ছোটো গল্প - সংসারের হিসাব নিকাশ - পলাশ দে | Bengali Short Story Life's Balance Sheet - Palash Dey WBRi Online Bangla Magazine

The following is a Bengali short story in Unicode Bangla font written by Palash Dey.

ছোটো গল্প

সংসারের হিসাব নিকাশ

পলাশ দে

আকাশে আজ মেঘ জমেছে।যখন তখন বৃষ্টি হতে পারে।জ্যেষ্ট মাসের প্রখর উত্তাপে গাছের পাকা কাঁঠালের গন্ধ চারিদিক ম-ম করছে।চন্দনা বাড়ীর অলিন্দে দাঁড়িয়ে বাপের বাড়ীর থেকে আসা আমন্ত্রনের প্রতিক্ষায় আছে।পরশু জামায় ষষ্টী বাড়ী থেকে এখনো কেউ এল না।তার উপর এ প্রথম বিয়ের পর জামাষ্টীর পালা।এই আনন্দ আলাদা,প্রত্যেক বাড়ীর জামাইদের এ এক অন্যতম আকর্শনীয় প্রত্যাশা থাকে বিয়ের পর।শশুড় বাড়ী থেকে মেয়ে-জামায়দের অভ্যর্থনার মধ্য দিয়ে নানান ধরনের স্বাধের খাবার, রূচিকর,সুস্বাদু আহার,মিষ্টান্ন থেকে শুরু করে জ্যেষ্ট মাসের পাকা ফল হাতের চেটোতে লেগে থাকা,পাকা আমের রস,আনারসের রস হাতে-মুখে লেপ্‌টিয়ে যেন জামাইকে নিয়ে শশুর বাড়ীতে এক আনন্দের উতসব মেলা মেতে উঠে।এবং এই জ্যেষ্ট মেলা উল্লাসে জামাইয়ের শালা-শালী তো তিল মাত্রও ফাঁক রাখে না আনন্দের জোঁয়ার তুলতে।

কিন্তু এদিকে সময় যত যাচ্ছে চন্দনার মনটা বিষন্ন হয়ে পড়ছে।সে ভাবছে তার বাপের বাড়ীর কথা-চন্দনার বাপের বাড়ীর অবস্তা খুব একটা ভালো না।চন্দনার বাবার সাধারন একটা মুঁদির দোকান।টুক-টাক বেঁচা-কেনা করে যা পায় তাদিয়ে এত বড় সংসারের বোঝা টানা,তা চন্দনার বাবার পক্ষে যে অসাধ্য ব্যপার সে কথা চন্দনা ভালো করেই বোঝে।তবুও একটা প্রত্যাশা রয়েযায়।বাড়ীতে আরও দুটি বোন ও তার একটি ছোটো ভাই আছে।এদের আগাম ভবিষ্যতে কথা চিন্তা করে-করে চন্দনার বাবার যে কী মানসীক পরিস্তিতি তারতম্য ঘটেছে সে কথাও চন্দনা খুব ভালো করেই জানে।তার এই বিয়েটাও খুব কষ্ট করে সেড়েছেন।এর-ওর কাছে ধার করে,ফান্ডের থেকে লোন নিয়ে কোনো মতে বিয়েটি সারানো হয়।আগেও তাদের পড়াশুনার তাগিদে এবং সংসারের ভালো মন্দ করতে গিয়ে বাজারে অনেক টাকা ধার ছিল চন্দনার বাবার।চন্দনার শশুড় বাড়ী থেকে কেশ টাকা দাবী ছিল-প্রায় পঞ্চাশ হাজার টাকা।এই টকা পরে পরিশোধ করবে বোলে চন্দনা বাবা কথা দিয়েছেন।এ-নিয়েও চন্দনার বাবার চিন্তার শেষ নেই।দুটি বোন প্রায় উপযুক্ত,বিয়ের বয়স হয়েছে।একটি ভাই  সে  এখন  অষ্টম  শ্রেনীতে  পড়ছে। চন্দনার তিনজন বোনই গ্রেজুয়েট।দেখতেও সুন্দর,এক দেখায় যেকোনো ছেলের পছন্দ হয়ে যাবে।

এদিকে বাড়ী থেকে কোনো নিমন্ত্রণ বার্তা নাএলে যে জামাই ষষ্টীতে যাওয়া যাবেনা।চন্দনা ভাবছে তার জামাই ও শশুর বাড়ীর কথা, এরাও বা কি বলবে, বিয়ের পর প্রথম জামাই ষষ্টী নাকি পানানো হবে না।এর পাড়ার প্রতিবেশিরাতো এক সপ্তাহ আগের থেকে শুভ যাত্রা শুভেচ্ছা দেওয়া শুরু করেছে।এদের কাছেও মুখ দেখাব কি করে।এক অশিনী সংকেতের ভয় পাচ্ছে চন্দনা।পর মূহুর্তে সে আবার মনকে শান্তনা দিচ্ছে।তা কখন হতে পারেনা।মা যে করে হোক বাবাকে পাঠাবেই; বলবে শিজ্ঞীরি যাও তুমি, এখনো পর্যন্ত বাড়ীতেই বসে আছো।কাল বাদে পরশু জামাই ষষ্টী, জামাই ও তার বাড়ীর লোকেরাইবা ভাববে কী।বিয়ের পর প্রথম জামাই ষষ্টী,কোথায় মাস খানেক আগে থেকেই জানিয়ে রাখতে হয়,তা-না কিনা এখনো গাঁট ধরে বাড়ীতে বসে আছো।এদিকে আমার চন্দনাও মন খারাপ করে ঘর বাইর করছে বাবার আসার প্রতীক্ষায়।এমনিতেই মেয়েটি অল্পতে বিক্ষুব্ধ হয়ে পরে।বেশি কিছু হলে মন ভেঙে বসে থাকে,তার উপর তুমি এত দেরি করছো। তুমি এখুনি যাও,আর বলে এসো কাল বিকেলেই যাতে ওরা এসে পরে।এই সব নানান কথা ভাবছে চন্দনা।এক মূহুর্তের জন্য মনটা শান্তি পায়, আবার যখন  ঘড়ীর দিকে তাকিয়ে দেখে বিকেল পাঁচটা তখন আবার মনটি বিকৃত হয়ে পরে।চন্দনা ভাবছে তার বিয়ের আগের দিন রাত্রির কথা-যখনো   নাকী  বিয়ের  টাকা   জোগাড় হয়নি। বাবা পাগলের মত ঘুরে বেড়াছে, মা হঠাত ফিঠ্‌ হয়ে পরে গেছে।বাড়ীতে রৈ-রৈ অবস্থা।আমার এসব দেখে হাত-পা কাঁপছিল।ভাই ডাক্তার ক’ল করতে গেছিল।রাত্রি তখন সাড়ে-আটটা।বাবা রাত এগোরটার সময় বাড়ীতে আসে।আমাকে বিয়ে দেওয়ার পর সংসারটা চলবে কিভাবে,তানিয়ে বাবার মুখে এক দুশ্চিন্তার ছাপ পড়ছিল।সেদিন আমি বুঝতে পেরেছিলাম যে-“সংসারের হিসাব আর মেয়েদের জীবনের হিসাবের মধ্যে একটা বড় ফারাক আছে।তা বিধাতার খাতায় কোন্‌ হিসাবে লিখা আছে সেটা শুধু মাত্র জানা ছিল না আমার”।বাবা কত হিসাব নিকাশ করছে,একবার বাইরে যাচ্ছে,আবার ঘরে এসে কিসব ভাবছে,আর খাটের উপর বসে কাগজ পত্র নিয়ে কিসব হিসেব করছে।আবার মাঝে মধ্যে মায়ের মাথার কিনারে বসে হাত দিয়ে বুলিয়ে-বুলিয়ে বলছে-চিন্তা করছো কেন আমি যে এখনো আছি।আমি বেঁচে থাকতে তোমার কিসের চিন্তা।চন্দনার বিয়ের টাকা জোগার করেছি।বাইরে এখন প্রায় দশ লক্ষ টাকা ধার রয়েছে সব মিলিয়ে।ওর বিয়ের পর একটু হিসেব করে চলতে হবে আমাদের। এক  জাগায়  একটা পঁচিশ লক্ষ টাকার লটারির টিকিট কাঁটিয়েছি। ভাগ্যক্রমে যদি লেগে তো কথাই নেই।তথাপি তুমি চিন্তা করো না সব ব্যবস্তা হয়ে যাবে। আগে   চন্দনাকে   শুভ-শুভ   বিদায়  দিয়েদি।  তার  পর সংসারের হিসাব নিকাশ নিয়ে মাথা ঘামানো যাবে শান্তি মত। মা    বলতো-তোমার     শরীরটা একদম ভেঙে গেছে। তোমাকে    নিয়েই যত-সব    চিন্তা     জানো।বাবা-মার কথাগুলোকে ধুর-ধার করে উড়িয়ে দিয়ে চলে যেতো।চন্দনা এসব কথা ভাবছে আর,ঝর্‌-ঝর্‌ করে জল পরছে তার আঁখি দিয়ে।বাইরে অন্ধকার হয়ে গেছে,রাত্রি সাতটা বাজে তখন কিছুক্ষনের জন্য চন্দনা ঘরের ভিতর গেলো।হঠাত ঘরের বাইরে গেটের আওয়াজ হওয়ায় চন্দনা দৌড় দিয়ে বাড়ীর বাইরে এসে দেখতে পেলো,চন্দনার বাবা দোয়ারের সামনে দাঁড়িয়ে রয়েছে।চন্দনা দেখেতো আল্লাদে আটখানা।বাবা তুমি;হ্যাঁরে মা আমি।দেরী করে ফেল্‌লাম তাইনা...ক্ষমা করে দিস্‌ আমায়।ভালো আছিস মা।হ্যাঁ বাবা ভালো আছি।তুমি এসোনা ভিতরে...না মা; আমার হাতে সময় কম পড়শু জামায় ষষ্টী,তাই তোকে বলতে এলাম।হঠাত চন্দনার শাশুড়ী-মা ডেকে উঠল চন্দনা...চন্দনা...।আসি মা,বাবা তুমি এসো না বাড়ীতে,কিযেনা তুমি।না রে মা আমার একটু অসুবিধে আছে,তোকে দেখার জন্য মনটা কাঁদছিলো।যা মা তুই আগে শুনে আয়,তোর শাশুড়ী-মা কেন ডাকলো,শুনে আয় যা।আর শোন আমি যে এসেছি বলিস না।তা হলে উনি আবার তোড়-জ়োড় শুরু করবে ভিতরে আসার জন্য।ঠিক আছে,তুমি একটু দাঁড়াও মা-কে বোলে পাঠাছি।আর আমি দেখি কেন ডাকছে।চন্দনা বিদ্যুত গতিতে ছুটে গেল বাড়ীর ভিতর।কি হোলো মা ডাকছেন কেন?

চন্দনার শাশুড়ী-মা চন্দনাকে বোলছে-মারে আমি অনিলকে,(চন্দনার জামাইয়ের নাম)খবর দিয়েছি।তোমার বাপের বাড়ী থেকে ফোন করে ছিলো তোমার কাকা।তোমাকে এক্ষুনিই বাড়ীতে যেতে হবে,তোমার বাবা লাইনে কাটা পড়েছে।তিনি আত্মহত্যা করেছেন।বাইরে তখন প্রবল বাতাস সহ বৃষ্টি নেমেছে...


Palash De - Poet Elocutionist from Assam, IndiaPalash Dey wrote his first poem and a story in school during Class 6.  He is a Central Committee  member of Bishwabanga Sahitya O Sanskriti Sanmelan and a regular contributor to Bengali literary magazines like “Prantik” published by the Nikhil Banga Sahaitya Sabha, Kokrajhar, Assam and a freelancer for some news-papers. Palash Dey lives in Bongaigaon, Assam and can be reached by e-mail at poet77.palash@gmail.com