বন্ধ ঘরের হত্যা রহস্য - অধ্যাপক (ড:) জি .সি. ভট্টাচার্য | Young Bengali Sleuth Badal Returns in Detective Crime-Mystery Story

DR G C Bhattacharya

Dr. G C Bhattacharya is a teacher at BHU, Varanasi, Uttar Pradesh, India and has been writing for over 15 years. His writings have been published in Ichchhamoti, Joydhak, Diyala, A-Padartha and other Bengali magazines. Besides Bengali, he writes in Hindi and English (UK short fiction) too. His published books includes Badal Kotha in Hindi. Dr. Bhattacharya can be reached at dbhattacharya9 [at] gmail [dot] com.

As you may know, we have introduced the young Bengali sleuth Badal in Dr. Bhattacharya's first of the detective crime-mystery short story series বাদলের প্রথম অন্বেষণ.

Submit your creative writing, story, poem, travelog etc. for publication on WBRi by e-mail to submissions@washingtonbanglaradio.com.


বন্ধ ঘরের হত্যা রহস্য

অধ্যাপক (ড:) জি .সি. ভট্টাচার্য, বারাণসী, উত্তর প্রদেশ


যে সময়ের কথা বলছি তখন আমি বিজ্ঞান কংগ্রেসের আসরে যাবার জন্যে তৈরী হচ্ছিলাম আর পেপারের পাওয়ার পয়েন্ট প্রেজেনটেসনের জন্যে বসে কম্পুটারে স্লাইড বানাচ্ছিলাম একমনে। বাদলের শীতের ছুটি হয়ে যেতেই আমার পুনা যাবার কথা সে দিব্বি জেনে ফেললো আর আমার পরীর দেশের রাজকুমার অপরূপ সুন্দর ভাইপো চঞ্চলের তো বেড়াবার নেশা আছেই।

ব্যাস, আর যায় কোথায়? দু’জনেই এসে ধরে পড়লো সঙ্গে নিয়ে যাবার জন্যে। তা ডিসেম্বরে কি টিকিট মেলে মাসের শেষে ট্রেন যাত্রার জন্যে? বারো বছর বয়স হয়ে গেছে বলে ওদের দু’জনের জন্যে ও দুখানা আস্ত টিকিট চাই, হাফ টিকিতে হবেই না।

দাদার পুলিশের চাকরির মূল্য জানা গেলো তখন। ছেলের আব্দারে পরদিনেই পুনা –বারাণসী একস্প্রেস ট্রেনের সেকেন্ড এ.সি.র তিন খানা টিকিট অনায়াসে বুক হয়ে আমার হাতে এসে গেলো আমার স্লিপারের টিকিটের বদলে। এক জন কনস্টেবল এসে দিয়ে গেলো তিন ঘন্টার মধ্যে।

দেখে শুনে বাদল সুন্দর হেসে বললো –‘কাকু, এই দেশে পুলিশের মহিমা রামভক্ত হনুমানজীর থেকেও বেশি তা জানো তুমি? এটা কিন্তু ভালই হলো কাকু, তুমি তো আবার ঠাণ্ডা কে এক্কেবারে পছন্দ করো না, কাট্টি করে রেখেছ , হি: হি: হি:…’ 

বাদল যা বলল, তা ঠিকই।

বেনারসে তখন দারুণ ঠাণ্ডা চলছে আর আমি শীতকাল এক্কেবারে বিশেষ করে কুয়াশা ঢাকা দিন পছন্দ করি না তা তো সবাই জানে কেননা একগাদা গরম পোশাক পরে কাজ করা আমার পক্ষে কঠিন হয় আর তা না পরলেও চলে না।

বাদল ও বেশী গরম জামা পরতেই চায় না। সেই  জন্যে ছেলেটার সুটের বদলে জ্যাকেট কিনে নিলাম আর নিজের জন্যে ও একটা নিতে হ’লো কেননা চঞ্চলের সুট, বুট, টাই এ’সবে কোনো অসুবিধাই হয় না, বড়লোকের ছেলে বলে হয়তো।

তবে বাদলের জন্যে আমি ঘরে রুম হিটার আর বাথরুমে ভেনাস গিজার লাগিয়ে নিয়ে ছিলাম, বড়লোক না হয়েও যাতে, ছেলেটা যখন  আমার কাছে থাকে সকালে উঠে যোগ ব্যায়াম আর স্নানে কোনো কষ্ট না হয়। চঞ্চলের জন্যে ও গরম জলের দরকার তখন হয় বৈকি।

বাদল ছোটবেলায় অপুষ্টির শিকার হয়ে ছিলো বেশ কিছুটা, গরিবের ঘরে জন্মে, যদি ও হাইলি ট্যালেনটেড দারুণ সুন্দর ছেলে কিন্তু আরো পাঁচ বছর আগে আমার সাথে পরিচয় হ’লে আমি তা হতেই দিতাম না।কিন্তু এখনো বাদল বেশ রোগাই রয়ে
গেছে ...  সে যাক গিয়ে, বাদলের পরিচয় কথা না হয় এর পরে একদিন বলবো, কিন্তু বাদলকে আজকাল আমি এখন নিয়মিত ভাবে যোগাসন আর  অন্য ফ্রী হ্যান্ড ব্যায়াম ও করাই ভোর বেলাতে, যাতে শরীর স্বাস্থ্য ভালো থাকে ছেলেটার।

এখন জানা গেলো যে ট্রেন চলে বুধবারে ডি.এল.ডব্লু.যার অন্য নাম হলো মন্ডুয়াডিহ  স্টেশন, সেখান থেকে সকাল ৪.৩৫ মিনিটে আর শুক্রবার বেনারস ক্যান্ট স্টেশনে কিন্তু এসে যায় ৩.৩০ হ’তে না হ’তেই।

আমাদের টিকিট ছিলো শুক্রবারে আর তাই রাত তিনটে না বাজতেই স্টেশনে যাওয়া কি সোজা কথা না কি ওই দারুণ শীত কালে, গরম লেপের মায়া ছেড়ে? আমার পক্ষ্যে তো বাপু ভীষণ কষ্টকর কাজ বলে মনে হয় শীত কালে ...

তবে বাদলের কথাই আলাদা।

ছেলেটা রাত একটাতেই  উঠে সব কাজ সেরে তৈরী হয়ে তবে যাবে।‘উঠলাম আর ছুটলাম’ পলিসি বাদলের জন্যে নয় তা আমি কি করবো? জিনিয়াস ছেলেদের ধরণ ধারণ তো একটু আলাদা হবেই, চব্চল তো ঘুম থেকে সাতটা বেজে গেলেও উঠতেই  নারাজ শীতকালে ...তা যতই পরীর দেশের রাজার ছেলের মতন অলোকসামান্য সুন্দর হোক না কেন। নিজের  ভাইপো বলে কথা, কাকার গুণ একটু না পেলে কি চলেরে বাপু?

তাই লেপের মায়া কাটিয়ে উঠতেই হ’লো আমাকেও আর আগে বাদলকে দামি অলিভ টেল টেল মাখিয়ে দিয়ে ব্যায়াম ট্যায়াম সব করিয়ে, একটু বিশ্রামের পরে বেশ করে স্নান করিয়ে দিলাম বিদেশী সাবান মাখিয়ে আর তারপরে নিয়ে গিয়ে দামি প্রসাধন শেষ করে গরম পোশাকের ড্রেস করাতে নিয়ে গেলাম...ছেলেটাকে তৈরী করে দিয়ে শেষে  জলখাবার ও কিছু করে দিলাম। রুম হিটারের কল্যাণে শীত বোঝাই গেলো না তাই রক্ষা...

তারপরে আমার দুধের বরণ পরীর দেশের রাজকুমার অপরূপ সুন্দর ছেলে চঞ্চলের পালা, তা সে তো ঘুম থেকে উঠতেই চায় না ...বাধ্য হয়ে ছেলেটাকে টেনে তুলে নিয়ে গিয়ে আগে বেসিনে হাত মুখ ধুইয়ে দিলাম আর তারপরে তাকেও বাথরুমে নিয়ে যেতেই হ’লো স্নান করাতে... তারপরে সংলগ্ন ড্রেসক্যুবিকালে প্রসাধন ও ড্রেস করিয়ে সাজিয়ে টাজিয়ে নিয়ে বাদলের কাছে এনে জল খাবারের জন্যে বসিয়ে দিলাম আমার জাপানি পুতুল ছেলেটাকে...

সব শেষে নিজের পালা এলো এবং তারপরে ও ট্রেনের জন্যে খাবার তৈরী করতে লেগে পড়তে হ’লো  চট পট করে।

আমি ট্রেনের খাবার খেতেই পারি না যে, তা কি করবো?

দাদা গাড়ী নিয়ে নিজেই চলে এ’লো ঠিক ২.৩৫ হতেই।

বাইরে তখন ঘোর কুয়াশা আর অন্ধকার। আমার মতন মানুষের বেরোবার মতন নয় অবস্থা মোটেই কেননা ভিজিবিলিটি পাঁচ ফিট ও নেই আর ওয়াইপার না চালালে উইন্ড স্ক্রীন একদম ঝাপসা হয়ে আসছে।বোঝো ঠ্যালা, ... উ: সে কি ঠাণ্ডা রে বাবা, হাত পা সব হিম  হয়ে আসে একদম, চঞ্চল সামনে বসে ছিলো বাপির সাথে ...পিছনে আমি আর বাদল ছিলাম তাই আমি তো বাদলকে শেষে কোলে তুলে দু’হাতে জড়িয়ে নিয়ে বসলাম ঠাণ্ডা কাটাতে ...দাদার গাড়ির এ.সি. ও কাজ করছিলো না ...

ট্রেন কিন্তু এক নম্বরে দাঁড়িয়ে ছিলো আর একটাই এ.সি.টু টিয়ার কোচ।আমাদের বার্থ ৭, ৮ আর ৯ খুঁজে পেতে  দেরি হলো না। ঠিক সময়েই দেখি ট্রেন ছেড়ে দিলো আর দাদা ও আমাদের গুড বাই করে নেমে গেলো।

পরের স্টপ জ্ঞানপুর রোড এক ঘন্টা দশ মিনিট পরে। আমাদের ১৫০০ কিলো মিটারের ও বেশি লম্বা যাত্রা হলো শুরু এলাহাবাদ,সাতনা, মাইহার, কাটনি, জবলপুর, পিপারিয়া,ইটারসি,খান্ডোয়া,ভুসাওল হয়ে।এখন দেখি বাদলের এই সমস্ত স্টেশনের নামই শুধু মুখস্ত নয় তাদের দূরত্ব ও। তাই চঞ্চল যেই জানতে চাইলো ইটারসি বেনারস থেকে কত দূর, বাদল অবহেলায় বললো ৬১৪ কে.এম.। বোঝো ঠ্যালা ।

তা ঠিক সময়ে ছাড়লে কি হবে? ট্রেন চলেছে গুড়গুড় করে তাই ইউ. পি. আর এম.পি. পার হতেই বেশ লেট হ’তে লাগলো... স্লো মোশানে চলার ফলে পরদিন সকাল আটটাতে পুনে পৌঁছবার আশা রইলো না আর।লুডো খেলে সময় কাটাতে লাগলো ছেলে দু’জন ...কি আর করবে?  অবশেষে নতুন বছর আর শতাব্দী  ও সহস্রাব্দির পয়লা জানুয়ারী বেলা ২.৩০ য়ে গিয়ে আমরা পুনেতে  নামলাম। সেখানে ঠাণ্ডা বিশেষ নেই দেখে আমার খুব ভালো লাগলো। আমরা গিয়ে কাছেই একটা হোটেলে উঠলাম আর পরদিন গনেশ খিন্ডে পুনে ইউনিভার্সিটিতে গিয়ে ইন্ডিয়ান সায়েন্স কংগ্রেসের ডেলিগেট ও তার সঙ্গী হিসেবে নাম রেজিষ্ট্রী করিয়ে নিলাম ইন্টারনেট কনেকটেড কমপুটারে তিনজনেই। যদিও তাদের কোনো আবাসনের ব্যবস্থা আমি নিলাম না।বাদল গিয়ে লাইনে দাঁড়িয়ে না পড়লে আমার দ্বারা সহজে হত না সে কাজটুকু ও তা ঠিক ...

সন্ধ্যে হবার আগেই আমরা নিজেদের হোটেলে ফিরে আসবো বলো টেম্পো নিলাম। চঞ্চল জানলা দিয়ে শহর দেখছিলো। বললো-‘বাদল, দেখ কি সুন্দর শহর পুনে, আর আমাদের বেনারস? কোথায় লাগে?’

বাদল বললো-‘তেরে চেহরে সে, নজর নহি হটতী, নজারে হম ক্যা দেখে’?

ব্যাস, আর যায় কোথায়, চঞ্চল রেগে বললো –‘ভালো হবে না বলছি বাদল, কাকু দেখো না তুমি, তোমার বাদল আমাকে ক্ষেপাচ্ছে...’

বাদল নির্বিকার ভাবে বললো –‘কোথায়? আমি তো একটু গান গাইছি মাত্র...’

কিন্তু এই কম্পুটারে নাম লেখানো এক ঝামেলা হয়ে দাঁড়ালো সেই দিনেই।  টেকনোলজির ঝন্ঝাট যাকে বলে।

আমাদের মি.সাবরকরের পাল্লায় পড়তে হয়েছিল, আর কি।

বিনয় দিবাকর সাবরকর। আমার কলেজ জীবনে একসাথে পড়ে ছিলো, আমি তো হলাম এক সামান্য মাস্টার কিন্তু সে আই.পি.এস.জয়েন করলো আমার দাদার মতন। তবে সে যে তখন পুনেতে পোষ্টেড তা কিন্তু আমার একটুও জানা ছিলো না। আর সে যে মহারাষ্ট্র পুলিশের গোপনীয় অনুসন্ধান বিভাগে যাকে আমরা ডিটেকটিভ ডিপার্টমেন্ট বলে জানি সেখানে সে ডি.আই.জি. ও হয়েছে সেটাই বা কে জানতো? তখন? তার আবার একটা প্রমোশন ও যে পেন্ডিং পড়েছিলো  সেটাও পরে জেনেছিলাম আমি।

একটু বিশেষ এফিসিয়েন্সী না দেখাতে পারলে সে গুড়ে তার বালি হবার দিব্যি সম্ভাবনা ও ছিলো তা ও আমি জানতাম না, তবে সন্ধের সময়েই এক পুলিশ জিপ এসে আমাদের সর্দার লজের গেটে দাঁড়িয়ে সব জানিয়ে ছাড়লো আর কি? তা’তে ছিলো দু’জন কনস্টেবল আর মি. রাউত নামে একজন জবরদস্ত মোটা সোটা পেটওয়ালা  পুলিশ ইন্সপেক্টর।সাথে তাদের ডি.আই.জি.সাহেবের এক খানা চিঠি ও ছিলো।

হোটেলের ম্যানেজার তো শশব্যস্তে আমাদের ঘরে এনে পৌঁছে দিলেন আর চিঠি পড়ে জানা গেলো যে ডি.আই.জি. সাহেব নাকি আমার দর্শন প্রার্থী, কিন্তু তিনি যে হেতু আমাকেই ডেকেছেন তাই শুধু আমি যেতে পারি কিন্তু  ছেলে দু’টোকে তিনি নিতে নারাজ।যা অর্ডার পেয়েছেন তাই তিনি পালন করতে বাধ্য।

তাই না শুনে আমি ও সোজা বলে দিলুম-‘যাব না, নমস্কার’।

আর যায় কোথায়? তাঁর পুলিশি মেজাজ চড়ে গেলো চড়াৎ করে। তিনি বললেন-‘এই মিস্টার, ভালো ভাবে আমার সাথে চলে চলো বলছি নইলে …’।

‘এরেস্ট করে নিয়ে যাবেন এই তো? তাই করুন গিয়ে না হয়। গ্রেফতারি পরোয়ানা নিয়ে আসুন আপনি। আমি এখানেই অপেক্ষা করবো আপনার জন্যে ...’

‘ঠিক আছে, আমি আধ ঘন্টার মধ্যে ফিরে এসে তোমাকে উচিত শিক্ষা দিয়ে ছাড়বো নইলে আমার নাম রাউত নয়। আমি বললাম –‘মোষ্ট ওয়েলকম’ ।

তিনি রেগে  মেগে গটগটিয়ে চলে যেতেই বাদল হি: হি: করে হেসে ফেললো। কিন্তু চঞ্চল ভয়ে ভয়ে বললো-‘কাকু, কি করলে? উনি যদি আমাদের সত্যি করে এরেস্ট করে নিয়ে যান, ফিরে এসে?’

ম্যানেজার ও ভয়ে কাঁপছিলেন আর আমাকে মি: রাউতের সঙ্গে যেতে বলছিলেন, কিন্তু আমি মাত্র না বলে চুপ করে রইলুম কারণ আমি জানতাম যে কাল প্রধান মন্ত্রী আসবেন সায়েন্স কংগ্রেস উদ্ঘাটন করতে আর আই.এস.সির রেজিস্টার্ড ডেলিগেট কে বিনা কারণে গ্রেফতার করলে ব্যাপারটা তিনি কেন সবাই জানতে পারবেনই মিডিয়ার দৌলতে।

বাদল তা বেশ ভালো করেই জানতো, তাই নিশ্চিন্ত মনে অপরূপ সুন্দর ছেলে চঞ্চলের দুধ সাদা হাত ধরে টেনে নিয়ে গিয়ে লুডো খেলতে বসে গেলো নির্বিকার ভাবে.. যেন কিচ্ছুটি হয়নি আর আমিও  বসলাম একটা সায়েন্স জার্নাল নিয়ে।

তবে কপালের লেখা যাবে কোথায়?

সেই যে বলে না... খন্ডন না হয়গো তাহা গোলক ধামে গেলে, দেখো যা থাকে কপালে .....মিনিট কুড়ি ও কাটলো না আবার পুলিশ জিপ এসে হাজির হ’লো গেটে আর তাই না দেখে চঞ্চল আমার কাছে এসে নিজের টানা টানা চোখ দু’টো আরো বড় বড় করে তাকিয়ে বললো-‘ও কাকু, আমি জানালা দিয়ে দেখলাম, আবার পুলিশ এসে গিয়েছে। এ’বার তুমি টপ করে পালাও কাকু, নইলে কি হবে?’

শুনেই বাদল আবার হি: হি: করে হেসে ফেললো আর বললো –‘কাকু, পুলিশ অফিসারের ছেলে হয়ে ও চঞ্চলটা না একদম একটা ভিতুর ডিম, এখনো ফোটেও নি যে বেশ একটা গোলগাল নরম সরম ছানা হবে ডিমটা ফুটে হি: হি: হি:...ভয়ে নিজের বিচার বুদ্ধি বা কমন সেন্স ও হারিয়ে ফেলেছে, তুমি দেখই না,কাকু’।

চঞ্চল তাই না শুনে বাদলকে এক  চড়  মারবে  বলে সোফা আর টেবিল ঘুরে ছুটলো আর বাদল আমার পিছনে এসে লুকিয়ে বললো –‘ও কাকু, তোমার পরীর দেশের রাজার ছেলের হাত থেকে আমাকে বাঁচাও, নইলে এবারে তো বিপদ আমার‘।

আমি বললাম-‘ অত সহজে নয়, তবে সব চুপ এক্কেবারে। এ’বারে অন্য লোক কেউ আসছেন আমাদের কাছে। আর আমি তাঁর ভারী পায়ের শব্দ সিঁড়িতে শুনতে পাচ্ছি। মনে হয় হোমরা চোমরা কেউ হবেন তিনি পুলিশের নির্ঘাৎ’।

ছেলে দু’টো এসে চেয়ারে বসতে না বসতেই দরজায় নক হ’লো। আমি দরজা খুলেই চমকে গেলুম। সঙ্গে দু’জন কনস্টেবল নিয়ে স্বয়ং ডি.আই.জি. সাবরকর দাঁড়িয়ে আছে দেখে আমি বললাম –‘আরে একি কান্ড? তুই কোথা হ’তে এসে জুটলি আবার পুনেতে? কি গেরো রে বাবা?  তা বেশ, এসেছিস যখন  আয় ভেতরে, বোস আর তোর হাতকড়া বার কর দেখি’।

‘আমি আপনার কাছে মাফ চাইতে এসেছি, হাত কড়া নিয়ে নয়,স্যার’।

‘স্যার? সেটা আবার কোন চুলো থেকে এলো তোর কাছে? আমি সিদ্ধার্থ, তা ও ভুলে গিয়েছিস বলে মনে হচ্ছে আমার। আরে যাকে তুই সিধা অর্থ বলতিস, সেই বন্ধুকে ভুলে গেলি পুলিশ হয়েই? এই জন্যেই পুলিশকে লোকে ফুলিশ বলে আর কি?’

‘সে আপনি যাই বলবেন সব আমি মেনে নেবো। তবে আমি কিছুই ভুলিনি। কিন্তু কথা হ’লো যে এখন আমি মাত্র একজন পুলিশবালা আর আপনি হলেন প্রফেসর আর বিখ্যাত সায়েন্টিস্ট। ভারতীয় বিজ্ঞান কংগ্রেসের ডেলিগেট। সুতরাং  সোজা পি.এম.কে আমার বিরুদ্ধে কমপ্লেন ঠুকে দিতে পারেন আপনি...’

‘পাগলামি ছেড়ে এসে বস আর কি হয়েছে তাই বল দেখি সোজা সুজি। আমি ঘোর প্যাঁচ  দেখলেই রেগে যাই তা তো তুই জানিস ভালো করেই। ...কি হয়েছে?’

‘কিছুই হয়নি? তবে মহারাষ্ট্রে এবারে জঙ্গি হানার গোপনীয় খবর পেয়ে আমাকে চব্বিশ নয় ছাব্বিশ ঘন্টা সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে, আর সমস্ত ডেলিগেটদের প্রটেক্সনের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে’।

তাই বসে কম্পুটারে আই.এস.সি.ডেলিগেটদের নামের লিস্ট আর রেসিডেন্স প্লেস পড়ছিলাম, তাইতে তোর নাম দেখতে পেয়ে রাউত কে পাঠিয়ে ছিলাম তোকে নিয়ে যেতে। তা সাথে যে তোর দু’জন ছেলে আছে তা তো জানতাম না, কেননা মেন লিস্টে ওদের নাম দেয় নি। সঙ্গীদের লিস্টে দিয়েছে আর তা আমি তখনো দেখিনি আর ওই সত্যি ফুলিশ ইন্সপেক্টর এসে তোকে এক্কেবারে গ্রেফতার করবার হুমকি দিতে শুরু করে দিলো। হে ভগবান, এই সব সঙ্গীসাথীদের নিয়ে আমাকে কাজ করতে হয় এখানে’।।

‘তা পুলিশ ড্রেস ছাড়িয়ে যাকে এখানে বলে ‘বর্দী উতার দেনা’, এক মাসের জন্যে লাইন হাজির করে দিয়েছি ব্যাটাকে সঙ্গে সঙ্গে আর একটা ইনক্রীমেন্ট ও বন্ধ করে দিয়েছি। তুই বললে সাসপেন্ড ও করে ছাড়বো।আমি মরছি এদিকে নিজের জ্বালায় আর কিনা ...’

‘তবু ও এলুম তোর কাছে সাহস করে।তুই গেট আউট বললেও যাচ্ছি না এখন। ভগবান তোকে ঠিক সময়ে পাঠিয়ে দিয়েছেন পুনাতে। তোরা আমাদের নবসহস্রাব্দিবর্ষের সন্ধ্যাতে আমন্ত্রিত, দয়া করে চল’।

‘সে না হয় যাব কিন্তু তোর সমস্যাটা কি তা তো বলবি আগে’

‘সে তো বলতেই হবে। আমার জীবন, সম্মান, চাকরী সব তোর হাতে ভাই’

‘কি ভাবে?’

‘বলবো, চল আগে।তোমরাও চলো ভাই দু’জনেই’।পরক্ষনেই সে আবার বললো - ‘আর তোমার নাম কি বাদল নাকি, বাবুভাই? আমার যেন মনে হচ্ছে কিছুদিন আগে পেপারে তোমার ওই সুন্দর মুখের ছবি দেখেছিলাম, কি লিটল বন্ড না হোমস কি সব লিখেছিল যেন?’
‘আমি বললাম –‘হ্যাঁ, এইবারে তুই ঠিক পুলিশ অফিসারের মতন কথা বলেছিস দেখছি’।

দরজার কাছে পাহারায় ছিলো কনস্টেবলরা। তাদের একজন কে ডেকে সাবরকর মহারাষ্ট্রী ভাষায় বললো –‘ ঘর লক করো আর তুমি পাহারায় থাকো যতক্ষণ না এই সাহেবরা ফিরে আসেন’।

সে খটাস করে স্যালুট ঠুকলো।

আমরা গিয়ে গাড়িতে বসলাম। স্থানাভাবে এখানে ও বাদলকে আমার কোলে তুলে বসিয়ে নিলাম। কি করবো? এই পেট মোটা দু’ দু‘জন অফিসার ও উঠলেন জিপে, আর থাকে জায়গা?  বাদল ধীরে বাংলাতে বললো-‘ও কাকু, তুমি আবার গ্রেট সায়েন্টিস্ট হ’লে কবে? নির্ঘাৎ জটিল কোনো সমস্যা আছে কিছু এনার? আমাদের ভুগতে হবে এই নিয়ে দেখছি’।

পুনেতে নববর্ষের উত্সব হয় মন্দ না।সাবরকর নিজের বাড়িতেও খুব সুন্দর আয়োজন করেছিলো, ২০০০ সালকে স্বাগত জানাতে কিন্তু সামান্য একটু জলযোগ সেরে নিয়েই  একটু পরে আমরা সাবরকরের অফিসে গিয়ে বসলাম আর আমি জানতে চাইলাম ব্যাপারটা।

সাবরকর শুরু করলো- ‘এই সহস্রাব্দি সায়েন্স কংগ্রেস স্পন্সর করেছিলেন মি:নার্লেকার নামে এক ধনী ব্যবসায়ী ও বিজিনেস ম্যাগ্নেট।
তিনি শেষ কয়েকটা পেমেন্ট করবার আগেই  কাল রাতে তাঁর শেষ নিঃশ্বাস ফেলেছেন।

অতি সুরক্ষিত নিজের ফ্ল্যাটের বন্ধ শয়ন কক্ষে তিনি মৃত অবস্থায় পড়েছিলেন। আমাদের ক্লিয়ার হোমিসাইড কেস বলে মনে হ’লেও পুলিশ ঘটনাটা মিডিয়া কে জানতে দেয়নি আজ, নইলে টেররিস্ট অ্যাটাক হয়েছে বলে তারা রটিয়ে দেবে। তাতে প্যানিক সৃষ্টি হবে  আর কালকের পি.এমের.প্রোগ্রাম বাতিল হয়ে যাবে। কংগ্রেসের আসর ও ফ্লপ হবে।

বিদেশ থেকে অনেক নোবেল লরিয়েট বৈজ্ঞানিক এসেছেন। অনেকে আসছেন। কাল দশটাতে উদ্ঘাটন হবে। তার আগেই আমাকে ঘাতক কে ধরতে হবে নইলে খবর তো আর বেশি সময় চেপে রাখা যাবে না।তখন তো হই হই কান্ড শুরু হয়ে যাবে একেবারে, যা খুশি তাই গল্প বানিয়ে ছেপে দেবে কাগজঅলারা আর পুলিশের অকর্মন্যতার কথা যদি মিডিয়া প্রমাণ করবার এমন সুযোগ পেয়ে যায় তাহলে যা হবে তা বুঝে নে’।

আমি জিজ্ঞাসা করলাম-‘তা কোনো সূত্র পেয়েছিস তোরা যে কে অপরাধী হতে পারে?’

‘আমি সন্দেহ ক্রমে একজনকে গ্রেফতার ও করে বসে আছি কিন্তু প্রমান কই? কিচ্ছুটি নেই, নিখুঁত অপরাধ ...’

‘শুধুমাত্র সন্দেহ  করে তো আর কাউকে পুলিশ ২৪ ঘন্টার বেশি আটকে রাখতে পারে না।মৃত ব্যক্তির ছোট সত্ভাই হ’বে উত্তরাধিকারী এবং একমাত্র বেনিফিসিয়ারি। তবে কিন্তু য়্যালিবি আছে তাঁর জবরদস্ত আর হত্যার তো কোনো প্রমাণ নেই।..মেডিক্যাল রিপোর্ট বলছে হঠাৎ হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে তিনি মারা গিয়েছেন এবং সেই ঘরে বাইরে থেকে কেউ ঢুকতে পারেনি। তিনি ছিলেন অবিবাহিত তাই মোটিভ তো পরিস্কার আর এই ছোট সত্ভাইটিও একজন মহাপুরুষ। হেন নেশা নেই যা তিনি করেন না, এমন কি জুয়াতেও তিনি ওস্তাদ’।      ..’

‘সেই ঘরে  যে কেউ ঢোকে নি বা কোনো পাইপ দিয়ে গ্যাস ঢুকিয়ে দেয়নি তার কি কোনো প্রমাণ আছে?’

‘আছে, কম্পুটার আর ওয়েবক্যামেরা লাগানো ছিলো। তার রেকর্ড পুরো ব্ল্যাংক, কোনো পাইপ ও ঢোকানোর চেষ্টা হয়নি ঘরে। শীতকাল বলে জানালা ও সব বন্ধ করা ছিলো। কোনো ভাবে কুচেষ্টা করা হ’লে তা রেকর্ড হয়ে যেত স্বয়ং ক্রিয় ভাবে আর দ্বিতীয়ত: সেই ভাইটির কাস্ট আয়রন য়্যালিবি আছে? কথাটার মানে জানিস?’

এতক্ষণে বাদল ধীরে বললো-‘জানি’

চমকে উঠে সাবরকর বললো-‘তুমি জানো? তবে শোনো ... দুই ভাই কাল সকালে অ্যাপার্মেন্ট থেকে একসাথে বেরিয়ে যান।চাবি মি: নার্লেকারের কাছেই ছিলো অবশ্য, কিন্তু ডুপ্লিকেট চাবি তো থাকতেই পারে। কিন্তু তার প্রয়োগ হতে পারেনি কেননা সারা দিন ছোট ভাইয়ের সাথে কেউ না কেউ ছিলো, এমনকি সন্ধ্যে ছ’টার শো’তে সিনেমা দেখতে সে গিয়েছিলো তার ও টিকিটের অংশ ছিলো তার কাছে আর এক বন্ধু ও ছিলো সাথে’।

‘এটা কি একটু সন্দেহজনক নয়?’

‘হতে পারে কিন্তু তার কথা মিথ্যা তার প্রমান তো চাই নইলে ভগবানকে ও মেনে নিতে হবে যে সে কোনো অপরাধ করেনি’।

‘সে যাকগিয়ে, এবারে তুই বল যে ঘটনাটা কখন হয়েছিল আর কেনই বা হোমিসাইড কেস বলছিস তুই? হার্ট এটাক তো হতেই পারে বা সুইসাইড…’।

‘শোন আগে কি হয়েছিল।

‘হ’তে কি না পারে? ব্যবসাতে পরের দিন বড় একটা ডিলিং ছিলো তাই সুইসাইডের সম্ভাবনা কম, স্পন্সরিঙের টাকা ও বাকি তবে হার্টের প্রবলেম হ’তেই পারে কিন্তু তা হ’লে  তিনি হয় ফোন করতেন ডাক্তারকে আর নয় তো বিছানাতেই পড়ে থাকতেন নির্ঘাৎ করে’
প্রায় রাত দশটা নাগাদ ছোট ভাই ফিরে আসে আর কলিং বেল বাজায়।

ঘন্টি বেজে যায় কিন্তু দরজা খোলেনা। বেশ কয়েকবার বেল বাজিয়ে অপেক্ষা করবার পরে  মনে সন্দেহ হয় তাঁর আর তখন তিনি সেই বহুতল ফ্ল্যাট বাড়ির অন্য বাসিন্দাদের ডাকেন। সেটাই স্বাভাবিক, তবে হই চই শুরু হয় তারপরে আর কেউ একজন পুলিশকে ও ফোন করে দেয়। লোকাল এস.ও. এলে পরে দরজা ভাঙ্গা হয় আর দরজার সংলগ্ন করিডোরেই মৃত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখা যায় মি: নার্লেকরকে। পুলিশের ডাক্তার এসে দেখে মৃত ঘোষনা করেন’।

‘তবে পোস্ট মর্টেমের রিপোর্ট বলছে যে তিনি হঠাৎ করে দম আটকে গিয়ে মারা গিয়েছেন যা ঠিক হার্ট অ্যাটাক নাও হতে পারে। তাই ভাবলাম কোনো বিষাক্ত গ্যাসের প্রভাবে মৃত্যু ও হ’য়ে থাকতে পারে তবে তার কোনো চিহ্ন ও মেলেনি। হাইলি ভোলেটাইল কোন গ্যাস হ’লে তা হতেই পারে কেননা মৃত্যুর সময় সন্ধ্যা প্রায় সাতটাতে আর আমরা জানতে পেরেছি রাত এগারটার আগে নয়। পুলিশ  ভেরিফিকাসন করার পরে ডেড বডি মুভ করা হয়’।

‘তিনি কখন বাড়ি ফিরেছিলেন?’

‘ঠিক সাতটার সময়, ঘরের ডিজিটাল বেব কামেরার ফটো তাই বলে ‘

‘ সেই সময়ে কি কারো আসবার কথা ছিলো দেখা করতে?’ বাদল জিজ্ঞাসা করলো এইবারে ...

‘ ঠিক তাই, আই.এস,সির. স্পন্সরশিপের টাকা দেবার জন্যে তিনি আয়োজকদের একজনকে নিজেই ডেকে ছিলেন আর তাই নিজেও এসে গিয়েছিলেন’

‘তিনি আসেননি?’

‘ এসেছিলেন বৈকি? লাখ টাকার পেমেন্ট নিতে আসবে না কেউ এ কি হতে পারে? তবে চারবার বেল বাজিয়ে ও সাড়া না পেয়ে তিনি মনে করেন যে একলা ঘরে হয় তিনি ঘুমিয়ে পড়েছেন আর নয় তো বেল বাজছে না কেননা বেলের শব্দ তিনি ভালো শুনতে পাননি ...অবশ্য তিনি বেশ বয়স্ক মানুষ, কানে কম শুনতেই পারেন...’

‘তিনি যে আসবেন সে কথা কেউ জানতো কি?’

‘অনেকেই জানতে পারে...গোপনে তো তিনি এইসব দান খয়রাত করতেন না, আজকাল স্পন্সর করা ও একটা তো ব্যবসা, বেশি করে নাম প্রচার করানো হয়ে থাকে স্পন্সরারের আর তার ব্যবসা বা প্রতিষ্ঠানের ...’

‘তা হলে সেই সুযোগ তো কেউ নিয়ে থাকতেই পারে? পি.ও.তে গিয়ে এবারে দেখতে হবে যে তোর মিস্টিরিয়াস কেস কি করে সলভ করা যায়’।

শুনে.সাবরকর বললো –‘সুযোগ নেবে কি করে? ঘর তো বন্ধ আর সে তো যেতেই হবে, কিন্তু গিয়ে কি আর দেখবি তুই? পুলিশ কি আর কিছু দেখতে বাকি রেখেছে? সবাইকার জবানবন্দি ও নিয়ে রেখেছে ফাইলে। তোর কোনো চান্স নেই, তবু ও একবার চল  ...’

বাদল আমার কানে কানে বললো-‘ওই পুলিশ জিপে করে মোটেই নয় কিন্তু, কাকু’

আমি হেসে বললাম –‘ঠিক আছে, সাবরকর, তোকে তো আমি ও বলতাম সবুর কর তা পুলিশ জিপ আনতে একটু সবুর করে তোর নিজের গাড়ী টাড়ী  থাকে তো এবারে তাই আন ভাই’।

নিজের এ.সি.গাড়ী এনে হজির করলো সে। আমরা রওনা হলাম। সায়েন্স কংগ্রেসে পুনের একটা রোড ম্যাপ দিয়েছিলো।সেটা বাদল একবার খুলে দেখেছিলো। সে বললো –‘কাকু, মনে হয় আমরা সদাশিভপেঠ ছাড়িয়ে যাচ্ছি। এদিকে তো সব পশ এরিয়া কাকু, বড় লোকেদের বাস। তবে বেশ দূর আছে  দেখছি ঘটনাস্থল’।

গাড়ী এসে একটা বহতল ফ্ল্যাট বাড়ির সামনে থামলো। লিফ্টে করে আমরা সোজা পাঁচতলাতে উঠে গেলাম। লিফ্ট থেকে পুরো করিডোর লাল কার্পেটে ঢাকা। আমরা ফ্ল্যাট নম্বর ৫১ র সামনে এসে দাঁড়ালাম। দরজা লক করা ছিল আর বাইরে একজন কনষ্টেবল বসেছিল পাহারায়। সাবরকর কে দেখেই সে উঠে স্যালুট ঠুকতে তাকে সীল ভেঙ্গে তালা খুলতে বলল। সে কাজ শুরু করে দিল তখুনি।

বাদল দরজার কাছেই ছিলো,সে হঠাৎ তার ডান হাতটা উঁচু করলো কিন্তু তার আঙ্গুল কলিং বেল অব্দি পৌছলো না তাই সে লাফিয়ে উঠে সুইচ টিপে দিলো কিন্তু বেল বাজবার কোনো শব্দ ভিতরে শোনা গেলো না যদি ও ততক্ষণে দরজা খোলা হয়ে গিয়েছিলো।

কিন্তু আমার বেশ রাগ হ’লো বাদলের এই ছেলেখেলা দেখে।রাগত ভাবে বললাম-‘এটা কি হ’লো বাদল? দেখছ দরজা লক করা রয়েছে আর তুমি কিনা কলিং বেল বাজাজ্ছো, পাগল না পেট খারাপ?’

বাদল হেসে বললো-‘মনে করো কাকু দু’টোই, কেননা আমার বেল দেখলেই বাজাতে ইচ্ছে করে খুব তার কি করবো? কিন্তু বেল তো এখন আর বাজলো না কাকু, যদি ও কাল রাতে বেজেছিলো বলে শুনেছি যখন ছোট ভাই এসেছিলেন বাড়ি ফিরে?’

বললাম-‘থাক, খুব হয়েছে খেলা, আর এরকম যেন করো না তুমি, সাবরকর হাসবে। তুমি না বলো বড় হয়ে গিয়েছে।আর তা’তে কি হয়েছে? বেল হয়তো খারাপ হয়ে গিয়েছে, তাই বাজে নি’।

ততক্ষণে দরজা খোলা ও লাইট জ্বালা হয়ে গিয়েছিলো আর বিশাল সুসজ্জিত ফ্ল্যাট মার্কারী ভেপার ল্যাম্পের উজ্জ্বল আলোতে ঝকমক করছিলো ।আমরা এক এক করে ঘরে ঢুকে করিডোর পার হয়ে গিয়ে সোফাতে বসলাম। একটু পরে সার্চ করা হলো ফ্ল্যাট আবার ...জুতোর তাকে কয়েক জোড়া বুট,শু আর চটি, ড্রেস ক্যুবিকালে কোটপ্যান্ট, সার্ট, টাই আর কিচেনের উপকরণ সব দেখা হ’লো তবে  সব নরমাল ...     আর সব শেষে কম্পুটারের ছবির ফুটেজ দেখা ও জবানবন্দি গুলো পড়া হলো। অবশ্য সাবরকরই পড়লো। আমরা শ্রোতা, তবে বাদল চঞ্চল কে চোখের ইঙ্গিত করে একটা কিছু বললো দেখলাম আর সে ও দিব্বি ঘাড় নেড়ে সায় দিলো।

কিন্তু.না:, কম্পুটার বলে যে ঘরে কোনো অনাহুত ব্যক্তির অনুপ্রবেশ ঘটেনি কখনো মোটেই তা ঠিক। সকালে দুই ভাই তৈরী হয়ে বেরিয়ে যাওয়া আর সন্ধ্যেতে ফিরে এসে বড় ভাই ঘরে ঢোকা অব্দি পরিস্কার ব্যাপার। এমনকি পরে একা উঠে দরজার দিকে মি: নার্লেকার চলে গেলেন, সেই ফুটেজ ও রয়েছে তবে করিডোর ক্যামেরার সীমার বাইরে বলে সেখানে যা হয়েছে তার ছবি নেই রেকর্ডে।

তাই এটা যদি খুন হয় তবে দুনিয়ার প্রথম নিখুঁত মার্ডার বলতে হবে যার কোনো ক্লু নেই প্লেস অফ অকারেন্সে। আমরা ব্যর্থ হলাম পুরোপুরি আর সাবরকরের মুখ ভার হয়ে উঠলো। কিন্তু করবার তো কিছু নেই, তাই আমরা ফিরলাম। সাবরকর রেল স্টেশনের কাছে আমাদের হোটেলে এনে পৌঁছে দিয়ে চলে গেলো একটি ও কথা না বলে।

আমি আমাদের ডিনারের অর্ডার দিলাম এসেই আর খাওয়া দাওয়ার পরেই ঘুমের আয়োজন করবো ঠিক করলাম, কেননা কাল সকাল ন’টাতে আমাদের যেতে হবে উদ্ঘাটন সভাতে আর ট্রেনে বা তার আগের রাতে ও ভালো ঘুম মোটেই হয়নি আমাদের কারোই।

চঞ্চল বাইরের পোষাক দামী জ্যাকেট ও আকাশী রঙের আঙ্গুরা উলের পুল ওভার সব একে একে খুলে বিছানায় যাবার জন্যে তৈরী হ’লো আর আমি ও গিয়ে ছেলেটাকে জড়িয়ে ধরে কোলে তুলে  নিয়ে একটু পায়চারি করে নেব ভাবলাম, অভ্যেস মতন।

কিন্তু ঠিক দু’মিনিটেই চঞ্চল ঘুমিয়ে গেলো দেখে বাদল ভ্রু কুঁচকে বললো-‘কাকু, পরীর দেশের রাজকুমারের খুব ঘুম পেয়েছিলো তা ঠিক, তবে তুমি কোলে নিতেই ঘুমিয়ে পড়লো দেখে মনে হয় এ’টা ওর ছেলেবেলার অভ্যেস।তুমি ওকে ঠিক দুধ খাইয়ে কোলে নিয়ে ঘুম পাড়াতে, তাই না কাকু?’

আমি শুধুএকটু হেসে  হ্যাঁ বললাম।

চঞ্চলকে নিয়ে গিয়ে ধীরে করে বাচ্ছা ছেলের মতন বিছানাতে শুইয়ে দিলুম আমি আর নরম কম্বল দিয়ে ওর দুধের বরণ শরীরটাকে ঢেকে দিলাম যাতে ঠাণ্ডা না লেগে যায়।বাদল বললো-‘এবারে কি করবে কাকু?’

আমি উত্তর না দিয়ে গিয়ে শুধুমাত্র অন্তর্বাস পরিহিত সুন্দর কিশোর ছেলে বাদলকেই জড়িয়ে ধরে টেনে কোলে তুলে নিলাম দেখে সে বললো-‘অ্যাই কাকু, কি করছো? আমার লজ্জা করে না? আমি তোমার চঞ্চলের থেকে বড় তা জানো তো? আর আমি কি তোমার ভাইপোর মতন অলোকসামান্য সুন্দর ছেলে নাকি, যে কোলে তুলে নিয়ে আদর করবে তুমি?  ওর মুখের দিকে তাকালে তো আর চোখ ফেরানই যায় না কাকু ...আমি তো ওর তুলনায় কালো ছেলে  আর জানো তো চঞ্চল বলে যে আমার মাথায় নাকি ঘুণ পোকা আছে আর সে যখন নড়ে, তখন সব গোলমাল হয়ে যায় আমার রুটিন’।

‘আমার কাছে কিন্তু এখন রূপের চেয়ে গুণ বড়,বাদল ...তা এখন আমার মাষ্টার হোমস কি ভাবছেন, তাই শুনি’ বাদলকে জড়িয়ে ধরে আদর করতে করতে আমি জিজ্ঞাসা করলাম।

মিষ্টি নরম সুরে বাদল বললো -‘তুমি শুনলে রাগ করবে, কাকু, থাক’।

‘না করবো না, তুমি বলো তো’।

‘ভাবছি যে আজ ও রাতের ঘুম আমাদের ভাগ্যে নেই একটু ও, কি হবে?’...

‘সে আবার কি কথা,বাদল? একটু পরেই তো গিয়ে শুয়ে পড়বো আমরা দু’জনেই...’

দারুণ মিষ্টি হেসে বাদল বললো-‘সেই কথাই তো মুস্কিলের, কাকু...কেননা বেলটা তখন বাজলো না কেন, তাই আমার মাথায় ঘুরছে তখন থেকে কাকু। তা এক কাজ করো না কাকু তুমি। আমি তো ক্লাস সেভেনে পড়ি, আমাদের কোর্সে ইলেকট্রিক বেল নেই। তা তুমি তো বৈজ্ঞানিক কাকু, একটু আমাকে বুঝিয়ে দেবে প্লিজ, কি করে কাজ করে ইলেকট্রিক বেল? আমি দেখে নিয়েছি যে ওই ফ্ল্যাটের বেলটা কিন্তু আধুনিক ইলেকট্রনিক বেল নয়, একটা বেশ পুরনো ধরনের ইলেকট্রিক বেল’।

‘তোমার মাথায় এখনো সেই বেল বাজছে বাদল? এই সব তুচ্ছ দিকে মন দিলে কি আর ভালো ইনভেস্টিগেটর হওয়া যায় বাদল? সে যাক গিয়ে, তোমার মাথায় যখন ঢুকেছে তখন বুঝিয়ে দিচ্ছি, কি ভাবে বাজে ইলেকট্রিক বেল, নইলে তো আর নিস্তার নেই ’।

এই বলে গিয়ে সোফাতে গিয়ে বসে পড়লুম আমি তবে বাদলকে ছাড়তে ইচ্ছেই  করছিলো না আমার একটুও , সত্যি বলছি ...তাই রূপবান ছেলেটাকে কোলে বসিয়ে রেখে একটা কাগজ নিয়ে তাইতে ইলেকট্রিক বেলের ডায়াগ্রাম আঁকতে শুরু করলাম আমি।সার্কিট, তার, আর্মেচর, হ্যামার, স্প্রিং, বেল সব আঁকলাম তারপর বিদ্যুত চুম্বক বসিয়ে তাইতে ইন্সুলেটেড তার জড়িয়ে দেখালাম। যেই সেই তারে বিদ্যুৎ বইবে অমনি লোহা থেকে বিদ্যুৎ চুম্বক হয়ে কি ভাবে আর্মেচর কে নিজের দিকে টেনে আনবে আর হ্যামার গিয়ে ঘা দেবে ঘন্টিতে তখন ঠণ…. শব্দের সাথে আর সঙ্গে সঙ্গে সার্কিট ব্রেক হয়ে যেতেই চুম্বক লোহা হয়ে যাবে আর আর্মেচর ফিরে যাবে স্প্রিংয়ের জোরে নিজের জায়গাতে হ্যামার সমেত। এই প্রক্রিয়া চলবে বার বার…আর বেল বাজবে ঠন ঠন  ঠন’।

বাদল একটি কথা ও না বলে চোখ বড় বড় করে চুপ চাপ সব শুনে গেলো।

তারপরে আমাকে ‘থ্যাংক ইউ, কাকু’ বলে  উঠে গিয়ে চঞ্চলের প্যান্টের পকেট থেকে একটা জাপানি ছোট রেকর্ডার বার করে নিয়ে এসে চালিয়ে দিয়ে জবানবন্দির অংশ গুলো আবার করে শুনতে লাগলো বসে।

বুঝলুম যে বাদল তখন এটাই অন করতে ইশারা করেছিলো চঞ্চলকে।

শেষে বললো-‘কাকু, দু’ দু’টো বিরাট অসঙ্গতি কোথাও রয়েছে আমাদের চোখের সামনেই কিন্তু আমি এমন একটা গাধা ছেলে যে কিছুতেই তা ধরতে পেরে উঠছি না আর তুমি কিনা আমাকে জিনিয়াস বলে আদর করো অতো’।

তখন রেকর্ডে শেষ জবানবন্দি চলছিলো মিঃ নার্লেকরের সত্ভাইয়ের। তিনি সিনেমার টিকিটের শেষ অংশও দেখিয়ে ছিলেন আর যে বন্ধু তার সাথে সিনেমাতে গিয়েছিলো তাকে ও পুলিশ আলাদা ভাবে জেরা করেছিলো। সে পরিষ্কার বলে যে সে সব সময় তার বন্ধুর সাথে ছিলো তবে সন্ধ্যে ছ’টাতে শো শুরু হতেই  সে একবার বাথরুমে গিয়েছিলো। তখন তো আর তার সাথে সে যেতে পারে না, তাই যায় নি।

প্রশ্ন করা হয় যে  তিনি কতক্ষণ পরে ফিরে এসেছিলেন বাথরুম থেকে? পাঁচ মিনিট না আরো কম?

একটু বেশি, ধরুন পঁচিশ মিনিট।

কেন? বাথরুম করতে কারো এত সময় লাগে নাকি আবার?

না:, তা লাগে না তবে তিনি বললেন যে অন্ধকারে বাইরে বেরোতে গিয়ে কিসে হোঁচট লেগে পুরনো চটিটা ছিঁড়ে যায়। তাই একটা মুচি খুঁজতে গিয়েছিলেন কেননা চটি সেলাই না হ’লে তো হাঁটতেই পারবেন না আর শো শেষ হ’তে তো ন’টা বেজেই যাবে। তখন তো আর মুচিকে পাবেন না তাই আর উপায় কি? তিনি নতুন সেলাই ও দেখেছিলেন বন্ধুর চটিতে, তাই অবিশ্বাস করেন নি।

সিনেমা শেষ হলে দু’জনে হেঁটেই ফেরেন অতো রাতে ট্যাক্সি না পেয়ে। তবে হলটা বাড়ির কাছেই বলে বেশী সময় লাগেনি আর ভিড় কমতে দেরি করে বেরিয়ে ও সাড়ে ন’টা কি পৌনে দশটার মধ্যে বাড়ি পৌঁছে যান।

বাদল বললো –‘অফ করে দিই রেকর্ডার কাকু, কিছুই তো হলো না, সব পন্ডশ্রম মাত্র। তোমাকে ঘুমোতেও দিলুম না আমি শুধুই। সরি কাকু, চলো এবারে গিয়ে শুয়ে পড়ি আমরা।

আমি নাইট ল্যাম্প অন করে গুডনাইটের সুইচ টিপে দিয়ে বাদলকে নিয়ে গিয়ে বিছানাতে লম্বা হ’লাম কম্বল গায়ে দিয়ে... আর ছেলেটার নরম উষ্ণ শরীরটাকে বুকে জড়িয়ে ধরে। ঘুমন্ত চঞ্চলকে তো আর তুলে আদর করা যায় না, তাই সেটা বাদলকে দিয়ে পুষিয়ে নিতে নিতে বেশ ঘুমে দু’চোখ জড়িয়ে এলো আমার।

কতক্ষণ তন্দ্রাতে ছিলাম জানি না।চটকা ভাঙ্গলো আমার বাদলের মৃদু ডাকে –‘কাকু, ও কাকু ...’
‘কি হলো আবার?’

‘কাকু, রাগ করলে? আমি বড় ত্যাক্ত করছি না তোমাকে আজ?

‘না, না…রাগ করিনি ... বলো না কি হয়েছে, শুনি?’

‘আমি যদি বলি যে এখনই আমাদের একবার পি.ও.তে যেতে হবে আবার অনুসন্ধানের জন্যে তা’হলে তুমি আমাকে ঘা কতক না দিয়ে কি আদর করবে কাকু?’

আমি চমকে গিয়ে উঠে বসলাম বিছানাতে – ‘কি বলছো বাদল তুমি? এত রাতে কি করে যাব অত দূরে আর সাবরকর সঙ্গে না থাকলে কে ঢুকতে দেবে সেখানে আমাদের? ...তা ছাড়া সবই তো তন্ন তন্ন করে দেখা হয়েছে বাদল, আর কি দেখার বাকি আছে বলো তো?’

‘আছে কাকু, আমি কম্পুটারের ছবির ফুটেজটা আবার একবার দেখতে চাই এবং তা এখনি আর শেষে ওই ঘন্টিটাও’।

‘নিকুচি করেছে তোমার ওই হতচ্ছাড়া ঘন্টির, হ্যাঁ না তো’।

তা মুখে রাগ দেখালেও বাদলের কাজে বাধা দেওয়া আমি পছন্দ করি না তা সে যত উদ্ভটই কাজ হোক না কেন.. আমি প্রায় দেখেছি যে তা করলে কিন্তু শেষে বড় ঠকতে হয়।তাই ফোন তুললাম গজ গজ করতে করতে।বাদল আমার স্বভাব জানে বলে চুপটি করে এক্কেবারে ভালো ছেলেটির মতন বসে রইলো ...

‘হ্যালো, সাবরকরকে চাই এখনি, কথা বলিয়ে দিন প্লিজ’।

একটু বিরতি…. তারপরে ‘হ্যালো স্যার’ শুনতে পেলাম আমি।বললাম-‘ঘুমোচ্ছিলিস তো? ডিস্টার্ব করলাম, আগেই তাই মাফ চাইছি’।

‘আরে আজ রাতে আমার শিরে সংক্রান্তি। কাল হয় আমার চাকরী যাবে আর নয় তো ডিমোশন দিয়ে ট্রান্সফার তো করে দেবেই নির্ঘাৎ। আর আমি ঘুমবো? তুই কি চাস এখন তাই বল। বান্দা হাজির আছে জানবি, গোটা ফোর্স সমেত’।

‘আমি নই, বাদল পি.ও. তে আর একবার যেতে চায় এবং তা  কিন্তু এখুনি। বলছে ভারী ক্রিটিকাল একটা ইন্ভেষ্টিগেশন নাকি বাকি থেকে গিয়েছে তখন তাই যদি কিছু মনে না করিস তবে….’।

‘আরে তুই এত কিন্তু করছিস কেন? আমি ভুঁড়িওলা পুলিশ অফিসার নই। তুই মাত্র আমাকে দশ মিনিট সময় দে, তার মধ্যে আমার গাড়ী তোর হোটেলে গিয়ে হাজির হবে। বে রেডি…’।

তখন আর কি? উঠে বাদল কে নিয়ে গিয়ে আগে দামী গরম পোশাক পরিয়ে দিতে  বসলাম।এত রাতে বাইরে বেশ ঠাণ্ডা পড়ে পুনেতে। কিন্তু চঞ্চলকে নিয়ে কি করি? ছেলেটাকে একলা ঘরে ফেলে রেখে দিয়ে যেতে ও মন চাইছে না আর সেটা করা ঠিক ও নয় নয়তো কাঁচা ঘুম ভাঙিয়ে তুলে নিয়ে যেতে হয় ...

হঠাৎ চঞ্চল নিজে থেকেই বিছানায় উঠে বসে বললো –‘কাকু, আমাকেও ড্রেস করিয়ে দাও। তোমার ফোনের সাথেই আমার ঘুম ভেঙ্গে গিয়েছে। তোমার সাথে না শু’লে কি আমার ঘুম হয় কাকু? তুমি তো বাদল কে নিয়েই আছ আজ দেখছি’।

তখন সবাই তৈরী হতে হতেই সাবরকর এসে হাজির হ’লো। এ.সি.কার ছুটলো আবার আগের পথে সাঁ সাঁ করে, সঙ্গে এক ভ্যান ইনভেষ্টিগেশনের ফুল টিম নিয়ে।

রাত একটা বাজছে তখন।

যেতে যেতে সাবরকর বললো -‘জানিস সিধা অর্থ, আমার বস কিন্তু আজ রেগে একদম আগুন হয়ে আছেন, তাই পুরো ফোর্স আর এক্সপার্ট টিম কে আমার জিম্মায় দিয়ে অর্ডার দিয়ে গেছেন- - ‘ডু এনি হেলিশ ডিড ইউ লাইক, বাট ট্রাই টু গেট অ ক্লু ফর দিস ব্লাডি কেস ওভারনাইট ইন এনি ওয়ে, য়্যান্ড দ্যাটস অল …’

সাবরকার বললো –‘তুই তো বুঝিস সিধা কথা আর তার অর্থ কিন্তু এই বিচ্ছিরি , বাজে আর বেয়াড়া পুলিশের চাকরিতে  যেমন করেই হোক না কেন, হুকুম তামিল করতে পারাই হ’লো একমাত্র কাজ আর যে তা করতে পারে সে যত গাধাই হোক না কেন এক মিনিটে হয়ে যায় মোস্ট এফিসিয়েন্ট  আর তা না পারলে যে কি দুর্গতি হয় তা তো তুই বুঝবি না’

বাদল বলল-‘আংকল, আমার কিন্তু একটা স্ক্রু ড্রাইভার লাগবে, পাবো কি?’

সাবরকর চমকে গেলেও সামলে নিয়ে বললো-‘তুমি চাইলে গোটা সি.আই.ডি. টিম আর অফিসটাই চলে আসবে পাঁচ মিনিটে সেখানে। তুমি শুধু বলো, কি করতে হবে আমাদের? আমার মাথাতে কিছুই আসছে না। তাই গোটা ডিপার্টমেন্ট আর ফোর্স নিয়েও অসহায় হয়ে বসে আছি’। 

গাড়ী গিয়ে থামলো পোর্টিকোতে আর আমরা লিফ্টে করে ফ্ল্যাটের দরজায় গিয়ে হাজির হলাম।

‘দরজা খোলো’ হুকুম দিলো সাবরকর।

খুলে গেলো দরজা আর আলোও  জ্বলে উঠলো।

‘এবার কি করতে হবে মাস্টার বন্ড’?

‘ক্যামেরার ফুটেজটা আগে দেখবো’।

সাবরকর অর্ডার দিতেই ছবি চালু হলো। আলো নিবিয়ে দিয়ে বসে দেখতে লাগলাম আমরা। একসময় বাদল বলে উঠলো -‘স্টপ ইট’।.

অপারেটর বোতাম টিপে বন্ধ করলো সঙ্গে সঙ্গে।

‘রিবাউন্ড ইট…টেক ইট ব্যাক’। বাদল বলল।

পিছিয়ে গেলো রেকর্ডের ছবি। আবার বললো বাদল-‘স্টপ অ্যান্ড সী, এই ফুটেজে বড় ইম্পর্টান্ট জিনিষ দেখা যাচ্ছে যা আমি আগে দেখে ও দেখিনি। তাই মিছেই এতটা সময় নষ্ট হলো। কি করবো? মায়ের কৃপায় ইনসাইট না এলে শুধু চোখে দেখে কিছুই হয় না যে, সে তো আর বানিয়ে নেওয়া যায় না ইচ্ছে হলেই’।

সাবরকর বললো -‘তা তো হ’লো না হয় কিন্তু দেখবোটা কি রে বাবা, তা তো আমাদের কারো মাথাতেই ঢুকছে না। সুট, বুট পরে মি: নারলিকার বেরিয়ে যাচ্ছেন আর কি যেন নিতে তাঁর ছোটভাই বেরিয়ে যেতে গিয়ে ও আবার ফিরে এসে ড্রয়ার খুলছেন।এই তো ছবি। ও হরি, পার্স নিতেই ভুলে গেছেন নাকি? ঠিক তাই, কিন্তু এতো স্বাভাবিক ভুল, সবাই করে থাকে ... এতে ইম্পর্টান্ট কি আছে বাদল?’

‘আছে, ছোট ভাইয়ের ভুলো মন তা জানা তো গেলো তো ...এবারে তিনি যে ড্রেস পরে আছেন তা লক্ষ্য করুন’।

ওয়েল ড্রেসড’… মি: সাবরকর বললো। ‘নিখুঁত পোশাক দেখতে পাচ্ছি, তবে সুট পরেননি, এই যা।কোট, প্যান্ট, বুট… কি নেই পরনে’?
‘তার মানে হচ্ছে যে এই ফিরে আসাটাই ভুল হয়েছিল তাঁর কেননা জুতো থাকে করিডোরে আর সেখানে ক্যামেরা নেই, ফটো ও উঠতো না তাঁর পোষাকের ফিরে না এলে। এটাই প্রথম অসঙ্গতি এই ফুটেজের, আংকল’।

‘কিন্তু কোনো অসঙ্গতি তো খোদাতেও ধরতে পারবে না এই ফুটেজে। তুমি কি পাগল হলে বাদল’?

শোনামাত্র ধনুক থেকে ছোঁড়া তীরের মতন লাফিয়ে উঠে বাদল ঋজু দেহে আর শান্ত ও স্থির গলায় প্রশ্ন করলো-‘আংকল, কিছুই নেই অসঙ্গতি বলছেন আপনি এই ফুটেজে? বেশ, তবে হয়তো আমারই ভুল হয়েছে কিন্তু মাত্র একটা প্রশ্নের উত্তর দিন আপনি আমাকে, আমি আর কোনো কথাই বলবো না’।

থতমত খেয়ে সাবরকর জিজ্ঞাসা করলো- ‘কি’?

‘সকালে যিনি বুট পরে বেরিয়েছেন ঘর থেকে, সন্ধ্যে বেলাতে তাঁর পায়ে চটি এলো কি করে?

শোনামাত্র লাফিয়ে উঠে দাঁড়ালো সাবরকর, যেন হাজার ভোল্টের শক খেয়েছে।

‘কি, কি বললে তুমি? ওহ মাই গড?  কি অসাধারণ অব্জার্ভেশন আর দৃষ্টি তোমার ভাই? আমি তোমাকে গোল্ড মেডেল দেওয়াবো… এক লাখ টাকার সরকারী পুরষ্কার ও পাইয়ে দেবো… তোমার জন্যে ডিটেকটিভ ডিপার্টমেন্টে চাকরী রিজার্ভ করিয়ে দেবো আমি’।

বাদল হেসে বলল-‘আংকল, এতে কিন্তু আপনার কাজ পুরো হবে না। তিনি সাফ বলবেন যে বুটটা বড় পায়ে লাগছিলো বলে তিনি বেরুবার আগে আবার খুলে রেখে দিয়ে চটি পরে নিয়ে বেরিয়ে ছিলেন। মনে রাখবেন করিডোরে ক্যামেরা না থাকায় আপনি মানতে বাধ্য হবেন তার কথা’।

‘তবে? তবে কি করবো? তীরে এসে তরী ডুবলো? কিছুই প্রমাণ হ’বে না’? ধপ করে আবার বসে পড়লো সে সোফাতে।

সুন্দর হেসে বাদল বললো-‘হবে আংকল, তবে তার জন্যে চাই একটা স্ক্রু ড্রাইভার’।

দ্বিতীয় অসঙ্গতি ও দেখে নেওয়া যাক যে বেলটা বাজলো না কেন তখন আমি সুইচ টিপতে’... 

‘অভি লে আও স্ক্রু ড্রাইভার’… বিরক্তি আর অসহায় রাগে গর্জে উঠলো সাবরকর। নীচে এক্সপার্ট টিম ছিলো। সেই দলের একজন স্ক্রু ড্রাইভার নিয়ে চলে এলেন।

‘এবারে কি করতে হবে বলো মাস্টার’?

‘এই নীচু টেবিলটাকে করিডোরে টেনে নিয়ে গিয়ে তার ওপরে এই স্টুলটাকে তুলতে হবে’।

সাবরকর ইঙ্গিত করলো। দু’জনে তত্ক্ষণাৎ তাই করলো।

বাদল গিয়ে দ্রুত উঠে পড়লো স্টুলের ওপরে কিন্তু হাত তুলেই বললো-‘না:,ছোটোদের দ্বারা যদি কিছু হ’বার হয়? যতই বুদ্ধি থাক না কেন তাদের। আমি  হাতই তো পাচ্ছি না। বেলটা অনেক উঁচুতে ফিট করা আছে যে’।

‘মাস্টার বন্ড, তুমি নেমে এসে কি করতে হবে ওদের বলে দাও শুধু। তুমি যা বলবে ওরা তাই করবে তত্ক্ষণাৎ’।

বাদল নেমে এসে বললো-‘আংকল, ওই কালো রঙের বেল বক্সটা খুলতে হবে তবে ভিতরে কাঁচের বা প্ল্যাস্টিকের টুকরো থাকতে পারে। যেন পড়ে গিয়ে ভেঙ্গে না যায় বা কারো হাত লেগে তার থেকে ফিঙ্গার প্রিন্ট না মুছে যায়, এমন সাবধানে খুলতে হবে বেলবক্সটাকে’।
‘ইলেক্ট্রিশিয়ান মুমতাজ কো বুলাও অভি’… হুকুম দিলো সাবরকর।

কয়েক মিনিটের মধ্যে চলে এলো ইলেক্ট্রিশিয়ান।

‘ওহি ইলেকট্রিক বেল বক্স পুরা উখাড়কর নীচে উতারো সাবধানী সে। এক ভি স্ক্রু য়া অউর কুছ উসমে সে গিরা তো তুম গয়ে কাম সে, সমঝ লো কি অভি হুয়ে সস্পেন্ড অউর ফির টর্মিনেটেড, জান লো’।

তাই কারেন্ট অফ করে দিয়ে সন্তর্পনে পুরো বেল বক্সটাই নামিয়ে আনলো মুমতাজ... একটা সাদা চাদর বিছিয়ে খুব সাবধানে তা খোলা হলো...

কি আশ্চর্য কান্ড?  ভিতরে অনেক কাঁচের টুকরো সত্যিই রয়েছে দেখা গেল। একটা বড় টুকরো তখনো আটকে রয়েছে কাঠের সাথে।
‘এইবারে এই টুকরো গুলো পরীক্ষা করলেই বোঝা যাবে যে এই কাঁচের বেল বা বলে যেটা ধাতুর বেল সরিয়ে আটকে  দেওয়া হয়েছিল, তাইতে হাই প্রেসারে কি ধরনের হাইলি ভোলেটাইল বিষাক্ত গ্যাস লিক্যুইফাইড ফর্মে  ভরা ছিলো’।

বাদল আবার বললো -‘এত বড় লোকের দরজার বেল অকেজো থাকে এটা মেনে নেওয়া চলে না কিন্তু ধাতুর বদলে কাঁচের বেল লাগানো থাকা কি অসঙ্গতি নয় একটা? সেই বেল কি আবার বাজে নাকি? আর মাথার ওপরে পড়ে থাকা এই প্রমাণ কেই বা খুঁজে পাবে? কেনই বা খুঁজবে কেউ? তবে আমার বেলায় ঘন্টিটা না বেজে আমাকে সন্দিগ্ধ করে তুলেছিলো তখন বলেই না সব গন্ডগোল হয়ে গেলো আর এমন সুন্দর ফন্দিটা মাঠে মারা গেল ...’  

‘কেমিকাল টিম কো বুলাও’, গর্জে উঠলো সাবরকর।‘অউর ফিঙ্গারপ্রিন্ট টিম কো ভি’।

এলো ফিঙ্গার প্রিন্ট এক্সপার্ট ও প্রিন্ট নেওয়া হ’লে কেমিকাল আনালিসিস শুরু হ’লো।

এক ঘন্টাতে রিপোর্ট দিলো টিম যে অতি বিষাক্ত গ্যাসের চিহ্ন আছে কাঁচের আধারে আর কাঁচ ও কাঠেতে ফিঙ্গার প্রিন্ট ও আছে।
বাদল বললো-‘শুধু যদি সন্ধ্যা বেলা ছ’টার একটু পরে এসে ডুপ্লিকেট চাবি দিয়ে দরজা খুলে দশ মিনিটের ও কম সময়ে ধাতুর  বেলটা বদলে দিয়ে যাবার সময়ে তাড়াতাড়িতে ভুল করে চটি পরে না বেরিয়ে যেতেন আমাদের আর্টিস্ট, তা’হলে আর ধরা যেত না তাঁর কীর্তি কোনো কালেই। আমি মানছি যে এটা শুধু মার্ডার নয়, এটা ও একটা আর্ট’।

‘পথে নেমে মনে পড়তে কি আর করেন তখন তিনি? ফিরে যেতে তো আর পারেন না কেননা যেকোনো সময়ে বড় ভাই এসে পড়তে পারেন ...তাই বাধ্য হ’য়ে চটি সারাতেই যেতে হ’ল যাতে নতুন সেলাই আর মুচিকেও সাক্ষী রাখা যায় আর  রাত দশটাতে এসে শুধু কলিং বেলের সুইচ টিপে দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা আর লোকজন ডাকা, এই তো কাজ। যিনি শব্দ শুনে দরজা খুলতে আসবেন, তিনি তো তার অনেক আগেই পঞ্চত্ব পেয়ে গিয়েছেন অন্য একজন কে দরজা খুলে দিতে এসে। আরো ঘন্টাখানেক পরে যখন পুলিশ এসে দরজা ভাঙ্গবে, তখন ঘরে গ্যাসের ও চিহ্নমাত্র নেই আর দিব্বি আপনিই বিনা বাধায় উদ্দেশ্য সিদ্ধি হয়ে গিয়েছে, আর কি’?     

‘আর্টের না নিকুচি কিয়া হ্যায়, অভি ম্যাচিং করো ফিঙ্গার প্রিন্ট রেকর্ড কে সাথ অউর না হো তো ডি.এন.এ. টেস্টিং করাও লেকিন একঘন্টে মে মুঝে রিপোর্ট চাহিয়ে ….সব কে সব অভি যাও’, রেগে মেগে এবারে কড়া অর্ডার দিল ডি.আই.জি. মি.সাবরকর।

বাদল একটু মাথা নিচু করে সুন্দর হেসে মিষ্টি গলায় বলল-‘আংকল, এইবারে তবে আমরা ও যাই। ভোর তো হয়ে আসছে। আমাদের তৈরী হ’তে  ও তো হ’বে, আর কাকু তো আবার সাত সকালেই যাবে উদ্ঘাটন সভাতে পি.এম.য়ের ভাষণ শুনতে আর আমাদের ও নিয়ে যাবেই,...কালকেই ফটো আই.ডি.করিয়ে রেখেছে কাকু’।


অধ্যাপক(ডঃ) জি০ সি০ ভট্টাচার্য, কাশী হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়,

বারাণসী-২২১ ০০৫, উত্তর প্রদেশ, ভারতবর্ষ।০৯৪৫২০০৩২৯০



Enhanced by Zemanta