ধীমানের লেখনী

Dhiman.jpg  


ধীমান পাল মূলত একজন শিল্পী।কর্পোরেট দুনিয়ায় তাঁর দম বন্ধ হয়ে এসেছিল।শিল্পের সাধনায় তিনি কখনও হাতে তুলে নেন তুলি,কখনও বা কলম। Online Magazine বিভাগে এখন থেকে প্রতি সপ্তাহে আমরা পাব তার লেখনীর ছোঁয়া-গল্প,কবিতা,প্রবন্ধ,ধারাবাহিক উপন্যাস,রহস্য গল্প, সমালোচনা, এরকম আরও কত কি!

শুরু হল রহস্য উপন্যাস 'ভুল ছবি'

পর্ব - ১


লোকটাকে দেখা যায় মাঝে মাঝেই রবীন্দ্রসদন চত্তরে। বহুদিনের না কাঁচা জিন্স, পায়ের তলার দিকটা রাস্তা আর চপ্পলের সাথে ক্ষয়ে যাওয়া অনেকটা জায়গা, মলিন রং ওঠা টি শার্ট কিংবা জামা। লোকটা একা একা ঘুরে বেড়ায় সারাদিন। যারা প্রায়শই সদন চত্তরে আড্ডা দেন, কিংবা কর্ম সুত্রে ওখানে যান, তাঁরা বেশ ভালো করেই চেনেন লোকটাকে। কেউ কেউ আবার সখ্যতাও করেন, বিঁড়ি সিগারেট কিংবা চা টাও খাওয়ান। নাম জানতে চাইলে সঠিক ভাবে কোন নির্দিষ্ট নাম সে বলে না, কিংবা হয়তো জানেও না নিজের নাম, ভুলে গেছে হয়তো।

গত পনের বছর ধরে আমার মোটামুটি নিয়মিত রবীন্দ্রসদন চত্তরে আনাগোনা, কখনো নিছক আড্ডা, কখনো বা নিজের কাজে। তা আমিও প্রায় গত বেশ কয়েক বছর লোকটিকে চিনি। আলাদা করে তাকে নিয়ে ভাববার কিংবা দেখবার বিষয়ে কোনোদিনই তেমন তাগিদ অনুভব করিনি, সাধারন আর দশটা লোকের মতনই তাকে ভবঘুরে কিংবা পাগল গোছের কিছু একটা ভেবে এসেছিলাম। কিন্তু ভুলটা ভাঙল গত পরশু দিন। আমাদের একমাত্র কবি বন্ধু, অমিতাভর একটি সংবর্ধনা ছিল সাহিত্য একাডেমীতে, তাঁরই আমন্ত্রণ পেয়ে গেছিলাম সেখানে। তাছাড়া নিজেরও কিছু কাজ ছিল একাডেমী অফ ফাইন আর্টস এ। সুতরাং একটু তাড়াতাড়িই পৌঁছে গেছিলাম, উদ্দেশ্য ছিল নিজের কাজটি সেরে একেবারে সংবর্ধনা অনুষ্ঠান দেখে তারপর ফিরে আসবো। তা পৌঁছে দেখি, কি এক অনিবার্য কারনে ফাইন আর্টসের কিউরেটর সাহেব ওদিন আসেন নি। সুতরাং আমার ব্যক্তিগত উদ্দেশ্য মণ্ডিত কাজটি উঠল মাথায়। সবে বেলা তিনটে, সংবর্ধনা অনুষ্ঠান বিকেল সাড়ে পাঁচটায়। কি আর করি, প্রথমে ভাবলাম একটা সিনামা দেখলে মন্দ হয় না। বহুদিন নন্দনে সিনেমা দেখিনি। কিন্তু তেমন ভালো ও উপভগ্য কিছু সিনেমা না থাকায় মত বদলালাম। তাছাড়া একা একা সঙ্গী ছাড়া সিনেমা দেখাটাও আমার ঠিক ধাতে আসে না। আর মল্লার কিংবা শ্রীলেখা যদি শোনে যে আমি একা সিনেমা দেখে এসেছি, তা হলে আমার সাত সাত্তে উনপঞ্চাশ পুরুষ উদ্ধার করে ছেড়ে দেবে। সাত পাঁচ ভাবতে ভাবতে অমিতাভকে একটা ফোন লাগালাম। অমিতাভ গম্ভীর গলায় জানাল তাঁরও আসতে মোটামুটি এখনও ঘণ্টা খানেক বাকি। কবি হিসেবে নাম করে ব্যাটার বেশ ভারিক্কী চাল হয়েছে আজকাল। অগত্যা একটি সিগেরেট ধরিয়ে হাঁটতে লাগলাম রবীন্দ্র সদন ভবনের ডান দিকে। সারি সারি পাম গাছের বাঁধানো বেদীটার উপর বিচ্ছিন ভাবে বসে আড্ডা মারছে বেশ কিছু নানা বয়সের পুরুষ ও মহিলা। কয়েদিন আগেই গান মেলা হয়ে গেছে এখানে। সেই ভাঙা মেলার বিচ্ছিন্ন কিছু বাঁশ, প্লাইউড, পেরেক ছড়িয়ে আছে এদিক সেদিক। পা বাঁচিয়ে হাঁটতে লাগলাম রবিবাবুর মূর্তিটির দিকে। একটা ফাঁকা জায়গা দেখে বসেও পড়লাম। একটা সময় ছিল যখন, বহুদিন গেছে আমি এই রকম একা একা বসে এখানে সময় কাটিয়েছি, আর পর্যবেক্ষণ করে গেছি মানুষজন। জনবহুল এলাকাতে একা একা বসে থেকে কিংবা ঘুরে বেড়িয়ে মানুষ দেখা আমার একটা নেশা ছিল এক সময়। অকারনে কোলকাতার বহু রাস্তা হেঁটে বেড়িয়েছি মানুষ দেখবার উদ্দেশ্যে। আজ অনেকদিন পর আবার নিজেকে সেই ভাবে পেয়ে বেশ ভালই লাগছিল। হাতে ঘণ্টা খানেক সময়, সঙ্গে প্রায় এক প্যাকেট সিগারেট, নাহঃ সময়টা কেটে যাবে নিমেশে। দূর থকে লাল জামা আর কালো প্যান্ট, বিশুকে আসতে দেখলাম আমার দিকে । বিশু এখানে চা বিক্রি করে। লেবু আর দুধ চা। কমবেশি আমাকে সেও চেনে তা প্রায় বছর পাঁচেক। মুচকি হেসে একটা লেবু চা দিয়ে চলে গেলো বিশু। সবে এক চুমুক দিয়েছি চায়ে, এমন সময় লোকটা আমার সামনে এসে দাঁড়ায় – একটু ফ্যাসফ্যাসে গলায় বলল –
আপনার কাছে দেশলাই হোবে - ! বাংলায় একটা স্পষ্ট হিন্দি টান । চুল ও পোশাক তথৈবচ। দেশলাই চাইল বটে, কিন্তু হাতে কোন সিগারেট নেই। হালকা হেসে পাঞ্জাবীর পকেট থেকে সিগারেটের প্যাকেট আর লাইটারটা বার করে হাতে দিলাম লোকটার। প্যাকেটটা বার দুয়েক উল্টে পাল্টে দেখে একটা সিগারেট ধরিয়ে নিল লোকটা। এক বুক স্বস্তির ধোঁয়া ছেড়ে আমার দিকে ফিরিয়ে দিলো প্যাকেট ও লাইটারটা।
বেশ একটা উদাসীন ভাব, অন্যমনস্ক চোখে আমার দিকেই মুখ করে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ধোঁয়া ছাড়ছে লোকটা ; বললাম -
– কি ব্যাপার ! কিছু বলবেন !        
- নেহি – কিছু না। কাঁচা পাকা চুল ভর্তি মাথাটা দু দিকে নাড়িয়ে জবাব দিল লোকটা ।
লোকটির ভাবগতিক দেখে আমার মধ্যেও সেই মানুষ চিনবার ইচ্ছাটা চাগিয়ে উঠলো আবার। লোকটিকে আমার পাশে বসবার জন্য অনুরোধ জানালাম। বিশু এগিয়ে আসছিল চায়ের দামটা নিতে। বিশুকে আসতে দেখে লোকটাকে জিজ্ঞাসা করলাম –
- চা খাবেন ! মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল সে।
বিশুকে আরও দুটো চা দিতে বললাম। কাপে চা ঢালতে ঢালতে বিশু লোকটাকে বলল –
- কি বিজেস ভাই ! খবর কি !
হাত বাড়িয়ে চায়ের কাপটা নিল লোকটা। বিশুর কথার উত্তরে শুধু সংক্ষেপে বলল -
- ভালো।  
চা দিয়েই বিশু চলে গেলো আবার নন্দন চত্তরের দিকে। চায়ের দামটা নিয়ে গেলো না এবারও, নিশ্চয়ই বুঝেছে আমার এখন বেশ খানিকটা সময় কাটবে লোকটাকে নিয়ে, মানে আরও কয়েক কাপ চা। লোকটাকে জিজ্ঞাসা করলাম -
- আপনার নাম কি ?
- জিঃ প্রতাপ আছে। 
- প্রতাপ ! তা বিশু যে আপনাকে বিজেস বলে ডাকল ?
- অঃ বিজেসও হতে পারে।
- হতে পারে মানে ! আজব তো ! নিজের নামটা কি সেটা ঠিক করে বলুন –
- ইয়াদ নেই।
- মনে নেই মানে ? নিজের নাম আবার কেউ ভুলে যায় নাকি ?
- জিঃ আমি ভুলে গেছি। কোখনো কোখনো মনে পড়ে, কিন্তু ইয়াদ থাকে না।
- হুম্‌ ; বুঝলুম। তা থাকা হয় কোথায় ?
- ইখানেই থাকি। নোরেনবাবু আমাকে থাকতে দিয়েছেন, ইখানেই থাকি।
- নোরেনবাবু মানে ! নরেন তালুকদার ! বাংলা একাডেমীর লাইব্রেরিয়ান ?
- জিঃ
- কোথায় থাকতে দিয়েছেন উনি আপনাকে ?
- জিঃ অইদিকে একটা ঘর আছে, অখানে । নন্দনের পিছনে গির্জার দিকটাতে আঙ্গুল তুলে দেখাল লোকটা।
- বেশ । আপনার কথার মধ্যে একটা হিন্দি টান আছে। তা আপনি কি বাঙ্গালী ? নাকি ... ... ...
- জিঃ আমি বাংলা জানি।
- সে জানেন তা না হয় বুঝলাম । আগে কোথায় থাকতেন ?
আমার ক্রমাগত জেরাতে বোধহয় লোকটা একটু অধৈর্য হয়ে উঠেছিল, হাত বাড়িয়ে বলল –
- একটা সিগারেট হোবে !
দিলাম আর একটা সিগারেট, নিজেও ধরালাম একটা । ভীষণ মন দিয়ে ধোঁয়া টানছে লোকটা । আমি আলগোছে আবার বললাম –
- তা কোথায় থাকা হ’ত আগে ?
মাথাটা একটু চুলকে নিয়ে বলল –
- পূর্ণীয়া।
- পূর্ণীয়া ! মানে বিহার !
- জিঃ
- পূর্ণীয়ার কোথায় ? মনে আছে কিছু ?
- জিঃ নেহি।

বোঝো কাণ্ড – নাম মনে নেই, কোথায় থাকতো তাও ভুলে গেছে। আমার ইন্টারেস্ট চৌগুণে পেয়ে বসলো। মল্লারকে বড্ড মিস করছি এখন,  সে সঙ্গে থাকলে এতক্ষণে অনেক কথা বার করতে পারতো লোকটার পেট থেকে। আজকে মল্লারেও আসবার কথা ছিল অমিতাভর সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে। শেষ মেশ বিধি বাম। শ্রীলেখার উৎপাতে আর কথার জ্বালায় বেচারাকে পুজোর বাজার সারতে যেতে হো’ল গরিয়াহাট। যদিও পুজোর এখনও ঢের বাকি, কিন্তু সে কথা মানে কে ! শ্রীলেখার মাঝে মাঝে এই ধরনের অত্যাচারে আমার বন্ধুর জীবনের অর্ধেকটা চলে গেছে আটলান্টিকের তলায়। বাকিটুকু বাঁচিয়ে রাখাই এখন দায়। যদিও এই সব কথা শ্রীর সামনে বলা চলে না, তাহলে ঘাড়ে গর্দানটাই আর থাকবে না। আসলে শ্রীরও তেমন কোন দোষ নেই। পয়সাওয়ালা বাপের একমাত্র আদুরে মেয়ে। তাই আদর আর আব্দারের ছায়াটি বাপের ঘর ছেড়ে এখন এসে পড়েছে আমার বন্ধুর ঘাড়ে। কি আর করা যাবে ! বাঁশ যখন ঘাড়ে নিয়েছই ঠ্যালাটা সামলাও এবার।
একটু ঘুরে বসে আবার জিজ্ঞাসা করলাম লোকটাকে –
- সত্যিই মনে নেই আপনার, কোথায় থাকতেন !
- জিঃ নেহি ।
- হুম্‌ - তা কাজ কর্ম কিছু করেন ? নাকি সারাদিন এখানে ওখানে ঘুরে বেড়ান ? চলে কি করে আপনার !
- একটা গোডাউন পাহারা দেই।
- গোডাউন !!! কিসের গোডাউন ?
- সিমেন্ট, বালু, রড এর।
- তা গোডাউনটা কোথায় ? কাদের গোডাউন ?
- জিঃ সানলাইট প্রোজেক্ট, রাজারহাটে।
- কিসের প্রজেক্ট ?
- জিঃ হাইরাইজ বানাচ্ছে।
- বুঝলাম। তা কাজ করেন কখন ? আপনাকে তো দিনের বেলা এখানেই দেখি মাঝে মাঝে !
- জিঃ হামার রাতের ডিউটি।
- হুমঃ, তা কতো মাইনে পান ?
- তিন হাজার।
- তিন হাজার ! ওতে চলে যায় আপনার ? 
- জিঃ আমি একা মানুষ।
- তা এরকম জামা কাপড় পড়ে থাকেন কেন ? নোংরা, ছেঁড়া –
- জামাকাপড়ে কি হবে সাব ! ও সব তো ইমানদারি দেখাবার জন্য লোকে পোড়ে ।
- বাহ্‌ বেশ কথা বলেন তো আপনি । তা সবাই কি ইমানদারি দেখায় বলে আপনার মনে হয় ?
- জিঃ
- মানে আসল ইমানদার কেউ নেই বলছেন !
- জিঃ এইসা নেহি – সোবাই নয় !
- তাহলে ?
- সাব হামি দেখেছি কোম্পানিতে । রাতের বেলা সব মাল সাফাই করছে, দিনের বেলা ভালো জামা পড়ে ঘুরছে । মিত্তির সাব ভি আছে ।
- মিত্তির সাব ? উনি আবার কে ?
- জিঃ হামাদের সাইট সুপারভাইজার আছে। উনি ভালো জামা কাপড় পোড়েন।
- হুমঃ – তাঁর মানে আপনাদের সাইটে চুরি হয় ?
- চুরি ভি হোয় ; অন্য কিছু ভি হোয়।
- অন্য কিছু মানে ! আর কি কি হয় শুনি।
- রাতের বেলা দারু ভি খায় অনেকে, সাট্টা ভি খেলে । তাছাড়াও আছে ওনেক কিছু । রাবিশের গাড়ি থেকে বহুত কামাই হয় সবার।
- হুমঃ তা আপনার কামাই হয় না।
- হামি অসবে নেহি যাই সাব । আমার কাজ আছে গোডাউন দেখা – ব্যাস।
- তার মানে আপনি সাচ্ছা ইমানদার ; আর বাকিরা ঝুটা ?
- জিঃ
লোকটার কথায় হাসি পেল। শালা এই বাজারে সাক্ষাৎ হরিশ্চন্দ্র। একটু তাঁর কাটা মনে হচ্ছে। দিনের বেলা সদন চত্তরে ঘুরে বেড়ায়, রাতে পাহারা দেয় গোডাউন। জানে অনেক কিছু, কিন্তু তেমন খোলসা করছে না। নাহঃ মল্লার থাকলে ভালোই হতো। আমি অতো ঘোর প্যাঁচের কথা বলতে পারি না। প্যাকেট থেকে আর একটা সিগারেট বার করে হাতে দিলাম লোকটার –
- তা প্রতাপ ভাই, কোলকাতায় কতদিন আসা হয়েছে ?
- চার সাল হোয়ে গেছে।  
- বাড়িতে কে কে আছে ? - চালাকি করে অন্যভাবে করলাম প্রশ্নটা।
চুপ করে আছে লোকটা, কিছু বলছে না। একমনে সিগারেট টেনে যাচ্ছ । কেমন জানি একটু সন্দেহ লাগলো। বাড়ির কথা জানতে চাইলেই চুপ করে যাচ্ছে কেন ! আবার বললাম –
- কি বলবে তো নাকি ! কে কে আছে বাড়িতে ?
- বাড়ি তো নেহি হামার। এখানেও কোহি ভি নেহি।
- সে তো জানি এখানে কেউ নেই। আমি বলছিলাম ওই পূর্ণীয়া মানে তোমার দেশের বাড়ির কথা।
- জিঃ পাতা নেহি।
- পাতা নেহি মানে ? বাড়িতে কে কে আছে মনে নেই, নাকি কেউ নেই তোমার !
- জিঃ ইয়াদ নেহি সাব।
এ তো মহা ঝামেলা, বাড়ি ঘরের কথা কিছুই মনে নেই নাকি লোকটার। নাহঃ কিছু একটা গণ্ডগোল আছে নিশ্চয়ই। যখনই জানতে চাইছি, লক্ষ্য করছি কেমন জানি হয়ে যাচ্ছে মুখটা। কিছু বলতে চায় না। চুপ করে থাকে।
মোবাইল ফোনটা বেজে উঠলো হঠাৎ। মল্লারের কল – উঠে দাঁড়ালাম, অনেকক্ষণ একনাগারে বসে থেকে পা গুলো ঝিন্‌ঝিন্‌ করছিলো –
- হ্যাঁ বল ; কোথায় আছিস তুই ?
- আর কোথায় ! শালা ট্রেডারসের সামনে দাঁড়িয়ে বিঁড়ি টানছি।
- আর শ্রীলেখা !
- ভিতরে। শাড়ির পাহাড় হাতে নিয়ে রঙ মিলান্তি খেলছে। বর্মণ বাবুর সাথে কথা হোল ?
- নাহঃ রে উনি আসেন নি আজক। ছুটিতে আছেন।
- যাহ্‌ - তার মানে আবার একদিন যেতে হবে। তা, অমিতাভর সাথে দেখা হয়েছে ?
- নাহ, ব্যাটার আসতে এখনও দেরি আছে। ফোন করেছিলাম।
¬- তা তুমি কি করছো গুরু ওখানে একা একা ? নারী সঙ্গ টঙ্গ নাকি ?
- ধুর শালা – একটা সাবজেক্ট পেয়েছি, সেটার সাথেই গ্যাজাচ্ছিলাম।
- সাবজেক্ট মানে ? আবার নতুন লোক ? তা এটাও কি পুরুষ ! নাকি - না না আ– রী ?
- নারী মানে ? আমাকে কি দেখেছিস কখনো নারী চর্চা করতে ?
- তুমি শালা ধম্মপুত্তুর । বাজারে আলুর যা দাম চলছে, তাতে তোমারও দোষ ধরলে অবাক হবো না।
- ধুস্‌ । যত সব । আরে একটা ভবঘুরে টাইপের লোক। মালটাকে মাঝে মাঝেই এখানে দেখি। একটু ঝাল্লাচ্ছিলাম আর কি ?
- হুমঃ তা কে সে ?
- তুইও দেখেছিস ওকে, এখানেই ঘোরাঘুরি করে, বেশ ইন্টারেস্টিং।
- কিরকম শুনি ?
- সে বাড়ি গিয়ে বলবো। তুই যা এখন শ্রীলেখার আঁচল ধর গিয়ে, নাহলে আবার চিল্লাবে। আমি রাখছি।
- ধুর শালা – বেমক্কা ফেসে গেছি মাইরি। ইস অমিতাভটা কি ভাববে বলতো ! এমনিতেই শালাটা খোঁচে আছে আমার উপর গত শনিবার থেকে, তারুপরে আজকেও যেতে পারলাম না।
- ভাবিস না । আমি সামলে নেবো। রাখছি এখন।
- হুম – টাটা -।
মল্লারের সাথে কথা বলতে বলতে খানিকটা এগিয়ে গেছিলাম রবীন্দ্র সদনের গেটের দিকে। কথা শেষ করে ঘুরে দাঁড়িয়ে দেখি, লোকটা নেই। এগিয়ে এলাম যেখানে বসেছিলাম সেই দিকটাতে। আসেপাশে তাকিয়ে খুঁজলাম । নাহঃ কোথাও নেই। গেলো কোথায় লোকটা ! পায়ে পায়ে এগিয়ে এলাম নন্দন চত্তরের দিকে। এরই মধ্যে বেশ ভীর জমে উঠেছে, ঘড়িতে সাড়ে চারটে প্রায়। এদিক ওদিক চোখ রাখতে লাগলাম, যদি লোকটাকে দেখতে পাই। অনেকটা কথা এগিয়েছিল লোকটার সাথে, আরও কিছুক্ষণ থাকলে আরও কিছু জানতে পারতাম হয়তো। নাহঃ দেখতে পেলাম না। নন্দনের বা পাশে আম গাছের গোঁড়ায় বেদীটাতে তিনটে মাঝবয়সী লোক আড্ডা মারছে। বিশুকে ওদের চা দিতে দেখে এগিয়ে গেলাম সামনে। তাছাড়া চায়ের দামটাও পায় সে। বিশু আমার দিকে পিছন ফিরে চা ঢালছিল কাপে, আমাকে দেখতে পায়নি । পাশে এসে বললাম –
- কতো হয়েছে রে বিশু তোর ?
- ওহঃ দাদা – চলে যাচ্ছেন নাকি ? আপনার তিনটে চা – মানে পনেরো। চা বানাতে বানাতে ঘাড় ঘুরিয়ে কথাটা বলল বিশু ।
- নারে, যাচ্ছি না এখুনি। সাহিত্য একাডেমীতে একটা প্রোগ্রাম আছে, সেখানে যাবো। মানিব্যাগ থেকে দুটো দশ টাকার নোট বার করে বিশুর হাতে দিয়ে বললাম –
- লোকটাকে দেখেছিস বিশু, এর মধ্যে ?
- কোন লোকটা দাদা ?
- আরে আমি যার সাথে বসে কথা বলছিলাম এতক্ষণ ; ওই প্রতাপ।
- প্রতাপ ? ওর নাম তো বিজেস। আপনাকে প্রতাপ বলেছে বুঝি ! এই এক দোষ দাদা লোকটার, এক একজনকে এক একটা নাম বলে। নাহঃ দাদা দেখি নি। আমি তো এদিকে ছিলাম, আপনিই তো বসে গল্প করছিলেন ওর সাথে।
- আরে একটা ফোন এসেছিল। কথা বলছিলাম। ফোনটা রেখে দেখি লোকটা নেই।
- হবে কোথাও এদিক ওদিক। এখানেই তো থাকে।
পাঁচটা টাকা ফেরত দিয়ে বিশু চলে গেলো নন্দনের সামনে দিকটাতে। কি আর করি ! আমিতাভও এসে পৌঁছায়নি এখনও। এলে নিশ্চয়ই ফোন করতো। সিগারেট ধরিয়ে চারিদকে চোখ বোলাতে বোলাতে হাঁটতে লাগলাম নন্দনের টিকিট কাউন্টারের দিকে। একটা অস্বস্তি হতে লাগলো, ইস্‌ লোকটা পালিয়ে গেলো ! কত কথা জানার ছিল, একটা ক্যারেক্টার, লেখার বেশ বলিষ্ঠ উপকরন । কিন্তু লোকটা গেলো কোথায় ?
অমিতাভ আসতে আসতে পাঁচটা বেজে দশ, প্রায় চল্লিশ মিনিট সারাটা চত্তর আমি তন্ন তন্ন করে খুঁজলাম, কিন্তু পেলাম না কোথাও।

অমিতাভ এসে পড়ায় মেতে গেলাম ওর সাথে । সঙ্গে মিতালিও এসেছে । একটা দামী জামদানী পড়ে বেশ কবিপত্নী কবিপত্নী ভাব । আমিও দেখে তৃপ্ত হলাম খানিকটা । মল্লার থাকলে এতক্ষণে মিতালির পিছনে লেগে ওকে নাজেহাল করে ছেড়ে দিত । এমনিতেই অমিতাভর পিছনে কম লাগেনা মল্লার । এই তো গত শনিবার রাতের পার্টিতে মল্লারের বাড়িতেই অমিতাভকে নিয়ে পড়েছিল মল্লার -
- শালা আজকের দিনে কবিতা লিখে যে কেউ গাড়ি ফুটাতে পারে তা একমাত্র তোকেই দেখলাম । ওই তো লিখিস সব হাবিজাবি, তোদের আধুনিক কবিতা – না আছে মানে আর না আছে ছন্দ – অমবস্যার রাতে পূর্ণিমার বাতি / আকাশ দিয়ে উড়ে গেলো এক ঝাঁক হাতী – শালা এই তো তোদের কবিতার নমুনা, কবিতা না হাফ সোল ! কারা কিনে পড়ে রে বে তোর ওই বই ! আমায় তো শালা মাগ্নিতে দিলেও নেবো না ।
- তাতেও তো তোর বুক সেলফে আমার সবকটা বইই উপস্থিত । মুচকি হেসে কথাটা বলেছিল অমিতাভ ।
- ওগুলো গুরু আমি কপচাইনা । শ্রী আর ওই গাড়ল সৃজিতটা পড়ে কবিতা, তাছাড়া ওগুলো সব তোর সই করা স্পেসমেন্‌ কপি । হিঃ হিঃ হিঃ,  আমার জন্য কিছু বটতলা টাইপের যদি লিখিস তো আলবাৎ পড়বো, মাইরি বলছি ।
দু পাত্তর চড়িয়েই লেগে গেলো মল্লার আর অমিতাভর ধুন্ধুমার । আমি আর মিতালি মৌজ করে গ্লাস হাতে বসে তাস পিটাচ্ছিলাম, আর মাঝে মাঝে খোঁচা মারছিলাম দুজনকেই । এমন সময় এক প্লেট গরম ফিস ফিঙার হাতে নিয়ে ঢুকল শ্রীলেখা । শ্রী আবার অমিতাভর একেবারে পেয়ারের পাঠিকা । প্লেটটা টেবিলে রাখতে রাখতে মল্লারকে খোঁচাটা মারল শ্রীলেখা –
- অমিতাভদা তাও তো বই বিক্রির টাকায় গাড়ি চড়ে । তোমার মতন তো আর বসে বসে বাপ ঠাকুরদার টাকায় ফুটানি করে না ।
পাশ থেকে মিতালি বলে উঠলো - এই রে আবার লেগছে – এবার পুরো টুয়েন্টি টুয়েন্টি ।
- আহা আমার বাপ আর দাদু যদি আমার জন্য গুছিয়ে রেখে যায় তো আমি কি করবো ? আমি কি ওদের বলে ছিলাম নাকি – বাবাগো, দাদুগো ; তোমারা আমার জন্য সব টাকা পয়সা গুছিয়ে রেখে যাও, আর একটি বড়োলোক বাপের আদরের দুলালি আমার গলায় ঝুলিয়ে দাও । আমি সেই দুলালিকে নিয়ে সুন্টু মুণ্টু করে দিন কাটাবো !
- একদম আমার বাবাকে নিয়ে কথা বলবে না বলে দিলাম । বেশ করেছি । আমি আদরের দুলালি তো দুলালি, তাতে তোমার কি ?
- আহাঃ চটছ কেন সোনা ! আমি তো অমিতাভর ল্যাজে টান মারছিলাম, তোমার ফোস্কা পড়লো কেন ?
- তুমিই বা সবসময় অমিতাভদার কবিতা নিয়ে কথা বল কেন শুনি ?  
ধুন্ধুমার লাগলো এবার শ্রী আর মল্লারের মধ্যে । যত রাত বাড়ে, তত বোতল খালি হয়, আর ততই মল্লার পিছনে লাগতে থাকে অমিতাভ আর শ্রীলেখার । সে এক দেখার মতন কাণ্ড । আমি আর মিতালি শুধু তবলা আর সারেঙ্গীর সঙ্গদ দিয়ে গেছিলাম মাঝে মাঝে ।

দুই- 

গতকাল অনুষ্ঠান শেষে আমি অমিতাভ আর মিতালি গেছিলাম পার্ক স্ট্রিট । অল্প বিস্তর পানাহারও হয়েছিল সেখানে । রাতে বাড়ি ফিরেও অমিতাভর সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের রেশ চলেছিল অনেকক্ষণ । তাই মাথা থেকে সম্পূর্ণ আউট হয়ে গেছিল লোকটার কথা, মল্লারকেও বলা হয়নি কিছুই । আজ রোববার, ঘুম থেকে উঠতে একটু গড়িমসি করছিলাম, কিন্তু পারলাম না । শ্রীলেখার চিলচিৎকারে উঠতেই হো’ল বিছানা ছেড়ে । জগাদাকে চা নিয়ে ঘরে ঢুকতে দেখে, জিজ্ঞাসা করলাম –
- কি হয়েছে গো জগাদা ! এতো চিৎকার কিসের ?
- কি আর হবে ! দাদাবাবু আর বউদিমনিতে লেগেছে আবার, ফি রোববার যেমন লাগে ।
- তা আজকে কি নিয়ে লাগলো শুনি ?
- ইলিশ মাছ ! মুচকি হেসে জগাদা বলল – 
- ই লি শ মা ছ – যাহ্ বাবা ।
- একবার গিয়ে দেখই না রান্নাঘরে – কি কাণ্ড ।
কি আর করি ; অগত্যা বিছানা ছেড়ে চায়ের কাপ হাতে নিয়ে বেড়িয়ে এলাম ডাইনিং হলে । কিচেনের সামনে দাঁড়িয়ে শ্রীলেখা চিৎকার করে সন্ধ্যাকে বলছে –
- ফেলে দে মাছগুলো । আমি পারবো না রান্না করতে । একটা রবিবারও নিস্তার দেবে না আমাকে । যেখানে খুশি চোখ যায় আমি চলে যাবো আজ ।
বুঝলাম মল্লার আজকেও আবার কাউকে নিমন্ত্রণ করে এসেছে । ব্যাটা পারেও বটে, নিত্য রবিবার ওর হই চৈ না হলে চলে না । দুটো প্রায় দের কেজি সাইজের মাছ সঙ্গে করে নিয়ে এসেছে মল্লার, জগিং থেকে ফেরবার সময় । সন্ধ্যা বঁটি নিয়ে বসেছে তারই ব্যাবস্থা করতে । আমি হাঁক পারলাম শ্রীলেখাকে – 
- কি রে ! চিৎকার করছিস কেন ? হয়েছে টা কি শুনি ?
- কি আর হবে ! আমার মাথা আর মুন্ডি ! তোমার বন্ধু আজকে রাজীবদা আর তাঁর বউকে ঢাক পিটিয়ে ইলিশ খাবার জন্য ডেকে পাঠিয়েছে সন্ধ্যেবেলা । গত পাঁচ বছরে আমি তো রাজীবদাদের বাড়িতে যাইনি কোন দিন নিমন্ত্রণ খেতে, শুধু মাত্র ওর মেয়ের জন্মদিন আর ওদের বিয়ের দিন ছাড়া ! উনহঃ সরষে ইলিশ খাবে ! খাওয়াচ্ছি দাঁড়াও ! আমি পারবো না রান্না করতে । যেখানে খুশি চলে যাবো । ওরা কদিন ডাকে আমাদের শুনি ?      
আমারও মাথাটা গরম হয়ে গেলো মল্লারের উপর । রাজীবের সাথে কি যে মধু মাখানো আছে ওর কে জানে । শালা কিপটে মাল একটা । এক নম্বরের স্বার্থপর ব্যাটা রাজীব, নিজেরটা ছাড়া কিছুই বোঝেনা । যেমন কর্তা তেমনই গিন্নী, ওর বউটা আবার আরও এক কাঁঠি উপরে । শ্রী কে জিজ্ঞাসা করলাম –
- তা বাবুটি কোথায় ? এখানে তো দেখছি না – কোথায় লুকিয়ে আছে ? 
- জানি না – জাহান্নামে গেছে বোধহয় ! সরষে ইলিশ রান্নার আগেই শ্রীর গলা থেকে ঝাঁজ বেড়িয়ে এলো বেশ জোরে । 
জগাদাকে আরেক কাপ চা দিতে বলে হাঁটা লাগালাম এক তালার ড্রইংরুমের দিকে । এতো বড় বাড়ির কোথায় লুকিয়ে আছে ব্যাটা কে জানে – কাকু মানে মল্লারের বাবা ১৯৮৪ তে এই বাড়িটা করেছিলেন । বৈষ্ণবঘাটা অঞ্চল তখন সবে উপনগরী হতে শুরু করেছে । প্রায় তিনতলা, আধুনিক প্যাটার্নের এই বাড়ি, উপর নিচ মিলিয়ে গোটা দশেক ঘর, প্রসস্থ ছাদ, তিন তিনটে বিরাট বিরাট ব্যালকনি – সামনে বেশ খানিকটা বাগান – সব মিলিয়ে সাত কাঠা জায়গার উপর একটি বাংলো টাইপের বাড়ি । কাকু ছিলেন হাইকোর্টের নামকরা উকিল । গত হয়েছেন তিন বছর, তাও এখনও পর্যন্ত এক নামে পুলিশ থেকে ক্রিমিলান, এডভোকেট সুগত বাসুকে সবাই চেনে, আর সেই সুবাদে মল্লার আর আমাকেও । কাকুর বাবা মানে মহিন্দ্র দাদুরা ছিলেন এককালে ঢাকা বিক্রমপুরের নামকরা জমিদার বংশ । ১৯৪১ সে বাংলাদেশের পাট চুকিয়ে সস্ত্রীক ও  দুই পুত্র সহ চলে আসেন এই দেশে, সঙ্গে এনিমি প্রপার্টির বিশাল অঙ্কের টাকা । সোদপুরের অমরাবতীতে প্রায় তের বিঘা জমি, বাগান, পুকুর সহ কিনে সেখানেই তৈরি করেন মোটামুটি আর একটি জমিদারী । কাকুর জন্ম এই দেশেই । কাকুরা ছিলেন তিন ভাই আর তিনজনেই ছিলেন মারাত্মক রকমের ব্রিলিয়ান্ট । কাকু সবার ছোট । মল্লারের বড় জ্যেঠু সুদিপ্ত বাসু, ১৯৬৩ তে ইঙ্গিনিয়ারিং পাশ করে চলে যান জার্মানি । তারপর ওই দেশের নাগরিকত্ত নিয়ে একেবারে পাকাপাকি ভাবে জার্মানির বাসিন্দা । তাঁর একমাত্র মেয়ে সুতপাদি, ডাক্তার, ক্যানাডাতে সেটেল্ড । বড় জ্যেঠু মারা গেছেন প্রায় দশ বছর, জেঠিমা দিদির কাছে ক্যানাডাতে । মেজ জ্যেঠু সৌমিত্র বাসু, প্যারিস ফেরত নাম করা আর্টিস্ট । জীবনের বহু বছর কাটিয়ে এসেছেন বিদেশে । বিয়ে থা করেননি । বাউন্ডুলে টাইপের মানুষ – এখন আশির উপরে বয়স । অমরাবতীর বাড়িতেই থাকেন একা, সঙ্গে দুজন চাকর নিয়ে । একটা স্টুডিওও করেছেন ওখানে । ছবি বিক্রি করে, নিজেও টাকা পয়সা করেছেন বিস্তর । সুতরাং আপাতত এই বোস বাড়ির একমাত্র প্রদীপের শোলতে হো’ল মল্লার, অর্থাৎ এককথায় পৈতৃক সম্পত্তির এই সুবিশাল ছায়ার তলাতেই মল্লারের অধিষ্ঠান । চরিত্রের একটি অন্যতম দিক, বাউন্ডুলেপনা ও খামখেয়ালীটি সম্পূর্ণ ভাবে পেয়েছে মেজ জ্যাঠামশাইয়ের কাছ থেকে । অমরাবতীর বাড়িতে আমরা মাঝে মাঝেই সবাই মিলে কাটিয়ে আসি । ওটা অনেকটা ঠিক আমাদের কাছে অক্সিজেন নেবার মতন । অতখানি খোলা জায়গা মিলে বাগানবাড়ী, স্থাবর সম্পত্তির বর্তমান মুল্য থেকেও তার মানসিক মুল্য অনেক অনেক গুন বেশী । যদিও ছোট বড় অনেক রিয়েল এস্টেট কোম্পানিই ওঁত পেতে বসে আছে ওখানে একটি হাউজিং কমপ্লেক্স তৈরি করবার জন্য । বর্তমান উপনিবেশিক প্রশাসনিক চাপে, কতদিন জমিদারিটি ঠেকিয়ে রাখা যাবে সেটাই সংশয় । 
আমি মল্লারের সাথে মিশে আছি ছায়ার মতন । হিসেবে মল্লারের থেকে মাস সাতেকের বড় আমি । তিনকুলে মল্লার আর শ্রীলেখা ছাড়া কেউ নেই আমার । নাহঃ রক্তের কোন সম্পর্ক নেই আমাদের । বাবা মায়ের কথা মনে পড়ে ভীষণ আবছা আবছা । ১৯৮০ সাল, বছর পাঁচেক বয়স তখন আমার । বাবা মায়ের সাথে বেড়াতে গেছিলাম কাশ্মীর । কাকুর কাছে শুনেছি, গুল মার্গ যাবার পথে নাকি একটি বাস নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে খাঁদে পড়ে যায় । কাকু কাকিমা ও মল্লার, ওরাও একই সময় ফিরছিলেন গুল মার্গ থেকে অন্য একটি বাসে । যে বাসটি খাঁদে পড়ে যায়, তাঁর মোটামুটি প্রায় সব যাত্রীই মারা গেছিল । শ্রীনগর পুলিশের এক উদ্ধারকারি দল আমাকে অচেতন অবস্থায় পায় একটি গাছের ডালে আটকে থাকা অবস্থায় । সবটাই কাকু আর কাকিমার কাছে শোনা ঘটনা । তারপর, সেখান থেকে ব্যাক্তিগত ও প্রশাসনিক তৎপরতায়, কাকু আমাকে সঙ্গে করে নিয়ে আসেন কোলকাতায় । প্রায় মাস ছয়েক নাকি আমি তেমন করে কথা বলতে পারিনি । তারপর আস্তে আস্তে চিকিৎসা আর কাকিমা কাকুর অগাধ স্নেহ ও সেবায় আমি সুস্থ হয়ে উঠি । শুধু নিজের আর বাবা মায়ের নামটা বলতে পেরেছিলাম মাত্র । বাকি আর কিছুই মনে ছিল না । আজও মনে পড়েনা তেমন, শুধু আবছা ছায়ার মতন দুটো মুখ । তারপর থেকে কাকু কাকিমা আর মল্লারই আমার সব । কাকিমা গত হয়েছেন পাঁচ বছর, আর কাকু ২০১১ র সেপ্টেম্বরে ।

একতালার ড্রইংরুমে বাবু শ্রী মল্লার মনোযোগ দিয়ে খবরের কাগজ উলাটাচ্ছেন । ওকে এখানে দেখে আমার পিত্তিটা আরও জ্বলে গেলো । চুলের মুঠিটা ধরে একটা টান মেরে বললাম –
- ওই হতভাগা ! আজকে আবার রাজীবদের ডেকেছিস কেন ! 
- হুম্ - মুখ তুলে উত্তর দেয় মল্লার ।  
- হুম্ মানে ! শ্রী খোঁচে গেছে বেদম । তাছাড়া শালা রাজীবটা এক নম্বরের ধান্ধাবাজ । আমাদের ক দিন ডেকে খাইয়েছে ওদের বাড়িতে যে তুই ওদের ডেকে মোচ্ছব করছিস !
- উফঃ সৃজিত – শ্রীর সাথে মিশে মিশে তুইও শালা ঝগড়ুটে হয়ে গেছিস । তা বলেছি তো কি হয়েছেটা কি শুনি ? অন্যে অধম হইলে আমি উত্তম হইব না কেন বৎস !
- তোমার উত্তমগিরি দেখাচ্ছি দাঁড়াও । আমার রাজীবকে একদম সহ্য হয়না । শালা পয়লা নম্বরের ধারিবাজ ।
- আহঃ বড্ড জ্বালাস তুই । পুলিশের লোকেরা এরকম একটু আধটু হয়েই থাকে । ডেকেছি একটা কাজ আছে বলে । মালটাকে একটু দরকার আমার । 
- কাজ না হাতী ! রাজীবের সাথে বসে গণ্ডে পিণ্ডে মাল গিলবি । 
- আরে না রে বাবা । সত্যই কাজ আছে রাজীবকে দিয়ে । নে খবরটা পড় । বলেই খবরের কাগজটা এগিয়ে দেয় আমার হাতে ।

রাজেরহাটের একটি নির্মানরত বহুতলের সংলগ্ন জমিতে পাওয়া গেছে ওই প্রোজেক্টের মালিকের স্ত্রী, রেশ্মি আগ্রয়ালের মৃতদেহ । ঘটনাটি ঘটেছে গতকাল সন্ধ্যের কাছাকাছি সময় । একটি অত্যন্ত রহস্যজনক মৃত্যু । সাংবাদিকদের সরব প্রশ্ন । রেশ্মি দেবী ওই নির্মানরত বিল্ডিঙে কি করছিলেন ওই সময় ? যদিও প্রথমিক স্তরের পর্যবেক্ষণে এটাই ধরে নেওয়া হয়েছে যে প্রায় দশ তালার উপর থেকে পড়েই তাঁর মৃত্যু হয়েছে, তবু বিষয়টি জটিল থেকে জটিলতর – আত্মহত্যা না হত্যা ! সানলাইট প্রোজেক্টের কর্ণধার, শ্রী বিজয় কেতন আগ্রয়াল ব্যাবসায়িক কাজে দিল্লী ছিলেন সেই সময় । খবর পেয়েই তিনি চলে আসেন কোলকাতায় । ঘটনার রেশে তিনি মারাত্মক রকমের মর্মাহত । পুলিশ ও প্রশাশন বিষয়টি খুঁটিয়ে দেখছেন । বিধান নগর থানার ও সি, শ্রী রাজীব দত্ত, সাংবাদিকদের বলেন, এটি নিছক দুর্ঘটনা না এর পিছনে অন্য কিছু লুকিয়ে আছে সেটা এখনই বলা যাচ্ছে না । রাজনৈতিক মহলেও নানারকম মতভেদ শুরু হয়ে গেছে । বিজয় বাবু একজন প্রতিষ্ঠিত ও বলিষ্ঠ ব্যাবসায়ী । বর্তমান সরকারের পূর্ত দপ্তরের সাথে তাঁর অগাধ মেলামেশা । তাঁরই স্ত্রীর এইরকম একটি সন্দেহ জনক মৃত্যুর পিছনে ঠিক কি কি কারন থাকতে পারে তা এখনই অনুধাবন করা যাচ্ছে না । 

খবরটা পড়ে আর ইনসেটে ছবিটা দেখে আমি লাফ দিয়ে উঠলাম সোফা ছেড়ে । চিৎকার করে মল্লারকে বললাম –
- আরে সানলাইট প্রজেক্ট মানে তো ওই লোকটা !
- ওই লোকটা মানে ? কোন লোকটা ?
- আরে প্রতাপ । মানে বিজেস –
- কে প্রতাপ ! বিজেস ই বা কে ? কি বলছিস টা কি – ঠিক করে বল । 
- আরে কালকে যে লোকটার কথা তোকে বলছিলাম, রবীন্দ্র সদনে, আরে যার সাথে হ্যাজাচ্ছিলাম ।
- মানে ? 
- মানে যেই প্রতাপ সেই বিজেস । লোকটা নিজের নামটা ঠিক করে বলতে পারে না, মনে নেই ।
- মনে নেই মানে ? কি বসছিস কি মাথামুণ্ডু ! সকাল সকাল ভুঞ্জা টেনেছিস নাকি বে !
- আরে দাঁড়া দাঁড়া – আমি কালকে একটা লোকের সাথে অনেকক্ষণ গ্যেজিয়েছিলাম রবীন্দ্র সদনে - আরে তোকে বললাম না – অমিতাভ আসেনি তখনো –
- হ্যাঁ – বলেছিলসি তো –
- আরে ওই লোকটা সানলাইট প্রজেক্টে কাজ করে । নাইটে – গোডাউন পাহারা দেয় । এই প্রজেক্টেই – রাজেরহাটে ।
অদ্ভুত একটা মুখ করে চোখ থেকে চশমাটা খুলে টেবিলে রাখে মল্লার । একটা সিগারেট ধরিয়ে কি যেন ভাবতে থাকে ।
- খবরটা পড়ে শালা আমিতো ভোম্ মেরে গেলাম রে । ইস্ লোকটাকে কালকে হারিয়ে ফেললাম তখন – না হলে - ইস্ 
মল্লার হঠাৎ উঠে দাঁড়িয়ে বলে –
- সৃজিত, গাড়িটা বেড় কর এখুনি । রবীন্দ্র সদন যাবো – জলদি ।

কথাটা বলেই ঘরের দিকে চলে গেলো মল্লার । আমিও জাস্ট হতবম্ভ । এখন রবীন্দ্র সদন ! পাগলাটা আবার খেপেছে । দাঁত মাজিনি, ফ্রেশ হইনি – আর কিনা শালা এখন ছুটবে রবীন্দ্র সদন । বোঝো !!!! 
পেপারটা হাতে করে নিয়ে আমিও উঠে এলাম দোতালায় । শুনতে পেলাম মল্লার বাথরুম থেকে চিৎকার করে বলছে –
- শ্রী জলদি কিছু খেতে দাও আমাদের । আমারা রবীন্দ্র সদন যাবো – এখুনি ।
এমনিতেই শ্রীলেখার মাথাটা আজ ফুঁটকড়াই হয়ে ছিল । আমাদের রবীন্দ্র সদন যাওয়ার কথা শুনে একেবারে চিরবিড়িয়ে উঠলো -     
- এখন রবীন্দ্র সদন যাবে মানে !! আহ্লাদ না ! কি পেয়েছ টা কি আমাকে তোমরা শুনি ! আমি পারবোনা ওই ইলিশগুলো রান্না করতে । কিচ্ছু পারবো না । আমাকে রান্নাঘরে ভজিয়ে দিয়ে বাবুরা চললেন আড্ডা মারতে । কিচ্ছু খাবার টাবার দিতে পারবো না । বাইরে থেকে কিনে খাও গে যাও – 
উফঃ আর পারি না এদের নিয়ে । ভাগ্যিস শালা বিয়ে করিনি । আমার অবস্থাও যে এর থেকে কিছু ভালো হতো এমনটা না । একটা সিগারেট ধরিয়ে আমিও ছুটলাম নিজের ঘরে, বাথরুমের দিকে । জলদি তৈরি হয়ে নেই – বেড়তে হবে – মিশন রবীন্দ্র সদন । 

রবীন্দ্র সদন পৌঁছলাম প্রায় এগারটা নাগাদ । শম্ভুনাথ পণ্ডিত রোডের সংলগ্ন রাস্তাটাতে গাড়িটা পার্ক করে আমি আর মল্লার খুঁজতে লাগলাম লোকটাকে । এখন সকালের দিক, তাই লোকজনের ভীর তেমন একটা নেই । তথাপি রবিবার বলে বেশকিছু লোকের আনাগোনা । আমি আর মল্লার খুঁজে বেড়াতে লাগলাম লোকটাকে । বার তিনেক চক্কর কাটা হয়ে গেলো গোটা সদন চত্তরটা, নাহঃ কোথাও খুঁজে পালাম না । বিশুকেও দেখতে পেলাম কোথাও । আসলে এতো সকালে বিশু আসেনা বোধহয় । দু একজন অন্য চা বিক্রেতাকে জিজ্ঞাসা করলাম, তারাও সঠিক কিছু বলতে পারলো না । বেশ খানিকটা হতাশ হয়েই, দুই বন্ধুতে সিগারেট ধরিয়ে ধোঁয়া টানছিলাম । এমন সময় মল্লার বলল –
- হ্যাঁ রে সৃজিত, লোকটা এখানেই কোথায় যেন থাকে বলছিলিস না !
- হ্যাঁ, আমাকে তো তাই বলেছিল । ওই সাহিত্য একাডেমীর পিছন দিকে ।
সিগারেটের শেষটুকু মাটিতে ফেলে চপ্পল দিয়ে মাড়িয়ে মল্লার বলল – 
- চলতো, একটু ফেলুগিরি করে আসি ।

চলবে......