ধীমানের লেখনী-রবি প্রণাম

আমার চেতনায় রবি

আমার কাছে রবীন্দ্রনাথ একটি দর্শন । যিনি ১৫৪ বছর আগে জন্মেও আগামী ১৫০০ (দেড় হাজার) বছরের পান্ডুলিপি লিখে রেখে গেছেন । ভাববাদ কিংবা বস্তুবাদ যেখানেই হোক না কেন তাঁর সৃষ্টির সামনে অন্য কোন ত্বত্ত খাটে না । যেমন ভাবে শ্রীরামকৃষ্ণ চরিতামৃত পড়লে চিত্ত সুদ্ধি হয়, ঠিক তেমনই রবিবাবু পড়লে নিজেকে চেনা যায় । অমরত্বের বিশেষ কোন সঙ্গা আমার জানা নে, তবে এইটুকু বলতে পারি, তাঁর সৃষ্টি অমরত্বকে টেক্কা দিতে পারে । সমস্ত চিন্তাশীল ভাবনার বনেদিয়ানার উপর দাঁড়িয়ে রবিবাবুর লেখার তুল্যমুল্য বিচার করলে দেখা যায়, রবীন্দ্রনাথ সেখানে শুধু আলাদা মাত্র নন, একেবারেই অন্যতম । যদি নানা মুনির নানা পথ বলে কোন কথা থাকে তো আমিও সেই কথাই বলি, রবিবাবু একটি পথ, যে পথে হাঁটলে চারপাশে অনন্ত নিবিড় ছায়ার মধ্যে দিয়ে নিজেকে উপলব্ধি করা যায় । জীবনের যে কটি দিক আছে তাঁর সব কটি দিকেই তাঁর বিস্তার সূর্যের আলোর মতন ।
যদি নিজেকে চিনতে হয়, বা নিজের আত্মার সাথে নিজেকে বিলীন করতে হয় তাহলে আমার মতে রবীন্দ্র দর্শনই একমাত্র পথ । যদিও একথা আমরা মানে অধুনা যারা অল্প বিস্তর ভাববাদের জগতে বিচরন করি, তারা সহজে মেনে নিতে পারিনা, যে একটি মাত্র মানুষের দ্বারাই সকল সৃষ্টি ত্বত্ত্বের হিসেব নিকেশ করা যায় । তাই রবীন্দ্র বিরোধিতা বোধহয় আমাদের এক অনিবার্য আত্মতুষ্টি । আর এই কথা রবিবাবু নিজেই টের পেয়েছিলেন । তাই নিজেই সেই রাস্তা খুঁড়ে রেখে গেছিলেন । রবীন্দ্রনাথের পরবর্তী কালে যে রবীন্দ্র বিরোধী যুগের সুচনা হয়েছিল, তাঁর প্রথম পথ প্রদর্শক রবিবাবু নিজেই । ‘শেষের কবিতায়’ তিনি এক অদ্ভুত আত্ম উপলব্ধির কথা প্রকাশ করেন, তা হোল নিজের লেখার পুনরায় আবর্তন । তিনি হয়তো বুঝেছিলেন ঠিকই যে কোন মাত্র একটি পথ মানুষ সহজে মেনে নেবে না, তাতে দৈর্ঘ্যর চেয়ে প্রস্থে বিরক্তি বাড়বে বেশী । তাই তিনি অতি সহজেই আনলেন গল্পের ছলে নিবারন চক্রবর্তীকে । অর্থাৎ একটি নতুন আবর্তন । নতুনকে জায়গা করে দিতে হবে, না হলে যে পুরাতনের সাবেকিয়ানা বজায় থাকবে না, সেটা তিনি উপলব্ধি করেছিলেন । অর্থাৎ একটা নতুন পথের জন্য আমরা যারা উন্মুখ তাদের কাছে সেই পথটিকে আলোকপাত করে যাওয়া – এটা বোধহয় একমাত্র তিনিই পারেন যিনি অনন্ত বিশ্বে একমেব্যম ; তাইতো তিনি ব্রহ্ম কবি ; যিনি নিজের আত্মার সাথে নিজের ভাবনার জগতকে সবার মাঝে পৌঁছে দিতে পেরেছিলেন ।
রবীন্দ্র দর্শন সর্বকালের শ্রেষ্ঠ আধুনিক দর্শন, যেখানে যাবতীয় প্রাচুর্যের বিশাল ভাণ্ডার । একজীবনে যা লেখা হয়েছিলো এক হাজার জীবনেও তাঁর সঠিক ভাবোদ্ধার করা যাবে না । সময় কাল ও সমাজকে নিক্তির বাটখারা বানিয়ে যখই তাঁর বিচার করতে যাই দেখতে পাই আসলে কাঁটাটি দাঁড়িপাল্লার ঠিক মাঝখানেই আছে, অর্থাৎ যা একশ বছর আগেও ছিল আধুনিক আজও তা সেই আধুনিকই । নিজেকে জানার মধ্যে দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে যদি কোন এক বিশেষ প্রাকারের মধ্যে আমরা ঢুকে যাই আর তখন যদি মনে হয় তা আমাদের নিজেদেরকে সীমাবদ্ধ করে ফেলছি, আমরা তখন মুক্তির আশায় ছুটে বেড়াই দশদিগন্ত । অথচ রবিবাবু কত না সহজেই না আমাদের সমস্ত মুক্তির পথ দিয়ে গেছেন তা একমাত্র তারাই জানেন যারা নিজের আত্মার সাথে মিশিয়ে রবীন্দ্রনাথকে বিশ্বাস করতে পেরেছেন । আমার কাছে রবীন্দ্রনাথ শুধুমাত্র রচনাবলী না, সে আমার বাইবেল, আমার গীতা কিংবা কোরান কিংবা গ্রন্থসাহেব ।
যদিও যেখানে ভাববাদের সাথে বস্তুবাদের কোন দ্বন্ধ নেই, কোন ফারাক নেই, কোন তর্ক নেই - আছে এক অনাবিল প্রশান্তি - এক অনন্ত বিশ্বাস - এক সীমাহীন উপলব্ধির পরশপাথর ।

আমার রবীন্দ্রনাথ -




[আবৃত্তি-মহাশ্বেতা ভট্টাচার্য ]