নিউ ইয়র্ক (New York City, United States)

This article is in Unicode Bangla Font.


আজ বহু বছর আমি কলকাতা ছাড়া......খুব ‘মিস’ করি আমার এই প্রিয় শহর কে। হোক না ভীড়, তবু ভীষন সুন্দর। তাই যখন নিউ ইয়র্ক (New York City)শহর কে প্রথম দেখলাম, মনে পড়ে গেল কলকাতার কথা। আর মনে পড়ল ‘রাস্তা চলেছে যত অজগর সাপ, পিঠে তার ট্রাম গাড়ি পড়ে ধুপ ধাপ, দোকান বাজার সব নামে আর ওঠে, ছাতের গায়েতে ছাত মরে মাথা ঠুকে......ট্রাম গাড়ি তো নেই, তবে বিশাল লাক্সারি গাড়ি আর বাস, সব যেন ধাক্কা ধাক্কি করে চলেছে...গায়ে গায়ে সব দোকান, নানা দেশের লোক নানা জিনিস বিক্রি করছে আর গগনচুম্বি সব অট্টালিকা, যাকে নাকি আমরা বলি ‘স্কাইস্ক্রেপারস’...নীল আকাশ প্রায় দেখাই যায় না।

(Manhattan)


তবু যেন নিউ ইয়র্ক ভীষন সুন্দর, ম্যানহ্যাটন এর জাদু চারিদিকে ছড়ানো আর সবচেয়ে সুন্দর স্ট্যাচু অফ লিবার্টি...(Statue of Liberty) যাকে দেখতে সারা পৃথিবী থেকে লোক আসে।
নিউ ইয়র্ক হার্বারের সন্মুখেই ব্যাটারি পার্ক, (Battery Park)এখানে ব্যাটারি বলতে যুদ্ধের সাজ সরঞ্জাম,জানবাহন বোঝায় যা কিনা নানা সময় ব্রিটিশ,ডাচ এবং অন্যান ইয়রপীয় সেনা তাদের বসতি রক্ষা করার জন্য এখানে রাখত...আর এখান থেকেই লিবার্টি আইল্যান্ড যাওয়ার ব্যাবস্থা।
প্রায়ে এয়ারলাইনের সিকিউরিটি চেক এর মত নিয়ম পেরিয়ে আমরা গিয়ে উঠলাম এক তিন তলা জাহাজ এ। ঠিক জাহাজ বলা যায় না হয়ত, তবে নৌকা তো নয়ই। সুদুর নীল হাডসন নদির ওপর যখন জাহাজ ভাসলো, ম্যানহ্যাটন এর অপরুপ আর কেতাদুরস্ত স্কাইলাইন দেখে আমরা মুগ্ধ। মিনিট পনেরর মধ্য পৌঁছে গেলাম লিবার্টি আইল্যান্ড। জাহাজ থেকেই মূর্তিটি দেখা যায় আর সত্যি বলতে কি, জাহাজ থেকে স্ট্যাচুর যা রুপ তা কিন্তু ওই দ্বীপ এ গিয়ে পৌঁছলে আর পাওয়া যায় না। তাই যারা আমার মতন ছবি তোলা নিয়ে মত্ত থাকেন, তাদের বলে রাখি, দ্বীপ, মূর্তি আর নদী মিলিয়ে অমন অপরুপ দৃশ্য কিন্তু ওই জাহাজ থেকেই।
দ্বীপে প্রচুর লোকের ভীড়, কেউ খাচ্ছে, কেউ ছবি তুলছে আর কেউ বা এমনি বসে আরাম করছে। দ্বীপটা বেশ বড়, জেটি থেকে সোজা রাস্তা গেছে, লিবার্টি কে ঘিরে আবার জেটিতেই ফিরে আসে। দ্বীপের মাঝখানে এক সুন্দর সবুজ ঘাসের পার্ক আর তার ওপরে স্ট্যাচু অফ লিবার্টি...বিশালকার আর দারুন সুন্দর। ওই মূর্তির আকর্ষনিয়তা ছবিতে যা তার দশ গুন বেশি সামনা সামনি...অসাধারন! স্ট্যাচু কে ঘিরে নানা ফলক যাতে লিবার্টির নানা ইতিহাস লেখা। প্রচুর ছবি তুললাম, অনেক কিছু খেলাম আর মেমেন্টো হিসেবে কিনলাম একটা ছোট মূর্তি।

(Statue of Liberty)


ফেরার সময় হল আর জাহাজ আমাদের নিয়ে গেল এলিস আইল্যান্ড...ইমিগ্র্যান্ট (অভিবাসী) মিউজ়িয়ম দেখাতে।(Ellis Island, Immigrants museum) এই মিউজ়িয়মে দশ কোটির ও বেশি অভিবাসী অ্যামেরিকানদের ইতিহাস হাজার হাজার ছবি, নোটস আর ফিল্মের মাধ্যমে সাজানো আছে। অ্যামেরিকায়ে প্রথম পদার্পন করে যে ভয়, অনিশ্চয়তা আর আশা আকাঙ্খা, তারই গল্প এখানে।
আমি যেখানেই বেড়াতে যাই, সব চেয়ে আগে ‘কি কি অতি অবশ্য ই দেখব’ তার একটা লিস্ট বানাই। এখানেও তাই ছিল। তাই আমরা পৌঁছোলাম আমাদের দ্বিতীয় স্থান এ...ইউনাইটেড নেশানস (United Nations HQ)এর প্রধান কার্যালয়ে। আর এক বিশাল আকাশ ছোঁয়া বাড়ি, নিচে পৃথিবীর নানা দেশের ফ্ল্যাগ। ভারতের ফ্ল্যাগ দেখে আমরা উল্লাসিত। সেদিনটা ছিল আবার বেশ মেঘলা আর খুব হাওয়া...সেই শীতল হাওয়াতে আমাদের দেশের তিরঙ্গাকে উড়তে দেখে মনটা একটু খারাপই লাগলো...কত দূরে আমি...ইন্ডিয়া...হোম সুইট হোম!

(United Nations, HQ)


আমার প্রথম ইউ.এন দেখা জিনিভা তে। ভালই লেগেছিল তাই এখানেও গেলাম দেখতে। ট্যুরিস্ট দের জন্য ট্যুরের ব্যবস্থা থাকে যাতে ইউ.এন এর নানা কাজকর্ম, তার ইতিহাস, কৃতিত্ব সব কিছুই জানা যায়। পৃথিবীর নানা দেশ থেকে পাওয়া উপহার, নানা এগজ়িবিশন; ডিকলোনাইজ়েশান, পীসকীপিং অপারেশন আর ডিসআর্মামেন্ট, আর ট্যুরের শেষে জেনারল অ্যাসেম্বলী (যেখানে পৃথিবী ব্যাপী সব আলোচনা হয়) দেখা আর বোঝা যায়। সব শেষে অ্যাসেম্বলী হলের সামনে দাঁড়িয়ে ছবি তোলার পালা।   
পৃথিবীর নানা শহরে আকাশ ছোঁওয়া শত তলা বাড়ির ওপর অনেক উঠেছি, কিন্তু তখন আমরা এম্পায়ার স্টেট বিল্ডিং এ যাচ্ছি...কিং কং এর এম্পায়ার স্টেট বিল্ডিং...(Empire State Building)ব্যাপারই আলাদা। ১৯৩১ সালে তৈরী হওয়ার পর, প্রায়ে চল্লিশ বছর ধরে এইটি ছিল পৃথিবীর সব চেয়ে উঁচু ইমারত...১০২ তলা। এখন আর নয়। আশি তলার ওপর আমরা পৌঁছলাম প্রায় চোখের নিমেষে, হাই স্পীড এলিভেটরে, কান বন্ধ সবার তবু খুব মজা। কিন্তু বাধ সাধলো আকাশের কালো মেঘ...শুনেছিলাম নাকি পরিস্কার দিনে অত ওপর থেকে আশেপাশের চারটে রাজ্য দেখা যায়, একেবারে পরিস্কার। সে আর আমার ভাগ্যে হল না, তবে একটা আশা রইল যে ওটা দেখার জন্যই আবার আসা যাবে।  
এত ঘোরাঘুরি করে মনে হল যেন অনেকক্ষন কিছু খাওয়া হয় নি। গাড়ি থেকে নেমে পড়লাম টাইমস স্কোয়ার এ।(Times Square) অ্যামেরিকার সবচেয়ে প্রানবন্ত জায়েগা...নিউ ইয়র্ক এর এক গুরুত্তপূর্ণ ঝলমলে ঠিকানা। সারা অঞ্চল জুড়েই শুধু গাড়ি, দোকান আর জমকালো সব  বিজ্ঞাপনের বোর্ড, কোনোটা ডিজিটল কোনোটা অ্যানিমেটেড....ওই দেখেই সময় কাটিয়ে দেওয়া যায়। সব চেয়ে মজার ব্যাপার হল টাইমস স্কোয়ার এর রাস্তায় রিকশা দেখা...হে ঈশ্বর, শুধু শুধু সবাই কলকাতাকে গালি দেয়, এতো নিউ ইয়র্ক, এখানেও রিকশা। রাস্তায় নানা রকম খাবারের স্টল, ফুটপাথ জুড়ে শুধু লোক ছুটেছে, কারোরই যেন সময় নেই...কিসের এত তাড়া কে জানে? ব্রডওয়ে থিয়েটারের (Broadway )সামনে দিয়ে ঘুরলাম খানিক্ষন, লায়ন কিং অভিনীত হচ্ছিল, আর একদিন আসবো বলে মনকে সান্তনা দিলাম।

(Rickshaw)


দিনের শেষে আমরা গিয়ে পৌঁছোলাম ‘গ্রাউন্ড জ়িরো’; (Ground Zero)আজ ধুলিস্মাত, ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার টুইন টাওয়ার যেখানে একদিন মাথা তুলে দাঁড়িয়ে থাকত, এখন এক বিশাল কন্সট্রাকশন সাইট। সামনে এক ফলক, ৯/১১ এর আগে ওই যায়েগায় কি ছিল, এখন কি হয়েছে আর ভবিষ্যতে কি হবে, তার বিবরন দেওয়া। যারা ৯/১১ এর বর্বরতায় প্রান হারিয়েছে, তৈরী হচ্ছে তাদের জন্য এক স্ম্রিতি সৌধ আর এক মিউজ়িয়ম যাতে থাকবে অ্যামেরিকার ইতিহাস।
আমাদের নিউ ইয়র্ক বেড়ানো শেষ, ফিরছি আমাদের গাড়িতে, হঠাত কাছেই এক সাইরেন বেজে উঠলো...কোনো ফায়ার ব্রিগেড বা অ্যাম্বুলান্স হয়ত। শহরে আমাদের বন্ধু এবং গাইড যিনি ছিলেন, উনি যা বললেন তাতে আমাদের সকলেরই গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল। উনি বললেন, কল্পনা করুন তো, ৯/১১ র সকালে ঠিক এই রকমই একটা সাইরেন, শুধু একশ গুন বেশি তার আওয়াজ আর তার সাথে ধোঁয়া, বিশৃঙ্খলা, বিভ্রান্তি আর আতঙ্ক....আমি বোধহয় চোখের সামনে সেই দৃশ্য কল্পনা করতে পারলাম যা কিনা পৃথিবী তে ‘শান্তি’ র মানে চিরদিনের মত পাল্টে দিয়েছে।


(Ground Zero)