ব্যতিক্রমী রামায়ণ - কল্পিতা বসু | Byatikromi Ramayan - Kalpita Basu (WBRi Bengali Online Magazine)

Kalpita Basu Kalpita Basu is a home-maker living in Kolkata for over 25 years. Now that her children have grown up, Kalpita has time once again to pursue that she has always enjoyed most - creative writing.

As a young student, Kalpita had contributed to magazines. A versatile writer, her writings include fiction, poems, translations, travelogs and more.

Kalpita Basu writes about the unique version of Ramayana composed by Bengali rural women and passed on over generations by word of mouth. Published in unicode Bangla font in our online magazine section. Kalpita can be reached at basukalpita at gmail.

You can send in your creative writings to submissions@washingtonbanglaradio.com for consideration towards publication in this section.



ব্যতিক্রমী রামায়ণ


কল্পিতা বসু


Sculpture: Sita from the Ramayana
সীতার প্রতিমূর্তী

পশ্চিম বঙ্গের গ্রাম বাংলার মেয়েরা যে মৌখিক রামায়ণ রচনা করেছে তা মহাকবি বাল্মিকী রচিত,আদি রামায়ণের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা বাল্মীকির রামায়ণে রামের বীরত্ব,সাহস,সত্যনিষ্ঠা,পিতৃভক্তি,কর্তব্য পরায়ণতা,প্রজাপালন ইত্যাদির জন্যে তাকে দেবত্ব প্রদান করেছে কিন্তু বাংলার মেয়েদের কাছে এর কোনো মূল্য নেই সীতার ওপর যে অমানবিক অত্যাচার,অবমাননা,কুটিল সন্দেহ, অপরিসীম লাঞ্ছনা হয়েছে সেটা তাদের বিচলিত করে তাদের দৈনন্দিন জীবনের দুঃখ,কষ্ট, তাদের অসহায়ত্ব, অস্তিত্ত্বের অপমান ইত্যাদির সঙ্গে সীতার জীবনের যোগসূত্র খুঁজে পায়


Painting: Sita's Virginity Test with Fire - from the Ramayana
সীতার অগ্নি পরীক্ষা

তাই তারা নিজেদের মত করে,নিজেদের জন্যে মৌখিক রামায়ণ রচনা করে৷ তারা সমালোচকদের ভয় পায় না,ভয় পায় না সমাজের নৈতিক বিচারকে বাংলার চারণ কবিরা রামায়ণের যে গান গায় তাতে রামের গুনগানই বেশী থাকে কিন্তু গ্রাম বাংলার মেয়েদের মৌখিক রামায়ণ সীতা কেন্দ্রিক

গ্রামের মেয়েরা অত্যন্ত সহজ,সরল,অশিক্ষিত বা অল্প শিক্ষিত তারা নিজেদের অভাব অভিযোগ জোর গলায় বলতে পারে না নিজেদের অধিকার দাবী করতে পারে না পুরুষ শাসিত সমাজে নারীর অধিকার বিশেষ করে গ্রাম্য নারীর অধিকার এক অলীক কল্পনা তারা সীতার মতই সর্ববংসহা তাদের দৈনন্দিন কাজের সময় যেমন ধান কাটা,জলতোলা,রান্না করা,পূজোর যোগাড় করা বা সাময়িক অবকাশের সময় নিজেদের তৈরী রামায়ণের গান ছড়া ধাঁধাঁর মাধ্যমে গাইতে থাকে সন্তানের জন্ম হয় মাতৃ গর্ভ থেকে কিন্তু মহাকাব্যের সীতার জন্ম ভূমি গর্ভ থেকে

ভূমিথেকেজন্মআমার,

মা নাই,বাপ নাই,নাই কোনো ভাই

মিথিলার জনক রাজা ,

আমায় পালন করলো’ তাই ৷’’


বালিকা সীতার জনক রাজা অযোধ্যার দশরথ পুত্র রামের সঙ্গে বিয়ে দিয়েছিল

জনকরাজাআমারবিয়াদিল,

বর হইল রাম,

দু চোখে স্বপ্ন নিয়ে শ্বশুর বাড়ী এলাম

সীতা শ্বশুর বাড়ী আসার সময় গুরুজনেরা অনেক উপদেশ দিল,যা সাধারনতঃ গ্রামের মেয়েদের দেওয়া হয়

সন্ধ্যে বেলায় এলো চুলে বেরিও না

দাঁত বার করে হেসো না

ভীড়ের মধ্যে এধার ওধার তাকিও না

অচেনা লোকের সাথে কথা বলিও না

গুরুজনদের অবহেলা করিও না

স্বামী ছাড়া পরপুরুষকে ফুল উপহার দিও না ৷”


গুরুজনদের উপদেশ শুনে দুচোখে স্বপ্ন নিয়ে মেয়েরা যখন শ্বশুর বাড়ী আসে বেশির ভাগ মেয়েই শ্বাশুড়ীর রোষের শিকার হয় ,স্বপ্ন চুর চুর হয়ে হয়ে যায়,জীবন দুর্বিষহ হয়ে ওঠে গ্রাম বাংলায় বধূ নির্যাতন কিংবা বধূ হত্যা খুবই সাধারণ ঘটনা সীতার ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম হয় নি রাম শুরুতে তার বালিকা বধূর সঙ্গে সখ্যতা স্থাপনে উৎসুক ছিল,কিন্তু বিমাতা কৈকেয়ীর হীনমন্যতার জন্যে সেটা সম্ভব হয় নি

রামএতটুকুনতেঁতুলপাতায়সীতাকেজানালোপিরীত,

কৈকেয়ী বিষ ঢেলে করলো রামের কান ভারী

সীতা ছাড়া রাম একলা খেল পান,

বিষাক্ত বিছের মত দরজার বাইরে কৈকেয়ী পাতলো আড়ী

ভঙ্গ হল স্বপ্ন সীতার বিমাতা কৈকেয়ীর রোষে ,

রাম লক্ষণের সাথে গেল চোদ্দ বছর বনবাসে


এক সঙ্গে পান খাওয়া দাম্পত্য সৌহার্দ্দের লক্ষণ, কিন্তু সীতা তার থেকেও বঞ্চিত হল


Rama, Laxmana and Sita - Madhubani Art
রাম
, লক্ষণ সীতা (মধুবনী চিত্র)

সীতা যদিও জনক রাজার ঘরে অত্যন্ত আদরে প্রতিপালিত হয়েছিল কিন্তু পল্লী কন্যারা তাকে অনাথ বলে বর্ননা করে-

ত্রিভুবনে আমার কেহ নাই,

তাই আমি নদীর শ্যাওলার মত

ঘাটেঘাটেভাসিয়াবেড়াই৷”


গ্রামের মেয়েরা যখন শ্বশুর বাড়ী যায় তাদের বলা হয় “সীতা সাবিত্রীর মত হও” সাবিত্রী স্বামী সত্যবানকে যমের হাত থেকে বাঁচিয়েছিল,আর সীতা বার বার অগ্নি পরীক্ষা দিয়ে রামকে প্রজাদের অপমানের হাত থেকে বাঁচিয়েছিল কিন্তু গ্রামের মেয়েরা নিজেদের কন্যা সন্তানের নাম কখনও সীতা রাখে না, তারা চায় না যে তাদের সন্তান সীতার মত দুঃখিনী হোক


Indian Bengali Village Women Fetching Water
গ্রাম বাংলার মেয়েদের একত্রে ধান আনার দৃশ্য

এই মৌখিক রামায়ণের গান এবং ছড়া আদি রামায়ণের বাল কাণ্ড এবং উত্তরা কাণ্ড থেকে সংগ্রিহিত ৷এই বাল কাণ্ড এবং উত্তরা কাণ্ড আদি রামায়ণে বিশেষ গুরুত্ব পায় নি বাল কাণ্ডে সীতার জন্ম,বিবাহ ইত্যাদির বর্ননা আছে,উত্তরা কাণ্ডে রাম রাবনের যুদ্ধ, রামের অভিষেক,সীতার অগ্নি পরীক্ষা,সীতার সন্তান সম্ভবনা, প্রজাদের সন্তুষ্টির জন্যে রামের গর্ভবতী সীতাকে বর্জন, সীতার প্রসব , এবং সীতার পাতাল প্রবেশ র্ণীত

গ্রামের মেয়েরা রাম রাবণের যুদ্ধের বা রাবণের নিধনের ব্যাপারে বিশেষ আগ্রহ দেখায় না তাদের আগ্রহ শুধু সীতার ওপর আদি রামায়ণে রামের যে ভাবমূর্তি আছে তাতে কালি ছেটাতে ভয় পায় না তাদের মতে কর্তব্য পরায়ণ রাম সীতার ওপর কোন কর্তব্য করেছে? সীতার বার বার অগ্নি পরীক্ষা নেওয়া, গর্ভবতী সীতাকে বর্জন করা কি কর্তব্য বিমুখতা নয়? রাম আদর্শ পুত্র, আদর্শভ্রাতা, আদর্শ শাসক, কিন্তু কখনোই আদর্শ পতি নয় তারা রামকে কঠোরএবং নিষ্ঠুর পতি হিসাবে চিহ্নিত করে রামকে পতিত পাবন ,করুনা সিন্ধু বলা হয় কিন্তু গ্রাম্য মেয়েরা তাকে ‘পাষণ্ড’এবং ‘পাপিষ্ঠ’ বলতে পিছপা হয় না

পাঁচ মাসের পোয়াতি সীতা বনবাসে যায়,

সীতার দুঃখ কাঁদায় তোমায় আমায়,

শুধু গলে না রামের পাষান হৃদয়,৷”

আরো গায়;

কিছুপথচলেসীতাপিছুপানেচায়,

পাপিষ্ঠ রামের প্রাসাদ তবু দেখা যায় ৷”


তারা রামের নৈতিক চরিত্রও বিশ্লেষন করে-

রাম তোমার একি দুর্মতি?

সীতারকরিলেএইদুর্গতি ৷”


গ্রামের মেয়েদের স্বামীরা যখন বাইরে যায় তখন তারা চুল বাঁধে না, সিঁদুর পরে না সীতাও অনুরূপ করে ছিল

সবাই সীতারে অত্যাচার করিল,

সীতা জটাচুলে সিঁদুর না দিয়া,

বারোবছরকাটাইল ৷”


অন্তঃসত্ত্বা সীতাকে প্রজাদের মন রজ্ঞনের জন্যে রাম বনবাসে পাঠা মৌখিক রামায়নে জঙ্গলে সীতার প্রসবের বর্ণনাও আছে

ঘন জঙ্গলে ধুঁয়া আসছে কোথা হতে?

সীতা মায়ের প্রসব হচ্ছে,জল ফুটছে,

ধূঁয়াআসছেসেখানহতে’’।


গ্রামের মেয়েদের যখন প্রসব হয় তখন ধাইমা প্রসব করায় তখন ফুটন্ত জলের দরকার হয় অত্যন্ত অস্বাস্থ্য কর পরিবেশে তাদের প্রসব হয়, বেশির ভাগ মেয়েরাই অপুষ্টির শিকার হয়

এখানেও তারা সীতার সমতুল্যা ফুটন্ত জল একটি মাত্র স্বাস্থ্যসম্মত জিনিষ যা প্রসবের সময় ব্যবহৃত হয় গ্রামে শিশু মৃত্যুর হারও যথেষ্ট বেশী


Indian Bengali Village Women Fetching Water
গ্রাম বাংলার মেয়েদেরএকত্রে জল আনার দৃশ্য

পল্লী গ্রামের মেয়েরা সীতার মতই একাকী তাদের স্বামী, সন্তান, পরিজন থাকা সত্ত্বেও তাদের একাকীত্ব ঘোচে না৷ তাদের মনের খবর কেউ রাখে না তারা হাসি কান্না কারোর সঙ্গে ভাগ করতে পারে না যেমন ছিল সীতা পুরো মহাকাব্যে তার কোনো মতামত নেই, কোনো বক্তব্য নেই নেই কোনো বিদ্রোহ , নেই কোনো প্রতিবাদ, আছে শুধু অসীম সহনশীলতা,আর গভীর আত্মত্যাগ

সীতা পল্লীগ্রামের মেয়েদের দৃষ্টান্ত স্বরূপ জীবনের জটিলতা সমস্যাকে সম্মান মর্যাদার সঙ্গে মোকাবিলা করার দৃষ্টান্ত

মৌখিক রামায়ণের শেষ পর্ব্বে আছে নিজ পুত্রদের রামের হাতে সঁপে দিয়ে, সীতার পাতাল প্রবেশ

পুত্রদেররামেরহাতেকরিয়াঅর্পণ,

ধরিত্রীমায়েরবুকেসীতাকরিলআত্মসমর্পণ ৷”


এই ভাবে মহাকাব্যের মহা নায়িকা চির দুঃখিনী সীতা জীবনের অবসান ঘটল

ভূমি হইতে জন্ম সীতার ভূমিতেই হইল বিলীন,

শেষহইলসীতামায়েরদুঃখেরদিন ৷”


সীতা গ্রাম বাংলার মেয়েদের কাছের মানুষ, তাকে কোনো অভিজাত শ্রেণীর মানুষ বলে তারা মনে করে না ৷ সীতা সহিষ্ণুতার প্রতীক, যে জীবনে হেরেও জিতে যায় ৷ মেয়েদের ভাব মূর্ত্তি ৷ তারা যখন সীতার দুঃখের গান গায় তখন তারা নিজেদের নিরাপত্তা হীনতার গানই গায় ৷

গ্রাম বাংলার সর্ব্বংসহা মেয়েরা চির শান্তি লাভ করে যখন তারা চিতায় ওঠে ৷ তাদের অপূর্ণ আশা,আকাঙ্খা,স্বপ্ন সব কিছু সমাধিস্থ হয়ে যায় ৷

সীতার জীবন কাহিনী কি গ্রাম বাংলার মেয়েদের বঞ্চিত জীবনের প্রতিফলন নয়? তাই তারা রামায়ণের পরিবর্ত্তে সীতায়ণের গান গায়;

হায়রেজনমদুঃখিনী,

দুঃখ তোমার ঘুচিল না হইয়া রাজরানী?

শেষ হইল সীতার কাহিনী ৷’’

সৌজন্যে-পশ্চিম বঙ্গের বিভিন্ন জেলার গ্রাম বাংলার মেয়েদের কাছ থেকে তথ্য, উদ্ধৃতি এবং ছবি সংগ্রিহিত