অচিন পাখী - তাপসকিরণ রায় | ACHIN PAKHI: Bengali Short Story by Tapas Kiran Ray (WBRi Online Bangla Magazine)

Tapas Kiran RoyThe Bengali short story Achin Pakhi by Tapas Kiran Roy is presented in Unicode Bangla font. Roy is writing for a couple of years now and he has been published across various online Bengali magazines including Ichchamati, Joydhak, Diala Kochikancha, Banglalive, Tilottama Bangla, Madhukari, Parabaas and our own WBRi Online Bengali Magazine. The author can be reached at tkray1950 [at] gmail [dot] com.

Read all about Tapas Kiran Roy in a short biography of the author.

You can send your stories, poems and creative writing for publication in our online magazine section by e-mail to submissions@washingtonbanglaradio.com.



অচিন পাখী

তাপস কিরণ রায়

ক্লাসের মঞ্জু বলে মেয়েটিকে আমার খুব ভালো লাগতো।তখন বয়স আমার কত,দশ এগার বছর হবে।মঞ্জুর বয়স হবে নয় কিম্বা দশ।বয়স হিসাবে কিই বা বুঝতাম!তবু ভালো লাগা,মন্দ লাগার ধারণা তো থাকতই।

রানাঘাট প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়তাম--স্কুলের নাম ছিলো,পাল চৌধরী প্রাথমিক বিদ্যালয়।স্থানীয় জমিদার তারা পালচৌধরীর পরনো বাড়ির দোতলায় বসতো স্কুল।

ছেলেমেয়েরা এক সাথে পড়তাম।ছেলে মেয়েদের দৈহিক ভাগাভাগি ব্যাপারটা আমার তেমন বোধ হয় জানা ছিলো না।তবে বুঝতাম--ছেলে মেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা ব্যাপার।বোঝাবুঝির স্পষ্টতার অভাব থাকলেও,স্বভাবেও ছেলে আর মেয়ে আলাদা।

মনে পড়ে কোনো দিন কোনো কারণে হয়তো স্কুল ছুটি হোয়ে গেছে।আমরা ছেলে মেয়েরা এক সঙ্গে কিছুটা সময় খেলা করে তারপর বাড়ি ফিরতাম।কি খেলতাম--লুকোচুরি খেলাই বেশী হতো।লুকোচুরিতে ছোঁয়া ছুঁয়ির ব্যাপারটা আকর্ষণ ছিলো অন্য খেলা থেকে অনেক বেশী!আর হাডুডু খেলা?হ্যাঁ,এ খেলাতেও মজা কম নেই।কাউকে হয়তো জাপটে ধরে নিজের কোটে রেখে দিলাম। জিত আমাদের।খেলার ছলে না, খেলার ভুলে কখনো হয়তো কোনো মেয়েকে নিজেদের কোট পার হতে না দেবার জন্যে আপ্রাণ চেষ্টায় নিজেরই অজান্তে জাপটে ধরে থাকতাম।

পাশ থেকে কোনো মেয়ে,বয়স থেকেও মন বেশী পেকে গেছে এমন,বোলে ওঠে, হয়েছে এবার ছাড় মঞ্জুকে !

তখন মনে হতো,হ্যাঁ,তাই তো দম ছুটে যাবার সাথে সাথে ওকে ছেড়ে দেওয়া উচিত। তবে ওই বয়সে অন্তত আমার মনে হয়েছে ইচ্ছাকৃত ও সব হতো না।

প্রাথমিক শালা পার করে গেলাম।ছিটকে গেলাম সবাই নিজের নিজের ঠিকানায়।এক এক জন আলাদা আলাদা স্কুলে গিয়ে ভর্তি হলাম।এবার বেশীর ভাগ ছেলেরা ছেলেদের স্কুলে,মেয়েরা মেয়েদের স্কুলে ভর্তি হলো।তবে,হ্যাঁ,কো এডুকেশন সিস্টেম কোনো কোনো হাই,মিডিল স্কুলে ছিলো।লাল গোপাল,হিজুলি স্কুলে ছেলে মেয়েরা এক সঙ্গে পড়েছে।

আমি সঙ্গ ছাড়া—পালচৌধুরী উচ্চ মাধ্যমিক স্কুলে পড়েছিলাম। ওটা ছেলেদের স্কুল ছিলো।প্রাথমিক স্কুলের কথা অনেক করে মনে পড়ত।সে সঙ্গে মেয়ে সাথীদের কথা। মঞ্জু,মিনতি,প্রীতি কনা,রাতু ওদের কথা খুব মনে পড়ত।ছেলেদের মোধ্যে এক বিশু, লেংড়া বিশু--যে ক্লাসে সবচে বয়স্ক ছিলো,লেঙড়ে চলত,আর সবার বিশুদা ছিলো। আর এক দিকে মিনতি,বয়সে মেয়েদের মোধ্যে সবচে বড়,প্রায় সবারই দিদি। ক্লাসে বিশুর দাদাগিরি আর মিনতির দিদি গিরি খুব চলত!

সে সব দিন পেড়িয়ে হাই স্কুলে এলাম।পড়া শোনার চাপ গেলো বেড়ে।মেয়েদের কথা ভাবার সময় পেতাম কম।পেলে প্রথমেই যার কথা মন পড়ত--সে হলো মঞ্জু।ওকে ভালো লাগতো আমার।কিন্তু কেন জানি না,সবচে কম,প্রায় না'য়ের মত কথা হতো মঞ্জুর সঙ্গে।তবু যেন ভালো লাগা লেগে থাকত মনের গহনে কোথাও! এক দিন হাই স্কুল থেকে ফির ছিলাম।পথে মঞ্জু,হাতে বই খাতা নিয়ে ফিরছে,ওকে আমি দেখেছি ও আমাকে দেখে নি।ওকে দেখে আমার খুব ভলো লাগছিল।আরও সুন্দর হয়েছে ও। চেহারা আরও খুলেছে।লালিত্ব বেড়েছে।আমার সামনে দিয়েই মঞ্জু আসছিল।এক সময় দুজনে কাছাকাছি হলাম।একেবারে পাশাপাশি।সোজা তাকালাম মঞ্জুর দিকে।ও তাকালো।আমি হাসলাম,ও হাসলো।কথা কিছুই হলো না আমাদের মোধ্যে!শুধু দেখলাম হাসির সঙ্গে সঙ্গে ওর গাল লাল হোয়ে গেলো।আমি ছেলে, তবু যেন মনে হোয়ে ছিলো আমার গালও লাল হোয়ে ছিলো সে দিন!কেউ দাঁড়ালাম না,কেই মুখ থেকে টু শব্দ করলাম না,শুধু পরস্পর পরস্পরের দিকে মুহূর্ত মাত্র তাকিয়ে থেকে পাশ কাটিয়ে বিপরীত দিকে চলে গালাম।যখন একে অন্যকে পাশ কাটিয়ে সামান্য ব্যবধানে এসে গেলাম,মনে হলো—আরে,কোনো কথা তো হলো না আমাদের,ভাবতে ভাবতে উভয়ের মাঝখানে স্থানের অনেক ব্যবধান এসে গেলো।

দিন চলছিল এমনি ভাবে।কেউ কাউকে বিশেষ উদেশ্য নিয়ে খুঁজে দেখি নি।

এমনি ভাবে ক্লাশ নাইনে উঠে গেলাম।আমাদের পারিবারিক সমস্যার কারণে আমাদের চলে যেতে হলো পশ্চিম বঙ্গ থেকে সুদূর মধ্য প্রদেশে।খুব খারাপ লাগছিল রানাঘাট ছেড়ে যেতে।হাই স্কুলের ও পাড়ার বন্ধু দেবাশীষ,ননটাই,বাবু,কল্যাণ,ধ্রুব ওরা আমার বন্ধু ছিলো।ওদের ছেড়ে যেতে প্রাণ কাঁদছিল।আর একজনের কথা বার বার মনে পড়ছিল,সে ছিলো মঞ্জু।চার বছরে চারবার তার সঙ্গে দেখা হয়েছে কি না সন্দেহ।তবু মনের কোণে ও বসা ছিলো।যত বার ওর সঙ্গে দেখা হয়েছিল প্রতি বারই--চোখে চোখ পড়ত,মুখ লালাভ হোয়ে উঠতো।আর উভয়কে দেখতে দেখতে পার হোয়ে যেতাম রাস্তা।বাকশূন্য,তবু,তবু কেন ছিলো এত অনুরাগ মঞ্জুর ওপর!

চলে যাবার সময় খুব করে ওর কথা মনে পড়ছিল।মনে হচ্ছিল ওর বাড়িটা যদি জানতাম কোথায়,তবে বলে আসতাম--আমি যাচ্ছি।তোমার জন্যে আমার মন খুব খারাপ করছে।

মঞ্জুর মনের কথা শুনতে বড় ইচ্ছা করছিল।আমার যাবার কথা শুনে মন ওর কি আমার মত কেমন কেমন করছে?কিন্তু দেখা হলো না,কথা হলো না।আমি সুদূরে পাড়ি দিলাম।মনে হলো আমি চলে গেলাম--কেউ জানলো না,কেউ শুনলো না!

তারপর কেটে গেলো পাঁচ ছটা বছর।ইতিমধ্যে আমি মেট্রিক পাশ করে প্রাথমিক স্কুলে শিক্ষকতা করছি।আর্থিক অবস্থার জন্যে পড়া লেখা আর এগিয়ে নিয়ে যেতে পাড়ি নি। তবে প্রইভেট কেনডিডেট হিসাবে বি.এ.পাশ করি।হ্যাঁ,মধ্যপ্রদেশ হলেও বাবার চাকরি ছিলো কেন্দ্রীয় সরকারের অন্তর্গত।আর আমার চাকরিও কেন্দ্রীয় সরকারের স্কুলেই ছিলো।ইতিমধ্যে মঞ্জুর কথা মনে হয় নি বললে ভুল হবে।বয়সের উচ্ছলতায় দু চারটি মেয়ের সঙ্গে ভাব যে জমাতে পাড়ি নি তা নয়।তবু নিভৃতে স্মৃতি চারণের মুহূর্তে মঞ্জুর কথা খুব মনে পড়ত।

মনে আছে এক দিন কি মনে হলো,মঞ্জুর নামে একতা পোস্ট কার্ড লিখে পাঠিয়ে দিলাম।ঠিকানা কোথায় পেলাম?রানাঘাটে থাকা কালীন শুধু এটুকু আমার কানে এসে ছিলো যে মঞ্জু রানাঘাট ইউসুপ স্কুলে পড়ত।সে ঠিকানায় ক্লাশ টেনের ছাত্রী হিসাবে পাঠিয়ে দিলাম সে চিঠি।তার মানে আমিও তখন পড়তাম ক্লাশ টেনে মধ্য প্রদেশের স্কুলে।মনে আশা ছিলো উত্তর আসবে।

পত্র দেবার পর দীর্ঘ তিন চারটি বছর কেটে গেলো।কোনো উত্তর পাই নি।অনেক কথাই তখন ভুলতে বসেছিলাম।

সুযোগ খুঁজ ছিলাম না,সুযোগ এলো--এল.টি.সি. নিয়ে রানাঘাট ঘুরে আসার কথা খুব করে মনে পড়ছিল।রানাঘাটে তখন আমার জ্যাঠা মশাই থাকতেন।

ঘুরতে গেলাম রানাঘাট।সরকারী পয়সায় রানাঘাট হোম টাউনে  গিয়ে পৌঁছালাম। জ্যাঠা মশাইয়ের বাড়ি গিয়ে পর দিন বেরিয়ে গেলাম বন্ধু বান্ধবদের সঙ্গে দেখা করতে। অনেকের সঙ্গেই দেখা হলো।দেবাশীষ,ননটাই,কল্যাণ,ধ্রুব সবার সঙ্গে দীর্ঘ আট বছর পর দেখা হলো।বিশুদা,লেংড়া বিশুর খোঁজ করে তার ঘরে পৌঁছালাম।বিশু বললো, সনাতন,কবে এলিরে?তোরা চলে গেছিস আমি শুনে ছিলাম।

আমি জিজ্ঞেস করলাম--মিনতি দি,প্রিতীকনা,মঞ্জু ওরা কোথায় বলতে পারো?

হাসলো বিশু,বললো,তোর দেখছি সবার কথা মনে আছে!আজ বিকেলে আসিস,তোকে সবার ঘরে নিয়ে যাবো।বিশুর অবাধ গতি ছিলো,ছেলে মেয়ে নির্বিচারে সবার ঘরে সে যেত,সবার সঙ্গে পরিচয় রাখা ওর স্বভাব ছিলো।ও বললো,মিনতি তো আমার বোন রে! আমার কাকার মেয়ে। ওর এখনো বিয়ে হয় নি,বুঝলি,দেখতে তো ভালো নয়,আর খুব কালো তো,তারপর বললো,তোর সঙ্গে সবার দেখা করিয়ে দেবো,কেমন?

আমি বললাম ঠিক আছে.কখন আসবো বল?

--আজ বিকেলে আয়,বিশুদা বললো।

বিশুদার কথা মত বিকেলে গেলাম।বিশু মিনিসিপালটি অফিসে কোনো কাজ করে। দফতরে ওকে বসতে হয় না।ঘুরে ঘুরে ফিল্ডের কাজ করতে হয়।বললাম,তুমি অফিস যাও নি বিশুদা?

--গিয়ে ছিলাম রে,ঘন্টা দুই ঘুরেফিরে এখানে ওখানের কাজ দেখে চলে এলাম।

--যাবে তো এখন?আমি বললাম।

--আমি তৈরী,চল,আগে মিনতিদের বাড়ি ঘুরে আসি।হ্যাঁ,তবে সনাতন একটা কথা বলে দিই।তুই বাইরে থেকে এসেছিস,সাবধান--ও ধার চাইলে টাকা পয়সা কিছু কিন্তু দিস না!

আমি মাথা নাড়লাম,বললাম,না,না--

তিন মিনিটে পৌঁছে গেলাম মিনতিদির বাড়ি।সেই ছোট বেলার এক স্কুলে পড়া মেয়ে, ক্লাসের সবার দিদি ছিলো।

দরজায় কড়া নাড়ল বিশু।বেশ পুরনো বাড়ি,বাড়ির দেওয়াল শ্যাওলা পড়ে কালচে হোয়ে গেছে।কোথাও থেকে চাপলা চাপলা প্লাস্টার ওঠানো !

দরজা খুলল মিনতি দি।দেখে চিনতে পারলাম না।এই সে মিনতি দি!অনেক দিন পর ওর সঙ্গে দেখা।মাঝে এখানে হাই স্কুলে পড়ার সময় দেখা হোয়ে ছিলো।সে প্রায় দশ বছর হোয়ে গেলো।মিনতি বিশুদাকে বললো,আয়,আয় ঘরে আয়,আমার দিকে অচিন চাহনি নিয়ে দেখল,বিশু দা বলে দিলো,সনাতন,আমরা এক সাথে পড়তাম না?মিনতি চিন্তা করল মুহূর্ত সময়,তারপর বললো,ও সেই ক্লাশের রোগা পটকা ছেলেটা!বলেই হেসে আমায় বললো,আয় আয়, ভিতরে আয়।বেশ চেহারা হয়েছে রে তোর,সে রোগা পটকা ছেলের সঙ্গে এখনকার তোকে কি ভাবে মিলাই বল তো?

আমি ঘরে ঢুকলাম।মোড়াতে বিশু বসলো,আমাকে এক হাতল ভাঙা চেয়ারে বসতে দিলো মিনতি।আমি বসে বললাম,কেমন আছ তুমি?

--চলে যাচ্ছে রে!চাকরী নেই,দিন আনা দিন খাওয়ার মত রোজগার।

--সে আবার কি ধরণের কাজ!

--সে বলবখন এক সময়,মিনতি কথা চেপে গেলো,বললো,চা খা এক কাপ,কেমন? রান্না ঘরে চলে গেলো মিনতিদি ।

আমি বিশুকে জিজ্ঞেস করলাম,মঞ্জুর বাড়ি চেনো তুমি?

--সব চিনি রে,তোকে নিয়ে যাবো।তবে জানিস তো ওর মাঝে খুব বদনাম হোয়ে ছিলো।

কৌতুহলী আমি প্রশ্ন করি,কি রকম?

একটা ছেলের সঙ্গে ভাব ভালবাসা ছিলো।বেশী মেলা মেশায় যা হয়,মঞ্জু নাকি প্রেগনেন্ট হোয়ে গিয়ে ছিলো!

--তারপর? আমি অস্থির হোয়ে যাচ্ছিলাম।মনে মনে ভাব ছিলাম,বাবা,এতদূর গড়িয়ে ছিলো ওর প্রেম কাহিনী!

--তারপর আর কি--ছেলাটা তো পালিয়েছে।অনেক দিন পড়ে শুনে ছিলাম ও এবরশন করিয়ে নিয়ে ছিলো।পেটের বাচ্চাটা নাকি অনেক বড় হোয়ে গিয়ে ছিলো,মরা বাচ্চা এক ডাস্টবিনে পাওয়া গিয়ে ছিলো।অনেকে দেখে ছিলো.সবার সন্দেহ মঞ্জুর দিকেই গিয়ে ছিলো।

আমি আশ্চর্য হচ্ছিলাম।আমার বাল্য বেলার প্রেমিকার কথা শুনছিলাম,যাকে আমি মন থেকে চেয়ে ছিলাম,খুব ভালোবেসে ছিলাম।আমার অব্যক্ত প্রেমের ভাষা যার কাছে ফুটে উঠাতে পারিনি--আমি সেই মঞ্জুর কথা শুনে মর্মাহত হলাম।মনে পড়ল তাকে উদেশ্য করে আমার লেখা চিঠির কথা।ও কি সেটা পেয়ে ছিলো!নিশ্চয় না,পেলে হয় তো উত্তর দিত।আর ওই সময় যদি তার প্রেমিকা জুটে গিয়ে ছিল, তো আমায় কে পোছে!

মিনতিদি চা নিয়ে আসলো।আমাদের সামনে চায়ের কাপ রাখল।ও নিজেও এক কাপ তুলে নিলো,আমায় জিজ্ঞেস করল,তুই চাকরি করিস?

--হ্যাঁ,স্কুলের টিচার,বলে হাসলাম আমি।

তাও তো ভালই,আমি দেখ মেট্রিক কোনো মত পাশ করে ছিলাম।ব্যাস,চাকরি নেই কপালে।মায়ের প্রাইভেট স্কুলের চাকরি আর আমার সামান্য রোজগারে সংসার চলছে কোনো মতে।

মাঝখান থেকে বিশুদা বলে উঠলো,ওদের দু জনের সংসার,মা ও মেয়ের।কাকা তো অনেক আগেই মারা গিয়েছিলেন।

চুপ করে শুনলাম আমি।চায়ে চুমুক দিতে লাগলাম।আর মঞ্জুর কথা চিন্তা করতে থাকলাম।কোথাও মনের মধ্যে মোচড় দিচ্ছিল।ঠিক কতটা বুঝতে পার ছিলাম না!

এক সময় উঠব বলে দাঁড়ালাম।বিশুদা আমার আগেই উঠে যাবার জন্যে আগে আগে পা বাড়ালো।হঠাৎ মিনতিদি আমার হাত টেনে ধরে বললো,আর এক দিন আসিস--ভলো ভাবে কথা হলো না রে তোর সঙ্গে!

বিশুদা গেটের বাইরে থেকে ডেকে উঠলো আমায়,অমনি মিনতিদি আমার হাতটা ধরে রেখেই বলে উঠলো,আমার জন্যে একটা ছেলে দেখিস রে!তোদের ওই বিদেশে না হয় চলে যাবো!কথা কটা বলে করুণ ভাবে তাকিয়ে থাকলো আমার দিকে।

কি বলব আমি ক্ষণ কাল চুপ থেকে বললাম,আচ্ছা,দেখব।

বিশুদা দ্বিতীয়বার আমায় দেকে উঠলো।

আমি,আসছি,বলে দ্বিতীয়বার পা বাড়ালাম।মিনতিদি বলে উঠলো,কালকে একবার আসিস না রে!তারপর কেমন যেন চোখ নাচিয়ে বলে উঠলো,কথা আছে তোর সঙ্গে, আসিস।

--ঠিক আছে,বলে বিশু দার সঙ্গে রাস্তায় নাবলাম।

--এবার মঞ্জুদের বাড়ি যাবো।বেশী দূর না এক কিলো মিটারের পথ,মিনিট পনের লাগবে যেতে,বললো বিশু।

কোনো দিন মঞ্জুদের বাড়ি যাই নি।বড় বাজারের পাশেই কোথাও থাকে শুনেছি।কারো কাছে শুনে ছিলাম মঞ্জুদের উপাধী নাকি কুন্ডু।ওর বাবা কোনো স্কুলের টিচার ছিলেন। এখানেও কড়া নাড়ল বিশুদা।একটা মেয়ে,কিন্তু বেশ বয়স্কা মনে হলো,দরজা খুলে দিলো।বিশু আমার দিকে তাকিয়ে পরিচয় দেবার মত করে বলে উঠলো,মঞ্জুর দিদি,--আর এ হচ্ছে,সনাতন,আমরা সবাই মঞ্জুর সঙ্গে এক স্কুলে এক ক্লাশে পড়তাম।

--এসো,এসো,ভেতরে এসো।ডাকলেন মঞ্জুর দিদি।আমরা ভিতরে গেলাম।ঘরে মঞ্জু ছিলো।বিশুদা মঞ্জুকে বলে উঠলো দেখত চিনতে পারছিস কি না--কাকে নিয়ে এসেছি বল?

মঞ্জু তাকালো আমার দিকে,একটু সময় নিরীক্ষণ করে আমার নাম বললো।

আমি আশ্চর্য হলাম।আমায় চিনে গেছে ও!কিন্তু মন সমান্য চঞ্চল হয়েই দমে গেলো। ওর সম্বন্ধে বিশুর মুখে শোনা কথাগুলি মনে পড়ে গেলো।

মঞ্জু আমায় ,তুই বলে সম্বোধন করল,বললো,বস,কেমন আছিস?

--ভালো,সংক্ষিপ্ত জবাব দিলাম।

--তোর সঙ্গে দেখা করবে বলে বার বার আমায় বলছিল।আমি বললাম,চল আমি নিয়ে যাচ্ছি,বিশু বলে উঠলো।

মঞ্জুর মা ঘরে ঢুকলেন।মঞ্জু আমার পরিচয় করিয়ে দিলো,মাসিমার পা ছুঁলাম আমি। মাসিমা জিজ্ঞেস করলেন,তুমি কি কর বাবা?

--স্কুলের টিচার,আমি বললাম।

--ভালো,খুব ভালো বাবা!বলে আমার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে ঘরের ভিতর চলে গেলেন।মঞ্জু আমার পাশে বসলো।তুই কোথায় উঠেছিস?

--জ্যাঠামশাইয়ের বাড়ি,বেলতলা।

--কি নাম রে?

--জ্যাঠামশাইয়ের নাম বললাম।

--আমি চিনি।

মঞ্জুর দিদি চা বিস্কুট নিয়ে এলেন।

--কত দিন আছিস?মঞ্জুর প্রশ্ন ছিলো।

--আছি তিন চার দিন।

--আর এক দিন আসিস।

মাথা নাড়লাম আমি।

মন ক্রমশঃ যেন ভেঙে যাচ্ছিল।দেখছিলাম চোরা বালির ধ্বস ক্রমশঃ অতলে নেমে যাচ্ছিল।সমস্ত ইচ্ছা,আশা আকাঙ্খার কি এখানেই তবে সমাপ্তি!ভাবতে পার ছিলাম না।এতদিনের জমিয়ে রাখা ইচ্ছাকে লাগাম দিয়ে রাখলাম।আমি চুপ করে ছিলাম।

--কিরে! আসবি তো?মঞ্জু বলে।

ভাবনায় ছেদ পড়ে,বললাম,হ্যাঁ,আসবো।

আসতেই হবে আমায়।মঞ্জুর কাছে শুনতে হবে,যা শুনেছি তা কি সত্যি!সত্যি তার প্রেমিক ছিলো,সত্যি ও তার সন্তান ধারণ করে ছিল!সত্যি ডাস্টবিনে পড়ে থাকা সন্তান ভ্রুণ কি ওরই ছিলো?মাথা ভার ভার লাগছিল। ইতিমধ্যে বিশু যাবার জন্যে উঠে দাঁড়ালো।আমি মঞ্জুকে বললাম,চলি।

মঞ্জুর দিদি আর মা ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন।মাসিমা বললেন,আবার এসো,বাবা!

মাথা নাড়লাম আমি।

মঞ্জু বললো,আসিস কিন্তু!

ওদের ঘর থেকে বেরিয়ে নিজেদের ঘরের উদেশ্যে রওনা হলাম।

রাতে কেবল মঞ্জুর কথাই মনে পড়ছিল।বিশুদার বলা মঞ্জুর ঘটনাগুলি কি ঠিক হবে! আমি যেন কোনো মতই মেনে নিতে পারছিলাম না।সেই ছোট বেলার মঞ্জু--যাকে আমি মনের মোধ্যে সুন্দর ভাবে এঁকে রেখে ছিলাম--একটা ধীর স্থির সুন্দর মেয়ে--যে মেয়েটা আমায় পছন্দ করত।অবশ্য জানি না এটা আমার ধারণার ব্যাপার কি না! মঞ্জুকে দেখলে আমার মনে হতো সে আমায় পছন্দ করত।ওর তাকানো--হাবভাবের স্থিরতার মোধ্যে সে লক্ষণ যেন ফুটে উঠতো!এক সঙ্গে পড়ার সময় ছেড়ে দিলেও পরবর্তী সময়েও কখনো যদি ওর সঙ্গে দেখা হয়েছে ওর গাল আমায় দেখে লাল হোয়ে উঠেছে--আমার অল্প বয়সের মুখেও সে লালের ছায়া পড়ত!

রাত জেগে মঞ্জুকে দীর্ঘ চিঠি লিখলাম।

পরের দিন বেলা দশটার দিকে মঞ্জুদের বাড়ি হাজির হলাম।ভেবে ছিলাম কে জানে ওর সঙ্গে দেখা হবে কি না!গত দিনের মত মঞ্জুর দিদি দরজা খুলে দিলেন।দিদি আমার নাম ধরে বললেন,এসো, ভেতরে এসো।

আমি ঘরে গিয়ে বসলাম।দিদি কোথাও যেন বেড় হচ্ছিলেন, বললেন,বসো,আমি একটু বের হচ্ছি,মঞ্জু আসছে।দিদি বেরিয়ে গেলেন।

এক মিনিট পরে মঞ্জু এলো ঘরে।হাসলো,আমার পাশে এসে বসলো।

আমি জিজ্ঞেস করলাম,তুই কি একা ঘরে?

ও বললো,না,মা আছে।

একটু সময় চুপ থেকে মঞ্জু বললো,কি রে চুপ করে কেন? কিছু বল!

--আমি শুনতে এসেছি রে!--আমি ধীরে কথাটা বললাম।নিজের গলাটাই কেমন যেন আমার কাছে অচেনা বলে মনে হলো!এত বিষন্ন গলা আমার!

--কি আর বলব,তুই তো চলে গেলি বহু দূর!মঞ্জুর গলাও বিষন্নতায় ভরা?

--কি করবো?কেউ তো কোনো দিন আমার খোঁজ করনি!

আমার কথা শুনে মঞ্জু আশ্চর্য হোয়ে বলে উঠলো,তুই এই কথা বলছিস কেন?

আমি ওকে কাল রাত জেগে লেখা পকেটে রাখা চিঠিটায় আলতো করে হাত ছোঁয়ালাম।ওকে চিঠিটা কখন,কি ভাবে দেবো সেটা ভাবছিলাম।ঘরে মাসিমা,হয় তো আড়ি পেতে মঞ্জু আর আমার কথা শুনছেন!

--তোর সঙ্গে কথা ছিলো আমার,আস্তে করে মঞ্জুকে বললাম।

--কি কথা?আমার সঙ্গে তোর তেমন কথা আছে?

এমনি সময় মাসিমা ঘরে ঢুকলেন।বললেন,কেমন আছ বাবা!

--ভালো,সংক্ষেপে জবাব দিলাম।আবার উঠে গিয়ে প্রণাম করলাম মাসিমাকে।

মাসিমা বলে উঠলেন,থাক,থাক,রোজ রোজ প্রণাম করতে নেই, বলে তিনি আমাদের সামনে বসলেন।

মঞ্জু বললো,এক মিনিট,আমি চা বানিয়ে নিয়ে আসছি।মাসিমা বলে উঠলেন হ্যাঁ,চা করে নিয়ে আয়।মঞ্জু রান্না ঘরে চলে গেলো।মাসিমা আমার চাকরি,কোথায় থাকি, এখানে কে আছেন, এসব প্রশ্ন করে জেনে নিলেন।

মঞ্জু তত সময়ে চা,মিষ্টি নিয়ে এসে গেলো।মাসিমা উঠে চলে গেলেন।যাবার সময় বলে গেলেন,তোমরা কথা বলো,আমার একটু কাজ আছে।মঞ্জুকে বললাম তুই তৈরী হোয়ে নে--আমার জ্যাঠিমার বাড়ি ঘুরে আসবি।

কেন রে?আশ্চর্য হলো মঞ্জু।যেন কিছুই ও বুঝতে পারছে না।

বললাম,সময় থাকলে চল,জ্যাঠিমার সঙ্গে দেখা হোয়ে যাবে।

মঞ্জু আবার আশ্চর্য হোয়ে বলে উঠলো,তোর অনেক কথা জমে আছে,না?

আঁচ করতে পারলাম না,মঞ্জু এমনি হেয়ালির মত কথা বলছে কেন!

এমন তো নয় ,ও কোনো দিন আমার কথা তেমন ভাবে চিন্তাই করে নি!কারণ ওর সঙ্গে আমার কোনো দিন দু চারটে কথা ছাড়া কথাই হয় নি।কেবল ছেলে মেয়েরা যখন এক সাথে খেলা করতাম তখন খেলা নিয়ে দু চার কথাই হোয়ে থাকবে!

দেখলাম মঞ্জু তৈরী হোয়ে গেলো আমার সঙ্গে যাবার জন্যে। মাসীমাকে নিশ্চয় বলে থাকবে!মাসিমা বোধ হয় সে কারণে আমায় বললেন,যাও বাবা,তোমরা ঘুরে আসো।

মঞ্জু আর আমি বের হলাম।না,কোনো পার্ক বা নির্জন জাগাতে নয়,জ্যাঠিমার বাড়ি। পথে যেতে বিশেষ কথা হলো না।কারণ,আমি তাকে তাকে ছিলাম আমার রাত জেগে লেখা চিঠি মঞ্জুর হাতে দেবো বলে।অর্ধেক পথ এসে বললাম,তোকে একটা চিঠি লিখে ছিলাম রে!

মঞ্জু যেন আকাশ থেকে পড়ল,আমায় লিখেছিস!কি বলত?কোনো বিশেষ—আমি তত সময়ে পকেটে হাত পুরে দিয়েছ। মোটা মুটি পাঁচ সাত পৃষ্ঠায় লেখা খাম পকেট থেকে টেনে বের করলাম।আশপাশ দেখে নিলাম,কেউ আবার সরাসরি আমাদের দেখছে না তো?না,তেমন মনে হলো না।

-- নে,মঞ্জুর হাতে চিঠি ধরিয়ে দিলাম।

ও খামটা দেখল,বললো,অনেক লিখেছিস রে!এত দিন কোথায় হাওয়া খেতে গিয়েছিলি তুই!তারপর চিঠি খুলতে গিয়েও খুলল না।বললো,এখন থাক,সময় নিয়ে পড়তে হবে।বলে,বুকের কাপড় সামান্য সরিয়ে ব্লাউজের ভিতর ঢুকিয়ে নিলো।সামান্য হেসে আবার বললো,তোর চিঠি বুকে ধরে রাখলাম!

জ্যাঠিমা চিনতো মঞ্জুকে।ওর প্রেম,পীরিত,ভালবাসার ঘটনার বিন্দু বিসর্গ তার জানা আছে কিনা তা আমার জানা নেই।

আমাদের দেখে তিনি আশ্চর্য হোয়ে গেলেন।আচমকা আমার এই পরিবর্তন দেখে হয়তো জ্যাঠিমা কিছু সময় থমকে ছিলেন।তার পরে নিজেকে সহজ করে বললেন, এসো,তোমরা ঘরে এসো।

মঞ্জুকে বললেম,ঘরে আয় !

মঞ্জু ঘরে ঢুকে পালঙ্কের ওপর বসলো।জ্যাঠিমার সঙ্গে ওর কুশল বিনিময় হলো।

এক সময় জ্যাঠিমা বললেন,তুমি তো ভালো গান গাও মঞ্জু,একটা গান শোনাও না!জ্যাঠিমা আমাকে খাটের নীচে থেকে হারমোনিয়ম বের করে দিতে বললেন।

হারমোনিয়ম বের করে মঞ্জুর সামনে রাখলাম।বললাম,তুই গান জানিস জানতাম না তো?

মঞ্জু হেসে বললো,তুই আমায় জানলি কবে?

মঞ্জুর হেয়ালি কথাগুলি ঠিক বুঝতে পারলাম না--কোথায় গিয়ে মোড় খাচ্ছে!

সখা হাত দুটি রাখো মোড় হাতে...যতদুর মন হলো সেদিন মঞ্জু এ ধরণের কোনো গান গেয়ে ছিলো।গান ভালো লাগে,কিন্তু কেন জানো না,গানের কথা আমি কিছুতেই মনে রাখতে পারি না!অথবা এটাও হতে পারে আমি মনে রাখার চেষ্টাই করি না।

আমার মনে গান নিয়ে প্রশ্ন জেগেছিল--সখা কি আমি?আমার হাতে কি ওর হাত রাখতে ওর ইচ্ছে আছে !আবার ভাবলাম গান তো গানই হয়,যে সিচুয়েশনে যখন যার যেটা ভালো লাগে!

জ্যাঠিমা প্লেটে করে মিষ্টি নিয়ে এলেন।আর জিজ্ঞেস করলেন,মঞ্জু চা খবে?একটু পড়ে চা বানাই?

--না,জ্যাঠিমা,চা এখন খাবো না--ঘরে যেতে হবে।

হ্যাঁ,সময়টা ঘরে ফেরার মতই।বেলা সারে বারটা বেজে গেছে।

আমি মঞ্জুকে ওর ঘরের দরজা পর্যন্ত এগিয়ে দিলাম,বললাম, আমার চিঠির উত্তর কাল পাবো তো?

ও একটু হেসে কিছু ভেবে নিয়ে বললো,হ্যাঁ,দেবার চেষ্টা করবো। তোর চিঠি পড়ে দেখি আগে,বলে হাসলো।সেই রকম মুচকি হাসি।সে হাসি অজানতে মনের মাঝে অনেক কিছু ছাপ ছেড়ে যায়।আমার চিঠি জানি না কেন অনেক অভিমানে ভরা লেখা ছিল।বিশুর থেকে শোনা সমস্ত কথা আমি খুলে লিখে ছিলাম। এমন কি ডাস্টবিনে পাওয়া ওর শিশু ভ্রুণের কথাও লেখা ছিল তাতে !

চিঠি দেবার পর আমার খুব খারাপ মনে হতে লাগলো।মনে হতে লাগলো,এত কিছু লেখা আমার উচিত হয় নি,আমার কতটা অধিকার ছিলো এমনি ভাবে লেখার!আমার আর এক মন বললো,না,সত্যের যাচাই হোয়ে যাওয়া জরুরী।আমার হাতে তো মাত্র একটা দিন আছে।তারপরই আমায় পাড়ি দিতে হবে সুদূর মধ্যপ্রদেশে,নিজের জাগায়।

পর দিন বিকেলে মঞ্জুর বাড়ি গেলাম।ওর বাবার সঙ্গে পরিচয় হলো।দিদি এসে খানিক সময় বসে গল্প করে গেলেন।দিদির বয়স হয়েছে--বিয়ের বয়স ছাড়িয়ে গিয়েছে। জেনেছিলাম,দিদি নাকি আর বিয়ে করবেন না।

মঞ্জু এলো বেশ কিছু সময় পরে।লক্ষ্য করলাম,ওর মুখটা কেমন ম্লান দেখাচ্ছে।আমার পাশে বসে ও হাসলো না,মুখে ওর রাগের ভাব লক্ষ্য করলাম না।তবে কি হলো!মনে মনে খুব রেগে গেলো কি খুব?আরও কিছু সময় বসলাম ওর পাশে।বললাম,কাল আমি ফিরব রে!

ও বললো,কালই ফিরছিস !তুই আমায় আগে জানাস নি কেন !

বুঝে নিয়ে ছিলাম ও কি বলতে চাইছে।

--তাই তো! কবে চলে গিয়েছিলি...এক সময় ভুলে গিয়ে ছিলাম তোকে--! মঞ্জু ধীর আক্ষেপে কথাগুলি বলল।ওর ঘরের লোকেরা মাঝে মাঝে চলে আসছিল।তাই ওর সঙ্গে নিভৃতে কথা বলা সম্ভব হচ্ছিল না।

এক সময় মঞ্জু আস্তে করে বললো,তোর ফিরে আসতে অনেক দেরী হোয়ে গিয়েছে রে!আমার চিঠি পড়লে তুই জানতে পারবি।

মঞ্জু আমার সঙ্গে আসার কথা বললো না,আমিও ওকে সাথে আসতে বললাম না। ফেরার সময় ও আমায় গেট পর্যন্ত পৌঁছে দিলো।আর খুব সন্তর্পনে আমার হাতে ওর লেখা চিঠি তুলে দিলো।সে চিঠি পকেটে ভরে নিলাম।বেশ রাতে বিছানায় শুয়ে চিঠি পড়তে শুরু করলাম--দীর্ঘ পাঁচ ছ পৃষ্ঠার চিঠি!

ওর চিঠিতে জানলাম এক সময় আমার প্রতি ওর দুর্বলতা ছিলো। কোন এক সময় আমার অনিশ্চয়তা,অনুপস্থিতি আর বয়সকালের ছোঁয়ায় ও প্রেমে পড়ে গিয়েছিল কোনো বড়লোক ছেলের সঙ্গে। এক বছর ভালই চলছিল--প্রেম প্রেমের গভীরতায় ছুঁয়ে গেলো শরীর!আন্তঃসত্ত্বা মঞ্জুকে ফেলে সে বড় লোকের ব্যবসায়ী ছেলে এ জাগা ছেড়ে নুরুদ্দেশ হোয়ে গেলো।আজ তিন চার বছর হোয়ে গেলো তার দেখা নেই।মঞ্জু আমার সমস্ত কথা ওর চিঠিতে অকপটে স্বীকার করে নিয়েছিল।

ওর চিঠির শেষ পৃষ্টায় লেখা ছিলো,তোর কথা ডুবে গিয়েছিল অতল জলে।--তোর কথা আমি কি করে ভাবি বল তুই?তুই তো দীর্ঘ দিন বাইরে।সময় তোকে ধীরে ধীরে আমার স্মৃতির বাইরে বের করে দিয়ে ছিলো।দু বছর আগে থেকে আবার আমি প্রেম করতে লেগেছি।সে ছেলে আমার সব কিছু জেনেও আমায় ভলোবেসেছে! আমার শরীর সে চায় না।ও আমায় বিয়ে করতে চায়।

না,তোর কোনো চিঠি আমার হাতে আসে নি,বল তুই আবার কেন ফিরে এলি!ছিলাম তো ভালই।পুরনো স্মৃতির অনেকটাই তো ভুলে গিয়ে ছিলাম!আবার তুই কেন মাঝ পথে আমার মনে ঢেউ তুলতে চাস বল?তুই কাল চলে যাচ্ছিস--ভালো,চলে যা,আমি আর প্রেম ভালোবাসা চাই না!আমি চাই ঘর--একটা ঘর!

তুই আমায় ভুল বুঝিস না।আমি মন খুলে তোর ছবি দেখতে চাই না রে!আমি জানি আমার সামান্য ভাবনা যদি আর একটু এগোয় আমি পাবো না--আমার শান্তির জীবন খুঁজে !---অনেক রাত জেগে লিখলাম তোকে।

এই ঘভীর রাতে আমি কি দেখতে পারছি জানিস?আমার সামনে অথৈ সমুদ্র!দুটো ঢেউ খাওয়া নৌকো চলেছে,আর ভাবতে পারছি না আমি!দেখছি,স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি, আমার দু পা দু নৌকায় রয়ে গেছে।মাঝ খানে অথৈ সমুদ্র। ইতি:কোনো এক অচিন পাখী।


Enhanced by Zemanta