স্বপ্ন - রতন লাল বসু: দশম অধ্যায় | Shopno - A Bengali Novel by Dr. Ratan Lal Basu - Chapter 10 | WBRi Bangla Online Magazine

"Shopno" is a novel by Dr. Ratan Lal Basu published serially in the WBRi Bangla Magazine section in unicode Bangla font. Links to previous chapters are posted at the bottom of every episode. This is the final chapter of Swapno.


স্বপ্ন

রতন লাল বসু

দশম অধ্যায়



দিন কেটে যায়। সমর এখন আর কলেজের সাতে পাঁচে থাকেনা। রিসার্চের বিষয় নিয়ে সবসময় চিন্তা করে। পড়াশুনা যা করার দিনের বেলাই সেরে নিতে হয়। সন্ধ্যার পর অধিকাংশ দিনই লোড শেডিং, আলো আসে রাত দশটার পর। অন্ধকার, দুরন্ত গরম আর মশার কামড়ে সমর অতিষ্ট হয়ে ওঠে। সমর কোনো কোনো দিন ট্রেনে চেপে শিয়ালদা চলে যায়। শিয়ালদা স্টেশনের সামনে দাঁড়িয়ে কর্মব্যস্ত মানুষের ছোটাছুটি দেখে। কখনোবা হ্যারিসন রোড বা সারকুলার রোড ধরে এলোমেলো হেঁটে বেড়ায়, কখনো হাঁটতে হাঁটতে এসপ্ল্যানেড চলে যায়। কখনো কলেজ স্কোয়ারে চুপচাপ বসে থাকে। সান্ধ্য কলকাতার পথে পথে মানুষের ভিড়। লাল দীঘির কালচে জলে, আধো অন্ধকার প্রেসিডেন্সি কলেজ আর কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিল্ডিং এ ফেলে আসা জীবনের স্মৃতি সমরের মনকে জীবনের একটা মোহজড়ানো অতীতে টেনে নিয়ে যায়। স্মৃতির আনাচ কানাচ থেকে কত হারিয়ে যাওয়া ঘটনা কত হারিয়ে যাওয়া মুখ উঁকি ঝুঁকি দিতে থাকে। বাসায় ফিরে আলো আসার পর আর পড়ায় মন বসেনা। বার বার সেই সব হারানো দিনের কথা মনে পড়ে যায়। সমরের জীবনে একসময় সেই সব উচ্ছল স্বপ্নমাখা দিনগুলো ছিল। মাত্র কয়েকটা বছর। তবু মনে হয় তারা যেন কোন সুদূর প্রাগৈতিহাসিক অস্পষ্টতায় বিলীন হয়ে গেছে। মনটা ভারাক্রান্ত হয়ে পড়ে।

সমর সেসব দিনের কথা ভুলে যেতে চায়। আবার স্বপ্ন দেখতে চেষ্টা করে। ডক্টরেট করে আমেরিকা যাবে। আবার একটা স্বপ্ন মাখা জগত। আবার সমর ফিরে যাবে ছাত্র জীবনে, আর একটা আরো স্বপ্নীল জগত। আগামী কয়েকটা বছর কোনোরকমে কাটিয়ে দেওয়া। তারপর সমর আবার নতুন করে জীবন শুরু করবে।

সেদিন শিয়ালদার কাছে একটা বহু পরিচিত ডাক শুনে সমর থমকে দাঁড়াল। কোকাকোলার দোকানের সামনে দাঁড়ানো ছেলেটাকে দেখে সমর নিজের চোখকে যেন বিশ্বাস করতে পারলনা। সুবল!

সুবলের স্মৃতি ঝাপসা হতে হতে মনের কোন অন্ধকার কোঠায় আশ্রয় নিয়েছিল। সুবলের কথা তেমন করে আর মনে পড়তনা। শুধু মাঝে মাঝে মনে হত কোন সুদূর অতীতে সুবল বলে একটা ছেলের সাথে সমরের গভীর বন্ধুত্ব ছিল। আবার আজ, এতদিন পর, যেন কত শতাব্দী,কত জন্মজন্মান্তরের দেয়াল ভেদ করে সুবল আবার ফিরে এসেছে, সমরের থেকে মাত্র কয়েক হাত দূরে দাঁড়িয়ে আছে। সেই বিচিত্র আনন্দে সমরের মনটা ভরে উঠল, যে আনন্দ আর কাউকে দেখলে পাওয়া যায়না। বিশ্ময়ে হতবাক সমরের মুখে কথা সরেনা। সমর শুধু বলল, ‘সুবল তুই!’

সুবল তেমনি হেসে বলল, ‘আয় আগে কোকাকোলা খেয়ে নে’। কত স্মৃতি, কত প্রশ্ন ঝাঁক বেঁধে এসে সমরকে অভিভূত করে তোলে। কোকাকোলা খেতে খেতে সুবল বলে, ‘চল শিয়ালদা স্টেশনে কোন ফাঁকা বেঞ্চে বসি। তারপর সব বলছি’।

শিয়ালদা সাউথ স্টেশন এখন বেশ নিরিবিলি। একটা ফাঁকা বেঞ্চে বসে সুবলের কাহিনী শোনে সমর। সেই রূপকথার রাজপুত্তুর আবার ফিরে এসেছে। আবার সমর ফিরে যায় সেসব সময়ে যখন মধ্যবিত্ত জীবনের একঘেয়েমি, সংকীর্ণতা, স্বার্থপরতা এসবের কথা সমর জানতনা। সেই ফার্স্ট ইয়ারে পড়ার সময় ওরা যেমন দুজনে বসে গল্প করত, সেই সব দিন যেন আবার ফিরে এসছে সমরের জীবনে।

সুবল সেই পুরোন ভঙ্গিতে বলে, ‘তোর খবর আমি সব জানি। গুরু চট্পট্ডক্টরেটটা করে নে। তুই রিসার্চ করছিস শুনে আমি খুব খুশি হয়েছি’।

সমর অভিযোগের স্বরে বলে, ‘তুই এতদিন আমার সাথে যোগাযোগ করিসনি কেন?’

সুবল ধীরে ধীরে শুরু করে তার দীর্ঘ কাহিনী, ‘জেল থেকে ছাড়া পাওয়ার পর ভাবলাম পুলিশ স্বাভাবিক ভাবেই আমার গতিবিধির উপর নজর রাখবে। তোর সাথে এ অবস্থায় যোগাযোগের চেষ্টা করলে তুই বিনাদোষে পুলিশের নেকনজরে পড়ে যাবি একথা ভেবেই তোর সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করিনি। তবে এখন আর কোন ভয় নেই। আমার বিরুদ্ধে ওদের কোন নির্দিষ্ট অভিযোগ নেই, কোন প্রমাণও নেই। এখন নকশাল আন্দোলন নেই বলতে গেলে, তাই যাদের শুধুমাত্র সন্দেহের বশে ধরেছিল তাদের ব্যাপারকে ওরা আর কোন গুরুত্ব দিচ্ছেনা’।

‘তোকে ধরল কেন?’

‘আমাদের নাটকের ক্লাবে কয়েকজন নকশাল নেতা এসেছিলেন। তাঁদের এরেস্ট করতে গিয়ে আমাকেও ধরে। তবে নেতারা পুলিশের কাছে বলেছেন আমার সাথে আগে তাঁদের কোন যোগাযোগ ছিলনা। নাটকের ব্যাপারে আগ্রহ থাকায় তাঁরা আমাদের ক্লাবে এসেছিলেন। ইচ্ছা ছিল আমাদের দলে ভেড়ানোর, কিন্তু সুযোগ পেলেননা। এভাবে মিথ্যা স্টেটমেন্ট দিয়ে ওঁরা আমাদের কয়েকজনকে বাঁচিয়ে দিলেন। সত্যি কথা বলতে কি ওঁদের সাথে আমাদের অনেক দিন থেকেই যোগাযোগ ছিল, তবে পুলিশের কাছেতো তার কোনো প্রমাণ নেই। আমাকেও অনেক উল্টোপাল্টা প্রশ্ন করেছিল, কিন্তু কিছু বের করতে পারেনি’।

সুবল এখনো ঠিক আগের মতই আছে। চেহারা বরং একটু খোলতাই হয়েছে। কথার ধরণ, মাথা নাড়া, মুদ্রাদোষ সব মিলিয়ে ঠিক সেই অপূর্ব, অনন্য, অদ্বিতীয় সুবল।

সুবল বলল যে জেলে থাকার সময়ও খুবই আমোদে থাকত। হৈ-হুল্লোড়, হাসি-তামাসায় সবাইকে মাতিয়ে রাখত। মজার গল্প বলত, ছোট ছোট প্রহসন লিখত। এসব কারণে সব ধরণের কয়েদীরাই সুবলকে খাতির করত, ভালো বাসত। সবাইকে হাসানোর জন্য সুবল নিত্য নূতন ফন্দি আঁটত। একবার কয়েকজন নূতন কয়েদী আসার পর সুবল ঠিক করল সুবল তাদের কাছে পাগোল সাজবে। সুবলের নির্দেশ মত নবাগত বন্দীদের কাছে বর্তমান সব বন্দী রটাতে লাগল যে সুবল বদ্ধ পাগোল, কাউকে সামনে পেলেই কামড়ে দেয়। একদিন একটা নতুন ছেলেকে দেখেই সুবল চুপিসাড়ে পিছন থেকে গিয়ে মোক্ষমভাবে জাপটে ধরল। চোখ বড় বড় করে হাঁ করে কামড়ানোর ভাণ করতে লাগলো। ছেলেটা ভয়ের চোটে কেঁদেই ফেলল। তখন সুবল হেসে সব রহস্য ফাঁস করে দিল। তারপর সবাই মিলে সে কি হাসি।

সুবলদের সেলে এক নতুন জাঁদরেল কয়েদীর আগমন ঘটল। মোটাসোটা গোলগাল চেহারা। বয়স চল্লিশের উপর। মাথায় বিরাট টাক। কয়েক লক্ষ টাকার চিটিং কেসএ এরেস্ট হয়েছে। প্রত্যেক কয়েদীকে নতুন আসার পর তার খাওয়ার রেশনের জন্য দরখাস্ত দিতে হয়। তার ভিত্তিতে কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা গ্রহণ করে। এই নতুন কয়েদীটা রেশনের দরখাস্ত লিখে দেওয়ার জন্য সুবলকে অনুরোধ করল। সুবল দরখাস্ত লিখে দিয়ে লোকটাকে সই করতে বলল। সই নেওয়ার পর সুবল বলল, ‘এবার টিপসই দিন’। লোকটাকে ইতস্ততঃ করতে দেখে সুবল গম্ভীর স্বরে বলল, ‘এমনি সইত আপনি ভুল দিতে পারেন। তাই টিপ সই সবাইকেই দিতে হয়’। কথাটা সুবল ঠিকই বলেছিল। যাই হোক টিপ সই দিয়ে লোকটা যেই ঊঠতে যাবে সুবলের মাথায় দুষ্টু বুদ্ধি খেলে গেল। সুবল মনে মনে বলল, ‘বেশি চালাক হয়ে গেছ। দাঁড়াও মজা দেখাচ্ছি’। প্রকাশ্যে বলল, ‘আরে এখনি উঠছেন কেন?’
লোকটা বিরস মুখে বলল, ‘আবার কি ঝামেলা বাকি আছে?’

সুবল হাসি চেপে গম্ভীর স্বরে বলল, ‘এবার পায়ের ছাপ দিন’। লোকটা সুবলের কথা শুনে হেসে উঠল, সুবলের মুখের দিকে বার বার তাকাতে লাগল। তারপর সুবলের গম্ভীর মুখ দেখে কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে গেল। সুবল রাগত স্বরে বলল, ‘হাসির কি হল, আমি কি আপনার সাথে ঠাট্টা করছি?’

‘ঠাট্টা ছাড়া কি, রেশনের দরখাস্তে কখনো পায়ের ছাপ দিতে হয়, এরকম অদ্ভূত কথা কোনদিন শুনিনি বাপু’।
‘আগে কখনো জেল খেটেছেন?’

‘না। আমার মত লোককে এর আগে কেউ ফাঁসাতে পারেনি। এবার নসীব খারাপ ছিল, তাই ধরা পড়ে গেলাম’।
‘তাহলে আপনি জেলের নিয়মকানুন জানবেন কি করে?’

‘আমার পরিচিত অনেকে জেল খেটেছে, এমন আজগুবি নিয়মের কথাতো কারো মুখে শুনিনি’।

‘শুনবেন কি করে, এ নিয়মতো সম্পূর্ণ নতুন। সবাইকে জিজ্ঞেস করে দেখুন। আজকাল অনেকে দেয়াল টপকে পালাচ্ছে। তাই এখন থেকে পায়ের ছাপ রাখার নিয়ম হয়েছে। আপনি মশাই রাঘব বোয়াল, আমাদের মত চুনো পুঁটি না, আপনি এ নিয়মের কথা জানেননা শুনলে সবাই হাসবে। আপনি বোধ হয় জানেন নিয়মটা। আমার সাথে এমনি মজা করছেন’।

লোকটা আমতা আমতা করে বলল, ‘হ্যাঁ এরকম শুনেছিলাম যেন কার কাছে’, তারপর আর কথা না বাড়িয়ে পায়ের পাতায় কালি মেখে রেশনের দরখাস্তে পায়ের ছাপ দিল। তারপর গজগজ করতে লাগল, ‘যত্তসব আহাম্মকের নিয়ম!’

ব্যাপারটা জানাজানি হওয়ার পর হাসির কলরোল উঠল। পায়ের ছাপ ওয়ালা দরখস্ত ফর্ম নিয়ে সেলের এটেন্ডেন্ট এসে ব্যাপারটা শুনে হাসিতে তার পেট ফাটার যোগাড়। এদিকে সবার হাস্যাস্পদ হয়ে বেচারা নতুন কয়েদীর নাজেহাল অবস্থা। কয়েকদিন বাদে সুবলকে একান্তে ডেকে লোকটা বলল, ‘আপনি ওস্তাদ লোক মশাই। আমার মত পাকা লোককেও বোকা বানিয়ে দিলেন’।

সুবল মুচকি হেসে বলল, ‘আমার সাথে পরামর্শ করে চিটিং এর কাজটা করলে এভাবে ধরা পড়তেন না’।

লোকটা গম্ভীর হয়ে বলল, ‘আপনাকেত আগে চিনতামনা যে পরামর্শ নেব। তবে দুজনেইতো একদিন বাইরে বেরোব। আমার সাথে যোগাযোগ রাখবেন। আপনার মত লোককে পেলে অনেক বড় ব্যবসা শুরু করতে পারব’।
কথা বলতে বলতে সুবল বীণার প্রসঙ্গটা নিজেই তুলল। এতক্ষণের উচ্ছলতা উধাও হয়ে সুবলের চোখে মুখে বিষণ্ণতার ছায়া পড়ল।

‘দেখ সমর, আমি ভাবতাম মেয়েদের কথা, পুরানো দিনের কথা ভুলে যাওয়া বুঝি খুব সহজ। কিন্তু হাজার চেষ্টা করেও বীণার কথা কিছুতেই ভুলতে পারিনা। বীণার জন্য আমার ভিতরটা ছিঁড়ে খুঁড়ে তছনছ হয়ে গেছে। তবু আমি হার মানতে চাইনা সমর। আমাকে আবার নতুন করে ভাবতে হবে। আমি শিল্পী, আমি আবার শিল্পের সাধনায় ফিরে যাব। শিল্পের মধ্য দিয়ে আবার সুন্দর পৃথিবী গড়ার স্বপ্ন সৃজন করে যাব’।



কথামত কয়েকদিন বাদে আবার সুবল সমরের বাসায় এল। সুবলকে অনেকটা চিন্তিত আর বিষণ্ণ দেখাচ্ছিল। কাছের একটা দোকানে চা খেয়ে ওরা সমরের ঘরে ফিরে আসল। বেশ কিছুক্ষণ চুপ চাপ থাকার পর সুবল বলল, ‘আমি আর কলকাতা থাকছিনা, কয়েকদিনের মধ্যেই কলকাতা ছেড়ে চলে যাচ্ছি’। সুবলের কথাটা সমরকে এমনি হতভম্ভ করে দিল যে সমরের মুখে কোনো কথা যোগালনা। মিটিমিটি হেসে সুবল বলে চলল, ‘চলে যাব কি বলছি, আমাকে চলে যেতেই হবে’।সুবল তীক্ষ্ণ চোখে সমরের প্রতিক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করে চলেছে। সুবলের কথার ধরণ থেকে সমর বুঝতে পেরেছে সুবল ঠাট্টা করছেনা। সমর ভেবে পায়না সুবল আবার কেন চলে যাবে। সেই আগের মতই কলকাতার উপর বীতশ্রদ্ধ হয়ে পড়েছে কি? সেটা অসম্ভব নয়। এখানে থাকলেইতো বীণার স্মৃতি ওকে যন্ত্রণা দেবে। ফিরে এসে বীণার খবর জানবার পর সুবল কি করে এতদিন কলকাতায় থাকল সেটাইতো আশ্চর্যের বিষয়। কিছুটা ধাতস্থ হয়ে সমর বলল, ‘তোকে কেন চলে যেতে হবে?’

সুবল ম্লান হেসে বলল, ‘তুই হয়ত ভাবছিস কোনো সেন্টিমেন্টাল ব্যাপার। কিন্তু ব্যাপারটা আদৌ সেরকম নয়। পাড়ার মস্তানরা আমার নাটকের ক্লাব, যাকে আবার দাঁড় করিয়েছিলাম, তা তছনছ করেছে। আমাদের জানিয়ে দিয়েছে পাড়ায় থাকলে বিপদে পড়তে হবে। আমি ওদের জানি। খুন করা ওদের কাছে জলভাত। তা ছাড়া উপর মহলের নির্দেশে কলকাতা পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চ আবার নকশালদের সাথে যুক্ত সবাইকে হেনস্থা করা শুরু করেছে। আমার নাম একবার ওদের খাতায় উঠে গেছে। কলকাতায় থাকলে আমার আর রেহাই নেই’।

সমর বিনা দ্বিধায় বলল, ‘তুই আমার বাসায়ত থাকতে পারিস। আমিত এখানে একা থাকি আর এখানে তোকে কেউ চিনবেনা। কলকাতা ছেড়ে চলে যাবি কেন?’

‘তোর বাসায় থাকার প্রস্তাবটা খুবই ভালো। আমি নিজে থেকেই হয়ত তোর ওখানে কয়েকদিন থাকার কথা বলতাম। কিন্তু কয়েকদিন বাদে আমাকে কলকাতা ছাড়তে হবেই। গতিক ভালো না আমি বুঝতে পারছি। কদিন বাদেই স্পেশাল ব্রাঞ্চ আবার আমার খোঁজ খবর নেবে। তোর বাসায় থাকলেও রেহাই পাবনা। মাঝখান থেকে তুই ফেঁসে যাবি। আমাকে কয়েক দিনের মধ্যে কলকাতা ছেড়ে দূরে কোথাও চলে যেতে হবে, পশ্চিমবঙ্গের বাইরে কোথাও’।

‘তুই তাহলে আজ থেকেই আমার বাসায় থেকে যা না’।

‘হ্যাঁ, সেটাই ভালো হবে। আমি সাত আট দিনের মধ্যেই বাইরে যাওয়ার ব্যবস্থা পাকা করে নেব। তবে এ কদিনের মধ্যে যদি কিছু ঘটে তাহলে কিন্তু তুইও জড়িয়ে পড়বি। আর একবার জড়িয়ে পড়া মানে কি বুঝতে পারছিস। তাই একটু ভালো করে সবদিক ভেবে রিস্কটা নে’।

সমর বলল, ‘আমার আর ভাবার প্রযোজন নেই, যা হবার হবে। আমি এই সামান্য ঝুঁকিটুকু নিতে পারবনা?’
‘ঝুঁকিটা কিন্তু খুব সামান্য না’।

‘তবু আমার সিদ্ধান্ত পাকা। আজ থেকে বাইরে চলে যাওয়া পর্যন্ত তুই আমার বাসায় থেকে যাবি, কিছুদিন যাবত আমার কেবল মনে হচ্ছে একটা স্বার্থপর জীবন যাপন করে কিইবা পেলাম। তোকে কয়েকদিন শেল্টার দিলে সান্ত্বনা মিলবে জীবনে অন্ততঃ একটা ভালো কাজ করেছি’।

রাত দশটার সময় সুবল এল। বলল রাতের খাওয়া সেরে এসেছে। সমর একা বেরিয়ে হোটেল থেকে খেয়ে এল।
সুবল সিগারেটে টান দিতে দিতে বলল, ‘তুই কিন্তু ভাবিসনা যে আমি পালিয়ে যাচ্ছি বা আমার লক্ষ্য থেকে সরে যাচ্ছি। আসলে এ সময়টা ভীষণ খারাপ। কোন রকমে এ সময়টা কাটিয়ে দিতে হবে। একবার “মিসা” আইনে আটক হোলে জীবনে আর কোনদিন ছাড়া পাবনা’।

‘বাইরে চলে গেলে সকলের থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন বোধ করবিনা, হতাশ হয়ে পড়বিনা?’

‘এখন এখানেই বা কি যোগাযোগ আছে বল? কোন সত্যিকারে কমিউনিস্ট পার্টিওতো এখনো গড়ে ওঠেনি। তবে আমার দৃঢ় বিশ্বাস অবস্থা খুব তাড়াতাড়ি বদলে যাবে। দেখেছিস শাসকশ্রেণি নিজেদের মধ্যে কেমন লড়াই শুরু করে দিয়েছে। এতে জয়প্রকাশ আর ইন্দিরা দুজনের দলই দুর্বল হয়ে পড়বে’।

‘আচ্ছা এই বিরোধের মূল ব্যাপারটা কি আমাকে একটু বুঝিয়ে বলতে পারবি?’

‘সমর তুইতো জানিস, ভারত একটা আধা-সামন্ততান্ত্রিক, আধা-ঔপনিবেশিক দেশ। এদেশের বাজার দখল করার জন্য আমেরিকা আর রাশিয়ার মধ্যে তীব্র ঠাণ্ডা লড়াই চলছে। এই দুই সাম্রাজ্যবাদী শক্তির দ্বন্দ্বেরই অভ্যন্তরিন প্রতিফলন হচ্ছে জয়প্রকাশ-ইন্দিরা দ্বন্দ্’।

‘তাহলে তোরা এদের কাউকেই সমর্থন করছিসনা?’

‘আমার মনে হয় বর্তমান পরিস্থিতিতে জয়প্রকাশকেই মদত দেওয়া দরকার। এখানে ইন্দিরা শক্তিশালী, পুরো রাষ্ট্র যন্ত্রটা হাতে রয়েছে। জয় প্রকাশকে এই অবস্থায় মদত দিলে ইন্দিরাগোষ্ঠী দুর্বল হয়ে পড়বে। তবে একথা নিশ্চিত যে ইন্দিরাকে হঠাতে পারলে জয়প্রকাশরাই তখন আমাদের প্রধান শত্রু হয়ে দাঁড়াবে। এখন দু-দলের কোন্দল যত বাড়বে আমাদের পক্ষে ততই মঙ্গল। তাই বলছিলাম শীঘ্রই আবার একটা ভালো সময় আসবে আর তখন নিজেদের সংগঠিত করে নিতে হবে। তবে তার আগের মুহূর্তটা ভয়ঙ্কর। ইন্দিরা এখন আরো হিংস্র হয়ে উঠবে। মুখ বুজে এই সময়টা পার হওয়ার অপেক্ষা করতে হবে। তাই এখন কিছু দিনের জন্য পশ্চিমবঙ্গের বাইরে গিয়ে থাকব। সময় বুঝে আবার ফিরে আসব, আবার আসল লড়াইএ সামিল হব’।

‘তুই যে বলেছিলি সরাসরি রাজনীতি করবিনা, নাটক নিয়েই থাকবি’।

‘আমিত নাটক নিয়েই লড়াই চালিয়ে যাব। সাম্রাজ্যবাদ, সামাজিক-সাম্রাজ্যবাদ আর তাদের দালালরা, মুৎসুদ্দি বুর্জোয়া, জোতদার-জমিদার এরাও কেউ শোষণ ব্যবস্থাকে কায়েম রাখার জন্য শুধু অস্ত্রের জোরে লড়ছেনা। ওরা শিল্প-সংস্কৃতি, সাহিত্য, দর্শনের মধ্য দিয়েও জনবিরোধী প্রতিক্রিয়াশীল লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে। ওদের অস্ত্রের বিরুদ্ধে আমাদের গেরিলারা যেমন অস্ত্র ধরবে, তেমনি ওদের শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতির অস্ত্রের বিরুদ্ধেও আমাদের একই স্তরে লড়াই চালিয়ে যেতে হবে’।

কয়েকদিন বাদে সুবল হাওড়া স্টেশন থেকে নর্থ বিহার এক্সপ্রেসে চড়ে বসল। সমর সুবলকে ট্রেনে তুলে দিয়ে ফেরার পথে অনুভব করল ওর বুকের ভিতরটা সম্পূর্ণ খালি হয়ে গেছে।

পরিশেষ

বৃষ্টি নামল ঝমঝমিয়ে। সমরবাবু ছাতাটা খুলতে বাধ্য হলেন। মেকং নদীটা এখন প্রায় সম্পূর্ণ অদৃশ্য হয়েছে। সামনে শুধু বৃষ্টির ধারা, ঝরে চলেছে ঝরে চলেছে। সুবলের সেই স্বপ্নের সুন্দর দিন আর ফিরে আসেনি। সুবলও হারিয়ে গেছে কোন বিস্মৃতির গর্ভে। পশ্চিমবঙ্গে সেদিনের পর নেমে এসেছে নিকষকালো অন্ধকার।
মাত্র কয়েক মাস আগে সমরবাবু এমনি এক নদী সঙ্গমে দাঁড়িয়ে ছিলেন। কাটোয়ায় সাখাই ঘাটে অজয় আর গঙ্গার মিলনস্থল। গাড়ির ড্রাইভার ছুটতে ছুটতে এসে উদ্বিগ্ন স্বরে বলল, ‘স্যার নানূর দিয়ে ফেরা যাবেনা। ঘুরপথে কীর্ণাহার হয়ে ফিরতে হবে’।

‘কেন?’

‘নানূরের কাছে সি.পি.এম. এর হার্মাদরা বাড়িঘরে আগুন ধরিয়ে দিয়েছে। নির্বিচারে লুটপাট চালাচ্ছে। ভীষণ গন্ডগোল ওদিকে’।

ভিসার মেয়াদ আর মাত্র দুদিন। তারপর ব্যাঙ্কক হয়ে মাত্র কয়েক ঘণ্টার পথ। আবার সেই দুঃস্বপ্নের জগতে প্রত্যাবর্তন।

সমরবাবু বিষণ্ণ মনে আর একটা সিগারেট ধরালেন। একটা বছর বারোর কাম্বোজ মেয়ে ভিজতে ভিজতে সমরবাবুর সামনে এসে কয়েকটা ছবির এলবাম এগিয়ে ধরল, ‘ওয়ান দলার সার’। পরণে শতচ্ছিন্ন পোশাক। সমরবাবু দুটো এলবাম নিয়ে ওর হাতে দুই ডলার দিতেই মেয়েটা খুশি হয়ে উঠল। হাসিমাখা মুখে স্বপ্নের ছোঁয়া। সমরবাবুর মনটা আবার খুশিতে ভরে উঠল। স্বপ্ন নিয়েইত মানুষ বেঁচে থাকে। সমরবাবু আবার সুন্দর পৃথিবীর স্বপ্ন দেখতে দেখতে এগিয়ে চললেন হোটেলের দিকে।

সমাপ্ত

THE END

Previous: Chapter 9 >


Dr.Ratan Lal BasuRatanlal Basu, Ph.D. (Economics) is an ex-Reader in Economics and Teacher-in-Charge, Bhairab Ganguly College, Kolkata, India. Dr. Basu has written & edited several books on Economics.

Apart from his passion for the field of Economics, Dr. Basu's other interests are Boxing & Small Game Hunting (gave up the nasty games during college life); Swimming in Turbulent Rivers (physically impossible now); Himalayan Treks, Adventure in Dense Forests, Singing Tagore Songs and also writing travelogues and fiction in Bengali and English.

Dr. Ratan Lal Basu can be reached at rlbasu [at] rediffmail.com.