স্বপ্ন - রতন লাল বসু: প্রথম অধ্যায় | Shopno - A Bengali Novel by Dr. Ratan Lal Basu - Chapter 1 | WBRi Bangla Online Magazine

"Shopno" is a novel by Dr. Ratan Lal Basu published serially in the WBRi Bangla Magazine section in unicode Bangla font. Links to previous and following chapters are posted at the bottom of every episode.


স্বপ্ন

রতন লাল বসু

প্রথম অধ্যায়


Bengali Novel SHOPNO Chapter 1 : WBRi Bangla Online Magazine

সমরবাবু ঘুমিয়ে পড়েছিলেন। ঘুম ভাঙতেই দেখেন বিকেল হয়ে গেছে। বাইরে বৃষ্টি পড়ছে। ল্যান্ডস্কেপ হোটেলের দশ তলার জানলা দিয়ে তাকিয়ে দেখেন মেকং নদীতে এক অপূর্ব স্বপ্ন মাখা জগত। সমরবাবু লিফ্ট দিয়ে দ্রুত নেমে পড়লেন। বাইরে যাবেন শুনে রিসেপসনিষ্ট মেয়েটা একটা সুন্দর রঙিন ছাতা এগিয়ে দিল। প্যাগোডা আকৃতির ক্যাম্বোডিয়ানা হোটেলের সামনে থেকে এক প্যাকেট সিগারেট কিনে এগিয়ে গেলেন মেকং এর তীরে। নদীর তীর ঘেঁষে সারি সারি নানান আকৃতির নৌকা। সমরবাবুকে দেখে একজন মাঝি এগিয়ে এসে ভাঙা ইংরেজিতে বলল, ‘হো-চি-মিন সিতি তু আওয়ারস্’। সমরবাবু বললেন, ‘আমার ভিয়েতনামের ভিসা নেই’। তারপর হেসে ফেললেন। হোটেলের ম্যানেজারের কাছে শুনেছেন নৌকা করে সায়গন যেতে কম করে আট ঘণ্টা লাগে। অথচ যাত্রীদের আকৃষ্ট করার জন্য মাঝিরা কেমন বেমালুম মিথ্যা বলে যায়।

সিগারেট ধরিয়ে সমরবাবু তাকিয়ে রইলেন নদীর দিকে। ঝিরঝিরে বৃষ্টি সপ নদী আর মেকং এর সঙ্গমস্থলে এক মোহময় জগত সৃষ্টি করেছে। পলপটের দুঃস্বপ্ন ভুলে সমরবাবু আবার ফিরে গেলেন ছাত্র জীবনের স্বপ্নের জগতে। মনে পড়ে গেল কবিতার একটা ছত্রঃ

“মেকং আর বেনহাই এর জলে নতুন জীবনের মুখ
কান পেতে শোন নতুন দিনের ঘোষণা মন্দ্রিত হচ্ছে হো-চি-মিন এর কণ্ঠে”

সমর বাবুর সামনে থেকে হঠাৎ সব কিছু মুছে গেল। ভেসে উঠল সুদূর অতীতের দৃশ্যাবলী। মনে পড়ে গেল শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের কবিতার কয়েকটা ছত্রঃ

“তারা আমাদের বলে গেলো হারানো দিনের সেই অনুপম স্বপ্নগুলি স্মৃতিগুলি
আমরা অনুভব করলাম আবার – সেই সব হারানো গল্প
যা আমরা এতাবৎকাল হারিয়ে এসেছি
হারিয়ে এসেছি হারিয়ে এসেছি হারিয়ে এসেছি – ফিরে পাবনা
জেনে কখনো আর
ফিরে পাবো না আর ফিরে পাবো না আর ফিরে পাবো না আর
সেইসব জ্যোৎস্নার ঝরাপাতার কথকতার দিন ফিরে পাবো না আর।”

II

‘তোমাদের এডমিশান টেষ্টতো পর্শুদিন হয়ে গেছে’।

সমরকে করুণ চোখে ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে থাকতে দেখে ক্লার্ক সহানুভূতির স্বরে বললেন, ‘তুমি মৌলানা আজাদ বা অন্য কোন কলেজে দরখাস্ত করনি?’

সমর যন্ত্রের মত পিছু হঠে একটা টুলের উপর বসে পড়ল। ক্লার্কের কয়েকটা কথা সমরের পৃথিবীটাকে বদলে দিয়েছে। দার্জিলিং মেলের বাঙ্কে শুয়ে তন্দ্রার অবসরে, বীরভূমের তালগাছে ঘেরা পিছুহটা পুকুর আর সীমাহীন মাঠ দেখতে দেখতে, স্টিমারের দলাই-মলাই ভিড়ে বিস্বাদ চা খেতে খেতে সমর অনেক স্বপ্ন দেখেছে প্রেসিডেন্সিতে ভর্তি হয়ে সবাইকে তাক লাগিয়ে দেবে।

অনেকদিন আগে সমর একবার কলকাতা এসেছিল। বাবার সাথে কলেজ স্কোয়ারের বেঞ্চে বসে ওয়াটার পোলো খেলা দেখছিল। বাবা প্রেসিডেন্সি কলেজের বাড়িটা দেখিয়ে বলেছিলেন, ‘এটাই আমাদের দেশের সবচেয়ে ভালো কলেজ; দেশের অধিকাংশ গুণি মানুষ এই কলেজে পড়েছেন’। তখনি সমরের মনে বাসনা জাগে বড় হয়ে প্রেসিডেন্সিতে পড়বে। আর সেই বাসনাকে ঘিরে তার মনে স্বপ্ন বাসা বাঁধতে থাকে।

হায়ার সেকেন্ডারী পরীক্ষায় ভাল রেসাল্ট করার পর সে আর মনের বাসনাটাকে চেপে রাখতে পারেনি। সবার কাছে গর্ব করে বলে বেড়িয়েছে, ‘দেখিস, আমিই এই স্কুলের একমাত্র ছাত্র যে প্রেসিডেন্সিতে পড়বে’। দু-একজন একটু ব্যঙ্গ করে বলেছিল, ‘গাছে কাঁটাল গোফে তেল। আগে এডমিশান টেষ্টে এলাও হয়ে নে তারপর বাতেলা ঝাড়িস’। সমর রেগে বলেছিল, ‘তোরা দেখে নিস, আমার প্রেসিডেন্সিতে ভর্তি হওয়া কেউ ঠেকাতে পারবেনা’।

সমরের মন তখন আত্মবিশ্বাসে ভরপুর ছিল। একটা নতুন জীবন, একটা স্বপ্নের পৃথিবী। ট্রামে চেপে কলেজ স্ট্রীট পর্যন্ত আসতে আসতে, প্রেসিডেন্সি কলেজের প্রাসাদে ঢুকে ক্লার্ককে প্রশ্ন করা পর্যন্ত বেঁচে ছিল সে স্বপ্ন। কিন্তু তারপর ক্লার্কের সামান্য কয়েকটা কথায় সমরের সব স্বপ্ন ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। ফিরে গিয়ে জলপাইগুড়ির এ.সি. কলেজে ভর্তি হওয়া ছাড়া এখন আর কোন রাস্তা খোলা নেই। তাও ওখানেও ভর্তি বন্ধ হয়ে গেছে কিনা কে জানে। ফিরে গেলে প্রথমেই সবাই ব্যঙ্গ বিদ্রূপে মেতে উঠবে। ঝলমলে স্বপ্নের পৃথিবীটা ভেঙ্গে চুরমার হয়ে গেল। সামনে শুধু নিরন্ধ্র অন্ধকার।

টুল থেকে উঠে সমর যন্ত্রের মত এগিয়ে চলে। একটা ছেলের গায়ে ধাক্কা মেরে হাতের বইগুলো ফেলে দেয়। বই কুড়োতে কুড়োতে ছেলেটা বিরক্ত হয়ে বলে, ‘দেখে চলতে পারেননা, কানা নাকি!’ সামনেই টয়লেট। ভেতরে কেউ নেই। বেসিনের সামনে এসে সমর কান্নায় ভেঙে পড়ে। অনেক কষ্টে এতক্ষণ কান্না চেপে ছিল। কান্নার দমকে দমকে বুকটা যেন ছিঁড়ে খুঁড়ে যেতে চায়। নাক গলা সর্দিতে ভারি হয়ে আসে।

‘ভাই কাঁদছ কেন?’ চম্কে ফিরে সমর দেখে একটা ছিপছিপে লম্বা ছেলে তার দিকে সহানুভূতি ভরা চোখে চেয়ে আছে। শ্যামবর্ণ সুন্দর চেহারা। সমর লজ্জা পেয়ে রুমাল দিয়ে মুখ ঢাকে। ছেলেটার কাছ থেকে চোখের জল আড়াল করতে চায়। সমরের পিঠে হাত রেখে ছেলেটা মিষ্টি স্বরে বলে, ‘কাঁদছ কেন? লজ্জার কি আছে? আমাকে বলনা তমার কি হয়েছে’।

কান্না জড়ানো স্বরে সমর বলে, ‘আমি নর্থ বেঙ্গল থেকে কাল বিকেলে এসেছি। কলেজে এসে শুনলাম আমাদের এডমিশান টেষ্ট হয়ে গেছে। প্রেসিডেন্সিতে আর ভর্তি হতে পারবনা। ফিরে গিয়ে কারো কাছে মুখ দেখাতে পারবনা। তা ছাড়া অন্য কোন কলেজে দরখাস্তও করিনি। এখন আমি কি করব?’ ছেলেটা মনদিয়ে সমরের সব কথা শুনল, তারপর হেসে বলল, ‘তুমি কেঁদনা, বোধ হয় ম্যানেজ হয়ে যাবে’।

ছেলেটার কথায় সমরের মনে আবার আশা জেগে উঠল। কিন্তু ম্যানেজ হবেই বা কি করে? সমর প্রশ্ন করতেই ছেলেটা বলে, ‘শুধুমাত্র যারা হায়ার সেকেন্ডারী পাশ করেছে তাদের এডমিশান টেষ্ট হয়েছে, প্রি- ইউনিভার্সিটি আর সিনিয়র কেম্ব্রিজ পাশ করে যারা এসেছে তাদের টেষ্ট এখনো বাকী আছে। তোমার সমস্যা যদি হেড অব দি ডিপার্টমেন্টকে বুঝিয়ে বলতে পার তবে তিনি নিশ্চয় তোমাকে টেষ্টে বসার সুযোগ দেবেন। খুব ভালো লোক’।

আশা নিরাশার দোলায় দুলতে দুলতে সমর ছেলেটার সাথে চলতে থাকে। প্রশ্ন করে, ‘আপনি কোন ইয়ারে পড়েন?’ ছেলেটা বলে, ‘আমি এই কলেজ থেকেই এবছর পি.ইউ. (pre-university) পাশ করেছি। এড্মিশান টেষ্টে বসব। আমাকে আর আপনি করে বোলনা। আমার নাম সুবল রায়। তোমার?’

‘সমর দত্ত’।

কয়েকটা জমকালো পোশাক পরা মেয়ে মেমদের মত ইংরেজি বলতে বলতে আসছিল। সুবল বেশ সুন্দর ইংরেজিতে প্রশ্ন করল হেড অব দি ডিপার্টমেন্ট এসেছেন কিনা। একটা স্মার্ট মেয়ে তড়বড় করে কি বলল। সমর কিছু বুঝতে পারলনা। সুবলকে প্রশ্ন করে জানল উনি এখনো আসেননি। তবে একটু পরেই তাঁর ক্লাশ আছে।

লাইব্রেরীতে বসে অপেক্ষা করতে করতে সমর অস্বস্তি বোধ করতে থাকে। পোশাক আসাক চালচলনে চারিদিকের ছেলেমেয়েগুলো যেন ভিন্ন জগতের। কত সুন্দর ইংরেজি বলছে। আনাড়ি গেয়োঁ সমর কোনোদিন ওদের নাগাল পাবেনা। সমর চুপসে গেল, খুব নার্ভাস বোধ করতে লাগল। না হয় এডমিশান টেষ্টে বসার সুযোগ পেল; কিন্তু কি করে এসব ছেলেমেয়েদের সাথে পাল্লা দিয়ে সিলেক্টেড হবে! সুবলের আশ্বাসে যে ক্ষীণ আশার আলো দেখেছিল, তা ক্রমে ম্লান হয়ে আসতে থাকে। জলপাইগুড়ি ফিরে যাওয়ার চিন্তা দুঃস্বপ্নের মত সমরকে তাড়া করতে থাকে।

লাইব্রেরির সামনেদিয়ে গট গট করে হাঁটতে হাঁটতে এক ভদ্রলোক চলে গেলেন। পাশের ছেলেটা বলল, ‘স্যার এসে গেছেন; আপনার কি দরকার আছে বলছিলেন। এখনো ক্লাশের দেরি আছে। দেখা করে আসুন’।

লাইব্রেরি থেকে বেরিয়ে সমর দেখে সুবল ফিরে আসছে। সুবলকে দেখে সমর মনে বল পায়। একরকম জোর করে নিজেকে টেনে নিয়ে স্যারের চেম্বারের সামনে দাঁড়ায়। পর্দা ফাঁক করে কাঁপা কাঁপা গলায় বলে, ‘মে আই কাম ইন স্যার?’

স্যারের চেম্বার থেকে বেরিয়ে সমর নিজেই বুঝতে পারেনা কি করে স্যারকে সব কিছু বলতে পারল। সমরের মুখে লাজুক হাসি দেখে সুবল বলে ওঠে, ‘কেমন আমি বলে ছিলামনা। টেষ্টে এলাও হলে ভরপেট খাইয়ে দিতে হবে কিন্তু’।

III

এডমিশান টেষ্টে উত্তীর্ণ দের তালিকার সামনে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে সমর। বুক ঢিপ ঢিপ করতে থাকে। তাকিয়ে দেখতে সাহস হয়না। অনেক কষ্টে প্রায় দম বন্ধ করে সমর লিষ্টের দিকে তাকায়। দ্রুত চোখ বুলিয়ে যায় নাম গুলোর উপর দিয়ে। প্রথমেই সুবলের নাম। আর দু-তিনটে নামের পরে ঐত স্পষ্ট করে লেখা সমর দত্ত। সমরের শরীর দিয়ে উষ্ণ রক্তস্রোত প্রবাহিত হয়। উত্তেজনায় হাত-পা কাঁপতে থাকে। তার পর সংশয় জাগে, ওটা অন্য কোনো সমর দত্ত নয়তো! পিঠে একটা হাতের স্পর্শে ফিরে তাকায়। সুবল মিটিমিটি হাসছে, ‘এবার আমার খাওয়াটা?’

কলেজ স্ট্রীট পেরিয়ে সমর আর সুবল কফি হাউসের দিকে এগিয়ে চলে। কফি হাউসের সিঁড়ির মুখে চিত্রাভিনেতা সৌমিত্র চ্যাটার্জি ওদের পাশ কাটিয়ে যান। সমর বোকার মত হাঁ করে চেয়ে থাকে। সুবল হেসে বলে, ‘সৌমিত্র প্রায়ই কফি হাউসে আসেন’। সমর অবাক হয়ে ভাবতে থাকে গ্রাম্য জীবন থেকে সে সম্পূর্ণ এক স্বপ্ন মাখা নতুন জগতে এসে পড়েছে। সংশয় জাগে, স্বপ্ন দেখছে নাত।

কফি হাউসে এলাহি কান্ড। সমস্ত ঘর জুড়ে অসংখ্য টেবিলের চার পাশে ছেলেমেয়েদের জটলা। এক একটা টেবিলের পাশে ছ-সাতটা বেতের চেয়ার টেনে নিয়ে ছেলে মেয়েরা গাদাগাদি করে বসে হাসি কলরবে মেতেছে। সারা ঘর জুড়ে মৌমাছির গুনগুন রবের মত শব্দপ্রবাহ অনর্গল বয়ে চলেছে। সিগারেটের পর সিগারেট পুড়ছে। কত স্মার্ট ছেলে, কত সুন্দর সুন্দর মেয়ে। সমরের অনুভূতিতে স্বপ্নের শিহরণ জাগে। সেই কৈশোর বয়স থেকে লালন করা কল্পনার পৃথিবীর দুয়ার যেন আজ উন্মোচিত হয়েছে। সেকি পারবে এসব ছেলেমেয়ের সাথে একাত্মতা গড়ে তুলতে! উত্তর-পূব কোণে একটা টেবিলের পাশে কালো মোটা মধ্যবয়সী ভদ্রলোক আনমনে চুরুট টানছেন। পাশের দুটো চেয়ার খালি। সুবল ভদ্রলোকের কাছ থেকে জেনে নিয়ে একটা চেয়ারে বসে পড়ল। সমরও সুবলকে অনুসরন করল। এদিক ওদিক চোখ ঘুরিয়ে আজব দুনিয়ার আজব কান্ড কারখানা দেখতে লাগল।

মাথায় পাগড়ি পরা সাদা পোশাকের ওয়েটাররা ব্যস্ত সমস্ত ভাবে এদিক ওদিক ছোটাছুটি করছে। জল আর খাওয়ার টেবিলে টেবিলে পৌঁছে দিচ্ছে, বিল মিটিয়ে নিচ্ছে। মাঝে মাঝে আড্ডাদারদের সাথে হাসি মস্করাও করছে। সুবল মুখ দিয়ে ‘উস্উস্’ শব্দ করে হাতে তুড়ি মারতেই একজন ওয়েটার টেবিলের সামনে এসে দাঁডাল। সুবল বলে, ‘দুটো মোগলাই আর কফি’। সমরকে করুণ চোখে চাইতে দেখে সুবল হেসে বলল, ‘আজ আমিই খাওয়াচ্ছি, টেস্টে ফার্স্ট হয়েছি বলে। তোমার খাওয়ানোটা বাকি রইল’।

এই অপরিচিত পরিবেশে বসে সমরের অস্বস্তি হতে থাকে। নিজের ঢোলা প্যান্ট, অবিন্যস্ত চুল, কথাবার্তা-চালচলন সবকিছুই এখানকার পরিবেশের সাথে সম্পূর্ন বেমানান। সমরের বারবার মনে হয় সবাই বুঝি ওর বোকাবোকা গ্রাম্য চেহারার দিকে তাকিয়ে আছে। পাশের টেবিলে একটা মেয়েকে হাসতে দেখে মনে হয় সমরকে দেখেই বুঝি হাসছে। খাওয়ার সময় আরো ফ্যাসাদ। কাঁটা চামচ ব্যবহার করার অভ্যাস নেই। সুবলকে অনুকরন করার অনেক চেষ্টা করেও সমর পেরে ওঠেনা। ওর আনাড়িপনা দেখে সবাই বুঝি হাসছে। সমরের হাত আর চলতে চায়না।

‘কি একা একা খুব খাচ্ছ’ বলতে বলতে একটা মেয়ে হাত বাড়িয়ে সুবলের প্লেট থেকে এক টুকরো মোগলাই তুলে মুখে পুরল। মোটা ভদ্রলোক অনেক ক্ষণ উঠে গেছেন। মেয়েটা খালি চেয়ারটা টেনে নিয়ে সমরের পাশে ঘন হয়ে বসে পড়ল। শাড়ীর প্রান্ত সমরের কাঁধ ছুঁয়ে যেতেই সমরের শরীরে কেমন একটা শিহরণ জাগে; সমর লজ্জায় জড়োসড়ো হয়ে পড়ে। হাত থেকে কাঁটা চামচ পড়ে যায়।

‘খুব লাজুক দেখছি। বাচ্চা ছেলেটা কে রে সুবল?’ মেয়েটা হাসতে হাসতে প্রশ্ন করে।

‘জলপাইগুড়ি থেকে এসেছে। আমার সাথে ফার্স্ট ইয়ারে ভর্তি হবে।‘

‘তাই বুঝ্ঝি!’ মেয়েটা ন্যাকামী করে ‘ঝ’ এর উপর জোর দিয়ে বলতেই সমর নিজের অজান্তে হেসে ওঠে।

মেয়েটা সমরের দিকে ঝুঁকে পড়ে বলে, ‘বাচ্চা দেখছি হাসছে। লজ্জা কেটেছে খোকা? তোমার নাম কি?

আমার নাম রত্না রায়। ফিজিক্সে ভর্তি হব’।

সমর অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে কাঁপা কাঁপা গলায় বলে, ‘সমর দত্ত’।

রত্না হেসে ওঠে, ‘মেয়েদের দিকে তাকাতেও লজ্জা; কি করে এই কো এডুকেশন কলেজে পড়বে!’ রত্না কথা বলতে বলতে সমরের হাতে নিজের উন্মুক্ত হাতের আলতো ছোঁয়া দেয়। সমরের শরীর দিয়ে যেন বিদ্যুত তরঙ্গ প্রবাহিত হয়ে যায়। শরীর মুহূর্তে শক্ত হতেই সমরের আরো লজ্জা পায়। এ-রাম মেয়েটা বুঝতে পারল নাত! সুবল বলে ওঠে, ‘আঃ কি করছিস রত্না? ছেলেটা সবে মাত্র জলপাইগুড়ি থেকে এসেছে’।

‘কেন জলপাইগুড়ির ছেলেরাত বেশ চালু হয় দেখেছি’।

‘ওদের বাড়ি শহরের বাইরে গ্রামে’।

‘ও তাই বল। ওহে গ্রামের বাচ্চা ছেলে, এরকম ্থাকলে কিন্তু এখানে টিকতে পারবেনা। একটু চালু হতে হবে, না হলে সবাই পিছে লাগবে’।

সুবল বলে ওঠে, ‘পিছে লাগবে মানে, আমি কি করতে আছি? দেখবি কয়েকদিনের মধ্যে আমি ওকে এমন চালু করে দেব যে পিছে লাগার ভয়ে তোকেই পালিয়ে বেড়াতে হবে’।

‘আচ্ছা দেখা যাবে তোমার সাকরেদের কেরামতি। আজ আমার কিছু কাজ আছে। উঠি তাহলে’।

রত্না উঠে যায়। সুবল ওয়েটারকে ডেকে আরো দু কাপ কফির অর্ডার দেয়। সমরদের পাশের টেবিলে বেশ বড় একটা জটলা। খেলাধূলা, সিনেমা, রাজনীতি সবকিছু নিয়ে জোর আলোচনা চলছে। ওদের সুন্দর কথাবার্তা শুনতে শুনতে সমর নিজের আনাড়িপনার কথা ভুলে যায়।

ট্রামে চেপে দিদির বাড়ি ফিরতে ফিরতে সমরের মনটা আনন্দে ভরে ওঠে। সমর নিশ্চয় একদিন ও-সব ছেলেমেয়েদের সাথে সহজ ভাবে মিশতে পারবে, ওদের আলোচনায় যোগ দিতে পারবা। গড়গড় করে ওদের মত ইংরেজি বলতে পারবে। রত্নার কথা মনে হতেই অদ্ভুত একটা শিহরন জাগে সারা শরিরে, শরীর অস্বস্তিকর ভাবে শক্ত হয়ে ওঠে। সমর তখন লজ্জা পেলেও আড়চোখে দেখেছে। কি সুন্দর দেখতে রত্নাকে। না, যে করেই হোক, স্মার্ট হতেই হবে। রত্নার মত মেয়েদের সাথে আলাপ জমাতে হবে। রাতে শুয়েও খালি রত্নার কথা মনে হয়। ঘুম আসতে চায়না।

IV

প্রথম যেদিন ক্লাশ শুরু হয় সমর কলেজে গিয়ে সুবলকে খোঁজে, কিন্তু অনেকক্ষণ অপেক্ষা করেও সুবলের দেখা মেলেনা। কয়েকদিন আগে রুটিন টুকে নিয়েছিল। প্রত্যেকটা ক্লাশের পাশে কয়েকটা ক্যাপিটাল হরফের ইংরেজি অক্ষর। সমর মাথামুণ্ডু কিছুই বুঝতে পারেনি। সুবলকে না পেয়ে লজ্জার মাথা খেয়ে একটা অচেনা ছেলেকে জিজ্ঞাসা করে জানতে পারল ওগুলো অধ্যাপকদের নামের আদ্যক্ষর। ছেলেটা হেসে সমরের দিকে কেমনভাবে তাকাতেই সমর মাথা নিচু করে তাড়াতাড়ি স্থান ত্যাগ করে নির্দিষ্ট ক্লাশ রুমে গিয়ে বসল। সুবলের উপর খুব রাগ হল। সুবল থাকলে তো এমন অপদস্থ হতে হতনা।

একটু বাদেই অনার্সের ক্লাশ শুরু হল। প্রফেসরের ইংরেজি লেকচার সমর কিছুই বুঝতে পারলনা। সবাই কেমন নোট টুকে নিল। সমর শুধু খাতার পাতায় হিজিবিজি কাটতে লাগল। ক্লাশের শেষে ওধিকাংশ ছেলেমেয়ে নিজেদের মধ্যে গল্প গুজব করতে লাগল। কয়েকজন আবার ইংরেজিতে আলাপ জুড়ল। সমরের নিজেকে ভীষণ অসহায় বোধ হল। এরচেয়ে বরং স্কুলই ভালো ছিল, কত বন্ধুবান্ধব ছিল। হঠাৎ দেখে একটা ধুতি পরা ছেলে কোণার দিকে চুপচাপ বসে আছে। সমরের মতই অবস্থা। পরের ক্লাশের পর এক পিরিয়ড অফ্। মেন বিল্ডিং-এ বাংলা পাশ-এর ক্লাশ। কলেজের মাঠ আর বেকার লেবরেটরির মাঝখান দিয়ে কিছুটা হেঁটে যেতে হবে। যেতে যেতে ধুতি পরা ছেলেটার সাথে সমরের আলাপ হয়ে গেল। নাম তিমির। সমরকে পেয়ে তিমিরও হাঁফ ছেড়ে বাঁচল। তিমির একটা মেসে থাকে। বাড়ি মেদিনিপুর। বাংলা ক্লাশের পর তিমির বিশেষ কাজে চলে গেল। পরের ক্লাশটা ইংরেজি পাস-এর। অন্য ঘরে যেতে যেতে আরো কয়েকটা ছেলে সমরের সাথে সেধে আলাপ করল। সমর তা হলে একা নয়। তার মত অনেক গ্রাম্য আনাড়ি ছেলে আছে। সমরের মনের বল অনেক বেড়ে গেল।

সমর বাংলা ক্লাশে সামনের সিটে বসে মন দিয়ে পড়া শুনল। ইংরেজি ক্লাশে পেছনের দিকে জানলার কাছে বসল। বিশাল ঘরে অসংখ্য ছাত্র-ছাত্রী। পেছনের দিকের ছেলে-মেয়েরা কি করছে অধ্যাপকের পক্ষে দেখা সম্ভব নয়। ঘড়ঘড় শব্দে কলেজ স্ট্রীট দিয়ে ট্রাম বাস ছুটে চলেছে। সমরের ভাবতে অবাক লাগে আজ সে প্রেসিডেন্সি কলেজের ক্লাশে বসে পড়া শুনছে। হ্যারিসন রোডের ওপারের একটা বাড়ির গম্বুজের মত মাথা দুটো পামগাছের মধ্য দিয়ে উঁকি মারছে। সমর ওটাকে নিয়ে খাতায় একটা কবিতা লিখে ফেলল।

“গম্বুজ
কত যুগ ধরে
হেথাকার কত রূপকথা
যদি মনে রাখ বোল একদিন 
নানা রঙে মেশা সেসব কাহিনী।
মনে কর কোনো কোলাহলহীন নিস্তব্ধ রাতে
যখন থেমে যাবে বাস-ট্রাম ব্যস্ত মানুষের
নিরর্থক ছোটাছুটি
থাকব শুধু তুমি আর আমি আর
জোনাকির মতো আলোগুলো আর
সেসব রূপকথার রোমন্থন চুপি চুপি কানে কানে
আর কেউ যেন শুনতে না পায়”।

পাশের ভারিক্কি চেহারার ছেলেটা মাথা নিচু করে একটা গল্পের বই পড়ছিল। সমরের খাতার দিকে হঠাৎ চোখ পড়তেই নিচু স্বরে বলে উঠল, ‘বাঃ তুমিত বেশ ভালো কবিতা লেখ’। সামনের বেঞ্চের ছেলেদের আড়ালে মাথা নিচু করে দুজনের মধ্যে আলাপ জমে ওঠে। ছেলেটার নাম অতীন সমাদ্দার। হিন্দু স্কুল থেকে পাশ করেছে। ইতিহাসে অনার্স নিয়ে পড়ছে।

ইংরেজির পর সেদিন আর কোন ক্লাশ ছিলনা। কমন রুমে বসে সমর আর অতীন অনেকক্ষ্ণণ গল্প করল। কমন রুমের ভিড় একটু কমে আসতেই অতীন স্বর নিচু করে বলল, ‘তুমিত এখানকার ব্যাপার ভালো করে জাননা। তাই তোমাকে কয়েকটা বিষয় একটু জানিয়ে দেওয়া দরকার। যে ছেলেগুলো ইংরেজিতে কথা বলছে, ওরা সিনিয়র কেম্ব্রিজ পাশ করে এসেছে। সব বড়লোকের ছেলে। ওদের সাথে গায়ে পড়ে মিশতে যাবেনা। কয়েকদিন কলেজে আস, নিজেই দেখতে পাবে ওদের খুব দেমাক। আমাদের মত বাংলা মিডিয়ামে পাশ করা ছেলেদের তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করে’। অতীনের এসব কথা সমরের খুব একটা ভালো লাগেনা। কিন্তু তর্ক এড়াতে সমর অতীনের সব কথায় সায় দিয়ে যায়।

ফেরার পথে হাওড়া স্টেশনে কিছুক্ষণ বসে যাত্রীদের ব্যস্ত-সমস্ত ছোটাছুটি দেখতে থাকে। নতুন জীবনের কথা নতুন সব ছেলেদের সাথে পরিচয়ের কথা ভাবতে ভাবতে রোমাঞ্চ জাগে। মনে হয়, ‘স্বপ্ন দেখছি নাত! হয়ত ঘুম ভেঙ্গে দেখব সেই গ্রামের বাড়িতেই আছি’।

পরদিনও সুবল আসেনা। ওদের ক্লাশের একটা সিনিয়র কেম্ব্রিজ গ্রুপের ছেলের সাথে আলাপ হয়। ছেলেটাই আগে থেকে আলাপ করে। ওর নাম মহীতোষ বসু। ছেলেটা বেশ অমায়িক। কি কি বই পড়লে ক্লাশ ফলো করতে সুবিধা হবে সমরকে সব বলে দেয়। বলে, ‘এসব বই ডিপার্টমেন্টাল লাইব্রেরিতেই পাওয়া যাবে। কেনার কোনো দরকার নেই। তারপর ক্লাশের মাঝখানে দুজনে লাইব্রেরিতে গিয়ে কার্ডের জন্য দরখাস্ত করে আসে। লাইব্রেরিয়ান বলেন কার্ড কয়েকদিন পরে পাওয়া যাবে। মহীতোষ প্রথম পাশ সাবজেক্ট বাঙ্গলার বদলে ‘অল্টারনেটিভ ইংলিশ’ নিয়েছে – সংক্ষেপে ‘অলটি’ বলে। মহীতোষ বলে, এসব পাশ ক্লাশ এখন বিশেষ ফলো করার দরকার নেই। পরীক্ষার কয়েকমাস আগে পড়ে নিলেই হবে। তবে অনার্স সাবজেক্টে প্রথম থেকেই জোর দিতে হবে। নাহলে পিছে পড়ে যেতে হবে।

পরের কয়েকদিনও সুবলের দেখা মেলেনা। সমর একটু দুশ্চিন্তাগ্রস্থ হয়, সুবলের অসুখবিসুখ কিছু হলনাত। সুবলের বাড়ির ঠিকানাওতো জানেনা। জানলে একবার ওর বাড়িতে খোঁজ নিত। অনার্সের ক্লাশ শেষ হতেই সমর রোজ কলেজ থেকে বেরিয়ে একা একা কলকাতার পথঘাট চিনতে থাকে। ফুটপাথ থেকে একটা ডায়রেক্টরী কিনে নেয়। ছোট্টো বইটায় কলকাতার সব পথঘাটের হদিস, ট্রাম বাসের নম্বর, সিনেমা হলের নাম ও অন্যান্য বহু তথ্য দেওয়া আছে। সমর মা বাবাকে চিঠিতে কত নতুন নতুন রাশ্তা চিনেছে লিখে জানায়।

সেদিন হাঁটতে হাঁটতে এসপ্ল্যানেড চলে আসে। মেট্রো সিনেমা আর গ্র্যান্ড হোটেল দেখে ভীষণ অবাক লাগে। আগে গ্র্যান্ড হোটেল, মেট্রো সিনেমা এসবের কথা লোকের মুখে শুনেছে, খবরের কাগজে ছবি দেখেছে। আজ নিজে একা একা মেট্রো আর গ্র্যান্ডের সামনে দাঁড়িয়ে সমরের মনে রোমাঞ্চ জাগে। হাঁটতে হাঁটতে সমর নিউ মার্কেটে ঢুকে পড়ে। ঝলমলে মানুষ আর ঝলমলে দোকানপাট দেখতে দেখতে ছোটবেলার কথা মনে পড়ে যায়। সেবার কলকাতা এসে বাবা-মার সাথে ট্যাক্সি করে কয়েকদিন সারা কলকাতা ঘুরে বেড়িয়েছিল। সে দিন ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল আর মিউজিয়াম দেখে নিউ মার্কেটে ঢোকার পর সে কি বৃষ্টি! সারা কলকাতা জলে থই থই। পেট্রোলের একটা অদ্ভূত গন্ধ। গ্রামে ফিরে সমর ভাবত স্বপ্নের মহানগরী কলকাতার গন্ধ ওরকম।

আজ নিউ মার্কেট থেকে বেরিয়ে লিন্ড্সে স্ট্রীটে আসতেই সমর পেট্রোলের গন্ধ পায়। মনে পড়ে যায় সেই স্বপ্নের কলকাতার কথা। আজকের এই বাস্তব কলকাতা স্বপ্নের গন্ধের সাথে মিশে মায়াময় হয়ে ওঠে। সমর এক স্বপ্নের জগতে এলোমেলো হাঁটতে থাকে। কার্জন পার্কের কাছে পৌঁছে এক ভদ্রলোককে প্রশ্ন করে ইডেন গার্ডেনের হদিস জেনে নেয়। ভদ্রলোক ওদিকেই চলেছেন। রঞ্জি স্টেডিয়ামে ওঁদের কোম্পানি কনস্ট্রাকশনের কাজ করছে। চলতে চলতে ভদ্রলোকের সাথে সমরের আলাপ জমে ওঠে। সমরের বাড়ি জলপাইগুড়ি জেলায় শুনে উনি বলেন, ‘আমিওত একসময় ওদিকে ছিলাম। আমবাড়ি ব্যারেজে আমাদের কনস্ট্রাকশনের কাজ ছিল’।

ইডেন গার্ডেনে ঢুকে সমর প্যাগোডার নিচে বসে। বাদাম ভাজা কিনে চিবোতে থাকে। বাবার সাথে সেবার যখন এখানে এসেছিল, এই প্যাগোডার সামনে পুলিশরা সুন্দর ব্যান্ড বাজাচ্ছিল। জলাশয়ে ছোট ছোট নৌকা দাঁড় বাইছিল। সমরের ইচ্ছা হয়েছিল নৌকায় চড়ার। বাবা ওর ইচ্ছার কথা শুনে বলেছিলেন, ‘ওদের গিয়ে বলো, তোমাকে নৌকায় চড়িয়ে দেবে’। সমর সাহস করে বলতে পারেনি। এখানে বসে বাদাম ভাজা খেতে খেতে সমরের সেসব দিনের কথা মনে পড়ে যায়।

চারিদিকে ছেলেমেয়েরা জোড়ায় জোড়ায় ঘনিষ্ট হয়ে বসে প্রেমালাপ করছে। সমরের ইচ্ছা করে ওদের মত প্রেম করতে। কলেজে কত সুন্দর সুন্দর মেয়ে। সমরের ওদের কথা ভাবতে খুব ভালো লাগে। কিন্তু এখনো কোন মেয়ের সাথে সেরকম আলাপ জমিয়ে তুলতে পারেনি। বড্ড লজ্জা করে। আরো স্মার্ট না হলে, সুবলের মত সুন্দর কথা বলতে না পারলে মেয়েদের সাথে ভাব জমানো যাবেনা। সমর ভাবে একদিন সেও পারবে। এখানে দুজনে পা ছড়িয়ে বসে বাদাম ভাজা খাবে আর সারাদিন ওই ছেলেমেয়েগুলোর মত এখানে বসে গল্প করবে। এসব ভেবে সমরের মনে রোমাঞ্চ জাগে।

দিন সাতেক পরে সুবল প্রথম কলেজে এল। সুবলকে দেখে সমর হাঁফ ছেড়ে বাঁচল। এর মধ্যে বেশ কয়েকজনের সাথে অবশ্য কিছুটা আলাপ হয়েছে। তবে অতীন ছাড়া আর সকলেই গ্রাম থেকে এসেছে, সমরের মতই লাজুক আর মুখচোরা। অতীনকে সমরের তেমন ভালো লাগেনা। মুখ ভোতকা আর অন্যের নিন্দা করতে ভালোবাসে। সুবলের কোনো তুলনাই হয়না। মাত্র কয়েকদিনেরতো আলাপ। অথচ মনে হচ্ছে যেন কত যুগের পরিচয়। সমরকে দেখেই সুবল উচ্ছ্বসিত হয়ে ওঠে। স্বকীয় ভঙ্গিতে হাত নেড়ে হাসতে হাসতে বলে, ‘কি গুরু কেমন চলছে, কোন ধামড়া মেয়ে আবার পিছে লাগেনিত?’

সেকেন্ড ইয়ারের একটা স্মার্ট ছেলে হেসে বলে, ‘মেয়েরা ওর পিছে লাগবে কি রে! দুদিন সবুর কর, দেখবি এই পুঁচকে ছোঁড়াই মেয়েদের পিছে লেগে লেগে ওদের অতিষ্ঠ করে তুলছে। আমরাওতো প্রথম দিকে গোবেচারা ছিলাম’। ছেলেটার মন্তব্যে সমরও হেসে ওঠে। সুবলের সাথে সিঁডি বেয়ে দোতলায় উঠতে উঠতে অভিযোগের সুরে বলে, ‘তুমি এতদিন কলেজে আসনি কেন? আমি রোজ খোঁজ করতাম’। সুবল হেসে বলে, ‘কি করব বল। বর্ধমানে এক আত্মীয়ের বাড়ি গিয়ে আটকে পড়লাম। আজতো অনার্স ক্লাশ হচ্ছে না। চল ইংরেজির পাশ ক্লাশে রেসপন্ড করে কেটে পড়ি’। অনেক ছেলেকেই সমর ক্লাশ কাটতে দেখেছে। সমর ভাবে ইংরেজি ক্লাশ কাটতে পারলে মন্দ হয়না। তবে কেমন ভয় করে, যদি ধরা পড়ে যায়। সেদিন একটা ছেলে ক্লাশ কাটতে গিয়ে ধরা পড়ে গেল। স্যার হেসে বললেন, ‘you should have gone on all fours’।

সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে দুটো ছেলে বলল, ‘কি রে সুবল, ইংরেজি ক্লাশে যাচ্ছিস তো? আমাদের দুটো প্রক্সি দিয়ে দিবি’। সুবল ওদের রোল নম্বর কাগজে টুকে নিল। ক্লাশের পেছন দিকে বসে গলার স্বর বদলে সুবল কি সুন্দর প্রক্সি দিল। আর সমর নিজেরটায় সাড়া দিতেই হিমসিম খেয়ে যায়। ভয় হয় কখন নিজের রোল নম্বরটা চলে যাবে, রেসপন্ড করা হবেনা। রোল কল সেরে স্যার বইয়ের পাতায় তাকাতেই সমরকে ইশারা করে সুবল পেছনের দরজা দিয়ে টুক করে বেরিয়ে গেল। সমরও সাহস করে বেরিয়ে পড়ে। দরজার পাশের একটা ছেলে ভিতর থেকেই মন্তব্য করে, ‘চ্যাংড়া দুদিনেই খুব চালু হয়ে গেছেত!’ সফল ভাবে ক্লাশ কাটতে পেরে সমরের নিজেকে কেমন হিরো হিরো মনে হয়।

রাজ রেস্টুরেন্টে ঢুকে সুবল কচুরির অর্ডার দেয়। ডালের তরকারিটা খুব সুস্বাদু। ওরা খাচ্ছে, এমন সময় দুদিক থেকে দুটো হাত এসে সমর আর সুবলের পাত থেকে একটা করে কচুরি তুলে নিল। একটা খুব রোগা, হ্যান্ডলুমের পাঞ্জাবি পরা ছেলে সুবলের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘শালা, এই বাচ্চা ছেলেটাকে খারাপ না করে ছাড়বিনা দেখছি’। সমরের দিকে ফিরে বলল, ‘এই হারামজাদাটার সাথে বেশি মিশবেনা। কোন সময় একটা ধামড়া মাগীর পাল্লায় ফেলে দেবে; একদম ভ্যানিটি ব্যাগে পুরে নিয়ে যাবে’। ছেলেটার কথা শুনে সমর হো হো করে হেসে ওঠে। পাশের ছেলেটাও হ্যান্ডলুমের পাঞ্জাবি পরেছে। স্বাস্থ্য বেশ ভালো। সমরের দিকে চেয়ে মোলায়েম স্বরে বলে, ‘ভাই কচুরি খেয়ে নিলাম, রাগ করলেনাত?’ সমর সপ্রতিভ ভাবে বলে, ‘এতে রাগ করার কি আছে। আপনারাও বসুননা, আমি খাওয়াচ্ছি’। ছেলেটা হেসে বলে, ‘পরে একদিন খাইও, আজ তাড়া আছে’। সুবলকে লক্ষ্য করে বলে, ‘সুবল, তোকে এবার ক্লাশ রিপ্রেসেন্টেটিভ হয়ে সামনের ইউনিয়ন ইলেকশানে দাঁড়াতে হবে। বিশেষ করে মেয়েদের ভোটগুলোর জন্য তোর উপর ভরসা করছি। সব ইয়ারের মেয়েদের সাথেই তো তোর ফষ্টি-নষ্টি’।

সুবল হেসে বলে, ‘তুমিও গুরু মাগিবাজীতে কম যাওনা!’ রোগা ছেলেটাকে উদ্দেশ্য করে বলে, ‘বেচু তুই এবার দাঁড়াচ্ছিসনা?’  

বেচু বলে, ‘তেমন ইচ্ছা নেই’।

‘এস.এফ. এর পোজিশন কিরকম বুঝছিস?’

‘খুব ভালো। এবার শালা পি.সি.এস.ও. কে ঘাড় ধরে তাড়াচ্ছি। ভালো কথা, আজ স্বর্ণময়ীতে একটা মিটিং আছে। তুই অবশ্যই আসবি, আর এই ছেলেটাকেও নিয়ে যাবি। আচ্ছা তোমার নাম কি ভাই?’

সমর সপ্রতিভ ভাবে উত্তর দেয়, ‘সমর দত্ত’।

‘সমর তুমিও আজ মিটিং এ যাবে কিন্তু’।

ওরা চলে যেতেই সমর প্রশ্ন করে, ‘সুবল তুমি পলিটিকস করো নাকি। ওরাতো কমিউনিস্ট পার্টি করে। তুমিও কমিউনিস্ট নাকি?’

সুবল আশ্বাসের সুরে বলে, ‘শুধু সমর্থন করি। বেচু নামের ছেলেটা সিরিয়াসলি পার্টি করে। শুনেছি বড়লোকের ছেলে; ওর বাবা কংগ্রেসের নেতা। তবে বাড়ির সাথে কোন সম্পর্ক রাখেনা’।

‘তুমি কমিউনিস্টদের সমর্থন করো কেন? কমিউনিস্টরাতো খুব খারাপ’।

‘তোমায় কে বলল খারাপ?’

‘ছোটোবেলা থেকে বাড়ির সকলের কাছে শুনে আসছি। তা ছাড়া এইতো কিছুদিন আগেই কমিউনিস্ট চীন আমাদের দেশ আক্রমণ করেছিল। এখানকার বেশিরভাগ কমিউনিস্টতো চীনকে সমর্থন করেছিল’।

‘আমার দাদারাও ওরকম বলে থাকেন। কিন্তু ওসব ভুল ধারনা। তোমাকে একদিন সব বুঝিয়ে বলব। অনেক সময় লাগবে। আজ এখনই মিটিং-এ যেতে হবে। তুমি যাবে?’

‘আজ পারবানা, সেই শিবপুরে যেতে হবে। মিটিঙে গেলে ফিরতে অনেক রাত হয়ে যাবে। দিদি চিন্তা করবেন’।

‘ঠিক আছে। পরে একদিন কিন্তু তোমাকে মিটিং-এ নিয়ে যাব। যাবেতো?’

‘নিশ্চয় যাব। তবে আজকের মত সন্ধ্যায় মিটিং হলে যেতে পারবনা’।

‘দুপুরের দিকেওতো অনেক মিটিং হয়। তোমাকে সেরকম কোন মিটিং-এই নিয়ে যাব। এখন তুমি সামনে থেকে হাওড়ার বাসে উঠে পড়, আমি হেঁটে স্বর্ণময়ী চলে যাব। বেশি দূর না’।

ফেরার পথে সমরের মনে নানা প্রশ্ন জাগে। সুবল তাহলে কমিউনিস্টদের সমর্থন করে। এতদিনতো জানত কমিউনিস্টরা খুব খারাপ। সুবল আজ বলল ওটা নাকি ভুল ধারণা। সুবলের কাছে একদিন শুনতে হবে আসল ব্যাপারটা কি। আজকাল অবশ্য অনেক লোকই কমিউনিস্টদের সমর্থন করছে। সেদিন এক ভদ্রলোক বলছিলেন এরপর নাকি ইলেকশান হলে কমিউনিস্টরা জিতে যাবে। তাই কংগ্রেস আর ইলেকশান হতে দেবেনা। ভদ্রলোক বলছিলেন এতদিন কমিউনিস্টদের সম্বন্ধে অপপ্রচারে বেশিরভাগ লোক বিশ্বাস করত। কংগ্রেসের উপর তাদের বিরাট একটা মোহ ছিল। কিন্তু এখন চিত্রটা সম্পূর্ণ বদলে গেছে। এতদিন দেশ স্বাধীন হয়েছে অথচ দেশের আসল উন্নতি বলতে কিছুই হয়নি। গরীবরা আরো গরীব হয়েছে, আর জোতদার, কালোবাজারি, মজুতদাররা ফুলে ফেঁপে উঠেছে। খাদ্য সমস্যা, বেকার সমস্যা আরো বেড়েছে, জিনিসপত্রের দাম হুহু করে বাড়ছে। এদিকে কংগ্রেসের তাবড় তাবড় নেতারা মুখে দেশপ্রেম আর জনদরদের বুলি আওড়াচ্ছেন আর আসলে নিজেদের গদি সামলাতে আর আখের গোছাতে ব্যস্ত থাকছেন। সাধারণ মানুষকে আর কতদিন ভাঁওতা দিয়ে বোকা বানিয়ে রাখা যাবে। তাই ধীরে ধীরে লোকে কংগ্রেসের উপর আস্থা হারিয়ে কমিউনিস্টদের সমর্থন করছে। সমর ভাবে কথাগুলো মোটেই অযৌক্তিক নয়। সুবলওতো একই ধরণের কথা বলছিল। তবে কমিউনিস্টদেরও কি বিশ্বাস করা যায়? বেচু আর কলেজের আর কয়েকটা সি.পি.এম.-এর ছেলে অবশ্য ভাল। কিন্তু সমর ওদের গ্রামে যেসব সি.পি.এম.-এর লোকদের দেখেছে তারা মোটেই সুবিধার নয়। কংগ্রেসের অবস্থা সুবিধার নয় দেখে অনেক অসৎ ব্যবসায়ী আর জোতদার ভোল পালটে সি.পি.এম. হয়ে যাচ্ছে। সি.পি.এম. এর বেশিরভাগ নেতাইতো এধরনের। সমর সি.পি.আই. এর কিছু নেতাকেও দেখেছে। সবাই শিক্ষিত ভদ্রলোক, মার্কসিজ্ম নিয়ে প্রচুর পড়াশোনা করেছেন। সব সৌখিন কমিউনিষ্ট, বাস্তব জগতের সাথে কোনো সম্পর্ক নেই। না এসব ভেবে সমরের কোন লাভ নেই, ওতো আর পার্টি করতে যাচ্ছেনা। যেই ক্ষমতায় আসুকনা কেন, সমরের ভবিষ্যত তো তাকে নিজে গড়ে নিতে হবে।

অবশ্য কলেজের ব্যাপারে সমর মত ঠিক করে ফেলেছে। নিজেদের ক্লাশ রিপ্রেজেন্টেটিভ এর ব্যাপারে সুবলকে ছাড়া আর কাউকে ভোট দেওয়ার প্রশ্নই ওঠেনা, সুবল অন্য দলের হলেও সমর ওকেই ভোট দিত। তবে সাধারণ ভাবে সমর বেচুদেরই সমর্থন করবে।

পি.সি.এস.ও.-র ছেলেমেয়েরা মুলত সিনিয়র কেম্ব্রিজ পাশ করা বড়লোকের ছেলে। কিছু কিছু ছেলেমেয়ে বেশ অমায়িক হলেও বেশিরভাগই নাকউঁচু, নিজেদের গ্রুপের বাইরে কারো সাথে ভালো করে মিশতে চায়না। সাধারণ বাংলা মিডিয়ামে পড়া ছেলেমেয়েরা কথা বলতে গেলে বেশ তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করে। অতীন ভুল বলেনি। কলেজে আসলে দুটো স্পষ্ট ভাগ হয়ে গেছে। একদিকে বাংলা মিডিয়ামে পড়া নিম্ন মধ্যবিত্ত ঘরের ছেলেমেয়ে আর অন্যদিকে ইংরেজি মিডিয়ামে পড়া উচ্চ মধ্যবিত্ত ও ধনী পরিবারের ছেলেমেয়ে। এস.এফ. আর পি.সি.এস.ও.র রাজনৈতিক লড়াই না থাকলেও এই বিভাজনটা থেকেই যেত। হয়তোবা প্রথম যুগ থেকেই এর অস্তিত্ব রয়ে গেছে।

নাঃ এসব কথা ভেবে সমরের কোনো লাভ নেই। শুধু সময় নষ্ট হবে আর মানসিক উত্তেজনা বাড়বে। বাবা—মা কত আশা করে কলকাতায় পড়তে পাঠিয়েছন। সমরকে অনেক বড় হতে হবে। রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়ে নিজের ভবিষ্যত নষ্ট করতে পারবেনা। সুবলকে স্পষ্ট করে জানিয়ে দেবে কোন মিটিং ফিটিং এ যেতে পারবেনা।

বাসায় ফিরে দেখে পাশের বাড়ির মেয়েটা রান্না ঘরে দিদির সাথে গল্প করছে। ইলেভেন ক্লাশে পড়ে। দিদি মেয়েটার কথা বলেছিলেন।

সমরের সাথে আলাপ করতে চেয়েছে। জামা কাপড় ছেড়ে সমর রান্না ঘরের সামনে  যায়। দিদি বলেন, ‘এত দেরি হল কেন? আমি কখন থেকে খাওয়ার নিয়ে বসে আছি। তাড়াতাড়ি খেয়ে নে। এই আরতির কথা তোকে বলেছিলাম’। সমর তাকাতেই মেয়েটার সাথে চোখাচোখি হয়। সমর চোখ নামায়। বেশ ফর্সা, শ্লিম শরীর। মুখের আদল তেমন ভালোনা। গোলচে মঙ্গোলীয় ধাঁচের। দুই গালে ব্রণর দাগ। মেয়েটা সপ্রতিভ ভাবে বলে, ‘আপনার সাথে আলাপ করতে চেয়েছিলাম। আপনিত সব সময় পড়া নিয়ে ব্যস্ত থাকেন। কথা বলার সময়ই পাননা’। সমর আমতা আমতা করে বলে, ‘না না সময় পাবনা কেন?’ কথা বলতে গিয়ে সমরের গলার স্বর কেঁপে যায়। মেয়েদের সাথে কথা বলতে গেলেই এরকম হয়। বেশ নার্ভাস বোধ হয়। অথচ শহরের ছেলেমেয়েগুলো কেমন সপ্রতিভ। এই মেয়েটা অচেনা সমরের সাথে কেমন স্মার্টলি কথা বলে গেল।

খাওয়া সেরে সমর আরতির সাথে কিছুক্ষণ গল্প করে। কিছুটা কথা বলার পর অনেকটা সহজ বোধ করতে থাকে। আরতি প্রেসিডেন্সি কলেজ সম্বন্ধে অনেক কিছু জানতে চায়। ওরও ইচ্ছা প্রেসিডেন্সিতে পড়ার। আরতি বলে ‘কিন্তু আমিকি হায়ার সেকেন্ডারি পরীক্ষায় অত ভালো রেজাল্ট করতে পারব?’ সমর বলে, ‘চেষ্টা করলে নিশ্চয় পারবে’। আরতি অদ্ভূতভাবে চোখ মুখ নাচিয়ে শরীর দুলিয়ে বলে ‘বললেইত হোলনা মশাই; আমিত আপনার মত ব্রিলিয়ান্ট নই’। এভাবে কথা বলতে গিয়ে আরতির শাড়ির আঁচল খসে পড়ে। গলার নিচে সুপুষ্ট স্তন যুগলের ভাঁজ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। সমর চকিতে মুখ ঘুরিয়ে নেয়। নাঃ, মেয়েদের সাথে সহজ হতে সমরের অনেক সময় লাগবে। আরতির মা ডাকায় সেদিনের মত আর কথা হয়না। আরতি বলে পরদিন আবার আসবে।

রাত্রে শুয়ে সমরের বার বার আরতির কথা মনে হতে থাকে। ন্যাকা ন্যাকা কথা গুলো স্পষ্ট মনে পড়ে যায়। চোখের সামনে ভেসে ওঠে আরতির গোলাকার ফর্সা মুখ, হাসিমাখা ছোট ছোট চোখ আর নিটোল স্তনযুগলের ভাঁজ। সমর আবার সেই অস্বস্তিটা বোধ করে।

কয়েকদিনের মধ্যে আরতির সাথে আলাপ বেশ জমে ওঠে। রোজ বিকেলে আরতি আসে। কলেজ থেকে ফেরার পর আরতি আর ভাগ্নে ভাগ্নীর সাথে ক্যারাম খেলে। আরতির সাথে সমরের নানান বিষয়ে গল্প হয়। আরতি বলে, ‘ইস্, যদি আপনার মত ব্রিলিয়ান্ট হতাম!’

সমর হেসে বলে, ‘হওনা, কে বারণ করেছে?’

আরতি আগের মতোই শরীর দুলিয়ে, বুকের আঁচল ফেলে বলে, ‘আপনি বললেই তো আর হয়ে যাবনা’।

‘তাহলে ওসব কথা ভেবে কি লাভ? বরং এক কাজ করতে পার, বুদ্ধু হয়ে যাও, সেটা তোমার পক্ষে অনেক সহজ হবে’।

আরতি কপট রাগ দেখিয়ে বলে, ‘ভালো হবেনা কিন্তু, আমাকে আপনি বুদ্ধু বললেন’।

সমর হেসে বলে, ‘তুমি বুদ্ধু তাতো আমি বলিনি। শুধু বুদ্ধু হয়ে যেতে বলেছি’।

‘আমি বুদ্ধু হলে আপনার কি লাভ?’

‘তোমাকে ঠকাতে পারব’।

‘তাই বুঝি, মেয়েদের ঠকানোর আপনার বুঝি খুব ইচ্ছা’।

‘সব মেয়েদের কথাত আমি বলিনি, শুধু তোমার কথা বলেছি’।

আরতি কোন উত্তর দেয়না। কেমন এক অদ্ভূত চাহনি মেলে সমরের দিকে চেয়ে থাকে। সমরের মনেও  কেমন একটা অপরিচিত আনন্দের শিহরণ জাগে।

লাইব্রেরি থেকে কিছু বই পড়ার পর সমরের এখন ক্লাশ ফলো করতে আর বিশেষ অসুবিধা হয়না। সুবলের সাথে রাজনীতি নিয়ে অনেক আলাপ হয়েছে। কমিউনিস্টদের আত্মত্যাগের অনেক কাহিনী বলেছে সুবল। দেশ বিদেশের নিপীড়িত মানুষদের সংগ্রামের গল্প বলেছে। রূপকথার মত সেসব কাহিনী শুনতে সমরের খুব ভালো লেগেছে। তবু সমর বলেছে সে সরাসরি রাজনীতি করতে পারবেনা। তবে কলেজের ইলেকশানে এস.এফ.কেই সমর্থন করবে। সমরকে একা পেয়ে সিনিয়র কেম্ব্রিজ গ্রুপের মহীতোষ একদিন বলে, ‘আমি এবার পি.সি.এস.ও. থেকে ক্লাশ রিপ্রেজেন্টেটিভ হিসাবে দাঁড়াচ্ছি। আশা করছি তোমার ভোটটা পাব। জানি সুবল তোমার সবচেয়ে প্রিয় বন্ধু। কিন্তু সুবল এস.এফ. এর হয়ে দাঁড়াচ্ছে, আর এস.এফ. মানেইতো সি.পি.এম। সুবল আসলে হুজুগে পড়ে দাঁড়াচ্ছে। ওর মত ছেলে কখনোই কমিউনিস্টদের সমর্থক হতে পারেনা’। সমর চুপচাপ থাকে, মহীতোষের কথার কোন প্রতিবাদ করেনা। কি লাভ শুধু শুধু কথা বাড়িয়ে।

মহীতোষ বেশ কিছুক্ষন ধরে কমিউনিস্টদের কুকীর্তির কথা বলে যায়। ওর মতে সবচেয়ে বড় কথা হল, ওদের কাছে সব কিছুর চেয়ে পার্টি বড়। বাবা-মা-ভাই-বোন, মানুশ সব কিছুর উপরে পার্টি। আগে দলের স্বার্থ তার পরে অন্য কিছু। মহীতোষ হাওয়ার্ড ফাস্ট আর সিনক্লেয়ার লিউইস কেন কমিউনিস্ট পার্টি ছেড়েছিলেন সে কাহিনী বলে, ভারতের স্বাধীনতা আন্দোললের সময় কি ভাবে কমিউনিস্টরা দেশ বিরোধী কাজ করেছে তার অনেক দৃস্টান্ত দেয়, স্তালিনের কনসেনট্রেশান ক্যাম্পের ভয়াবহ কাহিনী বলে। মহীতোষের কাছ থেকে সমর অনেক অজানা তথ্য জানতে পারে। তবে কলেজের ছাত্র সংসদ নির্বাচনের ক্ষেত্রেতো এসব বিষয় বিচার্য নয়। তা ছাড়া সুবল যেখানে দাঁড়াচ্ছে সেখানে অন্য কাউকে ভোট দেওয়ার কোন প্রশ্নই ওঠেনা। তবু সমর মুখে বলে যে সে মহীতোষকে ভোট দেবে। 

সুবল সহজ ভাবে সবার সাথে মেশে, হাসি তামাসা করে। সিনিয়র কেম্ব্রিজ গ্রুপের সবার সাথেও ওর বেশ ভাব। বিশেষ করে ওদের দলের মেয়েদের কাছেত সুবল খুবই জনপ্রিয়। সুবলের আদি রসাত্মক চুটকি শোনার জন্য বড়লোকের মেয়েগুলো সুবলের চারপাশে ভিড় জমায়। বেচুর বন্ধুরা সুবলকে ঠাট্টা করে বলে, ‘কিরে শালা, ওই মাগীগুলোর পাল্লায় পড়ে আবার ওদের দলে ভিড়ে যাবিনাতো’। সুবল তাচ্ছিল্যের সঙ্গে বলে ওঠে, ‘দেখিস বরং উল্টোটাই হবে, আমি ওদের অনেক ভোট ভাঙিয়ে আনব’।  

মহীতোষের সাথে সুবলের একদিন জোর তর্ক বেধে যায়। মহীতোষ বলে, ‘এবার এস.এফ. একটাও ভোট পাবেনা’।

সুবল হেসে উত্তর দেয়, ‘তুই বেট রাখ, পি.সি.এস.ও. এবার হারবেই। শুধু এ কলেজে কেন অন্য সব কলেজেও এস.এফ. জিতবে। আমি বলে রাখলাম, দু এক বছরের মধ্যে তোদের পেরেন্ট অরগানাইজেশন ছাত্র পরিষদ পশ্চিমবঙ্গের সব কলেজ থেকে মুছে যাবে’।

মহীতোষ বলে, ‘রেখে দে ওসব গালগল্প। অবশ্য ফাঁকা কল্পনায় দোষ কি? সেটাই কর ভাই, জিততেতো পারবিনা’। ওদের মধ্যে তর্কই হয় শুধু। রাগারাগি বা ব্যক্তিগত আক্রমণ হয়না।

সমর এখন নতুন পরিবেশের সাথে অনেকটা খাপ খাইয়ে নিতে পারলেও অনেক সময় এখনো কলকাতা আর প্রেসিডেন্সির পরিবেশের সাথে নিজেকে বেমানান মনে হয়। ডায়রীতে লেখেঃ

গ্রামের শান্ত পরিবেশে আমি ছিলাম খুবই একটা লাজুক ছেলে। আমার স্কুলের সহপাঠীদের অনেকেই মেয়েদের সাথে সহজ ভাবে মিশলেও আমি পারতামনা। নার্ভাস আর জড়তা বোধ করতাম। ক্লাশের ফার্স্ট বয় বলে সবাই খাতির করত। কিছু কিছু মেয়ে আমার সাথে আলাপ করারও চেষ্টা করেছে, কিন্তু আমার জড়তার জন্য আলাপ-পরিচয় জমে উঠতে পারেনি। ওদের সবার ধারণা জন্মে যায় আমার খুব গর্ব, তাই ওদের সাথে মিশতে চাইনা। আসল ব্যাপারটা ওরা কেউ বুঝতে পারেনা। অবশ্য আমার কিছুটা গর্ব যে ছিলনা তা নয়। কলকাতায় এসে দেখলাম এক নতুন দুনিয়া, প্রেসিডেন্সিতে আমার চেয়ে অনেক অনেক ভালো ছেলে মেয়ের ছড়াছড়ি। আমার গর্ববোধ নিমেষে ভেঙ্গে গেল। যে লাজুক স্বভাব নিয়ে গ্রামের পরিবেশে কোন অসুবিধাই বোধ করিনি সেই স্বভাবের জন্যই এখানে এসে প্রথমে খুব অসহায় বোধ করতাম। এখন অনেক সামলে উঠেছি। তবুও অনেক কিছু শেখার আছে। এ ব্যাপারে সুবলের বন্ধুত্ব আমাকে ভীষণ ভাবে সাহায্য করছে।ওর কাছ থেকে আরো অনেক কিছু শেখার আছে। আরতির সাথে গল্প করেও অনেক উপকার পেয়েছি। মেয়েদের সান্নিধ্যে সেই জড়তা এখন আর নেই। কলকাতার পথঘাট সব চিনিনা। রোড ডায়রি দেখে আর হেঁটে হেঁটে নতুন নতুন রাস্তা চিনতে হবে। ভিড় রাস্তায় চলতে অনেক সময় নার্ভাস বোধ করি। এ ত্রুটি কাটিয়ে উঠতে হবে। সুবলের সাথে কলকাতার পত্থে অনেক বেড়িয়েছি, ট্রামে-বাসে চড়েছি, রেস্টুরেন্ট-সিনেমা হলে গেছি। সুবল সব বিষয়ে কেমন স্মার্ট। আমাকেও ওরকম স্মার্ট হতে হবে। সুবল খুব রসিক। সবার সাথে জমিয়ে আড্ডা দিতে পারে। আমাকেও এসব শিখতে হবে। ভালো দর্জির কাছ থেকে শার্ট প্যান্ট বানাতে হবে, ভালো সেলুন থেকে চুল কাটতে হবে যাতে চেহারায় গেঁয়ো ভাবটা আর না থাকে। সুবলের সাথে ইংরেজিতে কথা বলা অভ্যাস করতে হবে।

V

কলেজের ছাত্র সংসদের নির্বাচন শান্তিপূর্ণ ভাবেই শেষ হল। সামান্য কিছু ঝগড়াঝাটি ছাড়া আর বিশেষ কিছু গন্ডগোল হলনা। সেদিনই ফল ঘোষনা হল। সুবল অনেক ভোটের ব্যবধানে জিতল। বোঝা গেল ওদের দলের কিছু মেয়েও সুবলকে ভোট দিয়েছে। মোটের উপর বেশি আসন পেয়ে এস.এফ. ছাত্র সংসদ দখল করল। পি.সি.এস.ও.র দীর্ঘ দিনের রাজত্বের অবসান হল। পি.সি.এস.ও.র ছেলে মেয়েরাও বেচুদের ভদ্রতা করে অভিনন্দন জানাল। বলল, ‘নির্বাচনে প্রতিযোগিতা হলেও আমাদের মধ্যে যেন কোনো শত্রুতা বা মনোমালিন্য না থাকে। নির্বাচনে হার জিততো আছেই’। সকলের এই সুন্দর মনোভাব দেখে সমরের খুব ভালো লাগল।

পরের দিন এস.এফ. এর বিজয় উৎসব হল। এস.এফ. এর ছেলেরা খুব হৈহুল্লোড় করল। বেচু, সুবল ও আরো অনেকে বক্তৃতা দিল। সমর চুপচাপ একপাশে দাঁড়িয়ে বক্তৃতা শুনল। বেচুর বক্তৃতা সবচেয়ে ভালো লাগলো। ওর গালার স্বর ভারিক্কি আর যুক্তিগুলোও তীক্ষ্ণ। অনেক কঠিন বিষয়কে জলের মত সহজ করে বলল। বেচু নানা দৃষ্টান্ত উল্লেখ করে বোঝাতে চাইল কি করে স্বাধীনতার পর থেকে দেশের অর্থনৈতিক অবস্থার অবনতি ঘটেছে। সাধারণ মানুষ, কৃষক, শ্রমিক সকলের দুরবস্থা দিনের পর দিন বেড়ে চলেছে অথচ কংগ্রেসের পাণ্ডা, জোতদার, পূঁজিপতি আর কালোবাজারীরা ফুলে ফেঁপে উঠছে। সাধারণ মানুষ কোন ন্যায্য দাবি নিয়ে অথবা অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে যখনই আন্দোলনে নেমেছে, পুলিশ আর কংগ্রেসের পোষা গুণ্ডারা তাদের উপর অমানুষিক অত্যাচার করেছে। অসংখ্য কমিউনিস্টকে বিনা কারণে জেলে পুরেছে প্রতিক্রিয়াশীল কংগ্রেস সরকার। আজ সেসব অন্যায় অবিচারের, শোষনের দিনের অবসান হতে চলেছে। সাধারণ মানুষকে আর ভাঁওতা দিয়ে বোকা বানানো যাবেনা। সাধারণ মানুষ আজ সচেতন হয়ে উঠছে, সব কিছু বুঝতে শিখছে। প্রেসিডেন্সি কলেজের মত প্রতিক্রিয়াশীলদের ঘাঁটিতে ছাত্র ফেডারেশন এর বিরাট জয় আগামী দিনে সমগ্র দেশে যুগান্তকারী পরিবর্তনের সংকেত বহন করছে। 

দু একদিন পরে মহীতোষ কথা রেখে সুবলকে বাজির টাকা দিতে গেল। সুবল বলল, ‘বেটা টাকা দিয়ে কি হবে। বরং আমাদের দুজনকে খাইয়ে দে’।

মহীতোষ বলল, ‘চল আজকে এসপ্ল্যানেডের কোন রেস্তোরাঁতে যাওয়া যাক’। সমর সুবলকে কানে কানে প্রশ্ন করল রেস্তোরাঁ কি। সুবল বলল আসলে রেস্টুরেন্টের আসল ফরাসী উচ্চারণ রেস্তোরাঁ। ইংরেজি পদ্ধতিতে আমরা রেস্টুরেন্ট বললেও আজকাল অনেকেই আসল ফরাসী উচ্চারণটাই ব্যবহার করছে। ওরা মহীতোষের বিশাল ডোসেটো গাড়িতে উঠতে যাবে এমন সময় রত্না এসে হাজির। অনেক দিন বাদে রত্নাকে দেখে সমরের দেহেমনে রোমাঞ্চ খেলে গেল। একটা কচি কলাপাতা ওঙের শাড়িতে ওকে অপূর্ব লাগছে। গাড়িতে উঠে মহীতোষ সুবলকে প্রশ্ন করল, ‘কোথায় যাওয়া যায় বল্ত?’সুবল একটু চিন্তা করে বলল, ‘আমজাদিয়া বা আমিনা’।

রত্না বলে উঠল, ‘অনাদিতে গিয়ে মোগলাই খেলে কেমন হয়?’

সুবল আর মহীতোষ একসাথে বলে উঠল, ‘দারুন প্রপোজাল। অনাদির মোগলাইয়ের কোনো তুলনাই হয়না’।

রেস্তোরাঁয় মোগলাই খেতে খেতে জমজমাট আড্ডা চলল। সমরও সপ্রতিভ ভাবে হাসি ঠাট্টায় যোগ দিল। ফেরার আগে সুবল সমরকে একপাশে ডেকে নিয়ে বলল পরের রবিবার সকালে ওর বাড়ি যেতে। ওর বাড়িতেই দুপুরে খেতে। পড়াশোনার ব্যাপারে ওরা কিছু সিরিয়াস আলোচলা করবে।

পরের রবিবার সমর খুব সকালে সুবলের বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দেয়। আগেই কথা ছিল সেদিন সামনের পার্ট ওয়ান পরীক্ষার পড়ার ব্যাপারটা দুজনে বসে ঠিক করে নেবে। এখন থেকেই রুটিন করে না পড়লে পরীক্ষায় ভালো ফল করা যাবেনা। সুবল স্বকীয় ভঙ্গিতে হাত নেড়ে বলেছিল, ‘গুরু, আমাদের দুজনেরই ফার্স্ট ক্লাশ পেতেই হবে। এখন থেকে ঠিক মত পড়াশুনা চালিয়ে গেলে ম্যানেজ হয়ে যাবে। কয়েক জন ফার্স্ট ক্লাশ পাওয়া সিনিয়র ছেলেদের নোটও যোগাড় করেছি। ওগুলো নিজেদের মত করে তৈরি করে নিতে হবে। বিদেশ যেতে হলে বি.এ., এম.এ. দুটোতেই ফার্স্টক্লাশ দরকার’। সমরের মনেও অনেক আশা ফার্স্ট ক্লাশ পেয়ে বিদেশে পড়তে যাওয়ার। কিন্তু সুবলের মত অসাধারণ ছেলের পক্ষে যেটা সহজ ব্যাপার সমরের পক্ষে সেটা বেশ কঠিন কাজ। তবে ঠিকমত পড়াশুনা করলে হয়ত ব্যাপারটা অসম্ভব নয়।

সুবলের বাড়ি পৌঁছতে প্রায় দশটা বেজে গেল। বাইরে তখন এপ্রিলের ঝাঁ ঝাঁ রোদ। সুবলের একতলার ঘরটা অবশ্য বেশ আরাম দায়ক। আসপাশে অসংখ্য বড় বড় বাড়ি থাকায় রোদ পৌঁছতে পারেনি। সুবলের ঘরে দুটো অচেনা ছেলে বসেছিল। সুবল সমরের সাথে ওদের আলাপ করিয়ে দিল। সমরকে দেখিয়ে সুবল ওদের বলে, ‘ও আমার সহপাঠী। ওকে দেখতে গোবেচারা হলে কি হবে, দারুণ ব্রিলিয়ান্ট ছেলে, একদম ছাইচাপা আগুন’। সমর সুবলের কথার প্রতিবাদ করে বলে, ‘আমি ওসব কিছুই না। সুবল সব বানিয়ে বানিয়ে বলছে’। অন্য ছেলে দুটোকে দেখিয়ে সমরের উদ্দেশ্যে সুবল বলে, ‘আমার ছেলেবালার বন্ধু মিহির আর অলোক, টপ মাস্তান আর মেয়েবাজ’। ওরা হেসে বলে, ‘কি রে বেটা তোর আল-ফাল বকার অভ্যাস এখনো গেলনা’। তারপর সমরকে উদ্দেস্য করে বলে, ‘সুবলের বাজে কথায় নিশ্চয় আপনি বিশ্বাস করেননি’।

মিহির যাদবপুর ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের মেকানিকাল ইঞ্জিনিয়ারিং এর ছাত্র আর অলোক একটা রেস্তোরাঁর মালিক। দুজনেই একটা নাটক ক্লাবে অভিনয় করে। সুবলও সেই অভিনয় দলে আছে। ‘আপনারা পড়াশুনা করুন। আজকের মত চলি, আবার পরে দেখা হবে’। ছেলেদুটো চলে যাবার পর ওরা দুপুর পর্যন্ত পড়ার রুটিন তৈরি করল। তারপর সুবলের মা খেতে ডাকলেন। সুবলের মা সমরের সামনে বসে খাওয়ান। সুবলের ছোটোবোন দরজার আড়ালে দাঁড়িয়ে উঁকি দিয়ে দেখতে থাকে। সমর মুখ নিচু করে খেতে থাকে। সুবল, ওর মা আর ছোটবোনের পীড়াপিড়িতে একটু বেশিই খাওয়া হয়ে যায়। ঘুম এড়াতে খাওয়ার পর দুজনে মীর্জাপুর স্ট্রীটে কিছুটা পায়চারি করে আসে।

ওরা বিকেলের মধ্যেই পড়ার রুটিন ঠিক করে ফেলে। গ্রীষ্মের বন্ধে অনেকটা পড়া তৈরি করে ফেলবে ঠিক করে। সমর গ্রীষ্মের বন্ধে গ্রামের বাড়িয়ে যাবে শুনে সুবল বলে, ‘তুই এখানে থাকতে পারলে ভালো হত’।

কিন্তু সমর কি করে এখানে থেকে যাবে! মা বারবার চিঠি লেখেন যে তিনি ব্যাকুল হয়ে প্রতীক্ষা করছেন সমর কবে বাড়ি আসবে। তা ছাড়া মা-বাবার জন্য, বাড়ির জন্য সমরেরও মন পোড়ে।

Next: Chapter 2 >


Dr.Ratan Lal BasuRatanlal Basu, Ph.D. (Economics) is an ex-Reader in Economics and Teacher-in-Charge, Bhairab Ganguly College, Kolkata, India. Dr. Basu has written & edited several books on Economics.

Apart from his passion for the field of Economics, Dr. Basu's other interests are Boxing & Small Game Hunting (gave up the nasty games during college life); Swimming in Turbulent Rivers (physically impossible now); Himalayan Treks, Adventure in Dense Forests, Singing Tagore Songs and also writing travelogues and fiction in Bengali and English.

Dr. Ratan Lal Basu can be reached at rlbasu [at] rediffmail.com.