মাইনাস - শুকদেব চট্টোপাধ্যায়, রহড়া | Minus - A Bengali Short Story by Sukdeb Chatterjee - WBRi Online Bengali Magazine

SUKDEB CHATTOPADHYAY"Minus" is a Bengali short story by Sukdeb Chatterjee of Rahara in unicode Bangla font published in WBRi Bengali Online Magazine section. You can send your creative writing to submissions@washingtonbanglaradio.com for consideration towards publication.


মাইনাস

শুকদেব চট্টোপাধ্যায়, রহড়া


কয়েকমাস হল অজয় এই ব্র্যাঞ্চে এসেছে। আগে যে সব ব্র্যাঞ্চে ছিল এটা তার থেকে অনেকটা আলাদা। আলাদা অফিসের কাজের নিরিখে নয়। ব্যাঙ্কের কাজ তো সব যায়গায় একই রকম। তফাতটা গ্রাহকদের ক্ষেত্রে। এখানে একাউন্ট হোল্ডারদের সিংহভাগই সিনিয়র সিটিজেন। বয়স্ক লোককে সামলান বেশ কঠিন কাজ। শারীরিক, মানসিক, আথির্ক, পারিবারিক, নানারকম সমস্যার কারণে এঁদের মন মেজাজ অনেক সময়েই ভাল থাকে না। পরিষেবায় এঁদের তুষ্ট করতে গেলে একটু বেশি সহিষ্ণুতার প্রয়োজন। অজয়ের এই গুনটি  আছে।
অজয় ক্যাশে বসে। একদিন কাউন্টারে বসে টাকা গুনছে এমন সময় কানে এল—আরে আপনি এখানে !
তাকিয়ে দেখে আগের ব্র্যাঞ্চের এক কাস্টোমার । নাম কেশব সেন। কোলকাতা বন্দরে ডেক অফিসার ছিলেন। একবার অজয়কে ওনার জাহাজে নিয়ে গিয়ে অনেক আপ্যায়ন করেছিলেন। সেই প্রথম ও কোন জাহাজের ইঞ্জিন রুমে ঢুকেছিল। ভদ্রলোক সু-স্বাস্থ্যের অধিকারী।
---এই কয়েক মাস হল এখানে এসেছি।
---ভালই হল, নিজের লোক একজন পেলাম।
কেশব বাবুর গলায় কলার দেখে অজয় জিজ্ঞেস করল---স্পন্ডিলাইটিস হয়েছে?
ম্লান হেসে বললেন---ওটা তো এটা সেটা করে বাগে আনা যায়। আমার রোগটা বড় বেয়াড়া, বাগ মানে না।
কলারটা খুলে দেখালেন। গলায় একটা ফুটো করা। ক্যানসার, কেমো চলছে।
যাওয়ার আগে কেশব বাবু করমদর্নের জন্য হাত বাড়াতে নিজের হাত এগিয়ে দিয়ে অজয় বলল—ভাল থাকবেন।
ভদ্রলোকের গলা বসে গেছে। ক্ষীণ স্বরে বললেন—ভাল তো সকলেই থাকতে চায় ভাই।
অজয়ের মনটা খারাপ হয়ে গেল।
আর এক দিন এক বৃদ্ধ কাউন্টারে হাত ঢুকিয়ে বললেন---এই নাও।
অজয় জিজ্ঞেস করল—কি ?
---প্রশ্ন নয়, দিচ্ছি খেয়ে নাও।
হাতে পড়ল কয়েকটা শুকনো আমলকী। এক একজন কত সহজে অপরিচিতকে আপন করতে পারে।
এক সহকর্মী পাশ থেকে বলল---ওনার বয়স প্রায় পঁচাশি।
ভদ্রলোক বেশ ধমকের সুরে বললেন—কি যা তা বলছ, পঁচাশি কবে পার হয়ে গেছে।
সুন্দর ছিপছিপে হাসিখুশি চেহারা।
---আপনাদের দেখলেও ভাল লাগে। আসবেন মাঝে মাঝে।
---আসব বৈকি। ভালবাসি, তাইতো আসি, বয়স যদিও অষ্টআশি।
অজয়ের মনটা খুশিতে ভরে গেল। এমন মানুষকে জোরের সঙ্গেই বলা যায়—‘ভাল থাকবেন’।
কিছু কথা কাউন্টারে বসলে গতানুগতিকভাবে সকলকেই বলা হয়। যেমন ‘কি নোট দেব’ বা ‘টাকাটা গুনে নেবেন’ ইত্যাদি। একদিন, একজন বয়স্ক মানুষকে পেমেন্ট দেওয়ার পর, অজয় ‘টাকাটা গুনে নেবেন’ বলাতে উত্তর এল---আমি গুনিনা ভাই। হিসেব নিকেশ করা অনেকদিন ছেড়ে দিয়েছি। হিসেব মেলে না। এই কটা টাকায় আর কত মাইনাস হবে! আমার সারা জীবনটাই মাইনাসে ভরা। এখন ফাইনাল মাইনাসের জন্য দিন গুনছি।
কথাগুলো বলে টাকাটা পকেটে ঢুকিয়ে ভদ্রলোক আস্তে আস্তে বেরিয়ে গেলেন। একটা ছোট্ট কথার কি প্রতিক্রিয়া। একে ‘ভালো থাকবেন’ বলা  অথর্হীন। কারণ, মানুষটার ভাল থাকার ইচ্ছেটাই হারিয়ে গেছে। মুখটা ভোলেনি। পরের মাসে টাকা দেওয়ার সময় আবার কি শুনতে হবে এই ভয়ে অজয় ওনার সাথে কোন কথা বলেনি।
ভদ্রলোক জিজ্ঞেস করেছিলেন---ভাল আছেন তো ?
অজয় কেবল মাথা নেড়েই উত্তর দিয়েছিল।
অজয় খুব ভাল শ্রোতা। এজন্য বৃদ্ধরা ওকে খুব পছন্দ করে। সংসারে যাদের কথা শোনার লোক কম, তারা অমন আগ্রহী শ্রোতা পেলে তার কাছে দুটো সুখ দুঃখের কথা বলে মনের ভার কিছুটা লাঘব করবে এটাই তো স্বাভাবিক। প্রথম দিন ওইরকম বিচিত্র অভিজ্ঞতা হলেও এই মানুষটার সাথেও বার কয়েক দেখা সাক্ষাতের পর ধীরে ধীরে অজয়ের বেশ মধুর সম্পর্ক গড়ে উঠল। ব্যাঙ্কে এলে কাজের বাইরেও একটু আধটু কথা বা গল্প গুজব হয়। কথা বাতার্তেও আগের মত অতটা হতাশা থাকে না।
এক শনিবার ব্যাঙ্কে কাজ মেটার পর ভদ্রলোক অজয়কে বললেন---আজ অফিসের পরে তুমি ফ্রি আছ ?
---তেমন কোন কাজ নেই। কেন বলুন তো ?
---আমার বাড়িতে যাবে ? বাড়ি বেশি দূরে নয়। আর তোমাকে বেশিক্ষণ আটকাব না।
বুড়ো মানুষ অমন করে বললে মুখের ওপর না বলা মুশকিল।
---ঠিক আছে, আপনি একটু বসুন আমি কাজ শেষ করে আসছি।
অজয় মানুষটার মুখে একটা খুশির ভাব লক্ষ্য করল। 
ব্যাঙ্ক থেকে বেরিয়ে রিক্সয় চেপে ভদ্রলোকের বাড়ি পৌঁছাতে মিনিট সাতেক লাগল। দোতলায় দু কামরার একটা ফ্ল্যাট। মোটামুটি পরিচ্ছন্ন।
---বস, আমি একটু কফি করে আনি।
---না না থাক না।
---তোমার অস্বস্তির কোন কারণ নেই। রান্না বান্নায় আমি বহুদিন থেকেই অভ্যস্ত। এতো সামান্য কফি। বস, আমি এখনি আসছি।
অজয় সোফায় বসে ঘরের চারধারটায় একবার চোখ বোলাল। আসবাবপত্রগুলো বেশ রুচিসম্মত। আলমারি আর র্যাকেতে প্রচুর বই। দেওয়ালে কয়েকটা ছবি টাঙান। একটাতে দুটি শিশু গলা জড়িয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আর একটা ছবিতে যৌবনকালে ভদ্রলোক এবং পাশে মনে হয় ওঁর স্ত্রী, আর দুজনের কোলে দুটি বাচ্চা। আর ওই মহিলারই একটা বড় ছবি পিছন দিকের দেওয়ালে রয়েছে। বেশ সুন্দরী। আর দরজার ঠিক মাথায় মাঝ  বয়সী এক ভদ্রলোকের ছবি।
একটু বাদে দু কাপ কফি আর একটা প্লেটে কিছু স্ন্যাক্স নিয়ে ভদ্রলোক ঘরে ঢুকলেন।
---এখানে আপনি একাই থাকেন ?
---হ্যাঁ ভাই, সাথে তো আর কাউকে রাখতে পারলাম না।  
---আপনি কি অবিবাহিত ?
---আমার জীবনটা বড় বিচিত্র ভায়া।
---কি রকম ?
---বাড়ি যাওয়ার তাড়া নেই তো ?
---সেরকম কিছু নেই। সন্ধ্যের দিকে গেলেই হবে। তবে আমার কৌতূহলটা বোধহয় একটু বেশি হয়ে যাচ্ছে তাই না ? 
---হয়ত আগে তোমার মত আগ্রহ কেউ দেখায়নি, তাই এই প্রথম কারো কাছে আমার জীবনের ঘটনা বা দুঘর্টনাগুলো জানাতে মন চাইছে। তুমি তো একটু আধটু লেখালিখি কর, দেখ হয়ত গল্পের কিছু রসদ পেলেও পেতে পার।
এরপর বৃদ্ধ তাঁর অতীতের পাতাগুলো আস্তে আস্তে ওলটাতে শুরু করলেন। বাবা-মা আহ্লাদ করে নাম রেখেছিল আনন্দময়। আনন্দময় দাস। ঈশ্বর অলক্ষ্যে হেসেছিলেন। জীবনে কোন আনন্দই তার দীঘর্স্থায়ী হয়নি। বরং দাস পদবীটা অনেক মানানসই। জীবনের অনেকটাই কেটেছে লোকের দাসত্ব করে আর গালমন্দ শুনে। বাবা ছোট একটা বেসরকারি অফিসে কাজ করত। সংসারটা কোনরকমে চলত। সঞ্চয় কিছুই ছিল না। তাই বাবা মারা যাওয়ার পর পাঁচ বছরের শিশু মায়ের সাথে দাদুর বাড়িতে গিয়ে উঠতে বাধ্য হয়। দাদু তখন রিটায়ার করেছে। তাঁর তিন মেয়ে আর এক ছেলে। আনন্দর মা সবার বড়। ছেলে ছোটখাট একটা চাকরি করে। মাইনে সেরকম কিছু নয়। ছোট মেয়ের তখনও বিয়ে হয়নি। সংসারের আথির্ক অবস্থা এমনিতেই সঙ্গিন তার ওপর আরো দুটো গলগ্রহ বাড়ল। বাবা তো, তাই কষ্ট হলেও ফেলতে পারেনি। বাড়িতে ঘর মাত্র দুটো। তার মধ্যে একটা বেশ ছোট। ছোট ঘরটাতে ছেলে থাকে, আর অপেক্ষাকৃত বড় ঘরটায় বিপত্নীক বৃদ্ধ আর তার ছোট মেয়ে থাকে। মেজো মেয়ে জামাই এলে আবার ছোট ঘরটা ওদের ছেড়ে দিতে হয়। আনন্দ আর ওর মার ঠাঁই হল সামনের বারান্দার একটা কোনে। ওটাই তখন ওদের কাছে অনেক। মাথার ওপর একটা ছাদ আছে আর দু বেলা দু মুঠো খাবার তো জুটছে। 
আনন্দর মা অনুভার একটা সেলাই মেশিন ছিল। আর সেলাইটাও ভাল পারত। সংসারের কাজের ফাঁকে পাড়া প্রতিবেশীদের জামা কাপড় সেলাই করে দিত। সামান্য হলেও কিছু আয় হত। বছর খানেক এভাবে কাটল।
---অভাবে আর কষ্টে বড় হওয়ার ফলে আমার কখনও কোন চাহিদা বা প্রত্যাশা ছিল না। যখন যতটুকু পেয়েছি তাতেই সন্তুষ্ট থেকেছি। কিন্তু ওই সামান্য পাওয়াটাও বোধহয় বিধাতার পছন্দ হয়নি।
বেল বাজল। আনন্দ গিয়ে দরজা খুলে পিওনের হাত থেকে একটা খাম নিয়ে ঘরে ঢুকে ওটা না খুলেই টেবিলে রেখে দিল।
---ছেলের চিঠি।
---পড়ে নিন না, পরে কথা হবে।
---না না, তেমন দরকারি কিছু নয়। না খুলেই বলতে পারি ভেতরে কি লেখা আছে। পরে পড়ব।
অজয় বুঝল যে চিঠিটা পড়ার সামান্যতম আগ্রহও বুড়োর নেই।
---হ্যাঁ, যা বলছিলাম, আমার কোন সুখই জীবনে বেশিদিন টেকেনি।
আবার শুরু হল এক দুঃখী মানুষের আত্মকথা। এক এক করে বেরিয়ে আসতে লাগল অন্তরে বহুদিন জমে থাকা হতাশা, বেদনা, বঞ্চনা আর ক্ষণিকের সুখের মুহূতর্গুলো।
মামার বাড়িতে আশ্রয় নেওয়ার বছরখানেক বাদে আনন্দর দাদু মারা যায়। আর তখন অনুভা বুঝতে পারে যে মাথার ওপর কংক্রিটের ঢালাই নয়, তার বাবাই ছিল সংসারের আসল ছাদ। কিছুদিনের মধ্যেই পরিস্থিতির চাপে ছেলেকে নিয়ে ও বাড়ি ছাড়তে হল। এক প্রতিবেশীর দয়ায় ঠাঁই পেল মেয়েদের একটা আশ্রমে। সারাদিন আশ্রমের নানান কাজ করতে হত আর বিনিময়ে জুটত দুজনের দু মুঠো অন্ন। কাজের প্রয়োজনে আর ব্যবহারের গুনে  অল্পদিনেই অনুভা আশ্রমের সকলের প্রিয় হয়ে উঠল। ছেলেকে একটা স্কুলে ভর্তি করল। আনন্দর লেখাপড়ায় আগ্রহ ছিল। এত অভাব অনটনের মধ্যেও ভাল নম্বর পেয়েই পরীক্ষা গুলোয় পাশ করত।
আনন্দ তখন ক্লাস সেভেনে পড়ে। একদিন স্কুল থেকে ফিরে দেখে মা বিছানায় শুয়ে আছে। অনুভা অসময়ে শোওয়ার মানুষ নয়। শরীরটা তার কদিন থেকে ভাল যাচ্ছে না। মাঝে মাঝে কাশি হচ্ছে। আর কাশি একবার শুরু হলে তা চট করে থামে না। আনন্দ বুঝতে পারল মার শরীরটা খুবই খারাপ হয়েছে। কাছে গিয়ে গায়ে মাথায় হাত বুলিয়ে জিজ্ঞেস করল---মা তোমার কি হয়েছে ?
অনুভা ছেলের হাতটা টেনে নিয়ে বলল---সেরকম কিছু না। শরীরটা একটু ম্যাজম্যাজ করছিল তাই শুয়ে আছি। তুই আমার কাছে একটু বোস তাহলেই সব ঠিক হয়ে যাবে।
---মা, তোমার শরীর এত খারাপ, একবার আশ্রমের মাসিদের ডাক্তার ডাকতে বলি না। 
অনুভা ছেলেকে বাধা দিয়ে বলল---তুই এত ব্যস্ত হোস না বাবা। ডাক্তার  ডাকার মত আমার কিছু হয়নি।
রাতে কাশির সাথে বেরোতে লাগল রক্ত। ডাক্তারকে ডাকতেই হল। কিছু পরীক্ষা করাবার পর ডাক্তার জানালেন যে অনুভার টিবি হয়েছে। যে আশ্রমে অনুভা এত প্রিয় ছিল, রাতারাতি সেখানে অচ্ছুৎ হয়ে গেল। লোক ধরে তাড়াতাড়ি একটা সরকারি টিবি হাসপাতালে পাচার করা হল। মা আশ্রম ছাড়ার কয়েক দিনের মধ্যেই আনন্দ বুঝতে পারল যে আশ্রমে তার আর কোন জায়গা নেই। স্কুল যাওয়া শিকেয় উঠল। একটা ব্যাগে কিছু জামাকাপড় নিয়ে বেরিয়ে এল রাস্তায়, খোলা আকাশের নিচে। দু একদিন কখনও রেল স্টেশনে কখনও ফুটপাতে কাটাল। সঙ্গে আনা চিঁড়ে মুড়ি খেয়ে কোনরকমে পেটের জ্বালা মেটাল। এর মধ্যে মাকেও দেখতে যায়। মায়ের দিকে তাকান যায় না। এমনিতেই রোগা চেহারা, কয়েকদিনে যেন আরো শুকিয়ে গেছে। ছেলেকে দেখলে শীর্ণ অবসন্ন হাত দুখানি দিয়ে জড়িয়ে বুকে টেনে নিত। সে এক অদ্ভুত মুহূর্ত। রোগের জ্বালা যন্ত্রণা ভুলে অনুভার মুখে ফুটে উঠত এক অসীম প্রশান্তি। আর মায়ের বুকে মাথা রেখে আনন্দও খুঁজত এক নিশ্চিন্ত আশ্রয়।
একদিন ঘুরতে ঘুরতে ক্লান্ত হয়ে আনন্দ রাস্তার ধারে একটা গাছের নিচে গিয়ে বসল। খিদেয় পেট জ্বলে যাচ্ছে। সঙ্গে না আছে খাবার না কিছু কিনে খাওয়ার মত পয়সা। ওর থেকে রাস্তার ভিখারিদের অবস্থা অনেক ভাল। ওরা যখন তখন যার তার কাছে হাত পাততে পারে। কখনও কিছু পায় কখনও বা পায় না। কিন্তু আনন্দর যত কষ্টই হোক ভিক্ষে করার মত মনটাকে এখনও তৈরি করতে পারেনি।  আনন্দ যেখানে বসেছিল তার সামনেই একটা রেস্টোরেন্ট। খাবারের গন্ধে খিদে আরো বেড়ে গেল। সামনে কাউন্টারে মাঝ বয়সী একটা লোক বসে রয়েছে। লোকের কাছ থেকে খাবারের দাম বুঝে নিচ্ছে আর মাঝে মাঝে চেঁচিয়ে কমর্চারিদের এটা ওটা বলছে। আনন্দের দিকে  ভদ্রলোক কয়েকবার তাকাল। কিছু পরে ইশারায় ওকে কাছে ডাকল। ওকেই ডাকছে কিনা বুঝতে না পেরে ও এদিক ওদিক দেখছিল।
---তোকেই ডাকছি। এদিকে আয়। 
আনন্দ কাছে যেতে ভদ্রলোক জিজ্ঞেস করল---ওখানে বসে আছিস কেন ? 
---এমনি।
---বাড়ি কোথায় ?
আনন্দ লোকটাকে তার প্রকৃত অবস্থা জানাল।
---সকাল থেকে খাওয়া হয়নি তো! যা, হাতে মুখে জল দিয়ে এসে খেয়ে নে।
আনন্দর বিশ্বাস হচ্ছিল না।
---দাঁড়িয়ে রইলি কেন, যা।
আনন্দ টেবিলে গিয়ে বসতেই একটা ছেলে ভাত, ডাল, তরকারি, মাছ  সব সাজিয়ে রেখে গেল। কতদিন বাদে একটু ভাল খেতে পাচ্ছে। তৃপ্তি করে খেয়ে ওঠার পর লোকটা আবার ডাকল।
---আমার কাছে এখানে থাকবি ? পড়াশুনোও করবি আর দোকানের কাজে আমাকে টুকটাক সাহায্য করবি।
নিজের কানকে আনন্দর বিশ্বাস হচ্ছিল না। ঘাড় নেড়ে সম্মতি জানিয়েছিল।
আবার মাথার ওপর ছাদ জুটল। শুরু হল নতুন জীবন।
দোকানের মালিকের নাম কানাই সরকার। বিয়ে থা করেনি। আত্মীয় স্বজন সেরকম বলার মত কেউ নেই। যা দু একটা আছে, তাদের সাথে কোনরকম যোগাযোগ নেই। কানাই এর ওই অঞ্চলে বহুদিনের বাস। পুরোনো দিনের দোতলা বাড়ি। অত বড় বাড়িতে থাকার লোক বলতে কানাই ছাড়া নিচের একটা ঘরে দোকানের দুজন কমর্চারী। কানাই যখন খুব ছোট তখন ওর বাবা এই বাড়িটা কেনে। শৈশবেই কানাই মাকে হারায়। এক বিধবা নিঃসন্তান পিসি ওদের কাছে থাকতেন। উনিই বেশ কিছুদিন সংসারটা সামলেছিলেন। লেখাপড়ায় কানাইএর তেমন মাথা ছিল না। অনেক চেষ্টায় ম্যাট্রিক পাশ করার পর লেখাপড়ায় ইতি টেনে বাবার সাথে দোকানে বসতে শুরু করে। লেখাপড়ায় মাথা না থাকলেও দোকানদারিতে কানাই অল্পদিনেই পোক্ত হয়ে উঠল। ছিল মুদির দোকান। টিম টিম করে চলত। আশে পাশে কয়েকটা ছোট কারখানা ছিল। ওগুলোতে অনেক লোক কাজ করত। কিন্তু ধারে কাছে কোন খাবারের দোকান ছিল না। এটে মাথায় রেখেই কানাই বেশ কিছুদিন ধরে তালে ছিল একটা রেস্টোরেন্ট খোলার। বাবা প্রথমে রাজি হচ্ছিল না। কিন্তু শেষে খানিকটা জোর করেই মুদির দোকানের পাশে বাড়ির একতলার বাকি ফাঁকা জায়গাটায় একটা খাবারের দোকান খুলল। নিজের মায়ের নামে নাম রাখল ‘করুণাময়ী রেস্টোরেন্ট’ । নামে রেস্টোরেন্ট হলেও মূলত কারখানার লোকগুলোর জন্য দুপুরে আর রাতে ভাত আর রুটির থালি থাকত। প্রথম কিছুদিন সেরকম না চললেও লোকমুখে ব্যাপারটা জানাজানি হওয়ার পর দুবেলা ভালই ভিড় হতে শুরু হল। একে এলাকায় আর কোন খাবারের দোকান নেই তার ওপর দামও কম। ভিড় তো হবেই। আস্তে আস্তে দোকানে ভাত রুটি ছাড়াও কানাই মুখোরোচক নানারকম ভাজাভুজিও রাখতে শুরু করল। দোকান থেকে রোজগারও ক্রমশঃ বাড়তে থাকল।
আনন্দ বাড়িতে আসার দু একদিন বাদে কানাই ওর সাথে ওর মাকে দেখতে গেল। হাসপাতালে ঢুকতেই ডাক্তাররা জানালেন যে মায়ের অবস্থা খুব খারাপ।  ঐ অবস্থাতেও ছেলের মুখে সব শুনে অনুভা একবার কানাইএর দিকে তাকাল। চোখে জল, তবু ঐ চাউনিতে ছিল পরম স্বস্তি। আনন্দ কাছে গিয়ে বসতে মায়ের শীর্ণ হাত দুখানি রোজের মত ওকে বুকে টানার চেষ্টা করল। কিন্তু একটু কেঁপেই তা স্থির হয়ে গেল। ছেলেকে দেখার জন্যই বোধহয় প্রাণটা আটকে ছিল। কিশোর আনন্দ কাঁদতে কাঁদতে মায়ের নিথর বুকে মাথা রেখে অনেকক্ষণ বসে রইল।
কানাই আনন্দকে সান্ত্বনা দিয়ে সঙ্গে নিয়ে গিয়ে অনুভার শেষ কৃত্যের সব ব্যবস্থা করল।
প্রথম দিন থেকে আনন্দর ওপর কানাইএর বড় মায়া  পড়ে গিয়েছিল। একটা রাস্তার ছেলের ওপর কেন যে এত টান এল তা বলা মুশকিল। হয়ত তার জীবনের একাকীত্বই এই অপত্য স্নেহের একটা বড় কারণ।
---এই কটা দিন তুই আমার সাথে এক ঘরেই থাক। মায়ের কাজ মিটে গেলে যে ঘরটা ভাল লাগে সেটাতে থাকিস।
শ্মশান থেকে ফিরে পরম স্নেহে কানাই আনন্দকে কথাগুলো বলল।
পারলৌকিক ক্রিয়াকর্ম মিটে গেলে পূব দিকের বাড়ির সেরা ঘরটাতে কানাই আনন্দর থাকার ব্যবস্থা করল। আবার আনন্দ স্কুলে ভর্তি হল। বই, খাতা, কলম, কোন কিছুর অভাব রইল না। অচিরেই দুজন অপরিচিত  মানুষের মধ্যে গড়ে উঠল পিতা পুত্রের মত এক আত্মিক বন্ধন। পড়াশোনায় আনন্দর বরাবরই আগ্রহ ছিল। অনুকূল পরিবেশ পেয়ে উত্তরোত্তর রেজাল্ট ভাল হতে লাগল।
প্রথম দিকে কানাইকে আনন্দ কাকু বলেই ডাকত।
একদিন কানাই কিন্তু কিন্তু করে বলল---বাবা তোকে একটা কথা বলব ? 
---বল না।
---তুই আমাকে বাবা বলে ডাকতে পারবি না !
আনন্দ সেই মুহূর্তে কোন উত্তর দেয়নি। পরদিন সকালে আনন্দর মুখে ‘বাবা’ ডাক শুনে কানাই ওকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেলেছিল।
কানাইকে সাহায্য করতে আনন্দ মাঝে মাঝে দোকানে গিয়ে বসত। লোকের সাথে ওর ব্যবহার খুব ভাল। ও দোকানে থাকলে খদ্দেররাও খুশি হয়। অনেকে তো ওকে দেখতে না পেলে কানাইকে জিজ্ঞেস করে---কিগো,  তোমার ছেলেকে দেখছি না যে ! ‘ছেলে’ কথাটা শুনে কানাইএর মনটা ভরে যায়।
গম্ভীর হয়ে বলে---উচু ক্লাসে উঠেছে, পড়াশোনার চাপ বেড়েছে, রোজ কখনও আসতে পারে !
বেশ ভাল নম্বর পেয়েই আনন্দ হায়ার সেকেন্ডারি পাশ করল। কানাই তো আনন্দে আত্মহারা। দোকানে সব খরিদ্দারকে মিস্টি খাওয়াল। আনন্দকে সঙ্গে করে নিয়ে গিয়ে একটা ভাল সাইকেল কিনে দিল।
সঙ্গে সাবধান বানী---কখনও জোরে চালাবি না, আর বড় রাস্তায় যাবি না।
আনন্দ খুব বাধ্য ছেলে। নিষেধ অমান্য করেনি।
কেমিস্ট্রিতে অনার্স নিয়ে কলেজে ভর্তি হল। নম্বর ভাল থাকায় অনেক ভাল কলেজে সুযোগ পেয়েছিল। কিন্তু সেগুলো বাড়ির থেকে দূরে হওয়ায় কানাই রাজি হয়নি। বাড়ির কাছেই একটা কলেজে ভর্তি হল।
এর মধ্যে একদিন কানাই আনন্দর নামে ব্যাঙ্কে একটা খাতা খুলে তাতে বেশ কিছু টাকা রেখে দিল।
---মাঝে মাঝে ব্যাঙ্কে গিয়ে প্রয়োজন মত টাকা তুলবি, আবার মাসের প্রথমে আমার কাছ থেকে টাকা নিয়ে জমা দিয়ে দিবি। কিরে, বুঝলি কিছু ?
আনন্দ মাথা নেড়েছিল। ওর কোন চাহিদা নেই। যা পায় তাতেই খুশি। এইজন্য কানাইএর ওকে এত ভাল লাগে।
কলেজেও মেধাবী ছাত্র হিসেবে আনন্দ নাম করল। দেখতে দেখতে বিএসসি ফাইনাল পরীক্ষা এসে গেল। আনন্দ অনেক রাত পযর্ন্ত পড়াশোনা করে। কানাইও জেগে পাশে বসে থাকে। কখনও মশা তাড়ায়, কখনও আনন্দর গায়ে মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়। আনন্দ শুতে যেতে বললে বলে---তুই বাচ্চা ছেলে রাত জেগে পড়ছিস আর আমি বাপ হয়ে কখনও শুতে পারি !
ফাইনাল পরীক্ষা শুরু হল। সবকটা পেপারই খুব ভাল হয়েছে। আর একটা  হলেই শেষ। পরীক্ষার আগের দিন আনন্দ রাত জেগে পড়ছে আর কানাই যথারীতি গায়ে মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। কানাইএর হাতটা আনন্দর একটু গরম ঠেকল।
---তোমার কি জ্বর হয়েছে ?
---কই না তো।
---তাহলে তোমার হাতটা অত গরম লাগল কেন ? এদিকে এস তো দেখি।
কানাইএর গায়ে হাত দিয়ে আনন্দর মনে হল বেশ জ্বর।
---গা বেশ গরম, এখনি শুয়ে পড়। কাল ডাক্তার দেখাতে হবে।
---ও ঠাণ্ডা গরমে একটু হয়েছে হয়ত। শরীর আমার ঠিকই আছে।
যা হোক ছেলের কথায় ঘরে গিয়ে শুয়ে পড়ল।
শেষ পেপারটাও মনোমতই হল। বাপ ব্যাটা দুজনেই খুব খুশি। দুদিনের জন্য দুজনে পুরী বেড়াতে গেল। আনন্দর জীবনে এই প্রথম কোথাও বেড়াতে যাওয়া। সমুদ্র দেখে মুগ্ধ হয়ে অনেকক্ষণ চেয়ে রইল। দুজনে প্রাণ ভরে সমুদ্রে স্নান করল। কানাইএর আরো কদিন থাকার ইচ্ছে ছিল। কিন্তু বাড়ি ফাঁকা আর দোকানটাও তো বেশিদিন বন্ধ রাখা যাবে না, তাই তাড়াতাড়ি ফিরতে হল।
এই বাড়িতে আসার পর থেকে আনন্দর জীবন সত্যিই আনন্দময় হয়ে উঠেছিল। কানাইএর স্নেহ ভালবাসা ভুলিয়ে দিয়েছিল তার অতীতের সব দুঃখ, বেদনা। আর কানাইএর শূন্য, একাকী, উদ্দেশ্যহীন জীবনে আনন্দ ছিল এক চরম প্রাপ্তি। ও আসার পর থেকে কানাইএর জীবনটা আমূল পাল্টে গিয়েছিল। সংসারে যে এত সুখের ভান্ডার আছে তা সে আগে কখনও বুঝতে পারেনি। পরস্পরকে অবলম্বন করে উভয়ে পেয়েছিল এক নতুন জীবনের সন্ধান। কানাই আনন্দকে এতটাই ভালবেসে ফেলেছিল যে একদিন ওকে ডেকে বলল---শোন, এখন তুই বড় হয়েছিস। এবার সময় করে একটা ভাল দিন দেখে বাড়ি আর দোকানটা তোর নামে করে দেব।
আনন্দ বাধা দিয়ে বলল---কেন, নাম পাল্টাবার কি দরকার ?
---বাঃ তোকে এবার আস্তে আস্তে সব বুঝে নিতে হবে না। আমি মরে গেলে সব দেখবে কে ? 
আনন্দ কানাইএর মুখে হাত চাপা দিয়ে বলেছিল---অমন কথা আর বলবে না। আমার ভাল লাগে না। 
কানাই ছেলেকে জড়িয়ে ধরে অনেক আদর করল। পুরী থেকে ফিরে আসার  পর থেকেই কানাইএর শরীরটা তেমন ভাল যাচ্ছিল না। মাঝে মাঝেই শরীর ম্যাজম্যাজ করে জ্বর হয়। প্রথমদিকে আনন্দ বার বার বলা সত্ত্বেও একেবারেই গা করেনি। ধীরে ধীরে শরীর আরো কাহিল হয়ে পড়ল। অদ্ধের্ক দিন দোকানে বসতে পারে না। আনন্দ গিয়ে সামাল দেয়। পাড়ার ডাক্তার দেখিয়ে কোন লাভ হল না। আনন্দর এক সহপাঠীর বাবা বড় ডাক্তার। একদিন কানাইকে নিয়ে তার কাছে গেল। তিনি ভালভাবে দেখার পর রক্তের কিছু পরীক্ষা করাতে দিলেন। রিপোর্ট আসার পর জানা গেল ব্লাড ক্যানসার। অনেক চেষ্টা করেও আনন্দ খবরটা কানাইএর কাছ থেকে লুকোতে পারেনি। মনে মনে ভেঙ্গে পড়লেও আনন্দকে সান্ত্বনা দিয়ে বলেছিল---ওরকম গুম মেরে থাকিস কেন ? একটু আধটু শরীর খারাপ হবে না! কয়েক মাস ওষুধ  খেলেই সব ঠিক হয়ে যাবে। আমার অত সহজে কিছু হবে না।
মুখে যাই বলুক, সময় যে তার ঘনিয়ে এসেছে তা কানাই বিলক্ষণ বুঝতে পারছিল। তাই আবার বাড়ি হস্তান্তরের প্রসঙ্গটা তুলল।
---উকিলের সাথে আমার কথা হয়ে গেছে। আগামী মাসের মাঝামাঝি ভাল দিন আছে, রেজিস্ট্রিটা করিয়ে নেব।
কিন্তু সময় যে হাতে এত কম তা কানাই বুঝতে পারেনি। ঘোরাঘুরি করা আগেই বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। কয়েকদিনের মধ্যে বিছানায় উঠে বসার শক্তিটাও চলে গেল। আর তারপর ধীরে ধীরে চলে গেল কোমায়। আনন্দ সারাক্ষণ কানাইএর মাথার কাছে বসে থাকে। অসম্ভব জেনেও আশায় থাকে যদি কানাই আবার ভাল হয়ে যায়। না ভাল সে আর হয়নি। দুদিন বাদেই মারা গেল। শেষ বেলায় বোধহয় একটু জ্ঞান এসেছিল। চোখ চেয়ে বিড়বিড় করে আনন্দকে কিছু বলার চেষ্টা করেছিল। নিজের বাবাকে মনে নেই। খুব অল্প বয়সে হারিয়েছে। কানাই প্রকৃত অর্থে তার বাবার জায়গাটা নিয়েছিল। আনন্দর দ্বিতীয়বার পিতৃ বিয়োগ হল।
মারা যাওয়ার খবরটা জানাজানি হতেই শকুনের মত বেশ কিছু আত্মীয় পরিজন এসে হাজির হল। এতদিন আনন্দ এই বাড়িতে আছে কিন্তু এই মানুষগুলোকে সে কখনও দেখেনি বা কানাইএর কাছেও এদের কথা কখনও শোনেনি। বাড়িতে ঢুকে একটু চোখের জল ফেলে নিয়ে যে যার মত খবরদারি করতে শুরু করে দিল। আনন্দ যে এ বাড়িতে আশ্রিত ছাড়া আর কিছু নয় তা ওইটুকু সময়ের মধ্যেই ওকে ঠারেঠোরে বুঝিয়ে দিল। আনন্দ চিরকালই একটু নম্র প্রকৃতির। তাছাড়া অভাব অনটনের মধ্যে বড় হওয়ায় কোন ব্যাপারে প্রতিবাদ করার মত মনের জোরও তার ছিল না। তবে একটা ব্যাপার বেশ জোরের সঙ্গে সকলকে জানিয়ে দিল।
---বাবার মুখাগ্নি ও পারলৌকিক ক্রিয়াকর্ম সব আমিই করব।
দু একটা টিপ্পনী ভেসে এল। ‘আশ্রিতের আবার বাবা। রঙ্গ দেখে আর পারিনা, বাব্বা।‘ তবে ব্যাঙ্গ বিদ্রুপ যাই হোক শ্রাদ্ধশান্তিতে খরচ আছে বলে এ কাজে কেউ এগোয়নি। আর শকুনদের নজর তো কানাইএর সম্পত্তিতে। ওটা বেহাত না হলেই হল। শ্মশান থেকে ফিরতে রাত দশটা বেজে গেল। রাতে কানাইএর ঘরে কম্বল পেতে আনন্দ শুল। ঘুম আর আসে না। খালি বিছানার দিকে তাকিয়ে ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল।
---সারাদিন এত ধকল গেল, রাত জাগিস না বাবা, শুয়ে পড়।  
চমকে উঠে আনন্দ ঘরের চারদিকটা দেখল। খাটের ওপর থেকে কানাই ওর দিকে তাকিয়ে হাসছে। কানাইএর কিনে দেওয়া ক্যামেরায় আনন্দই কয়েক মাস আগে ছবিটা তুলেছিল। এতদিনের স্মৃতি, কথা, সব যেন চারদিক থেকে ভেসে আসছে। নিজের সমস্ত ভালবাসা উজাড় করে দিয়ে তার জীবনটা ভরিয়ে দিয়েছিল ঐ মানুষটা।
---যেন ভায়া, সুখ এক একজনের কপালে থাকে না। অমন মানুষটাকে হারাবার কিছুদিনের মধ্যেই বুঝতে পারলাম যে ও বাড়িতে আমার পক্ষে আর থাকা সম্ভব নয়। শ্রাদ্ধের কাজকর্ম মিটে যেতেই সবাই নিজেদের লক্ষ্যে ঝাঁপিয়ে পড়ল। সকলেই সকলের প্রতিপক্ষ। তবে নিজেদের মধ্যে যতই মারামারি করুক, আমার বিরুদ্ধে কিন্তু সকলে একজোট। কারণ, আমাকে রাস্তা থেকে সরাতে না পারলে কাজ হাসিল করা সহজ হবে না। রুখে দাঁড়াবার মত মনের জোর বা ইচ্ছে কোনটাই আমার ছিল না। আমার এক বন্ধু অমলের সাহায্যে কয়েক দিনের মধ্যেই আমার জিনিসপত্র নিয়ে ও বাড়ি ছেড়ে কলেজ স্ট্রিটের এক মেসে গিয়ে উঠলাম। জিনিসপত্রের সঙ্গে এনেছিলাম আমার তোলা কানাই সরকারের ছবিটা। ওইটাই সেই ছবি। আমার নিজের বাবা বা মা কারোরই ছবি নেই। মায়ের মুখ অস্পষ্ট হলেও মনে আছে, বাবার তাও নেই। উনি আমার বাবা, আমার গুরুজন, আমার সবকিছু।
ঘরে ঢুকে অজয়ের যে কটা ছবি চোখে পড়েছিল তার মধ্যে কানাইএর ছবিটাও ছিল। ঘরে দরজার ঠিক ওপরেই টাঙান রয়েছে।
---আর ঐ ছবি দুটো কাদের ? 
---একটা আমার স্ত্রীর আর অন্যটা আমার ছেলে মেয়ের সাথে আমি ও আমার স্ত্রী।
---আপনার স্ত্রী তো বেশ সুন্দরী !
আনন্দ কোন উত্তর করল না।
---অনেকক্ষণ তো হল। আর এক রাউন্ড চা করে আনি, কি বল ?
আবার বেল বাজল। দরজা খুলতেই একটা বাচ্চা মেয়ে দৌড়ে এসে আনন্দকে জড়িয়ে ধরল।
---দাদু আজ বেড়াতে নিয়ে গেলে না?
---কাল যাব দিদিভাই। আজ কাকুটার সাথে একটু কথা বলছি তো।
উত্তরটা শিশুটির একেবারেই মনঃপুত হল না। এ ঘর ও ঘর খানিক ঘোরাঘুরি করে চলে গেল। 
---আমার নাতনি। স্কুল থেকে ফিরে এলে রোজ বিকেলে একবার বেড়াতে  নিয়ে যেতে হবে। আর ছুটির দিনে কতবার যে আসে তার ঠিক নেই।
---বাঃ, আপনার একজন দারুন সঙ্গী বলুন।
---তা বটে।
অজয় ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখে ছটা বেজে গেছে। শনিবারের সন্ধ্যায় ক্লাবের আড্ডাটা বেশ জমে। আজ আর যাওয়া হল না। এমন এক কাহিনীর মাঝপথে ছেড়ে চলে যাওয়া যায় না।
কিচেনের দিকে যেতে যেতে আনন্দ জিজ্ঞেস করল---ভাই, বোর হচ্ছ না  তো? আর হলেও এই বুড়োটার কথা ভেবে আর একটু না হয় থাক। কতদিন বাদে মনটা বড় ভাল লাগছে।
এবার চায়ের সাথে এল অমলেট। খিদেও পেয়েছিল। মুহূর্তের মধ্যে প্লেট খালি হয়ে গেল। টি ব্রেকের পর আবার শুরু হল আনন্দর বিচিত্র জীবনকথা।
প্রথম জীবনটা খুবই কষ্টের ছিল। কিন্তু মাঝে এতগুলো বছর সুখে, স্বাচ্ছন্দে কাটার ফলে কলেজ স্ট্রিটের মেসের ছোট পলেস্তারা খসে যাওয়া ঘরে প্রথম কদিন বেশ অসুবিধে হচ্ছিল। আনন্দর বন্ধু অমলও একই মেসে থাকত। অমলদের বাড়ি বদ্ধর্মান জেলার দাইহাটে। বয়সে আনন্দর থেকে একটু বড়। ও বি.কম. পাশ করে চাটারড পড়ছে। অমল আনন্দর খুব ভাল বন্ধু। আনন্দর বাড়িতে মাঝে মাঝেই যেত। আর ছুটি ছাটাতে গিয়ে থেকেওছে। কানাইও অমলকে পছন্দ করত। ও সঙ্গে থাকায় নতুন পরিবেশে নিজেকে মানিয়ে নেওয়া আনন্দর পক্ষে অনেক সহজ হল। মাস খানেক পর বি.এস.সির রেজাল্ট বেরল। হাই ফার্স্ট ক্লাস নিয়ে আনন্দ পাশ করেছে। এই খবর শুনে যে মানুষটা সব থেকে খুশি হত সেই আজ নেই। ঘরে ফিরে মাকর্শিটটা কানাইএর ছবির সামনে রেখে বাচ্চা ছেলের মত কেঁদেছিল।
এম.এস.সি তে চান্স পেতে কোন অসুবিধে হল না। এই সময় আনন্দর একটা বিরাট ভরসা ছিল। বাড়ি আর দোকান রেজিস্ট্রি করে যেতে না পারলেও, কানাই নিজের জমানো টাকার প্রায় সবটাই আনন্দর অ্যাকাউন্টে ট্রান্সফার করে দিয়েছিল। ঐ টাকার পরিমাণটা যথেষ্ট ছিল বলে খরচ খরচা নিয়ে আনন্দকে চিন্তা করতে হয়নি। এম.এস.সি পাশ করার পর আনন্দ বেশ কটা সরকারী, আধা সরকারী চাকরির সুযোগ পেল। কিন্তু পড়াশোনা ভালবাসত বলে ওগুলোতে না ঢুকে কাছাকাছি একটা স্কুলে শিক্ষকতা শুরু করে। কয়েক মাস কাটার পর মেস ছেড়ে পাশেই দু কামরার একটা বাড়ি ভাড়া নিয়ে ও আর অমল চলে আসে।  অমলের বাবা-মা কোলকাতায় এলে ওদের ভাড়া বাড়িতে এক আধ দিন থেকে যেতেন। কেবল ছেলের বন্ধু বলেই নয়, ধীর, শান্ত স্বভাবের জন্য ওঁরা আনন্দকে খুব পছন্দ করতেন। সংসারে একা বলে ওর প্রতি একটা সহানুভূতিও ছিল। আনন্দকে অনেকবারই ওঁরা দাইহাটে যাওয়ার জন্য বলেছেন কিন্ত নানা কারণে যাওয়া হয়ে ওঠেনি। সেবার গরমের ছুটিতে অমল প্রায় জোর করেই ওকে নিজের দেশের বাড়িতে নিয়ে গেল। বদ্ধির্ষ্ণু গ্রাম। স্টেশনের পাশেই বড় খেলার মাঠ। মাঠের ধারেই স্কুল। অমলের বাবা ঐ স্কুলে শিক্ষকতা করেন। স্কুলের পাশ দিয়ে রাস্তা চলে গেছে। রিকসায় মিনিট দশেক লাগল অমলদের বাড়ি পৌঁছতে। পুরনো ধরনের বড় বাড়ি। সামনে অনেকটা বাগান।
বাইরে থেকেই অমল চিৎকার পাড়ল--ও মা আ আ আ। কাকে এনেছি দেখ।
অমলের মা সামনের বারান্দায় এসে ছেলের সাথে আনন্দকে দেখে খুব খুশি হলেন।
---এস বাবা ভেতরে এস। তুমি এসেছ খুব ভাল লাগছে। খোকা আনন্দকে তোর ঘরে নিয়ে যা। আর হ্যাঁ, সাড়ে বারোটা বাজে। একটু জিরিয়ে নিয়ে চান করে ভাত খেয়ে নে। কখন বেরিয়েছিস, নিশ্চই খুব খিদে পেয়ে গেছে।
অমল বাবা মার একমাত্র সন্তান, তার ওপর বাইরে থাকে, ফলে বাড়িতে ওর আদর আবদারটা স্বাভাবিকভাবেই একটু বেশি। বন্ধু হিসেবে এই স্নেহ ভালবাসার অংশীদার হয়ে আনন্দরও খুব ভাল লাগছিল। পাশেই লাগোয়া অমলের কাকার বাড়ি। দুই ভাইয়ে সম্পর্ক খুব ভাল। বহুদিন একসাথে সবাই এ বাড়িতেই ছিল। কয়েক বছর আগে পাশের ফাঁকা জমিতে কাকারা বাড়ি করে চলে গেছে। এখনও ভাল মন্দ কিছু রান্না হলে এবাড়ি ওবাড়ি চালান হয়। কাকার নিজস্ব ব্যবসা আছে।
ঘরে গিয়ে জামাকাপড় পাল্টে দুজনে একটু বিশ্রাম নিচ্ছে, এমন সময় বছর পনেরর একটা ছেলে ঘরে ঢুকল।
---দাদা, কখন এলি রে ?
---এইতো খানিকক্ষণ হল। তুই আজ স্কুলে যাসনি ?
---টেস্ট হয়ে গেছে, স্কুল তো ছুটি।
---ও, তাইতো। আমার একদম খেয়াল ছিল না।
তারপর গুরুজন সুলভ গম্ভীর স্বরে ব্লল---পড়াশোনা ঠিকমত হচ্ছে তো ?
বোঝা গেল প্রসঙ্গটা তার একেবারেই পছন্দের নয়।
সংক্ষিপ্ত উত্তর এল---হ্যাঁ।
---এ আমার বন্ধু আনন্দ। তোর আর একটা দাদা। আর আনন্দ, ও আমার ছোট ভাই অয়ন।
পায়ে হাত দেওয়াটা যুক্তিযুক্ত হবে কিনা বুঝতে না পেরে অয়ন আনন্দের দিকে তাকিয়ে একটু হাসল। বয়সে অনেকটা তফাৎ থাকলেও অল্প সময়ের মধ্যেই আনন্দর সাথে অয়নের সম্পকর্টা বেশ জমে গেল। যে কয়দিন আনন্দ ওখানে ছিল, অয়ন সারাক্ষণই ওর সাথে ঘুরেছে।
নিচে থেকে অমলের মার গলা পাওয়া গেল---কিরে তোদের স্নান হল ? আর বেলা করিস না, খেতে আয়। খেয়ে দেয়ে যত পারিস গল্প কর।
খাওয়ার ঘরটা বেশ বড়। মাঝে টেবিল পাতা। আটজন একসাথে খেতে বসতে পারে। ঘরে কিছু অপরিচিত মুখ। অমল একে একে পরিচয় করাল।
---আমার কাকা, কাকিমা আর আমাদের একমাত্র আদরের বোন তনিমা।
কাকা-কাকিমার পায়ে হাত দিয়ে নমস্কার করে আর তনিমার দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে আনন্দ খেতে বসল। অমলের মা রান্নাঘরে খাবার বেড়ে দিচ্ছেন, কাকিমা আর তনিমা পরিবেশন করছে। এলাহি আয়োজন।
মনে হয় আনন্দর আসার খবরটা এঁরা জানতেন।
কাকিমা বললেন---নিজের বাড়ি মনে করে চেয়ে নেবে, একদম লজ্জা করবে না।
এত সুস্বাদু রান্না এত আন্তরিকতার সঙ্গে আনন্দকে কেউ কোনদিন খাওয়ায়নি। মনটা ভরে গেল, সঙ্গে পেটটাও। তনিমা অয়নের থেকে বছর তিনেকের বড়। উনিশ কুড়ি মত বয়স। স্থানীয় কলেজে পড়ে। এদের ভাই বোন সবকটিকেই দেখতে ভাল। খাওয়া দাওয়ার পর আনন্দ দুপুরে গুছিয়ে একটা ঘুম দিল।
---উঠুন, চা এনেছি। মিস্টি সুরেলা কন্ঠে ঘুম ভাঙল। তনিমা চায়ের কাপ হাতে সামনে দাঁড়িয়ে।
---আমায় ডাকলেই তো হত, কষ্ট করে আনতে গেলে কেন ?
মুচকি হেসে তনিমা বলল---এনে যখন ফেলেছি তখন একটু কষ্ট করে খেয়ে নিন।
ঘর থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সময় বলে গেল---চা খাওয়া হলে নিচে আসবেন। দাদা অপেক্ষা করছে, আপনাকে নিয়ে ঘুরতে যাবে।
বিকেলে অমলের সাথে অনেক ঘোরা হল। বেশ ভাল লাগছিল। সন্ধ্যাবেলায় কাকার বাড়িতে জোর আড্ডা বসল। অয়নের সামনে পরীক্ষা, তাই ইচ্ছে থাকলেও বেশিক্ষণ থাকার অনুমতি পায়নি। গল্প, ঠাট্টা, মস্করার মধ্যে সন্ধ্যে গড়িয়ে রাত হল।
---এবার ওঠ, সকলে খেতে চল। অমলের মা তাড়া লাগালেন।
রাতের খাওয়া কাকার বাড়িতে। কাকার বাড়িটা অমলদের থেকে একটু ছোট হলেও অনেক ঝাঁ চকচকে। রাতেও ভুরিভোজ।
আনন্দ খাবারের দিকে তাকিয়ে বলল---কাকিমা, আমি এত খেতে পারব না।
অমলের কাকা মিস্টি ধমকে বললেন---বাচ্চা ছেলে, খেতে বসার আগেই ওরকম না না করবে না। তোমাদের বয়সে আমরা...
লোহা খেয়ে হজম করতাম---তনিমা বাক্যটা সম্পূর্ণ করে দিল। 
তবে রে মেয়ে—জেঠি বকা লাগাল।
অমল তো ভাল বন্ধু ছিলই, এখানে আসার পর ওর পরিবারের সকলকেই খুব ভাল লাগল। এদের আতিথেয়তা, আন্তরিকতা, ভোলার নয়। হয়ত নিজের বলতে কেউ নেই বলেই এদের পরিবারের স্নেহের বাঁধনটা ওকে এতটা অভিভূত করেছিল। ফিরে আসার সময় অমলের মা আর কাকিমা বাদে গোটা পরিবার ওদের স্টেশনে ছাড়তে এসেছিল।
---আবার আসবেন।
ট্রেন ছাড়ার মুখে তনিমার আহ্বানে সাড়া দিয়ে ঘাড় নেড়ে সম্মতি জানিয়েছিল। আসবে বৈকি। এত ভালবাসাকে কি কখনও উপেক্ষা করা যায় ! কিছুদিন পর স্কুল ছেড়ে আনন্দ কলেজে অধ্যাপনায় যোগ দেয়। মাইনেও কিছুটা বাড়ে। অমল চাটারড পাশ করে বড় একটা ফার্মে চাকরি করছে। এখনও ওরা এক বাড়িতেই থাকে। তবে এ বাড়িটা আগের থেকে অনেক বড় আর ভাল।
এক রবিবার দুপুরে গল্প করতে করতে অমল বলল---আনন্দ, এবার বিয়ে  করে সংসারী হ।
---তা আমায় পরামর্শ না দিয়ে তুই নিজে করছিস না কেন ?
---আমার বাড়িতে তো দেখাশুনো জোর কদমে শুরু করে দিয়েছে।
---ঠিক আছে, আগে তোর বিয়েতে মজা করি, তারপর না হয় আমারটা নিয়ে ভাবব।
---আনন্দ একটা কথা বলব ?
---তুই আবার কবে থেকে আমার সাথে কথা বলার আগে পারমিশান নেওয়া শুরু করলি? 
---তনিমাকে তোর পছন্দ ?
আনন্দ একটু চুপ করে রইল। ভাবতেই পারছে না যে ওর মত চালচুলোহীন মানুষের সাথে তনিমার মত ভাল বংশের এক সুন্দরী মেয়ের সম্বন্ধ আসতে পারে।
---কিরে, চুপ করে রইলি যে !
---আমার তো তুই সবই জানিস। তোর বাড়ির অন্যদের কি এতে মত আছে?
---বাড়িতে না জিজ্ঞেস করে কি আর তোকে বলছি ।
প্রথম দেখার পর থেকেই তনিমার প্রতি আনন্দর একটা দুবর্লতা জন্মেছিল। তবে সাহস করে সে কথা না তনিমা না অমল, কাউকেই বলতে পারেনি। মনের কথা মনেই ছিল।
---তনিমাকে জিজ্ঞেস করেছিস, ও রাজি আছে তো ?
হেসে অমল বলল---তনিমার মনের খবর বাড়ির মধ্যে সবথেকে ভাল আমিই রাখি।
---ঠিক আছে। তবে আমাকে তৈরি হওয়ার জন্য একটু সময় দিতে হবে।
প্রায় বছর খানেক বাদে তনিমা আনন্দর ঘরে এল। বাড়িতে আনন্দ একাই থাকে। অমল চাকরি সূত্রে তখন পাটনাতে। সমস্ত ঝক্কি সামলে আনন্দর বিয়েটা অমল একাই উৎরে দিয়েছিল।
তনিমা খুব গোছান মেয়ে। কয়েকদিনের মধ্যে ঘরদোরের চেহারাটাই পাল্টে দিল। আনন্দর শ্রীহীন জীবনে তনিমা এল পূণির্মার জ্যোৎস্না হয়ে। যার স্নিগ্ধ আলোয় সে খুঁজে পেয়েছিল জীবনের অনেক সুখের সম্ভার। তখন হানিমুনের সেরকম চল না থাকলেও সুযোগ পেলেই আনন্দ সস্ত্রীক বেড়াতে চলে যেত। ওই কয়েকটা বছর ছিল তার জীবনের সেরা সময়। বিয়ের বছর ঘুরতেই তনিমার কোলে এল ‘আশা’। দুজনেই চেয়েছিল মেয়ে হোক। মেয়েকে প্রথম দেখার পর আনন্দর সেকি আহ্লাদ। বাচ্চা হওয়ার কিছুদিন আগে থেকে তনিমা বাপের বাড়িতে ছিল। মেয়ে দু তিন মাসের হতেই ওদের নিয়ে আনন্দ কোলকাতায় চলে আসে। এখানে অতটুকু বাচ্চা নিয়ে একা থাকতে হবে বলে বাড়ির লোকেরা আপত্তি করলেও আনন্দ খানিকটা জোর করেই তনিমাকে নিয়ে আসে। ওদের ছেড়ে ও আর একা থাকতে পারছিল না। তনিমার মা মেয়েকে ঐ অবস্থায় একা ছাড়তে ভরসা পাননি তাই সঙ্গে এসে কোলকাতায় কিছুদিন রইলেন।
আনন্দর জীবনের ধারাটাই বদলে গেছে। সে এখন আর এই সংসার সমুদ্রে সহায়সম্বল, আত্মীয় পরিজনহীন এক দিগ্ ভ্রষ্ট নাবিক নয়। আনন্দময় দাস ছাড়াও তার আরো পরিচয় আছে। সে একাধারে স্বামী, বাবা, শিক্ষক ও পরিবারের দায়িত্ববান একজন কর্তা।
---জানো ভায়া, বিয়ের পর কয়েক মাস আমাদের একটা ঘোরের মধ্যে কেটেছে। সে এক অদ্ভুত ভাললাগা। যার আবেশে ছকে বাঁধা দৈনন্দিন জীবনের সবকিছু এলোমেলো হয়ে গিয়েছিল। তবে আশাকে কোলে নিয়ে যে অনুভূতি, যে শিহরন, যে ভাললাগা অন্তরে উপলব্ধি করতাম তার সাথে অন্য কোন জাগতিক সুখই তুলনীয় নয়। আমার রক্ত, আমার সৃষ্টি, আমার সন্তান- --সে এক স্বগীর্য় তৃপ্তি।
একদিন গল্প করতে করতে তনিমা আব্দার করে বলল--- হ্যাঁগো, আমাদের নিজেদের ছোটখাট একটা বাড়ি করার কথা একটু ভাব না। এখনি বলছি না। একটু টাকা পয়সা জমিয়ে তারপর।
আনন্দরও একটা বাড়ি করার কথা কদিন থেকেই মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছিল।
বলল—হ্যাঁ, আমারও মাথায় আছে। দু একজনকে বলেওছি ভাল জায়গায় দু এক কাঠা জমির সন্ধান পেলে খবর দিতে।
কিছুদিন বাদে ভবানিপুরে আদি গঙ্গার দিকে দুকাঠার মত পছন্দসই একটা জমি পাওয়া গেল। কলেজের মাইনে ছাড়াও টিউশনি করে আনন্দ ভালই রোজগার করত। সংসারে যথেষ্ট খরচ করার পরেও উদ্বৃত্ত থাকত। এ ছাড়া কানাই এর দেওয়া টাকাটার অনেকটাই তখনও ছিল। ফলে জমি কিনে ছোট একটা বাড়ি করতে কোন অসুবিধে হয়নি। পুজো দিয়ে নিজের বাড়িতে যখন ঢুকল তখন আশার বয়স আড়াই বছর। নতুন বাড়িতে এসে সেও বেশ মজা পেয়েছিল। ‘আমার বালি’ আমার বালি’ বলে ধেই ধেই করে খানিক নেচে নিল।
বাড়িটা ছোট হলেও সুন্দর প্ল্যান করে করা। দুটো বেড রুম, দুটো টয়লেট, একটা কিচেন, একটা ছোট ড্রইং রুম আর একটা স্টাডি। সামনে কিছুটা ফাঁকা জমি। তনিমা ধীরে ধীরে নিজের পছন্দমত জিনিসপত্রে ঘরদোর সাজিয়ে ফেলল। দোতলায় সিঁড়ির পাশে ফাঁকা জায়গাটায় ঠাকুরঘর। সামনের ফাঁকা জমিটাও আর ফাঁকা নেই। নানারকম ফুলের গাছ লাগিয়েছে। তনিমা খুব খুশি।
অন্তরঙ্গ মুহূর্তে বলেছিল— আমার আনন্দের ঘরে এসে জীবন আমার আনন্দে ভরে গেছে। আচ্ছা, আমাদের বাড়ির একটা নাম থাকবে না ?
---কিছু ভেবেছ ?
---‘সোনার সংসার’ নামটা কেমন ?
---তুমি যখন চাইছ তখন ঐ নামই হবে।
কয়েক দিনের মধ্যেই পাথরে খোদাই করে বাড়ির নাম গেটের সামনে লাগান হল। কলেজের সহকর্মী থেকে আত্মীয় পরিজন যারাই বাড়িতে আসে তারা সকলেই একবাক্যে বাড়ির আর এত সুন্দর করে সাজিয়ে রাখার জন্য তনিমার প্রশংসা করে।
বিজয় তো একদিন বলেই ফেলল—আনন্দদা, বৌদি ছিল বলে তরে গেলে। রান্নাবান্না করে, এতটুকু বাচ্চা সামলে, সারা বাড়িটা কি সুন্দর চকচকে রেখেছে বলতো !
আনন্দ অকপটে স্বীকার করল---সে আর বলতে ভাই।
বিজয় ঐ পাড়াতেই কিছুটা দূরে ভাড়া থাকে। একাই থাকে। বাবা মা অনেক কাল অগে মারা গেছে। পৈতৃক বাড়ি ডায়মন্ড হারবারের কাছে কোন এক গ্রামে। সরকারি কোন একটা অফিসে কাজ করে। ভাড়াটে হলেও এ পাড়ায় অনেকদিন আছে। জমি দেখতে আসার সময় রাস্তাতেই আনন্দর সাথে আলাপ হয়। পাড়াতে বেশ পপুলার। পরোপকারী ছেলে। সকলের প্রয়োজনে পাশে থাকে। আনন্দর সাথে তো মাত্র কদিনের আলাপ, তাতেও নতুন বাড়িতে মালপত্র নিয়ে আসার সময় সারাক্ষণ সাথে থেকেছে।
বলেও রেখেছে--- আনন্দ দা নতুন পাড়া, কোন সমস্যা হলে ছোট ভাইকে ডাকতে সংকোচ কোর না।
আনন্দ তখন প্রকৃত অর্থেই সুখী। ভাল চাকরি, মনের মত বাড়ি, ঘরে অমন ভাল বৌ, ফুটফুটে মেয়ে, আর এত ভাল পাড়া প্রতিবেশি। আর কি চাই ? সুখের পাত্র অবশ্য তখনও ভরেনি। পাওয়া আরো বাকি ছিল। বছর খানেক বাদে ঘরে এল ‘আলোক’। ছেলে মেয়েদের নাম সব তনিমার দেওয়া। ভাইকে দেখে সাড়ে তিন বছরের দিদির সে কি আনন্দ। নাওয়া খাওয়া ভুলে সারাদিন কেবল ভাইএর কাছে বসে থাকে। কলেজ থেকে বাড়ি ফেরার পর নিজের ভরা সংসার দেখে আনন্দর মন জুড়িয়ে যায়। সেরকম আড্ডাবাগীশ না হলেও আগে পাড়ার ‘আমরা কজন’ ক্লাবে গিয়ে মাঝে মাঝে গল্প গুজব করত। বিজয়ই সকলের সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল। এখন কলেজ আর বাজার করা ছাড়া সারাক্ষণ বাড়িতেই কাটায়। শিশুদের কলকাকলি, স্ত্রীর সোহাগ, তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করে। যদিও বাড়িতে সবর্ক্ষণের জন্য একটা কাজের মেয়ে আছে তবু তনিমাকে একটু হাতে হাতে সাহায্য করার চেষ্টা করে। ভাল লাগে। তনিমা উদ্যোগি হয়ে মেয়েকে পাড়াতেই একটা ভাল গালর্স স্কুলে ভর্তি করল। প্রথম দিন স্কুলে গিয়ে মেয়ের সে কি কান্না। তারপর আস্তে আস্তে অভ্যাস হয়ে গেল। সাদা জামা আর লাল টুকটুকে ফ্রক পরে পিঠে বইখাতার ব্যাগ নিয়ে ওইটুকু মেয়ে মাকে আর ভাইকে টা টা করতে করতে বাবার সাথে স্কুলে যেত। অন্য সময়ে বাবার কোলে চড়ে ঘুরলেও স্কুলে কিন্তু হেঁটেই যেত। একটু বড় হওয়ার সাথে সাথে পাকা গিন্নি হয়ে উঠল। কোনদিন আনন্দ কলেজ থেকে একটু দেরী করে বাড়ি ফিরলে বকুনি খেত---কি ব্যাপার, এত দেরী কেন ? এতক্ষণ কি করা হচ্ছিল ?
আনন্দ হাত বাড়ালেই লাফিয়ে বাবার কোলে উঠে অনেক আদর করত।
তনিমা ভেঙিয়ে বলত---ওরে আমার বাপ সোহাগী মেয়ে রে ।
আলো হামা দিয়ে কাছে এলে ওকেও কোলে তুলে নিত। একদিন ছেলে মেয়ে দুজনেই বাবার কোলে, এমন সময় বিজয় বাড়িতে ঢুকল।
---আরে ব্বাস। এমন সুন্দর দৃশ্য, দাঁড়াও দাঁড়াও একটা ছবি তুলি।
বিজয়ের হাতে ক্যামেরা। ওর ছবি তোলার খুব শখ।
---বৌদি, তুমি দূরে কেন ? দাদার পাশে দাঁড়াও...একটু গা ঘেঁসে..আর একটু..আর একটু.. হ্যাঁ, পারফেক্ট। যা একখানা ছবি হবে না। ছবি তুলে  দিলাম, এবার কড়া করে একটু চা কর তো বৌদি।
---তোমরা গল্প কর আমি চা বসাচ্ছি।
তনিমা আর আনন্দের ব্যবহারের গুনে পাড়া প্রতিবেশী অনেকের সাথেই বেশ বন্ধুত্ব হয়েছে। বাড়িতেও যাতায়াত হয়। তবু তার মধ্যে পাশের বাড়ির তপন ব্যানাজীর্দের পরিবার আর বিজয়, এরা একরকম ঘরের লোক হয়ে গেছে। ছুটি ছাটার দিনে মাঝে মাঝেই একসাথে খাওয়া দাওয়া হৈ হুল্লোড় হয়।
দেখতে দেখতে আলোর বয়স চার বছর হল। ওর স্কুলটা একটু দূরে। আনন্দ ছেলে মেয়েদের স্কুলে পৌঁছে দিয়ে আসে আর বাড়ি আনে তনিমা। দুজনেরই পড়াশোনায় আগ্রহ আছে। আনন্দ ওদের জন্য একজন মাষ্টার রাখার কথা বলতে তনিমা আপত্তি করে বলেছিল—এইটুকু বাচ্চাদের আবার মাষ্টার কিসের? আমি তো রোজই ওদের পড়াই।
---না আসলে তোমার একার ওপর বড্ড চাপ পড়ে যাচ্ছে তাই।
---আমার কোন অসুবিধে হচ্ছে না। আর তুমি নিজেও তো একটু পড়াতে পার।
---ঠিক আছে, কাল থেকেই শুরু করছি। এই আশা, এই আলো, কাল সন্ধ্যে বেলা থেকে তোমাদের নতুন মাষ্টার মশাই পড়াবেন।
---কে বাবা, কে বাবা ?
---আমি ই ই ই।
---ছেলেমেয়ে তো হেসেই খুন।
তনিমা কপট রাগ দেখিয়ে বলল—অমন ফাজলামো করলে ওরা আর তোমার কাছে পড়েছে।  
নিমর্ল আনন্দে সময়টা ভালই কাটছিল। কিন্তু কোন সুখই আনন্দর কপালে দীঘর্স্থায়ী হয়নি। ছেলে মেয়ে দুটো তখন একটু বড় হয়েছে। মেয়ে ক্লাস সিক্স আর ছেলে থ্রীতে পড়ে। কয়েক মাস হল তনিমার আচরণে এক অদ্ভুত পরিবতর্ন এসেছে। অমন হাসিখুশি প্রাণোচ্ছল মেয়ে কেমন চুপচাপ হয়ে গেছে। প্রায়ই অন্যমনস্ক হয়ে কি যেন ভাবে। অল্পেতেই রেগে যায়। ব্যাপারটা  লক্ষ্য করার পর আনন্দ নানাভাবে বহুবার তনিমাকে জিজ্ঞেস করেও কারণটা কি তা জানতে পারেনি। কিন্তু সমস্যাটা ক্রমশ বাড়তে থাকায় আনন্দ একদিন তনিমাকে বলল—তোমার শরীরটা নিশ্চয় ভেতরে ভেতরে খারাপ হয়েছে। চলো একটা ভাল ডাক্তারকে দেখাই।
উত্তর না দিয়ে তনিমা চুপ করে রইল। কিন্তু আনন্দ ডাক্তার দেখাবার জন্য পিড়াপিড়ি করাতে বেশ ঝাঁঝের সঙ্গে তনিমা বলল—আমি ঠিক আছি। আর আমাকে নিয়ে তোমার অত না ভাবলেও চলবে।
এই তনিমা আনন্দর একেবারে অচেনা। এতদিন যে মানুষটার সাথে ঘর করেছে এ যেন সে নয়। আনন্দ চুপ করে গেল। আগে কখনও মনমালিন্য হলে কিছুক্ষণের মধ্যেই তনিমা তা মিটিয়ে ফেলার চেষ্টা করত। সে চেষ্টা দূরে থাক, আনন্দর সাথে কথা বলাই কমিয়ে দিয়েছে। ছেলে মেয়েদের সাথে একটু আধটু যা কথা বলে। তাও যে ছেলে মেয়ে ওর প্রাণ তাদেরও কারণে অকারণে বকাবকি করে। বাড়ির কাজকর্ম, বাগান, কোনকিছুতেই আর মন নেই। আচরণে মানসিক বিকারের লক্ষণ স্পষ্ট। আনন্দ খুব চিন্তায় পড়ে গেল। বাড়িতে কোন গোলমাল বা অশান্তি হয়নি। কেন এমনটা হল তার কোন কারণই মাথায় আসছে না। ডাক্তারের কাছেও যেতে চাইছে না। কি করবে বুঝতে না পেরে পাশে তপনদের বাড়িতে গিয়ে সব কিছু খুলে বলল।
---বিজয় আর তোমরা আমার অত্যন্ত কাছের লোক। বিজয়ের তো আজকাল দেখাই পাওয়া যায় না। তোমরা একটু চেষ্টা করে দেখ, যদি বুঝিয়ে সুঝিয়ে তনিমাকে কোন ডাক্তারের কাছে নিয়ে যেতে পার।
-- ব্যাপারটা আমাদেরও চোখে পড়েছে। আগে আপনারা অফিস চলে গেলে আমি আর বৌদি কত গল্প গুজব করতাম। ইদানীং বৌদি তো আসেইনা আর আমি আপনাদের বাড়ি গেলেও দায়সারা ভাবে দু একটা কথা বলে। ফলে আমিও আর যাওয়ার আগ্রহ পাই না। আর একটা কথা, বিজয় কিন্তু খুব সুবিধের ছেলে নয়।  ওকে যতটা সম্ভব এড়িয়ে চলবেন।
-- বিজয় তো আমাদের অনেক উপকার করেছে ভাই। আর তোমরাও তো এতদিন ওকে খুব ভাল ছেলে বলতে।
-- বলতাম, কিন্তু এখন আর বলি না।
আনন্দ ভেবে পায় না কি এমন হল যে রাতারাতি ছেলেটা এদের চোখে বাজে হয়ে গেল। ও নিয়ে পরে ভাবলেও চলবে। এখন ওর সমস্যা তনিমা, বিজয় নয়।
আনন্দকে আস্বস্ত করে অনিতা বলল—আমাদের পক্ষে যতটা সম্ভব আমরা চেষ্টা করব। তপন ডাক্তারের সাথে যোগাযোগ করবে আর বৌদিকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাওয়ার ভার আমার। আপনি অত চিন্তা করবেন না, আমরা পাশে আছি।
আনন্দ খানিকটা নিশিন্ত হয়ে বাড়িতে ফিরল। এই অদ্ভুত আচরণ শুরু হওয়ার পর থেকে তনিমা আনন্দের সাথে খুব প্রয়োজন ছাড়া কথা বলে না। আনন্দও আর ঘাটায় না। বাচ্চা দুটোকে নিয়ে যতটা পারে সময় কাটায়।
তপন খুব অল্প সময়ের মধ্যেই ডাক্তারের সাথে যোগাযোগ করেছে। সামনের রবিবার সন্ধ্যায় সময় দিয়েছে। এখনও তনিমার কানে যায়নি, গেলেই একটা অশান্তি বাধাবে।
সেদিন কলেজে ক্লাস কম ছিল। শরীরটাও ভাল লাগছিল না, তাই লাইব্রেরি বা অন্য কোথাও না গিয়ে আনন্দ সোজা বাড়ি ফিরে এল। বাড়িতে ঢোকার সময় দেখে তপন সামনের বারান্দায় পায়চারি করছে। ডাক্তার দেখাবার ব্যাপারে তনিমাকে রাজি করাতে এসেছে বোধহয়। ইশারায় তপনকে জিজ্ঞেস করলে ও আনন্দকে বাড়ির ভেতরে যেতে বলল। শোওয়ার ঘরের খাটের ওপর অনিতার কোলে মাথা রেখে দুই ছেলে মেয়ে অঝোরে কাঁদছে। আনন্দ কিছুই বুঝে উঠতে পারল না। বাবাকে দেখতে পেয়ে বাচ্চা দুটো দৌড়ে এসে জড়িয়ে ধরে বলল—বাবা, মা নেই।
--- সেকি, কোথায় গেল ?
অনিতা চুপ করে বসে আছে।
অনিতা তুমি কিছু জান ?
অনিতা তখনও চুপ।
চুপ করে থেক না, তনিমার কি হয়েছে বল।
অনিতা আমতা আমতা করে বলল—আপনি ওর সাথে কথা বলুন।
আনন্দ ছুটে গিয়ে তপনকে জিজ্ঞেস করল—আমাকে খুলে বল কি হয়েছে।
তপন ছেলেমেয়েদের থেকে একটু আড়ালে সরে গিয়ে কোনরকম রাকঢাক না করে জানাল—তনিমা তোমার ঘর ছেড়ে বিজয়ের সাথে চলে গেছে।
আনন্দ স্তম্ভিত, বাকরুদ্ধ হয়ে গেল। এতক্ষণ এতরকম দুশ্চিন্তা মাথার মধ্যে ঘুরপাক খেলেও এটা একবারের জন্যও ভাবতে পারেনি। তপন টেবিল থেকে একটা খাম এনে আনন্দকে দিল। ভেতরে তনিমার লেখা একটা চিঠি।
‘ জানি যা করছি সমাজের চোখে তা চরম পাপ। নিজের মনের সাথে এই ক মাস অনেক যুদ্ধ করেছি। কিন্তু কি করব, অনেক চেষ্টা করেও বিজয়ের আকষর্ণকে উপেক্ষা করতে পারলাম না। ছেলে মেয়ে দুটোর জন্য কষ্ট হচ্ছে। ওদের নিয়ে যেতাম। কিন্তু ওরা তো তোমাকে ছাড়া থাকতে পারবে না। তোমার কাছে আমার এ কাজ ক্ষমার অযোগ্য তাই ক্ষমা চাইছি না। ছেলে মেয়ে দুটোকে দেখ। ওরা তোমার কাছে ভাল থাকবে। আমাকে ভুলে যেও।  ভাল থেক।
তনিমা’
চিঠিটা পড়ে আনন্দর চোখ দিয়ে দু ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল। মনটা তোলপাড় হয়ে যাচ্ছে। হায় রে সংসার। নিজের হাতে তিল তিল করে গড়ে তোলা সোনার সংসারকে কত সহজে ছারখার করে দিয়ে চলে গেল। সে নিজের কথা না হয় বাদই দিল, কিন্তু তনিমা তো একজন মা। কি করে পারল ছেলেমেয়েদের ওপর এতটা নিষ্ঠুর হতে। আর যে ছেলেটাকে সে নিজের ভাইএর মত দেখত, বিশ্বাস করত, তার কাছেই পেল এমন চরম আঘাত। মানুষকে ভালবাসা আর বিশ্বাস করার কি নিমর্ম পরিণতি। আনন্দ  অবাক হয়ে ভাবে যে সংসারে সম্পকর্গুলো এত ঠুনকো হলে সমাজটা এখনও টিকে আছে কি করে ! মনের ভেতরের দুঃখ কষ্টটা আস্তে আস্তে চরম রাগ আর ঘৃণায় পরিণত হল। নিজের মনকে বোঝাল যে ভেঙে পড়লে চলবে না। বাচ্চা দুটোর জন্য ওকে শক্ত হতে হবে। ওদের যে ও ছাড়া আর কেউ নেই।
কাঁপা গলায় তপনকে শুধু বলল—বিজয়ের ব্যাপারে আমাকে আরো আগে সাবধান করলে না কেন ভাই ? অবশ্য তোমাকে দোষ দিয়ে লাভ নেই, দোষ আমার কপালের। খবরটা শ্বশুর বাড়িতেও পৌছল।
--প্রাথমিক সংকোচ কাটিয়ে শ্বশুর শাশুড়ি বাড়িতে এসে আমার ছেলে মেয়ে  দুটোকে নিজেদের কাছে নিয়ে গিয়ে রাখতে চেয়েছিলেন। আমার মাথার ঠিক ছিল না। ওদের সকলের মধ্যেই তখন আমি তনিমাকে দেখতে পাচ্ছি। ওদের সঙ্গে সঙ্গে বিদায় করে দিই। এমনকি এক সময়ের আমার প্রানের বন্ধু অমল সান্ত্বনা দিতে এলে ওকেও দূর দূর করে তাড়াই।
--কিন্তু একা দুটো বাচ্চাকে সামলাতেন কি করে? যখন কলেজে যেতেন তখন তো ওরা একেবারে একা থাকত।
-- ওটাই তখন আমার সবথেকে বড় চিন্তা ছিল অজয়। প্রথমে বেশ কিছুদিন কলেজে যেতে পারিনি। তারপর সারাক্ষণের জন্য একজন মাঝবয়সী মহিলাকে রেখেছিলাম। ওই বাচ্চাদের দেখত। এছাড়া তপন আর ওর স্ত্রী ওই দুঃসময়ে সারাক্ষণ পাশে ছিল। বাচ্চা দুটোকে যতটা সম্ভব আগলেছে। সমস্যা আরো ছিল। ততদিনে খবরটা চারিদিকে বেশ চাউর হয়ে গেছে। পাড়ায়, কলেজে, বাজারে, সবর্ত্র একই প্রশ্ন। কেউ সান্ত্বনা দিচ্ছে, কেউ পরামর্শ দিচ্ছে, আবার কেউ কেউ শুধু মজা লুটছে। আমার তখন উন্মাদের অবস্থা। পরিচিত মানুষ দেখলেই আতঙ্ক হচ্ছে। কেউ কিছু বলতে এলেই, তা ভাল মন্দ যাই হোক, রাগ হচ্ছে।
ফোন বাজল। আনন্দ গিয়ে খানিকক্ষণ কথা বলে আবার এসে বসল।
রাত তখন প্রায় নটা। অজয় আগেই বাড়িতে ফোন করে জানিয়ে দিয়েছে যে ফিরতে একটু দেরী হবে। কিন্তু সেই একটুটা যে এতক্ষণ হয়ে যাবে তা ভাবতে পারেনি। এখন পুরোটা না শুনে উঠতেও মন চাইছে না। দুজনেরই তখন নেশা ধরেছে। একজনের শোনাবার নেশা আর অপরজনের শোনবার নেশা।
লোকলজ্জার যন্ত্রণায় আনন্দ ভবানিপুরের ‘সোনার সংসার’ ছেড়ে অনেক দূরে দমদমে একটা ভাড়া বাড়িতে এসে উঠল। এখানে সকলেই তার অপরিচিত। সারাক্ষণ অন্ততঃ তনিমাকে নিয়ে নানা কুরুচিকর প্রশ্নের উত্তর তো দিতে হবে না। মা চলে যাওয়ার পরে আশা কয়েকদিন ভাইএর সাথে খুব কান্নাকাটি করেছিল। তারপরে ধীরে ধীরে নিজেকে সামলে নিয়ে ওইটুকু মেয়ে বাড়ির সকলকে সামলেছে। ভাইকে সারাক্ষণ সামলানোর সাথে সাথে বাবাকেও নানাভাবে ভুলিয়ে রেখেছে। ছোট্ট আশা মানসিক ভাবে অনেক বড় হয়ে গেছে। মায়ের জাত তো। মেয়েরা বোধহয় এমনই হয়। তনিমা কি তবে ব্যতিক্রম ! হয়ত।
শুধু বাড়ি পাল্টেই সমস্যা মেটেনি। একই কারণে চাকুরিস্থলও পাল্টাতে হল। শহরের ভাল কলেজ ছেড়ে মফস্বলের একটা কলেজে চাকরি নিল। রেজাল্ট ভাল, অধ্যাপক ভাল, ফলে কলেজ পাল্টাতে অসুবিধে হয়নি।
জীবনে তনিমার মধুর স্মৃতি আর তার কাছে পাওয়া চরম আঘাত, কোনটাই আনন্দর পক্ষে ভোলা সম্ভব নয়। তবু সময়ের সাথে সাথে অনেক কিছুই স্বাভাবিক হয়ে এল। তনিমা এখন এই সংসারে অতীত। স্ত্রী অথবা মা, কোনরূপেই সে আর এখন এই সংসারকে কাঁদাতে পারবে না। ছেলেমেয়েদের মনে এখন মার জন্য আছে কেবল ঘৃণা আর আক্রোশ। আনন্দর মনে তাও নেই। তনিমার প্রতি ভালবাসা, ঘৃণা, ক্রোধ, কোনটাই সে অনুভব করে না।
দেখতে দেখতে আশা স্কুলের গণ্ডি পেরিয়ে কলেজে ভর্তি হল। লেখাপড়ায় ছেলেমেয়ে দুজনেই ভাল। আনন্দই ওদের গাইড করে। শুধু পড়াশোনা কেন, জীবনের প্রতিটা ক্ষেত্রে বাবাই ওদের পরামশর্দাতা, বন্ধু, সবকিছু।
আনন্দর শ্বাশুড়ি তখন খুব অসুস্থ। নাতিনাতনিকে একবার দেখার জন্য অনেক কান্নাকাটি, অনুনয় করে চিঠি লিখে ছেলেকে আনন্দর কাছে পাঠালেন। সেবার আনন্দ আর কোন বাধা দেয়নি। ছেলেমেয়েরা যাবে না বলে বেঁকে বসলেও আনন্দই ওদের বুঝিয়ে রাজি করায়। মা চলে যাওয়ার পর এই প্রথম ওদের মামার বাড়িতে যাওয়া। আশার তবু কিছু মনে আছে। আলোকের কাছে জায়গা, মানুষজন সবই নতুন। আদর ভালবাসা সব পেলেও ওরা একবারের জন্যও ভুলতে পারছিলনা যে এরা সকলেই মায়ের লোকজন। কোনক্রমে একদিন থেকে জোর করেই দুজনে বাড়ি ফিরে আসে।
--স্যার, এবারের বড়দিনের ছুটিতে কিন্তু আমার দেশের বাড়িতে যেতেই হবে।
-- ঠিক আছে যাব।
-- প্রত্যেক বারেই যাব যাব বলেন কিন্তু যান না।
-- নারে বিশু, এবার ঠিক যাব।
-- মনে থাকে যেন স্যার।
বিশু মানে বিশ্বনাথ টুডু আনন্দর কলেজের পিওন। পুরুলিয়ার একটা গ্রামেতে ওর বাড়ি। আনন্দকে খুব ভালবাসে। আনন্দকে একবার বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার ওর অনেক দিনের ইচ্ছে । প্রায়ই বলে কিন্তু যাওয়া হয়ে ওঠেনি।
--আমি দু তিন দিনের জন্য পুরুলিয়ায় বিশুর বাড়িতে যাব ভাবছি। এমন ভাবে ধরেছে। তোরা কদিন একা থাকতে পারবি ?
-- কেন পারব না । আমরা কি এখনও বাচ্চা আছি নাকি ? বেশ প্রত্যয়ের সঙ্গে আশা জানাল।
ঠিকই তো। ওইটুকু দুটো বাচ্চা দেখতে দেখতে কত বড় হয়ে গেল। আশা মাস্টার্স করছে আর আলো কলেজে পড়ে। আশা অনেকটা বাবার মতন। কোন চাহিদা নেই। বাবা যা দেয় তাতেই খুশি। আলোর ধরণটা একেবারে আলাদা। আব্দার লেগেই আছে। আর কখনও অভিমান করে, কখনও বা বাবার গলা জড়িয়ে আদর করে কাঙ্ক্ষিত জিনিস সে আদায় করেই ছাড়বে। আনন্দও ছেলেমেয়েদের কোন দিক থেকে কোন অভাব রাখেনি। সব সময় নানাভাবে চেষ্টা করেছে যাতে সন্তানেরা মায়ের অভাব বুঝতে না পারে।
আলো এমন সুযোগ হাতছাড়া করল না। রসিকতা করে বলল—যাওয়ার পারমিশান দিচ্ছি, কিন্তু বাবা একটা শর্ত আছে।
--এতে আবার শর্ত কিরে ?
-- আছে, আছে।  একটা ভাল রেস্টোরেন্টে দুজনের খাওয়ার পয়সা দিয়ে যেতে হবে।
-- কি হচ্ছে ভাই ? আশা ধমক দিল।
-- কিছু না দিদি। সোজা হিসেব। বাবা বেড়াতে যাবে আর আমরা খেতে যাব।
আনন্দ ছেলের গাল টিপে প্রস্তাবে সম্মতি দিল।
ডিসেম্বর প্রায় শেষ। ঠান্ডা ভালই আছে। আর কোলকাতা থেকে গ্রামের দিকে ঠান্ডা অনেক বেশি হবে। দুদিনের মত জামা, প্যান্ট, টুকটাক জিনিস আর একটা শাল ছোট একটা ক্যাম্বিসের ব্যাগে পুরে সকালে একটা ট্রেন ধরে আনন্দ পুরুলিয়ার উদ্দেশ্যে রওনা হল। বিশুর বাড়ি যে স্টেশনে সেখানে কয়েকটা প্যাসেঞ্জার ট্রেন ছাড়া আর কিছুই দাঁড়ায় না। তাই পুরুলিয়ায় নেমে ট্রেন পাল্টাতে হবে। পুরুলিয়ায় নেমে অনেকক্ষণ অপেক্ষা করার পর একটা লোকাল ট্রেনে উঠল। বিকেল চারটে নাগাত পৌঁছল বিশুর স্টেশন বাগালিয়া হল্টে। একেবারেই ছোট স্টেশন। যাত্রীও হাতে গোনা কয়েকজন। গাড়ি এক মিনিট দাঁড়াবে। বিশুই মালপত্র নামিয়ে আনন্দকে নিয়ে একটা রিকশায় চেপে বসল। স্টেশনের পাশে দু একটা দোকানপাট ঘরবাড়ি রয়েছে। একটু এগোতেই চারিদিক সব ফাঁকা হয়ে গেল। রাস্তার ধারে মাঝে মাঝে কয়েকটা বাড়ি আর বাকি ধু ধু প্রান্তর। কোথাও কোথাও কিছু চাষবাস হচ্ছে। এত রুক্ষ লাল মাটিতে চাষও সেরকম ভাল হওয়ার কথা নয়। স্টেশনের কিছুটা পর থেকে রাস্তাও কাঁচা আর এবড়ো খেবড়ো।
একটা মাটির বাড়ি দেখিয়ে বিশু বলল—ওটা স্যার একটা অবৈতনিক স্কুল। লেখাপড়া ছাড়াও ওখানে একটু আধটু হাতের কাজও শেখান হয়। কালকে আপনাকে এখানে নিয়ে আসব স্যার। আপনার মত মাস্টারমশাইয়ের পদধূলি পড়লে আমাদের ছেলেমেয়েগুলো ধন্য হয়ে যাবে।
-- বাজে বোকো নাতো। তোমার বাড়ির বাচ্চারা কি এই স্কুলেই পড়ে ? 
--হ্যাঁ স্যার, শুধু আমার বাড়ি কেন, আমাদের মহল্লার প্রায় সব বাড়ির ছেলেমেয়েরাই এখানে পড়তে আসে।
বাড়ির বাইরে দু একটা বাচ্চা দৌড়াদৌড়ি করছে। গেটের সামনে স্কুলের নাম বড় বড় করে লেখা “আশালোক”।
বেশ নতুন ধরণের সুন্দর নাম।
আর একটু যেতেই বিশু বলল—স্যার এসে গেছি। 
সামনে অনেক ঘরবাড়ি। অধিকাংশই মাটির। কিছু পাকা বাড়িও রয়েছে। একটু এগিয়ে বাঁ ধারে একটা পাকা বাড়ি দেখিয়ে বিশু জানাল—স্যার ওটা আমার বাড়ি।
রিকশাওয়ালা জিনিসগুলো ঘরে পৌঁছে দিল। আনন্দ ভাড়া দিতে গেলে কিছুতেই নিল না। নিশ্চয় বারন আছে। ওর বাড়ি ওই পাড়াতেই। এর মধ্যে ওদের দেখতে লোক জমে গেছে। দু একজন আনন্দর পায়ে হাত দিয়ে নমস্কার করে গেল। ব্যাপার স্যাপার দেখে মনে হল বিশু এ পাড়ার একজন কেউকেটা। আর সেটাই স্বাভাবিক। কোলকাতায় চাকরি করে, একটা পাশ দিয়েছে, তার ওপর তুলনামূলক ভাবে অবস্থাও ভাল। একটা ঘর আনন্দর জন্য সাজিয়ে গুছিয়ে রাখা হয়েছে। এদের আতিথেয়তা আর আন্তরিকতায় আনন্দ অভিভূত হয়ে গেল।
খানিক বাদে বিশু আনন্দকে নিয়ে বের হল। ঘোরা বা দেখার সেরকম কিছু নেই। আদিবাসী পাড়াটা পার হলে চাষের জমি আর ফাঁকা মাঠ। অনেক আদিবাসী এলাকা আনন্দর ঘোরা। এদের নিয়ে ওর গবেষণা মূলক কিছু লেখা বিভিন্ন সময়ে নানান পত্রিকায় বেরিয়েছে। অনান্য জায়গাগুলোর মত বিশুদের পাড়ায় অভাব অনটন সেরকম চোখে পড়েনি। প্রত্যেক বাড়িতেই বড়রা কিছু না কিছু উপার্জন করে। ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া শেখানর একটা আগ্রহও আছে। আর সবোর্পরি পাড়ার লোকেদের মধ্যে বেশ সদ্ভাব আছে। দেখে আনন্দর খুব ভাল লাগল। পাশেই রয়েছে একটা স্বাস্থ্য কেন্দ্র। একটু এগোতেই একটা শিব মন্দির দেখিয়ে বিশু বলল—স্যার, বাবা খুব জাগ্রত। বাবার কাছে মন থেকে কিছু চাইলে ঠিক পাওয়া যায়।
তুমি কি কি পেয়েছ ?
--আমার ছেলে, মেয়ে, বৌ, চাকরি, বাড়ি সবই বাবার দয়ায়।
আনন্দ একটু হেসে বলল—তাহলে তোমার চেষ্টায় কিছুই হয়নি বলছ।
ইঙ্গিতটা বুঝতে পেরে বিশু একটু লজ্জা পেল। ঝাঁ চকচকে মন্দির। বিশুর কাছে জানতে পারল যে বছর কয়েক আগে একটা ট্রাস্ট পুরোনো মন্দিরটাকে সংস্কার করে এখনকার অবস্থায় এনেছে। আনন্দ নাস্তিক না হলেও জীবনে নানা ঘাত প্রতিঘাতের সম্মুখীন হতে হতে তার ঈশ্বরে বিশ্বাসটা ফিকে হয়ে গেছে। এখনও সে ঠাকুর দেবতাকে প্রণাম করে ঠিকই, তবে তার অধিকাংশটাই এতকালের অভ্যাসের ফলে বিশ্বাসে নয়। চটি খুলে দুজনে মন্দিরে ঢুকল। এখানে শিব হিসেবে যা পুজো করা হয় তা কোন শিবলিঙ্গ নয়। একটা গোল মত কালো পাথর শ্বেত পাথরের সিংহাসনে বসান আছে। বিশু হাত জোড় করে বিড় বিড় করে কিছু বলতে শুরু করল। বোধহয় শিব ঠাকুরের কাছে নতুন কোন চাহিদা জানাচ্ছে। মন্দিরে ঢুকে আনন্দরও বেশ ভাল লাগছে। অভ্যাসবসে ছেলে-মেয়ে দুটোর ভাল চেয়ে চোখ বন্ধ করতেই মনের জানালা দিয়ে তৃতীয় একজন কখন যেন ঢুকে পড়ল। অনেক চেষ্টা করেও তাকে আলাদা করে সরান গেল না। অতবড় আঘাত সত্ত্বেও এতকাল পরেও আনন্দর অবচেতন মনে তনিমা এখনও রয়ে গেছে। সন্ধ্যা হওয়ার একটু আগে ওরা ফিরে এল।
 --স্যার কাল আমাদের রাতে গাড়ি। সকালবেলা স্কুলে যাব। 
--তোমার জায়গায় এসেছি, যেখানে নিয়ে যাবে যেতে হবে।
-- গিয়ে দেখবেন ভাল লাগবে।
রাতে বিছানায় শুয়ে কেবলই তনিমার কথা মাথায় ঘুরপাক খেতে লাগল। এতদিন বেশ ভুলে ছিল। ওই শিব মন্দিরে গিয়ে সব কেমন গোলমাল হয়ে গেল। সকালবেলা স্কুল দেখতে যাওয়ার আগে আনন্দ বাচ্চাদের জন্য কিছু লজেন্স আর বিস্কুট কিনে নিল। বিশুও চান টান করে রেডি।
--তোমাদের স্কুলে কোন ক্লাস পযর্ন্ত আছে ?
-- ক্লাস ফাইভ অব্দি স্যার। ঘর খুব কম। পলিথিন, টিন, এসব দিয়ে ঢেকে কোনরকমে ম্যানেজ হচ্ছে। বষার্কালে খুব অসুবিধে হয়। আসলে স্যার পয়সার বড় অভাব। এবার আমাদের এম.এল.এ. কথা দিয়েছেন স্কুলটার জন্য কিছু একটা ব্যবস্থা করবেন।
-- রাজনীতির কারবারিদের প্রতিশ্রুতি স্পিরিটের থেকেও তাড়াতাড়ি উবে যায় এটা জান তো।
-- তা ঠিক। তবে অনেককেই ধরেছি, এবার একটা কিছু ব্যবস্থা করেই ছাড়ব।
সমাজকল্যাণ মূলক কাজে বিশুর এই উৎসাহ আনন্দর খুব ভাল লাগল।
বেরোবার সময় সাথে চেক বইটা নিয়ে নিল। সঙ্গে তেমন টাকা নেই, যদি কিছু ডোনেট করতে ইচ্ছে হয় চেক কেটে দেবে। স্কুলটা বিশুর বাড়ি থেকে মিনিট পাঁচেকের পথ। তখনও স্কুল শুরু হয়নি। বাচ্চারা সব একে একে আসছে। বিশুর মহল্লার বাচ্চারা সংখ্যায় বেশি হলেও আশে পাশের গ্রাম থেকেও ছেলে মেয়েরা এখানে পড়তে আসে। স্কুলে আসার কথাটা বোধহয় বিশু আগে থেকেই জানিয়ে দিয়েছে। চার পাঁচ জন সার দিয়ে আনন্দকে অভ্যথর্নার জন্য স্কুলের সামনে দাঁড়িয়ে রয়েছে। বিশু এক এক করে সকলের সাথে পরিচয় করিয়ে আনন্দকে একটা ঘরে নিয়ে গিয়ে বসাল।
--স্যার একটু বসুন, বড় দিদিমণি এখনই আসছেন।
বসার সাথে সাথেই একজন চা আর বিস্কুট দিয়ে গেল। তারপর শুরু হল নমস্কারের পালা। মাস্টার, পড়ুয়া, কেউ বাদ যাচ্ছে না। অল্প সময়ের মধ্যেই বড় দিদিমণি ঘরে ঢুকলেন। আনন্দকে তখন দেখা যাচ্ছে না। কৌতূহলী ছাত্র শিক্ষক সব ওকে ঘিরে রয়েছে। কেউ ওর পা ছুঁয়ে কেউ একটু কথা বলে ধন্য হচ্ছে। আর আনন্দ তখন সঙ্গে আনা লজেন্স বিস্কুটগুলো বাচ্চাদের মধ্যে বিলোচ্ছে।
--নমস্কার স্যার। একটু দেরী হয়ে গেল, মাজর্না করবেন। বাচ্চারা, স্যারকে আর বিরক্ত কোরো না। তোমরা এবার ক্লাসে যাও। 
--গলাটা শুনেই আনন্দ চমকে উঠল। প্রতি নমস্কারের জন্য উঠে দাঁড়িয়ে সামনের মানুষটাকে দেখে বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেল। সামনে হাতজোড় করে দাঁড়িয়ে রয়েছে তনিমা। একটা হাল্কা আকাশি রঙের শাড়ী পরা। এতগুলো বছর পরেও চেহারাটা প্রায় একই আছে।
বিস্ময়ের ঘোর কাটার পর অস্ফুট স্বরে আনন্দ জিজ্ঞেস করল—তোমরা এখানে থাক ?
--আমি একাই থাকি। 
শিক্ষক ছাত্র সবাই ক্লাসে চলে গেছে। ঘরে তখন শুধু ওরা দুজন। আনন্দর মনের ভেতরটা তোলপাড় হয়ে যাচ্ছে। কত কিছু বলতে আর জানতে ইচ্ছে করছে। অতি কষ্টে নিজেকে সংযত করল।
--কাল বিশুর কাছে নাম আর পেশায় অধ্যাপক শুনে মনে হয়েছিল যে মানুষটা তুমিই হবে। তবে এক নামে তো একাধিক মানুষ থাকে তাই  নিশ্চিত হতে পারিনি। 
আনন্দ নিজের আবেগকে লাগাম দিয়ে চুপ করে রইল।
--ছেলে মেয়ে দুটো কত বড় হয়ে গেছে। ওদের খুব দেখতে ইচ্ছে করে। ওরা এখন কি করছে ?
আনন্দ সংক্ষেপে জানাল।
--এতদিন বাদে দেখা হল, আমায় ভাল মন্দ কিছুতো বল।
-- সব  সম্পর্কেই তো বহুকাল আগে ইতি টেনে দিয়েছ তনিমা। এতদিন বাদে আর কি বা বলার থাকতে পারে ! 
কথার মাঝে বিশু আর একজনের সাথে এক প্লেট জলখাবার নিয়ে ঘরে ঢুকল।
--খেয়ে নিন স্যার।
-- তুমি কি পাগল, এত কে খাবে বলত ?
কিছু খেতেই হল।
আনন্দকে থামিয়ে অজয় জিজ্ঞেস করল—এতকাল পরে দেখা, ওভাবে মুখ ফিরিয়ে থাকলেন কি করে ? ভাল কথা যদি নাও বলা যায়, মনের ভেতর জমে থাকা রাগ দুঃখটা তো প্রকাশ করতে পারতেন।
-- ওর প্রতি তখন আমার মনে রাগ, দুঃখ বা ঘৃণা কিছুই নেই। ওটা আমার জীবনে ঘটা অনেক দুঘর্টনার মধ্যে একটা বলে মনে করি। আর সেদিন কম কথা বলেছি কারণ তা না হলে নিজেকে সামলাতে পারতাম না। 
চলে আসার আগে আনন্দ চেক বইটা  খুলে এক লাখ টাকার একটা বেয়ারার চেক তনিমাকে দিয়ে বলেছিল—টাকাটা বিরাট কিছু নয়, তবু এতে যদি কোন উপকার হয় ভাল লাগবে।
তনিমা না করেনি।
উপকারটা কার তনিমার না স্কুলের তা উহ্য ছিল। তাই চেকে পে র জায়গাটাও ফাঁকাই রাখা ছিল।
ফিরে আসার সময় তনিমা খুব আস্তে বলেছিল—সকলে ভাল থেক। অনেক চেষ্টা করেও সে আনন্দের কাছ থেকে চোখের জল লুকোতে পারেনি।
--চেকটা তাহলে আপনি স্কুল নয়, তনিমাকেই দিয়েছিলেন।
-- বলতে পার। আমাকে এক সময় স্বামী রূপে অস্বীকার করলেও আমার সন্তানের মা হিসেবে তো আমি ওকে অস্বীকার করতে পারি না। 
 তনিমার সামনে সব আবেগ, কৌতূহল, চেপে রাখলেও স্কুল থেকে বেরিয়ে এসে বিশুকে আনন্দ জিজ্ঞেস করল—তোমাদের দিদিমণি কি বরাবরই এখানে থাকেন ?
-- না স্যার। ছ সাত বছর আগে কয়েকজন লোক আমাদের এখানে লেখাপড়া আর চিকিৎসার উন্নতির জন্য কাজ করতে এসেছিল। দিদিমণিও ওই দলে ছিল। ওনাদের চেষ্টাতেই স্বাস্থ্যকেন্দ্র আর এই স্কুলটা হয়েছে। বছর দুয়েক বাদে অন্যরা চলে গেলেও দিদিমণি এখানেই থেকে গেলেন। আসলে আমাদের ভালবেসে ফেলেছেন। স্কুলেরই একটা মাটির ঘরে থাকেন আর সারাদিন বাচ্চাগুলোকে নিয়েই মেতে থাকেন।  মানুষটা খুব ভাল স্যার। এখানে সবাই ওনাকে খুব ভালবাসে আর মান্য করে।
-- দিদিমণির ঘরবাড়ি, পরিবার পরিজন, কেউ নেই ?
-- সেও একদিন জিজ্ঞেস করেছিলাম স্যার। বললেন “চলতে চলতে একদিন হঠাৎ পা পিছলে পড়ে গিয়েছিলাম। আর তখনই না আমার জীবনের সব থেকে দামী জিনিসগুলো কোথায় যেন হারিয়ে গেল”। উনি কি যে বললেন স্যার কিছুই বুঝলাম না। তবে আর ওই নিয়ে কখনও কিছু জিজ্ঞেস করিনি।
-- স্কুলের নামটা দিদিমণি রেখেছে তাই না ?
-- স্কুলের সব কিছুই ওনার মতে হয়েছে স্যার।
সন্তানদের নামেই স্কুলের নামটা রেখেছে।
বাড়ি ফিরে এসে তনিমার ব্যাপারটা ছেলে মেয়েদের জানাবে কিনা তাই নিয়ে আনন্দ একটু দোটানায় ছিল। কিছুদিন বাদে দুজনকেই সব কিছু জানায়। কিন্তু ছেলে বা মেয়ে কেউই মায়ের ব্যাপারে সামান্যতম আগ্রহও দেখায়নি।
আশা এম.এ. পাশ করে অল্প সময়ের মধ্যেই একটা ভাল চাকরি পেয়ে গেল। প্রথম মাইনের টাকায় বাবা আর ভাইএর জন্য জামা কাপড় কিনে আনে। সেই কোন ছোটবেলায় মা চলে যাওয়ার পর থেকে বিয়ের আগে পযর্ন্ত আশা বাড়িটাকে সব দিক থেকে আগলে রেখেছিল।
কমল ওর স্বনিবার্চিত। সম্পকর্টা জানার পর আনন্দ একদিন ছেলেটিকে বাড়িতে ডেকে পাঠাল। ছেলেটার কথাবার্তা ভাল। দেখতে শুনতেও খারাপ নয়। বয়স আশারই গায়ে গায়ে। সিভিল ইঞ্জিনিয়ার, ভাল প্রতিষ্ঠানে চাকরি করে। বাড়িতে মা আর ছেলে থাকে। বাবা বছর কয়েক আগে মারা গেছেন। আনন্দ কোন আপত্তি করেনি। আপত্তি করার কথাও নয়। আশা চলে যাওয়ার পর থেকে বাড়িটা একদম ফাঁকা হয়ে গেল।
কলেজে ভর্তি হওয়ার পর থেকে আলোর একটা আলাদা পরিমণ্ডল, আলাদা জগৎ তৈরি হতে শুরু হয়। সেটা আস্বাভাবিক কিছু নয়। ছেলেপুলে বড় হলে তার নিজস্ব একটা স্পেস তো থাকবেই। আশারও ছিল। কিন্তু একসাথে বসে খাওয়াদাওয়া, অবসর সময়ে সকলে মিলে গল্প গুজব ইত্যাদি করার মধ্যে দিয়ে ও বাড়ির সম্পর্কের বাঁধনটাকে কখনও আলগা হতে দেয়নি। ওর নিজস্ব সম্পকর্গুলো কখনই পারিবারিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে বাধা হয়নি।
কিন্তু আলোর নতুন সম্পকর্গুলো ওকে ধীরে ধীরে আনন্দের থেকে দূরে আরো দূরে নিয়ে যেতে থাকে। বাবার সাথে ছাড়া যে কোনদিন খেতে বসত না সেই ছেলের কাছে এখন বাড়ির এইসব ছোটখাট সেন্টিমেন্টের কোন মূল্য নেই। কতদিন আনন্দ রাতে একসাথে খাবে বলে ছেলের অপেক্ষায় বসে থেকেছে। অনেক রাতে ছেলে যখন মাতাল হয়ে ঘরে ফিরেছে তখন তার আর খাওয়ার অবস্থা ছিল না। একদিন পাকাপাকিভাবে ব্যাপারটায় ইতি টেনে বলে দিয়েছে—বাবা তুমি রোজ আমার জন্য বসে থেক না। তুমি তোমার মত খেয়ে নিও। আমি আমার সুবিধে মত খাব।
কিছু বলার নেই। বড় হয়েছে। ছেলেবেলার অভ্যাসগুলো তো পাল্টাবেই। আনন্দ খবর নিয়ে জেনেছে যে ছেলে অসৎ সঙ্গে পড়েছে। কয়েকবার বোঝাবার চেষ্টা করেছে কিন্তু কোন লাভ হয়নি। যৌবনের উদ্দাম স্রোতে নৌকো তখন বাঁধন ছিঁড়ে ভাসতে ভাসতে ঘাটের থেকে অনেক দূরে চলে গেছে। আর ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়। একটা সময়ের পরে একই বাড়িতে থাকলেও, বাবা আর ছেলের মধ্যে মানসিক যোগাযোগটা পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল। অথচ এমনটা হওয়ার কোন কারণ ছিল না। আনন্দ সব সময় স্নেহ ভালবাসা দিয়ে তার দুই সন্তানকে আগলে রেখেছিল। ওদের কোনদিন কোনকিছুর অভাব বুঝতে দেয়নি।
--বুঝলে অজয়, এরপর মাঝে মাঝেই একটা মেয়েকে নিয়ে বাড়িতে আসতে শুরু করল। থাকতে না পেরে একদিন মেয়েটি কে তা জানতে চাইলাম। বেশ উত্তেজিত হয়ে জানিয়েছিল যে ওটি ওর গালর্ফ্রেন্ড। আমারও সহ্যের সীমা তখন পার হয়ে গেছে। বলেছিলাম যে আমার বাড়িতে এসব চলবে না। এর কয়েকদিন বাদে আলো বাড়ি ছেড়ে চলে গিয়েছিল। যাওয়ার আগে বেশ ঝাঁঝের সঙ্গে বলে গিয়েছিল ‘তুমি কি ভেবেছ তোমাকে ছাড়া আমার চলবে না’!
এরপর বাবার সাথে অনেকদিন কোন যোগাযোগ রাখেনি। আনন্দ ছেলের খবর কিছু কিছু রাখত। লেখাপড়ার পাঠ আগেই সাঙ্গ হয়ে গিয়েছিল। কোথায় একটা ছোটখাট কাজ করত। রোজগার সামান্যই, তাই বস্তি এলাকায় একটা ঘর ভাড়া করে ছিল। এরমধ্যে বিয়েটাও সেরে ফেলেছে। নিজের ছেলের বিয়েতে আনন্দ একজন সাধারণ নিমন্ত্রিত ছাড়া আর কিছু ছিল না। আর নিমন্ত্রণটাও হয়েছিল অত্যন্ত দায়সারাভাবে। আত্মসম্মানবোধ আছে এমন মানুষ নিজের ছেলের বিয়েতে এভাবে যেতে পারে না। আনন্দও যায়নি। দুঃখ, কষ্ট, আঘাত, আনন্দর জীবনে নিত্য সঙ্গী। তবু ছেলের কাছে পাওয়া আঘাত বোধহয় সবকিছুকেই ছাপিয়ে গিয়েছে। 
মেয়ের ইচ্ছেয় আর চেষ্টায় মেয়ের ফ্ল্যাটের সামনা সামনি এই ফ্ল্যাটটা কিনে বহুদিন কাটান দমদমের ভাড়া বাড়িটা ছেড়ে একসময় এখানে চলে আসে। এখানে মেয়েরও বাবাকে দেখাশুনার একটু সুবিধে হয় আর আনন্দরও নাতি  নাতনিদের সাথে সময়টা ভালই কাটে। আলোর বউ অনেকবার এই ফ্ল্যাটে এসেছে। কয়েকবার আলোও সঙ্গে ছিল। মেয়েটি খারাপ নয়। স্বামীর আচরণের জন্য ক্ষমা চেয়ে আবার বাপ ছেলের সম্পকর্টা গড়ে তোলার চেষ্টা করেছে। এমনকি আলোকে দিয়েও তার কৃতকর্মের জন্য বাবার কাছে দুঃখ প্রকাশ করিয়েছে।
আনন্দ যেমন জীবনে কখনও কোন কিছুর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে পারেনি, তেমনই আঘাত জর্জরিত জীবনে সব আঘাত সামলে অচিরেই জীবনের স্বাভাবিক ছন্দে ফিরে আসার এক অদ্ভুত ক্ষমতা ওর মধ্যে ছিল। কিন্তু আলোর আচরণের এই কুৎসিত পরিবতর্নের পর থেকে ওকে নিজের ছেলে বলে পরিচয় দিতেও ঘৃণা বোধ করে। তাই বৌমার শত চেষ্টাতেও বাবা ছেলের সম্পর্ক আর স্বাভাবিক হয়নি। তা ছাড়া আনন্দর মনে হত আলো বা তার বউএর তার ফ্ল্যাটে আসাটার পিছনে একটা অভিসন্ধি ছিল। তা হল অর্থ।
-- ছেলের চিঠি না পড়ে কেন রেখে দিয়েছি জানো অজয় ? কারণ খামের ভেতর কি লেখা আছে তা আমার জানা। নয় নিজে নয় বউমাকে দিয়ে টাকা চেয়েছে। চাকরি তো সেরকম কিছু করে না। ভাঁড়ারে টান পড়লেই বাপকে স্মরণ করে।
-- চাইলেই টাকা দিয়ে দেন ?
-- অধিকাংশ সময়েই দিই। কি করব ছেলে ত। যত বদই হোক পয়সার অভাবে খেতে পাবে না বাপ হয়ে তা কি দেখতে পারি!
-- তা সামনা সামনি না এসে চিঠি লিখে চায় কেন ?
-- সামনে এসে চাইবার তো আর মুখ নেই। আর তাছাড়া এখন এখানে নেই। বিহারে কোথায় যেন কাজ করে। অবশ্য কাজ সেরকমই করে, না হলে ফি মাসে হাত পাততে হয় !
যাক ওসব কথা ছাড়। সব ঘটনা তো শুনলে। এবার বল, আমার মত জীবনে এত বিয়োগ, এত হারানো, এত কষ্ট, আর কখনও শুনেছ ? কেবলই মাইনাস।
--বাবা কখন খাবে ? কত রাত হল বল তো! আজকাল একদম কথা শুনছ না। আর তুমি না খেলে বাচ্চা দুটোও খাবে না। 
কথাগুলো বলার পর মহিলা ঘরে অজয়কে দেখতে পেয়ে লজ্জা পেয়ে যায়।
--তুই খাবার বাড় আমি এখনই আসছি। 
ভদ্রমহিলা চলে যাওয়ার পর আনন্দ অজয়ের দিকে চেয়ে বলল—আমার মেয়ে। 
--আন্দাজ করেছি। এর পরেও বলবেন আপনার পাওয়ার ঘরে কিছুই নেই। কানাইএর মত একজন অপরিচিত মানুষের নিজেকে উজাড় করে দেওয়া ভালবাসা, সান্নিধ্য ও অসীম নির্ভরতা পাওয়া কজন মানুষের কপালে জোটে। আর আপনার মেয়ে আশা। বিয়ের আগের কথা বাদই দিলাম, বিয়ের এতকাল পরেও বাবার জন্য এত ভাবে, এটা কি কম বড় পাওয়া। সন্তানের এই ভালবাসা আর উৎকণ্ঠায় ভরা শাসন, নাতি নাতনির সঙ্গ, আজকের এই বৃদ্ধাশ্রমের যুগে এক বৃদ্ধের কাছে এর থেকে বড় পাওয়া আর কি থাকতে পারে ! জীবনে আপনি যতবার সমস্যায় পড়েছেন তা থেকে বেরিয়ে আসার পথও কিন্তু কোন না কোন ভাবে পেয়ে গেছেন। জীবনের যোগ বিয়োগের অঙ্কটা বড় জটিল। কোথায় কি চিহ্ন বসাচ্ছেন তার ওপর নির্ভর করবে এর উত্তর।
কিছু সময় চুপ করে থাকার পর আনন্দ বলল—তোমার মত করে অবশ্য কোনদিন ভাবিনি। দেখি তোমার প্রসেসে অন্য কোন উত্তর পাই কি না।
এতদিনের জমে থাকা ব্যাথা বেদনাকে উগরে দিতে পেরে মানসিকভাবে মানুষটাকে অনেকটাই ভারমুক্ত মনে হচ্ছে। এখন একে ভরসা করে বলাই যায় “ভাল থাকবেন”।
অজয় ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখে রাত এগারটা। আর নয়, এবার উঠতে হবে।
 

Enhanced by Zemanta