তোমার যা ইচ্ছা - অধ্যাপক ড: জি.সি.ভট্টাচার্য | Tomar Ja Icche (What You Wish) - Bengali Short Story by Dr. G C Bhattacharya

DR G C Bhattacharya

Dr. G C Bhattacharya is a teacher at BHU, Varanasi, Uttar Pradesh, India and has been writing for over 15 years. His writings have been published in Ichchhamoti, Joydhak, Diyala, A-Padartha and other Bengali magazines. Besides Bengali, he writes in Hindi and English (UK short fiction) too. His published books includes Badal Kotha in Hindi. Dr. Bhattacharya can be reached at dbhattacharya9 [at] gmail [dot] com.

This story is reproduced in Unicode Bengali font for increased browser compatibility.

Submit your creative writing, story, poem, travelog etc. for publication on WBRi by e-mail to submissions@washingtonbanglaradio.com.



তোমার যা ইচ্ছা

ডঃ জি০ সি০ ভট্টাচার্য, বারাণসী, উত্তর প্রদেশ


গল্পটা আমার পরীর দেশের রাজকুমার অপরূপ সুন্দর তেরো বছরের ভাইপো চঞ্চলকে শুনিয়ে ছিলাম আমি তার মিষ্টি এক ঠাট্টার বদলে। যে সময়ের কথা বলছি, তখন ছিল শীত কাল। বাদল বিকেলে রোজ আসতো তখন চঞ্চলের সাথে ব্যাডমিন্টন খেলতে। আমি ওদের স্কুলের মাঠে ও খেলতে পাঠাতে রাজী নই বলে খেলা হতো বাড়ির ছাদে আর সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলেই খেলার দফা গয়া হতো দেখতে দেখতে। তা কি আর করা?
 
সে দিন ও যথারীতি বাদলকে বাড়িতে পৌঁছে দিয়ে স্কুটারে করে চঞ্চলকে নিয়ে চলে এসেছিলাম আমি স্কুল থেকে বিকেল তিনটের সময়। আমাদের জলখাবারের ব্যবস্থা করাই ছিল, এমন কি রাতের খাবার ও তৈরী করে রেখে দিয়েছিলাম আমি আগেই। রাতে শীতের ভয়ে। আমি যে বিলক্ষণ শীতকাতুরে, তা চঞ্চল ছোট্টবেলা থেকেই জানে।

গরমজলে মুখ হাত পা ধুইয়ে স্কুল ড্রেস বদলে ঘরের পোষাক পরাচ্ছিলাম আমি দুধবরণ ছেলে চঞ্চলকে, হঠাৎ করে ঠান্ডা হাওয়ার সাথে বৃষ্টিপড়া শুরু হতেই সব মাটি হ’ল। কুমার চঞ্চলের খেলা বন্ধ । বেনারসে শীতকালে প্রায়ই এমন হয়ে থাকে যাকে বলে ওয়েস্টার্ন ডিষ্টার্বেন্স। ফলে দুর্দান্ত ঠান্ডা পড়া শুরু হয়ে যায় আর যা কিনা একটু ও পছন্দ নয় আমার।

আমার ঘরে রুমহীটার ও সেইসাথে ব্লোয়ার দুই চলছিল তাই গরম পোষাক আগে না পরিয়েই চঞ্চলকে খেতে বসিয়ে দিলাম আমি তাড়াতাড়ি করে। অন্য কারণ ও ছিল। তখনই অন্ধকার মতন হয়ে আসছিল মেঘের জন্য আর ঝড়জল বাড়লে লাইট ও বন্ধ হয়ে যেতে পারে কারেন্ট অফ হয়ে। তা সে ছেলে কি একলা খায় নাকি? আমাকে ও খাইয়ে ছাড়ে। কোনমতে খাওয়া শেষ হতে না হতে আলো গেল ফট হয়ে।

চঞ্চল বলল--‘ও কাকু, এবার কি করবে বলো? লাইট তো নিভেই গেল যে…’

‘যাক গিয়ে, এই আমি কম্বল মুড়ি দিলুম। যা শীত করছে না আমার…..’

এই বলে আমার কার্তিক ঠাকুর ছেলেটাকে নিজের কোলে তুলে বসিয়ে নিয়ে নরম দামী একটা কম্বল জড়ালুম ভাল করে। বাইরে তখন ঝমাঝম বৃষ্টি নেমেছে পাগলা হাওয়ার সাথে পাল্লা দিয়ে। তা সে বৃষ্টি ও থামে না আর লাইট ও আসে না। আর তখন সে যা ঠান্ডা না …উঃ, সে আর কহতব্য নয়।

ভাবলুম --চঞ্চলকে তখন আগে গরম পোষাকগুলো সব পরিয়ে দিলেই হতো। এখন এই অন্ধকারে কি করি? এমারজেন্সী লাইট ও চার্জ করা হয় নি আজ আবার। দূর হোক ছাই বলে ছেলেটাকেই কোলে তুলে নিয়ে বিছানায় গিয়ে গরম লেপের মধ্যে ঢুকে পড়লুম আমি। চঞ্চল আমাকে জড়িয়ে ধরে নিয়েছিল দুই নরম মসৃণ বাহু দিয়ে ওকে কোলে তুলে নেবার সময়েই।

এখন নেই কাজ তো খই ভাজ নীতি মেনে নিয়ে এই পরম রূপবান ছেলে চঞ্চলকে আদরে আদরে অস্থির করা যাক খানিক। তাই করলুম। খানিকপরে একটু শীত কাটতে বেশ তন্দ্রামতন এসে গিয়েছিল আমার চঞ্চলের গায়ের গরমে।

চটকা ভাঙল চঞ্চলের ডাকে-‘কাকু, ও কাকু….’

‘কি? কি হয়েছে?’

‘কিছু হয়নি কাকু, দেখোই না তুমি উঠে, লাইট তো কখন এসে গেছে, কাকু’।

‘আসুক গিয়ে, আমি উঠছি না এই ঠান্ডার মধ্যে’।

চঞ্চলকে আরো ভালো করে নিজের বুকে শক্ত করে জড়িয়ে নিয়ে বললাম আমি।

আমার কথা শুনে শুনে ছেলে চুপ।

‘আচ্ছা কাকু…’ খানিকপরে আবার চঞ্চল ডাকল।

‘আবার কি হলো, শুনি?’

‘হয়নি কিছুই, তোমাকে একটা কথা জিজ্ঞাসা করি’?

‘কি?’
‘বৃষ্টি হয়ে না হয় আমার খেলা বন্ধ হ’লো, কাকু…তা আজ সেই উপলক্ষ্যে কি আমার পড়াশুনোর ও ছুটি নাকি, কাকু? রোজ তো দেখি এতক্ষণ গিয়ে পড়তে না বসলে আমার কাকু রেগে আগুন তেলে বেগুন, তেড়ে বলেন তিনি…হয়ে ওঠে…তাই না  হিঃ  হিঃ  হিঃ…’

‘এই, হলো…দিলে ফেলে তো ক্যাঁচাকলে আমাকে….কি ছেলেরে বাবা’। মনে মনে বললুম আমি। মুখে বললুন-‘হুঁ, আজ যে আমার তোমাকে এখন ছাড়তে একটুও ইচ্ছেই করছে না, তার কি হবে….?’

অন্য কোন ছেলে হ’লে হয়তো বলতো--‘কাকু, এই সন্ধ্যে বেলায় আবার কেউ শুয়ে থাকে নাকি’? বা ‘তুমি আমাকে ছেড়ে দাও এখন, কাকু’।
 
সেটাই স্বাভাবিক।
 
কিন্তু চঞ্চল তো দারুণ বুদ্ধিমান ছেলে, অনন্য সাধারণ।  

সে বললো-‘তোমার যা ইচ্ছা হয়, তুমি কর কাকু। আমার তো তাইতেই বেশ ভালো লাগে। আর রোজ রোজ যদি বৃষ্টি হয়ে তোমার এমনি ধারা ইচ্ছা হয় তো সে আরো ভাল । এই রেনী ডের বদলে রেনী ইভনিং ও রেনী নাইট কিন্তু আরো বেশ মজার তাই না, কাকু। বিশেষ করে শীতকালে, কেননা তাহলে আর বাড়িতেও তো পড়তে বসতেই হয় না, ঝামেলা চুকেই যায় … হিঃ  হিঃ   হিঃ…’

সুন্দর ছেলে চঞ্চলের এই মিষ্টি ঠাট্টা শুনে আমি এক্কেবারে চুপ।

একটুক্ষণ পরে নিজে চিৎ হয়ে শুয়ে অলোকসামান্য রূপবান কিশোর ছেলে চঞ্চলকে জড়িয়ে ধরে নিজের বুকের ওপরে তুলে নিয়ে ভালো করে লেপ চাপা দিয়ে নিয়ে বললুম-‘চঞ্চল, এই… তোমার যা ইচ্ছে হয় ….…নিয়ে কিন্তু একটা বেশ মজার গল্প আছে, শুনবে?’

‘গল্প? …. তায় আবার শুনবে কি না সে কথা জিজ্ঞাসা করে কেউ নাকি? তুমি বলো কাকু’…  

ব্যস, এবার আমার জিৎ হয়ে গেল আপনিই।
 
কেননা এখন যতক্ষণ গল্প চলবে, এই পরীর দেশের রাজকুমার দারূণ অসম্ভব সুন্দর ছেলেটাকে ছাড়তে হবে না আর।

রাতে শোবার আগে সেই ছোট্টবেলা থেকে গল্প শোনার অভ্যাস যে আমার কাছে, চঞ্চলের।

তখনকার চেয়ে এখন তো ছেলেটা কত বড় হয়ে গিয়েছে, অসম্ভব রকম সুন্দর হয়ে উঠেছে আর তেরো বছর বয়স হয়ে গেছে বলে এখন ছেলেটার পরনে অন্তত অন্তর্বাস হলেও তো রয়েছে, তখন তো তাও থাকতো না। পারিবারিক অ্যালবামের সে সব ফটো দেখে এখন তো চঞ্চল লজ্জা পেতে ও শিখেছে। আমাকে বলে –‘তুমি কি কাকু? এইভাবে কেউ ফটো তোলে না কী ছেলের’?
 
আমি বলে দিই-‘আরে, আমি কি করে তুলব নিজের ফটো, তায় আবার একটা চার পাঁচ বছরের ছেলেকে কোলে নিয়ে? ওসব তো তোমার মায়ের কীর্তি, বড় হলে তখন দেখিয়ে ছেলেকে ক্ষেপাবে বলে তুলেছিল। চানের সময়ের ভ্যাঁ করে কান্নার ও ফটো আছে তোমার’।

সে সব যাই হোক, চঞ্চল এখন ও শুধু গল্প শোনার অভ্যাসটি ছাড়তে পারে নি।

আমি বললুম, তবে শোন---‘অনেককাল আগের কথা। সেই সময় বারাণসীতে থাকতো এক ধনী শেঠ। বহু টাকাপয়সা, জায়গা জমী, বাড়ীঘরের মালিক। বিরাট বড় ব্যবসা। সুদের কারবারেই কয়েকলক্ষ টাকা লগ্নী করা ছিল। বিরাট আড়ত, বাণিজ্য সব ছিল। শুধু ছিল না যা তা হলো গিয়ে আমার চঞ্চলের মতন একটা সুন্দর মতন নিজের ছেলে’। বলে একটু থেমে গেলুম আমি।

এইবার আমার ঠাট্টা শুনে রাগ করে আমার বুকে দুধসাদা ছোটো হাতের নুঠি দিয়ে আঘাত করে চঞ্চল বললো-‘আঃ কাকু, তুমি গল্পটা আগে বলোই না। ছেলে তো ছেলেই হয়, সে সুন্দর কি না, তা দিয়ে কি হবে? মা বাবার কাছে সব ছেলেই সুন্দর হয়, জানো তো কাকু। এমন কি, পেঁচার ও, হ্যাঁ না তো…’

রূপকুমার চঞ্চলের আমার ও নিজের প্রতি এই কটাক্ষ বা ঠাট্টাকে অগ্রাহ্য করে বললুম-‘বলছি তো, বাবা। এখন লক্ষ্মীদাস শেঠের খুব চিন্তা ছিলো যে সে মারা গেলে তার কারবার কে দেখবে? শেঠানী তো আর কিছুই জানে না হিসাবপত্র। সব বেহাত হয়ে যাবে। তা চিন্তা করলেই তো আর কারো ছেলে হয় না। এইজন্যই আগেকার দিনে বড়লোকেরা মানে পয়সাওয়ালা লোক বা রাজারা এন্তার বিয়ে করতো। যদি একটা ছেলে হয়ে যায় তবে সম্পত্তি রক্ষা হয়। তা সেই শেঠজীর ছেলে হবার আশা ও মিটলো না’।

‘একদিন যথানিয়মে শেঠজী শেষনিঃশ্বাস ফেললেন আর শেঠানীর মাথায় সত্যিই যেন বাজ পড়লো। কান্নাকাটির ধূম পড়ে গেল। কারবার লাটে উঠলো তা তো বটেই। শোক কাটতে ও মৃতের নিয়ম পালনে একমাস কাটলো। তারপর তো অর্থচিন্তা আসবেই। শেঠানী যা দাম পেল তাইতেই কারবারের বেশীর ভাগ সব বেচে দিল। গুদাম, আড়ত, দোকান সব। তবে বেশী দাম কেউ দিল না সুযোগ পেয়ে। সবশেষে সুদের ব্যবসার হিসেব শুরু হলো। সে তো আর বেচে দেওয়া যায় না। টাকা ধার দেওয়া আছে। সুদসমেত আদায় না করতে পারলে সব ফক্কা। ঠিকানা বইখাতায় মিললে ও আদায় করে কে? বিশ্বাসী লোক চাই’।

বহু কষ্টে শেষে একজন তেমন লোক মিললো।

তাকে ডাকা হতে সে এসে জিজ্ঞাসা করলো-‘শেঠানীজী, টাকা তো আমি আদায় করে আনবো না হয় ঘুরে ঘুরে, তাগাদা করে। তাইতে একমাস ও লাগতে পারে আর তিনমাস ও হতে পারে। তা এত কষ্ট করে কাজ করে আমার ও তো কিছু……মানে বুঝতেই তো পারছেন …আমার ও তো ঘরদোর আছে, ছাপোষা মানুষ আমি…মানে বলছি কি যে সব আদায় করে আনবার দায়িত্ব আমার, সে হয়ে যাবে কিন্তু তার থেকে আপনাকে কি দিতে হবে বলুন’।

‘শেঠানীর তখনও শোকে কষ্টে মাথার ঠিক নেই। কথার প্যাঁচ ধরতে পারলো না। আমি কি পাব তা না জিজ্ঞাসা করে উল্টোকথা কেন জানতে চাইছে লোকটা তাও না বুঝেই বলে দিল-‘ তোমার যা ইচ্ছে হয়, তাই দিও’।।

 ব্যস, আর যায় কোথায়? সে তো তাই চায়। রাজী হয়ে গিয়ে পরদিন থেকেই শেঠজীর খাতা বগলে নিয়ে সে কাজে নেমে পড়লো’।  

‘পাক্কা তিনমাস ঘুরে সে প্রায় সব টাকা আদায় করে নিয়ে এলো। দুই লক্ষ টাকা। এখনকার হিসেবে তার মূল্য দুই কোটি টাকার ও বেশী হবে। তারপরে সে টাকা ভাগ করতে বসলো। সব টাকা দু’ভাগ করলো সে। ।একভাগে রাখল এক লক্ষ ষাট হাজার আর অন্যভাগে চল্লিশ হাজার টাকা আর তারপরে সে সেই চল্লিশ হাজার টাকার পুঁটলী শেঠানীর হাতে তুলে দিয়ে নিজে এক লক্ষ ষাট হাজার টাকা নিয়ে রওনা হলো।

জিজ্ঞাসা করা হলে নির্ভয়ে বলে দিল-‘ এতে আমার আর কি দোষ? শেঠানী তো সবার সামনে আমাকে বলেই দিয়ে ছিলেন যে তোমার যা ইচ্ছা হয়, আমাকে দিও। আমি তাই দিয়ে দিয়েছি তো। আচ্ছা, নমস্কার’।

চঞ্চল নিজের পদ্মপত্রের মতন টানা টানা চোখদুটোকে আরো বড় বড় করে বলল-‘বাব্বা, কি দুষ্টু লোক কাকু, আদায়ী মজুরী বলে আশী শতাংশ টাকাই নিয়ে নিলো। তাকে কেউ কিছু বললো ও না, কাকু?’

‘শেঠানী নিজে বলেছে, অন্য কেউ বলবেই বা আর কি? তবে অনেকে অনেক কিছু বোঝালো ও এই বলে ব্যাখ্যা করতে চাইলো যে শেঠানীর মাথার ঠিক নেই, তার কথার অর্থ হলো তোমার পারিশ্রমিক যা ইচ্ছা হয় নিয়ে বাকি টাকা আমাকে দিও’।

‘পারিশ্রমিক কখনোই সব টাকার অর্দ্ধেকের বেশী হতেই পারে না। যেমন এইকালে ও সুপ্রীম কোর্ট বলেছে যে আরক্ষণ কখনই পঞ্চাশ শতাংশের বেশী হতে পারে না। তা সে কথা তো আর তখন আইনে লেখা ছিল না। কেন মানবে কেউ? বড় বয়েই  গিয়েছে । লোকটা বাড়ী চলে গেল গড়গড় করে টাকা নিয়ে’।

‘ও কাকু, তখন কি হলো, বলো না তাড়াতাড়ি করে’।

‘কি আর হবে? যেমন কর্ম তেমন ফল, আমার গল্পের ইতি হ’ল’।

‘তুমি না কাকু, ভীষণ দুষ্টু ছেলে একটা। এইভাবে কেউ গল্প শেষ করে না কী? বাদল থাকলে ঠিক বলতে পারত সমাধান আর টাকা আদায়ের ফন্দি। আমি তো গাধা ছেলে একটা, জব্দ হয়ে যাই একটুতেই তাই। নাঃ, আমি হারি… পারব না, বলতে কোন উপায়। হলো তো, এবার তুমি বল, কাকু, প্লীজ……..’

‘পারিশ্রমিক পেলে বলতে পারি ভেবে চিন্তে’।

‘তোমার কি পারিশ্রমিক চাই, কাকু? আচ্ছা, আমি রাতে শোবার সময় আদর করে দেব খুব করে তোমাকে। হলো তো…’

‘আচ্ছা, তাই সই। তা তখন তো আর বাদল কুমার জন্মায়নি যে সমস্যা মিটিয়ে দেবে। তুমি পারলে না বলে নিজেকে গাধা ভাববার দরকার নেই, চঞ্চল। কেননা তখনকার দিনে ও গোটা শহরের লোক মিলে কেউ কিচ্ছুটি করতে পারে নি। তবে তিনদিন পরে একজন খবর নিয়ে এল যে দিলদার নগরে এক বৃদ্ধ কাজী আছেন। খুব বুদ্ধিমান, বিবেচক আর  বিখ্যাত ব্যক্তি। তাঁর আদেশ আর নবাবের আদেশ একই কথা। নবাব নিজে ও তাঁর পরামর্শ নিয়ে থাকেন। বলা বাহুল্য যে তখন পাঠান আমল চলছিল দেশে।

তা সেই কাজির কাছে নালিশ জানালো শেঠানী বাধ্য হয়ে।

তিনি যথাসময়ে দু’পক্ষকেই তলব দিলেন হাজির হতে তাঁর দরবারে মানে এজলাসে প্রমাণ সমেত। শেঠানী নিয়ে গেল চল্লিশ হাজার টাকা আর শেঠের সুদের কারবার ও ধারকর্জের হিসেবের খাতা আর সেই সংগ্রাহক এল বাকী টাকা নিয়ে।

বৃদ্ধ কাজী চুপটি করে বসে দু’পক্ষের কথা শুনলেন। তারপর বললেন-‘বিবিজান, তুমি এই নফরকে কি হুকুম দিয়েছিলে, পরিষ্কার ভাবে আবার বল তো, কলমবন্দ মানে রেকর্ড করা হবে’।

‘সব টাকা তোমাকে আদায় করে আনতে হবে, সুদসমেত’।

‘তারপর…’

‘আমাকে তাকে কি দিতে হবে জিজ্ঞাসা করা হলে বলি- তোমার যা ইচ্ছা হয় দিও’।

‘তোমার মতলব ছিল-সে যা চায় তাই তোমাকে দেবে। ঠিক কথা?’

‘হ্যাঁ হুজুর’।

‘এবং সে তোমাকে চল্লিশ হাজার টাকা দিয়ে বলেছে যে সে এই দিতে চায় তোমাকে’। তুমি তাতে কী রাজী?’

‘না হুজুর’।
‘কেন? সে তো তোমার কথামতন কাজই করেছে?’
‘কিন্তু সে মালিককে টাকার অর্দ্ধেকের ও কম টাকা দিয়ে বাকি সব কী পারিশ্রমিক হিসেবে নিতে পারে,হুজুর?’

        ‘নফর, এই প্রশ্নের তুমি কি উত্তর দিতে চাও?’

‘হুজুর, গোস্তাকী মাফ হয় তো বলি…’

‘বল’

‘এইক্ষেত্রে কথা দেওয়া হয়েছিল যে আমি যা চাই, তাই দেব সুতরাং কত দিতে চাইব তা আমার বিবেচনাধীন হবে এবং সেই কারণেই অন্য পারিশ্রমিকের নিয়ম এইক্ষেত্রে কখনোই প্রয়োজ্য নয়, হুজুর…’

‘হুম, তারমানে তুমি যা চাও তাই তোমাকে দিতে হবে শেঠানীর হাতে তুলে। অন্য কোন কিছু নিয়ম অমান্য হবে …..ঠিক তো?’

‘একদম ঠিক, হুজুর’।

‘কোনো সন্দেহ নেই তো?’

‘না হুজুর’।

‘ তবে এবার কলমবন্দ করা হোক-‘নফর নিজে যা চাইবে, তাই  সে দিতে রাজী থাকবে শেঠানিকে, অন্য কে কী বলে বা দেশের কানুন কী বলে, তার সাথে কোনও মতলব নেই এই নালিশে’

‘ফারসীতে কলমবন্দ করা হ’ল, হুজুর’ ….কলমকার বা নথীলেখক বলল।

‘তোমার যা ইচ্ছা মানে তুমি যা চাও এই তো?’ লম্বা সাদা দাড়িতে হাত বুলিয়ে নিয়ে বৃদ্ধ কাজী আবার বললেন।

‘একই কথা হুজুর’
‘কোনো সন্দেহ নেই তো?’

‘না হুজুর’

‘কলমবন্দ করা হোক’

‘করা হ’ল হুজুর’

ব্যস, কাজী এক্কেবারে চুপ। পুরো এজলাশ ও চুপ। যাকে বলে পিন ড্রপ সাইলেন্স। পাক্কা তিন মিনিট কাটল।

‘তারপর, কাকু?’-চঞ্চল সাগ্রহে জানতে চাইল।

‘চঞ্চল, বোঝ তুমি এবার । যে অতবড় কাজী, সেও যদি কোর্ট প্রসিডিংয়ের সময় চুপ করে বসে থাকতে পারে তবে তাদের গল্প  বলতে বসে আমি চুপ মেরে গেলে কি দোষ?’

‘কোন দোষ নেই, কাকু। আমার যথেষ্ট আক্কেল হয়েছে, কাকু। আমি ভাইপো না হয়ে তোমার নিজেরই ছেলে হ’লে হয়ত এই মুস্কিল হতো না আমার। একটু বুদ্ধি শুদ্ধি অন্তত থাকত আমার ঘটেও। আমাকে মাফ করে দাও, কাকু’।

‘আরে, এতে এত কথার কিছু নেই। আসল ব্যাপার হলো আগে চিন্তা ও বিচার করে নিয়ে বিবেচনা করে কথা বলতে হয়। তা খানিকপরে কাজীসাহেব বললেন-‘সব টাকা একজায়গায় করে গুনে টাকার অঙ্ক কলমবন্দ করা হোক’।

তাই করে পুরো দুই লক্ষ টাকা পেয়ে রেকর্ড করা হল।

কাজী সাহেব হুকুম দিলেন-‘ টাকা দুই ভাগে ভাগ করা হোক। একভাগে থাকবে এক লক্ষ আশী হাজার ও অন্য ভাগে বিশ হাজার টাকা’।

তাই করা হ’ল।

এবার নফরকে ডাকা হ’ল।

কাজী সাহেব বললেন-‘তুমি এইবার এই দুটি ভাগের টাকা দেখে বল তো, কোনভাগটি তুমি চাও’।
কোনো ভাবনা চিন্তা না করেই সে বলল-‘হুজুর বড় ভাগটি চাই’।

‘নাঃ, অত তাড়াতাড়ি করতে হবে না। সময় নিয়ে ভেবে চিন্তে বল তুমি। পরে আর কিন্তু মওকা পাবে না’।

‘আমি ভেবে চিন্তেই বলছি, হুজুর। বড় ভাগটিই আমি চাই’।

‘কোন সন্দেহ নেই তো?’।

‘না, হুজুর’।

‘নফর যা চায়, তা সে আবার বলুক কলমবন্দি করবার জন্য’।

তাই করা হ’ল।

কাজী সাহেব গম্ভীর হয়ে এবার বললেন-‘আমার বিচার শেষ। এবার ফয়সলা শুনানী বাকী’।

‘আমি ফয়সলা দিচ্ছি। ইচ্ছে হলে বাদী মানে ফরিয়াদী বা বিবাদী যার মন হবে, সে নবাবের দরবারে যেতে পারে আমার দেওয়া ফয়সলার বিরুদ্ধে’।

‘এখানে সবার সামনে ভেবে চিন্তে নফর বলেছে যে সে টাকার বড় ভাগটি চায় বা পেতে ইচ্ছা করে। ঠিক কথা? কোনমতেই সে ছোটভাগটি চায় নি, বার বার সুযোগ দেওয়া সত্বে ও। তার ইচ্ছা পরিষ্কারভাবে সে সবার সামনে বলেছে। আর শর্ত ও ছিল এই যে তার যা ইচ্ছা তাই সে দেবে আর তার ইচ্ছা তো টাকার বড় ভাগটি। সুতরাং এইখানেই সে একটু ভূল করে ফেলেছে। অতি লোভে পড়ে কিছুমাত্র বিবেচনা  না করে। এখন শর্ত যখন এই ছিল যে নফর যা চায় বা তার যা ইচ্ছা তাই সে শেঠানিকে দেবে। তখন সেই শর্তানুযায়ী টাকার এই বড়ভাগটিই বাধ্য হয়ে নফরের ইচ্ছামতন শেঠানিকে দিয়ে দেওয়া হ’ল। ছোটভাগটি মানে বিশ হাজার টাকা, যা আমার মতে নফরের উচিত প্রাপ্য পারিশ্রমিক হিসেবে, তাকে তাই দিয়ে দেওয়া হ’ল’।
 
‘এই ফয়সলার সাথেই এই টাকাভাগের মামলা রফা দফা বা নিষ্পত্তি করা হ’ল। সেই সাথে আজকের মতন এজলাশ ও বরখাস্ত করা হ’ল’।

কাজিসাহেবের বিচার বা ফয়সলা শুনে অতি লোভী অর্থ সংগ্রাহক চুপ এক্কেবারে।

সেই সঙ্গে এবার আমি ও চুপ আর চঞ্চল ও।

একই কথার অর্থভেদ করে কাজীসাহেব বিলক্ষণ বিচার করে দিয়েছেন যে।

 আর কে কি বলবে?


Enhanced by Zemanta


blog comments powered by Disqus

SiteLock