বন্দী মগন - তাপসকিরণ রায় | Bondi Magan (Entrapped Magan) Bengali Short Story for Young Adults by Tapas Kiran Ray

Tapas Kiran RoyThe Bengali short story Bondi Magan by Tapas Kiran Roy for teens and tweens (but equally enoyable by adults) is presented in Unicode Bangla font. Roy is writing for a couple of years now and he has been published across various online Bengali magazines including Ichchamati, Joydhak, Diala Kochikancha, Banglalive, Tilottama Bangla, Madhukari, Parabaas and our own WBRi Online Bengali Magazine. The author can be reached at tkray1950 [at] gmail [dot] com.

Read all about Tapas Kiran Roy in a short biography of the author.

You can send your stories, poems and creative writing for publication in our online magazine section by e-mail to submissions@washingtonbanglaradio.com.



বন্দী মগন

তাপস কিরণ রায়


মগনদের ঘর এলাহাবাদের ছোট এক গলিতে।ক’দিন আগেই তার বাবা মারা যায়।এখন ঘরে মাত্র দুটি প্রাণী--মগন ও তার মা।বাবা দু বেলা কোন মত তিন পেট চালাবার জন্যে কুলি,মুটেগিরি করত।

ওদের ঘর ঝুপড়ি ঘর।অনেক দিন আগে সরকারী জমির ওপর বিশ পঁচিশ ঘর লোক ঝোপড়ি  ঘর বানিয়ে বসবাস শুরু করেছিল।আজও পর্যন্ত ওদের কেউ উত্খাত করে নি।নিয়মমতো নাকি সরকারী জমি দখলকারী গরীবের জমির ওপর হক বসে।অবশ্য এর একটা সময় থাকে--নির্দিষ্ট দীর্ঘ একটা সময়ের পরে সে জমির ওপর গরীবের বসবাসের হক জন্মায়।মগনদের ঘরও অনেকটা তেমনি।

মগন ক্লাস ফাইভে পড়ে।সরকারী স্কুলে।বইপত্র বন্ধু বান্ধবদের কাছ থেকেই যোগার করে নিয়ে পড়া লেখা চালাতে হয় তাকে।
এত কাল এমনি চলছিলো।বাবা মারা যাবার পরে পেট আর চলে না।মগন কি করে দুটো পয়সা রোজগার করবে তাও বুঝে উঠতে পারে না।দু দিন একটা দোকানে কাজ করছিল।কিন্তু কাজকর্ম ওর নাকি বেশ ঢিলা।সে জন্যে বয়সের বিচার না করেই দোকানদার মালিক ওকে ছাড়িয়ে দিয়েছে।

বাবা মারা যাবার ক’দিন পরেই পাশের বাড়ির মদন ভাইয়ার মোবাইলে মগনের এক কাকার ফোন এলো। কাকা জানতে পেরেছিল,তার দাদার মৃত্যু সংবাদ।কিন্তু বিশেষ কারণে মগনদের  বাড়ি আসতে পারে নি।মগন এখন কি করে?যদি সম্ভব হয় তাকে যেন কাকার কাছে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।কোন না কোন কাজের ব্যবস্থা এখানে হোয়ে যাবে।

মগনের মা মোবাইল ধরে ছিল।দেওরের ফোন ছিল।মধ্য প্রদেশের জবলপুরের ঠিকানাও দিয়ে দিয়েছে--মগন তার খাতায় তা লিখে নিয়েছে।

ক’হপ্তা বিনা কাজে থাকার পর মগন ঠিক করল কাকার কাছে গিয়ে কিছু একটা কাজ করা যাক।মায়ের আপত্তি ছিল,এত ছোট ছেলে এত দূরে যাবে কি করে!কিন্তু কিছু দিন যাবার পরে অগত্যা ঠিক হল মগন তার কাকার কাছে যাবে--অন্তত মা ছেলের পেটে দুটো দানা দেবার মত কিছু তো করতে হয়!মগন একদিন মাকে জানিয়ে ট্রেনে চড়ে বসলো।না,টিকিট কাটার পয়সা সে কোথায় পাবে!হাতে ময়লা,জীর্ণ এক প্লাস্টিক ব্যাগে একটা শার্ট,প্যান্ট পুরে সার্টের পকেটে কাকার জবলপুরের ঠিকানা সঙ্গে নিয়ে সে পারি দিলো মামার ঘরের উদ্দেশ্যে। 

বিনা টিকিটে সে পৌঁছে গেলো জবলপুর।এবার কাকার বাড়ি যেতে হবে।পকেটে তার একটাও পয়সা নেই!যে দুটো টাকা নিয়ে ও বেরিয়ে ছিল,পথে তা দিয়ে এক বেলা কিছু পেটে দিয়ে ছিল।তাতেই খরচা হোয়ে গিয়েছে।পকেট থেকে কাকার ঠিকানা লেখা কাগজটা বের করল।গ্রাম-সুহাগী, আধারতাল, মকান নাম্বার-পাঁচশ আট।ও স্টেশন থেকে বেরিয়ে এক দোকানে জিজ্ঞেস করে নিলো,আধার তাল সুহাগী কত দূর বলে।দোকানদার বলল,‘সে তো অনেক দূর!কম করে সাত কিলোমিটার হবে।তুই অটোতে চলে যা! লাইনের অটো পাবি,বাসও আছে।’

--‘কোন রাস্তায় যেতে হবে?’মগন জিজ্ঞেস করল।

দোকানদার হাত দিয়ে সামনের রাস্তা দেখিয়ে বলল,‘ওই রাস্তা ধরে গিয়ে অটো পেয়ে যাবি।’

রাস্তা ধরে এগোল মগন।দেখল অটোওয়ালা,‘ঘামাপুর, আধারতাল,সুহাগী’,বলে চীল্লাচ্ছিল।ও কি করবে ভাবল।না,পয়সা ছাড়া উঠলে অটোওয়ালা ওকে পিটাবে।ও কেবল খেয়াল করল অটোটা কোন রাস্তা দিয়ে গেলো।ও সেই রাস্তা ধরেই হাঁটতে থাকলো।হেঁটে প্রায় তিন চার কিলোমিটার পার হোয়ে ঘামাপুর এলো,এর পর আধারতাল,আর তার পরে হল সুহাগী গ্রাম।আধারতালের কাছে রাস্তার ফুটপাতে মগন দেখতে পেল একটা লোক বাইক সারাবার কাজ করছে।সঙ্গে তার গাড়ি সারাবার নানা যন্ত্রপাতি রাখা--যে গুলি রাস্তার এক কোনেই রাখা।বড় এক বোতলে লোকটার খাবার জল ভরা রাখা ছিল।সেটা কাত হয়ে রাস্তার কোনাতেই পড়ে ছিল।মগনের আগেই অনেক জল পিপাসা পেয়েছিল,জলের বোতল সামনে দেখে তার যেন আরও,আরও পিপাসা লেগে গেলো।হঠাৎ মনে হল তেষ্টায় যেন তার গলা ভীষণ শুকিয়ে গিয়েছে!ও বাইক সারানোর লোকটাকে জিজ্ঞেস করে বসলো,‘আঙ্কল,একটু জল খাবো?’

লাকটা তীক্ষ্ণ নজরে তাকাল মগনের দিকে,প্রশ্ন করল,‘কোথাকার ছোকরা তুই?’

ওরে বাবা!বড় মেজাজ দেখি লোকটার,তবু মনে ভয় নিয়ে মগন বলল,‘আমি এলাহাবাদ থেকে এসেছি।’

--‘এলাহাবাদ থেকে এখানে!সঙ্গে কে আছে তোর?’কাজ করতে করতেই লোকটা যেন মগনকে জেরা করে চলেছে।

--‘সঙ্গে কেউ নেই,আমি একা’,মগন ধীরে বলল।

কাজ করতে করতেই রুক্ষ গলায় লোকটা আবার বলে উঠলো,‘কোথায় যাবি তুই?’

--‘আমার কাকার বাড়ি,সুহাগী’,মগন বলল।

--‘চিনিস কাকার বাড়ি?জবলপুর আগে কখনো এসেছিস?’প্রশ্নের পর প্রশ্ন করে যেতে লাগলো লোকটা।

--‘না,এখানে আগে আসি নি,কাকাকেও আমি চিনি না’,মগন ওর নিজের সব কথা বলে যেতে থাকলো।

লোকটা এবার হাতের কাজ ছেড়ে দিয়ে মুহূর্তের মধ্যে কি যেন ভেবে নিলো--ওর চোখ দুটো কি ভেবে যেন চকচক করে উঠলো!উঠে আসলো মগনের সামনে।ওকে দেখতে লাগলো ভালো করে--মনে মনে ভাবল,চলবে,একে দিয়ে চলতে পারে।ও জলের বোতল এগিয়ে দিলো মগনের দিকে,বলল,‘অল্প খাবি,তোর কাকার কি নাম বলত?’

মগন বলল,‘নগেন বাছার।’

--‘আরে আরে,ওকে তো ভালো করে চিনি আমি!তবে ও তো কবেই মরে ভূত হোয়ে গিয়েছে’,যেন আনন্দের সঙ্গে কথাগুলি বলে গেলো সামসুল।

প্রায় চীত্কার করে উঠলো মগন,‘কি বলছ তুমি!এক মাসও হয় নি মোবাইলে কথা হয়েছে কাকার সঙ্গে!’

--‘ওই তো হ্যাঁ,তিন সপ্তাহ হবে তোর কাকা,নগেন এক্সিডেন্টে মারা গেছেরে!’

তাড়াতাড়ি এক ঢোক জল খেয়েই মগন ধপ করে রাস্তার ওপর বসে পড়ল। বাইক সারাবার লোকটার নাম সামসুল খান।ও এই এরিয়াতেই থাকে।ওর ওপর দু একটা পুলিশ কেস এখনো লেগে আছে।এক সময় ডাকাতদের দলে নাকি সামিল ছিল।ধরা পড়ে ক’বছর জেল খেটে আর পুলিশের ঠেঙানি খেয়ে শরীরের তাগত অনেক কমে গেছে।তবে হাড়ে হাড়ে শয়তানি বুদ্ধির কমি নেই,ও মগনকে বলল,‘তুই ভাবিস না,আমার কাছে দু দিন থাক,তারপর তোর কাকিমা ওরা ফিরে এলে আমি তোকে পৌঁছে দেবো।’
--‘কাকিমারা কেউ ঘরে নেই?’অসহায়ের মত মগন প্রশ্ন করে।
--‘আরে না,বলছি কি?তোর কাকা মারা যাবার পর ওরা কোথাও গিয়েছে।’কথা কটি বলে থামল সামসুল।শয়তানি বুদ্ধি খেলতে লাগলো ওর মাথায়।আবার বলল,‘তুই ভাবিস না তো,আমার সঙ্গে তুই কাজ করবি,চিন্তা নাই তোর।’
মগনের কান্না পাচ্ছিল খুব।কাকার কাছে এসেছে--কিন্তু সে কাকাও নেই!কখন যেন ওর দু চোখ বেয়ে জল গড়াতে লাগলো।
--‘কান্না থামা ত--ওই পানাটা আমার হাতে দে,আর ওই বাক্স,ওটাকে টুল বক্স বলে,ওটা আমার কাছে এনে রাখ!’ সামসুল যেন  আদেশের সুরে কথাগুলি বলে উঠলো। কিছু করার নেই,মগন ওর কথা মত কাজ করল।আপাতত ওর ঘরেই আশ্রয় নিতে হবে তাকে।পেট মুচড়ে উঠলো ওর, ভীষণ খিদে পেয়েছে।কোন কাজই যেন ও আর করতে পারছে না।মাথা চেপে ও মাটিতে বসে পড়ল।
--‘এই বসে পড়লি যে!বাক্স থেকে ছ নম্বর পানা বের করে দে তো!’আদেশ করল সামসুল।
--‘ছ নম্বর পানা?’বিস্ময়ে তাকাল মগন সামসুলের দিকে।
--‘তোর চোখ দুটো বড়বড় রে!এত বড় চোখ করলে চলবে না--আমার কাছেই তোকে থাকতে হবে--খেতে হবে--বুঝলি?লেপটি মেরে বসে থাকলে তোর মুখে কে খাবার গুঁজে দেবে বল?’
মগন দেখল,লোকটা এখন থেকেই বকাঝকার সুর নিয়ে কথা বলা শুরু করেছে!তবু তাকে শুনতে হবে তার কথা। কটা দিন তো ওর কাছেই কাটাতে হবে।
রাত তখন আটটা বেজে গেছে।মগন ভালো ভাবে চলতে পারছিলো না।ওকে দিয়ে তবু সামসুল অনেক কাজ করিয়ে নিয়েছে।এবার টুল বক্স ওর কাঁধে চাপিয়ে দিলো,‘বলল,চল ঘরে!আধা কিলোমিটার পথ কাঁধে আট দশ কিলো ওজনের বাক্স নিয়ে ধুঁকতে ধুঁকতে কোন মত সে সামসুলের সঙ্গে তার ঘরে এসে পৌঁছল।ঘরের ভিতরে নিয়ে গিয়ে বাক্স রাখল। কেরোসিনের ল্যাম্প জ্বালল সামসুল,বলল,‘রান্নাবান্না জানিস কিছু?’
--‘না।’
--‘কি জানিস তুই,হ্যাঁ?খাওয়া ছাড়া কিছু জানিস না?’ সামসুল বলে উঠলো,‘কাল থেকে তুই রাঁধবি!’
ভয়ে ভয়ে মগন বলে উঠে,‘আমি পারি না যে!’
--‘তোর ঘাড় পারবে,বুঝলি?’সামসুল বলে।
রাতে সিদ্ধ ভাত খেলো দু’জনে।সামান্য কটি ভাতে মগনের পেট ভরল না।খাবারের বেশীর ভাগটা সামসুলই খেয়ে নিয়েছে!পর দিন সকাল হতে না হতে সামসুল মগনকে ধাক্কা মেরে ঘুম থেকে উঠিয়ে দিলো,‘যা,যা,তাড়াতাড়ি যা--ঘরের বাইরে দুটো স্কুটার পড়ে আছে দেখ,বালতি দিয়ে জল এনে ভালো করে সাফ করে ফেল!তারপর এসে রান্না করবি।’
লাইন দিয়ে বাইরের কল থেকে জল এনে স্কুটার ধুলো মগন। মাঝে সামসুল এসে তার গালে এক চড় করিয়ে বলে উঠলো,‘রান্নার কথা এত বলতে হয় কেন রে?রান্না করতে জানিস না--হা ভাতে ছোকরা!’
হাত পুড়িয়ে কোন মত সেদ্ধ ভাল রাঁধল মগন।
বেলা দশটা বাজতেই মগনের মাথায় সামসুল চাপিয়ে দিলো টুল বক্স।মাঝ পথে মগন দুবার থেমে গিয়ে ছিল,শক্তিতে কুলোচ্ছিল না তার--বাক্স ভীষণ ভারী মনে হচ্ছিল তার কাছে।সামসুল সামনে থেকে প্রায় ছুটে এসে টেনে এক চড় কসাল ওর গালে।গালি দিলো।অনেক কষ্টে,টাল সামলাতে সামলাতে গিয়ে সে পৌঁছল সেই কালকের রাস্তার ধারে যেখানে সামসুল বাইক সারায়।মগন দিন ভর লেগে থাকলো কাজে--এটা দে,ওটা দে,গাড়ি তুলে ধর,দোকান থেকে স্ক্রু,নাট কিনে নিয়ে আন—এমনি যাবতীয় ফাই ফরমাস,গালি,সে সঙ্গে থাপ্পড় চড় লেগেই থাকলো ওর ভাগ্যে।মাঝখানে যখন বেলা পড়ে আসছিল,তখন সামসুল পকেট থেকে পাঁচ টাকা বের করে ওকে দিয়ে বলল,‘যা,দু মিনিটে কিছু খেয়ে আয়,আর রাতে খাওয়া পাবি না কিন্তু!’
এমনি চলল,জবরদস্তি মগন সামসুলের  কাছে বন্ধকের মত থাকতে লাগলো।সামসুল তাকে শাসিয়েছে,‘আমি তোকে মারি এ কথা কারো কানে যেন না যায়!আর গেলে কি হবে জানিস তো?’
ভয়ে মগনের মুখ থেকে একটা শব্দও বেরোল না।
ওকে চুপ দেখে সামসুল গালি দিয়ে বলে উঠলো,‘কি হবে বুঝলি না তো?এই যে—’বলে,সে তার হাতের জ্বলন্ত বিড়ি ঠেসে ধরল মগনের গালে।যন্ত্রণায় ছটফট করতে লাগলো মগন,ওর মুখ থেকে চাপা ‘উঁ,আঁ’,শব্দ বেরিয়ে আসতে লাগলো।
মগন এক মাস ধরে সামসুলের বাড়ি পড়ে আছে।ঘরে থাকা কালীন কেউ এলে সামসুল হেসে মগনকে দেখিয়ে বলে, ‘এটা আমার নোকর রে!’বাইরের লোকের সামনে সে মগনের সঙ্গে ভালো ব্যবহারের ভান করে!
সে দিন কোন অপরাধী দলের কেউ সামসুলকে ডেকে পাঠাল।সে মগনকে ঘরে তালা দিয়ে বলে গেলো,‘চুপ করে থাকবি,আমি রাতে এসে তোকে খাওয়ার টাকা দেবো,বুঝলি?’
মগন কাঁদছিল।সারা দিন সে না খাওয়া।এই এক মাসে তার অতি দৈন্য অবস্থা।রোগা--কালো--জিরজিরে শরীর হোয়ে গেছে ওর।গাড়ির কালি ঝুলি গায়ে লেগে থাকে,কোন দিন স্নান করে,কোন দিন করে না--কোন দিন খায়,কোন দিন না খাওয়ার মতই থাকতে হয়।দিন ভর পাঁচ টাকায় কি হয় আজকাল!সারা শরীরে সামসুলের মারের কালশিটে দাগ,গালে,কপালে বিড়ির ছেঁকার দাগ ভরে আছে!আজ বুঝি মগনের মা তার নিজের ছেলেকে দেখেও চিনতে পারবে না!কাঁদতে লাগলো মগন।
মাঝে  একবার ভেবে ছিল পালিয়ে যাবে,রাতে দরজা খুলে দু পা এগিয়ে ছিল,অমনি সামসুল উঠে ওর গলা টিপে  ধরেছিল--দেওয়ালে মাথা ঠুকে দিয়ে ছিল.বলে ছিল,‘তুই,গালি দিয়ে বলে ছিল,আমার নোকর--আজ সারা রাত আমার পা টিপে দিবি,হারামজাদা !’
আজ মার কথা খুব করে মনে পড়ছে মগনের।অন্ধকার ঘরে চুপচাপ বসে আছে ও।কে জানে এতদিন মা বেঁচে আছে কি না!ও আসার সময় মার কাছে একটা পয়সাও ছিল না।মা তার না খেয়েই মরে গেছে হয় তো!
রাত তখন গভীর।মগনের চোখ লেগে আসছিল--এমনি সময় ঘরের দরজার বাইরের দিক থেকে কারা যেন কথা বলে উঠলো।নিশ্চয় সামসুল!ওর সঙ্গে আরও কেউ এলো নাকি?ও কান পেতে শোনার চেষ্টা করল।বাইরে কে জেনো বলছে,‘হারামজাদা,পালিয়েছে!দরজায় তালা লাগানো আছে।’
আর একজন উঁচু স্বরে বলে উঠলো,‘ভাঙ তালা,ঘরে চুরির মাল কিছু আছে কি না দেখ!’আসলে পুলিশ সামসুল খানের খোঁজে এসেছে।কোন চুরি ডাকাতির সঙ্গে জড়িত সন্দেহে তাকে ধরতে এসেছে।
পুলিশ  ঘরের তালা ভাঙ্গল।অন্ধকার ঘরে টর্চ মেরে দেখতে লাগলো।হঠাৎ ওদের চোখে পড়ল ঘরের এক কোণে মগন বসে আছে।পুলিশের একজন ধমক দিয়ে বলে উঠলো,‘কে,কে তুই?’
মগন কাঁদোকাঁদো  গলায় বলে উঠলো,‘আমি মগন।’
--‘কে মগন?সামসুল কোই,বল?’দারগা এসে মগনের এক হাত চেপে ধরে বলে উঠলো।
চুপ করে বসে ছিল মগন।কি ঘটনা,আর কারাই বা এত রাতে এসে তাকে জেরা করছে সে বুঝতে পারলো না।অন্য এক  পুলিশ তাকে কান ধরে টেনে তুলল,বলল,‘এটা সামসুলের দলেরই হবে!’
--‘না,না,না,’কান্নায় ভেঙে পড়ল মগন।
--‘তা হলে কে তুই?’পুলিশ জেরা করতে থাকলো।ওরা ওকে থানায় নিয়ে এলো।
সব বলল,মগন,কাঁদতে কাঁদতে সব কথা পুলিশকে খুলে বলল।
থানার দারগা বুঝতে পারল সব কিছু।মগনকে সামসুল বন্ধকের মত কাজে লাগাচ্ছিল,ওর প্রতি নির্দয়,অমানুষিক ব্যবহার করছিল।
সে দিনেরই শেষ রাতের ঘটনা।সামসুলকে ধরবার জন্যে পুলিশ আবার এসে লুকিয়ে ঘিরে রেখে ছিল তার বাড়ি।রাতের অন্ধকারে সামসুল স্বাভাবিক এলো নিজের ঘরে।ও চমকে উঠলো যখন দেখল ওর ঘরের দরজার তালা ভাঙা। তার মানে মগন পালিয়েছে!তবু অন্ধকারে পা টিপে টিপে সে ঘরের ভিতর ঢুকল,চাপা চীত্কার করে মগনকে ডাকতে লাগলো।ও মনে মনে বলে চলে ছিল,‘তোকে ধরতে পারলে মেরেই ফেলবো আজ,আমার হাত থেকে তুই কথায় পালাবি?’এমনি সময় তিন চারজন পুলিশ মিলে সামসুলকে ঘিরে ফেলল।একজন পুলিশ বলে উঠলো,‘তুই ও আমাদের হাত থেকে পালাতে পারবি না।’
সামসুল আর পালাবে কোথায়?ওর হাতে হ্যান্ডক্যাপ পরিয়ে দিলো পুলিশ।আর থানার লকআপে এনে পুরে দিলো।
পর দিন মগনকে দারগা পৌঁছে দিলো তার কাকার বাড়িতে।কাকাকে দেখতে পেয়েই মগন কান্নায় ভেঙে পড়ল,‘বলল,কাকা,মা বেঁচে আছে তো?’
--‘হ্যাঁ মগন,তোমার মাকে আমি টাকা পাঠিয়েছি।তোমার খোঁজ করছি কত দিন ধরে।এখানকার থানায় রিপোর্ট করেছি।’
মগন কি তার ভাগ্য জোরে বেঁচে গেলো!হয়তো তাই--না হলে এমনি কত মগন কত জাগায় বন্ধক হোয়ে পড়ে আছে।তারা মাথার ঘাম পায়ে ফেলে অনেক অত্যাচারের মধ্যে দিয়ে দু বেলা দু মুঠো খাবার যোগার করতে হিমসিম খেয়ে যাচ্ছে।সামসুলদের মত অমানুষ,অত্যাচারী পাষণ্ডের দল ওদের অসহ্য যন্ত্রণা দিয়ে খলের হাসি হাসছে।

সমাপ্ত