ছোটো গল্প: এক অভিশপ্ত রাতের কাহিনী - পলাশ দে | Tale of an accursed night - a Bengali short story by Palash Dey

Tale of an accursed night - a Bengali short story by Palash Dey on WBRi Online Bangla Magazine. The following story is in Unicode Bangla font.

ছোটো গল্প

এক অভিশপ্ত রাতের কাহিনী

পলাশ দে

    কম্পানীর জরুরী মীটিংটা শেষ হতে-হতে অনেক রাত রাত হয়েগেছে সমীরের।বাড়ীতে বুড়ো বাবা-মা এতক্ষনে চিন্তা করতে শুরু করেছে,এই কথা ভাবতে ভাবতে সমীর হাতে-দিকে ঘড়ির টাইম্‌টা একবার দেখে নিল পাক্কা পনে এগারটা বাজে তখন।পার্কিং-পোয়েণ্টে যে কয়টি মারুতিকার ষ্টেণ্ড করা আছে,তার মধ্যে নীল রং-এর ষ্ট্যাণ্ডার্ট মারুতিকারটা সমীরের।সমীর এই মাল্টিনেশন্যাল ফুট-প্রডাক্ট কম্পানির সেলস্‌ এক্সিকিউটীভ ম্যানেজার।ভালো মাইনে পায়।বর্তমান বোম্বাইতে সেটেল্‌ হয়ে আছে।কিন্তু ভবিষ্যতে তাকে আবার কোথায় সেটেল্‌ হতে হয় তা বলা মুশকিল।সমীরের বয়স খুব জোর ত্রিশ কি বত্রিশ হবে।হাইট পাঁচ ফুট দশ ইঞ্চি।স্লীম্‌ ফিগার,দেহের গঠন বেশ সুন্দর-একদম হ্যাম্‌সাম বয়।মুখে গোঁফ-দাঁড়ি না থাকায় বেশ ফুট্‌-ফুটে লাল,চেহারাটা রাতের হেলোজিন লাইটের ফোকাসে গ্লেস্‌ দিচ্ছে-মাথায় বেশ ঘন সিল্কী চুল।হোয়াইট প্যাণ্টের সাথে ডীপ ব্লু সার্ট আর সাথে রেড্‌-কালারের টাইটাও বেশ ফুটেছিল সমীরের গলায়।ডান হাত দিয়ে  পীঠের উপর কোট্‌টাকে  কাঁধের সাথে ঝুলিয়ে রেখে যখন সিঁড়ি বেয়ে নাম্‌ছিলো তখন বেশ ভালো লাগ্‌চ্ছিলো সমীরকে,এক দেখায় যেকোনো মেয়ে দেখলে ইম্প্র্যাস্‌ হয়ে যাবে।সমীর এখনো বিয়ে করেনি।তবে বিয়ের ব্যপারে অভিরূচি না থাকলেও বিয়ের দিক থেকে একেবারে অমত নয় সমীরের।শুধু একটা ভালো পাত্রীর সন্ধ্যান চাই।পাত্রীর সন্ধ্যান বলতে সমীরের মতন ছেলের কি আবার পাত্রীর অভাব আছে নাকী।কত মেয়ে যে ওর জন্য পাগল তার কোনো ইয়ত্তা নেই।কথা হলো সমীরের মনমতো একটা মেয়ে চাই।যে মেয়ে সমীরের মতো বর পাবে,সে মেয়ে নিশ্চয় ভাগ্যশালী হবে,এ ব্যপারে কোনো সন্দেহ নেই।সমীর এম্‌.কম্‌.-এ ফার্ষ্ট ক্লাস ফার্ষ্ট।পুনে উনিভার্সিটি থেকে মাষ্টার ডিগ্রী নিয়েছিল সমীর।বিজনেস্‌ ম্যানেজ্‌মেণ্টে অনার্সও ছিল সমীরের।ফাইনান্স এবং মার্কেটিং-এ ভালো নোলেজ আছে সমীরের, আসলে সমীরের ইচ্ছে সে একজন বিসনেস্‌ টাইকোন হবে।তারজন্য তাকে যে পরিশ্রম এবং ষ্ট্রাগল্‌ করতে হবে লাইফে সেই চিন্তায় মাঝে মধ্যে সমীর নিজের  ব্যক্তিগত জীবনে বিবাহের গুরূত্বটা ঠিক বুঝে উঠতে পারে না।পারেনা বললে ভুল,পারার জন্য যে সময়টুকু দরকার তা সে সারাদিনে কাজের ব্যস্ততার চাপে বিবাহের ভাবনাটা একেবারেই চাপা পরে যায়।বাবা চিন্তা করবে ভেবে সমীর কাড়ে উঠে মোবাইল থেকে একটা ফোন করে দিল বাসায়,যে হাফ্‌এন আওয়ারের মধ্যে সে বাড়ীতে এসে পৌঁছবে।

মেরিন্ড্রাইভের রাস্তা,সমীরের কাড়টা হু-হু করে চলছে।গরমের দিন কাড়ের এ.সি.টা অন্‌ করতে ভুলে গেছিলো সমীর, তাই এত গরম অনুভব করছিল এতক্ষন, এ.সি.টা অন্‌ করে কাঁচের জানালার বাইরে মূহুর্তের জন্য ফলো করতেই কিছু যেন চোখে পড়ল।সমীরের কাড়টা বেশ এগিয়ে গিয়েছিল,ততক্ষনে সমীর ইতস্ততঃ বোধ করলো তারপর নিমিষের মধ্যে কাড়টাকে স্লো-করে আবার ব্যাক করলো সমীর।ঠীকই তো রাস্তার পাসে হাফ-দেওয়াল দিয়ে ঘেরা সারি-সারি নারকেল গাছ রয়েছে,সেখানে একটি মহিলা সাদা শাড়ী পরে চুলগুলো ঘার অবধি ছেরে দিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে আর এক দৃষ্টিতে সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে আছে,বাতাসও ছেড়ে ছিলো খুব।সমীর মহিলাটির ব্যাক সাইডটা দেখতে পাচ্ছে আর ভাবছে-এত রাতে এই মহিলা টি কে? কি করছে এখানে দাঁড়িয়ে;অদ্ভুত কাণ্ডতো।সঙ্গে  তো-কেউ নেই,সাথে কোনো লাগেইজ কিংবা কাঁধে কোনো ভেনিটীবেগও ঝুলানো নেই।গায়ে যে সাড়ীটা পরা তা-তো বেশ দামী শাড়ী পরিহিতা বোলে মনে হচ্ছে আর ব্যাক সাইডটা দেখে মনে হচ্ছে বেশ উঁচু ঘরের কোনো মহিলা।সমীর কাড়টাকে রোডের একপাশে ষ্ট্যাণ্ড করে মহিলাটির সামনে এগিয়ে গেল,ঠিক মহিলাটির পাশে গিয়ে দাঁড়ালো সমীর।মহিলাটির পাশে গিয়ে দাঁড়াতেই হয়তো মহিলাটি টেরপেয়ে ঘারটা মুভ করে আবার সামনের দিকে তাকিয়ে রইলো ঠিক আগের মত।সমীর বুঝতে পারলো তার আসার সংকেতটা বেশ বুঝেছে এবং তাকে হয়তো ওয়েলকামো জানিয়েছে মহিলাটি।ভারী সুন্দর দেখতে মহিলাটি,লম্বায় পাঁচ ফুট সাত হবে,পরনে তেমন কিছু নেই শুধু মাত্র গলায় একটি সোনার চ্যান ধারন করা।পায়ে সিম্পুল পাম্প-শু টাইপ জুতো পড়া,মাথার মাঝখান দিয়ে সিঁতি কাটা আর চুল গুলো বাতাসের জন্য এলো-মেলো হয়ে মুখের মধ্যে বার বার এসে জড়াচ্ছে।চোখ দুটো বেশ সুন্দর দেখতে,পাতলা ঠোঁট দুটো শান্ত স্নিগ্ধ ভাবে কিছু না বলার তপ্স্যায় ধ্যান মগ্ন অবস্থায় রয়েছে।সমীর মৃদু কাশীর ঝাকুনি দিয়ে নিজেকে তার পাশে আসাটা জাহির করলো এবং পকেট থেকে সিগারেটের প্যাকেটটা বার করে একটা সিগারেট মুখে দিয়ে লাইটারটা দিয়ে ধরালো।সেগেরেটটি দুই আঙ্গুলের মাঝখানে চেপে ধরে এক-দুবার টান দিয়ে মহিলাটির দিকে তাকিয়ে বলল-হ্যালো, আই এম সমীর,এন্ড আর ইউ?হোয়াট আর ইউ ডুইং হেয়ার?মহিলাটি জবাব দিলো-হোয়াই?আর ইউ ডিস্টার্ব ফিলিং?ও-ও সরি; নো-নো আয়েম ডোন্ট ফিলিং এনি ডিস্টার্ব।বাট,ইউ ডোন্ট মাইন্ড,দ্যান প্লীজ,ক্যান ইউ টেল্‌ মী ইউর ন্যাম?...প্লীজ।মহিলাটি তখন জবাব দিলো-মায় ন্যাম ইস্‌ সৃজা ঘোষ।একথা বোলে মহিলাটি আবার সামনের দিকে তাকিয়ে রইল।তখন সমীর বলল-ও দেট মীন্স আর ইউ বেঙ্গলী?এম আই রাইট্‌?মহিলাটি একঝলক সমীরের দিকে দেখে মাথা নেড়ে শাইদিল।তখন সমীর বলল বেশ এত বড় বোম্বে শহরে মাঝরাতে রাস্তার ধারে একজন সুন্দরী মহিলা একা-একা দাঁড়ীয়ে আছে তার ওপর আবার বাঙ্গালী ভাবাই যায়না।এ-তো একটা মিরাকেল ঘটে গেল দেখছি।সমীর মহিলাটিকে ভালো করে লক্ষ্য করল-দেখে মনে হলো মহিলাটির বয়স বেশী না,খুব জোড় আঠাশ-ঊনত্রিশ হবে।এডুকেটেট বলে মনে হলো।কিন্তু এতো রাতে এরকম একজন যুবতী মেয়ে একা-একা পথের ধারে কি করছে জানতে কৌ্তুহল হল সমীরের।সমীর জিজ্ঞাসা করল বেশতো ভালই মিলে গেলদেখি,আমিও তো বাঙ্গালী আমার নাম সমীর বোস।সৃজা তখন বলল কথা শুনেতো মনেই হল আপনি বাঙ্গালী।তা আপনি-বা এখানে কি করছেন।সমীর সিগারেটের ছাইটা টোকা দিয়ে ফেলে মুচকী হেসে বলল-এমন একজন মহিলাকে এতো রাতে নির্ঝুম রাস্তায় দাঁড়ীয়ে থাকতে দেখেকি চলে যাওয়া যায়।কিসের জন্য দাঁড়ীয়ে আছেন এখানে।কারোর জন্য অপেক্ষা করছেন কি?নাকি বাড়ীর থেকে রাগ করে বেড়িয়ে এসেছেন-সমীর বলল।তখন সৃজা জবাব দিলো,এই পৃথীবিটা যখন একলা মহাকাশে শূন্যে ঘুরে বেড়ায় তখন কী কারোর কাছে কোনো কৈফিয়ত দিতে হয়,কেন ঘুরছে,কিসের জন্য ঘুরছে।তাহলে আমি এখানে দাঁড়ীয়ে আছি তাতে কী অসুবিধে শুনি।আমাকে প্লীজ একলা ছেড়ে দিন, লীভ মী এলোন প্লীজ...।তখন সমীর বলল দেখুন মীস্‌ সৃজা আপনার কাছ থেকে চলে গেলে আমার যেমন কোনো ক্ষতি হবেনা ঠিক আপনিও কিছু হারাবেন না।কিন্তু এতো রাতে একটা অবিবাহিতা উপযুক্ত মেয়ে একা-একা এখানে দাঁড়ীয়ে আছেন,কতরকমের বিপদ আসতে পারে।আপনার কোথাও যেতে হলে বলুন, আমি আমার গাড়ী করে পৌঁছে দিয়ে আসতে পারি।সৃজা মুচকী হেসে আবেগের সুরে বলল উঠলো আমাকে পৌঁছে দিয়ে আসবেন কোথায়?সমীর বলল-কোথায় মানে,আপনি যেখানে যেতে চান বা যেখানে থাকেন সেখানে।সৃজা সমীরের দিকে এক মূহুর্ত তাকিয়ে বলল-আমার কোনো  থাকার নির্দিষ্ট জায়গা নেই বা যাবার  কোনো  নির্দিষ্ট গন্থব্য স্থল নেই।সমীর ভ্রু-কুঁচ্‌কে সৃজার দিকে পূর্ণ দৃষ্টীতে তাকিয়ে বলল তার মানে।সৃজা উত্তর দিল-হুঁ; আপনি যা কান দিয়ে শুনেছেন তাই।সমীরের মাথায় যেন একটা ঝাটকা লাগলো,কী বলছেন আপনি তাহলে কোথায় থাকেন? সৃজা তখন বিরক্তি অনুভব করছিলো,তায় সে রাগের  মাথায় বলল-আপাততো আপনার সামনেই আছি দেখতেই তো পাচ্ছেন।সমীর বলল,আসলে আই মীন আপনি কী এখানকার ডোমেস্টিক।সৃজা বলল দেখুন মিষ্টার আমি এখানকার ডোমেষ্টিক না ফোমেষ্টিক এই কৈফিয়ত আপনাকে কেনো দেব।আপনি কোথায় যাচ্ছিলেন যান তো,আমাকে ডিষ্টার্ব করবেন না প্লীজ।আমাদের মতো মেয়েরা এই সমাজে বেঁচে আছে কেবল প্রতিদিনের জ়ীবন সংগ্রামের সাথে নিজেদের অসহায় জীবনের লড়ায়ের মাধ্যমে, এর  বাইরে  আর  কিছু না। সমাজে এবং এই পৃথীবিতে যা কিছু হচ্ছে সব আপনাদের মত বড়-বড় লোকের জোড়ে,  প্রমোটারদের     জোড়ে,  নেতাদের     জোড়ে, রাজনীতির জ়োড়ে আর আমাদের মত অসহায় মেয়েরা তিল-তিল করে  সমাজের  একেকটা মানুষের সঙ্গে লড়াই করে চলছে তার সঙ্গে দিয়ে যাচ্ছে তাদের কামনা ইন্ধন।এবেলা সব পুরূষরাই টটস্ত এর বাইরে জিজ্ঞেস করো তাহলে নারী জীবনের তিরস্কার পৃথীবির মধ্যে প্রথম স্থান অধিকার করে আছে।তখন সমীর বলল-বুঝেছি আপনার ভিতর সমাজকে নিয়ে যে নারী বিদ্রহ জ্বলে উঠেছে তা আপনার কথা-থেকেই বুঝতে পারলাম।কিন্তু আপনি তো কেবল গোটা পৃথীবিকে এভাবে দোষ দিতে পারেন না।এবং গোটা সমাজের মানুষকে দোষারোপ করতে পারেন না।অন্তত্য আমাকে এর থেকে বাইরে রাখতে পারেন।আর আমিও ঠিক আপনাকে বুঝতে পারছি না কারন, ঠিক-ঠিক খুলে আই মীন আপনি আপনার না থাকার ঠিকানার কথা বলছেন না কোথাকার মেয়ে,কোথায় থাকেন, কিংবা কোথা-থেকে এসেছেন সে কথা বলছেন,যার জন্য আমি আপনার জীবন রহস্যটাকে খুঁজে বার করতে পারছি না।তখন সৃজা বলে উঠল মানুষের জীবনের রহস্যটা খুব ক্রিটিক্‌ল জানেন,আর একটা নারীর জীবনের রহস্যতো আরো বেজাল।আচ্ছা আপনি কী কখনো আপনার মা-কে প্রশ্ন এই করেছিলেন যে আপনার জন্মের কারন আপনার মা-ইবা কেন?সমীর তখন বলল-দেখুন মীস্‌ সৃজা মায়েদের কাছে সন্তান্দের কোনো বিকল্প প্রশ্ন থাকেনা। আর এ করাও পাপ।তখন সমীরের মুখের কথা কেড়ে নিয়ে সৃজা একটু হেসে বলে উঠল পাপ...হোয়াট ইস্‌ দীস্‌?এইটি আবার কী,পাপ পূণ্যের এই জোড়ালো আর অহেতুক প্রশ্ন এই একুবিংশ শতকের যুগে এর কোনো স্থান নেই।তাছাড়া সংবিধানের পাতায় পাপ-পূণ্যের হিসাব-নিকাসের কোনো হিতপদেশের গল্প তৈ্রী করা হয়নি,আর এ কোনো আপ্তবাক্যের নিয়ম মেনে চলে না,চলে শুধু সংবিধানের ভাষায় যা পাপ পূণ্যের অলৌ্কিক কথায় নয়।

সমীর তখন বলল,আসলে আপনি থাকেন কোথায়,বোলবেন তো।কোনো ঘর ছাড়া, পরিবার ছাড়া আপনি একা-একা এ আমার ভাবতেও কেমন লাগছে।আপনার পরিচয়টি দিলে আমি খুশি হবো। দুর্নিতীতে ভরা এই সমাজে বহু নারীর পরিচয় থাকে না,থাকবার কোনো বাড়ী-ঘর থাকে না বা নির্দিষ্ট কোনো স্থানও থাকে না।সমীরের মনের ভিতর একটা ইন্টারেস্‌স্টিং ভাব জমে উঠেছে।সে বলল আপনি করেন কী,দেখতেও ভারি সুন্দর,আপনাকে দেখেত এখানকার বলিউডেড় যে-কোনো ডিরেক্টোর নিয়ে নেবে।তা একবার ট্রাই নিয়ে দেখছিলেন কী মীস্‌ সৃজা। সৃজা বলল দেখুন মিষ্টার অহেতুক প্রশ্ন না করে আপনি বাড়ী চলে যান।রাত অনেক হয়েগেছে আর আপনার বাড়ীতে আপনার স্ত্রী না খেয়ে হয়তো বসেও আছে।স্ত্রী...কে স্ত্রী,কার স্ত্রী...হ্যালো মীস্‌ আমি কোনো  বিয়ে-সাদী কোরিনি যে আমার স্ত্রী থাকবে।  বাড়ীতে বাবা-মা ও সার্ভেন্ট আর আমি ছাড়া কেউ নেই।ও-তাই বুঝি বলল সৃজা।তখন সমীর ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বলল দেখুন সাড়ে-এগারটা বাজতে চলল,আপনি এভাবে দাঁড়িয়ে নাথেকে আপনি আমার সাথে আমার বাড়ীতে চলুন,কাল সকালে নয়তো আপনি চলে যাবেন আপনার জ়ায়গায়।সৃজা বিরক্তির স্বরে একমূহুর্ত সমীরের দিকে তাকিয়ে বলে উঠল কী ফালতু বকছেন যানতো আপনি বাড়ীতে,আপনার সঙ্গে কথা বলাটাই ভুল হয়েগেছে।আপনেরা ভদ্র ঘরের ছেলে,চুপচাপ করে চলে যানতো।এ-খানে আমার সঙ্গে দাঁড়িয়ে থেকে আপনার সময় এবং আপনার ইমেজ নষ্ট করছেন কেনো।সমীর তখন বলে উঠল যাক বাবা এতো রাতে এক অসহায় মেয়েকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে...অসহায়; কে-অসহায়?সমীরের মুখের কথা কেড়ে নিয়ে বোলে উঠল সৃজা।আমি অসহায়,কে বলল আপনাকে আমি অসহায় বলুনতো,কে বলল?না মানে আমি...আমি মানে,কি জানতে চান আপনি;আমি এখানে একা কেন তাই না? আপনি এ-কথা জেনে কি করবেন?,আমাকে নিয়ে কোনো মহাকাব্য রচনা করবেন বুঝি?সৃজা একটু রাগ হয়েই এ-কথাগুলো বলল সমীরকে।সমীর বলল দেখুন আমি কোনো কালিদাস নই কিংবা মিলটন নই যে আপনাকে নিয়ে কাব্য রচনা করবো।তাছাড়া আপনি যদি আমাকে ভুল বুঝেন,তা-সে আপনার  ভুল। দেখুন  মিষ্টার নারীকে দিয়ে কাব্য রচনা যে-কেউই করতে পারে,আপনি না-পারতে পারেন তা সে আপনার কমজুরি।তখন সৃজা সমীরের মুখোমুখি হয়ে দাঁড়ালো,আর হাত জোড় করে বলল-দেখুন আপনি এখান থেকে চলে যান,বেমালুম আপনি আমাকে অযথা প্রশ্ন করে আপনার সময় নষ্ট করছেন আর আমাকে যন্ত্রনা দিছেন।সমীর সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে সিগারেটের অবশেষটুকু ফেলে দু-হাত দেওয়ালের উপর ভর দিয়ে সৃজার দিকে এক ঝলক তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলো,আপনাকে দেখে তো মনে হচ্ছে একজন ভালো শিক্ষিতা মেয়ে,তা আপনি কতদূর পড়াশুনা করেছেন বলতে পারবেন।তখন সৃজা একটা দীর্ঘ শ্বাস ফেলে সমীরকে উত্তর দিলো হয়তো উত্তরটি দেওয়ার কোনো ইচ্ছেই ছিল না সৃজার।সমীরের এতোভাবে নাছড়বান্দার জন্যই হয়তো সে দিতে বাধ্য হলো।আমি আমার নিজের জন্য যতটুকু পড়াশুনা করেছি,তা-আমার জন্য বদহজমি হয়ে গেছে।কেন?সমীর জিজ্ঞেস করে।কেন,তার উত্তর আমার নিজেরও জানা নেই।সৃজা তখন বলতে শুরূ করে...আমি ইংলিসে অনার্স নিয়ে এম.এ. কম্‌প্লীট করেছিলাম।তারপর নিজেকে নিয়ে যতটুকু স্বপ্ন দেখেছিলাম সব এই সমুদ্রের জলরাশির ডেউ-এ কোথায় ভাসিয়ে নিয়ে চলে গেছে,বুঝতেই পারলাম না।সমীর তখন জিজ্ঞেস করলো আচ্ছা আপনি কোথা-থেকে মাষ্টার ডিগ্রীটা নিলেন?সৃজা কতখন চুপ করে থেকে বলল-আসামের গুয়াহাটী উনিভার্সিটি থেকে।আসাম!সমীরের চোখ-দুটো চরক  গাছ  হয়ে উঠল। কি বলছেন আপনি, আই মীন আপনি কী আসামী।সৃজা বলল হ্যাঁ!আমি আসামী।আসামেই গুয়াহাটী শহরে আমার জন্ম।ছেলেবেলা অর্থাত স্কুল লাইফ আর কলেজ লাইফ আমার গুয়াহাটীতেই।আমি একসময় লেখা-লিখিতে খুব পাগল ছিলাম।সেখানকার লোকাল প্যাপারে অর্থাত ‘দি আসাম ট্রিবিউনে’এডিটরিয়াল পেজ এবং হরাইজন-কলামলীস্টে অনবরত লেখা-লিখি করতাম আমি।বিভিন্ন টপিক্সের উপর লিখতে ভালোবাসতাম।এর পর ভারতের বেশ ভালো-ভালো বাংলা ও ইংরাজী পত্রিকায় আমার লেখা ছেপে ছিলো।কিন্তু ভাগ্যের পরিহাস এমন হলো যে এগুলো আর কিছুই রইলো না আমার,সময়ের স্রোতে আজ আমার সব কিছু মুছে গেছে আমার জীবনের মানচিত্র থেকে।

সৃজা একটা দীর্ঘ-শ্বাস ফেলে এক মূহুর্তের জন্য সমীরের দিকে তাকালো আর বলল অবাগ লাগছে তাই-না।আপনি হয়তো ভাবছেন আমি এই বোম্বে শহরে এলাম কী করে আর এই এতো বড় শহরে আমি করছিই বা কী।সত্যিই তো-আপনি আমার মনের কথা বলেই ফেলেছেন,আর আমিও ভাবছি আপনার লুক-আপ,আপনার কথা শুনে-তো মনে হয় না যে আপনি কোনো সাধারন মেয়ে বোলে।বাইদাওয়ে এবার বলুন তো আপনি কি করে এখানে  আসলেন।সৃজা তখন বলল সে অনেক কথা। সো - প্লীজ আমি আমার পুরনো কথা রিপীট করতে চাই না এবং আপনি আমাকে বাধ্য করবেন না।দেখুন আপনি যখন আমার সাথে এতসব কথা শেয়ার করেছেন তাতে নিশ্চয় আপনি বুঝতে পেরেছেন যে আমি কোনো চোর কিংবা গুণ্ডা বদমাইশ নই।আর যদি একান্তই আমাকে নিয়ে কোনো আপনার মনে দিধা থাকে তাহলে...তখন সৃজা  একগাল হেসে বলল-খারাপ ভালো বিচার করে আমার কোনো লাভ নেই আর আমার কাছে এর কোনো দাম নেই। মানুষের ভালো-মন্দ জেনে আমার আমার কী হবে।যখন ভালো-মন্দটাকে বোঝার প্রয়োজন ছিল,জানার ছিলো,তখনি-যখন পারিনি এখন আমার কাছে এর কোনো ভেলু নেই।তখন সমীর বলল আচ্ছা কী হয়েছে আপনি একটু খুলে বলুন তো,এ কথার সাথে-সাথে আর একটি সিগারেট বার করে ধরালো সমীর।এরপর এক-দুবার সিগারেটে টান দিলো সমীর।একটা দীর্ঘ শ্বাস ফেলে সৃজা বলে উঠল-জানেন তো একটা মানুষ তার জীবনের সরলতাটুকুর জন্যই তার দেহ,মন প্রবৃত্তির অনুশাসন মেনে চলতে বাধ্য হয়।আর এই সরলতা যখন কোনো জটিল ক্ষপ্পরে পরে তখন তার জীবনটি দিসাহারা হয়ে জীবনের উল্টো-পথে চলা শুরূ করে।তখন সৃজা সমীরকে বলল জানেন,একটা লাইফের কণ্ডিসান কিরকম।তখন সমীর প্রশ্ন কী-রকম।তখন সৃজা বলল-বিনিময় ইয়েস্‌ এই বিনিময় যে কোনো মানুষের জীবনের কণ্ডিসান।তারমানে সমীর বলে উঠল।সৃজা বলল এর মানে ভেরী সিম্পুল,কিছু পেতে গেলে কিছু দিতে হয়।ইকনোমিক্সের ডিমান্ড ডেফিনেসান এই ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।তাই-তো রবীঠাকুর বলেছিলেন-‘কোনো মূল্যবান জিনিষকে তার মূল্য না দিলে মূল্যবান জিনিষ কখনো নিজের করা যায় না’।তাই আমাদের জীবনে বিনিময় প্রথাটা সবচেয়ে বেশী গুরুত্বপূর্ণ। আজ থেকে সাত-আট বছর আগের কথা আমি তখন সবে-মাত্র মাষ্টার ডিগ্রী কম্‌প্লীট করেছি,পি.এইচ.ডি. করার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম।গুয়াহাটী মালিগাওঁতে আমাদের বাড়ী ছিলো।বাড়ীতে আমি এবং আমার মা থাকতাম।বাবা বি.এ. পড়াকালীন ইহলোক ত্যাগ করেছিলেন।সাধারন রেলওয়ে কর্মচারি ছিলেন কিন্তু মাইনে খুব একটা বেশী ছিলো না।রিটায়ার করেছিলেন।মা পেনশন পেতেন।একদিন হঠাত করে মা অসুস্থ হয়েপরে।সেখানে আত্মীয়-স্বজন বলতে কেউ ছিলো না।যারা ছিলো তারা আমাদের কোনো বিশেষ প্রয়োজনে আসেনি।চিকিতসা করে ধরা পরলো মার ক্যান্সার হয়েছে।লিভার-ক্যান্সার।ডাক্তারদের বলামতে মাস দু-এক মা বেঁচে থাকবে।এরপর ডাক্তারদের পরামর্শ মতে বোম্বে জগজীবনরাম ক্যান্সার হাস্পাতালে রেফার করা হ’ল এবং সেখানে গিয়ে টাটা-ক্যান্সার হাস্পাতাল থেকে মায়ের চিকিতসাটা করানো হবে বলে সমস্ত কিছু ব্যবস্থা করা হ’ল।ডাক্তাররা প্রথমবার মানাই করেছিল কিন্তু আমার অবস্থা দেখে শান্তনাটুকু দেবার জন্য এমনটা ডিসিসন নেওয়া হ’ল।মা-ছাড়া আমার এই পৃথীবিতে আছেই-বা কে তখন।জগজীবনরাম হাস্পাতালটি সরকারী হাসপাতাল।প্রথমে রেলের থ্রুতে এখানে পাঠানো হয়, এর পর সেখান থেকে পেসেণ্টকে টাটা ক্যান্সার হাস্পাতালে নিয়ে যাওয়া হয় চিকিতসার জন্য।এরআগে কোনো দিনও বোম্বে শহরে আসিনি,জানিও না কী-থেকে কী করতে হয়।সবার কাছ থেকে অর্থাত যারা আগে এখানে এসেছিলো তাদের কাছ থেকে কিছুটা জেনে নেওয়া হ’ল।এবং এখানে আসার জন্য তৈ্রী হতে লাগলাম।দূর দেশে আসব মায়ের চিকিতসার জন্য,হাতে পয়সা-কড়ি তেমটা নেই।বাবার অনেক ধার থাকায় সেই ধার পরিষোধ করতে রিটায়ারের সমস্ত টাকা বাইরে পাওনাদারকে মিটিয়ে দেওয়া হ’ল।নিজে যা দু-একটা টিউশন করতাম তা দিয়ে কনমতে চলে যেত আমাদের দুই মা-মেয়ের।এরপর ব্যাংকের থেকে মার নামে লোন নিলাম পঞ্চাশ হাজার টাকা আর মাকে সঙ্গে করে নিয়ে বোম্বে রওনা হলাম।গুয়াহাটী থেকে ‘দাদার-এক্সপ্রেস্‌’ ট্রেনটি বোম্বে ‘দাদার’ স্টেষনে মাঝ রাতে এসে পৌঁছলো রাত তখন একটা।আমি মাকে সঙ্গে করে নিয়ে একা টেক্সি ভাড়া করে বোম্বে সেন্ট্রাল রওনা হলাম।কিন্তু ভাগ্যের পরিহাসে টেক্সি ডাইভারটা যে শয়তান ছিল কে জানে আমাদের অপরিচিত দেখে অন্য রাস্তায় এনে তাদের দল-সহ আমাদের জেরা করে।এরপর আমি আর মা-দুজনেই চিকিতকার করতে লাগলাম,হ্যাল্‌প মী,বাঁচান...বাঁচান...। কেউ শুনলো না সব পয়সা-কড়ি কেরে নিয়ে,যা কিছু ছিল সবটাই নিয়ে নেয় তারা।আর আমার গায়ের উপর দস্যুগুলো ঝাপিয়ে পড়ল,সব সর্বনাস করে ফেললো আমার,কিছু বাকী ছিলনা।এদিকে মা অসহায় হয়ে চিকিতকার করতে থাকে আমার মেয়েকে বাঁচান,আমার সৃজাকে বাঁচান...।সারা রাত ধরে ওই পিশাচগুলো আমার গায়ের ওপর পরে আমাকে সর্বনাস করতে লাগলো কিছু করার ছিল না,সেদিন কোনো ভোগবান ছিল না আমাকে রক্ষা করার।টাকা-পয়সা সব নিয়ে চলে গেল শয়তান পিশাচগুলো।তখন হুঁস্‌!হাড়িয়ে ফেলে ছিলাম।পরের দিন সকালে আমার জ্ঞ্যান ফিরেছিল।রাস্তার এক ধারে আমি মার কোলে মাথা রেখে শুয়ে ছিলাম।আমাকে বুকে জুড়িয়ে হাউ-হাউ করে কাঁদতে লাগলো,তার সাথে আমিও।যা হবার তো হয়েই গেছিল এর পর নিজেকে সামলিয়ে মাকে নিয়ে বোম্বে সেন্ট্রালে পৌঁছলাম।তারপর মাকে হাস্পাতালে এড্‌মীট করালাম।হাতে কোনো পয়সা-কড়ি নেই।সমাজের চোখে আমি নষ্ট মেয়ে তাই জীবনের সব সুখ,শান্তি,আনন্দ আর ভালোমন্দ চোলে গিয়েছিল আমার জীবন থেকে।মা চাইছিল না চিকিতসা করাবে বোলে কিন্তু আমিও ভাবলাম এছাড়া আর উপায় কী,কোথায় যাব,কী ভাবে যাব কোনো কিছু আর বাকী নেই তাই।ঠিক করলাম জীবন যখন নষ্ট হলোই তখন এই নষ্ট আর আকর্ষনীয় শরীর দিয়েই আমি পয়সা রোজগার করবো আর মায়ের চিকিতসা করাবো।শুরু হ’ল আমার জীবনের প্রথম শরীর ব্যবসা দিয়ে পয়সা রোজগার করা। তা দিয়ে মায়ের চিকিতসা শুরু করলাম।


কিন্তু একদিন মা আমাকে ছেড়ে এই পৃথীবি থেকে বিদায় নিল।এর পর আমি একা এই পৃথীবিতে।আমার জীবনে আর কিছু বাকী রইলনা সব নিঃষেস হয়ে গেল।এখন অবশ্য অভ্যাস হয়ে গেছে। এই ছিল সৃজার জীবনের কাহিনী।

তখন সৃজার চোখ দিয়ে দু-এক ফোঁটা জল নেমে আসল,তখন সৃজা সমীরের দিকে তাকিয়ে বলল কী স্বাদ মিটলো আপনার।এটাই একটি নারীর জীবন যুদ্ধ।আজও আমি টিকে আছি এই সুন্দর রুপ আর এই আকর্ষনীয় দেহের বিনিময়ে বুঝলেন মশাই।এবার আপনি বাড়ী ফিরে যান আর আমাকে এখানে দাঁড়িয়ে থাকতে দিন।সমীরের যেন কথা বলার বাক-শক্তি হাড়িয়ে ফেলেছে।ঠিক সেই সময় একটা অন্য-কাড় এসে দাঁড়ালো রাস্তার ধারে আর হর্ন বাজাতে লাগলো।সৃজা পিছন ফিরে চাইলো আর তার সাথে সমীরও।দেখলো সাদা কালারের একটি কাড়ের ভিতর ভদ্র পোষাক পরিহিতা একজন লোক এসে সৃজাকে হাত দিয়ে ডাকছে।সৃজা চোখের জল মুছে সমীরকে বলল-বাই মীষ্টার আপনার সাথে কথা বোলে ভালো লাগল,আপণী আমার সময়টা পাস্‌ করেছেন ভালো।একগাল হেসে সৃজা সমীরকে আবার বলল,আপনার শুধু-শুধু সময়টা নষ্ট হ’ল।ততোক্ষনে লোকটি কাড়ের থেকে বেড়িয়ে সৃজার কাছে এসে দাঁড়ালো আর সৃজার কোমর ধরে বলল-কী ব্যপার চলো। তখন সৃজা হুঁ! বলে  সমীরকে বলল তাহলে আসি মীষ্টার সমীর বোস আমার পার্টী এসে গেছে।আমায় এখন যেতে হবে।তখন লোকটি সৃজাকে বোলে উঠল,কী ব্যপার নতুন কন্ট্রাক হচ্ছে-নাকী।সমীর একটু রেগে গিয়েছিলো কিন্তু রাগটাকে কাবু করে সৃজার জন্য খুব দুঃখ হ’ল।সে এক করুণ দৃষ্টিতে সৃজার দিকে তাকিয়ে থাকলো।সৃজা লোকটার হাত ধরে চলে গেলো কাড়ে করে।

আর সমীর সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে সিগারেটের অবশেষটুকু সমুদ্রের মধ্যে ফেলে দিয়ে দাঁড়ীয়ে রইল।যেন এক অভিশপ্ত রাতে তার সাথে কোনো এক অভিশপ্ত ঘটনা ঘটে গেল।


Palash De - Poet Elocutionist from Assam, IndiaPalash Dey wrote his first poem and a story in school during Class 6.  He is a Central Committee  member of Bishwabanga Sahitya O Sanskriti Sanmelan and a regular contributor to Bengali literary magazines like “Prantik” published by the Nikhil Banga Sahaitya Sabha, Kokrajhar, Assam and a freelancer for some news-papers. Palash Dey lives in Bongaigaon, Assam and can be reached by e-mail at poet77.palash@gmail.com

Enhanced by Zemanta