স্বপ্ন - রতন লাল বসু: অষ্টম অধ্যায় | Shopno - A Bengali Novel by Dr. Ratan Lal Basu - Chapter 8 | WBRi Bangla Online Magazine

"Shopno" is a novel by Dr. Ratan Lal Basu published serially in the WBRi Bangla Magazine section in unicode Bangla font. Links to previous and following chapters are posted at the bottom of every episode.


স্বপ্ন

রতন লাল বসু

অষ্টম অধ্যায়



পূর্ব পাকিস্তানে কিছুদিন যাবত রাজনৈতিক গোলযোগ চলছিল। পূর্ববাংলার নেতা শেখ মুজিবর রহমানের সাথে বাঙালীদের অধিকার নিয়ে বিরোধ বাধল পাকিস্তানের মিলিটারি শাসক ইয়াহিয়া খানের। এই বিরোধ চূড়ান্ত রূপ নিল যেদিন মুজিবর পূর্ববাংলার স্বাধীনতা ঘোষণা করলেন। পাকিস্তানি সৈন্যরা পূর্ববাংলার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। শুরু করে দিল ভয়াবহ তাণ্ডব। মানুষের উপর অবর্ণনীয় অত্যাচার, নির্বিচার হত্যা, নারীধর্ষণ। সে এক নারকীয় অবস্থা। লক্ষলক্ষ বাঙালী বাড়িঘর আত্মীয়-স্বজন ছেড়ে আশ্রয়ের আশায় আন্তর্জাতিক সীমানা অতিক্রম করে পশ্চিমবঙ্গে ঢুকে পড়ল। ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর দৌলতে পশ্চিমবঙ্গের সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতে সরকারি আশ্রয় পেল লক্ষলক্ষ রিফুজি। পূর্ববাংলার মুক্তিযোদ্ধাদের সব রকমের সাহায্য দিতে শুরু করলেন ভারত সরকার। প্রকৃতপক্ষে মুজিবরের ঘোষিত স্বাধীন রাষ্ট্র‘বাংলা দেশ’ কে প্রথম স্বীকৃতি দিলেন ভারত সরকার।

এদিকে পুর্ব-পাকিস্তানের ঘটনা নিয়ে নকশালদের উপদলীয় কোন্দল চূড়ান্ত রূপ নিল। নকশালদের প্রধান দল সি.পি.আই. (এম.এল.) এর এক গোষ্ঠীর মতে চীন যেহেতু পাকিস্তানকে সমর্থন করছে তারাও তাই করবে। আর এক গোষ্ঠী আবার পূর্ববাংলার মুক্তিযোদ্ধাদের সমর্থন জানালো। এই গোলযোগের সূত্র ধরে নকশালদের বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে অন্যান্য মতপার্থক্যও তীব্র আকার ধারণ করল এবং অবশেষে সি.পি.আই. (এম.এল.) টুকরো টুকরো হয়ে ভেঙ্গে পড়ল। এক উপদলের ছেলেরা অন্য উপদলের ছেলেদের খুন করতে লাগল, পুলিশের কাছে ধরিয়ে দিতে লাগল। বড় বড় নকশাল নেতারা একে একে ধরা পড়তে লাগলেন। ভারতবর্ষের অন্যান্য অঞ্চলেও নকশাল আন্দোলনে ভাটা দেখা দিল। নগ্ন হয়ে পড়ল উপদলীয় কোন্দল। সমর একদিন খবরের কাগজে দেখল কয়েকজন নপকশাল নেতার সাথে সুবলও এরেস্ট হয়েছে।

সমর একদিন সীমান্তবর্তী দেয়ানগঞ্জে এক বন্ধুর বাড়ি বেড়াতে গেল। হলদিবাড়ি থেকে মাইল ছয়েক বাসে যেতে হয়। একদম অজ পাড়াগাঁ। বন্ধুর বাবা সরকারি ডাক্তার। মাঠের মধ্যে সরকারি ডিস্পেন্সারী আর ডাক্তারের কোয়ার্টার। আশপাশে কয়েকটা বাঁশঝাড়, পিছনে বিরাট ধানের ক্ষেত, কাছেই একটা প্রাইমারী স্কুল। বন্ধুর নাম পরেশ। অনেকদিন পর বাড়ির বাইরে আসতে পেরে সমরের বেশ ভালো লাগল। তা ছাড়া এদিকে সেই আতঙ্ক তেমন ছড়াতে পারেনি।

পরেশের সাথে বিকালে হাটের দিকে বেড়াতে গেল সমর। সেদিন হাটবার না হলেও স্থায়ী দোকানগুলো খোলা ছিল। একজন দোকানদারের সাথে পরেশের বেশ বন্ধুত্ব। দোকানদারের কাছ থেকে পূর্ব বাংলার রিফুজীদের সম্বন্ধে নানান গুজবের কথা শোনা গেল। কিছু মাড়োয়াড়ি ব্যবসায়ী আর রাজবংশী দেউনিয়া নাকি রিফুজি মেয়েদের নিয়ে ফলাও কারবার জুড়ে দিয়েছে। তাছাড়া বাংলাদেশের যুদ্ধ সম্বন্ধে সমর অনেক নতুন তথ্য জানতে পারল। আসলে মুক্তি যোদ্ধা বলতে গেলে প্রায় কিছুই নেই। ভারতের বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্সের বাঙালী জওয়ানরা নাকি লুঙ্গি পরে মুক্তি যোদ্ধা সেজে পুর্ববঙ্গে ঢুকে পড়ছে। ওরাই নাকি পাকিস্তানি সেনাদের সাথে যুদ্ধ করে অনেক এলাকা মুক্ত করেছে। অনেকে আবার বলছে মুজিবর নাকি রাশিয়ার গুপ্তচর প্রতিষ্ঠান কে.জি.বি.এর দালাল। আসলে লোকটা নিজে নাকি সৎ আর জনপ্রিয়তাও প্রচুর। কিন্তু রাজনীতির প্যাঁচ বোঝেনা। ওকে সামনে রেখে রাশিয়া আর ইন্দিরা গান্ধী নাকি নিজেদের স্বার্থ হাসিল করে নিচ্ছে। পাকিস্তানের কবল থেকে মুক্ত হলেই নাকি স্বাধীন “বাংলাদেশ” রাশিয়ার ঘাঁটি আর মাড়োয়াড়ী ব্যবসায়ীদের লুঠের ক্ষেত্র হয়ে পড়বে। তবে ওখানে সত্যি মুক্তিযোদ্ধাও নাকি আছে। তারা মৌলানা ভাসানি, মহম্মদ তোহা, সিরাজ শিকদার প্রমুখ প্রকৃত দেশপ্রেমিক নেতাদের নেতৃত্বে যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে।

পরেশ বলল, ‘নানা মুণির নানা মত। ওসব নিয়ে ভাবতে গেলে মাথা খারাপ হয়ে যাবে’।

সন্ধ্যাবেলা ওরা দুজন বারান্দায় বেতের চেয়ারে বসল। মাঠের উপর ঝকঝকে চাঁদের আলো। গাছগাছালি, বাঁশঝাড় সব জ্যোছনার ওড়না জড়িয়ে অপূর্ব রূপ ধারণ করেছে। সামনের বিরাট গাছটায় কালো কালো বাদুড় ঝুলছে। মনে হচ্ছে যেন কালো ফল ঝুলছে গাছ থেকে।

মাঝরাতে ভয়ঙ্কর এক আওয়াজে চারিদিক থরথর করে কেঁপে উঠল। ঘুম ভেঙ্গে গেল সমরের আর ও আতঙ্কিত হয়ে পড়ল। পরেশেরও ঘুম ভেঙ্গে গেছে। পরেশ বলল, ‘বর্ডারে হয়ত কোনপক্ষ কামান দেগেছে। মাঝে মাঝে এখানে এরকম শব্দ শোনা যায়। ভয়ের কিছু নেই, গুলিগোলা এতদূর আসবেনা’।

সকাল হতেই একটা ছেলে খবর দিল মাণিকগঞ্জ বর্ডারে রিফুজি ক্যাম্পে পাকিস্তানি মর্টার পড়েছে। বিকেলে মর্টার দেখতে সমর আর পরেশ তিনমাইল পথ হেঁটে মাণিকগঞ্জ গেল। মর্টার পড়েছে রিফুজী ক্যাম্পের কোল ঘেঁষে। কোনো লোক মারা যায়নি। মর্টার পড়ে একটা বিরাট কূয়োর মত গর্ত হয়ে গেছে। পাশেই রিফুজী ক্যাম্প। অসংখ্য ত্রিপলের ছাউনি। চারিদিকে মলমূত্র ছড়ানো তার মাঝে কঙ্কালসার মানুষের গাদাগাদি। ভয়ঙ্কর দুর্গন্ধ সহ্য করতে না পেরে ওরা তাড়াতাড়ি স্থান ত্যাগ করল।

পূর্ববাংলার স্বাধীনতা আন্দোলনকে ভারতের প্রত্যক্ষ সাহায্য করাকে কেন্দ্র করে পাকিস্তান ভারতের বিরুদ্ধে সামগ্রিক যুদ্ধ ঘোষণা করল। যুদ্ধ শুরু হল পশ্চিম সীমান্তেও। ভারতীয় সেনারা অল্প সময়েই পূর্ববাংলা দখল করে স্বাধীন বাংলাদেশ উপহার দিল মুজিবর রহমানকে। অসংখ্য পাকিস্তানি সৈন্য বন্দী হল ভারতীয় সেনাবাহিনীর হাতে। ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে যুদ্ধবিরতি চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার পর তাদের মুক্তি দেওয়া হল। পাকিস্তানে ইহাহিয়া খান ক্ষমতাচ্যূত হলেন। প্রধানমন্ত্রী হলেন জুলফিকার আলি ভুট্টো।

এদিকে পশ্চিমবঙ্গে নকশাল আন্দোলন প্রায় শেষ হয়ে এসেছে। বড় বড় নেতারা সব জেলে নয় ফেরার, হাজার হাজার নকশাল ছেলে বন্দী হয়ে জেলগুলো সব ভরে ফেলেছে। খুনখারাপি অনেক কমে গেছে।



সমর কলকাতার বিভিন্ন কলেজে দরখাস্ত করেছিল। একটা প্রাইভেট কলেজ থেকে ইন্টারভিউ লেটার পেল। সমর ভাবল চাকরি হওয়ার সম্ভাবনাত খুবই কম কেননা ওসব কলেজে আগে থেকেই কাকে নেওয়া হবে ঠিক করা থাকে। ইন্টারভিউটা একটা লোকদেখানো ব্যাপার। তবে কিছু অভিজ্ঞতা হবে আর অনেকদিন পর কলকাতা ঘুরে আসা হবে এসব ভেবে সমর ইন্টারভিউ দিতে গেল। ইন্টার ভিউয়ের পর হেডঅবদি ডিপার্টমেন্ট সমরকে একান্তে ডেকে বললেন, জয়েন করার জন্য রেডি থাকতে। কয়েকদিনের মধ্যেই এপয়েন্টমেন্ট লেটার ওর দেশের বাড়ির ঠিকানায় চলে যাবে। সমর দার্জিলিং মেলএ সেদিনই ভাটুইপুর রওনা দিল আর কয়েকদিনের মধ্যেই এপয়েন্টমেন্ট লেটার পেয়ে গেল।

এবার রকেট বাসে করে সমর আবার কলকাতায় ফিরে এল। আবার সেই পুরোনো কলকাতা, ঠিক সেই আগের মতই ব্যস্ত, কর্মমুখর। যে বিরাট ঝড় বয়ে গেছে এর উপর দিয়ে তার কোনো চিহ্নই নেই। কিন্তু সমরের কাছে সবই বদলে গেছে। নেই সেই মানুষগুলো, সেই বন্ধুবান্ধব, সেই পুরোনো জীবন। কোথায় যেন কি হারিয়ে গেছে যা আর ফিরে পাওয়া যাবেনা। পুরোনো সব কিছুকে ভুলে গিয়ে শুরু করতে হবে সম্পূর্ণ নতুন জীবন, সম্পূর্ণ নতুন ভাবে। সমরের মনটা কেমন উদাস হয়ে যায়। জেগে ওঠে দুর্বোধ্য এক বিষণ্ণতা।

Next: Chapter 9 >

Previous: Chapter 7 >


Dr.Ratan Lal BasuRatanlal Basu, Ph.D. (Economics) is an ex-Reader in Economics and Teacher-in-Charge, Bhairab Ganguly College, Kolkata, India. Dr. Basu has written & edited several books on Economics.

Apart from his passion for the field of Economics, Dr. Basu's other interests are Boxing & Small Game Hunting (gave up the nasty games during college life); Swimming in Turbulent Rivers (physically impossible now); Himalayan Treks, Adventure in Dense Forests, Singing Tagore Songs and also writing travelogues and fiction in Bengali and English.

Dr. Ratan Lal Basu can be reached at rlbasu [at] rediffmail.com.