বাংলা নাটিকা: বই চুরি রহস্য - অধ্যাপক ড: জি.সি.ভট্টাচার্য | Boi Churi Rohossho - Bengali Play by Dr. G C Bhattacharya

DR G C Bhattacharya

Dr. G C Bhattacharya is a teacher at BHU, Varanasi, Uttar Pradesh, India and has been writing for over 15 years. His writings have been published in Ichchhamoti, Joydhak, Diyala, A-Padartha and other Bengali magazines. Besides Bengali, he writes in Hindi and English (UK short fiction) too. His published books includes Badal Kotha in Hindi. Dr. Bhattacharya can be reached at dbhattacharya9 [at] gmail [dot] com.

This play is a part of Dr. Bhattacharya's detective mystery series featuring young sleuth Badal who you was introduced to you in বাদলের প্রথম অন্বেষণ and appears in many other crime-mystery stories on WBRi like বন্ধ ঘরের হত্যা রহস্যকাঞ্চনপুরের দলিল রহস্য and so on - search for keywords "badal detective" for a full list.

This story is reproduced in Unicode Bengali font for increased browser compatibility.

Submit your creative writing, story, poem, travelog etc. for publication on WBRi by e-mail to submissions@washingtonbanglaradio.com.



বই চুরি রহস্য

বাংলা নাটিকা


সময় : সন্ধ্যাবেলা
স্থান :    বাদলের কাকুর পড়বার ঘর
পাত্র :   অতি সুন্দর দশ বছরের ছেলে বাদল ও তার কাকু

প্রথম দৃশ্য

পরিবেশ : কম্পুটারে বাদলের কাকু বসে কাজ করছেন ,পাশে বাদল ,বিছানার ওপরে দামি নরম কম্বল রাখা আছে একটা

বাদল: ‘ও কাকু, কি করছো অতো মন দিয়ে আজ?’
কাকু:   ‘ ইন্টারনেটে আই.আর.সি.টি.সির এক্যাউন্ট খুলে দিল্লী যাবার জন্যে ট্রেনের টিকিট কাটছি তবে এই শীতেও দেখি বেজায় ভিড় ...আজ ১৫ তারিখ নভেন্বরের আর টিকিট চাইছি ৩১ ডিসেম্বরের তা সেও নেই খালি, সব ওয়েট লিস্ট  ...না এ.সি.থ্রিতে না টুতে...কি গেরো রে বাবা’
বাদল :   ‘তুমি তো স্লিপার ক্লাশে দেখই  নি কাকু, হয়তো খালি আছে’
কাকু: ‘এই শীতে স্লিপার ক্লাশ ...ওরে বাবা এই সুন্দর মতন ছেলেটা বলে কি? ...কাজ নেই আমার, নামেই তো শীত করছে আমার ...এই আমি কম্বল মুড়ি দিলুম ...কি দারুণ ঠাণ্ডা রে বাবা ‘
বাদল : ‘কোথায় ঠাণ্ডা? দাও আমি কাটছি টিকিট, তোমাকে কম্পুটারে  কাজ করতে দেখে আমি বেশ শিখে নিয়েছি’
কাকু: ‘এই তবে নাও ,কাট  তুমি টিকিট , এখনি এবার বেনারসে যা ঠাণ্ডা পড়েছে না সে আর বলবার নয়

 ‘( নিজে কম্বল মুড়ি দিয়ে বসে বাদলের কাকু বাদলকেও নিজের কোলে তুলে বসিয়ে নিলেন আর  তার বাঁ হাতটা ঠান্ডা কনকন করছে দেখে, সেই হাতটা ধরে কম্বলের মধ্যে টেনে নিয়ে দু’হাতে চেপে ধরলেন )

কাকু- ‘ইঃ, কি ঠান্ডা হয়ে গেছে বাদল, এখন একে গরম না করলেই নয়, নির্ঘাৎ করে বৃষ্টি শুরু হয়ে যাবে …আগে বাদলকে গরম করি, টিকিট তারপর কাটব’।

(ডান হাতেই বাদল এ সী থেকে স্লীপার ক্লাস বদলাতে বসলো  উইন্ডোতে,)

বাদল ( হেসে)-‘আঃ কাকু, কোথায় এত ঠান্ডা পেলে বলতো তুমি এখনই, দিল্লী যাবে তবে কি করে, শুনি?’

কাকু-‘কে যাবে রে বাবা, থাক, কাজ নেই আমার দিল্লী গিয়ে…আমি ঘরেই বসে খাব- দাব আর ঘুমোবো শীতের ছুটিতে। আমার এই নরম মতন বালিশটাকে জড়িয়ে ধরে, বেশ গরম ও আছে, দেখো তুমি ...মাসিমা আসুক গিয়ে বাড়ি ফিরে, কাজ সেরে। আমি আর দেব না এই সুন্দর ছেলেটাকে ফেরত, তা ঠিক…এই দারুণ শীতে তো এক্কেবারেই নয়, ভাগ্যিস করে তিনি শ্রাদ্ধ বাড়িতে ছেলেকে না নিয়ে গিয়ে একলা গিয়েছেন’…
.
বাদল-‘আমি তো কালো ছেলে কাকু, তোমার দুধবরণ ভাইপোর তুলনায়। আমাকে নিয়ে কি করবে তুমি? আমি কি সুন্দর অত? তোমার নিজেরই খারাপ লাগবে আমাকে সঙ্গে নিয়ে কোথাও গেলে লোকে ঠিক হেসে দেবে তোমার সাথে আমাকে দেখে ‘

কাকু-‘কে বলে আমার বাদল কালো? আর জানো তো, বাদল কালো কখন হয়…জলভরা থাকলেই সে কালো, নইলে তুলোর মতন সাদা, তবে সে বাদলকে কে চায় বলো তো…চাতক ঠকানো মেঘ কেবা চায় বল…কবিতায় আছে না’

বাদল-- ‘নাও, কাকু, বাদলকে তুমি অত আদর পরে করো, রাতে শুয়ে…তখন, এদিকে তো পুরো ৩০খানা বার্থ খালি স্লীপারের, দেখো তুমি…বেনারসে সব্বাই না খুব খুব বড়লোক হয়ে গেছে মনে হয়, তাই এই অবস্থা….কাকু, কাটবে টিকিট?’

কাকু-‘ওরে বাবা, এই ঠান্ডায় স্লীপার ক্লাস…উঃ... নামেই আমার গায়ে জ্বর আসছে যে’
বাদল-‘ তবে কি করবে, কাকু?’

কাকু-‘বাদল, তুমি এ সী ফার্স্ট ক্লাশে দেখ তো…’

বাদল-‘ ও কাকু, সে তো অনেক ভাড়া পড়বে, কাকু কি করে কাটবে টিকিট?...
(একটু পরে )
বাদল- ‘ও কাকু, নাও…মাত্র দুটো বার্থই আছে খালি কাশী বিশ্বনাথ এক্সপ্রেসের এ সী ফার্স্টক্লাসে ও…’

কাকু-‘জয় মা ভগবতী, তবে তো মার দিয়া কেল্লা…কট করে কেটে ফেল দুটোই …আপদ চুকে যাক, আর সব বড়লোকেরা যাক গিয়ে তখন স্লীপারে…ঠান্ডাতে হি হি করে কাঁপতে কাঁপতে…’

(বাদল একহাতেই টাইপ করে প্যাসেন্জার ডিটেলস লিখছে ফর্মে... কাকুর  তখন বেশ তন্দ্রার আমেজ এসে গেছে....বাদলের পিঠে মাথা রেখে তিনি তন্দ্রাচ্ছন্ন ....)

বাদল -‘ নাও কাকু, এস বি আই পেমেন্ট গেটওয়ে এসে গেছে, ডেবিট কার্ড নম্বর,কবে থেকে ভ্যালিড, পিন নম্বর সব লিখে দিতে হ’বে এবং পে প্রেশ করতে হবে বলছে…কাকু, না যদি তুমি কম্বল থেকে হাত বের করো নেহাৎ, তবে আমাকেই বলে দাও, টাইপ  করছি’…

(কাকু বলে গেলেন আর বাদল এন্ট্রি করে ভেরিফিকেন কোড টাইপ করে পে অর্ডার করে দিতেই কাকু ছেলেটার ঠান্ডা কনকনে ডান হাতটা ও ধরে কম্বলের মধ্যে টেনে নিলেন )

(কম্পুটারে লেখা ফুটল- ‘ওয়েট করুন, প্রসেসিং হচ্ছে’...কয়েক মিনিট পরে, টিকিট বুকড্ সক্সেসফুলি, কন্গ্রাচুলেশনস লেখা…এবং ই- টিকিট এসে গেল। তবে কুপে ও সীট নম্বর কিচ্ছুটি লেখা নেই সেই টিকিটে, চার্ট তৈরী হ’লে তখন না কি জানা যাবে...কাকু প্রিন্টার অন করে দিলেন  একটা আঙুল বাইরে এনে প্রিন্ট কম্যান্ড দিয়ে। বাদল রিটার্ন টিকিট বুক করায় ফেরবার টিকিটের ও কপির ডবল প্রিন্ট নিলেন )
 
কাকু - ‘বাঁচলুম, এবারে আমি নিশ্চিত বলতে পারি যে আমরা দিল্লী যাচ্ছি…’

বাদল -‘ও কাকু, আজ যত রাত হচ্ছে না, তত যেন ঠান্ডা বাড়ছে, তুমি যদি একটু সময়ের জন্য আমাকে ছাড়তে, তবে রাতের খাবার আমি তৈরী করে আনতুম আর ...রুমহিটার ও চালিয়ে দিতুম না হয়, কাকু’।

কাকু-‘তুমি পারো রান্না করতে,বাদল? চঞ্চল তো পারেই না’

বাদল (হেসে )-‘সামান্য পারি, মায়ের রান্না করা দেখে শিখেছি, কি করব বলে দাও, আমি আলু পোস্তর তরকারী আর লুচি করে আনছি চটপট করে, হবে তো?’

কাকু-‘যথা লাভ….তথাস্তু’।

( বাদল উচ্চ প্রতিভাবান ছেলে, যা একবার দেখে বা শোনে, তাই শিখে যায়।
একঘন্টায় রান্না সারা হয়ে গেল বাদলের। ঘরে দুধ ছিলই। দিব্যি গরম গরম লুচির ডিনার হয়ে গেল। বাদল চটপটে ছেলে, প্লেট টেট সব ধুয়ে এনে তারপর বিছানা, মশারি সব ঠিক করে ফেলল একটু পরেই)

বাদল - ‘এস কাকু, শুয়ে পড়ি এবার আমরা’...

(এই বলে ছেলে জামাকাপড় ছেড়ে ফেলে তৈরী হ’ল বিছানায় গিয়ে শুয়ে পড়বার জন্য। ঘরে রুমহিটার চলছিল, তাই ঠান্ডা তখন বেশ কম।)

(কাকু  গিয়ে চঞ্চলের বদলে বাদলকেই সেইরাতে দু’হাতে ধরে কোলে তুলে নিয়ে পায়চারী করে নিলেন  ঘরেই খানিকটা অভ্যাস মতন, তারপরে নিদ্রাদেবীর আরাধনা করতে গিয়ে শুয়ে পড়লেন নাইট বাল্ব জ্বেলে দিয়ে, ছেলেটার সাথে। )

কাকু- (স্বগত )-‘ভাগ্যিস বাদল এসেছিলো নইলে এই শীতে ঘুমই আসতে চাইতো না একলা শুয়ে, আমার পরীর দেশের রাজকুমার ভাইপো চঞ্চল তো গিয়েছে মহীসুরে বেড়াতে বাবা মায়ের সাথে, ঠিক আছে আমি ও যাব বাদলের সাথে)

(কাকু তারপরে তাই চঞ্চলের বদলে বাদলকেই দু’হাতে টেনে নিয়ে আদর করতে লেগে গেলেন .) ঘুমিয়ে পড়লেন দু’জনেই ...

দ্বিতীয় দৃশ্য

স্থান-বেনারস ক্যান্টনমেন্ট রেল স্টেশন , নয় নম্বর প্লাটফর্ম ..   

দিন-৩১ ডিসেম্বর, ১৯৯৬   কাল: বেলা -দেড়টা
পাত্র- বাদল ও তার কাকু এবং স্টেশনের লোকজন ---ভিড়


( কাশী বিশ্বনাথ এক্সপ্রেস ট্রেন এসে লাগলো প্লাটফর্মে ...দু’জনে উঠে পড়লেন  ... বেলা দু’টো .... গাড়ী ছাড়লো---ট্রেনের শব্দ
পরিবেশ -- সুয্যিমামার দেখা নেই... মেঘ ও কুয়াশায় চারিদিক আছন্ন হয়ে আছে আর তেমনি দারুণ বরফের মতন ঠান্ডা হওয়া চলছে )...

(গাড়ী ছাড়বার খানিক পরে )
 
বাদল  –‘ও কাকু, আমার বিজ্ঞানের গল্পের বই এনেছে তো, ট্রেনে কি পড়বো? এই
এ সি গাড়িতে শীত তো নেই,এত সব গরম জামাতে আমার গরম লাগছে যে’…
(এই বলে ছেলে জ্যাকেট খুলে ফেললো )...

কাকু-‘কোনো বিজ্ঞানের বই তো আনা হয়নি’

(বাদল  খাবার প্যাক করে আনা হিন্দী খবরের ‘আজ’ কাগজখানা নিয়েই পড়তে বসলো...তা সে পুরনো কাগজ তো কি ... ১৮ জুলাই ১৯৯৬ সনের পুরনো কাগজের বিজ্ঞানের পাতাটা নিয়ে মেতে গেলো ছেলেটা)

বাদল –‘ও কাকু, দেখ না কি সব বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের কথা ছেপেছে কাগজে, পড়ে দেখ না… ট্যাগেক্স সিস্টেম কি? ইলেক্ট্রো ম্যাগনেটিক ওয়েভ কি? লি কোম্পানি কোথায়? তুমি তো বিজ্ঞানী ...বলো না’...

কাকু (স্বগত)- জিনিয়াস ছেলের কি ঝামেলা রে বাবা ? কোথায় যা একখানা কমিক্স এনেছি তাই পড়বে বসে ছেলে  ...তা নয়, চঞ্চল হলে এই ঝামেলা হত না। )

(পরে পাতাটা পড়ে কাকু বাদলকে  কিছু বুঝিয়ে দিলেন , তবে সিস্টেমটা নতুন বলে সবকিছু তিনি  ও জানতেন  না )

তৃতীয় দৃশ্য

স্থান-নতুন দিল্লী রেল স্টেশন ও হোটেল নিউ গনেশ প্যালেস
কাল – সকাল আট টা
পাত্র-বাদল,কাকু, অটো ওয়ালা, হোটেলের ম্যানেজার  
পরিবেশ-
কুয়াশাতে সব ঢাকা ...সাদা ...স্টেশন, রাস্তা ...কিছুটি দেখা যায় না ...টেম্পো ও খুব কম আছে..যা আছে তারা ভাড়া চাইছে ডবল)

কাকু---‘পাহাড়গঞ্জের হোটেল নিউ গণেশ প্যালেস অব্দি যেতে তিরিশ টাকা চাইছে যে ...এ কি মগের মুলুক নাকি রে বাবা,... তবে তাই চলো বাপু কি আর করা? বাদল, উঠে  পড় দূর্গা বলে ’

( অটো চলবার শব্দ ...একটু পরেই অটো হোটেলে পৌছালো )

হোটেল ম্যানেজার –‘ তিন তলায় একটা ঘর খালি আছে তবে ভাড়া পড়বে পাঁচশ  টাকা আর খাবার চার্জ আলাদা’

কাকু-‘ তাই দাও বাবা, এই ঠান্ডাতে কোথায় ঘুরবো আমরা?’   
(কাকু রুম বুক করলেন  ...)...

(কোনমতে শীতে কাঁপতে কাঁপতে তিনতলার ঘরে ঢুকেই জুতো খুলে বিছানায়  গিয়ে শুয়ে কম্বল মুড়ি দিলেন কাকু …যা ঠান্ডা বাপ রে বলে ...বাদল তাতে রাজি নয় . খালি তাড়া দিতে লাগলো।)

বাদল-‘ও কাকু, ওঠো না, এই সকাল বেলায় কি কেউ শুয়ে থাকে নাকি? ...হাত মুখ ধোবে না নাকি? কখন তুমি যাবে সায়েন্স কংগ্রেন্সে?’

কাকু-‘আরে বাবা সে তো কাল, আজ কেন উঠবো এই বরফের মতন ঠান্ডার মধ্যে শুনি? তুমি ও জুতো খুলে এস তো দেখি বিছানাতে’...

(তা চঞ্চল হলে আর বলতে ও হত না, এ সে ছেলেই নয় ...লেগে গেলো ইমার্সন হিটার আর ছোট রুম হিটার বার করতে ...ঘরটা এ সি নয় ,তাই রুম হিটার ছিল সাথে ...কি করা? এ সি ঘর হাজার… এগারোশোর নিচে নেই সাধারণ হোটেলেই..).

(আধ ঘন্টা পরে ঘর একটু বেশ গরম হলো, জল ও গরম করে নিলো বাদল...তখন কাকুকে তুলে ছাড়লো বিছানা থেকে সে।)
 
বাদল  –‘নাও এবার ওঠো তো তুমি কাকু, দেখো ঘর বেশ গরম হয়েছে আর জল ও বরফের মতন নেই ...মুখ হাত ধুয়ে আগে জলখাবার কি আছে দেখি ...খাবে তো ...ওঠো না’

কাকু (রাগ করে ) –‘ এ তো ভালো মুশকিল হলো আমার, এ ছেলে তো দেখি খালিই ডাকে এই ঠান্ডাতে। দেবো এইবার উঠে এক্কেবারে ল্যাংট করে টেনে নিয়ে গিয়ে  ঠান্ডা জলেতে চান করিয়ে ছেলেকে এখুনি ...’

বাদল ( হেসে ফেলে )--‘ও কাকু, সে তো করাতেই হবে আমাকে চান আর দিল্লির শীত বলে তুমি বুঝি আজ আমাকে সব জামাপ্যান্ট পরিয়েই  চান করাবে... হি: হি: হি:’

কাকু (স্বগত )-‘না:, এমন হলে কি কিছু করা চলে?
বাদলের সাথে দেখি পারবার জো টি নেই, দুর্গা বলে উঠেই পড়া যাক এই বিষম শীতের সাথে লড়াই করতে...চান, খাওয়া সব তো করতেও হবে...নতুন বছরে কি উপোষ দেবো ? বরং খান কয়েক কেক আনিয়ে নিই হোটেলের রুম সার্ভিস কে ডেকে...)

চতুর্থ দৃশ্য

কাল- ২ জানুয়ারি, ১৯৯৭
সময়- বেলা এগারোটা   
স্থান- সায়েন্স কংগ্রেস প্যাভিলিয়ন...রেজিস্ট্রেশন হল ।
পরিবেশ- দারুন ঠান্ডার মধ্যে খোলা জায়গাতে সে কি লম্বা লাইন ...লাইট ও নেই আবার সেদিন, কম্পিউটার অচল, ম্যানুয়াল কাজ হচ্ছে...  

কাকু-‘ এদের কি কান্ড রে বাবা? উ:, দেখেই তো আমার হয়ে গেছে’ ...

( বাদল নির্বিকার ...একটা প্লাস্টিকের চেয়ার টেনে এনে কাকুকে বসিয়ে লাইনে লেগে গেলো বাদল, কাকুর পরে চিল্ড্রেন সায়েন্স কংগ্রেসে নিজের ও করিয়ে নিলো রেজিস্ট্রেশন।)

(বিকেল চারটে বেজে গেলো এই করতে আর তখনি যেন অন্ধকার ঘনিয়ে এলো। সেখানের ডিনার মাথায় রেখে  চট করে হোটেলে ফিরে আসা ও কষ্টকর হলো, এত ঠান্ডা  ..হোটেলেও  লাইট নেই, ঘর গরম হবার ও আশা নেই, তবে বাদল  এসেই আগে মোমবাতি জ্বেলে দিয়ে খাবার দাবার পাঠিয়ে দিতে বলে দিলো আটটার সময়, তারপরে ঠান্ডা জলেই হাত মুখ ধুতে লাগলো ওই দুরন্ত ছেলে।)

কাকু-‘ ও রে বাবা, উ: দেখেই তো আমার হাত পা ঠান্ডা ...আমি আর উঠে যাচ্ছি না হাত পা ধুতে’

( তা প্রায় রাত দশটার পরে লাইট এলো সেদিন...হিটার চলতে তবে উঠে খাবারের সদ্গতি করা সম্ভব হলো কাকুর পক্ষে...খেয়েই শুয়ে ঘুম ।)

পঞ্চম দৃশ্য


কাল- ৩ জানুয়ারী…
স্থান --উদ্ঘাটন প্যান্ডেল, দিল্লী বিশ্ব বিদ্যালয় --- সায়েন্স  কংগ্রেসের সভা ...প্রধান মন্ত্রী এসে গাউন পরে ভাষণ দিয়ে গেলেন সকাল ন’টাতে ..দিল্লী বিশ্ববিদ্যালয়ে যেতে সাড়ে সাতটাতে বেরোতে হলো ঘন কুয়াশার মধ্যে দু’জনকে)

কাল ---৪ জানুয়ারি
 তারপর দিন কাকুর পেপার ছিলো সেক্সনাল সেশানে...পোস্টার প্রেজেনটেশন বলে দেরি হলো না বেশি, পার্টিসিপ্যান্ট  অনেকেই আসেননি দেখা গেলো ।

তাড়াতাড়ি রেহাই পেয়ে হোটেলে ফিরলেন )
অটো চলবার শব্দ হয়ে থামবার শব্দ হ’লো

কাকু (স্বগত )_ ... ‘এবার আর যাচ্ছি না, সাত তারিখ পর্যন্ত আমার এক্কেবারে ছুটি ...শেষের দিন গিয়ে সার্টিফিকেট নিলেই হবে। রোজ কে যাবে এই ঠান্ডাতে বসে লেকচার শুনতে রে বাবা?’
( তখন কংগ্রেস চলতো ৮ তারিখ অবধি।)

(তা বাদল কি তাই শোনবার মতন ছেলে নাকি একটা, একটু পরেই --- )...

বাদল -‘ও কাকু, চলো না আমরা গিয়ে দিল্লী বই মেলা দেখে আসি আজ, প্রগতি ময়দানে হচ্ছে, দেখবার মতন জিনিস , সায়েন্সের অনেক বই পাবো ...’

কাকু(স্বগতভাবে)--- ‘আমি কই কম্ম কাবার, এ ছেলেতেই করলো সাবাড় ...এই ঠান্ডাতে রাতে আমাকে বলে কিনা ময়দানে যাও, ওরে বাবা, কি করে যাব? প্রগতি ময়দান কি এখেনে?...কি গেরো ...দরকারটা কি রে বাবা? ...না, সায়েন্সের বই কিনবো ...চলো না কাকু, জিনিয়াস ছেলের না নিকুচি করেছে, আমার রূপকুমার চন্চলই ভালো’)

দ্বিতীয় অঙ্ক

প্রথম দৃশ্য

স্থান- দিল্লী প্রগতি ময়দান বই  মেলা
কাল- সন্ধ্যা সাতটা
পাত্র ---কাকু,বাদল ও মেলার ভিড়   

কাকু-(স্বগত )-‘যতই রাগ করি, যেতেই হবে আমাকে বাদল যখন একবার সুর তুলেছে, ছেলেটা যে কোন ধাতু দিয়ে তৈরী তা কে জানে রে বাবা ...শীত ও করেনা? ’
আর সেই গিয়েই না হলো এক ঝামেলা ...)

 অটো চলবার শব্দ -----

(টেম্পো ধরে প্রায় চল্লিশ মিনিট ঠান্ডাতে কাঁপতে কাঁপতে গিয়ে হাজির হলেন দু’জনে  বিরাট বড় মেলাতে ...)

(দারুন শীতে ও হই চই, নিয়নের আলো, লোকজনে ঝলমল করছে সব স্টল, নানান স্টল থেকে বাদল অনেকগুলো মাগ্যাজিন,কমিক্স সব কিনলো শেষ মেষ ম্যাকগ্র হিল বুক কোম্পানী।
খুব বড় পব্লিশার্স...রাজকীয় স্টল দেখে ঢুকে পড়লেন কাকু  ...বিদেশী কোম্পানি, সব বিষয়েরই বই ছাপে ও বিক্রি করে।)

পরিবেশ---

(গেট পেরিয়ে কাঁচের দরজা ঠেলে ঢুকেই লম্বা করিডোর ও হলঘর, নরম সবুজ কার্পেট পাতা দারুণ সাজানো পুরো এ সি করা হল, কে বলবে দেখে যে মাঠের মধ্যে প্লাইউড দিয়ে তৈরী,…একেবারে রাজকীয় প্যালেসের লাইব্রেরি যেন, কাউন্টার পার হয়ে দ্বিতীয় দরজা দিয়ে ঢুকেই সারি সারি কাঁচ লাগানো আলমারি ডবল তাকের... বিষয় লেখা প্লাকার্ড লাগানো – অর্থনীতি, রাজনীতি, গণিত, রসায়ন, ভূগোল, শিক্ষা, মনোবিজ্ঞান নানা বিষয়।)

(কাকু বই বাছতে লেগে গেলেন , তবে সেখানে কোনো পাহারা নেই, যে যার ইচ্ছে মতন বই দেখছে, বেছে নিচ্ছে...)

কাকু -(স্বগত )-‘এদের  কি রকমের  ব্যাপার রে বাবা? মজা তো দেখি মন্দ নয় ...এদের কি বই চুরি যাবার ভয় ও নেই? এত সব দামী বই রয়েছে, দিল্লী কি বিলেত হয়ে উঠেছে নাকি... কে জানে বাবা? যাক গিয়ে ...আমার আর কি?’  ..

(এজুকেশনাল টেকনোলজি ও সাইকোলজির খান তিনেক বই বেছে নিয়ে দেখলেন  দাম প্রায় দেড় হাজার টাকা, দাম লেখা জায়গাতে লাল বর্ডারের চৌকো চকচকে টেপ লাগানো, তাতে দাম ছাপা আছে..)

কাকু-‘.নির্ঘাত দাম বাড়াবার জন্যে এই কান্ড করা হয়েছে, এখন করি কি? বই গুলো ছাড়তে ও ইচ্ছে নেই আর সঙ্গে আছে মাত্র এক হাজার টাকা ...

 বাদল (হাতে বই  নিয়ে কাকুর কাছে এসে )-–‘ও কাকু, দেখো কয়েকটা ভালো বই পেয়েছি বিজ্ঞানের, তবে সব ইংরিজিতে লেখা, তা তুমি পড়ে আমাকে সব বুঝিয়ে দিও, দাম ও কম ...এই দেখো বর্ডার দেওয়া লাল টেপ আটকে দাম লিখে রেখেছে, এটা একশো আর এটা নব্বই আর এটা শুধুই পঞ্চাশ আর শেষেরটা একশো পঞ্চাশ মানে হলো গিয়ে তিনশো নব্বই’ ...

কাকু-‘ও রে বাবা, তবে তো সব মিলিয়ে হলো আঠারশো নব্বই, অত টাকা তো আমি আনিনি সঙ্গে’ ...

বাদল–‘ তুমি এস না কাকু,আমি তো আছি ... সেল্স কাউন্টার এ’দিকে’ ।

(কাকুর হাত ধরে বাদল নিয়ে এলো সেদিকে। সেখানে দু’জন খুব সুন্দরী ও স্মার্ট মহিলা বসে কম্পুতে কাজ করছিলেন )।

প্রথম মহিলা --‘আসুন স্যার’     
বাদল (গম্ভীর মুখে )---‘এই বই গুলো প্যাক করে মেমো দিন’

প্রথম মহিলা -‘ও, সিওর স্যার’

(প্রথমজন বইগুলো নিয়ে কম্পুটারে নাম, লেখকের নাম, দাম সব এন্ট্রি করে দ্বিতীয় জন কে দিলেন, তিনি এক এক করে বই গুলো খুলে দাম লেখা টেপ লাগানো দিকটা ঘুরিয়ে ধরে একটা চৌকো মতন যন্ত্রের সামনে ঢুকিয়ে দিতে লাগলেন ...লিভারে চাপ দিতেই টক করে শব্দ হতে লাগলো ...তারপর তিনি সেগুলোকে অন্য একটা মেশিনে ঢুকিয়ে লিভার টেনে দিলেন, দু’মিনিটেতে  পলিথিন প্যাক হয়ে বই এসে গেলো )।

কম্পুটার নিয়ে কাজেরত মহিলা  –‘কি নাম লিখবো স্যার?’

(কাকু  অবাক হয়ে তাদের কাজ ও মেশিন দেখছিলেন  )

 বাদল –‘লিখুন,  বাদল কুমার’

(শুনেই তিনি যেন একটু চমকে উঠলেন বলে মনে হলো ...)
(একটু পরে )
দ্বিতীয় মহিলা-‘স্যার, জানতে পারি কি কোন বাদল কুমার? ডিটেকটিভ কি?’

বাদল-‘হ্যাঁ, মাদাম?’     
(.প্যাকেট দুটো দিয়ে তিনি এক্সকিউজ মি বলে চলে গেলেন কোথায় যেন),

অন্য মহিলা  –‘স্যার,পনেরশো বারো টাকা হয়েছে দাম’

কাকু-‘সে কি, এত কম?’

মহিলা -‘কম নয় স্যার, আমরা সব বইয়ে ২০ পার্সেন্ট করে ছাড় দিই মেলাতে তো, তাই ...’

কাকু (মনে মনে ) – ‘তা আর দেবে না কেন? দাম তো আগেই বাড়িয়ে রেখে দেওয়া হয়েছে এখন ছাড় ও দিলে ...বেশ কান্ড কারখানা বটে এদের ’।

(বাদল পকেট থেকে ষোলোশো টাকা বার করে দিয়ে দিলো )

কাকু -‘ বাদল, তুমি টাকা কোথায় পেলে?’

বাদল (হেসে ) –‘ কেন কাকু, সেবার যে আমি মুক্তোর হার খুঁজে দিয়ে অত পুরস্কার পেয়েছিলাম, তার টাকাটা তো সব পড়েই আছে। তুমি তো নিলেই না। তাইতেই না আমাকে মিডিয়া ডিটেক্টিভ বানিয়ে দিয়েছিলো, কাগজে ছবি টবি সব ছাপে আমার তখনই তো প্রথম’।

(খটাং করে অটোমেটিক মেশিনে ছাপ মারলো একটা, ক্যাশ মেমোতে – ‘পেড’

বাকি টাকা ও মেমো বাদল নিয়েই এগিয়ে যেতে কাকু  বই তুলে নিলেন )

বাদল  --(পিছনে ফিরে ) –‘এই রে, সরি কাকু, এদের স্টাইল দেখাতে গিয়ে ভূল হয়ে গেছে, আমাকে মাফ কর কাকু, দাও বই আমি নিচ্ছি’

কাকু --‘তাতে আর কি হয়েছে, চল না ...’

বাদল--- ‘না না, আমার পাপ হবে খুব। তুমি কেন নেবে আমি থাকতে সাথে? ...দাও দাও’
(বাদল অন্য হাতে কাকুর হাত ধরে চললো, সবে মেন গেটের কাছে গিয়েছেন দু’জনে ( পেছনে ডাক) –‘ স্যার ...স্যার...’
কাকু ---‘কে?’
(তকমা আটা উর্দি পরা এক বেয়ারা ছুটে এসে)-...‘স্যার, এক মিনিট স্যার, ম্যানেজার সাহেব একবার দেখা করতে চান আপনাদের সাথে দু’মিনিটের জন্যে’

কাকু (স্বগত)- )... ‘এ আবার কি ব্যাপার রে বাবা? আমরা কি পয়সা না দিয়ে চুরি করে পালাচ্ছি নাকি? এভাবে তাড়া করবার মানে? কি জ্বালা এই বিদেশী স্টলে রে বাবা, এমন জানলে কে আসতো?  

কাকু--- ‘কেন? কি জন্যে শুনি? আমাদের অত সময় নেই .. এই দেখো ক্যাশ মেমো ...টাকা দেওয়া হয়ে গেছে ...চুরি করে পালাচ্ছি না যে ম্যানেজারের সাথে দেখা করতে হবে ..’

বেয়ারা ---‘না না, সে কি ? আপনারা তো চোর ধরেন স্যার ...ডিটেক্টিভ...কেন স্যার, রিটা দিদিমণি বলেননি কিছু ...তিনিই তো সাহেবকে সব বললেন ...তাই তো সাহেব ডেকে পাঠালেন...না হয় সাহেবকেই ডেকে আনছি আমি এখানে’

কাকু (ধীরে )--‘এই সেরেছে, যতই হোক, এদের এখানে এসে এদেরই সাহেব কে তলব করা অভদ্রতা হয়ে যায় বেশি...
কাকু ( হতাশ হয়ে) -‘ না তার দরকার নেই, চলো যাই ...’

কাকু (স্বগত )---না বাদলকে আমি নাম বলতে দিই তখন, না এই ক্যাঁচাকলে পড়তে হয় ... সেই যে বলে না ...দেখো যা থাকে কপালে, খন্ডন না হয় গো তাহা গোলকধামে গেলে...এও দেখি তাই।


দ্বিতীয় দৃশ্য

স্থান ---স্টল ম্যানেজারের চেম্বার
কাল- রাত সাড়ে আটটা
পাত্র- বাদল, কাকু, ম্যানেজার , বেয়ারা

পরিবেশ---
(বেয়ারা নিয়ে এসে হাজির করলো এক এ০ সি০ করা ঘরে, বিরাট বড কাঁচে ঢাকা অর্ধ চন্দ্রাকৃতি সেক্রেটারিয়েট টেবলের সামনে। উল্টো দিকে রিভলভিং চেয়ারে যিনি সুট বুট,কোট,টাই পরে বসে ছিলেন তিনি হাত বাড়িয়ে উঠে দাড়ালেন দশাসই বপু নিয়ে –)

ম্যানেজার--‘মোস্ত ওয়েলকাম স্যার,গুদ ইভনিং  ...’

(বোঝা গেলো, ইনিই হলেন কোম্পানির জবরদস্ত ম্যানেজার।)

কাকু (ম্যানেজারকে )- –‘ইভনিং, বলুন কি করতে পারি আমরা আপনাদের জন্যে? ’।    

ম্যানেজার- ‘প্লিজ, বি শিতেদ স্যার, মি গোমেশ স্যার ...পিতার গোমেশ, এ ভেরি স্মল ম্যান য়্যান্ড ইউ আর বিগ দিতেকতিভ...আই নো, ইউ কেম হিয়ার ইন দিল্লী তু আওযার স্তল..ইত ইজ গ্রেত লাক  ফর মি ...বিগ অপরচুনিতি ..’
সে আর থামেই না
তার পরেই বেল বাজালেন ম্যানেজার ---টিং টিং ...ও সঙ্গে সঙ্গে বেয়ারার আগমন

বেয়ারা---‘ ‘ইয়েস স্যার ...’
ম্যানেজার –‘কফি  আন্দ  মিল্ক উইথ চকলেত  কুইক ‘

কাকু- ‘আবার কফি কি হবে? আমরা এখন যেতে চাই ..কেন ডাকলেন আমাদের এবার তাই বলুন, আমরা খুব টায়ার্ড , দিন ভোর তো গিয়েছে সায়েন্স কংগ্রেসের ঝামেলা ‘ ..’

ম্যানেজার-‘ ও আপনারা দিল্লিতে এসেছেন সাযেন্স কংগ্রেসের জন্যে? তাই বলুন ...আপনারা তো আসবেনই  তাই  বলছি স্যার, রিতা এসে যেই বললো যে  মাস্টার লিটল বন্ড বাদল কুমার এসেছে আজ ...হাতে হেভেন পেলুম যেন স্যার, স্যার, একটা দারুণ সমস্যা হয়েছে স্যার ....চুরি হচ্ছে আমাদের স্টলে রোজ’ ...

কাকু (বিরক্ত হয়ে )-‘তা আমরা কি করবো? আপনি পাহারা বসান’

ম্যানেজার-‘আছে স্যার, তাও আছে জবরদস্ত ...আপনারা তো বই কিনেছেন না?’

কাকু-‘হ্যা, পেমেন্ট ও হয়ে গেছে ...’

ম্যানেজার --‘আরে, আমি তা বলিনি। আপনারা কি দামের টেপটা একটু দেখেছিলেন?...’

কাকু-‘তা কেন দেখবো না, সব বইতেই তো টেপ আটকে দাম বাড়িয়ে বসে আছেন আপনারা, কোথায় মেলাতে দাম কমাবেন তা নয় উল্টে ...’

ম্যানেজার--- ‘না না,স্যার ... দাম বাড়াই  নি উল্টে ২০ পার্সেন্ট ছাড় দিচ্ছি সবাইকে’

কাকু-‘তবে টেপ লাগিয়েছেন কেন?’

ম্যানেজার- ‘ওই তো, ওটাই তো আমাদের পাহারাদার স্যার, কি করবো , এত বড় স্টলেতে পঞ্চাশ ষাটটা আলমারি, পাহারা দেবার মতন লোক নেই আমাদের, আর সেটা আমাদের দেশে অভদ্রতা ও, তাই অনেক খরচ করে ওই ব্যবস্থা করেছিলাম ... অন্য দেশে এতে শপ লিফটিং আটকেছি ও, তবে এখানে দেখছি সব বৈজ্ঞানিক চোর, গত সাত দিনে দশ হাজার টাকার বই চুরি গেছে আমাদের, পুলিশ ও কিছু করতে পারছে না, স্যার আমরা ডুবে যাবো স্যার... আমার চাকরি চলে যাবে স্যার...আপনাদের কিছু করতেই হবে স্যার,প্লিজ ...’

(খালি স্যার স্যারের ঠ্যালায় অস্থির হয়ে) বাদল ---‘ আপনাদের সিস্টেমটা একটু আগে বলবেন কি আপনি?’

ম্যানেজার--‘বলছি স্যার, এই টেপটা কিন্তু সাধারণ দামের চেপি বা স্টিকার নয় ভাই, ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক টেপ, ব্রি্টিশ প্যাকেজিং কোম্পানী জনসন অ্যান্ড লির নাম শুনছেন কি আপনারা?’
বাদল--‘হ্যাঁ’
ম্যানেজার (একটু চমকে উঠে )---‘ আচ্ছা তবে শুনুন ...ট্যাগেক্স সিস্টেমে অটোমেটিক মেশিনের সহায়তায় প্র্তিটি বইতে এমনভাবে ওই টেপ আটকে দেওয়া হয়েছে যে কেউ ব্লেড দিয়ে চেঁছে বা কেটে ও তুলে ফেলতে পারবে না। এই সিস্টেমে ২৫০০০ মিটার লম্বা ও ৬ মিমী চওড়া টেপের বান্ডিল, ডিসপেন্সার আর আটকে দেবার উপকরণ থাকে, সেই একবান্ডিল টেপেতে তিন লাখ বইতে চেপি বা স্টিকার লাগানো হয়ে যায়, খরচ পড়ে হাজার ডলার। বই বাইন্ডি করাবার সময়েই এটা আমরা করিয়ে নিই। মেশিনে একঘন্টাতে প্রায় ২৫০০০ বইয়েতে স্টিকার আটকে দেওয়া হয়ে যায় অটোমেটিকভাবে। কিছু বুঝতে পারছেন, স্যার’?

বাদল -‘হুঁ, আমি জানি’।

ম্যানেজার—‘স্টলে রাখবার আগে আমরা শুধু টেপটাকে সক্রিয় করে দিই ইলেকট্র্নিক মেশিনে ঢুকিয়ে দিয়ে, তার ফলে টেপ থেকে অদৃশ্য বিদুৎচুম্বকিয় তরঙ্গ বেরোতে থাকে।  আমাদের মেনগেটে এমন একটা সেন্সেটিভ উপকরণ লাগানো আছে, যা সঙ্গে সঙ্গে তাকে বিদুৎ তরঙ্গে বদলে দিতে সক্ষম। তাই গেটের অ্যালার্ম বেজে উঠবে কেউ অ্যাকটিভ টেপের বই নিয়ে গেটের কাছে গেলেই। বিক্রী করবার সময় টেপটাকে নিষ্ক্রিয় করে দিই আমরা আবার মেশিনে ঢুকিয়ে। তাই তখন আর ঘন্টি বাজে না’।

কাকু--‘এতই যদি বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থা করেছেন, তবে চুরি হয় কি করে’?

ম্যানেজার--‘সেইটাই আপনাদের খুঁজে দেখতে হবে স্যার, আমাদের কোন মেশিন খারাপ হয়ে যায় নি কোথাও। আমি খবর পেয়েছি, আজ যে দামী মেডিসিনের বইগুলো নতুন এসেছে, সেগুলো ও দু’তিন দিনের মধ্যেই চুরি হবে, আটকাতে না পারলে কয়েক লাখ টাকার লোকসান হয়ে যাবে আমাদের কেননা সব ডলারে দাম ’।

বাদল (একটু চিন্তা করে নিয়ে )--‘যা করতে বলব আপনি করতে পারবেন কি? চুরী যে কিভাবে যে হচ্ছে তা তো বোঝা যাচ্ছে স্পষ্টই’।

ম্যানেজার ---‘কি বলছ তুমি মাষ্টার বন্ড্? তুমি সত্যি বলছ?’

বাদল--‘হ্যাঁ, খুব সহজ কাজ চুরী করা, তবে আপনাকে তা আটকাতে হলে কয়েকটা ন্যানো টেকনোলজিক্যাল ইক্যুইপমেন্ট আনাতে হবে কিন্তু’।

ম্যানেজার--‘হয়ে যাবে, ইউ নেম ইট অ্যান্ড উই গেট ইট। আমাদের কোম্পানির মি০ গ্যারিফিল্ড আসছেন কাল, আমি যা বলব সব নিয়ে আসবেন, খুব বড় বৈজ্ঞানিকের ল্যাবে কাজ করেন তিনি পেনসিলভ্যানিয়াতে তো,… তুমি বল’।

বাদল --‘একটা কাগজ দিন, লিখে দিয়ে যাই। কাজ হয়ে যাবে আপনার এতেই মনে হয়’।

বাদল ( একটু পরে )--‘হয়েছে, নিন। আমরা এবারে যাই। রাত হয়ে গেল অনেক তো’।

ম্যানেজার--‘যদি কিছু মনে না করেন তো একটা কথা বলি?’
কাকু---‘বলুন’।

ম্যানেজার--‘আমার ড্রা্ইভার যদি আপনাদের পৌঁছে দিয়ে আসে…অটো এখন পাওয়া মুস্কিল হবে আর খোলা অটোতে যেতে কষ্ট  ও হবে আপনাদের খুব’।
   
কাকু-- ‘অর্থাৎ জানতে চাইছেন আমরা ওইখানেই আছি কি না? ঠিক আছে।‘
ম্যানেজার- (বেল বাজালেন )-টিং টিং
বেয়ারা –‘ইয়েস স্যার ...’
ম্যানেজার –‘ ড্রাইভার  মিস্টার হ্যারি ‘...’
(একটু পরে )
ড্রাইভারের প্রবেশ- ‘ইয়েস স্যার’
ম্যানেজার –‘ ব্রিং মাই বোলেরো আন্দ হেল্প দি জেন্তেল মেন টু গো টু হোতেল ..ও. কেয় ‘
ড্রাইভার –‘ মাই প্লেজার স্যার’

গাড়ির দরজা বন্ধের ও স্টার্টের শব্দ  

(দামী এ০সি০ কারে চড়ে ফিরলেন দু’জনে যখন, রাত দশটা বেজে গেছে। রাতে খেয়ে দেয়েই ঘুম। বই আর খুলে দেখাও হ’ল না। )


তৃতীয় দৃশ্য

স্থান—হোটেলের ঘর
পাত্র—কাকু, বাদল, হোটেলের বেয়ারা , ম্যানেজার পিটার সাহেব
কাল- সন্ধ্যার পরে


(পরের দিন আবার যদি পিটার এসে পেটায়, এই ভয়ে কংগ্রেসের আসরেই চলে গেলেন দু’জনে । ন্যানো টেকনোলজির ওপর আরো একটা প্লেনারী সেশান ছিল, লেকচারগুলো শুনলেন  বটে, তবে অতি জটিল ব্যাপার সহজে বোধগম্য হবার নয় বলে মনে হ’ল। সন্ধ্যাতে হোটেলে ফিরে শুনলেন যে  তিনবার ফোন করেছিল পিটার সাহেব। জ্বা্লাতন আর কাকে বলে?)

কাকু-(মনে মনে )--  ‘আজ আর আমি কোথাও যাচ্ছি না একপা ও বাইরে। বাদল বই গুলো পড়ুক ঘরে বসে।

(তা  একটু আরাম করা  কপালে থাকলে তো । গরমজলে হাত পা ধুয়ে সবে একটু কম্বল মুড়ি দিয়ে বসেছেন কাকু, এক বেয়ারা এসে হাজির)

বেয়ারা -‘সা’ব, আপকা ফোন আয়া হ্যায়…’

কাকু --‘ফোনের না নিকুচি কিয়া হ্যায়…যাব না ধরতে, যাও। ঘরে নেই কেন ফোনের এক্সটেনশান?’।
    
(বাদল ছুটল তখনই ফোন ধরতে।)

কাকু (স্বগত )-‘বাবা রে বাবা, ছেলে না কাঠবেড়ালী একটা, কে জানে?’

(বাদল ফিরল দশ মিনিট পরে)

বাদল ( হাসতে হাসতে )--‘কাকু, তোমার কম্বল ফেল, গরম ড্রে্সিং গাউন জড়া ও, পিটার সাহেব আসছেন একবার দেখা করতে। আমি কফি ও স্ন্যাক্স পাঠিয়ে দিতে বলে এসেছি, তিনি এলেই’।

কাকু--‘নাঃ, এবারে আমি দেশত্যাগী হব নির্ঘাৎ এই পিটারের পিটুনি খেয়েই দেখছি । রাতে ফিরে ও রেহাই তো নেই দেখি। কি গেরো রে বাবা’।

(তা আধঘন্টা পরেই উদয় হলেন তিনি)

ম্যানেজার -‘ হ্য্যালোও  স্যার, হাউ আর ইয়ু? এ কি হোটেলে আছেন আপনারা? এখানে আপনাদের মানায় না, চলুন এখুনি… আমি হোটেল অশোকে স্যুট বুক করে দিচ্ছি একটা’

কাকু-‘থাক, আপনার খবর বলুন …আগে কফি খেয়ে নিন । এই রাতে আমি কোথাও যেতে রাজী নই জানবেন’।

ম্যানেজার --‘আমাদের দরকারি জিনিষপত্র সব সকালে এসে গেছে, দিনভোর কাজ ও চলেছে, স্টল রিজুভিনেট হচ্ছে, নতুন প্র্পার্টি কাউন্টার তৈরী হচ্ছে। কাল রেজাল্ট জানা যাবে, আপনারা ক্লান্ত তাই আমিই চলে এলুম স্যার….’

কাকু--‘কেতাথ্থ করলেন মানে দয়া করে যে আপনি এলেন তাতেই আমি ধন্য’…

(আরও খানিক বকে বিদেয় হলেন তিনি।)

কাকু—‘বাব্বা, আমার  প্রাণটা যেন বাঁচল।  এখন মানে মানে ৮ তারিখটা এলে যেন বাঁচা যায়’।

চতুর্থ দৃশ্য

স্থান- হোটেলের ঘর
কাল- বিকেল বেলা
পাত্র- কাকু, বাদল, ম্যানেজার পিটার সাহেব, ড্রাইভার, এ.সি.কার
পরিবেশ--

(পরদিন আবার তিনি যে এসে হামলা করবেন, তা নির্ঘাৎ করে কথা।
আর হ’লো ও তাই। বিকেল বিকেলই ফিরে এসেছিলেন দু’জনে সেদিন ঠান্ডার ভয়ে। ঠান্ডা আরও বেড়েছে সেদিন। তাপমাত্রা মাত্র তিন ডিগ্রী।)

(তা সেদিন তিনি এসেই কাকুকে বাদল সমেত নিয়ে চললেন অশোক হোটেলে। )

ম্যানেজার—‘ ব্রিং অল লাগেজ তু মাই কার মি: হ্যারি ...লেত আস গো তু হোতেল অশোকা’
কাকু—‘ কি দরকার স্যার? আমরা তো বেশ আছি’  

ম্যানেজার -‘আজ আমার দিন স্যার, সকাল বিকেল দু’বেলা হয়েছে অ্যাটেম্পট…সাকুল্যে চারজন ধরা পড়ে থানায় আটক হয়েছে... তারা প্রায় হাজার ডলারের বই নিয়ে হাওয়া হচ্ছিল। সকালের দু’জনকে তখনই দিইনি পুলিশে, বেঁধে আমার ঘরেই ফেলে রেখে দিয়েছিলাম আমি, যাতে খবরটা গোপন থাকে’।

বাদল-‘অ্যালার্ম বেজেছিল, আন্কল?’

ম্যানেজার ---‘হ্যাঁ, মেটাল ডিটেক্টারেরও সেই সাথে। চোরেরা তো আর ফ্রি প্র্পার্টি কাউন্টারে সব  কিছু জমা দিয়ে ঢুকবে না । আপনারা ৮ তারিখে ফিরবেন  তো, ততদিন আমার কার রইলো ড্রাইভার সমেত আপনাদের জন্য স্যার। ডোমেস্টিক এয়ারপোর্টে সকাল আটটাতে আপনাদেরকে পৌঁছে দিয়ে ফিরে যাবে। এই নিন ফ্লাইটের টিকিট। গুড নাইত, স্যার’।
 
(তিনি চলে গেলে কাকু প্লেনের টিকিটের প্ল্যাস্টিকের ব্যাগটা খুললেন, দেখা গেলো যে ব্যাগে আছে  এয়ার ইন্ডিয়ার দু’টো টিকিটের সাথে একটা তিনলাখ টাকার ব্যা্ংক ড্রাফ্ট….কাকুর নামে, ওরিয়েন্টাল ব্যাংকের…)

কাকু---‘কি কান্ড…,ব্যাপারটা কি হলো,বাদল?’

বাদল ( সুন্দর করে হেসে )--‘খুব সোজা কাকু, চোরেরা সাথে করে নিয়ে আসত বিশেষ কোন কেমিক্যাল লাগানো ধাতুর পাত, সেঁটে দিত চেপির ওপরে, ব্যাস, ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক ওয়েভ বন্ধ, অ্যালার্ম ও আর বাজতো না।  কেমন চালাকি বলত কাকু ? হি: হি: হি:’

বাদল-‘কি আর করা ? তাই আমি বলেছিলুম-‘গ্র্যাফিন লাগাতে’।

‘ন্যানো টেকনোলোজির ওপর প্লেনারী সেশানে সেদিন লেকচার হ’ল তাই শুনেই তো আইডিয়াটা পেলুম আমি, কাকু। গ্র্যাফিনের পরমাণু বিন্যাসের স্লাইড ও তো দেখিয়েছিলেন বৈজ্ঞানিক উইলিয়ামস’।

কাকু-‘ তাই তো বাদল, আমার তো মনেই নেই সবকথা ...’

বাদল---- কাকু, জানো তো যে ‘৬টা করে কার্বন পরমাণু পাশাপাশি দাঁড় করিয়ে (স্ক্যানিং টানেলিং মাইক্রোস্কোপ ব্যবহার করে) এক পাতলা শক্ত পর্দা তৈরী করা হয়েছে জার্মানির ম্যাক্স প্ল্যাংক প্র্তিষ্ঠান ও ইংল্যান্ডের ম্যান্চেস্টার বিশ্ব্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানিদের যৌথ উদ্যোগে আজ থেকে বেশ কয়েক বছর আগে। এখন ইউরোপ, ব্রিটেন সর্বত্র ট্রান্জিস্টার তৈরির জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে গ্র্যাফিন যা ২০০১ সালে জাপানে তৈরী হয়েছে কার্বন ন্যানোটিউব থেকে। এই পর্দা এত পাতলা যে দু’লক্ষ পর্দা পরপর বসালে  তবে তা একটা মোটা চুলের মতন হবে মাত্র। এই গ্র্যাফিন হল দারুণ বিদ্যুৎ পরিবাহী, সুতরাং আমার আইডিয়া ছিল যে যদি এই পর্দা কভারের পিছনের পুরো পাতাটায় বসিয়ে দেওয়া হয় দামের চেপির ওপর দিয়ে, তখন মাত্র তার ওপরে কিছু আটকে দিলে ও বিদ্যুৎ চুম্বকিয় তরঙ্গ আটকানো তাইতে আর সম্ভব হবে না, পুরো পাতাটাই না ব্লক করলে...ঠিক তো,  কাকু?

কাকু—‘তা ঠিক বটে’

বাদল—‘আর এই পর্দা খালি চোখে দেখা ও তো যাবে না যে কেউ বুঝতে পারবে আগেভাগেই আর সেইমতন পাতার জায়গা ব্লক করবে…হিঃ হিঃ হিঃ…কেমন ফন্দি বলো না কাকু? সঙ্গে মেটাল ডিটেক্টার ও অবশ্য লাগানো হয়েছিল আসা যাওয়ার প্রবেশ পথে’।

কাকু--‘দামী ফন্দি…..যার দাম তিন লাখ টাকা আর এই জামাই আদরে রাজকীয় স্যুটে থাকা, এ০সি০ কারে চড়ে বেড়ানো, ইচ্ছেমতন দামী খাওয়াদাওয়া করা আর প্লেনে চড়ে বাড়ী ফেরা, সব পিটার সাহেবের কেয়ার অফে, বেচারার চাকরিটা যে বেঁচে যাবে আর লোকসান ও কমবে তা ঠিক…..’


(এই বলে কাকু  টপ করে নিচু হয়ে পরম সুন্দর ছেলে বাদলকে দু’হাতে জড়িয়ে ধরে অবলীলায় কোলে তুলে নিয়ে পায়চারী শুরু করলেন ঘরে নিজের  অভ্যাস মতন, ঠান্ডার প্র্কোপের হাত থেকে ক’দিন পরে একটু রেহাই পেয়ে।)

(হোটেল অশোকের বিশাল ঘরে তখন তিন রডের  ভার্টিক্যাল রোটেটিং রুমহিটার জ্ব্লছে আর হট এয়ার কনভেক্টার মেশিনের ফ্যান গরমভাব ছড়িয়ে দিচ্ছে দু’জনের  গায়েতে আরামের উষ্ণ পরশের মতন। পরদিন তাপমাত্রা নেমেছিল দু’ডিগ্রিতে কিন্তু বাদলের  কাকুর শীতের কষ্ট আর ছিলো না।)



কাকু –(বাদলকে আদর করতে করতে )—‘জয় হোক ন্যানোটেকনোলজির’।

-

অধ্যাপক (ড:)জি.সি.ভট্টাচার্য ,বারাণসী, উত্তর প্রদেশ,ভারতবর্ষ



blog comments powered by Disqus

SiteLock