বাবা-মা ও সমরকে বিব্রত করে তুলতে চায়নি। সমর অবশ্য বলে ছিল ভালো কোন বিশেষজ্ঞ ডাক্তার দেখাতে। রত্না উত্তরে বলেছিল, ‘তোমার একটুও ধৈর্য নেই। দুদিন সবুর কর, এমনিই সেরে যাবে। এখন ডাক্তার ডাকলে পরে তোমরাই আমাকে নিয়ে হাসাহাসি করবে’।

কিন্তু আর যে সহ্য করা যায়না। ব্যথাটা ধীরে ধীরে উপর দিকে উঠছে। হাঁটুর চাকতি ছাড়িয়ে কুঁচকির দিকে এগিয়ে চলেছে। একটা বিষাক্ত পোকা যেন বিষ ঢেলে দিতে দিতে পা বেয়ে উপরের দিকে উঠছে। মাঝে মাঝে পায়ের আঙ্গুলগুলো অসাড় হয়ে আসে। অনেকক্ষণ পা চেপে বসে থাকলে যেমন ঝিঁঝিঁ ধরে অনেকটা সেরকম। রাতের দিকেই ব্যথাটা প্রকট হয়ে ওঠে। সারারাত ব্যথায় ঘুম আসেনা। দিনের বেলা ব্যথা কিছুটা কমে আসলে রত্না ঘুমিয়ে পড়ে। এ অবস্থায়ই রত্না একদিন সমরের সাথে দক্ষিণেশ্বর বেড়াতে গেল। রত্না মিথ্যে করে বলল যে তার পায়ের ব্যথা অনেক কমে গেছে। যথা সম্ভব পা সোজা রেখে হাঁটছিল রত্না। রত্নার কথা বিশ্বাস করে সমর অনেকটা দুঃশ্চিন্তা মুক্ত হল।

দক্ষিণেশ্বরে পঞ্চবটীর কাছে ওরা গঙ্গার ধারে একটা বেঞ্চে বসল। পঞ্চবটীর কাছে হনুমানগুলোকে ঘিরে লোকেদের জটলা, সবাই কলা, ছোলা, কপির টুকরো ছুঁড়ে দিচ্ছে আর হনুমানগুলো তা নিয়ে কাড়াকাড়ি করছে। ছোট বাচ্চা কোলে মেয়ে হনুমানগুলোও গাছ থেকে নেমে এসেছে। খাওয়ার সংগ্রহ করতে পারলে বাচ্চাগুলোকে আগে খাওয়াচ্ছে। সামনে গঙ্গা দিয়ে ছোট ছোট নৌকা দাঁড় বেয়ে চলেছে। কখনোবা জলে ঢেউ তুলে জল-পুলিশের স্পীডবোট ছুটে যাচ্ছে।

এখন ভাঁটার সময়। জল অনেকটা নেমে গেছে। স্নানার্থীরা কাদার মধ্য দিয়ে গিয়ে গঙ্গা স্নান সারছে, বোতল আর কলসিতে করে পবিত্র গঙ্গাজল সংগ্রহ করছে। নির্বাক বসে ওরা অনেকক্ষণ কাটিয়ে দিল। বিকেল শেষ হতে চলল। সূর্য ওপারের ঘরবাড়ির আড়ালে মুখ লুকিয়েছে। ‘চল এবার ফেরা যাক’ বলে সমর উঠে দাঁড়াল। রত্না ঊঠতে গিয়ে আবার ধপ করে বসে পড়ল। ওর পা দুটো যেন পাহাড়ের মত ভারি হয়ে গেছে। সমর ফিরে দেখে রত্না দাঁতে দাঁত চেপে অসহ্য যন্ত্রণা সহ্য করে উঠে দাঁড়ানর চেষ্টা করছে। সমর ওর কাছে ছুটে এসে ওকে বসিয়ে দেয়। বুঝতে পারে রত্না সব মিথ্যে বলেছে। ওর পায়ের ব্যাধী সারাত দূরের কথা অনেক বেড়ে গেছে। কিন্তু এখন সে বিষয়ে তর্ক করার সময় নয়। সমর রত্নাকে বেঞ্চে বসিয়ে দিল। দুজন মহিলা এসে দাঁড়িয়েছেন। সমরকে প্রশ্ন করলেন, ‘মেয়েটার কি হয়েছে?’ সমর সংক্ষেপে বলল, ‘পায়ে ব্যথা, হাঁটতে পারছেনা। আপনারা দয়াকরে একটু লক্ষ্য রাখুন। আমি ট্যাক্সি ডেকে আনছি। আপনাদের সময় আছেত?’

‘সে কি বলছ ভাই। একটা মেয়ে অসুস্থ হয়ে পড়েছে আর আমরা ব্যস্ততা দেখিয়ে কেটে পড়ব! তুমি নিশ্চিন্ত মনে ট্যাক্সি ডেকে আন। আমরা ওকে ট্যাক্সিতে তুলে দিতে সাহায্য করব’।

সমর মনটাকে শক্ত করে। এখন নার্ভাস হলে চলবেনা। যে করে হোক রত্নাকে বাড়ি পৌঁছে দিতে হবে’। ট্যাক্সি ওদের বসার জাযগা থেকে অনেকটা দূরে দাঁড়ায়। কিন্তু ভদ্রমহিলা দুজন থাকায় রত্নাকে ট্যাক্সিতে তুলতে বিশেষ অসুবিধা হয়না। ওঁরা একজন আহীরিটোলা ও একজন শ্যামবাজার থাকেন। তাই ওরাও সমরদের সাথে আসেন। এমনকি সমর ও রত্না আপত্তি করা সত্বেও রত্নাদের বাড়ি পর্যন্ত আসেন। তবে রত্না পীড়াপীড়ি করা সত্বেও বাড়ির ভিতর আর যান না।

রত্নার বাবা অবস্থা দেখে বিখ্যাত ডাক্তার ব্যানার্জীকে ফোনে কল করেন। ডাক্তারবাবু প্রাথমিক পরীক্ষার পর জানালেন, ‘বাইরে থেকে বিশেষ কিছু বোঝা যাচ্ছেনা। আমি আপাততঃ ব্যথা কমার একটা ওষুধ দিচ্ছি। এক্স-রে ও অন্যান্য কিছু টেষ্ট করাতে হবে, সব লিখে দিচ্ছি। দুএকদিনের মধ্যে সব টেষ্ট করিয়ে রিপোর্টগুলো আমার কাছে পাঠিয়ে দেবেন। তারপর আমি পরবর্তী চিকিৎসা কি হবে তা ঠিক করব’।
রত্নার বাবা-মার দিকে চেয়ে ডাক্তারবাবু বললেন, ‘আসলে আপনাদেরই এতদিন ব্যাপারটা নেগলেক্ট করা উচিত হয়নি, প্রথম থেকেই আমাকে বা অন্যকোন ভালো ডাক্তারকে দেখানো উচিত ছিল’।

রত্নার মা বললেন, ‘আমরা কি করে বুঝব বলুন। মেয়েত বলে ব্যথা সেরে গেছে। আর এখন কলেজে ক্লাশ না থাকায় ওকে বাইরেও যেতে হয়না তাই আমাদেরতো বোঝার কোনো উপায় ছিলনা যে অসুখটা এতদূর গড়িয়েছে’।

ডাক্তারবাবু বললেন, ‘এখন আর পুরোনো কাসুন্দি ঘেঁটে কোনো লাভ নেই। দ্রুত চিকিৎসা করতে হবে। পারলে কালকের মধ্যেই সব টেষ্টগুলো করাতে দিন। রিপোর্ট পেতে পেতে পর্শুদিন হয়ে যাবে। রিপোর্ট হাতে পেয়েই আমাকে দেখাবেন’।

ডাক্তারবাবু চলে যেতেই রত্নার মার সমরের দিকে নজর পড়ল, ‘তোমারত ফিরতে অনেক দেরি হয়ে যাচ্ছে। আমি তাড়াতাড়ি কিছু করে দিচ্ছি, তুমি খেয়ে তাড়া তাড়ি ফিরে যাও। তোমার দিদি চিন্তা করবেন’।

যাওয়ার সময় রত্না ম্লান হেসে বলল, ‘তুমি সাবধানে যাবে। আমাকে নিয়ে চিন্তা কোরোনা। ভালো চিকিৎসা হচ্ছে। এবার তাড়াতাড়ি সেরে উঠব’।
প্রাথমিক প্যাথলজিক্যাল রিপোর্টগলো পাওয়ার পর ডাক্তার ব্যানার্জী কয়েকজন সহকর্মীকে পরামর্শ দানের জন্য ডেকে আনলেন। এক সপ্তাহের বেশি সময় ধরে ডাক্তাররা রত্নার উপর নানান পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালালেন। বারবার এক্সরে, থুথু, মল-মূত্র পরীক্ষা করেও ডাকসাইটে চিকিৎসকরা রত্নার অসুখ ধরতে পারলেননা। এলোপাথাড়ি ওষুধ ইঞ্জেকশান বিরামহীন ভাবে চলতে লাগল। রত্না মুখে বলে ব্যথা কমছে, কিন্তু ব্যথা ক্রমাগত বেড়েই চলল। অসাড়তা পায়ের পাতা ছাড়িয়ে ধীরে ধীরে উপর দিকে উঠছে।

ডাক্তারদের কথা থেকে সমর বুঝতে পারল যে এ পর্যন্ত কোনো ডায়াগনসিসই করা সম্ভবপর হয়নি। সব দেখে সমরের মন ডাক্তারদের উপর বিষিয়ে উঠল। একটা সহজ অসুখ ব্যাটারা ধরছে পারছেনা। ওদের বিদেশি ডিগ্রিগুলো সব পুড়িয়ে দেওয়া উচিত।

রত্নার বাবা-মা একদম ভেঙ্গে পড়েছেন। আত্মীয়-স্বজনদের পরামর্শমত হোমিওপ্যাথী, কবিরাজী, তাগা-তাবিজ সব কিছু চেষ্টা চালাচ্ছেন। কিন্তু কিছুতেই কিছু হচ্ছেনা, কেউ অসুখটা ধরতে পারছেনা। এদিকে রত্নার শরীরের ব্যথা ক্রমাগত কোমর ছাড়িয়ে উপরে উঠছে। রত্না সম্পূর্ণ সয্যাশায়ী হয়ে পড়েছে। বিছানায় পাশ ফিরতেও কষ্ট হয়। ঘুমও পায় খুব। তন্দ্রার ঘোরে রত্না অনুভব করে সেই বিষাক্ত পোকাটা হাজার হাজার পা মেলে শরীর বেয়ে ক্রমাগত উপরে উঠছে। ধেয়ে চলেছে মস্তিষ্কের দিকে। রত্না আগে ভয় পেত, কিন্তু এখন ব্যাপারটা কেমন গা সওয়া হয়ে গেছে। যন্ত্রণার বদলে এখন অসাড়তাই বেশি বোধ করে।

রত্না একদিন দুর্বল হাতে সমরের হাত চেপে ধরে বলে, ‘শিলা মেয়েটা খুব ভালো, ও কিন্তু তোমাকে খুব ভালোবাসে’।

সমর বলে, ‘এসব কথার মানে কি?’

রত্না ম্লান হেসে বলে ‘কোনো মানে নেই। এমনি মনে হল তাই বললাম’।

সমরের মনটা হঠাৎ খুব খারাপ হয়ে যায়। মুখে কথা সরেনা। রত্নার রুগ্ন হাত ধরে চুপচাপ বসে থাকে।

একদিন রত্নাদের বাড়িতে ঢুকতে গিয়েই সমর থমকে দাঁড়িয়ে পড়ে। বাইরের ঘরে বসে দুজন ডাক্তার রত্নার অসুখ সম্বন্ধে আলোচনা করছেন। সমর দরজার বাইরে আড়ি পেতে ওঁদের কথপোকথন শুনতে থাকে। ওঁরা অনেক পরীক্ষা করে রত্নার ব্যাধির আসল কারণ খুঁজে পেয়েছেন। রত্নার অসুখ কোন জীবানু বা বাইরের অন্যকোন কারণ ঘটিত নয়। শরীরে কি একটা অত্যাবশ্যক উপাদানের জন্মগত অভাবের জন্য রত্নার নার্ভগুলো সব অসাড় হয়ে যাচ্ছে। অসাড়তা ধীরে ধীরে মেরুদণ্ড আর মস্তিস্কে ছড়িয়ে পড়বে। ওকে বাঁচানো অসম্ভব। রত্না যে এত বয়স পর্যন্ত এই ডেফিসিয়েন্সি নিয়ে কি করে বেঁচে ছিল সেটাই বিস্ময়ের ব্যাপার।

এ কি শুনছে সমর! না না, সব মিথ্যা। অপদার্থ ডাক্তারগুলো রোগ ধরতে না পেরে যা তা বলছে। সব ওদের মনগড়া ধারণা। নিজেদের অক্ষমতা ঢাকতে মিথ্যা অজুহাত খাঁড়া করা। সমরের মনে হয় ছুটে গিয়ে দরজার খিল দিয়ে বাড়ি বসিয়ে দেয় ডাক্তারগুলোর মাথায়। মাতালের মত টলতে টলতে বেরিয়ে আসে রত্নাদের বাড়ি থেকে।

নিমতলা ঘাটের সামনে ফুলে ঢাকা দেহটার দিকে তাকাতে গিয়েও সমর তাকাতে পারেনা। আচম্বিতে স্ট্র্যাণ্ড ব্যাঙ্ক রোড ধরে দিশাহীন ভাবে ছুট লাগায়। শিলা চিৎকার করে ওঠে, ‘দিব্যন্দু ওকে ধর, নাহলে ট্রাকে চাপা পড়বে’। দিব্যেন্দু ছুটে এসে সমরকে চেপে ধরে। শিলা, মিলি আর দিব্যেন্দু সব সময় ওকে নজরে রাখে। শবদাহ শেষ হওয়ার পর সবাই গঙ্গায় স্নান সেরে নেয়। তারপর শিলার গাড়িতে করে শিলা আর দিব্যেন্দু  সমরকে দিদির বাড়ি পৌঁছে দেয়।

সমর দেশের বাড়ি ফিরে চলেছে। টিউশনিটা এক বন্ধুকে দিয়ে দিয়েছে। সমর অনেক অনেক দূরে পালিয়ে যেতে চায়।

Next: Chapter 5 >

Previous: Chapter 3 >


Dr.Ratan Lal BasuRatanlal Basu, Ph.D. (Economics) is an ex-Reader in Economics and Teacher-in-Charge, Bhairab Ganguly College, Kolkata, India. Dr. Basu has written & edited several books on Economics.

Apart from his passion for the field of Economics, Dr. Basu's other interests are Boxing & Small Game Hunting (gave up the nasty games during college life); Swimming in Turbulent Rivers (physically impossible now); Himalayan Treks, Adventure in Dense Forests, Singing Tagore Songs and also writing travelogues and fiction in Bengali and English.

Dr. Ratan Lal Basu can be reached at rlbasu [at] rediffmail.com.