স্বপ্ন - রতন লাল বসু: দ্বিতীয় অধ্যায় | Shopno - A Bengali Novel by Dr. Ratan Lal Basu - Chapter 2 | WBRi Bangla Online Magazine

"Shopno" is a novel by Dr. Ratan Lal Basu published serially in the WBRi Bangla Magazine section in unicode Bangla font. Links to previous and following chapters are posted at the bottom of every episode.


স্বপ্ন

রতন লাল বসু

দ্বিতীয় অধ্যায়



পুজোর বন্ধের ঠিক পরে ঘটনাটা অত্যন্ত আকষ্মিক ভাবে ঘটে গেল। এতই আকষ্মিক যে প্রথমে সমর বিশ্বাস করতে চায়নি, ভেবেছে সবাই ওর সাথে ঠাট্টা করছে। কি করে বিশ্বাস করা যায় যে সুবলের মত ভালো ছেলেকে প্রিন্সিপ্যাল কলেজ থেকে এক্সপেল করেছেন। কিন্তু সকলের মুখে একই খবর শুনে সমর বুঝতে পারল ঘটনাটা সত্যি। সমরের মাথা ঝিম ঝিম করতে লাগল। কেউই সঠিক ভাবে বলতে পারলনা সুবলের এক্সপেল্ড হওয়ার আসল কারণ কি? সমর হন্যে হয়ে সুবলকে খুঁজে বেড়াল, কিন্তু কলেজের কোথাও সুবলের দেখা মিললনা। বেশ কয়েকদিন যাবত সুবল কলেজে আসছেনা, তাই সুবলের খবর কেউ বলতে পারলনা।
অনার্স ক্লাশের শেষে মেন বিল্ডিং এ পাশ ক্লাশ করার সময় রত্নার কাছ থেকে আসল ঘটনাটা জানা গেল। কলেজের বারান্দা দিয়ে কয়েকটা মেয়ের সাথে রত্নাকে হেঁটে যেতে দেখে সমর তাড়াতাড়ি ওর সামনে গিয়ে বলল, ‘রত্না, সুবলের ঘটনা সম্বন্ধে কিছু জান?’
রত্না বিষন্ন ভাবে বলল, ‘হ্যাঁ, বেচুর কাছ থেকে কিছু কিছু শুনেছি। চল সব বলছি’।
রত্না সঙ্গের মেয়েগুলোর কাছ থেকে বিদায় নিল। ওরা সমরের দিকে চোরা চাহনি মেলে নিজেদের মধ্যে নিচু স্বরে কি বলাবলি করে হেসে উঠল। ওদের ব্যাপারে কোনো মনোযোগ না দিয়ে সমর আর রত্না কলেজ স্ট্রীট পেরিয়ে কলেজ স্কোয়ারের একটা বেঞ্চে গিয়ে বসল। একটা মোটা গোলগাল চেহারার খাটো করে নোংরা ধূতি পরা মাঝবয়সী বিহারি ছোলাভিজানো, মোটরশূঁটিরদানা, কাঁচালংকা মিশিয়ে ‘মাল্টি-ভিটামিন’ বেচছে। এটা বিক্রেতার দেওয়া নাম। সমর প্রায়ই ওর কাছ থেকে ‘মাল্টি ভিটামিন’ কিনে খায়; সমরের প্রিয় খাদ্য। লোকটা সমরকে দেখতে পেয়েই হেসে বলে উঠল, ‘দেব নাকি?’ সমর বলল, ‘দুটো দাও’। লোকটা শাল পাতায় করে ‘মাল্টি ভিটামিন’ দিয়ে গেল। সমর আর রত্না চিবোতে চিবোতে আলাপ জুড়ল। রত্না ধীরে সুস্থে প্রথম থেকে সুবলের ব্যাপারটা বলতে শুরু করল।
আমেরিকান ইউনিভার্সিটি সেন্টারে সুবল কি একটা বিষয়ে তর্কাতর্কি করেছিল। ওরা এ-বিষয়ে কলেজের প্রিন্সিপ্যালের কাছে লিখিত অভিযোগ জানায়। প্রিন্সিপ্যাল নিজের চেম্বারে সুবলকে ডেকে নিয়ে সাবধান করে দিতেই সুবল বোকার মত প্রিন্সিপ্যালের মুখের উপর বলে ওঠে, ‘ওদের উপর আপনার এত দরদ কেন? আপনিকি সি.আই.এ.র দালাল?’ আর সেজন্যই প্রিন্সিপ্যাল সুবলকে এক্সপেল করেছেন।
সুবলের ঘটনাটা রত্নাকেও খুবই মর্মাহত করেছে। সবাই সুবলকে খুঁজছে, প্রিন্সিপ্যালের কাছে দুঃখ প্রকাশ করতে নিয়ে যাওয়ার জন্য। প্রিন্সিপ্যাল বেচুদের কাছে বলেছেন সুবল মৌখিক ভাবে ক্ষমা চেলেই তিনি ওকে কলেজে ফিরিয়ে নেবেন। অথচ সুবলেরই কোনো পাত্তা নেই।
সমর বলে, ‘চলোনা সুবলের বাড়ি গিয়ে খোঁজ করি’।
রত্না আগ্রহের সঙ্গে বলে ওঠে, ‘তুমি সুবলের বাড়ি চেন?’
সমর বলে, ‘অনেকবার গেছি’।
‘তাহলে চল খোঁজ নিয়ে আসি’।
হ্যারিসন রোড ধরে সুবলের বাড়ির দিকে যেতে যেতে দুজনেই সুবলের নানান গুন নিয়ে আলোচনা করতে থাকে। দুজনেই একমত হয় যে সুবল পরীক্ষা দিতে পারলে ফার্স্ট ক্লাশ পাবেই। সুবলের মত বুদ্ধিমান ছেলে এই বোকামিটা করল কেন ওরা বুঝে পারেনা। সুবলের মা বাড়িতে ছিলেন। ওরা কথা বলে বুঝতে পারল সুবল দুতিন দিন হল কোন এক বন্ধুর বিয়ে উপলক্ষে হুগলি গেছে। কবে ফিরবে বলে যায়নি। উনি বললেন, ‘ছেলেটা যে কেন এমন বাউন্ডুলে হয়ে গেল বুঝতে পারিনা’। ওঁর কথা থেকে বোঝা গেল যে উনি কলেজের ব্যাপার কিছুই জানেননা। ওরাও এবিষয়ে কিছু উল্লেখ করলনা।
ওরা বিষন্ন মনে সুবলের বাড়ি থেকে বেরিয়ে এল। মির্জাপুর স্ট্রীটে এসে রত্না বলল, ‘আমার বেশ খিদে পেয়েছে’।
সমর বলল, ‘আমারও’
‘তাহলে চল কোন রেস্তোরাঁতে ঢুকে পডি’।
সমর হেসে বলে, ‘আমার কিন্তু পকেট একদম গড়ের মাঠ’।
‘সে ব্যাপারে মাথা ঘামাতে হবেনা মশায়’।
রেস্তোরাঁয় বসে রত্নার সম্বন্ধে অনেক কথা জানতে পারে সমর। রত্না আগে এসব কথা কিছুই বলেনি। সমর প্রশ্ন করলেই এড়িয়ে গেছে। সমর আজই প্রথম জানতে পারল যে নিমতলা ঘাটের কাছেই রত্নার বাবার কাঠের গোলা আছে আর ওখানে গঙ্গার ধারেই রত্নাদের বাড়ি। রত্না বলল পরে একদিন সমরকে ওদের বাড়ি নিয়ে যাবে।
রাতে সমরের ঘুম আসতে চায়না। কেবল সুবলের হাসি মাখা মুখটা চোখের সামনে ভেসে ওঠে। কত ছোট খাটো ঘটনা মনে পড়ে যায়। সুবলের সাথে কলকাতার কত জায়গা ঘুরে বেড়িয়েছে। কত সিনেমা হল্, রেস্তোঁরায় গিয়েছে; কত নতুন মানুষের সাথে পরিচয় হয়েছে সুবলের মাধ্যমে। সুবলের সান্নিধ্য না পেলে গ্রামের ছেলে সমর এসব পরিবেশের সংস্পর্শে আসার কথা ভাবতেই পারতনা। সেই সুবলকে কলেজ থেকে তাড়িয়ে দিল! সমর ভাবে সুবল নিশ্চয়ই বিয়ে বাড়ি থেকে ফিরে সমরের সাথে যোগাযোগ করবে।
বেচুকে সমর এড়িয়েই চলত। বেচু সবসময় রাজনীতি নিয়ে মেতে থাকে। ওর যেন রাজনীতি ছাড়া জীবনে আর কোনো চিন্তা বা কাজের বিষয় নেই। কলেজে ক্লাশও বিশেষ করেনা। বেচুকে দেখলেই সমরের ভয় করে, এই বুঝি ধরে ওদের দলে ঢুকিয়ে দেয়। বেচুর বাডির অবস্থা বেশ ভাল। পড়াশুনাতেও ভাল ছিল। ইচ্ছা করলে ভাল রেজাল্ট করে জীবনে অনেক উন্নতি করতে পারত। কিন্তু ওর মাথায় এক চিন্তা, গরীব মানুষদের ভাল করতে হবে, শোষণ মুক্ত করতে হবে। ওকে এ বিষয়ে প্রশ্ন করলেই বলে, ‘আমি নিজে হয়ত খুব শিক্ষিত হলাম, বিরাট চাকরি পেলাম। কিন্তু তাতে দেশের কি যায় আসে, সমাজের তাতে কি মঙ্গল হবে? কটা গরীব মানুষের পেটে ভাত জুটবে তাতে?’ বেচুর মতে এই সমাজ ব্যবস্থা অন্যায়-অবিচারে ভরা, সরকার ও রাষ্ট্র ব্যবস্থা বড়লোকদের স্বার্থই দেখে। বড়লোকের দ্বারা গরীবের শোষণ, জোতদার-জমিদারদের দ্বারা কৃষকের শোষণ, শিল্পপতিদের দ্বারা শ্রমিকের শোষণকে কায়েম করাই এই রাষ্ট্র ব্যবস্থার মূল লক্ষ্য। বেচুর জীবনের লক্ষ্য এই সমাজ ব্যবস্থা, রাষ্ট্র ব্যবস্থাকে ভেঙ্গে ফেলে শ্রমিক-কৃষক দের রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা, যেমন রাশিয়া ও চীনে হয়েছে। সেই নতুন রাষ্ট্র ব্যবস্থায় সাধারণ মানুষ পাবে ন্যায় বিচার। কয়েকজন মাত্র ধনী ব্যক্তি কোটি কোটি মানুষের রক্ত শুষে ফুলে ফেঁপে উঠতে পারবেনা। ভিয়েতনামের মানুষরা যেমন সত্যিকারে স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধ করছে, বেচুরাও তেমন ন্যায় যুদ্ধ শুরু করতে চায়।
সমর বেচুকে শ্রদ্ধা করে। সমর আজকাল অনেক কিছু বুঝতে পারে। তা ছাড়া কলেজেইতো সাধারণ ছেলেমেয়েদের সাথে পি.সি.এস.ও. মার্কা ছেলেমেয়েদের এক বিরাট সামাজিক ব্যবধান সমর চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছে।
তবু সমর নিজেকে সরাসরি রাজনীতির সাথে জড়িয়ে ফেলে নিজের ভবিষ্যত নষ্ট করতে চায়না। সুবল মাঝে মাঝেই বলত, ‘সবাইতো আর আত্মত্যাগ করতে পারেনা। বরং আবেগের বশে জোর করে আত্মত্যাগ করতে গেলে ফলটা শেষে উল্টো হয়। তখন আত্মত্যাগও হয়না আবার ক্যারিয়ার নষ্ট হওয়ায় হতাশা দেখা দেয়। তাই ভালো করে ভেবে, নিজেকে সম্পূর্ণ যাচাই করে নিয়ে তবে এ পথে পা বাড়াবি। আর সবাইকে আত্মত্যাগ করতে হবে তারতো কোনো প্রয়োজন নেই। অন্য মানুষের ক্ষতি না করে যদি জীবন যাপন করিস, যদি সমাজের প্রগতিশীল আন্দোলনকে নৈতিক সমর্থন জানাস, তা হলেওতো মানুষ হিসাবে অনেকটা দায়িত্ব পালন করা হয়।’
একদিন ট্রামের ভাড়া বৃদ্ধির বিরুদ্ধে আন্দোলনের সাথে সমর জড়িয়ে পড়েছিল। পুলিশ কাঁদুনে গ্যাস ছুঁড়ছিল। কি বিকট গন্ধ! চোখ জ্বালা করে চোখে জল এসে যায়। সমর সেদিন আন্দোলনকারীদের সাথে মিলে হেয়ার স্কুলের মাঠ থেকে পুলিশকে লক্ষ্য করে পাথর ছুঁড়েছে, আফাটা কাঁদুনে গ্যাসের সেল তুলে নিয়ে আবার পুলিশের দিকে ছুঁড়ে দিয়েছে।
সেই শেষ। তারপর থেকে সমর ঠিক করেছে বেচুদের নৈতিক সমর্থন করলেও কখনো আর রাজনৈতিক আন্দোলনে সরাসরি জড়িয়ে পড়বেনা। তাই এরপর থেকে বেচুকে এড়িয়েই চলত।
আজ সমর ভাবল সুবলের ব্যাপারটা নিয়ে বেচুর সাথে কথা বলবে। সুবলের মত বন্ধুর জন্য অন্তত এটুকু যদি না করে তাহলে নিজের বিবেকের কাছে কি জবাবদিহি করবে। কমনরুমে একদঙ্গল ছেলের সাথে বেচু কথা বলছিল। মাথার চুল উস্কো-খুস্কো, সারা শরীরে একটা রুক্ষতা। হাড্ডিসার শরীরের মাঝে উজ্জ্বল চোখদুটো যেন আলোর ঝিলিক ছড়াচ্ছে। সমর দুরুদুরু বক্ষে বেচুর সামনে গিয়ে দাঁড়াল। বেচু অনর্গল কথা বলে চলেছে। কথার স্রোত যেন শেষ হতে চায়না। কিছুক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে থেকে সমর ভাবল এর মধ্যে বেচুর সাথে কথা বলবে কি করে। তার চেয়ে এখন চলে যাওয়া ভাল। পরে না হয় ওকে ফাঁকা পেলে কথা বলা যাবে। হঠাৎ সমরের দিকে চোখ পড়তেই বেচু বলে উঠল, ‘সমর তুই কি কিছু বলবি?’ সমর বলল, ‘হ্যাঁ আপনার সাথে একটা দরকার ছিল’। সমরকে পাশের ছেলেগুলোর দিকে বোকা বোকা চোখে তাকাতে দেখে বেচু হেসে বলল, ‘সবার সামনে বলতে কিছু অসুবিধা আছে?’ সমর সপ্রতিভ ভাবে বলল, ‘না তেমন কিছু না, তবে একা বলতে পারলে ভালো হয়।‘ ‘তাহলে এদিকে আয়’ বলে বেচু সমরকে ঘরের কোণের দিকে ডেকে নিল। সমর নিচু স্বরে বলল, ‘আচ্ছা সুবলের কি হবে? সুবলকি আর কলেজে ফিরে আসতে পারবেনা?’
বেচু গম্ভীর গলায় বলল, ‘ব্যাপারটা খুবই দুঃখের। আমরা না লড়ে ছাড়বনা। দরকার হলে কলেজ বন্ধ করে দেব। তবে সুবলটাও ছেলে বটে। একদিনও আমাদের সাথে যোগাযোগ করলনা। কয়েকদিন কলেজেই আসছেনা।‘
সমর বলল, ‘আমি সুবলের বাড়ি গিয়েছিলাম। ও কলকাতার বাইরে এক নিকট আত্মীয়ের বিয়ে বাড়িতে গেছে। ওখান থেকে ফিরে হয়ত কলেজে এসে সবার সাথে যোগাযোগ করবে’।
‘ঠিক আছে সুবল কলেজে এলেই ওর সাথে কথা বলে আমরা সব প্রোগ্রাম ঠিক করে ফেলব। তোর কোনো চিন্তা নেই আমরা ওর জন্য সব কিছু করব। তবে ওর সাথে দেখা হলে বলিস, যেন যত তাড়াতাড়ি সম্ভব আমার সাথে যোগাযোগ করে’।
বেচুর কথায় সমর অনেকটা আস্বস্ত হল। কিন্তু কয়েকদিন বাদে বেচু সমরকে ডেকে বলল সুবলের নিজেরই নাকি কলেজে ফিরে আসার আর কোন ইচ্ছা নেই। অন্য কোনো কলেজে ভর্তি হয়েছে। তাই সুবলকে নিয়ে আন্দোলনের আর কোন প্রশ্নই ওঠেনা। এসব কথা শুনে সমরের সুবলের উপর ভীষণ অভিমান হল। একদিনতো সমরের সাথে অন্তত দেখা করতে পারত। কি দরকার ওরকম ছেলের জন্য দুঃখ করে। তবুও সমর রোজ ভাবে আজই বুঝি কলেজে গিয়ে সুবলের হাসিমাখা মুখ দেখতে পাবে। সমর নিশ্চিত যে অন্য কলেজ থেকেও সুবল ফার্স্ট ক্লাশ পাবে।
একদিন রত্না বলল, ‘সমর চলনা সুবলের বাড়ি যাই। এতদিনেও ছেলেটার কোনো খোঁজ মিললনা’।
সমর বিরক্তিমাখা স্বরে বলল, ‘তোমার ইচ্ছা হয় একা যাও। আমি যেতে পারবনা। অন্য কলেজে ভর্তি হয়েছে অথচ আমাকে জানানোর কোনো প্রয়োজনই বোধ করলনা’।
রত্না হেসে বলল, ‘শুধু শুধু মাথা গরম করছ কেন? এমনওতো হতে পারে যে সুবল অসুস্থ হয়ে পড়েছে তাই কারো সাথে যোগাযোগ করতে পারছেনা’।
‘একটা চিঠিতো দিতে পারত’।
‘আচ্ছা সেসব বিষয় ফয়সালা করা যাবে পরে। চলতো আগে ওর সাথে দেখা করি। তারপর না হয় প্রাণ খুলে ঝগড়া কোরো’।
সমর হেসে বলল, ‘চল আজই যাওয়া যাক’।
মীর্জাপুরের মোড়ে মিহিরের সাথে দেখা। সমরকে দেখে বলে উঠল, ‘আরে সমর বাবু যে? কোথায় চললেন?’
‘এদিকে আর কোথায় যাব? সুবলের বাড়ি’।
‘সুবলতো এখানে নেই’।
সমর উৎকন্ঠিত স্বরে বলল, ‘কোথায় গেছে?’
‘কেন আপনি জানেননা, সুবলতো অনেকদিন হল পাটনায় মাসীর বাড়ি চলে গেছে’।
‘কবে ফিরবে কিছু বলে গেছে কি?’
‘আমার সাথে যাওয়ার আগে একদিন দেখা হয়েছিল। বলল পড়াশুনা আর করবেনা। পাটনায় ব্যবসা করবে। ওর কথা শুনে যা মনে হল, ওর আপাততঃ কলকাতায় ফেরার কোন ইচ্ছা নেই। একদম পাগলা ছেলে। আজ চলি, একটা জরুরি কাজ আছে’।
সমরকে বিমর্ষ দেখে রত্না বলল, ‘দেখ, সুবলের কথা ভেবে মন খারাপ করে আমাদের কি লাভ। আজ বরং চল আমাদের বাড়ি যাবে’।
‘ঠিক আছে চল। কিন্তু মনটা বড় খারাপ হয়ে গেল। সুবলের মত ভাল ছেলে একদম পড়াশুনা ছেড়ে দিল!’
‘আপাততঃ অভিমান বশতঃ হয়ত ওরকম সিদ্ধান্ত নিয়েছে।পরে হয়ত আবার মত বদলাবে। আর বেচুদের সম্বন্ধে কয়েকটা কথা তোমার জানা দরকার। বেচু তোমাকে সব সত্যি বলেনি। সুবল বেচুর সাথে যোগাযোগ করেছিল। বেচু ওকে স্পস্ট বলে দিয়েছে যেহেতু সুবল ওদের পার্টির সদস্য নয় তাই ওর জন্য বেচুরা বিশেষ কিছু করতে পারবেনা। ওদের পার্টির নেতারা এতে অনুমোদন দেবেনা আর পার্টির ওপর মহলের অনুমতি ছাড়া কোন ছাত্র আন্দোলন সম্ভব নয়। আসলে ওদের কাছে মানুষের আর মানবিক সম্পর্কের চেয়ে পার্টি আগে’।
সমরের মুখে কোনো কথা সরেনা। অদ্ভুত ব্যাপারতো। মুখে মানুষের মঙ্গলের কথা বলে অথচ ওদের মূল লক্ষ্য পার্টির উন্নতি, পার্টির ক্ষমতা বৃদ্ধি। রত্নাকে প্রশ্ন করে করে সমর বেচুদের দল সম্পর্কে আরো অনেক তথ্য জানতে পারে।
রত্নার বাবার বিরাট চেহারা। মধ্যদেশে মেদের আধিক্য। ফর্সা রঙ। ইঁয়া মোটা গোঁফ। খুব আলাপি লোক। সমরের বাড়ি জলপাইগুড়ি শুনে বললেন, ‘আমাকে প্রায়ই ওদিকে যেতে হয়। সুকনা আর আমবাড়ি ফালাকাটার সালকাঠ খুব ভালো। গয়েরকাটা, ভাটুইপুর এসব জায়গা থেকেও আমার কাঠ আসে’। রত্নার মা খুবই সাধাসিধে মানুষ। সমরকে রুটি তরকারি খেতে দিলেন। বেশি খাওয়ার জন্য সাধাসাধি করতে থাকলেন। সমরকে প্রশ্ন করলেন, ‘মা-বাবাকে ছেড়ে এতদূরে থাকতে তোমার কষ্ট হয়না?’
রত্নার পড়ার ঘরের জানলা দিয়ে বেলাশেষের গঙ্গা অপরূপ লাগছিল। ছোট ছোট নৌকায় পুতুল পুতুল মানুষেরা দাঁড় টেনে চলেছে। কি সুন্দর ফুরফুরে হাওয়া। রত্না বলে, ‘সারাদিন এরকম হাওয়া থাকে। খুব ঘুম পায় এই হাওয়ায়। তোমার এ জায়গাটা কেমন লাগছে?’
সমর হেসে বলে, ‘দারুণ। কবিতা লিখে ফেলতে ইচ্ছা করছে। ওঃ এরকম একটা ঘরে যদি থাকতে পারতাম!’
‘তাহলে সারাদিন বসে বসে পড়াশুনা বাদ দিয়ে শুধু কবিতাই লিখতে, তাইতো?’
রত্নার কথায় সমর হেসে ওঠে।
ওরা দুজনে গঙ্গার ধার দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে উত্তর দিকে এগিয়ে চলে। গণৎকারেরা টিয়ে পাখী নিয়ে রাস্তার ধারেই ভাগ্য গণনায় বসে গেছে। কোথাওবা গাঁজার আসর বসেছে। হরিবোল রব তুলে কয়েকটা শববাহক ওদের পাশ কাটিয়ে নিমতলা ঘাটের দিকে চলে গেল। সমর বলে, ‘সারাদিন এই হরিবোল ধ্বনি শুনতে তোমার ভালো লাগে?’
রত্না মৃদু হেসে বলে ‘সবসময় শুনতে শুনতে আমাদের গা সওয়া হয়ে গেছে। এমনি বেশ মজাই লাগে। সারারাত ধরে এখানে কর্মব্যস্ততা। মড়া পোড়াতে কত রকমের মানুষ আসে। সকালে-দুপুরে-সন্ধ্যায় গঙ্গার ঘাটে নানা ধরনের স্নানার্থীর ভিড়। কত বিচিত্র ধরনের সাধু দেখা যায় এখানে। আবার বিহারীরা ‘ঝম ঝম’ বাজনা বাজিয়ে সারারাত ধরে গান করে কখনো। এখানে এক অদ্ভুত জীবনের প্রবাহ। এখানে এলে আমাদের সমাজের একটা বিশেষ দিককে উপলব্ধি করতে পারবে। মাঝে মাঝে এখানে আস, তাহলে তখন সব বুঝতে পারবে’।
সমর বলে, ‘আমিতো এখনই এক নতুন জীবনের স্বাদ অনুভব করতে পারছি। খুব ভালো লাগছে’।
রত্না প্রসঙ্গ ঘুরিয়ে বলে, ‘পাঁপড় পোড়া খাবে?’
‘কোথায়?’
রত্না আঙ্গুল দেখিয়ে বলে, ‘ওইযে রাস্তার ধারে উনুন নিয়ে বসেছে’।
সমর সোৎসাহে বলে ওঠে, ‘ঝাল পাঁপড় না, দারুন লাগে। চলো চলো’।
ওরা দুজন ঝাল পাঁপড় খেতে খেতে নিমতলা ঘাটের দিকে ফিরে আসে। রত্না রহস্য করে বলে, ‘শ্মশানের ভেতরে যাবে?’
সমর এক কথায় রাজি হয়ে যায়। মড়া পোড়ানো বিটকেল গন্ধ অগ্রাহ্য করে ওরা চিতার কাছে একটা সরু বেঞ্চে বসে। ওদের পাশেই দুটো ছেলে-মেয়ে মাথা নিচু করে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে। হয়তো ওদের মা-বাবা বা অন্য কোনো নিকট আত্মীয় মারা গেছে। হঠাৎ কোথা থেকে এক বিষন্নতার হাওয়া সমরের মনকে ভারাক্রান্ত করে তোলে। রত্নাও কেমন গম্ভীর হয়ে যায়। ওরা বেশ কিছুক্ষণ নিশ্চুপ বসে থাকে।
এক অদ্ভুত অনুভূতি সমরকে দৈনন্দিন জীবনের ঊর্ধ্বে কোন এক অপরিচিত জগতে নিয়ে যায়। কেমন একটা রহস্য, জীবন সম্বন্ধে গভীর এক উপলব্ধি, সমর যেন বুঝেও ঠিক বুঝে উঠতে পারেনা। বিচিত্র অনুভূতিটা সমরের সচেতনতার কিনার ঘেঁষে ঘেঁষে চলে যায়, ধরা দিতে দিতেও ধরা দিতে চায়না। সমর বুকের মধ্যে কেমন একটা কষ্ট অনুভব করে। রত্নাকে বলে, ‘চলো বাইরে যাই’


সমর কলেজ স্কোয়ারে বেঞ্চে একা বসে বাদাম ভাজা চিবোচ্ছিল। ফেব্রুয়ারি শেষ হতে চলল, শীত একদম বিদায় নিয়েছে। দুপুরের খটখটে রোদে একটু গরমও পড়েছে। অবশ্য সন্ধ্যার দিকে শুন্দর দক্ষিণে হাওয়া দেয়। তখন মনটা এক বিচিত্র অনুভূতিতে ভরে ওঠে। সমরের নিজেকে কেমন নিঃসঙ্গ মনে হয়। কোনো মেয়ের ভালোবাসা পেতে মনটা উৎসুক হয়ে ওঠে।
রত্নার সাথে বেশ কয়েকদিন ঘুরে বেড়িয়েছে। অনেক গল্প করেছে নিভৃতে। সরস্বতি পূজোর দিন দুজনে সারা কলকাতা চষে বেড়িয়েছে। ঠাকুর বিসর্জনের দিন নিমতলা ঘাটে সে কি ভিড়! নিমতলা ঘাটে জীবনের এক বিচিত্র দিক দেখেছে সমর। কি বিচিত্র সহর এই কলকাতা! কত বিস্ময় এর আনাচে কানাচে। প্রতি মুহূর্তে অভিনবের সাক্ষাত ঘটে এই বিচিত্র সহরে। কলকাতার প্রতিটা মুহূর্ত যেন বিস্ময়ের চমক নিয়ে অপেক্ষা করে আছে। কলকাতা তাই চির নবীন, অফুরন্ত এর প্রাণশক্তি। গ্রামের ছেলে সমরের জীবনে কত পরিবর্তন এনেছে কলকাতা, কত নতুন অভিজ্ঞতা সমরের চেতনাকে, কল্পনাশক্তিকে সমৃদ্ধ করে চলেছে। আর প্রেসিডেন্সি কলেজতো সম্পূর্ণ এক নতুন জগত, গোটা দেশের শিক্ষা-সংস্কৃতির ধারক ও বাহক। এখানে ক্লাশের পড়া হয়ত পরীক্ষার কাজে তেমন লাগেনা। অনেক অধ্যাপকই এতটা উচ্চ মানে পড়ান যে ছাত্ররা সবসময় ঠিক বুঝে উঠতে পারেনা। কিন্তু ক্লাশের বাইরে অসংখ্য ভালো ছেলেমেয়ে, বহুমুখি বিষয়ে আলোচনা, একজনের মনকে সবদিক দিয়ে সমৃদ্ধ করে তোলে। পরীক্ষায় খুব ভালো ফল না করলেও প্রেসিডেন্সিতে পড়া একটা ছেলের মানসভূমি সামগ্রিকভাবে এতটাই সমৃদ্ধ হয়ে ওঠে যা হয়ত অন্যকোন কলেজে পড়ে পরীক্ষায় খুব ভালো ফল করলেও সম্ভব হতনা। মেন বিল্ডিং এর বিকল ঘড়িটার দিকে তাকিয়ে সমর একদিন ভাবছিল সময়ের প্রবাহের মাঝে ঘড়ির কাঁটাটা কেমন থেমে আছে। ঠিক তেমনি শতাব্দীর পর শতাব্দী কেটে যাবে, কিন্তু প্রেসিডেন্সির পরিমণ্ডল দেশের শিক্ষা-সংস্কৃতির মধ্যমণি হয়ে একই ভাবে অনন্যরূপে বিরাজ করতে থাকবে। এখানকার পরিবেশের উর্ব্বরভূমি সমরের মনকে যে কতটা সমৃদ্ধ করেছে তার হিসাব মেলা ভার।
দুপুরের ঝলমলে রোদে পান্থপাদপ গাছ, বিচিত্র আকৃতির পাম গাছ, বাদাম-ওয়ালা, ফুচকা-ওয়াল্মাল্টি-ভিটামিন-ওয়ালাকে ঘিরে ভিড়, এদিক ওদিক চলমান দু চারটে মানুষ, পিছনে কলেজ স্ট্রীটে ট্রাম-বাসের অবিরাম ঘড়ঘড়ানি, টুকরো টুকরো কথার প্রবাহ। সমর বাদাম ভাজা চিবোতে চিবোতে এক স্বপ্নের জগতে ভেসে বেড়ায়। রত্নার কথা মনে পড়ে যায়। রত্না দিল্লীতে বেড়াতে গেছে বাবা-মার সাথে। অনেকদিন তাই দেখা নেই।
‘নাঃ, এখন আর অন্য কিছু নিয়ে ভাবলে চলবেনা। সামনে পার্ট-ওয়ান পরীক্ষা। যে করেই হোক অনার্স্এ ভালো ফল করতেই হবে’। সমর মনে মনে সিদ্ধান্ত নেয়। সে গ্রামের ছেলে। এ সীমাহীন কলকাতা সহরে তাকে সাহায্য করবার মত কেইবা আছে। এখানকার ভালো ভালো ছেলেমেয়েদের পাশে গ্রামের ছেলে সমরের অস্তিস্ত অকিঞ্চিতকর। পরীক্ষায় ভালো ফল করতে পারলে তবু নিজের স্বকীয় পরিচয় দেওয়ার মত একটা কিছু থাকবে।
কতগুলো মেয়ে ফুচকা-ওয়ালার চারদিকে ভিড় জমিয়েছে। ঝকমকে শাড়ি, বিচিত্র রঙের বাহার। সমরের আবার রত্নার কথা মনে পড়ে যায়। গ্রাম্য ছেলে সমরকে রত্না কি ভালোবাসে, দিল্লীতে বসে রত্নাওকি সমরের কথা ভাবছে? হঠাৎ এক বিচিত্র পুলকে সমরের মনটা ভরে ওঠে।
কলেজে ভর্তি হওয়ার পর প্রথম যে খাতাটায় লিখত সেটা এখনো আছে। স্মৃতিচিহ্ন হিসাবে সমর এটা চিরদিন রেখে দেবে। এই খাতাটা এমন এক সময়ের সাক্ষ্য বহন করছে যখন সমর বস্তুতঃ কলকাতা আর প্রেসিডেন্সি কলেজের সীমাহীন জগতে প্রবেশোন্মুখ, দাঁড়িয়েছিল অতল সমুদ্রে ডুব দেওয়ার আগে ডুবুরি যেমন কিছুকাল স্তব্ধ হয়ে থাকে ঠিক তেমনি ভাবে। এখন ডুবুরি সমর সেই সমুদ্রের অতলতা থেকে অমূল্য মণিরত্ন আহরণ করে চলেছে।
প্রথম দিন ক্লাশের শেষে এই বেঞ্চে বসে সমর সে খাতার পাতায় বিচিত্র ছক কেটেছিল। পৃথিবী সম্বন্ধে এক দার্শনিক মতবাদের খসড়া করেছিল। ভেবেছিল তার সৃস্টি দেখে, চিন্তার গভীরতা দেখে সবাই অবাক হয়ে যাবে, সমরের মননশীলতার তারিফ করবে। গ্রামের অপরিচিত ছেলে সমর সকলের মাঝে নিজের স্থান করে নেবে। তারপর নিজের কাছেই এসব উদ্ভট চিন্তাকে হাস্যকর ছেলেমানুসি মনে হয়েছে।
‘মাই গড্, মুখে হাত দিয়ে অমন কি গভীর চিন্তায় মগ্ন হয়ে আছেন?’
সমরের চিন্তাসূত্র ছিন্ন হয়ে যায়। তাকিয়ে দেখে ফার্স্ট ইয়ারের শিলা। কথা বলতে বলতেই শিলা সমরের গা ঘেঁষে দুম করে বেঞ্চের উপর বসে পড়ে। সুবলের মাধ্যমেই এই স্মার্ট মেয়েটার সাথে মৌখিক আলাপ হয়েছিল। বড়লোকের মেয়ে। একটা সুন্দর স্ট্যান্ডার্ড-হেরাল্ড গাড়ি নিয়ে যত্র-তত্র ঘুরে বেড়ায়। মেয়েটা খুবই হাসিখুশি। জমিয়ে আড্ডা দিতে আর অনর্গল কথা বলতে ভালো বাসে। সুবল বলেছিল মেয়েটা ছিঁটিয়াল।
শিলা হঠাৎ প্রশ্ন করে, ‘রত্নাদিকে বেশ কয়েকদিন দেখিনা, জানেনকি কোথায় গেছে?’
‘বাবা-মার সাথে দিল্লী বেড়াতে গেছে’।
‘যাক ভালোই হল’।
সমর অবাক হয়ে বলে, ‘কেন বলত?’
‘রত্নাদি থাকলে এরকম ভাবে আপনার সাথে গল্প করতে সাহস পেতামনা’।
‘অদ্ভূত কথাত! তুমি আমার সাথে কথা বললে রত্নার রাগ করার কি আছে?’
শিলা হাসতে হাসতে বলে, ‘আপনিত বেশ ন্যাকামি করতে পারেন। আমার সাথে এভাবে দেখলে রত্নাদি কেন রাগ করবে সেটা আপনাকে আমার বুঝিয়ে বলতে হবে?’
শিলার কথায় সমর রেগে ওঠে, বলে, ‘আজে বাজে কথা বলা যদি বন্ধ করতে পার তাহলে এখানে বোস, না হলে উঠে যাও’।
শিলা ঘাবড়ে গিয়ে বলে, ‘রাগ করবেননা সমরদা, আমি আর এসব কথা বলবনা। আসলে আমার বাজে বকা স্বভাব, সবাই সেটা জানে। আমার ভুল হয়ে গেছে। আমি এখানে থাকবত?’
সমর নরম হয়ে বলে, ‘আচ্ছা বোস। আসলে আমারই এরকম হঠাৎ রেগে ওঠা উচিত হয়নি’।
ওরা বেশ কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে থাকে। পরিমণ্ডল স্বাভাবিক হয়ে আসতেই শিলা বলে, ‘আপনাকে আমার অন্য ছেলেদের থেকে আলাদা মনে হয়, যেমন সুবলদাকে মনে হত’।
সমর হেসে বলে, ‘আমি আলাদাত বটেই, গ্রামের ছেলে, আনস্মার্ট, আদব-কায়দা ভালো জানিনা’।
সমরকে থামিয়ে দিয়ে শিলা বলে, ‘আরে দুর্, আমি সেকথা বলছিনা। আপনার মধ্যে একটা বিশেষ কিছু আছে, একটা ক্রিয়েটিভ সত্ত্বা বলতে পারেন। আপনার সাথে দুএকদিন কথা বলে আমি সেটা বুঝতে পেরেছি’।
সমর হেসে বলে, ‘বাঃ বেশত গ্যাস দিতে শিখেছ। আমি কিন্তু বুদ্ধু নই!’
শিলা গম্ভীর হয়ে বলে, ‘বিশ্বাস করুন আমি একটুও বানিয়ে বলছিনা’।
সমর প্রসঙ্গ এড়াতে বলে, চল একটু ভাঁড়ে চা খাওয়া যাক। গেটের কাছেই চা-ওয়ালার কাছে চা খেতে খেতে শিলা বলে, ‘আপনার হাতে সময় আছে?’
সমর বলে, ‘অনেকটাই সময় আছে। আজ লাইব্রেরি যেতেও ইচ্ছা করছেনা। সন্ধ্যার আগে বাসায় ফেরারও কোনো মানে হয়না’।
শিলা উচ্ছ্বসিত হয়ে বলে, ‘তাহলে চলুননা ভিক্টোরিয়া থেকে ঘুরে আসি। ফেরার সময় আমি গাড়ি করে আপনাকে পৌঁছে দেব’।
সমর হেসে বলে, ‘খুবই ভালো প্রস্তাব’।
বিকেলের ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল। কোকাকোলা, ফুচকা, ভাঁড়ের চা, আলুকাবলি-ওয়ালাকে ঘিরে উচ্ছল ভিড়; বাঁশি-ওয়ালা, বেলুন-ওয়ালাকে ঘিরে মিষ্টি শিশুদের কলরব। সামনে গড়ের মাঠের বিস্তার, কলাবতী ফুলের ঝাড়ে রঙের বৈচিত্র্য। জলের ধারে বেঞ্চে সমরের পাশে আর একটা স্বপ্নের মেয়ে। রত্নার চেয়েও আরো অপরূপ, আরো রহস্যে ভরা। শিলার চোখের গভীরতায় সমরের অতীত, বর্তমান, ভবিষ্যত একাকার হয়ে একটা মুহূর্তে থমকে থেমে যায়, সময় অনন্তে হারিয়ে যেতে থাকে। ওরা নিশ্চুপ বসে চারিপাশের দৃশ্য দেখতে থাকে এবং নারী-পুরুষ কন্ঠের কলকাকলী শুনতে থাকে। সুর্য পশ্চিম দিগন্তে গাছ-পালার আড়ালে ঢলে পড়তেই চারিদিকের আলোগুলো ঝলমলিয়ে মায়া বিস্তার করে। সমর বলে, ‘এভাবে অনন্তকাল বসে থাকতে ইচ্ছা করছিল, কিন্তু উপায় নেই, ফিরতে হবে’।
ওরা গাড়িতে ফিরে আসে। ছিমছাম স্ট্যান্ডার্ড-হেরাল্ড গাড়িটা রেডরোড ধরে দ্রুত ছুটে চলে। চারিদিকে নিয়ন আলোর ঝিকিমিকি। সমরের স্মৃতি থেকে হারিয়ে যায় রত্না, হারিয়ে যায় আরতি। সমরের মনের জগত জুড়ে শুধু একটা মেয়েই বিস্তার লাভ করে, তার নাম শিলা।
পরের দিন প্রথম দিকে দুটো অনার্স ক্লাশ করার পর সমর শিলার সাথে বেরিয়ে পড়ে। আগেই কথা ছিল আজ শিলাদের বাড়ি যাবে। পাম এভেনিউএর অভিজাত পাড়ায় সব বাড়িগুলো প্রচণ্ড আর্থিক সংগতির সাক্ষ্য বহন করছে। ঝকঝকে তকতকে মোজেক করা সব বাড়ি। সব বাড়ির সাথেই গাড়ির গ্যারেজ রয়েছে। গ্যারেজে গ্যারেজে বিদেশি মডেলের দামি গাড়ি- রোলস রয়েস, ক্যাডিলাক, প্লিমাউথ, ডোসেটো, ইমপালা, ফোর্ড। কোথাও দারিদ্র্যের চিহ্নমাত্র নেই, ঝকমকে স্বচ্ছলতা। অথচ একটু আগেই পার্ক সার্কাস দিয়ে আসতে আসতে সমর দেখেছে বস্তির কুঁড়ে ঘরের সারি, কঙ্কালসার মানুষের মিছিল, খাটা পায়খানা আর আবর্জনার স্তুপ। দুটো জগতের মাঝে দূরত্ব বড়জোর কয়েক কিলোমিটার। অথচ কি বিরাট ব্যবধান, যেন সম্পূর্ণ আলাদা দুটো পৃথিবী। ভাবতে ভাবতে সমর অবাক হয়ে যায়।
একটা সুন্দর দোতলা বাড়ির গেটের সামনে শিলা গাড়ি দাঁড় করায়। দারোয়ান গেট খুলে দেয়। লাল পাথর বাঁধান সুন্দর পথের দুধারে মরশুমি ফুলের সারি- ডালিয়া, দোপাটি, জিনিয়া, পপি, প্যাঞ্জি, সালভিয়া, হোলিহক, পিটুনিয়া। সমরকে দরজার কাছে দাঁড় করিয়ে শিলা গাড়ি গ্যারেজে রেখে এসে দরজার তালা খোলে।
বিশাল হলঘরে মার্বেল বাঁধানো বিরাট ওভাল আকৃতির টেবিলের চারিধারে গদিমোড়া চেয়ার, দেয়াল আলমারিতে একরাশ বই, কিছু বাদ্যযন্ত্র, দেয়ালে বিশাল আকৃতির তৈলচিত্র – প্রাকৃতিক দৃশ্যাবলী, সুন্দর নগ্ন নারীমূর্তি। শিলা বলে ‘চল আমার পড়ার ঘরে গিয়ে বসি’।
দোতলায় শিলার পড়ার ঘরটা একটু ছোট, আলমারিতে পড়ার বই ছাড়াও অনেক ইংরেজী উপন্যাস, টেবিল আর ছোট বিছানার উপর বইখাতা এলোমেলো ছড়ানো। টেবিলে একটা সুদৃশ টেবিল ল্যাম্প। শিলা বলে, ‘আমি জামা কাপড় বদলে কফি করে আনছি, আপনি ততক্ষণ আলমারির বই দেখতে থাকুন, জানলা দিয়ে বাইরের দৃশ্যও দেখতে পারেন’। শিলা চলে যাওয়ার পর সমর আনমনে আলমারির উপন্যাসগুলো দেখতে থাকে। অনেক নাম করা উপন্যাস রয়েছে, ফরাসী ও রুশ সাহিত্যিকদের উপন্যাসের ইংরেজি অনুবাদও রয়েছে। সমর ভাবে মাঝে মাঝে শিলার কাছ থেকে ধার করে কিছু কিছু বিদেশি উপন্যাস পড়তে হবে। সমর বই দেখতে দেখতে মশগুল হয়েছিল, কখন শিলা তার পাশে এসে দাঁড়িয়েছে আদৌ টের পায়নি। শিলার মৃদু হাসির শব্দে সমর ফিরে তাকিয়ে স্তম্ভিত হয়ে যায়। শিলা ওর গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে, ঊর্ধ্বাঙ্গে ব্রা ছাড়া আর কিছুই নেই। সমর কিছু বুঝে উঠবার আগেই শিলা ওকে জড়িয়ে ধরে আবেগ জড়িত কণ্ঠে বলে ওঠে ‘I love your Samar’ আর তারপর সমরের মুখ টেনে নিয়ে চুমো খাওয়ার চেষ্টা করতে থাকে। সমর এক ঝটকায় নিজেকে ছাড়িয়ে নেয় আর তারপর ছুটে নিচে নেমে যায়। চিৎকার করে বলে, ‘তোমার মত নোংরা মেয়ের সাথে আর কোনো সম্পর্ক রাখবনা’।
পরের দিন কলেজে শিলা সমরের কাছে ক্ষমা চাওয়ার চেষ্টা করে। সমর বিরক্তি ভরে ‘ঠিক আছে ঠিক আছে’ বলে ওকে এড়িয়ে যায়। এরপরও শিলা কয়েকবার সমরের সাথে কথা বলার চেষ্টা করে, কিন্তু সমর ওকে বার বার এড়িয়ে যায়। এর মধ্যে রত্না ফিরে আসায় সমর অনেকটা স্বস্তি পায়, তবে রত্না বা আর কারো কাছে শিলার ব্যাপারটা প্রকাশ করেনা। এদিকে সামনে পার্ট ওয়ান পরীক্ষা এসে পড়ায় সমর আর রত্না দুজনেই পরীক্ষার পড়া নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। সমরের সব নোট তৈরি। সুতরাং সমর ঠিক করে দেশের বাড়ি গিয়েই নিরিবিলিতে পড়াশুনা করবে। পরীক্ষার সাত-আটদিন আগে ফিরলেই হবে। রত্না ওকে দার্জিলিঙ মেলে তুলে দিতে শিয়ালদা স্টেশন আসে। গাড়ি ছাড়ার সময় বলে, ‘চিঠিতে যোগাযোগ রেখ আর Admit Card দেওয়ার নোটিশ দিলে আমি তোমাকে টেলিগ্রাম করে জানিয়ে দেব’।


সমরের পার্ট-ওয়ানের অনার্স পরীক্ষা বেশ ভাল হয়, তবে ফার্স্ট ক্লাশ পাওয়া যে সম্ভব নয় সেটা বেশ বুঝতে পারে। সম্ভবতঃ কেউই হয়ত ফার্স্ট ক্লাশ পাবেনা। সমর ভাবে একমাত্র সুবলই পারত ফার্স্ট ক্লাশ পেতে। কেনযে সুবল আর ফিরে এলনা। সুবলের কথা মনে পড়তেই সমরের মনটা খারাপ হয়ে যায়, অনেক পুরোনো স্মৃতি ফিরে এসে সমরের মনকে ভারাক্রান্ত করে তোলে। বুকের ভিতরটা হু-হু করে ওঠে।
ম্যাথামেটিক্স পাস পরীক্ষার দিন রত্নার সাথে দেখা হয় আবার। এর সপ্তাহখানেক বাদে বাংলা আর ইংরেজী পরীক্ষা। কথা হয় পরীক্ষা শেষে দুজনে কোথাও যাবে। পরীক্ষার হলে একটা বেশ মজার ঘটনা ঘটে। পরীক্ষার হলে বেশ কিছু ছেলে কাগজ নিয়ে নকল করছিল। হলে কোনো অধ্যাপক ছিলেননা। শুধুমাত্র বেয়ারারা ইনভিজিলেশন দিচ্ছিল। মাঝে মাঝে ওরা নকলকারীদের কাছ থেকে কাগজ কেড়ে নিয়ে ছিঁড়ে ফেলে আবার নিজেদের মধ্যে গল্পে মগ্ন হয়ে পড়ছিল। সমরের পাশের একটা ছেলে টয়লেট থেকে আসার সময় টুক করে টেবিল থেকে একটা Differential Calculus এর বই তুলে এনে সমরকে বলল, ‘ভাই চার নম্বর প্রশ্নের উত্তর কোন পাতায় একটু বের করে দেবে?’ সমর কিছু বলার আগেই একজন বেয়ারা এসে বইটা কেড়ে নিয়ে আবার টেবিলে রেখে দিল। পরীক্ষা শেষে যারা পরীক্ষার ঠিক পূর্ব মুহূর্তে পড়ার জন্য বই আর নোট খাতা এনেছিল, অনেকেই তারা সেগুলো খুঁজে পেলনা। অনেকে বইখাতা ফেরত পেলেও দেখল অনেক পাতা সম্পুর্ণ উধাও। টয়লেটে গিয়ে সমর দেখে সারা ঘর ছেঁড়া কাগজের টুকরোয় ভর্তি। রত্নাও জানাল যে মেয়েদের টয়লেটের অবস্থাও একই রকম। রত্নাও একটা মজার অভিজ্ঞতার কথা বলল।
একটা মেয়ে ব্লাউজের ভাঁজ থেকে কাগজ বের করে নকল করছিল। গার্ড সামনে এলেই ব্লাউজের ভাঁজে আবার কাগজটা গুঁজে ফেলছিল। রত্নার হঠাৎ চোখ পড়তেই দেখে মেয়েটা কাগজথেকে যে অঙ্কের সমাধানটা টুকছে কোনো প্রশ্নের সাথে তার কোনো সম্বন্ধই নেই।
পার্ট-ওয়ানের পর রেজাল্ট বের হতে অন্ততঃ মাস দুয়েক সময় লাগবে। সমর আবার দেশের বাড়িতে ফিরে যাবে ঠিক করে। বাড়ি যাওয়ার আগে রত্নার সাথে মেট্রো, এলিট, গ্লোব ও অন্যান্য কয়েকটা ভালো সিনেমা হলে বেশ কিছু সিনেমা দেখে নেয়। ইডেন গার্ডেন, বোটানিক্যাল গার্ডেন, ঢাকুরিয়া লেক, ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালে আড্ডা দেয়। ট্রাম আর দোতলা বাসে করে কলকাতার যত্রতত্র ঘুরে বেড়ায়। দোতলা বাসের জানলায় বসে বাইরের চলমান দৃশ্য দেখতে দেখতে সমর আনমনা হয়ে যায়। ভুলে যায় পাশে রত্নার অস্তিত্বের কথা। সমর ভাবে একদিন ও খুব বড় সাহিত্যিক হবে। দেশ বিদেশে ওর নাম ছড়িয়ে পড়বে। রত্নার কথায় সম্বিত ফেরে বাস থেকে নামার যায়গা এসে গেছে। রত্না হেসে বলে, ‘তুমি বড্ড ভাবুক, একা বেরোলেত বিপদে পড়বে, চিন্তা করতে করতে কোথা থেকে কোথায় চলে যাবে, বুঝতেও পারবেনা’।
একদিন এস্প্ল্যানেডে জোর বৃষ্টি এল। ওরা ছুটে গিয়ে ট্রাম স্ট্যান্ডের ছাউনিতে গিয়ে দাঁড়ায়। চারিদিকে সন্ত্রস্ত মানুষের গাদাগাদি ভিড়, সবাই বৃষ্টির হাত থেকে নিজেকে বাঁচাতে চায়। সামনে শ্যামবাজারের একটা ট্রাম পেয়ে সমর আর রত্না উঠে পড়ল। ট্রামের জানলা সব বন্ধ। ভিতরে গুমোট গরম। এদিকে বৃষ্টি ঝরছেত ঝরছেই। বৃষ্টি মনটাকে কেমন করে দেয়। জাগিয়ে তোলে হারিয়ে যাওয়া পুরোনো দিনের টুকরো টুকরো স্মৃতি। সমরের মনে পড়ে যায় ছোটবেলার গ্রামের সেই বাদল দিনগুলোর কথা। দিঘি-পুকুর সব জলে থই থই করত। রাস্তা ছাপিয়ে যাওয়া জলের স্রোতে পুঁটি মাছের ঝাঁক, রাত্রে টিনের চালে ঠুং ঠাং বৃষ্টির আওয়াজ আর ব্যাঙেদের একটানা ঘুমপাড়ানি গান। ঊঠোনে কুয়ো কুয়ো খেলত সমর। একটু মাটি খুঁড়লেই কলকলিয়ে জল উঠত, ভেসে আসত ভেজা মাটির এক বিচিত্র গন্ধ। কাদাভরা মাঠে ফুটবল খেলার সে কি মজা।
প্রেসিডেন্সি কলেজে ভর্তি হওয়ার পর সমর একদিন বোটানিক্যাল গার্ডেন দেখতে গিয়েছিল। হঠাৎ ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি এল। একটা ঝোপড়া গাছের নিচে গিয়ে সমর আশ্রয় নিল। গাছের পাতা থেকে সমরের সারা গায়ে টুপটাপ জল ঝরছিল। এক সময় গাছের গা বেয়ে জলের ধারা নেমে সমরকে সম্পূর্ণ নাইয়ে দিল। অগত্যা গাছের আশ্রয় ছেড়ে সমর বেরিয়ে আরো ভিজতে ভিজতে ৫৫ নমবর বাস স্ট্যান্ডের দিকে এগিয়ে চলল। এসব জীবনের স্বপ্ন মাখা মুহূর্ত। জমে আছে স্মৃতির পাতায়। বৃষ্টিঝরা দিনে এইযে রত্নার সাথে ট্রামে চেপে চলেছে, এ মুহূর্তটাও অতীত হয়ে যাবে। জমা থাকবে স্মৃতির পাতায় আর সুদূর ভবিষ্যতে এমনি কোনো বৃষ্টিঝরা দিনে স্মৃতির পাতা থেকে ভেসে উঠে মনটাকে কেমন করে দেবে।
হ্যারিসন রোড পেরিয়ে ট্রাম হঠাৎ থেমে গেল। চারিদিকে থই থই জল। ট্রাম বাস সব থেমে গেছে। যাত্রীরা সব ধূতি-প্যান্ট গুটিয়ে, কেউবা স্যান্ডেল হাতে তুলে নিয়ে জল ভেঙে হেঁটে চলেছে। সমর আর রত্না চটি হাতে নিয়ে নেমে পড়ল থই থই জলে। আজ ওরা ভিজবে। জোর বৃষ্টি নিমেষে দুজনকে চুব্বুস করে দিল। ওরা কোনো তোয়াক্কা না করে হাঁটতে থাকে ফুটপাথ ঘেঁষে। হাঁটুঅব্দি প্যান্ট-শাড়ি ভিজে গেছে। ফুটপাথের ভাঙ্গা পাথর পায়ের তলায় বিঁধছে। কোথাও বা গর্তে পা হড়কে যাচ্ছে। নোংরা জলে নানান আবর্জনা, কাগজের টুকরো, আনারসের পাতা, ঝাঁটা সব ধীর গতিতে ভেসে চলেছে, বুঝিবা সহর পরিক্রমায় বেরিয়েছে। দু-একটা দোতলা বাস চলছে। হঠাৎ বিরাট ঢেউ তুলে একটা দোতলা বাস ওদের পাশ দিয়ে চলে গেল। পাশের দোকানের মেঝেয় ধাক্কা খেয়ে নোংরা জলের ধেউ আবার ফিরে এল। সমর আর রত্না কোন রকমে পড়ে যাওয়া থেকে নিজেদের সামলে নেয়। ঢেউএর ধাক্কায় একটা স্কুলের মেয়ের বইখাতা হাতথেকে ছিটকে পড়ে যায়। সমর আর রত্না অনেক কষ্টে কিছু ভেজা বই-খাতা উদ্ধার করে মেয়েটার হাতে তুলে দেয়। ওদের মুখের দিকে ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে মেয়েটা বলে, ‘মা আমাকে মারবে’ আর তারপর ভ্যাঁ করে কান্না জুড়ে দেয়।
সমর বলে, ‘কি পাগলামী করছি আমরা বলত? দুজনেই কিন্তু অসুখে পড়ব’।
রত্না বেপরোয়া ভাবে বলে, ‘পড়বতো পড়ব। তাবলে কি বোকার মত ঘরে বসে থাকব? এই যে অভিজ্ঞতা হচ্ছে, এই যে এডভেঞ্চার হচ্ছে, এর বিনিময়ে আমি অসুখের কষ্ট সহ্য করতেও রাজি। সমর তুমি যদি এটুকুতেই ঘাবড়ে যাও তাহলে শিল্পি-সাহিত্যিক হবে কি করে!’।

Next: Chapter 3 >

Previous: Chapter 1 >


Dr.Ratan Lal BasuRatanlal Basu, Ph.D. (Economics) is an ex-Reader in Economics and Teacher-in-Charge, Bhairab Ganguly College, Kolkata, India. Dr. Basu has written & edited several books on Economics.

Apart from his passion for the field of Economics, Dr. Basu's other interests are Boxing & Small Game Hunting (gave up the nasty games during college life); Swimming in Turbulent Rivers (physically impossible now); Himalayan Treks, Adventure in Dense Forests, Singing Tagore Songs and also writing travelogues and fiction in Bengali and English.

Dr. Ratan Lal Basu can be reached at rlbasu [at] rediffmail.com.