ওই সময়টা – একটি ঘটনা, দুঘর্টনা কিংবা থ্রিলার - শুকদেব চট্টোপাধ্যায়, রহড়া | Oi Shomoyta - Ekti Ghotona, Durghotona Kimba Thriller

SUKDEB CHATTOPADHYAYBy Sukdeb Chatterjee of Rahara in unicode Bangla font published in WBRi Bengali Online Magazine section. You can send your creative writing to submissions@washingtonbanglaradio.com for consideration towards publication.



ওই সময়টা – একটি ঘটনা, দুঘর্টনা কিংবা থ্রিলার

শুকদেব চট্টোপাধ্যায়, রহড়া


ডিসেম্বরের মাঝামাঝি, বছর শেষ হতে চলল। অনেক ছুটি নষ্ট হয়ে যাবে। অবশ্য এটা নতুন কিছু নয়, প্রতি বছরেই হয়। খুব দরকার ছাড়া অফিস থেকে গৌতম সহজে ছুটি ছাটা পায় না। কাজের লোকের এটাই বিপদ। এবারে কাজের চাপ একটু কম আর সবোর্পরি  বড় সাহেব বিদেশে থাকায় কদিনের ছুটি ম্যানেজ করতে পেরেছে।
সোমার সাথে প্রায় দিন পনের দেখা হয়নি। ছুটির প্রথম দিনটা ওর জন্য রেখেছে। বলা যায় না, পরের দিনই হয়ত অফিস থেকে শমন চলে আসবে  কাজে যাওয়ার জন্য। রিস্ক নিয়ে লাভ নেই। সোমা গৌতমের হবু স্ত্রী। তবে স্বনিবার্চিত নয়। একটি ম্যাট্রিমনি সংস্থার মাধ্যমে দুই পরিবারের সহমতের ভিত্তিতে  নিবার্চিত। কয়েক মাস বাদে বিয়ে।

ছুটির দিনে গৌতম নটার আগে ঘুম থেকে ওঠে না। বেরতে হবে বলে সকাল সাতটাতেই উঠে পড়েছে। সোমার সাথে দেখা করার আগে একবার ব্যাঙ্কে টাকা তুলতে যেতে হবে। অসময়ে ছেলেকে ঘুম থেকে উঠতে দেখে বাসবি জিজ্ঞেস করলেন—এত আগে উঠে পড়লি যে ! কোথাও যাবি নাকি ?

--হ্যাঁ, একটু ব্যাঙ্কে যাব আর তারপর কোলকাতায় টুকটাক কাজ আছে।

--আকাশটা কালো হয়ে আছে। যাচ্ছিস যা কিন্তু ছাতাটা সঙ্গে নিয়ে যাস, যে কোন সময় বৃষ্টি নামতে পারে।

--সে যাবখন, তুমি আগে একটু চা দাও।

বাড়ি থেকে বেরতে বেরতে প্রায় বারোটা বেজে গেল। সোমা বাগবাজারের কাছে একটা নাগাদ দাঁড়াবে। হাতে খুব বেশি সময় নেই। ব্যাঙ্কে ভিড় থাকলে মুশকিল হবে।  আকাশ সকালের থেকে আনেক পরিষ্কার হয়ে গেছে। ব্যাঙ্কটা বাড়ির থেকে একটু দূরে, বড় রাস্তার ওপারে। ব্যাঙ্কের বাড়ি বড় রাস্তার ওপরে হলেও মূল গেটটা বড় রাস্তায় নয়। বাঁ দিকের একটা সরু গলি দিয়ে যেতে হয়। ব্যাঙ্কে ঢোকার মুখে গৌতম লক্ষ করল একজন লোক কাঁধে বড় একটা ব্যাগ নিয়ে গেটের মাঝ বরাবর দাঁড়িয়ে রয়েছে। দুবলা পাতলা চেহারা। ওই চেহারায় সিকিউরিটির লোক হওয়া সম্ভব নয়। ‘ভাই একটু পাশে সরে দাঁড়ান না’ বলে লোকটাকে পাশ কাটিয়ে গৌতম ভেতরে ঢুকল। কাস্টোমারের  সাথে আদান প্রদানের মূল কাজ দোতলায় হয়। একতলায় একধারে কেবল চেক জমা নেওয়া হয়, আর বাকি জায়গাটায় ব্যাঙ্কের কাগজ পত্র আর ফাইলে ঠাসা। একতলায় কাউকে চোখে পড়ল না। বছরের শেষ, অন্যান্য আফিসের মত এদেরও অনেকে ছুটি নিয়েছে মনে হয়। দোতলায় ওঠার সিঁড়ির ধাপগুলো বেশ উঁচু উঁচু। না দেখে উঠলেই হোঁচট খেতে হবে। সিঁড়ি দিয়ে ওপরে ওঠার সময় দোতলায় ঢোকার মুখের কাঁচের ভেজানো দরজার দিকে চোখ পড়তে গৌতমের মনে হল ভেতরে দরজার সামনে থেকে কেউ যেন সরে গেল। সিকিউরিটির লোক হবে বোধ হয়। ওপরে উঠে দরজা ঠেলে ভেতরে পা দিতেই পিছন থেকে একজন ধাক্কা মেরে গৌতমকে সামনে ঠেলে দিয়ে দরজায় তালা দিয়ে দিল। পড়তে পড়তে ও কোনরকমে নিজেকে সামলে নিল। ভাল করে কিছু বুঝে ওঠার আগেই আর একজন ওকে ঠেলতে ঠেলতে ভল্টের সামনেটায় নিয়ে গেল। ওখানে গাদাগাদি করে ব্যাঙ্কের লোক আর কাস্টোমাররা সব দাঁড়িয়ে রয়েছে। এবার পুরো ব্যাপারটা গৌতমের কাছে পরিষ্কার হল। বড়ই অসময়ে ব্যাঙ্কে এসে পড়েছে। গৌতমের শরীর বেশ শক্ত পোক্ত। যে লোকটা ওকে ধাক্কা মেরে নিয়ে গেল তাকে ও একটা ঘুষি মারলে সে আর উঠবে না। কিন্তু এখানে সাহস দেখানো বোকামো। ভেতরে ওরা তিনজন রয়েছে আর সকলের কাছেই অস্ত্র আছে। এখন বুঝতে পারছে নিচে দরজার মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা লোকটিও এদেরই একজন। ও বোধহয় বাইরেটায় নজর  রাখছে। গৌতমই শেষ কাস্টমার যাকে ওরা ভেতরে ঢুকতে দিয়েছে। ওর পরে যারা এল তাদের সকলকেই দোতলায় গেটে দাঁড়িয়ে থাকা লোকটি দরজার পাশ থেকে বিনয়ের সঙ্গে জানাল যে ক্যাশ চেকিং হচ্ছে আধ ঘণ্টা পরে যেন তারা আসে। ভেতরে কি ঘটছে বাইরের কেউ ঘুণাক্ষরেও তা টের পেল না।    সিকিউরিটির লোকটা হাত পা বাঁধা অবস্থায় মাটিতে পড়ে আছে। ক্যাশ কাউন্টারের সামনে থেকে ওদের একজন আগ্নেয়াস্ত্র উচিয়ে বলল—কে ম্যানেজার, সামনে আসুন।

গৌতমের ঠিক পাশ থেকে সৌম্য দশর্ন একজন প্রৌঢ বাধ্য ছেলের মত বেরিয়ে এসে কয়েদিদের মত মাথা নিচু করে দাঁড়ালেন। এর মধ্যে একজনের মোবাইল বেজে উঠল।

--খবরদার, ফোন ধরলেই শেষ করে দেব। সব ফোন মাটিতে রাখ।

আদেশের অন্যথা হল না,অনেকগুলি ফোন সামনের টেবিলটাতে জমা পড়ল।

--আপনাদের ক্যাশিয়ার কোথায় ?

ম্যানেজার কাঁপা কাঁপা গলায় অতি কষ্টে ডাকলেন- অসিত।

কোন সাড়া নেই। আবার ডাকলেন—অসিত, বেরিয়ে এস ভাই।

কিন্ত দ্বিতীয় বারেও কোন সাড়া এল না।

--শালা লুকিয়ে বাঁচবি না। তুইও মরবি, এরাও মরবে। শিগগিরি বেরিয়ে আয়।

ম্যানেজারের ডাকে সাড়া না মিললেও ডাকাতের ধমকানিতে সঙ্গে সঙ্গে কাজ হল। একটা আলমারির পিছন থেকে ক্যাশিয়ার অসিত কাঁপতে কাঁপতে বেরিয়ে এল। ব্যাঙ্কে অনেকদিন ধরে আসার ফলে গৌতম অসিতকে ভালভাবেই চেনে। মাথায় চুল কম, বছর পঞ্চাশ মত বয়স। অধিকাংশ সময় ক্যাশ কাউন্টারেই বসে। একটু  ছিটেল প্রকৃতির,সারাদিন বকবক করে। তবে  ওই মুহূর্তে একেবারে বাকরুদ্ধ। ম্যালেরিয়া রুগীর মত কেবলই কেঁপে যাচ্ছে।

--যা তাড়াতাড়ি গিয়ে ভল্ট খোল।

একজন গেটের মুখে দাঁড়িয়ে রইল আর অন্য দুজন ভল্টের থেকে টাকা বার করে দুটো বড় ব্যাগে ঢোকাতে লাগল। ভল্টের কাজ শেষ হলে একজন অসিতের ঘাড়ে ধাক্কা দিয়ে বলল—এবার কাউন্টারের মালগুলো দিবি চল।
ক্যাশ কাউন্টারের পিছনদিকে যাওয়ার সময় লোকটা হোঁচট খেয়ে চেঁচিয়ে উঠল—এটা আবার কে শুয়ে এখানে, ওঠ শালা।

--ও আমদের ক্যাশ পিওন দিলীপ স্যার, বোধ হয় অজ্ঞান হয়ে গেছে।

ওই কাঁপুনির মধ্যেই অসিত কোনরকমে মিউ মিউ করে বলল। জীবনে প্রথম স্যার সম্বোধন শুনে লোকটা বোধহয় খুশি হল কারণ, আর ও অসিতকে কোন গালমন্দ করেনি।

পুরো ঘটনাটা মিনিট পনেরর মধ্যে শেষ করে গেটে বাইরে থেকে তালা দিয়ে  ওরা চলে গেল। এতক্ষণ সিকিউরিটি অ্যালার্ম ভয়ে কেউ বাজায়নি। ওরা চলে যাওয়ার খানিকটা বাদে অ্যালার্ম বাজানো হল। ওই সময় বড় রাস্তা দিয়ে প্যারামিলিটারি বাহিনীর একটা গাড়ি যাচ্ছিল। অ্যালার্মের আওয়াজ শুনে তারাই এসে তালা ভেঙে ভেতরে ঢুকে পুলিশকে খবর দেয়। পুলিশ আসা অবধি ওরা সকলকে একটু অপেক্ষা করতে বলল।  অন্য সকলের মত গৌতমও এতক্ষণ একটা ঘোরের মধ্যে ছিল। আগে সিনেমাতে দু একটা ব্যাঙ্ক ডাকাতি দেখেছে। আজ প্রত্যক্ষ করল। ভাবলেই গাটা সিউরে উঠছে। সম্বিৎ ফেরার পর সোমার কথা মনে পড়ল। দেরী হয়ে গেছে, ও বেচারি দাঁড়িয়ে থাকবে। ফোন করে জানিয়ে দিল যে আধ ঘণ্টার মধ্যেই পৌছোচ্ছে। দুশ্চিন্তা করবে বলে ঘটনার কথা কিছু জানায়নি। এর মধ্যে পাশের থানা থেকে পুলিশ এসে গেছে এবং  মেন গেটে আবার তালা দিয়ে দিয়েছে। ওরাও  সকলকে অনুরোধ করল একটু অপেক্ষা করার জন্য। কিছুক্ষণের মধ্যেই নাকি হেড অফিস থেকে টিম আসছে  জিজ্ঞাসাবাদের জন্য। গেরোর ওপর আবার গেরো। অগত্যা সোমাকে আবার ফোন করে নানা মিথ্যে কথা বলে গৌতম দিনের প্রোগ্রামটা বাতিল করল। বুঝতে পারছে সোমা বেশ অসন্তুষ্ট হয়েছে কিন্তু কিছু করার নেই। পরে দেখা হলে সবিস্তারে কারণটা বলবে।

আধঘণ্টা পর হেড অফিসের টিম এল। সামনে মাতব্বর গোছের একজন অফিসার আর সঙ্গে আরো চারজন। তার মধ্যে একজন ফটোগ্রাফার। একে ভয়ে, আতঙ্কে, সকলেই মানসিক ভাবে বিপযর্স্ত তার ওপর ব্যাঙ্কে জায়গার তুলনায় লোক বেশি হয়ে গেছে। দমবন্ধ হওয়ার মত অবস্থা। জলের ঝাপটা খেয়ে গোঁ গোঁ করতে করতে ক্যাশ কাউন্টারের পাশে অজ্ঞান হয়ে যাওয়া দিলীপের আসতে আসতে জ্ঞান ফিরছে। বাঁধন মুক্ত হয়ে সিকিউরিটি গার্ড একটা চেয়ারে গিয়ে বসেছে। পরে যাই হোক, আপাতত ভারি বন্দুকটা তাকে আর বহন করতে হচ্ছে না। কারণ, টাকার সাথে সাথে ওটিও ডাকাতে নিয়ে  গেছে।

মাতব্বর অফিসারটি হোমিওপ্যাথি ওষুধের বাক্সের মত দুটো মাঝারি বাক্স একটা টেবিলের ওপর রেখে বললেন—আপনাদের মানসিক অবস্থা আমি বুঝতে পারছি, তবু অনুরোধ করব আর একটু সময় থেকে আমাদের একটু  সাহায্য করুন। আচ্ছা, আপনাদের এখানে কোন মহিলা স্টাফ আছেন ?

ম্যানেজারই উত্তর দিলেন—একজন আছে, কিন্তু সে আজকে অ্যাবসেন্ট।

ম্যানেজারের উত্তর শুনে অফিসারটি আপন মনেই বিড় বিড় করে বললেন ‘থাকলে ভাল হত, মেয়েরা একবার দেখলে চট করে মুখ ভোলে না।‘   এরপর ভদ্রলোক বাক্স দুটো খুললেন। একটাতে দুটো অ্যালবাম আর অন্যটায় রয়েছে অনেকগুলো পাসপোর্ট সাইজের ছবি।

--দয়া করে এক এক করে এসে ছবিগুলো দেখুন। যদি কোনটর সাথে  আজকে যারা এসেছিল তাদের কারো কোন মিল পান আমাদের বলুন। কাজের সুবিধে হবে।

ইচ্ছেয় হোক বা অনিচ্ছেয় সকলে একবার ছবিগুলো দেখল। উত্তর অবশ্য সকলেরই এক--না কোন মিল নেই।

এক মহিলা কেবল একটু ভুল করে ফেলেছিলেন। পাশে দাঁড়ান তাঁর স্বামীকে একটা ছবি দেখিয়ে জিজ্ঞেস করলেন—হ্যাঁগো, এটা অনেকটা গেটের মুখে দাঁড়ান ছেলেটার মত না ?

স্বামী ভদ্রলোক ছবির দিকে না তাকিয়েই  বৌকে ‘কি যা তা বলছ‘ বলে ধমক লাগিয়ে টানতে টানতে সরিয়ে নিয়ে গেলেন।

পুলিস অফিসার স্মিত হাসলেন।

বেলা দুটো নাগাদ যাওয়ার অনুমতি মিলল। সোমার সাথে সিনেমা দেখতে যাওয়ার কথা ছিল। হলে যাওয়া না হলেও এতক্ষণ ধরে যা দেখল তা যে কোন রোমহর্ষক সিনেমাকে হার মানাবে। সিনেমার চরিত্রগুলো যেন বাস্তবে সামনে এসে কিছুক্ষণ কিছু কান্ড করে গেল। আর সেই চরিত্র গুলোর মধ্যে নিজের অজান্তে সেও হয়ে গিয়েছিল একজন। গেটের বাইরে তখন প্রচুর লোক জড় হয়ে গেছে। ভেতরের লোকেরা এক এক করে বাইরে আসতেই কৌতূহলী জনতা প্রশ্নের ডালি নিয়ে ছেঁকে ধরল। ঠিক যেমনটি কোন সিনেমার প্রিমিয়ার শো এর পর কলা কুশলীরা হল থেকে বেরোবার সময় হয়।

অনেক কিছু ঘটেছে, আরো অনেক খারাপ কিছু ঘটতে পারত। তবু ভয় বা আতঙ্ক নয়, অক্ষত শরীরে এমন ভয়ানক ঘটনার বিরল অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করে গৌতম রীতিমত পুলকিত ও রোমাঞ্চিত। এ এমন অভিজ্ঞতা যা মানুষের জীবনে কদাচ ঘটে। আর এমন এক ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণ দিতে পারা তো রীতিমত ভাগ্যের ব্যাপার।  এ তার সারা জীবনের সঞ্চয়। যা শুনে কেবল পরিচিতজনই নয়, ভবিষ্যতে কোন একদিন হয়ত তার দুরন্ত নাতিও দুষ্টুমি ভুলে  চোখ বড় বড় করে অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকবে।


শুকদেব চট্টোপাধ্যায়, রহড়া।
৪৬৬,ওল্ড ক্যালকাটা রোড,
১৮১ নং রেশন দোকানের পাশে,
পোঃ রহড়া, জিলাঃ উত্তর ২৪ পরগণা,
পিন-৭০০১১৮.
ফোন-৯০৫১২৫৯০৭৫ / ২৫৬৮৭৮০২
ইমেলঃ sukdeb.fhs@gmail.com / Sukdeb_rah@rediffmail.com