স্বপ্ন - রতন লাল বসু: তৃতীয় অধ্যায় | Shopno - A Bengali Novel by Dr. Ratan Lal Basu - Chapter 3 | WBRi Bangla Online Magazine

"Shopno" is a novel by Dr. Ratan Lal Basu published serially in the WBRi Bangla Magazine section in unicode Bangla font. Links to previous and following chapters are posted at the bottom of every episode.


স্বপ্ন

রতন লাল বসু

তৃতীয় অধ্যায়



থার্ড ইয়ারের ক্লাশ শুরু হতে না হতেই কলেজ বন্ধ হয়ে গেল। বেচুদের দলের কয়েকটা ছেলেকে প্রিন্সিপ্যাল কোনো কারণ না দেখিয়েই কলেজ থেকে তাড়িয়ে দিয়েছেন। তখনকার দিনে প্রেসিডেন্সি কলেজের প্রিন্সিপ্যালের ক্ষমতা ছিল কোনো কারণ না দেখিয়েই কোনো ছাত্রকে কলেজ থেকে তাড়িয়ে দেওয়ার। বেচুরা প্রিন্সিপ্যালকে চেপে ধরল ছেলেগুলোকে কলেজে ফিরিয়ে নিতে হবে। প্রিন্সিপ্যাল বেচুদের চাপের কাছে মাথা নোয়ালেননা, নিজের সিদ্ধান্তে অটল থাকলেন। বেচুরা কলেজের দেয়ালে দেয়ালে পোস্টার দিল, ‘বিতাড়িত কমরেডদের ফিরিয়ে নিতে হবে’, ‘কালা কানুন উঠিয়ে দাও’ ইত্যাদি। কলেজের গেটের সামনে ভিড় করে বেচুরা ক্রমাগত শ্লোগান দিতে থাকল। প্রিন্সিপ্যাল ও কিছু অধ্যাপক ঘেরাও হলেন। পুলিশ এসে তাঁদের মুক্ত করল। কিছু ছাত্রকে গাড়িতে তুলে নিয়ে পরে মুচলেকা লিখিয়ে ছেড়ে দিল। অবশেষে বেচুদের দল এস.এফ. (স্টুডেন্টস ফেডারেশান)-এর ছেলেরা কলেজ বন্ধ করে দিল। কলেজের গেটের সামনে একদল ছেলে বসে পড়ল, কাউকে কলেজে ঢুকতে দেবেনা। পি.সি.এস.ও. (প্রেসিডেন্সি কলেজ স্টুডেন্টস অরগানাইজেশন)-এর কিছু ছেলে কলেজ খোলার চেষ্টা করল। কিন্তু ততদিনে কলকাতার অধিকাংশ কলেজের অসংখ্য ছেলেমেয়ে বেচুদের সমর্থনে কলেজের গেটের সামনে এসে বসতে শুরু করেছে। কলকাতার অধিকাংশ কলেজে তখন এস.এফ. এর প্রতিপত্তি। তাই ছাত্র সমাজের এক বিরাট অংশের সমর্থন পুষ্ট হয়ে বেচুদের কলেজগেট অবরোধ চলতেই থাকল। পুলিশ এসে মাঝে মাঝে অবরোধকারী ছাত্রদের উঠিয়ে দিলেও ক্লাশ শুরু করা আর সম্ভব হলনা। অনেক অধ্যাপক আগ্রহী ছাত্রদের নিয়ে নিজেদের বাড়িতে কিছু কিছু দরকারি ক্লাশ করতে থাকলেন।
একদিন এই ডামাডোলের সুযোগ নিয়ে কে বা কারা কলেজের কেমিস্ট্রি লেবরেটরি ভেঙ্গে তছনছ করল। লক্ষ লক্ষ টাকার যন্ত্রপাতি সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে গেল। এর মধ্যে অনেক যন্ত্রপাতি ছিল যা আর বাজারে কিনতে পাওয়া যাবেনা। যার মধ্যে নাম করা বৈজ্ঞানিকদের দান করা অনেক যন্ত্রপাতিও ছিল। সমস্ত পত্র পত্রিকার প্রথম পাতায় এই খবর বেরোল। সকলেই এই লজ্জাজনক ঘটনার তীব্র নিন্দা করল। এস.এফ. ও পি.সি.এস.ও. এই ঘটনার নিন্দা করে পরস্পরকে দোষারোপ করতে লাগল। পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের গোয়েন্দা দপ্তর অবশ্য এটাকে কোনো অপরাধী চক্রের কাজ বলে সন্দেহ প্রকাশ করল।
সমরও মাঝে মাঝে গেটের সামনে বসে, সবার সাথে সুর মিলিয়ে স্লোগান দেয়। একদিন গেটের কাছে একটা ছেলে বলল, ‘আমাকে চিনতে পারছেন, সেইযে ইউনিভার্সিটি ইনসটিটিউটে ডিবেট কম্পিটিশনে আলাপ হয়েছিল?’ সমর হেসে বলল, ‘খুব চিনতে পেরেছি, সিটি কলেজে পড়েন, কি যেন নামটা?’
‘অভীক চ্যাটার্জ্জী। আপনার নামটাও ভাই জানিনা’।
‘সমর দত্ত’।
‘ভাবতেও পারিনি আপনাদের কলেজকে দিয়েই শেষে আন্দোলনটা শুরু হবে। আমারতো ধারণা ছিল প্রেসিডেন্সি শুধু বড়লোকের ছেলেদের আড্ডাখানা; এখানকার ছাত্রছাত্রীরা সমাজের মূল অংশ থেকে বিচ্ছিন্ন। এই ঘটনার পর আমার সে ভ্রান্ত ধারণা সম্পূর্ণ ভেঙ্গে গেছে’।
সমর হেসে বলল, ‘আসলে বাইরে থেকে দেখে কোনো কিছু সম্বন্ধে ধারণা তৈরি করাটাই ভুল’।
‘ঠিকই বলেছেন। আমি কেবল বাইরের প্রাচীরটাকেই দেখেছিলাম। ভেতরে ভেতরে যে বারুদ জমছে ধারণাই করতে পারিনি। এই উত্তাল আন্দোলন দেখে আমি আজ সত্যিই অভিভূত হয়ে পড়েছি। হয়ত ভারতীয় সমাজের কোয়ালিটেটিভ চেঞ্জের সূত্রপাত এখান থেকেই হবে। চলুল একটু কফি হাউস থেকে ঘুরে আসি। যারা দাঁড়িয়ে আছে তারা বসুক’।
কফি হাউসে ঢুকে ওরা দেখে বেজায় ভিড়। কোনো চেয়ার খালি নেই। বুদ্ধি করে দুটো টিনের ফোল্ডিং চেয়ার জোগাড় করে সমর আর অভীক এক কোণে বসে পড়ল। আসপাশের অধিকাংশ ছেলেমেয়ে নানান কলেজ থেকে এই আন্দোলনকে সমর্থন জানাতে এসে জড়ো হয়েছে। কলেজের আন্দোলন ও তার ভবিষ্যত নিয়ে নানান মত প্রকাশ করছে। কেউ কেউ আবার কমিউনিজমের জটিল তত্ত্ব নিয়ে তর্ক জুড়েছে। সকলের মুখেই বেচুর নাম। কলকাতার বামপন্থী ছাত্রদের কাছে বেচু একটা আবিষ্কার। যে কলেজ শধু কিছু কেরিয়ারিস্ট আমলা তৈরি করে সেখান থেকে বেচুর মত ছেলে বেরোল কি করে ভেবে সবাই অবাক হচ্ছে।
অভীকও ওদের কথায় সায় দিল। পাশের টেবিলের ছেলেমেয়েরা তখন শ্রেণীহীন সমাজ কেমন হতে পারে তাই নিয়ে তর্ক জুড়েছে, মার্কস-এঙ্গেলস, লেনিন, স্তালিন, মাও-সে-তুং এর রচনা থেকে উদ্ধৃতি দিচ্ছে। অভীকও মাঝে মাঝে ওদের আলোচনায় যোগ দিয়ে মত প্রকাশ করতে লাগল। সমর চুপ করে ওদের আলোচনা শুনছিল। অনেক কিছুই ওর কাছে দুর্বোধ্য ঠেকছিল। কিন্তু শুনতে খুব ভালো লাগছিল। ক্লাশের পড়ার বাইরেও ওরা কত পড়াশোনা করে। সমরত এসব কিছুই জানেনা।
কফি খেয়ে সমর আর অভীক বেরিয়ে পড়ল।
কলেজ স্ট্রীটের দিকে যেতে যেতে অভীক বলল, ‘এখন কি করবেন?’
‘কি আর করব, দিদির বাড়িতে ফিরে যাব’।
‘এখনই বাড়ি ফিরে কি করবেন? চলুননা আমাদের বাড়ি, কাছেই, বউবাজারে। চলুননা আমাদের বাড়িতে বসে কিছুক্ষন গল্প করি, তারপর আপনাকে হাওড়ার বাসে তুলে দেব’। ট্রাম-বাস আর পথ চলতি মানুষের পাশ কাটিয়ে সমর আর অভীক বউবাজারের দিকে এগিয়ে চলল। রাস্তার ভীড় একটু হাল্কা পেয়েই অভীক আলাপ জোড়ে, ‘আচ্ছা, আমরা জ্যোতি বসু, বেচু এদের ডি-ক্লাস্‌ড বলতে পারি, তাইনা’।
সমর কিছুক্ষণ বোকার মতো তাকিয়ে থেকে বলে, ‘আসলে আমি এসব কিছু বুঝতে পারিনা’।
‘কেন আপনি মার্কসিজ্‌মের কোনো বই পড়েননি?’
‘একটাও না’
‘আমি অবশ্য আসল বই কিছু পড়িনি। আসল বইগুলো খুব কঠিন। তবে এমিল বার্ণস, মরিস কর্ণফোর্থ এদের বইয়ের বাংলা অনুবাদ পড়ে অনেক কিছু জানতে পেরেছি। এসবতো আজকাল সবার জানা দরকার’।
‘আমার আসলে রাজনীতি সম্বন্ধে কোন আগ্রহ নেই। কলেজের ব্যাপারটা কয়েকটা ভালো ছাত্রের ভবিষ্যত নিয়ে। তাই সমর্থন করছি’।
‘রাজনীতি আর মার্কসিজ্‌মের প্রাথমিক বিষয়গুলো না জানলেতো যে সমাজে বাস করছেন তার সম্বন্ধে কিছুই বুঝতে পারবেননা। সাহিত্য, দর্শন, বিজ্ঞান সবকিছুতেই রাজনীতি আছে, শ্রেণি দ্বন্দ্বের ব্যাপার আছে। অর্থনীতির ছাত্র হয়ে আপনারতো এসব বিষয় ভালো করে জানা দরকার’।
কথা বলতে বলতে ওরা বউবাজারের মোড়ে পৌঁছে গেল। অভীককে অনুসরণ করে সমর একটা সংকীর্ণ গলিতে ঢুকে পড়ল। দুধারের বাড়িগুলোর মাথা ঝুঁকে পড়ে আকাশটাকে প্রায় ঢেকে ফেলেছে। মনে হচ্ছে দুপাশের বাড়িগুলো যে কোনো সময় হুড়মুড় করে ভেঙ্গে পড়তে পারে। কিছুটা এগিয়ে অভীকদের বাসা। একটা ভাঙ্গাচোরা আদ্যিকালের বাড়ির একতলায় অভীকরা ভাড়া থাকে। দুটো মাত্র ছোটো ঘর। একতলায় আরো তিন পরিবার ভাড়া থাকে। বাইরের ঘরটায় ঢুকে সমর দেখে সারা ঘরে জামা কাপড় বাক্স প্যাটরা এলোমেলো ছড়ানো। সমরকে ইতস্তত করতে দেখে অভীক একপাশের খাটের উপর বসতে বললো। নিজেও বসল। বিছানার পাশে দেয়ালের কাঠের তাকে একগাদা বই খাতা। সামনের ছোটো টেবিলেও বইখাতা, টেবিল ল্যাম্প। অভীকের বাবা রাইটারসে লোয়ার ডিভিশন ক্লার্ক। অভীকই বড় ছেলে। নিচে আরো তিন বোন দু ভাই। পরের ভাইটা সুরেন্দ্রনাথ কলেজে ফার্স্ট ইয়ারে পড়ে। দুই বোন এক ভাই স্কুলে পড়ে। সবচেয়ে ছোট বোনটা মাত্র দু-বছরের। দুটোমাত্র ঘরে এতগুলো মানুষের বাস। অভীক এর মধ্যে কি করে পড়াশুনা করে ভেবে সমর অবাক হয়। অভীকের মা ওদের কথা শুনে বাইরের ঘরে আসতে অভীক সমরকে পরিচয় করিয়ে দেয়। ভাইবোনরা সব বাইরে। ছোটোটা পাশের ভাড়াটেদের মেয়েটার সাথে পুতুল খেলছে। অভীকের মা স্নেহভরা কণ্ঠে বলেল, ‘চা খাবে?’ সমর আপত্তি জানায়।
ওরা দু-জন বাড়ির ছাতে গিয়ে দাঁড়ায়। ছাতের কার্ণিশ ভেঙ্গেচুরে গেছে। হ্যালান দিতে ভয় করে, এই বুঝি ভেঙ্গে পড়বে। সমর বলে, ‘এই ভিড়ের মধ্যে পড়াশুনা করেন কি করে?’
অভীক ম্লান হেসে বলে, ‘করতে হয়। কি করব, অন্যকোনো উপায়তো নেই। বাবার সামান্য আয়। আমরা সব ভাইবোন প্রাইভেট টুইশনি করে যার যার পড়ার খরচ চালাই। কলেজের লাইব্রেরিতে বসে অনেক পড়া তৈরি করে নি’।
সমর কোনো কথা বলেনা। অবাক হয়ে অভীকের কথা শুনতে থাকে। অভীক বলে চলে, ‘আমাদের একারইতো এ-অবস্থা নয়। দেশের বেশিভাগ লোকইতো কঠিন জীবন সংগ্রাম করছে। আমরাতো তবু দুবেলা খেতে পাচ্ছি, জামাকাপড় পরতে পারছি। আর শ্রমিক-কৃষকদের কথা, ফুটপাথবাসী লোকগুলোর কথা ভাবুন। আসলে এরকম ভাবে চলতে পারেনা। এই সমাজ ব্যবস্থাটা বদলানো দরকার’।
চারপাশে পুরোনো ধাঁচের ছোটো বড় বাড়ি, একে অপরের গায়ে সেঁটে আছে। ফাটল ধরা ইঁট বেরোন দেয়াল। কোথাও বট-পাকুড়ের চারারা মনের আনন্দে শেকড় চালিয়েছে। ছাতে ছাতে দড়িতে শাড়ি সায়া সার্ট প্যান্ট মেলা রয়েছে। কে বলবে কলকাতা ‘প্রাসাদ নগরী’? চারিদিকে তাকিয়ে সমরের মনে হয় সে যেন হরপ্পা মহেঞ্জোদারোর ধ্বংশাবশেষের মাঝে দাঁড়িয়ে আছে। অবশ্য প্রাসাদ নগরীর দেখা যে মেলেনা তা নয়। চৌরঙ্গী, পার্ক স্ট্রীট, বালিগঞ্জ্‌পার্কসার্কাসে সমর প্রাসাদ নগরীর দর্শন পেয়েছে। কিন্তু আজ সমর যেন এক অনেক যুগ আগের কোন প্রাচীন শহরের মাঝে দাঁড়িয়ে আছে, বাড়িঘরগুলো যেন মাটি খুঁড়ে আবিষ্কার করা হয়েছে। আর এসব বাড়ির ভিতরে রয়েছে অসংখ্য মানুষের কঙ্কাল।
কিছু দূরের একটা ছাতের আলসেতে দাঁড়িয়ে একটা মেয়ে এ ছাতের দিকে একদৃষ্টে চেয়ে ছিল। সমর ওর দিকে তাকাতেই মেয়েটা মুখ ঘুরিয়ে অন্য দিকে চলে গেল। অভীক একটু লাজুক লাজুক ভাবে বলল, ‘আজ আপনাকে একটা কথা বলব। কাউকে বলবেননা কিন্তু। ওই যে মেয়েটাকে দেখলেল, ওর সাথে বেশ কিছুদিন হলো আমার প্রেম চলছে। ক্লাশ নাইনে পড়ে’।
সমর উৎসাহিত হয়ে বলে ওঠে, ‘দা-রুন ব্যাপার। কি করে আলাপ হলো?’
‘আলাপ এখনো হয়নি’।
‘তবে!’
‘রোজ ছাতে উঠে আমরা দুজনে পরস্পরের দিকে তাকিয়ে থাকি। আচ্ছা কি করে কথা বলা যায় বলুনতো’।
‘সে তো খুব সহজ ব্যাপার। রাস্তায় ডেকে একদিন কথা বলুনন’।
‘যদি স্রেফ না করে দেয়, অথবা চেঁচামেচি করে লোক জড়ো করে?’
‘দেখে কি মনে হয়, সেরকম কিছু করার সম্ভাবনা আছে না কি?’
‘কি করে বলি বলুন। ছাতে তাকিয়েতো ভালোই মনে হয়। কিন্তু মেয়েদের মনের ব্যাপার কি করে বোঝা যায়? কথায় বলেনা- দেবাঃ ন জানন্তি, কুতো মনুষ্যাঃ’।
‘তাহলে আর ছাতে দাঁড়িয়ে রোজ রোজ হয়রানি করে কি লাভ? ভুলে যান মেয়েটার কথা’।
‘আমার কিন্তু বার বার মনে হয় ও আমাকে ভালো বাসে’।
‘তাহলে এক কাজ করুন। একটা বশীকরণ কবোচ কিনে হাতে পরে নিন’।
অভীক হেসে বলে, ‘দূর আপনি ঠাট্টা করছেন’।
সমর এবার হো হো করে হাসতে থাকে। অভীকও সে হাসিতে যোগ দেয়।
‘দাদা, মা তোদের দুজনকে মুড়ি খেতে ডাকছে’।
সমর তাকিয়ে দেখে একটা বছর তেরোর রোগাটে মেয়ে। ফর্সা ফেকাশে রঙ। চোখ মুখ কাটা কাটা, বেশ সুন্দর বলা যায়। অভীক ওর বোনের সাথে সমরের পরিচয় করিয়ে দেয়। ওর নাম তপতী। মেয়েটা বেশ সপ্রতিভ। সমরের দিকে চেয়ে বলে, ‘চলুন সমরদা ঝাল মুড়ি মাখা খেয়ে নিন’।

বেশ শীত পড়েছে। সবার গায়ে গরম পোশাক চড়েছে। সমরের এই নাতিদীর্ঘ শীতকালটা খুব ভালো লাগে। কলকাতায় প্রায় সারা বছরই গরম। অসহ্য লাগে। শরীরটা শীতে অনেক ভালো থাকে। রোদ্দুরটা কি মিষ্টি! ভাটুইপুরের শীতের মতো কলকাতার শীতে তেমন ঝাঁঝ নেই। সমর এখন গেটে না বসলেও বেচুদের আন্দোলনের সব খবরাখবর রাখে। সামনেই পশ্চিমবঙ্গে ইলেকশান। সি.পি.এম.-এর সাথে অন্যান্য বামপন্থি দলগুলো আর অজয় মুখার্জির ‘বাংলা কংগ্রেস’ মিলে ‘যুক্ত ফ্রন্ট’ নামে কংগ্রেস বিরোধী বিরাট জোট গড়েছে। অজয় মুখার্জী কংগ্রেস থেকে বেরিয়ে এসে নতুন দল গড়েছেন আর যুক্ত ফ্রন্টের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। চারিদিকে সাজ সাজ রব, মিটিং মিছিল, পোস্টারের ছড়াছড়ি। ট্রামে-বাসে-ট্রেনে সর্বত্র লোকের মুখে মুখে ইলেকশানের আলোচনা। খবরের কাগজগুলো ভরে থাকছে ইলেকশানের বিভিন্ন খবর। সকলের মতই হল কংগ্রেস এবার হেরে যাবে। অজয় মুখার্জীর নেতৃত্বে যুক্তফ্রন্ট পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় আসবে।
কলেজে সবাই বলাবলি করছে যুক্তফ্রন্ট ক্ষমতায় এলে বেচুদের লাভ হবে। বামপন্থী নেতারা নাকি আশ্বাস দিয়েছেন ক্ষমতায় এলে ছাত্রদের দাবী মেনে এক্সপেল্‌ড ছাত্রদের কলেজে ফিরিয়ে নেবেন, কলেজ থেকে ‘কালা কানুন’ তুলে নেবেন। সমর ভাবে যুক্তফ্রন্ট জিতলে কি ভালোই না হবে। জিনিষপত্রের দাম বাড়া বন্ধ হবে, ভেজাল আর কালোবাজারি বন্ধ হবে। চাষীরা জমির মালিকানা পাবে। পুলিশের জুলুম আর থাকবেনা। ১৯৪৭ সালে নামে মাত্র স্বাধীনতা এসেছে। কিন্তু যুক্তফ্রন্ট জিতলে পশ্চিমবঙ্গে সত্যিকারের স্বাধীনতা আসবে।
যুক্তফ্রন্ট-এর ক্ষমতায় আসার কথা ভেবে জোতদার, কালো বাজারী, গুণ্ডা-বদমাস, অসৎ সরকারি আমলা, অসৎ পুলিশ সকলে খুব ভয় পেয়ে গেছে। তাই ওরা কংগ্রেসকে জিতিয়ে দেওয়ার মরীয়া চেষ্টা চালাচ্ছে। আর মধ্যবিত্ত, চাষী-মজুররা দিন গুনছে কবে যুক্তফ্রন্ট ক্ষমতায় আসবে। বেচুদের দলের অনেক ছেলে বলাবলি করছে কংগ্রেস আর কোনোদিন ক্ষমতায় ফিরে আসতে পারবেনা। এবার শুরু হবে খেটে খাওয়া মানুষদের রাজত্ব। তবে অজয় মুখার্জী লোকটা খুব একটা সুবিধার নন।  কংগ্রেস থেকেইতো এসেছেন। আসলেতো খাঁটি বুর্জোয়া। পরের নির্বাচনে ওঁকে বাদ দিয়েই শুধুমাত্র বামপন্থীদের নিয়ে জোট গড়তে হবে। এখন অবশ্য ট্যাকটিক্যালি অজয় মুখার্জীকে সঙ্গে রাখতেই হবে। সমরও এসব কথা এখন বিশ্বাস করে। অথচ আগে কমিউনিস্ট ও বামপন্থীদের সম্বন্ধে সমর অনেক ভুল ধারণা পোষণ করত।
কয়েক বছর আগের একটা ঘটনার কথা সমরের মনে পড়ে গেল। হায়ার সেকেন্ডারী পরীক্ষার ঠিক আগে সমর বাবার সাথে ট্রেনে করে যাচ্ছিল। বাবার সাথে একজন সরকারি অফিসার আলাপ জুড়েছিলেন। ভদ্রলোক বলছিলেন সরকারি কেরানি, স্কুল শিক্ষক, কলেজের অধ্যাপক এদের মধ্যে কমিউনিস্টদের সংখ্যা দিনের পর দিন বেড়ে চলেছে। তাও সি.পি.আই. হলেও কথা ছিল। সি.পি.এম.-এর প্রভাব প্রতিপত্তি দিনের পর দিন যেভাবে বেড়ে চলেছে তা দেশের পক্ষে খুবই বিপজ্জনক। একবার ক্ষমতা দখল করতে পারলে সি.পি.এম. দেশটাকে তছনছ করে ছাড়বে। স্তালিন, মাও-সে-তুং দের মত এদেশেও ডিক্টেটরশিপ চালু হবে। ভারতের অবস্থা চীন-রাশিয়ার মত হয়ে যাবে। মানুষের স্বাধীনতা বলে আর কিছু থাকবেনা।
বাবা বললেন, ‘সব দোষ নেহেরুর। কমিউনিস্টদের মন যুগিয়ে চলবেন, তা ওরা বাড়বেনা! চীন যখন অন্যায় ভাবে তিব্বত দখল করল, নেহেরু বিনা দ্বিধায় সেটা মেনে নিলেন। চৌ-এন লাইকে এদেশে এনে কত আদিখ্যেতা! তারপর চীন যখন আমাদের দেশ আক্রমণ করল তখন হুঁশ হল’।
ভদ্রলোক বললেন, ‘শুধুমাত্র কমিউনিস্টদের ব্যাপারে নয়, নেহেরুর নরম নীতির জন্য দেশটা রসাতলে যাবে। দেখলেন না কেমন বেরুবাড়ি পাকিস্থানকে দিয়ে দিলেন’।
বাবা বললেন, ‘প্যাটেল বেঁচে থাকলে দেশের এদশা হতনা। চীন পাকিস্থান সবকে টাইট দিয়ে দিত। ফিফথ কলামিস্ট কমিউনিস্ট গুলোকে পিটিয়ে ঠাণ্ডা করে দিত’।
সেদিন কমিউনিস্টদের প্রভাব বৃদ্ধির কথা শুনে সমরেরও খুব দুঃশ্চিন্তা হয়ে ছিল। তারপর নিজেকে আশ্বাস দিয়েছিল, ‘ধুর কমিউনিস্টরা কখনো জিততে পারবেনা’। কিন্তু আজ সমরের ধারণা কত পালটে গেছে। আজ সমর মনে প্রাণে কামনা করছে যুক্তফ্রন্ট যেন জেতে।

১৯৬৭ সালের সাধারন নির্বাচনে কংগ্রেস হেরে গেল। অজয় মুখার্জীর নেতৃত্বে গঠিত হল যুক্তফ্রন্ট মন্ত্রীসভা। সি.পি.এম. নেতা জ্যোতি বসু হলেন উপ-মুখ্যমন্ত্রী। পশ্চিম বঙ্গের মানুষের মনে উল্লাস। নতুন স্বপ্ন, নতুন আশা। মিটিং-মিছিলে কলকাতা উত্তাল হয়ে উঠল। ট্রামে-বাসে, পথে-ঘাটে লোকের মুখে মুখে এই বিরাট পরিবর্তন নিয়ে নানান আলোচনা। কংগ্রেসের পুর্বতন মুখ্যমন্ত্রী প্রফুল্ল সেন নিজের জায়গা আরামবাগ থেকে হেরে গেছেন। হেরে গেছেন জাঁদরেল কংগ্রেস নেতা অতুল্য ঘোষও। রাস্তায় রাস্তায় বেগুন আর কাঁচকলা ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছে। বেগুন কানা অতুল্য ঘোষের প্রতীক আর কাঁচকলা খাদ্য আন্দোলনের ঘাতক প্রফুল্ল সেনের প্রতীক। কয়েক বছর আগে বিধান রায়ের মুখ্যমন্ত্রীত্বকালে প্রফুল্ল সেন যখন খাদ্য মন্ত্রী ছিলেন তখন খাদ্য সমস্যা প্রচন্ড রূপ ধারণ করেছিল। চালের দাম যখন আকাশ ছোঁয়া, পশ্চিমবঙ্গের সাধারণ মানুষ যখন প্রধান খাদ্যদ্রব্য চাল কিনতে অপারগ, তখন রেশন ব্যবস্থা বা অন্য কোনো বাস্তব সমাধানের প্রচেষ্টা না করে প্রফুল্ল সেন সাধারণ মানুষকে ভাতের বদলে কাঁচকলা খেতে উপদেশ দিয়েছিলেন। সেই থেকে কাঁচকলা প্রফুল্ল সেনের প্রতীক হয়ে পড়ে। খাদ্য সমস্যা সমাধানের জন্য সরকারের উপর চাপ সৃষ্টি করতে সাখারণ মানুষ যখন স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলনে নামে তখন খাদ্যমন্ত্রী প্রফুল্ল সেন পুলিশকে আন্দোলন কারীদের উপর গুলি চালাতে নির্দেশ দিয়েছিলেন। এর ফলে অসংখ্য মানুষের মৃত্যু ঘটেছিল।
সামগ্রিক ভাবে দেখতে গেলে পশ্চিমবঙ্গে কংগ্রেসের এই নির্বাচন বিপর্যয়ের মূল কারণ ছিল অর্থনৈতিক। ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের সময় বাংলা দিখণ্ডিত হয় এবং সব চেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্থ হয়। ভারতের অন্তর্গত পশ্চিমবঙ্গে শিল্পগুলো পড়লেও প্রধান উৎপাদনশীল কৃষিক্ষেত্রগুলো সব পাকিস্তানের অন্তর্ভূক্ত পূর্ববঙ্গের ভাগে পড়ে। সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার ফলে পূর্ববঙ্গ থেকে অসংখ্য হিন্দু আন্তর্জাতিক সীমানা অতিক্রম করে পশ্চিমবঙ্গে চলে আসতে থাকে। পাঞ্জাব দ্বিখণ্ডিত হওয়ার সময় ভারতের অন্তর্গত পাঞ্জাবের সমস্ত মুসলমান পাকিস্তানভূক্ত পাঞ্জাবে চলে যায় এবং বিনিময়ে পাকিস্তান থেকে সব শিখ ও হিন্দুরা ভারতে চলে আসে। কিন্তু বাংলার ক্ষেত্রে এ-জাতীয় কোনো বিনিময় না হওয়ায় পূর্ব বাংলা থেকে আগত অসংখ্য উদবাস্তুর চাপে পশ্চিমবঙ্গের অর্থনীতি সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত হয়ে পড়ে। অথচ অন্যান্য রাজ্যগুলো কেন্দ্রীয় সরকারের কাছ থেকে যে আর্থিক সাহায্য পেয়েছে, অবহেলিত পশ্চিমবঙ্গ তার কিছুই পায়নি। অবশ্য আর্থিক সমস্যা শুধু পশ্চিমবঙ্গেরই নয়, সারা ভারতেই প্রকট আর্থিক সংকটের উদ্ভব হয় দেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকেই।
বেকার সমস্যা, খাদ্য সমস্যা ও অন্যান্য আর্থিক সমস্যা সমাধানের জন্য এবং সামগ্রিক আর্থিক অগ্রগতির জন্য ১৯৫১ সাল থেকে পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়। ভারত কৃষিপ্রধান দেশ। জনসাধারণের বেশিরভাগ অংশ জীবিকার জন্য কৃষির উপর সম্পূর্ণ নির্ভরশিল। অথচ কৃষি উৎপাদন ব্যবস্থা অনুন্নত, জমিদার-জোতদার নিয়ন্ত্রিত সামন্ততান্ত্রিক ব্যবস্থার অধীন। তাই প্রথম পরিকল্পনায় কৃষি ব্যবস্থার সংস্কার ও কৃষির উন্নয়নের উপর সর্বাধিক গুরুত্ব আরোপ করা হল। এই সময় ভুমি সংস্কার ব্যবস্থার মাধ্যমে জমিদারী ও অন্যান্য সামন্ততান্ত্রিক উৎপাদন সম্পর্কের অবসান ঘটানর জন্য আইন প্রণয়ন করাও হয়েছিল।
প্রথম পরিকল্পনার সময়ে মূলতঃ প্রকৃতির বদান্যতার জন্য নিয়মিত ভালো বৃষ্টিপাত হওয়ায় খাদ্যশস্যের উৎপাদন যথেষ্ট বৃদ্ধি পায়। এর ফলে খাদ্যদ্রব্যের দাম কমে মুদ্রাস্ফীতির হার খুবই কমে যায়। কিন্তু কৃষির মূল সমস্যা গুলো থেকেই যায়। বাস্তবে ভূমিসংস্কার বিফল হয়।
দ্বিতীয় পরিকল্পনার সময় কৃষিউন্নয়নকে অবহেলা করে ভারি শিল্পের উপর বেশি গুরুত্ব আরোপ করা হয়। এদিকে জলবায়ুর ক্ষেত্রেও প্রতিকূলতা দেখা দেয়। ফলে জনসংখ্যার দ্রুত বৃদ্ধির সাথে তাল মিলিয়ে খাদ্য শস্যের উৎপাদন বৃদ্ধি না পাওয়ায় খাদ্য সমস্যা ভয়াবহ রূপ ধারণ করে। জিনিসপত্রের দাম হু-হু করে বাড়তে থাকে। তৃতীয় পরিকল্পনার সময় আবার মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা-এর মত ভারত পাকিস্তান ও চীনের সাথে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। এর ফলে পরিকল্পনার কাজ সম্পূর্ণ বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। চতুর্থ পরিকল্পনা শুরু করাই সম্ভবপর হয়না।
১৯৬০ এর দশকের মাঝামাঝি সময় থেকে খাদ্য সমস্যা ও বেকার সমস্যা ক্রমাগত ভয়াবহ রূপ ধারণ করতে থাকে। কালোবাজারি, ভেজালদার, মুনাফাখোরদের দাপটে সাধারণ মানুষের জীবন অতিষ্ট হয়ে উঠেছিল। কংগ্রেসের উপর মানুষের আস্থা সম্পূর্ণ চলে গিয়েছিল। তাই তারা একটা পরিবর্তন চাইছিল। যুক্তফ্রন্ট তাদের সামনে এক নতুন আশার বাণী নিয়ে এল। মানুষ দলে দলে যুক্তফ্রন্টকে ভোট দিয়ে তাদের ক্ষমতায় নিয়ে এল। পশ্চিমবঙ্গের মানুষ মুক্তকণ্ঠে ঘোষণা করল, ‘তোমরা আমাদের সরকার, সাধারণ মানুষের সরকার। তোমরা ভালো কাজ কর, আমরা তোমাদের সাথে আছি। তোমাদের সাময়িক বিফলতাকে আমরা সমালোচনা করবনা। তাই তোমারা নিশ্চিন্ত মনে কাজ করে যাও’।
সমরের মনেও দুরন্ত আশা ছিল পশ্চিমবঙ্গ এবার বদলে যাবে। আসছে নতুন জীবন। মানুষ পাবে প্রকৃত স্বাধীনতা, শোষণ থেকে মুক্তি। পুলিশরাজ শেষ হয়ে আসছে জনসাধারণের শাসন।
কিন্তু খুব অল্প সময়ের মধ্যেই সাখারণ মানুষের মোহভঙ্গ ঘটল। সমরের আশায় প্রথম আঘাত এল যেদিন সি.পি.এম. এর সুবিধাবাদী নেতারা বেচুদের আন্দোলন নিঃশর্তভাবে তুলে নিতে কড়া নির্দেশ দিলেন।

Next: Chapter 4 >

Previous: Chapter 2 >


Dr.Ratan Lal BasuRatanlal Basu, Ph.D. (Economics) is an ex-Reader in Economics and Teacher-in-Charge, Bhairab Ganguly College, Kolkata, India. Dr. Basu has written & edited several books on Economics.

Apart from his passion for the field of Economics, Dr. Basu's other interests are Boxing & Small Game Hunting (gave up the nasty games during college life); Swimming in Turbulent Rivers (physically impossible now); Himalayan Treks, Adventure in Dense Forests, Singing Tagore Songs and also writing travelogues and fiction in Bengali and English.

Dr. Ratan Lal Basu can be reached at rlbasu [at] rediffmail.com.


Enhanced by Zemanta