ডেথ সার্টিফিকেট -(Death Certificate) A Review of the Film By Lipika Ghosh.

w81b4i

ডেথ সার্টিফিকেট -

ম্যাজিক ।চোখের পলকে খুলে যাচ্ছে একটি পাহাড় নদী অরণ্য ঘেরা রাঙা মাটির গ্রাম । যে গ্রামে মানুষদের মুখে আবিলতা নেই । যে গ্রামে এখনও শহুরে সভ্যতার বিষ ঢোকেনি । যে গ্রামের ছোট্ট এক স্টেশনে রামলখন পানি পাঁড়ে । যাত্রীদের তৃষ্ণার জল দান তার কাজ । জল তার বাপ , জলের মধ্যে সে ছোট্ট বেলায় হারানো বাপকে খোঁজে । আর স্বপ্ন দ্যাখে, বলা ভালো কবিতার মতন স্বপ্ন দ্যাখে ।

ম্যাজিসিয়নের অসম্ভব কেরামতির খেলায় ম্যাজিক স্টিকের ‘টাচ’ এ পরতে পরতে খুলে যাচ্ছে এক স্বপ্নের দেশ । পরিচালক রাজাদিত্য ব্যানার্জী পরিচালিত প্রথম বাংলা সিনেমা ‘ডেথ সার্টিফিকেট’ । প্রথম একটি বাংলা সিনেমা যা আসলে এক আশ্চর্য ম্যাজিক । এই বাক্যটি শোনা মাত্র বিশ্বজোড়া বাঙ্গালী অবাঙ্গালী সিনেমা প্রেমী মানুষ রে রে করে উঠবেন আমার ধৃষ্টতা নিয়ে । এত বিখ্যাত সিনেমা পরিচালকের মণি মাণিক্যে ঠাসা আমাদের বাংলা সিনেমার জগৎ । ডেথ সার্টিফিকেট কে প্রথম সেই সিনেমা যা আসলে ‘আশ্চর্য ম্যাজিক’ এই উপমা দেওয়ার ঔদ্ধত্যের জন্য মার্জনা চাইছি না ।বরং দাবী করছি সিনেমাটি দেখুন দর্শকবৃন্দ । আর ভুলে যাওয়া উচিত নয় পরিচালক্ রাজাদিত্য ব্যানার্জির দাদার নাম বাপ্পাদিত্য বন্দ্যোপাধ্যায় , একজন সফল খ্যাতনামা চিত্র পরিচালক । তা সত্ত্বেও একটাই ব্যাখ্যা ‘ডেথ সার্টিফিকেট’ সম্পর্কে দেওয়া যায় - বাংলা সিনেমা জগতে ‘প্রথম এক আশ্চর্য ম্যাজিক’ –‘ডেথ সার্টিফিকেট’ ।“দাদা কে সবাই চেনে , সবাই চেনে ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির …… ‘সবচেয়ে বড় কথা মানুষের দর্শকের এত এক্সপেক্টেশন ছিল দাদার কাছে ন্যাচারালি আমার ওপর একটা চাপ ছিল’ । দাদা বাপ্পাদিত্য বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে যে চাহিদা ছিল দর্শকের তা প্রথম সিনেমা ‘ডেথ সার্টিফিকেট দিয়েই পূরণ করতে শুরু করেছেন ভাই রাজাদিত্য ব্যানার্জী ।

সিনেমা তৈরীর কলা কৌশল নিয়ে চুল চেরা বিশ্লেষণ করুন সিনেমা বিশেষজ্ঞরা । অনুরোধ কড়া সমালোচনা করে ত্রুটি বিচ্যুতি গুলো সামনে আনুন । দাবী একটাই ম্যাজিসিয়নের মায়াজালে আচ্ছন্ন হয়ে থাকবে্ন একাত্তর মিনিট । । ম্যাজিসিয়ন নিজেই দর্শককে মন্ত্রমুগ্ধ করে রাখবেন আবার সেই ঘোর নিজেই ভেঙে দেবেন । রূঢ় বাস্তবের এক রুক্ষ রূপের সামনে দাঁড় করিয়ে দেবেন দর্শককে । যা থেকে দর্শক ছুটে পালাতে চাইবে । যেমন ছুটে পালাচ্ছে, হারিয়ে যাচ্ছে সাবিত্রী এক অনন্ত অজানার দিকে । সাবিত্রী হল সিনেমাটির মুখ্য চরিত্র । আসলে রূঢ় বাস্তবের প্রতীক সে ।একদিকে লাল মাটির গ্রামের প্রকৃতি কন্যা সে । পানি পাঁড়ের বড় সোহাগি বউ । যেমনটা ঠিক হয় খুব প্রান্তিক মানুষের জীবন । কত অল্প চাহিদা , আর তৃপ্তি নিয়ে রুক্ষ প্রকৃতির বুকে জল খুঁড়ে বেঁচে থাকে । অন্যদিকে এই প্রকৃতি কন্যাই বাস্তবের মারে জর্জরিত হয়ে হারিয়ে যেতে চায় অজানায় । রামলখন একটি কাব্যিক চরিত্র । এক অসাধারণ কবিতা । রুক্ষ লাল মাটির দেশকে, তৃষ্ণার্ত যাত্রীকে জল দিয়ে তৃপ্ত করতে চায় সে । পৃথিবী থেকে লুপ্তপ্রায় বস্তু প্রেম আর ভালবাসার প্রতীক সে । রামলখনের ভূমিকায় স্বয়ং পরিচালক রাজাদিত্য বন্দ্যোপাধ্যায় নিজে । গ্রামের দাদু এই দুই এর মেল বন্ধন । বাস্তব আর কবিতার মধ্যবর্তী যোগসূত্র ।

সিনেমাটিতে কোনো স্টার অভিনেতা অভিনয় করেন নি । ডেথ সার্টিফিকেটে অভিনয় করার পর এই সিনেমার অভিনয় দেখে এই সিনেমার অভিনেতা দের স্টার অভিনেতা বলতে বাধে না । দক্ষ পরিচালকের দক্ষতা ধরা পড়ে যখন তিনি স্টার তৈরী করেন ।অথবা তথাকথিত স্টার অভিনেতাদের মধ্যে থেকে তাঁদের

অভিনয়ের এমন দক্ষতা বা গুনাবলী টেনে বের করে আনেন যা আগে দর্শক কখনো দেখেনি । পরিচালকের ভূমিকা জহুরীর । পরিচালকের ভুমিকা ডায়মন্ড কাটারের । কোনটা সাধারন পাথর কোনটা হীরে তা চিনে নিতে ভুল হয় না তাঁর । তারপরের কাজ সেই পাথর কে দক্ষতার সঙ্গে ছেনি বাটালি দিয়ে কেটে কেটে হীরের আসল রূপটি বের করে আনা । বাজারে তখন তা অমূল্যে বিকোয় । ডেথ সার্টিফিকেটের পরিচালক রাজাদিত্য ব্যানার্জীও সেই জহুরী । ডেথ সার্টিফিকেটে ‘দাদু’র ভূমিকায় প্রদীপ ভট্টাচার্য, যাঁর অভিনয় দক্ষতার সঙ্গে আমরা পরিচিত । মূলত তিনি থিয়েটারের লোক । খেলাধুলো সম্পর্কে খুব বেশি ধারনা না থাকলেও এটা চোখে পড়ে বুদ্ধিমান দূরদর্শী কোচ খেলার খুব ক্রুসিয়াল মোমেন্টে অভিজ্ঞ খেলোয়ার কে মাঠে নামান । এক্ষেত্রেও যেন তাই হয়েছে । প্রদীপ ভট্টাচার্য অভিজ্ঞ খেলোয়াড় । উনি জানেন পরিচালকের নির্দেশনার বাইরে আরেকটা জিনিস থাকে তা অভিনেতার নিজস্ব তুরুপের তাস , নিজস্ব মাত্রা । ‘সাবি আমর রামকে হেরালাই নি দেবেই, অকে খোঁজিতে বাহার গেরামে , চলে ……’ একটা খোঁজের শুরুটা দাদু চরিত্রে প্রদিপ ভট্টাচার্যের হাত ধরে । হ্যাঁ ‘ডেথ সার্টিফিকেট’ সিনেমাটি একটি খোঁজ , একটা জার্নি । পরিচালক রাজাদিত্য ব্যানার্জী জহুরীর মত জার্নি শুরুর প্রথম পদক্ষেপ ফেলতে এই চরিত্রটির জন্য প্রদীপ ভটাচার্য কে নিয়েছেন । সাবিত্রীর ভূমিকায় দীপমালা সেনগুপ্ত ।মুখ্য চরিত্র । একবারো যাঁর অভিনয় দেখে মনে হয়না তিনি অভিনয় করছেন । সরল এক কুরমী মেয়ে , রুক্ষ ভূমিতে সজল উপস্থিতি ।স্বামী সোহাগের ছাপ যার মুখে চোখে । যেন পরিচালক ছেনি বাটালি দিয়ে কেটে কেটে গড়েছেন সাবিত্রীকে । চরিত্রটির সঙ্গে মিলেমিশে একাকার দীপমালা সেনগুপ্ত ।এই অভিনেত্রীটির জন্য অপেক্ষা করে ছিল বাংলা সিনেমা । সাবিত্রীর অনন্ত পথে দৌড় বোধকরি অভিনেত্রীরও অভিনয় জীবনের অনন্ত পথে দৌড়ের শুরু । শিবু – গৌতম দাসান্ডি । যার সাইকেলের চাকায় সিনেমার মূল বিষয় খোঁজ তথা জার্নি শুরুর পূর্ব প্রস্তুতি । অভিনয় কি করেছে গৌতম দাসান্ডি ? পরিচালক তাঁকে শিবু চরিত্রটির ছাঁচে ফেলে এমন ভাবে গড়েছেন গৌতম দাসান্ডির একমাত্র পরিচয় হয়ে দাঁড়িয়েছে ‘শিবু’ । রামলখন চরিত্রে অভিনেতা রাজাদিত্য ব্যানার্জী ।

“দাদু তুমি স্বপ্ন দ্যাখো না ?”

আশ্চর্য প্রশ্ন । অদ্ভুত জিজ্ঞাসা । সূর্যাস্তের পর এক মায়াবী বিকেলে নদীর ধারে পাথুরে টিলার ওপর মুখোমুখি বসে গ্রামের দাদু কে প্রশ্ন করে রামলখন । রামলখনের চরিত্রে অভিনয় করেছেন রাজাদিত্য ব্যানার্জী । পরিচালক রাজাদিত্য ব্যানার্জীর প্রথম এবং শেষ প্রেম ‘অভিনয়’ ।মূলতঃ তিনি থিয়েটার ঘরানার মানুষ । নিজের পরিচালিত সিনেমায় অভিনেতা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করলেন তিনি । রামলখন কোনো মানব চরিত্র নয় । একটি আদ্যোপান্ত নিটোল কবিতা । রাজাদিত্য ব্যানার্জী সেই কবিতাকে একটি মানবিক রূপে আত্মপ্রকাশ ঘটিয়েছেন ।কবিতার নাম পানিপাঁড়ে ‘রামলখন’ । কি করে সম্ভব হল এই অসম্ভব ! কবিতা এবং অভিনয় ওতোপ্রতো ভাবে একটা মানুষের মধ্যে জড়িয়ে না থাকলে এই অসাধারণ আত্মপ্রকাশ ঘটত না ।

“স্বপ্ন দ্যাখার কোনো বয়স আছে কি?’

এক নবীন কুরমী যুবা আর এক প্রবীন প্রাচীন বৃদ্ধকে মায়ালোকে বসে এই মায়াবী প্রশ্নটি করে । অসম্ভব ইনোসেন্ট একটি পুরুষ মুখ । যা খুব দূর্লভ । যে মুখ হয়ত প্রান্তবাসী কিছু জনজাতি সম্প্রদায়ের মধ্যে চকিতে চোখে পড়ে । স্বপ্নে ভরপুর কুরমী যুবার দুটি চোখ ।যে চোখ অনেক অনেক স্বপ্ন দ্যাখে । দ্যাখায় ।

“শুখা মরসুম আমার ভাল লাগে না । ইচ্ছে করে বালতি বালতি জল ভ’রে পুরো দুনিয়াটাকে সবুজ করে দিই । তোর ঈশ্বর আমারি মতন পানি পাঁড়ে ।……… গোটা দুনিয়াটা সবুজ হয়ে যাবে । সেই দিনটা আসবেই আসবে” ।

কি গভীর বিশ্বাস ছেলেটির । একবারও মনে হয় না রামলখন চরিত্রে কোনো অভিনেতা অভিনয় করছেন । যাঁর নাম রাজাদিত্য ব্যানার্জী । একজন অভিনেতা শুধুমাত্র চরিত্রটির সাথে একাত্ম হতে পারলেই কি এমন অভিনয় সম্ভব ? আসলে এটাই অভিনয় । যে কোনো চরিত্রের মধ্যে অনায়াসে ঢুকে পড়া অভিনেতার কাজ । কিন্তু প্রথম নিজের পরিচালিত সিনেমায় প্রথম আত্মপ্রকাশ এত সহজ ছিল না । অন্য পরিচালকের পরিচালনায় অভিনয় করার সময় অনেকটা ছাড় পাওয়া যায় । নিজের পরিচালিত সিনেমায় একেবারেই সে অপশন থাকে না । দুটো সত্ত্বা একসাথে কাজ করেছে রাজাদিত্য ব্যানার্জীর মধ্যে । এক পরিচালক রাজাদিত্য ব্যানার্জী আরেকটি অভিনেতা রাজাদিত্য ব্যানার্জী । দুটি সত্ত্বা অদ্ভুত ভাবে দুটি বিপরীত মেরু তে অবস্থান করেছে । রামলখন চরিত্রে শুধুই এক কুরমী যুবক । প্রেম আর ভালোবাসায় ভরপুর এক প্রাণ । তৃষ্ণার্ত মানুষকে জল দেয় যে যুবকটি । কি আগ্রহভরে সে যাত্রীদের তেষ্টা মেটায় । স্বল্প সময়ের জন্য গাড়ি দাঁড়ায় ছোট্ট একটি স্টেশনে । যাত্রীদের সময় কোথা ট্রেন থেকে নেমে জল খাবে ? তাদের পানি পাঁড়ে আছে । রামলখন । জলের অপর নাম তো জীবন ।রামলখন সেই জীবনের প্রতীক । যে জীবন মানুষের চির কাঙ্খিত । যে জীবন মানুষ পেয়ে হারায় । আর সারাটা জীবন ধরে যে জীবন না পাওয়ার যন্ত্রণায় কাতরায় সেই স্বাভাবিক প্রাণশক্তি তে ভরপুর এক জীবনের নাম রাজাদিত্য ব্যানার্জী , দুঃখিত রামলখন ।

“রোমান্সকে ওভার প্লে করিনি’ – পরিচালক রাজাদিত্য ব্যানার্জী । করার দরকার হয় না আদৌ । মোটা দাগের একঘেঁয়ে রোমান্স বাংলা কমার্সিয়াল এবং প্যারালাল দুই ধরনের সিনেমাতে দেখে দেখে আমাদের চোখ ক্লান্ত । সংলাপ অথবা শরীরি আবেদন ও যৌনতা প্রকাশের আতিশয্যে ভরপুর আমাদের বাংলা সিনেমা । যেন জোর করে চোখে গেঁথে দেওয়া হয় –‘এটা রোমান্স, ওটা প্রেম , সেটা শারীরিক চাহিদা’ । খড়ি দিয়ে ব্ল্যাকবোর্ডে দাগ টেনে ছাত্র দের পড়া বোঝানোর মত । দর্শককে এতটা নিরেট ভাবার কোনো প্রয়োজন আছে কি ? নাকি সহজে বাহবা কুড়নোর এক পন্থা মাত্র । শরীর , যৌনতা , বিছানা … ভীষন ক্লান্ত আমরা , দর্শকরা । নতুবা মানসিক এমন টানাপোড়েনের দৃশ্যে এত ভার যে দোটানায় পড়ে হাঁসফাঁস করি আমরা , দর্শকরা । ‘না’ বলার দিন অনেকদিন আগেই পেরিয়ে গেছে । ‘আমরা এই গতানুগতিক চর্বিত চর্বন দেখবনা’ – কথাটা বলার দিন পেরিয়ে গেছে । ‘ডেথ সার্টিফিকেট’ আমাদের সেই অনুচ্চারিত ‘না’ তা কে উসকে শুধু দিল না , কোনটা ‘হ্যাঁ’ তা আমাদের সামনে এনে দিল । হ্যাঁ রোমান্স কে ওভার প্লে করার দরকার পড়ে না । অথচ সিনেমাটি রোমান্সে ভরপুর । নারী পুরুষের আদি অন্ত কালীন আকর্ষণ , আদিবাসী কুরমী যুবক যুবতীর মধ্যে তীব্র শরীরি আবেদন সিনেমাটিতে দর্শককে চুড়ান্ত রোমান্টিকতায় ডুবিয়ে দেয় নিমেষে । যেখানে দর্শক নিজেদের জীবনের প্রেম ভালোবাসা যৌন আবেদনের শরীরি আকর্ষণের সাথে রিলেট করতে পারে ।পরিচালক রাজাদিত্য ব্যানার্জীর এক অসাধারন চ্যালেঞ্জিং দক্ষতা সিনেমায় রোমান্সের উপস্থাপনায় ।

ছৌ নাচের দেবী মুখোশ সাবিত্রীকে পরিয়ে খুলে রামলখন সাবিত্রীর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে । একহাতে দেবী মুখোশ আরেক হাত সাবিত্রীর কপাল ঘেঁষা চুল গুলো হাতের তালুর একটু চাপ ধীরে ধীরে মাথার

পিছনের দিকে সরিয়ে দিতে দিতে সাবিত্রীর মুখের দিকে তীব্র তাকিয়ে থাকা । সাবিত্রীর চোখে মুহূর্তে বিদ্যুতের ঝলক, কামনার উন্মেষ তার প্রিয় পুরুষটির জন্য । কুরমী যুবক রামলখনের মুখে সরলতার সাথে পৌরুষের এবং একটি পুরুষের প্রিয় নারীটির প্রতি চুড়ান্ত যৌন আকর্ষণের এমন মেল বন্ধন বাংলা সিনেমায় দেখিনি । এই দৃশ্যের মেয়াদ মাত্র কয়েক মুহুর্ত । রাজাদিত্য ব্যানার্জী কি অভিনয় করছিলেন আদৌ ? সন্দেহ হয় । মেক-আপ ম্যানের দক্ষতায় অভিনেতার মুখে সারল্য, পৌরুষ, প্রাণশক্তির প্রচুর্য, সঙ্গিনীর প্রতি যৌনতার তীব্রতা এত কিছু প্রলেপ করে দেওয়া সম্ভব না । এটা অভিনেতা রাজাদিত্য’র নিজস্ব । পরিচালক রাজাদিত্য’র নির্দেশনা কে ছাড়িয়ে দক্ষ অভিনেতা রাজাদিত্য তাঁর নিজস্ব মাত্রা যোগ করেছেন । খুব সন্দেহ হয় প্রথম সিনেমায় রাজাদিত্য রামলখন চরিত্রটিতে নিজেকেই উজাড় করে প্রকাশ করেছেন । অভিনয়ের আড়ালে ।

“স্বপ্ন দ্যাখার কোনো বয়েস আছে দাদু ?”

নিভন্ত সন্ধের অপূর্ব প্রাকৃতিক পরিবেশে দাদুকে প্রশ্ন করে রামলখন ।কন্ঠস্বরের আশ্চর্য তীব্রতা সে জিজ্ঞাসায় । মুখে চোখে কি আগ্রহ সে জিজ্ঞাসায় । প্রাচীন বুড়ো মানুষটি বোঝেন যুবা পুরুষটির মন ছটফট করছে ।

‘আজ সাবিত্রীকে খুব মনে পড়ছে । সাবিত্রী যেন একটা সবুজ পৃথিবী” ।

প্রিয় নারীটি একটি পুরুষের নিবিড় আশ্রয়স্থল । প্রতিটি পুরুষ এই সাবিত্রী রূপের নারীকে খোঁজে । একান্ত করে পেতে চায় । রাজাদিত্য সেই আশ্রয় পেয়েছে , দুঃখিত রামলখন ।

ঠিক যখন রামলখন দাদু কে সবুজ পৃথিবীর স্বপ্নের কথা বলছে , ঠিক তখনি সাবিত্রীকে দেখা যায় রুক্ষ কঠিন মাটি হাত দিয়ে খুঁড়ে আঁজলা ভরে জল তুলছে তার মাটির ঘড়ায় । রামলখনের সবুজ পৃথিবীর প্রতীক সাবিত্রী ।একটি নবীন যুবা চোখের স্বপ্ন দেখার প্রেরণা সাবিত্রী । একই কথার পুনরাবৃত্তি করি – রামলখন কোনো বাস্তব মানব চরিত্র যেন নয় , একটি নিটোল কবিতা। একটি কবিতাকে সিনেমার মুখ্য চরিত্র হিসেবে রেখেছেন পরিচালক রাজাদিত্য ব্যানার্জী । সেই কবিতা কে অবয়ব দিয়ে অভিব্যক্তি দিয়ে ফুটিয়ে তুলেছেন অভিনেতা রাজাদিত্য ব্যানার্জী ।

“রাম কোথায় তুই ? আমার খুব তেষ্টা পেয়েছে ।তুই আ,মাকে জল খাওয়াবি না রে বাপ?” ---

অপূর্ব সংলাপ । একটা অদ্ভুত দেখতে গাছের নীচে বসে দাদুর আর্ত আবেদন । গাছ টা খুব প্রতীকী । সবুজে ভরপুর গাছ নয় । দীর্ঘ এক গাছ , যার চূড়ায় অগোছালো ভাবে সামান্য সবুজ লেগে । গাছটি আসলে যেন মৃত । গাছটিও জল চায় । বাঁচতে চায় । প্রাচীন মানুষটির আবেদন , ওই অদ্ভুত দেখতে গাছটির আকুল আবেদন আকাশের দিকে হাত তুলে , তা সমগ্র মানব জাতির আবেদন । পৃথিবী বাঁচতে চায় । পৃথিবীর পানি পাঁড়ে কোথায় সে ? যে বালতি বালতি জল্ ঢেলে পুরো পৃথিবীটা সবুজ করে দেবে ।

শুরুতেই বলেছি ডেথ সার্টিফিকেট আসলে একটি ম্যাজিক । ম্যাজিসিয়নের মায়াজালে দর্শক ৭১ মিনিট আচ্ছন্ন থাকবেন । ম্যাজিকের মধ্যে লুকিয়ে আছে আছে ম্যাজিক । যে মুহূর্তে দর্শক সবে মোহমুগ্ধ হবেন থিক সেই মুহূর্তে ম্যাসিজিয়ন ট্রেন থেকে ছুঁড়ে দেবেন এক বালতি জল । সাবিত্রীর দিকে । পৃথিবীর দিকে । চমকে উঠবেন দর্শক – মোহভঙ্গ না কি নতুন মোহের জাল বিস্তার ! ঠিক সাবিত্রির মতই । ট্রেন থেকে আচমকা ছুঁড়ে দেওয়া বালতি ভর্তি জলে ভেজা সাবিত্রী , চোখে মুখে প্রিয় পুরুষটির অসম্ভব সোহাগের স্পর্শ

‘জল’, ভেজা মুখ চোখ বেয়ে গড়িয়ে নামে । ম্যাজিসিয়নের চোখে মুখে তখন তৃপ্তির আভাস । “রোমান্সকে ওভার প্লে করিনি” …… - ম্যাজিসিয়ন রাজাদিত্য ব্যানার্জী ।

“Everyone has some kind of compass inside them , A clock that is closely connected with their instinct – not so much with their head . This clock tells every single person what is allowed and what is not allowed . When we should stop and when we can go on . We have to listen to it unconditionally .if you betray it .You betray yourself.” –KRZYSZTOF KIESLOSKI . রাজাদিত্য ব্যানার্জীর প্রিয় পরিচালক । যাঁর সিনেমা তৈরীর প্রভাব পরিচালক রাজাদিত্য ব্যানার্জীকে বিশেষ ভাবে প্রভাবিত করে , একথা তিনি সাক্ষাতকারে জানিয়েছেন ।খুব স্বাভাবিক ভাবেই তাঁর প্রিয় পরিচালকের বিখ্যাত সিনেমা ‘No end’ আর ‘blue’ সিনেমা দুটির কথা মনে পড়ে । ‘ in interview in Cinemaia , Dan jardine wrote , “No End is kkieslowski’s dry run for blue, both are wrenching and beautifully-lensed studies of one woman’s struggle to deal of loved ones in a larger politically-charged context .Where they differ : While similarly bleak and sorrowful, Blue finds a tortured peace , a painful hope , where No End is a giant sinkhole of despair.’ রাজাদিত্য ব্যানার্জীর ‘ডেথ সার্টিফিকেট’ সিনেমাটি উক্ত দুটি বিখ্যাত সিনেমার স্পর্শ দেয় , বিষয়বস্তু চয়ন এবং ফিল্ম তৈরী দুটি ক্ষেত্রেই । রাজাদিত্য ব্যানার্জীর বাবা সাহিত্যিক গবেষক সাংবাদিক সম্পাদক তথ্যচিত্র নির্মাতা শ্রদ্ধেয় দেবাশিস বন্দ্যোপাধ্যায়ের ছোট গল্প অবলম্বনে ডেথ সার্টিফিকেট সিনেমা টি । ডেথ সার্টিফিকেট সিনেমাটি তিনি উসৎর্গ করেছেন দাদা চিত্র পরিচালক বাপ্পাদিত্য বন্দ্যোপাধ্যায় ও বাবা সাহিত্যিক দেবাশিস বন্দ্যোপাধ্যায় কে । দাদার আকস্মিক মৃত্যু এই সিনেমাটি তৈরী করার অন্যতম তাগিদ হিসেবে কাজ করেছে সম্ভবত । দাদার মৃত্যুর এক বছরের মধ্যেই প্রয়াত হলেন বাবা দেবাশিস বন্দ্যোপাধ্যায় ।এই দুই প্রিয়জনের মৃত্যু এবং তাঁদের মৃত্যু শংসাপত্র পরিচালক রাজাদিত্য ব্যানার্জীকে এক যন্ত্রনাদায়ক জার্নির দিকে ঠেলে দেয় বলাই বাহুল্য ।প্রথম সিনেমা ডেথ সার্টিফিকেট তৈরীর নেপথ্যে এই অসম্ভব যন্ত্রনার ইতিহাস রয়ে গেছে নিশ্চিত ভাবেই ।

“গানের ক্ষেত্রেও আমি বলি যে আমরা কিন্তু আমাদের , যে আমাদের টেলিভিশনে যাঁরা কাজ করেন , যাঁরা এখানে কাজ করেন , গানের ক্ষেত্রেও একই ভাবে মনে করি তাঁরা কিন্তু ভীষণ প্রতিভাবান । আমরাই কোথাও তাঁদের নিয়ে … আরও সুযোগ কিন্তু তাঁরা ডিজার্ভ করেন।“ – বাপ্পাদিত্য বন্দ্যোপাধ্যায় ।একই বক্তব্যে বিশ্বাসী তাঁর ভাই পরিচালক রাজাদিত্য ব্যানার্জী ।সেজন্যই ডেথ সার্টিফিকেট সিনেমাটির সঙ্গীত পরিচালক ‘মহিনের ঘোড়াগুলির’ প্রদীপ চট্টোপাধ্যায় । সুর নিজেই একটি চরিত্রের রূপ নিয়েছে সিনেমায় । যে রাঙা মাটির গ্রাম , পাহাড় , নদী, উঁচু নিচু টিলা ঘেরা পটভূমিতে সিনেমাটি নির্মিত সেই প্রকৃতির সঙ্গে সঙ্গীত পরিচালকের সুর ও গানের প্রয়োগ দর্শক / শ্রোতাকে আবিষ্ট করে । সহ সংগীত পরিচালক – শুভদীপ পাল ।

তিনটি লন্ঠন একটি মাচার নিচে । একটি বৃদ্ধের , একটি অল্প বয়সী কুরমী ছেলের , আরেকটি কুরমী যুবতীর । মাঝরাতে তারা খুঁজ়তে বেরিয়েছিল । তাদের হারানো প্রিয়জনকে । যে বাড়ি ফেরেনি । সারা গ্রাম খুঁজতে খুঁজতে সন্ধান না পেয়ে ওরা তিনজন একটি মাচার নিচে এসে আশ্রয় নেয় । তিনটি লন্ঠন

তখনো জ্বলছে । রাত শেষ হতে চলেছে । কুরমী যুবতী টি র মনে ভেসে উঠছে তার প্রিয় জনের সাথে কাটানো ভালোবাসার মূহূর্ত গুলো … অর্পিতা চন্দ’র গলায় বাজে –

“বেরা গেলি লোলিতা মোর কিষ্ট নি আলা …” শ্রী রাধিকার আকুল বিলাপ তার সখী ললিতার কাছে …” সকালের আলো ফোটে । তিনজন স্টেশনের দিকে যাত্রা শুরু করে । মাঝে মাঝে ক্লান্ত হয়ে উঁচু নিচু পাথুরে টিলায় বসে । আবার ওঠে । চলতে শুরু করে । গান বাজে … “ আহম কহি গেলো কালা / গাঁথল মন ফুলেক মালা / মালা হেলি জপ মালা / মালেক উপাই নিহালা …” গানটি তাদের পৌঁছে দেয় স্টেশন চত্বরে । ডেথ সার্টিফিকেট সিনেমায় প্রদীপ চট্টোপাধ্যায় সুর ও সঙ্গীত কে সিনেমার একটি অন্যতম চরিত্রে রূপ দিয়েছেন । তিন জনের সাথে সাথে সুর ও খুঁজতে বেরিয়েছে এক হারানো প্রিয়জন কে । স্টেশনে ট্রেনের হুইশল ক্রমে ক্ষীণ হয়ে যাচ্ছে , প্ল্যাটফর্ম ছেড়ে ট্রেন দূরে চলে যাচ্ছে তখন বাঁশির সুরে বাজতে থাকে এক করুন আকুতি – বেরা গেলি লোলিতা মোর কিষ্ট নিয়ালা…” এই বাঁশির সুর সিনেমার তিনজন চরিত্রের সঙ্গে একসঙ্গে যাত্রা করে রামপুরহাট হাসপাতালের দিকে । অনেকটা রাস্তা । হারানো প্রিয়জনের সন্ধানে সিনেমার চারটি চরিত্র – গ্রামের দাদু , শিবু , সাবিত্রী আর সুর । রামপুরহাট হাসপাতা;ল চত্বরে গিয়ে সুর টি থমকে যায় । ছেড়ে যায় না । আবার যখন তিনটি চরিত্র হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে থানার উদ্দেশ্যে হাঁটতে শুরু করে তাদের মৃত, ট্রেনে কাটা প্রিয় জনের রক্ত মাখা জামার সন্ধানে থানার দিকে সুর টি আবার তাদের সাথে সাথে চলে … “বেরা গেলি লোলিতা মোর কিষ্ট নিয়ালা” … সঙ্গীত পরিচালকের এক অনবদ্য সৃষ্টি ডেথ সার্টিফিকেট সিনেমার সুর ও সঙ্গীত । আর সেজন্যই পরিচালক রাজাদিত্য বন্দ্যোপাধ্যায় ‘মহিনের ঘোড়াগুলির’ প্রদীপ চট্টোপাধ্যায় কে সিনেমার সঙ্গীত নির্দেশনার দায়িত্বে রেখেছেন ।

ঘন মেঘ ।বৃষ্টির জলে ভরে যাচ্ছে আমাদের লাল মাটির গ্রাম । জল গড়িয়ে যাচ্ছে কালো পিচ রাস্তা থেকে লাল মাটির পথে । রুক্ষ গ্রামে মনসুন এল বুঝি । বাজছে ভারতীয় উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত । গাইছেন শিল্পী । বর্ষা মিলনের ঋতু । নদী নালা ভরে ওঠে ।বর্ষা পূর্নতার ঋতু । রুক্ষ প্রকৃতিও সবুজে সাজে । কুরমী যুবতী টি তার প্রিয়জনকে হারিয়েছে চিরকালের জন্য । বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে দৌড়তে থাকা সাবিত্রীর হাত ধরে স্বামী রামলখনের একসাথে দৌড়নোর দৃশ্য । মনসুন রাগ বাজছে সহ সঙ্গীত পরিচালক শুভদীপ পালের কণ্ঠে । সাবি , সাবিত্রী স্টেশন মাস্টারের লিখে দেওয়া ডেথ সার্র্টিফিকেট সম্পর্কিত কাগজটি ছিঁড়ে কুচি কুচি করে ছিঁড়ে ফেলছে প্ল্যাটফর্মে । পাশ দিয়ে ট্রেনের চলে যাওয়া । দূরদর্শনে তখন মহাকাশে স্যাটেলাইট পাঠানোর দৃশ্য । আশ্চর্য বৈপরীত্য । চুড়ান্ত বিচ্ছেদ আর শূণ্যতার হাহাকার কে ছাপিয়ে যাচ্ছে চির পূর্ণতার ঋতু বর্ষা , বৃষ্টি । মনসুন রাগ বাজছে । আশ্চর্য সঙ্গীত নির্দেশনা প্রদীপ চট্টোপাধ্যায়ের। সুর একটি মুখ চরিত্র এই সিনেমায় ।

সিনেমার ভাষা – কুরমালি । কুরমালি ভাষায় এটি প্রথম সিনেমা । ঝাড়খন্ড সহ পশ্চিমবঙ্গের এবং ভারতবর্ষের বেশ কিছু জেলার প্রান্তিক জনজাতির ভাষা কুরমালি । বিশেষ করে কুরমী সম্প্রদায়ের ভাষা । নিজের প্রথম সিনেমার ভাষা হিসেবে কুরমালি ভাষার ব্যবহার নিঃসন্দেহে দুঃসাহসিক এবং প্রশংসনীয় ।

“আমি কঠিন চ্যালেঞ্জিং কাজ করতে ভালবাসি । এটা খুব বড় ক্যানভাসের একটা ছবি …” । “সিনেমা করাটা একটা ঝড়ের মধ্যে দিয়ে যাওয়ার মত …” – রাজাদিত্য ব্যানার্জী । ঝড় শেষে আমাদের অপেক্ষা আরও কিছু অসাধারন ম্যাজিকের – নতুন কিছু সিনেমার ।

ডেথ সার্টিফিকেট – কুরমালি ভাষায় প্রথম সিনেমা ।

প্রোডিউসার , স্ক্রীন প্লে , নির্দেশনা – রাজাদিত্য ব্যানার্জী

সময় – ৭১ মিনিট

ভাষা – কুরমালি (ইংরাজি সাব-টাইটেল সহ)

প্রোডাকশন হাউস – ব্যাক বেঞ্চার্স ফিল্মস

সঙ্গীত – প্রদীপ চট্টোপাধ্যায় ও শুভদীপ পাল ।

অভিনয়ে – দীপমালা সেনগুপ্ত , রাআদিত্য ব্যানার্জী , প্রদীপ ভট্টাচার্য , গৌতম দাসান্ডি, ভুপেন পান্ডে ,

রাজু রায় এবং সুদিন অধিকারী