কাঁঠাল্ - ডঃ অশোককুমার মিশ্র | Kaanthal: A Short Story By Dr. Asokekumar Misra (WBRi Bangla Online Magazine)

Dr. Asokekumar MisraEditor's Note: Dr. Asokekumar Misra is a Bengali poet, short story writer, dramatist, literary critique and Associate Professor of Bengali Dept. at Bhairab Ganguly College at Belghoria, Kolkata. He has authored many books on Bengali literature, including text books and reference books for M.A. courses of Calcutta University and other institutions.

Dr. Misra can be reached at asokemisra6 at gmail.

You can submit your writings for publication at WBRi Online Magazine by email to submissions@washingtonbanglaradio.com.




কাঁঠাল্


ডঃ অশোককুমার মিশ্র


জামাইষষ্ঠীর সাতদিন আগে থেকে  ঘর- বার ,পোষ্টাপিস -টাপিসে যাতায়াত করে করে হল্লাক হয়ে গেছে গোবিন্দ – না শ্বশুরমশায়ের চিঠি না শ্বশুরমশায়ের টিকি ।

বড় খারাপ লাগছে গোবিন্দের । তার এক গুচেছর বন্ধু তার চারপাশে শ্বশুরমশায়দের, শালাদের পাঠনো জামাইষষ্ঠীর আমন্ত্রন পত্র দেখিয়ে দেখিয়ে চোখ কান ঝালাপালা করে দিয়েছে – অথচ তার বেলা!  – হা হতোস্মি! না শ্বশুরের আসা, না তার তরফের কোনো দু’ আঁচড়ে চিঠি !

বড় বেকুব বনে গেছে গোবিন্দ । না না বেকুব বানানো হয়েছে তাকে।

বড় সখ ছিল তার শ্বশুরবাড়িতে জামাইষষ্ঠীর আপ্যায়ন নিতে যাবার।কেননা এধরনের অনুষ্ঠানে নাকি সব বাড়িতে যাযা হয় সে সব এলাহি ব্যাপার।

বিলু বলেছে তার গত বচ্ছরের  অভিজ্ঞতার বিচিত্র কথা। সেসব কথা গোবিন্দ শুধু শুনেনি চোখ কান দিয়ে যেন গিলেছে।

শ্বশুরবাড়িতে পা দেওয়ামাত্র সে কী আপ্যায়ন! শ্বশুর শশব্যস্ত  হয়ে ছুটে এলো, শাশুড়ী ব্যস্তসমস্তভাবে ছুটে এল, শালারা- শালীরা দাসদাসীরা- শেষমেষ ছুটে এল সে – অবগুণ্ঠিতা, কুণ্ঠিতা ।কেউ আনে জল, কেউ করে বাতাস; কেউ আনে ফল, কেউ আবার ফলসা ; কেউ দেয় দৃষ্টি, কেউ  আনে মিষ্টি, কেউ আনে   ------

সে এক ধুন্ধুমার কাণ্ড বলতেই হবে।

ছুটে আসে ভিস্তিওলা –জলের খরচ বেড়েছে তো !

দৌড়ে আসে পঙ্খাওলা –লোডশেডিং বেড়েছে তো !

হেঁটে আসে মাছওলা –জামাই ভালো্বাসে যে ।

পাঁঠার গলায় দড়ি বেঁধে কাঁধে ঝুলিয়ে বাড়ি পর্যন্ত ধাওয়া করে কসাই।

সবারই একমাত্র লক্ষ্য কামানো আর কমানো- সে নাপিতই হোক আর পুরোহিত। একের কামাই অন্যের কমার ফলেই ঘটে কিনা !

চিঠি পেল না গোবিন্দ।

তবু সে এমন এক ভাব করতে শুরু করল যেন সে চিঠি পেয়েছে   শ্বশুরের।জামাইষষ্ঠীতে যাবে তাই।জোর তোড়জোড় চলছে যেন তারই ।  আপিসে ছুটি নেবার পালাও শেষ ।এবার যাওয়াই বাকি ।

শ্বশুরবাড়ি দী্ঘায় ।সমুদ্রসৈকত থেকে বেশি দূরে নয়। সমুদ্রের গম্ভীরকণ্ঠ এই সামাণ্য দূরত্ব পেরিয়ে কাঁপিয়ে দিয়ে যায় শ্বশুরের গৃহের অঙ্গন।ঝাউয়ের দোল ঘরে বসেই দেখা সে কি কম সুখ।

নাই বা হল নিমন্ত্রণ ।শ্বশুরবাড়ি যাবে বৈ তো নয়!।জামাইষষ্ঠীর আগেরদিন  গোবিন্দের  সব উদ্যোগে জল ঢালা হয়ে গেল।

এ্যা বড় কাঁঠাল হাতে দর্শন দিলেন তার শ্বশুর । অর্ধাঙ্গিনী এমন ভাব দেখাল যেন---। বলল –‘ দেখলে তো, বাবা ঠিক তত্ত্ব করেছে ।‘

তত্ত্ব বলে তত্ত্ব । কাঁঠাল , কাঁঠাল। – ধুতির বদলে কাঁঠাল, নারকেলের বদলে কাঁঠাল, পাঞ্জাবীর  বদলে কাঁঠাল, এমন কি জামাইষষ্ঠীর বদলেও কাঁঠাল।

রুণু রেগে গেল। রাগবারই কথা ।  শেয়ালপণ্ডিতের কাছে কুমীর ছানার গচি্ছত রাখার গল্পকথা বলে দিয়েছি যে!

শ্বশুর- ষষ্ঠী সেরে ষষ্ঠীর দিনই চলে গেলেন শ্বশুর। বলে গেলেন অনেক অনেক কথা। অনেক অনেক স্নেহ,প্রেম,ভালো্বাসার কথা।দেওয়ায় কি আসে যায়- আসল ব্যাপার তো মন। পরে্রদিনই সেই মনসহ দেওয়া উপহার খোলা হলো। কাঁঠাল ভেঙ্গেই রুণুর চোখ কপালে। কাঁঠালে একটাও কোয়া নেই।

ক্ষিপ্ত হয়ে রুণু শার্লক হোমসের মতো বাবার পিছু ধাওয়া করা মনস্থ করল। আমি বৃথাই তাকে নিবৃত্ত করার চেষ্টা করলাম। একটা কোষহীন কাঁঠালের জন্য সপ্তমীর দিন নগদ একশ’ টাকা গচ্চা আর একটা নির্ভেজাল ছুটি জলাঞ্জলি ঠেকাতে পারলাম না।

শ্বশুরবাড়িতে গিয়েই  রুণু পাকড়াও করল মাকে।সপ্তমীর দিন অবাঞ্ছিতভাবে মেয়ে জামাই এর আগমনকে মোটেই ভালো মনে মেনে নিতে পারেন নি মা।

চোখের কোণে তাঁর ফের খরচান্তের চিন্তাজনিত ভ্রুকুটি। -কিরে তোরা?

আজ?

-হ্যাঁ আসতে হল। বাবার জন্য।

- কেন? বাবার জন্য কেন? বাবা তো তো্র কয়েকঘণটা আগেই এসে পৌঁছেছিল।

-সে জন্যেই তো কয়েকঘণটা পরে এসে  পৌঁছেছি।কাঁঠালের লোভে।

-কাঁঠাল? বলিস কি রে? কাঁঠাল কোথা পাবো?

- কেন, পাঠাতে পারো আর কোথায় পাব, কোথায় পাব  বলে চেঁচাচ্ছ?

-কে কাঁঠাল নিয়ে গেছে তোর কাছে ?

- কেন, বাবা।

-ওই কাঁঠালটা তোর বাবা নিয়ে গেছে?

-হ্যাঁ।

-ওটা তো ভুতি ভরতি কাঁঠাল, ওতে তো কোয়া থাকে না,তাই তো সরিয়ে রেখেছিলাম। ওমা, সেটা নিয়েই তোর বাবা গেছে তোর কাছে?

-সেই জন্যেই তো আসা। আমার মান সম্মান ধুলো্য় লুটিয়ে দিলে একেবারে!

ক্রুদ্ধ কন্যার সমভিব্যাহারে এক গ্লাস জলও না খেয়ে শ্বশুরবাড়ি থেকে বেরিয়ে এসে দীঘার নামী ব্লু ভিউ হোটেলে ঢুকলাম।আরও পাঁচশ’ বেরিয়ে গেল।

হায়রে, বন্ধুরা এখন কি মজাই না করছে !নানা চিত্তিরের খাওয়া দাওয়া সেরে আজকের দিনে শালীদের নিয়ে চুটিয়ে স্ফূ্র্তি করছে, সিনেমা দেখছে। শুনেছে সব সে বিলু নীলুদের কাছে। বলতেই হবে ভাগ্য ওদেরই। শহরে বিয়ে করার এই এক সুখ,কথায় কথা্য় শ’ দুশ’ খরচ করতে হয় না। পাশেই শ্বশুরবাড়ি যখন খুশি যাও। হায় আমার কপাল! হায় নীলু বিলুর ভাগ্য!

ক্ষুণ্ণমনে বাসে উঠতে গিয়ে চমকে উঠলাম।

এ কী! বাসের সামনের সিটে কে বসে ? বিলু নীলু না!

গোবিন্দের মনে  হল পৃথিবীটা তার শ্বশুরের দেওয়া এক মস্ত কাঁঠাল ।




blog comments powered by Disqus

SiteLock