স্বপ্ন - রতন লাল বসু: নবম অধ্যায় | Shopno - A Bengali Novel by Dr. Ratan Lal Basu - Chapter 9 | WBRi Bangla Online Magazine

"Shopno" is a novel by Dr. Ratan Lal Basu published serially in the WBRi Bangla Magazine section in unicode Bangla font. Links to previous and following chapters are posted at the bottom of every episode.


স্বপ্ন

রতন লাল বসু

নবম অধ্যায়



শহরতলীর কো-এডুকেশন কলেজ। জায়গাটা শহরতলীর রেল স্টেশন থেকে কিছুটা দূরে। কলেজ থেকে সামান্য দূরে গঙ্গা। কলেজের ছিমছাম তিনতলা বাড়ি। সামনের মাঠে সবুজ পাতায় ছাওয়া কৃষ্ণচূড়া গাছ। কলেজ ক্যাম্পাসের বাইরে থেকে গঙ্গা পর্যন্ত ধানের ক্ষেত, জিলিপি বাবলা, ভেরেণ্ডা আর আকন্দ গাছের ঝোপঝাড়। ধান ক্ষেতের পাশে কয়েকটা ছোট টালির ছাতের ঘর। সামনের পুকুরের সাথে সংলগ্ন বাঁশের উপর বাঁধা সরু নৌকার মত জলসেচের সরঞ্জাম। একটা কাঁটাল গাছ পুকুরের উপর হেলে পড়েছে। কাঁটাল গাছের একরাশ পাতা পুকুরের উপরকার কচুরিপানার আস্তরণ ছুঁয়ে গেছে। কয়েকজন চাষী সরু নৌকাটার একটা কোণ নিচু করে পুকুরের জলে ডুবিয়ে দিচ্ছে। এবার বাঁশের উপর চাপ দিয়ে অপর কোণটা জমির দিকে হেলিয়ে দিতেই নৌকার জল জমিতে এসে পড়ছে।
কলেজের একতলার সিঁড়ির কাছে কয়েকটা ছেলেমেয়ে গল্প করছিল। সমর ওদের সামনে গিয়ে বলল, ‘টিচার্স রুমটা কোনদিকে?’ একটা ছেলে বলল, ‘দোতলায় উঠে সোজা ডানদিকে চলে যান’।

টিচার্স রুমে হেড-অব-দি ডিপার্টমেন্টের সাথে দেখা হল। ইন্টারভিউ এর সময়ই আলাপ হয়েছিল। সমরকে দেখে খুশি হয়ে বললেন, ‘আপনি তাহলে এসে গেছেন। আজই জয়নিং রিপোর্ট জমা দিন। আর বারোটার সময় আমার একটা ক্লাশ আছে। আপনি আজ ওটা নিয়ে নিন। কালকের মধ্যেই আপনার রুটিন হয়ে যাবে’।

হেড-অব-দি ডিপার্টমেন্ট মণিদা সমরকে ক্লাশে নিয়ে ছাত্র-ছাত্রীদের সাথে পরিচয় করিয়ে দিলেন। সমর ক্লাশে পড়াতে গিয়ে প্রথমে একটু জড়তা বোধ করছিল। তবে ছত্র-ছাত্রীরা একটুও গণ্ডগোল না করায় সমর কিছুক্ষণের মধ্যেই ধাতস্থ হয়ে গেল, ফিরে পেল আত্ম বিশ্বাস। ক্লাশের পর কিছু ছাত্রছাত্রী সমরের সাথে আলাপ করল। পড়ার ব্যাপারে কিছু জেনে নিল।

ওরা চলে যেতেই সমর বারান্দায় দাঁড়াল। গাছগাছালির ফাঁক দিয়ে গঙ্গা দেখা যাচ্ছে। ক্ষুদে ক্ষুদে নৌকায় দাঁড় বেয়ে চলেছে ক্ষুদে ক্ষুদে মানুষ। গঙ্গার ওপারে একটা ইঁটের ভাটির চিমনি থেকে একরাশ ধোঁয়া আকাশের বুক চিরে এঁকে বেঁকে চলেছে। সমরের আবার এক নতুন জীবন শুরু হতে চলেছে।



কিছুদিন আগেই পশ্চিমবঙ্গের ইলেকশনে ইন্দিরার কংগ্রেস বিশাল ব্যবধানে যুক্তফ্রন্টকে হারিয়ে দিয়েছে। সি.পি.এম. প্রায় নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। সব কলেজেই এখন ইন্দিরা কংগ্রেসের ছাত্র পরিষদের ইউনিয়ন। পশ্চিমবঙ্গে দুঃসময় কেটে গিয়ে শান্তি এসেছে। কেমন একটা থমথমে ভাব। একেই কি বলে শ্মশানের শান্তি? সমর উদাস মনে গঙ্গার দিকে চেয়ে থাকে।

পরদিন থেকে সমরের রুটিন মাফিক ক্লাশ শুরু হল। মণিদা সমরকে নিয়ে বসে রুটিন বুঝিয়ে দিলেন, হেসে বললেন, ‘এখন থেকে আমি তুমি সম্বোধন করছি’। সমর সপ্রতিভভাবে উত্তর দিল, ‘আমিওতো ভাবছিলাম আপনাকে সেটা বলব, আর আমি আপনাকে মণিদা বলে ডাকব’।

মণিদা এবার বললেন, ‘তুমি কিন্তু নিজের মত নিয়ম মেনে ক্লাশ করে যাবে। আমার মতই ঘন্টা পড়ার সাথে সাথে ক্লাশে চলে যাবে। অন্য কারো কথায় কান দেবেনা। আর রাজনৈতিক আলোচনা থেকে যথাসম্ভব দূরে থাকবে’।
কয়েকদিন পরের ঘটনা। ঘন্টা পড়ার সাথে সাথে সমর এটেনডেন্স রেজিস্টার নিয়ে ক্লাশে চলেছিল। বিনোদদা পেছন থেকে ডেকে বললেন, ‘কি হে সমর ঘন্টা পড়তে না-পড়তেই ক্লাশে চললে দেখছি!’

রবীনদা বললেন, ‘আরে যেতে দাও। নতুন এলে একটু বেশি উৎসাহ হয়। কয়েকদিন বাদে সব ঠিক হয়ে যাবে’।
বিনোদদা বললেন, ‘তবু ওকে প্রথম থেকেই বলে দেওয়া ভালো। নাহলে ছাত্র-ছাত্রীরা পেয়ে বসবে। বুঝলে সমর, ঘন্টা পড়ার পর কমপক্ষে পনর মিনিট অপেক্ষা করে তারপর ক্লাশে যাবে’।

সমর সোজা ক্লাশে চলে গেল। কিন্তু মনটা ভীষণ খারাপ হয়ে গেল। কলেজের চাকরিতে ঢুকে সমর কত আদর্শের কথা চিন্তা করেছে। কিন্তু কয়েকদিনের মধ্যেই অধ্যাপক শ্রেণির যা পরিচয় পেতে শুরু করেছে, তাতে এদের সাথে একসাথে কাজ করবে কি করে? ওরা যা বলে বলুক, সমর নিজের দায়িত্ব পালন করে যাবে। তাতে ওরা যদি সমরকে একঘরে করে দেয় তাও সই।

ক্লাশ শেষে টিচার্স রুমে ফিরে সমর একটা সিগারেট ধরাল। দুজন ছাত্রী দরজার কাছ থেকে বলল, ‘আসব স্যার?’
সমর ওদের আসতে বলল। ভিতরে ঢুকে একটা মেয়ে বলল, ‘স্যার, আপনি যেটা ক্লাশে পড়িয়েছিলেন আমরা সেটা লিখেছি। একটু খাতাটা দেখে দেবেন স্যার?’

সমর বলল, ‘এখনতো আমি বাড়ি ফিরব। তোমরা বরং খাতা দুটো রেখে যাও, আমি বাড়িথেকে দেখে কাল ফেরত দিয়ে দেব’। মেয়েদুটো খাতা দিয়ে চলে গেল।

রবীনদা হেসে বললেন, ‘কিহে সমর এরমধ্যেই ছুকরিগুলোর সাথে খুব জমিয়েছ দেখছি। ওরা ইয়ং ছেলে পেয়েছে, এই বুড়োদের কি আর পাত্তা দেবে? সাবধান। একদম তলিয়ে যেওনা যেন’।

কলেজে শিক্ষকদের মধ্যে দুটো গ্রুপ। একটা তরুন সরকারের আর একটা রথীন সামন্তর। কলেজের শুরু থেকেই নাকি এই দু-দলের লড়াই চলে আসছে। কলেজের প্রিন্সিপ্যাল, অশিক্ষক কর্মচারি এমনকি ছাত্রদেরও এরা নিজেদের দলের দিকে টানার চেষ্টা করে। আজ টিচার্স রুমে তরুনবাবুর দলের কেউ নেই। রথীন বাবুর দলের লোকেরা নিজেদের মধ্যে গুজগুজ ফুসফুস করে আলোচনা করছেন। তরুনবাবুর দল নাকি প্রিন্সিপ্যালকে হাত করে ফেলেছে। তাই ওদের দারুণ দুশ্চিন্তা। এই ক্লেদাক্ত পরিবেশে বসে থাকতে সমরের একদম ভালো লাগেনা। ক্লাশ আর নেই। সমর কলেজ থেকে বেরিয়ে পড়ল। গঙ্গার ধার দিয়ে অনেকটা হেঁটে গেল। কয়েকটা জিলিপি বাবলার গাছ জোয়ারের গঙ্গায় ঝুঁকে পড়েছে। আসেপাশে ঢেঁকিশাকের ঘন জঙ্গল। গঙ্গার ঘোলাটে জলে অপূর্ব ঢেউএর খেলা। কি অপরূপ লাগছে গঙ্গাকে। আর সামান্য দূরেই কলেজ, শিক্ষক সমাজ। সমর সেই সমাজের একজন আজ। প্রথমে কলেজে ঢোকার পর সমরের খুব গর্ব হয়েছিল সে একজন কলেজের অধ্যাপক বলে। কিন্তু এ কি দেখছে সে! এই অধ্যাপকদেরই লোকে এত শ্রদ্ধা করে!

একদিন কলেজ যাওয়ার পথে মিহির বাবুর সাথে দেখা হল। লম্বা-চওড়া সুন্দর চেহারা। পরণে ফিনিফিনে ধূতি আর ঘী-রঙের পাঞ্জাবী। সব মিলিয়ে আভিজাত্যের ছাপ। দুজনেরই ক্লাশের তখন অনেকটা দেরি ছিল। মিহির বাবু বললেন, ‘চল সমর চা খেয়ে নেওয়া যাক’।

একটা ছোট্ট চায়ের দোকানে ওরা ঢুকল। বেঞ্চে বসে কয়েকটা ছেলে গল্প করছিল। ওরা সমরদের জায়গা ছেড়ে দিল। চা খেতে খেতে মিহিরবাবু বললেন, ‘দেখেছ সমর রথীনদের গ্রুপ কি আরম্ভ করেছে। ওরা অভিযোগ করছে আমরা নাকি প্রিন্সিপ্যালকে হাত করে অনেক সুবিধা আদায় করছি। আরে, তোরাওতো এতদিন প্রিন্সিপ্যালকে দিয়ে অনেক কাজ করিয়ে নিয়েছিস! তখন কোনো দোষ হয়নি, আর আমাদের বেলা যত দোষ!’

সমর বলল, ‘মিহিরদা, আমি কোনো গ্রুপে নেই। এসব দলাদলি আমার একদম ভালো লাগেনা’।

‘তুমি নতুন এসেছ তাই এসব বলছ। এ-কলেজে থাকলে বুঝতে পারবে একটা না একটা গ্রুপে তোমাকে যেতেই হবে। না হলে টিকতে পারবেনা। আমি তরুনবাবুকে সমর্থন করি কারণ তিনি নিজের স্বার্থ দেখেননা, সব সময় ন্যায় এর পক্ষে’।

‘ঠিক আছে আমিতো এসব কিছু এখনো জানিনা। আস্তে আস্তে সব ভালো করে বুঝে নি। তখন যাদের ভালো মনে হবে তাদের দিকে যাব’।

‘রথীন কিন্তু ভয়ঙ্কর শ্রুড। ওর কথার মারপ্যাঁচে ভুলোনা কিন্তু’।

‘মনে থাকবে’ কথাটা গম্ভীর ভাবে বলে সমর সোজা কলজের দিকে পা বাড়ায়।



মাস কয়েক হল তরুনবাবুর গ্রুপ প্রিন্সিপ্যালকে হাত করে ফেলেছে। এর আগে তিনি রথীনবাবুদের দিকে ছিলেন। তখন তারা অনেক সুযোগ সুবিধা আদায় করে নিয়েছে। ইভ্নিং সেকশনের ইনচার্জশিপ, বার্সার-এর পদ, ইভ্নিং সেকশনের অনেক পার্টটাইম লেকচারারের পোষ্ট সব এখন রথীনবাবুদের হাতছাড়া হয়ে তরুনবাবুদের দখলে এসেছে। রথীনবাবুরা সরবে এসব ‘অনাচারের’ প্রতিবাদ জানাচ্ছেন। অথচ আগে তাঁরাই অনায়াসে, বিবেকের সামান্য দংশন ছাড়াই এসব সুবিধা ভোগ করে এসেছেন। সমরতো কোন বাড়তি সুবিধা প্রত্যাশা করেনা। তবে কেন দলে ভিড়তে যাবে! কোন দলে না ভিড়লে নাকি অনেক বিপদের সম্ভাবনা আছে। দুদলের পাণ্ডারাই ঝানু লোক। কখন যে কি চক্রান্ত করে বিপদে ফেলে দেবেন তা সমরের মত একজন অনভিজ্ঞ ছেলের পক্ষে বোঝা অসম্ভব। কোন গ্রুপের সাহায্য ছাড়া কে বাঁচাবে তখন?

পার্টটাইমার ব্রজকিশোরকে নিয়ে দুদলের লোকেরাই এখন খুবই চিন্তিত। তিনি নাকি কোন দলকেই তোয়াক্কা করছেন না, ছাত্রদের মধ্যে দারুণ ফিল্ড করে ফেলেছেন, দুদলের কেউই নাকি অনেক চেষ্টা করেও যা পারেননি। ব্রজবাবু নাকি ছাত্রদের সাথে খোস গল্প করেন, এমনকি একসাথে সিগারেটও খান। ছাত্র পরিষদের পাণ্ডারা নাকি ব্রজবাবুর কথায় ওঠে বসে।

ব্রজবাবুর সাবজেক্টে একটা ফুল টাইম পোস্ট খালি হয়েছে। দুদলেরি ক্যান্ডিডেট আছে অথচ ব্রজবাবু নাকি ওই পোস্টটা দাবী করছেন। দুদলই এ ব্যাপারে এককাট্টা হয়ে ব্রজবাবুর বিরোধিতায় নেমেছেন। তাঁকে পার্টটাইম থেকেও হটানোর চেষ্টার কসুর করছেননা দুদল। কিন্তু ছাত্রদের ভয়ে প্রিন্সিপ্যাল হুট করে কিছু করতে সাহস পাচ্ছেন না।
রেল স্টেশনে সেই বিতর্কিত ব্রজবাবুর সাথে সমরের একদিন আলাপ হয়ে গেল। ছিপছিপে চেহারা। ফর্সা রঙ। বয়সে সমরের চেয়ে দু-চার বছরের বড় হবেন। একটা স্কুলে স্থায়ী পদে চাকরি করছেন, আর এখানে পার্ট টাইমার। ব্রজবাবু বললেন, ‘দেখুন কতদিন ধরে এখানে পার্ট টাইম কাজ করছি। হোল টাইম পোস্ট এর উপর আমার একটা ক্লেম আছে। ওরা চক্রান্ত করছে আমাকে ঢুকতে দেবেনা। দেখি ওরা আমাকে কি করে ঠেকাতে পারে!’ ব্রজবাবুর সাথে সেদিন সমরের অনেকক্ষণ আলাপ হল। ব্রজবাবু বললেন, ‘আসুননা সমরবাবু, আমরা কয়েকজন ইয়ং ছেলে মিলে একটা থার্ড গ্রুপ করি’। সমর কায়দা করে কথাটাকে এড়িয়ে গেল।

সমর আবার রিসার্চ শুরু করে দিল। একজন ভালো গাইডও পেয়ে গেল। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে পি.এইচ.ডি.র জন্য নাম রেজিস্ট্রি করিয়ে নিল। রিসার্চ আর পড়াশুনা নিয়ে থাকলে কলেজের ক্লেদাক্ত পরিবেশের কথা ভুলে থাকা যায়। সমর ক্লাশ নিয়েই কলেজ থেকে চলে আসে, পারতপক্ষে কোন আলাপ আলোচনায় থাকেনা। সমর কলেজের কাছাকাছি একটা বাসা ভাড়া করেছে। একটা পাঞ্জাবী হোটেলে খায়। সমর সব সময় রিসার্চের কথা নিয়ে ভাবার চেষ্টা করে। এখানে পড়ে থাকলে চলবেনা, ডক্টরেট করে বিদেশে চলে যেতে হবে। সম্ভব হলে তার আগেই। আমেরিকার ইউনিভার্সিটিতে দরখাস্ত করার জন্য সমর GRE (Graduate Record Examination) আর TOEFL (Test of English as a Foreign Language) পরীক্ষার প্রস্তুতি নিতে থাকে। সমর আশায় বুক বাঁধে, একদিন সুন্দর জীবনের দেখা পাবেই, এই ক্লেদাক্ত পরিবেশে কোন রকমে কয়েকটা বছর কেটে যাবেই।



ছাত্র সমাজও আর আগের মত নেই। মাত্র কয়েক বছরের মধ্যে ছাত্রদের এমন নৈতিক অধঃপতন কি করে সম্ভব হল সমর ভেবে কূল পায়না। যুগের পরিবর্তনের সাথে সাথে মূল্যবোধ পরিবির্তিত হয়, যারা পুরানো তারা নতুনদের সাথে খাপ খাইয়ে চলতে পারেনা। কিন্তু এ-তো সেই জেনারেশন গ্যাপ নয়, এ-যে আমূল বদলে যাওয়া। অনেকদিন পরে দেখলে চেনা মানুষকেও অচেনা বলে মনে হতে পারে। কিন্তু এ যেন সে মানুষটার শরীর ভারি রোলার দিয়ে দুমড়ে মুচড়ে তাকে এক মাংশপিণ্ডে পরিণত করার সামিল। ছাত্র সমাজের উপর কে হানল এই নিষ্ঠুর আঘাত,কে তাদের ধ্যান-ধারণা, নীতি, বিবেক, মানবিকতা সব কিছু রোলার দিয়ে সম্পূর্ণ গুঁড়িয়ে দিয়েছে!

পড়াশুনা করাটা আজকাল যেন এক হাস্যকর ব্যাপারে পর্যবসিত হয়েছে। পরীক্ষার হলে বই খুলে নকল করাত একটা নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা। ওটা বুঝি পরীক্ষার্থীদের সংবিধান প্রদত্ত মৌলিক অধিকার। আগে নকল ধরা পড়লে খাতা ক্যানসেল হত। আর এখন নকলের কাগজ কেড়ে নিলেই ধুন্ধুমার কাণ্ড বেধে যায়। তবে নকল করতে দেওয়া হবে কি হবেনা সেটা নির্ভর করে পরীক্ষার্থীরা পরীক্ষাকেন্দ্রের ছাত্র পরিষদ নেতাদের সুনজরে কি কূনজরে আছে তার উপর। সুনজরে থাকলে অবাধে নকল চলতে থাকে। আর সুনজরে না থাকলে ছাত্র নেতারাই হলে ঢুকে নকল ধরতে থাকে। সাধারণ ছাত্রদের আবার নকল করার জন্য পরীক্ষাকেন্দ্রের ছাত্র পরিষদ নেতাদের চাঁদা দিতে হয়। যারা নকল করতে চায়না তাদের কাছ থেকেও জোর করে চাঁদা আদায় করা হয়। চাঁদা না দিলে সে পরীক্ষাই দিতে পারবেনা। ছাত্র পরিষদের নেতারা নিজেদের পছন্দ মত সেন্টারে সিট ঠিক করে নেয়। আর হোম সেন্টার হলেত কথাই নেই। তারপর তারা বিশেষ ঘরে দরজা বন্ধ করে পরীক্ষা দেয়। কোন ইনভিজিলেটর থাকবেনা। ছাত্র নেতাদের নিজের পক্ষে টানার জন্য বিভিন্ন গ্রুপের অধ্যাপকরা এসব ছাত্রদের সাহায্য করেন, কেননা এরা বই বা নোট পেলেও সঠিক উত্তর কোথা থেকে লিখতে হবে তা ঠিক করতে পারেনা।

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশ্নপত্র পরীক্ষার অনেক আগেই ফাঁস হয়ে যায়। তাছাড়া রেজাল্ট বেরোনোর পরও বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র নেতাদের টাকা দিলে তারা ফেল করা ছাত্রদের নম্বর বাড়িয়ে পাশ করিয়ে দিতে পারে। বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকদের মধ্যেও দলাদলি আর তার ফলে ছাত্র নেতারা তাদের কাছ থেকে অনেক সুযোগ সুবিধা পেয়ে যায়।
এই ডামাডোলের বাজারে সৎ ছাত্রছাত্রীদের চূড়ান্ত দুর্দশা। একে পরীক্ষার হলে গণ্ডগোল তার উপর বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা দপ্তরেও অরাজকতার চূড়ান্ত। কারা প্রশ্নপত্র করবেন সেটা যোগ্যতার ভিত্তিতে ঠিক না হয়ে সুপারিশের জোরেই ঠিক হয়। প্রশ্নপত্রের মডারেটর, খাতার পরীক্ষক, স্ক্রুটিনাইজার, ট্যাবুলেটর, এরাও সব সুপারিশের ভিত্তিতে নির্বাচিত হন। যাঁরা প্রশ্নপত্র তৈরি  করেন তাঁদের অনেকেরই সিলেবাস সম্বন্ধে ধারণা না থাকায় আবোল তাবোল প্রশ্ন করেন। খাতা দেখার ব্যাপারে পরীক্ষকরা খুবই অল্প সময় পান, যদিও রেজাল্ট বের হতে বছর কাবার হয়ে যায়। তার উপর খাতা পড়ে অযোগ্য লোকের হাতে। খাতা দেখার আগেই খাতা হারিয়ে যায়। অবহেলার সাথে খাতা দেখা হয়। একজনের নম্বর আর একজনের ঘাড়ে চাপে। ব্যাক,ইনকমপ্লিট রেজাল্ট এসবের দাপটে সাধারণ ছাত্রছাত্রীদের নাভিশ্বাসের যোগাড়।

কলেজের অফিস থেকে পরীক্ষার ফী জমা দেওয়ার ফর্ম হারিয়ে যায়, কারো এডমিট কার্ড সময়মত আসেনা। কারোবা এডমিট কার্ডে ভুল রোল নম্বর বসে যায়। পরীক্ষার আগের মুহূর্ত পর্যন্ত ছাত্ররা সঠিক ভাবে জানতে পারেনা সিট কোথায় পড়েছে। কোন ইনভিজিলেটর যদি নকল সম্বন্ধে বিশ্ববিদ্যালয়ে রিপোর্ট করেন পরীক্ষার্থীরা কনট্রোলার অফিসে চড়াও হয়ে তাঁদের নাম জেনে নেয়। বিশ্ববিদ্যালয় কখনো দায়িত্ব নিজের কাঁধে রাখতে চায়না। তারপর রিপোর্টকারী অধ্যাপকের হেনস্থার একশেষ। পথে ঘাটে অশ্লীল গালাগাল দেবে এবং অনেক সময় ছোরা পিস্তল বুকে ছুঁইয়ে রিপোর্ট তুলে নিতে বাধ্য করবে।

ছাত্র নেতাদের অধিকাংশই নিজেদের পার্টি সম্বন্ধে কিছুই পড়া শুনা করেনা। শুধু জানে মারদাঙ্গা করতে আর ইউনিয়নের টাকা যথেচ্ছভাবে খরচ করতে। মদ খাওয়া, বেশ্যাবাড়ি যাওয়া এসব ছাত্রনেতাদের কাছে জলভাত। উৎসব অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে কলেজের ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে অবাধ যৌন ব্যাভিচার চলে। একবার সরস্বতী পূজোর রাতে এক মস্তান ছাত্র এক ছাত্রীকে সঙ্গে করে কলেজের দারোয়ানকে বলল, ‘একটা ঘর খুলে দে, আমরা শোব’। দারোয়ান আপত্তি তুলল। তখন মস্তান তার দলের ছেলেদের ডেকে দারোয়ানকে বেদম মারল। রথীনবাবুর দলের লোকেরা এব্যাপার নিয়ে দারুন হৈচৈ বাধালেন। প্রিন্সিপ্যাল আর তরুনবাবুরা ছাত্রনেতার পক্ষ নিলেন। সব ব্যপারটাকে ধামা চাপা দিলেন। দারোয়ানকে চাকরির ভয় দেখিয়ে প্রিন্সিপ্যাল স্বীকৃতি লিখিয়ে নিলেন যে সে রাতে কিছুই হয়নি, কলেজে কোন ছাত্রই আসেনি।



জিনিসপত্রের দাম হুহু করে বাড়ছে। মানুষের জীবন অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে। তবু কেউ কোন প্রতিবাদ জানায়না, কংগ্রেসের মস্তানদের ভয়ে সবাই জুজু বনে গেছে। চাকরির বাজার ভয়ঙ্কর খারাপ। এম.এল.এ.র সাহায্য না পেলে চাকরি, মিনিবাসের পারমিট, ব্যবসার জন্য ব্যাঙ্কের লোন কিছুই পাওয়া যায়না। তাই দলে দলে ছেলে চাকরি বা অন্যকোনো সুযোগের আশায় যুব কংগ্রেসে ভিড়ছে। সেখানে আজকাল এত ভিড় যে সেখানে ঢুকেও আর কোনো লাভ হচ্ছেনা।

আগে ট্রামে-বাসে, পথে-ঘাটে, চায়ের দোকানে মানুষ রাজনীতি আর দেশের সমস্যা নিয়ে আলোচনায় মুখর হয়ে উঠত। এখন সব মানুষ কেমন গুম মেরে গেছে। এক অদৃশ্য আতঙ্ক সব মানুষকে সদা নিয়ত তাড়িত করে চলেছে। কেউ কাউকে বিশ্বাস করে মন খুলে কথা বলতে পারেনা। এই যে সমাজ-সচেতন, সমস্যা-সচেতন, প্রতিবাদমুখর বাঙালীরা হঠাৎ থমকে থেমে নীরব হয়ে গেছে এটা কি বড় কোন ভয়ঙ্কর ঘটনার, কোন বৈপ্লবিক পরিবর্তনের পূর্বাভাস। সমর ঠিক ভেবে পায়না।

সেদিন কলেজের টিচার্স কাউন্সিলের মিটিং এর জন্য বেলা দুটোর পর ক্লাশ ডিসল্ভ হয়ে গেল। মাঝে মাঝেই এরকম মিটিং হয়। সেদিন কিছু ভালো ছাত্র-ছাত্রী অনুযোগ করল, ‘স্যার, প্রায়ইতো আপনাদের মিটিং এর জন্য ক্লাশ নষ্ট হয়। তাছাড়া অনেকেত এমনিই কোনো ক্লাশ করেননা’। সমরে উত্তর দেওয়ার কিছু ছিলনা। কিন্তু কথাটা সমরের মনে খুব লাগলো। সত্যিতো,কলেজের অধ্যাপকরা নিজেদের সমস্যা, নিজেদের ব্যাপার-স্যাপার নিয়েই সদা ব্যস্ত। ছাত্রদের কথা, তাদের সমস্যার কথা ওঁরা কখনো ভাবেননা। এসব কথা কাউকে বলেও কোন লাভ নেই। মিছিমিছি টিটকিরি শুনতে হবে।

সব অধ্যাপকদের যাথে মিটিং এ স্থান সঙ্কুলান হয় সেজন্য আজ অনেক বেশি চেয়ারের সমাবেশ হয়েছে টিচার্স রুমে। সমর পিছনের দিকের একটা চেয়ারে বসল। এসব আলোচনা শুনতে সমরের আদৌ ভালো লাগেনা। চুপচাপ পিছনে বসে কোন রকমে সময়টা কাটিয়ে দিতে পারলেই হল।

প্রিন্সিপ্যাল আসার পর মিটিং শুরু হল। প্রথম থেকেই দু দলের মধ্যে অল্প স্বল্প কথা কাটাকাটি চলতে লাগল। রোজই এমন হয়ে থাকে। চুপচাপ বসে থাকতে থাকতে সমরের একটু ঘুমের ঝিমটি এসেছিল। হঠাৎ টেবিল চাপড়ান আর চিৎকার চেঁচামেচিতে সমর ধড়মড় করে উঠে বসল। দু পক্ষের মধ্যে ভয়ঙ্কর ঝগড়া শুরু হয়ে গেছে। চলছে অশ্রাব্য গালিগালাজের ফুলঝুরি। একজন আস্তিন গুটিয়ে মারপিট করতে উঠে পড়লেন। অন্যেরা তাঁকে ধরে আটকালেন। প্রিন্সিপ্যাল ঠান্ডা মাথার লোক। বললেন, ‘আপনারা এসব কি শুরু করেছেন? ছাত্রছাত্রীরা, বেয়ারারা সব শুনছে। ওরা হাসা হাসি করছে’। অবশেষে ঝগড়া কিছুটা থামল। মিটিং শেষ হতে সন্ধ্যা উতরে গেল। সমর ঠিক করল আর কোনদিন মিটিংএ থাকবেনা। ছি ছি, এদের একটুও কাণ্ডজ্ঞান নেই, আত্মসম্মান বোধ নেই! বাইরে থেকে বেয়ারারা, ছাত্রছাত্রীরা সব শুনতে পাচ্ছিল। এঁরাই নিজেদের শিক্ষক, সমাজের মাথা বলে দাবি করেন! নাঃ, একটা চাকরি করতে হয় তাই। কলেজের কোনো ব্যাপারে সমর আর থাকবেনা। ক্লাশ নিয়েই কলেজ থেকে কেটে পড়বে। মনযোগ দিয়ে রিসার্চের কাজ চালিয়ে যেতে হবে। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ডক্টরেট ডিগ্রি পেতে হবে।

একদিন মেট্রো হলে ইভ্নিং শোতে সিনেমা দেখে সমর হাঁটতে হাঁটতে শিয়ালদহ স্টেশনের দিকে চলেছিল। নানান জাতের মানুষ আর কলকাতার কর্মব্যস্ততা দেখতে দেখতে পথ চলতে সমরের খুব ভালো লাগে। তবে কয়েকবছর যাবৎ কলকাতার ভিড় ক্রমাগত বেড়েই চলেছে। হোস্টেলে থাকতে সমর প্রায়ই হাঁটতে হাঁটতে এসপ্ল্যানেড চলে যেত, আবার হেঁটেই হোস্টেলে ফিরে আসত। কখনো তড়িৎকে সঙ্গে নিয়ে আসত। মাত্র পাঁচ বছর আগের কথা। তখন কিন্তু পথে ঘাটে, ট্রামে-বাসে অনেক কম ভিড় হত। মাত্র কয়েক বছরের মধ্যেই কলকাতার জনসংখ্যা যেন বেশ কয়েকগুণ বেড়ে গেছে।

সমর ধর্মতলা রোডের ভিড় ঠেলে হাঁটতে হাঁটতে প্রাণচঞ্চল মৌলালীর মোড়ে পৌঁছে সিগারেট ধরাল।
‘এই যে সমরবাবু’।

সমর এদিক ওদিক তাকিয়ে চেনা কাউকে দেখতে না পেয়ে ভাবল কেউ অন্য কোন সমরকে ডেকে থাকবে। তারপর ভিড়ের দিকে ভালোকরে তাকাতেই ব্রজবাবুকে দেখতে পেল। সমর এগিয়ে গেল। ব্রজবাবু প্রশ্ন করলেন, ‘এদিকে কোথায় গিয়েছিলেন?’

‘মেট্রোতে একটা সিনেমা দেখে ফিরছি। ভিড় বাসে ওঠা দায়, তাই হেঁটেই চলেছি। শিয়ালদা থেকে ফেরার ট্রেন ধরব। আপনি কোথায় যাচ্ছেন?’

‘একটা টিউশনি করে ফিরছি। সামনেই আমার মেস, চলুননা’।

‘আজ থাক, অনেক রাত হয়ে যাবে। পরে একদিন নিশ্চয়ই আসব’।

‘আপনি শিয়ালদা হয়ে যাবেনতো। চলুন গল্প করতে করতে আপনাকে একটু এগিয়ে দি’।

ব্রজবাবু একটু দ্বিধা করে প্রশ্ন করলেন, ‘আপনি কালকের টিচার্স কাউন্সিলের মিটিং এ ছিলেন?’

‘ছিলাম’ সমর সংক্ষিপ্ত উত্তর দিল।

‘আমার ব্যাপারে কিছু আলোচনা হয়েছে?’

‘কি করে জানব, আমিতো ভালোকরে কিছুই শুনিনি। শুনব কি, কি নিয়ে যেন ভীষণ ঝগড়া ঝাটি হচ্ছিল’।

‘ওরকম সব মিটিং এই হয়। আচ্ছা দেখেছেন কেমন অন্যায়, পার্ট টাইমারদের মিটিং এটেণ্ড করতে দেওয়া হয়না। অন্য সব কলেজে এরকম কোন বিধিনিষেধ নেই। আপনি পরের মিটিং এ বিষয়টা তুলুননা’।
আমি আবার মিটিং ফিটিং এ বিশেষ কথা বলতে পারিনা’।

‘একবার সাহস করে উঠে দাঁড়াবেন, দেখবেন প্রাথমিক জড়তা কেটে যাবে। প্রথম প্রথম সবারই একটু অসুবিধা হয়, নার্ভাস বোধ হয়, হাত-পা-গলার স্বর কেঁপে যায়। তার পর সব ঠিক হয়ে যায়’।

Next: Chapter 10 >

Previous: Chapter 8 >


Dr.Ratan Lal BasuRatanlal Basu, Ph.D. (Economics) is an ex-Reader in Economics and Teacher-in-Charge, Bhairab Ganguly College, Kolkata, India. Dr. Basu has written & edited several books on Economics.

Apart from his passion for the field of Economics, Dr. Basu's other interests are Boxing & Small Game Hunting (gave up the nasty games during college life); Swimming in Turbulent Rivers (physically impossible now); Himalayan Treks, Adventure in Dense Forests, Singing Tagore Songs and also writing travelogues and fiction in Bengali and English.

Dr. Ratan Lal Basu can be reached at rlbasu [at] rediffmail.com.