"Death Certificate"--A Relevant Regional Language film by Rajaditya Banerjee. Review by Chirantan Bhattacharyya

 বৃষ্টি আর রেলের চাকার মাঝখানে ভাসমান রূপকথা।  

 ‘অন্ধজনে দেহ আলো / মৃতজনে দেহ প্রাণ’। কিন্তু কে দেবে? আমরা কি দোবো? না কি পারলে কেড়ে নেবো? ‘ডেথ সার্টিফিকেট’ কি নিছকই একটা কাগজ? সাল, তারিখ, মৃত্যুর কারণ লেখা নিছকই একটা কাগজ?

 

বৃষ্টির শব্দের ভীতরে ভেসে ভেসে আসছিল আওয়াজটা,  ‘সাবিততর্‌রি... সইত্যবান... সাবিততর্‌রি... সইত্যবান...’। সাধারণ একটা মাইকের চোঙার আওয়াজ। যাত্রা হবে সেদিন সন্ধ্যায়। তারই প্রচার চলছিল। কিন্তু জলকণাদের সাথে ভিজে ভিজে সেই আওয়াজ পৌঁছে যাচ্ছিল অন্য একটা অনির্দিষ্ট ঠিকানার দিকে। অন্যদিকে একজন সাইকেল আরোহী একটা খবর নিয়ে আসছিল। রাস্তাটা কখনও চড়াই; কখনও ঢালু হয়ে নেমে গেছে; কখনও সোজা; কখনও গভীর বাঁক। সাইকেলের চাকাটা ঘুরে চলেছে অপ্রসারিত রাস্তায়। সামনে নীরব কয়েকটা পাহাড়। ওরাও কি অপেক্ষা করছিল কোনো খবরের? কিন্তু কি খবর নিয়ে আসছিল সাইকেল আরোহী? একটা বিয়োগান্তক দৃশ্যের মাঝে সাবিত্রী। রূপকথার গল্পের সাবিত্রী নয়,এক অন্য সাবিত্রী। পানি পাঁড়ে রামলক্ষণের বউ।  সাইকেল আরোহী তার কানে কানে একটা খবর শোনায়। এই খবরটাই নিয়ে আসছিল সাইকেল আরোহী। কিন্তু খবরটা কি ছিল? নির্দিষ্ট করে সেটা কি সেই সাইকেল আরোহীও জানতো? জানতো না। সে শুধু জানতে পেরেছিল ট্রেনের পানি পাঁড়ে রামলক্ষণ কে পাওয়া যাচ্ছে না। পাওয়া যাচ্ছে না মানে সে তার নির্দিষ্ট কাজের জায়গায় ফেরেনি। ফেরেনি তো কি হয়? কত মানুষই তো দেরী করে ফিরে আসে। কোথাও হয়তো আটকে গেছে! কিন্তু মানুষ নির্দিষ্টতা চায়। নিশ্চিত কোনো খবর। সেটা ভালো হোক কি মন্দ। রাতের অন্ধকার ভেদ করে চলেছে তিনটে লন্ঠন  গভীর অন্ধকার ভেদ করে তিনটি মানুষের অভিযান। একজন বৃদ্ধ, একজন যুবতি ও একজন যুবক। গভীর অন্ধকারে ডুবে  ‘শাল কাঁদে / পিয়াল কাঁদে / কাঁদে মহুয়ার বন’ – তারা কাঁদছে কেন? আসলে তো কাঁদছে মানুষগুলোই। আপেক্ষিকতার নিদর্শ মনে করে তাদের সাথে কেঁদে চলেছে পারিপার্শ্বিকও। ঠিক এই জায়গাতে তে পরিচালক রাজাদিত্য বন্দ্যোপাধ্যায়ের মুনশিয়ানার প্রশংসা না করে পারা যায় না। শ্রদ্ধেয় সাহিত্যিক দেবাশিস বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘ডেথ সার্টিফিকেট’ নামেরই গল্পের অনুসরণে গড়ে উঠেছে সিনেমার কাহিনী। একটি মানুষের নিখোঁজ হয়ে যাওয়া। প্রিয়জনের উদ্বেগ। কখনো কখনো তার থেকেও বড় দাঁড়ায় একটুকরো কাগজ। একটা সার্টিফিকেট। হেসালং ইস্টেশানের মাস্টারবাবুর কথায় - ডেথ সার্টিফিকেটের মানে হল যখন কোনো মানুষ মারা যায় তখন ওখানে একটা কাগজ দেয়। মাস্টারবাবু একটা কাগজে কিছু লিখে দিয়েছিল। তার একটু আগেই সহানুভূতিশীল হয়ে সাবিত্রী-র হাতে গুঁজে দিয়েছিল একটা পঞ্চাশ টাকার নোট। রামপুরহাটের সেই দারোগাবাবুর কাছে ইসটেসানবাবুর লিখে দেওয়া কাগজের থেকেও দামি হয়ে অন্য একটা কাগজ যার নাম টাকা। আবার হাসপাতালের দালালের কাছে টাকার থেকেও দামী সাবিত্রীর শরীর!

 

পরিচালকের নিজের ভাষ্য অনুযায়ী এই সিনেমা আসলে একটা প্রয়াস। সেইসব নির্বাক প্রান্তিক মানুষদের বেঁচে থাকা অথবা না থাকার ইতিহাসটাকে তুলে আনা। যারা ভাবতেই পারে না ন্যায় বিচার। ভাবতেই পারে না একটুকরো একটা কাগজ আসলে কতটা দামী হয়ে উঠতে পারে। এইসবই ঠিক। কিন্তু তার মাঝেও আরেকটা বিষয়ও ভীষণ ভাবে প্রস্ফুটিত হয়ে যায় – এই সিনেমা আসলে অনির্দিষ্টটার। বারবার করে এসে যাচ্ছে ট্রেন। ট্রেন এর হুইশল। একটা দিক থেকে এসে আরেকটা দিকে হারিয়ে যাওয়া। সিনেমাটা দেখতে দেখতে আমরাও বারবার হারিয়ে যাচ্ছি ওই গতিমান অনির্দিষ্টটার দিকে। তখনই আবার ফিরে চলে আসছে সেই প্রশ্নটা একটা কাগজ আসলে কতটা দামী হতে পারে? নির্দিষ্ট আর অনির্দিষ্টের এই বেড়াটাকে নিয়ে বারবার খেলা করেছেন পরিচালক।

 

সমস্ত ছবি জুড়েই রুক্ষ মানভূমের টাঁড়, অপূর্ব এক নিসর্গ কবিতার লাইনের মতো ভেসে ভেসে থেকেছে। বার পরক্ষণেই ধাক্কা খেতে হচ্ছে অন্য একটা শব্দের অভিঘাতে – লাশটা আসলে কাদের এক্তিয়ারে? কে দেবে ডেথ সার্টিফিকেট? সমস্ত  সিনেমাতে সৌরভ গুপ্তের শব্দের ব্যবহার অসাধারণ, আলাদা ভাবে উল্লেখ করতেই হয়। আবহসঙ্গীত এবং  সিনেমাতে ব্যবহৃত গানগুলি অসম্ভব উচ্চমানের। সুরকার মহিনের ঘোড়াগুলি খ্যাত প্রদীপ চট্টোপাধ্যায় ও শুভদিপ পাল আলাদাভাবে দাগ রেখেইছেন। যতগুলি চরিত্র রয়েছে সিনেমাতে তাদের প্রত্যেকেই নিজের নিজের চরিত্রগুলি খুব সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। তবুও আলাদাভাবে চোখে পড়বেই দাদুর ভূমিকায় বর্ষীয়ান অভিনেতা প্রদীপ ভট্টাচার্যের অভিনয় কিম্বা হাসপাতালের দালালের ভূমিকায় ভূপেন পাণ্ডের অভিনয় এবং স্বয়ং পরিচালক রাজাদিত্য ব্যানার্জীর অভিনয়। একটা মানুষ যে স্বপ্ন দেখে রুক্ষ একটা পৃথিবীতে কোথাও জলের অভাব রাখবে না। রাজাদিত্য’র অভিনয়ে সেই স্বপ্নগুলোই আমাদের মধ্যে সঞ্চারিত হয়ে যায়। অর্ণব ভট্টাচার্য খুব দক্ষতার সাথে সম্পাদনার কাজটি  করেছেন। ছবিটি উৎসর্গ করা হয়েছে প্রখ্যাত সাহিত্যিক দেবাশিষ বন্দ্যোপাধ্যায় ও বিখ্যাত চিত্র পরিচালক বাপ্পাদিত্য বন্দ্যোপাধ্যায় কে।

 

এটা জেনে খুব আশ্চর্য হতে হয় যে পরিচালকের এটিই প্রথম ছবি। যে দক্ষতা এবং মুনশিয়ানার সাথে পরিচালনার কাজটি করা হয়েছে তাতে ছবিটি শেষ হওয়ার পরে কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে যেতে হয়। এমন একটা সিনেমা বানাতে গেলে ভালবাসতে জানতে হয়। ভালবাসতে জানতে হয় মানুষকে,  সাধারণ মানুষকে, ওইসব প্রান্তবাসি নির্বাক মানুষদের, ন্যায়বিচার যাদের কাছে রূপকথার কাহিনীর মতো অলিক। ভালবাসতে হয় প্রকৃতিকে। ভালবাসতে হয় লোকসঙ্গীত কে। বুকের গভীরে অবিরাম প্রশ্নচিহ্ন না থাকলে এমন একটা সিনেমা বানাতে পারা যায় না।

 

পরিচালক নিজেই জানিয়েছেন এই সিনেমা ভ্রষ্টাচার, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা আর মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে একটা শক্তিশালী বয়ান। এই সিনেমাতে আমরা দেখতে পাই একজন মানুষের মৃত্যুর মত ঘটনাতেও কত উদাসীন থাকতে পারে অন্য আর কিছু মানুষ। তারা কেউ হাসপাতালের ডাক্তার আবার কেউ পুলিশ আবার কেউ দালাল আবার কেউ এমনিই মানুষ। একটা মানুষের শেষ স্মৃতিটুকু ফিরিয়ে দেওয়ার বিনিময়েও টাকা চাইছে কেউ! কোন খাদের কিনারে এসে দাঁড়িয়েছি আমরা? পরিচালক রাজাদিত্য বন্দ্যোপাধ্যায় নিজের বয়ানে এটাও জানিয়েছেন যে যেখানে আমরা অন্য গ্রহে প্রাণের সন্ধানে দৌড়চ্ছি সেখানে বাকি অর্ধেকটা পৃথিবী শুধু মানুষ হয়ে বেঁচে থাকবার অধিকারটুকু খুঁজে বেড়াচ্ছে। তার প্রশ্ন প্রযুক্তিবিদ্যা সার্বজনীন  হয়ে উঠছে যে পৃথিবীতে সেখানে মানুষ হয়ে বেঁচে থাকবার অধিকার কবে সার্বজনীন হবে?

 

কাহিনীর একেবারে শেষে এসে অদ্ভুত এক বৈপরীত্য আমাদের সমস্ত চেতনাকে উদাসীন করে দিয়ে  স্থবিরতার দিকে নিয়ে চলে যায় – একদিকে মহাশূন্যের দিকে রকেট ছুটে যাচ্ছে আর অন্য দিকে সমস্ত দিন ধরে  টানাপড়েনের মধ্যে থেকে,  শেষকালে কাগজের টুকরোটাকে কুচি কুচি করে ছিঁড়ে অনন্ত অনির্দিষ্ট গন্তব্যের দিকে হারিয়ে যাচ্ছে একটি যুবতি যার নাম সাবিত্রী।