কাঞ্চনপুরের দলিল রহস্য - অধ্যাপক (ড:) জি .সি. ভট্টাচার্য, বারাণসী, উত্তর প্রদেশ | Short Story - WBRi Bengali Online Magazine

DR G C Bhattacharya

Dr. G C Bhattacharya is a teacher at BHU, Varanasi, Uttar Pradesh, India and has been writing for over 15 years. His writings have been published in Ichchhamoti, Joydhak, Diyala, A-Padartha and other Bengali magazines. Besides Bengali, he writes in Hindi and English (UK short fiction) too. His published books includes Badal Kotha in Hindi. Dr. Bhattacharya can be reached at dbhattacharya9 [at] gmail [dot] com.

This is the second story in the Dr. Bhattacharya's detective mystery series featuring young sleuth Badal who you was introduced to you in বাদলের প্রথম অন্বেষণ.

This story is reproduced in Unicode Bengali font for increased browser compatibility.

Submit your creative writing, story, poem, travelog etc. for publication on WBRi by e-mail to submissions@washingtonbanglaradio.com.



কাঞ্চনপুরের দলিল রহস্য

অধ্যাপক (ড:) জি .সি. ভট্টাচার্য, বারাণসী, উত্তর প্রদেশ

কাঞ্চন পুরের নাম হয়তো অনেকেই শোনেনি তবে সেই অখ্যাত অজগ্রামে সেবারে বেশ এক মজাদার কান্ড হয়েছিল একটা দলিল নিয়ে। আজ সেই কথাই বলছি ....

জমিদার বিলাস সিংহের প্রাসাদের লোহার সিন্দুক থেকে এই দলিলখানা এক্কেবারে উধাও হয়ে যায়। নির্ঘাৎ করে চুরি তবে খাসা চুরি, কোনো প্রমাণ নেই ..

বোঝাই যায় যে সময়ের কথা বলছি সেই সময়ে দেশ স্বাধীন ও হয়নি আর জমিদাররাও নির্মূল হয়ে যায়নি, সুতরাং তাদের রমরমা ও বেশ ছিলো ইংরেজ সরকার বাহাদুরকে প্রসন্ন করে রেখে। উপযুক্ত সম্মান উপাধি ও পেতেন সেবার বদলে।

বিলাস সিংহের জমিদারি ছোট হলে ও তিনি বড় ইংরেজ ভক্ত ছিলেন আর তাই বিলিতি ডিটেকটিভ আনিয়ে এক মাস ধরে তন্ন তন্ন করে অনুসন্ধান করালেন কিন্তু দলিল পাওয়া গেলো না আর তা না পেলে পাশের এলাকার জমিদার রায় সাহেব বিক্রম বাহাদুর যে তার সুন্দরপুর নামের একটা মৌজা যে কোনো সময়ে এসে দখল করে নিতে পারেন, তা জানা ছিলো তাঁর।

কেননা দুই জমিদারের পূর্ব পুরুষদের মধ্যে মৌজা বিনিময়ের একটা চুক্তি হয়েছিল নিত্য নৈমিত্তিক লাঠা লাঠি রুখতে, যে রাজপুর মৌজা রায় বাহাদুর সাহেবের পিতার জমিদারিতে থাকবে আর সুন্দরপুর পাবেন বিলাস সিংহের পিতা। এই দলিলে ইংরেজ সরকারের প্রতিনিধিদেরও হস্তাক্ষর ছিলো আর  আগে এই দুটি মৌজাই ছিলো বিলাস সিংহের পিতার জামিদারিতেই।

তাই ব্যাপারটা গোলমেলে। দলিলের দু’টি নকল করিয়ে দুই জমিদারের কাছে রাখা হয় তবে সেই দলিল না পাওয়া গেলে  এখন কি করা যায়?

জমিদারবাবু তো শেষে বড় বড় তান্ত্রিক এনে তন্ত্র মন্ত্র আর জ্যোতিষী ডেকে এনে গোনা গাঁথানো অব্দি শুরু করলেন কিন্তু কিছুই হ’লো না দেখে রেগে মেগে একদিন ধুত্তেরি বলে একজন মোসাহেবের পরামর্শে খবরের কাগজে দিলেন এক বিজ্ঞাপন ঠুকে এই মর্মে যে যদি কোনো বুদ্ধিমান ব্যক্তি এসে কাঞ্চনপুরের দলিল খুঁজে বার করে দিতে পারেন তাহলে তাকে নগদ পঞ্চাশ হাজার  টাকা পুরস্কার দেওয়া হবে। তখনকার দিনে সেই টাকার মূল্য এখন তো পঞ্চাশ কোটির ও বেশি হবে বোধহয়।

তা বিজ্ঞাপন তো বেরুলো কিন্তু কোনো সাড়া শব্দ নেই কারো, কোনো উত্তর আর আসে না।

এক মাস পরে একখানা খামের চিঠি এলো জমিদারবাবুর কাছারিতে যে অয়নাংশ নামের কোনো ভদ্রলোক একজন চেষ্টা করে দেখতে চাইছেন।

তখনকার দিনে সাধারণ লোকে সবাই চিঠি পত্র লিখত এক আনার পোস্ট কার্ডে আর একটু বড়লোক হলে অন্তর্দেশী বা ইনল্যান্ড লেটার ব্যবহার করতো কেউ কেউ - সুতরাং এই ভদ্রলোক যে বেশ ধনী তা বোঝা গেলো।

ধনীদের তিনি বেশ সম্মান করতেন তাই জমিদার স্বীকৃতি  জানালেন। গরিবদের তিনি মানুষ হিসেবেও বেশি মূল্য বা মর্যাদা দিতে নারাজ ছিলেন তা বলাই বাহুল্য ...

উত্তর এলো যে তিনি রেল গাড়িতে যাবেন না যদি অন্য যানবাহনের কোনো ব্যবস্থা করা হয় তাহলে যেতে পারেন।

তখনকার দিনে জন সাধারণ চলতো পায়ে হেঁটে আর জমিদারেরা ঘোড়ায় বা পালকিতে করে।

মটোর গাড়ীর চল শুরু হলেও সব জামিদাদের তা ছিলো না।  রেল গাড়ী কিছুদিন হ’লো শুরু হয়েছে চলা তবে দূর পথের জন্যে, তাও ই.আই.আর., বি.এন.আর ইত্যাদি রেল কোম্পানির দ্বারা চালানো হত ।

এখন অয়নাংশ থাকেন বীরভূমের এক গ্রামে।

দূর তো অনেকটা তাই জমিদার বাবু রাগ করে এক খানা মটোর গাড়ীই  কিনে আনলেন কোলকাতা থেকে আর সেটা কাছারিতে নথিভুক্ত হলে একদিন পাঠিয়ে দিলেন অয়নাংশের ঠিকানায়।

তাইতে চড়ে এলেন দু’জন একজন ভদ্রলোক নাম দ্রাঘিমাংশ আর তার চৌদ্দ বছরের ছেলে যার নাম নাকি অয়নাংশ।

ব্যাপার দেখে জমিদারবাবুর চোখ তো গোল গোল হয়ে সাঁই করে চড়কগাছে উঠে গেলো ।

এ যে উল্টো রামায়ন। 

ছোট একটা ছেলে, সে কিনা হলো গিয়ে ডিটেকটিভ আর তার বাবা কিনা তার আসিষ্ট্যান্ট আর এদের জন্যেই তিনি গাড়ী কিনে নিয়ে আসতে পাঠিয়েছিলেন।

ও রে বাবা, তিনি তো কপাল চাপড়াতে লাগলেন চট পট শব্দে বেশ জোরে জোরে।

কিন্তু করবেন কি আর? একখানা গোটা বাড়ি দিলেন তাদের থাকতে, তা  সে অবশ্য মাটির বাড়ি আর টালির  চাল।

তা’হলে কি হয়? গ্রামে তাই তখন ছিলো সম্পন্ন লোকেদের আস্তানা কেননা গরিবেরা  থাকত খড়ের চালের ঘরে, পাকা বাড়ি তো ছিলো মাত্র জমিদারবাবুর।

কুয়ো ও একটা ছিলো বাড়িতে... ব্যাস, আর কি চাই থাকবার জন্যে ?

দিনে তো তারা দু’জনে অনুসন্ধানের জন্যে থাকবেন জমিদার বাড়িতে আর খাবেন ও সেইখানেই, শুধু রাতে থাকবার জন্যেই  বাড়ি দেওয়া।

তা বাপু অয়নাংশ ছোট ছেলে হলে কি হয়, দেখা গেলো সে বেশ চট পটে আর বুদ্ধিমান এবং  নিজে হাতে করে সব আবার থেকে খোঁজা খুজি  ও শুরু করে দিলো।

জমিদারবাবু একবার জিজ্ঞাসা করেছিলেন যে আপনাদের নাম এইরকম কেন?’

তাই শুনে দ্রাঘিমাংশ বাবু বললেন –‘আমি ভূগোলের টিচার ছিলাম যে, এখন রিটায়ার করেছি আর আমার বাবা তো ভূগোলে পি.এইচ.ডি. ও করে শেষে ভবঘুরেই হয়ে যান। বলতেন- ‘ঘরে বসে কি ভূগোল শেখা যায় নাকি আবার? ঘর ছাড়াদের বিষয় হলো এটা’। তবেই বুঝুন আপনি এখন, ভূগোল কি একটা সোজা বিষয় হ’লো নাকি?  বেশী পড়লে হয় মাথা গোল হয়ে যায় আর তা না হলে পা গোল তো নির্ঘাৎ করে হবেই হবে’।

তাই না  শুনে আবার একবার বেশ করে জমিদার বাবু নিজের কপালটাকে চাপড়ে নিলেন কেননা ভালোরকমের পাগলের পাল্লায় যে তিনি পড়ে গেছেন তা বুঝে নিলেন আর যে মোসাহেবের পরামর্শে তিনি কাগজে বিজ্ঞাপন দিয়েছিলেন, তাকে তখনি রেগে মেগে এক্কেবারে দূর দূর করে তাড়িয়ে দিয়ে তবে জল খেলেন সেদিন।

তবে অয়নাংশকে তাড়ালেন না। ছেলেটা কিন্তু বেশ দেখতে। মুখখানা বেশ সুন্দর, ছেলেটা ও বেশ চকচকে ফর্সা আর ব্যবহারও মিষ্টি সুতরাং জমিদার গিন্নির তার ওপরে বেশ মায়া পড়ে গিয়েছিলো দু’দিনেই। অবশ্য তার কাজের ফল ও পেলেন দেখতে সাত দিন পরেই।

সে একটা পুরনো ডায়েরি খুঁজে বার করলো জমিদারবাবুর লোহার সিন্দুক ঘেঁটে। ডায়েরিখানা জমিদারবাবুর বাবার আমলের। তা’তে বাংলাতে অনেক কথা সংকেতে লেখা ছিলো যা ইংরেজ গোয়েন্দারা হয়তো ঠিক পড়ে উঠতে পারেনি বলে মনে হলো। যেমন লেখা ছিলো- ‘নাচ ঘর থাকলেই সাজঘর ও থাকে’ ...’দুইয়ের জায়গায় তিন হলে কি হয়?’, ‘চোর পালালে যদি বুদ্ধি না বাড়ে তাহলে বাটপাড়ি করো, বাপ বাপ করে বুদ্ধি বাড়বে’, ‘আয়নাতে কি শুধু লোকে মুখই দেখে?’ ইত্যাদি প্রভৃতি।

ও রে বাবা রে, সে সব পড়ে জমিদার বিলাস সিংহ তো তৃতীয় বার কপাল চাপড়ান আর কি। এ যে পাগলের প্রলাপ আর তার মানে তার নিজের বাবা ও ছিলেন এক পাগল তার মানে ভূগোলের ছাত্র নাকি রে বাবা? সেরেছে, এসব কি গন্ড গোলের কথা লিখে রেখে গেছেন তিনি?

তা বললে কি হবে পরদিন কিন্তু দ্রাঘিমাংশ বাবু জানতে চাইলেন যে আগের দিনের জমিদারদের বাড়িতে তো নাচঘর থাকতো বটে, আপনাদের ছিলো না? আমার ছেলে জানতে চাইছে যে।

তিনি বললেন –‘ না, ছিলো না, যত্ত গেরো সব ...’

‘আর সাজঘর?’

‘তাও না তবে সাজাঘর ছিলো আর আছে ও তবে বন্ধ পড়ে আছে, আমরা কেউ সে ঘর খুলি না বা যাই ও না’।

‘সাজাঘর? তার মানে?’

‘মানে যে ঘরে এনে দুষ্টু প্রজাদের জব্দ করা হত শাস্তি দিয়ে, আর কি? আমার বাবা তাদের প্রাণে তো মারতেন না, বলতেন আহা কেষ্টর জীব সব আমি মারবার কে? তবে আমি জমিদার তো, একটু কিছু ব্যবস্থা না নিলে কি শাসন চলে? তাই আমার অতিথি হয়ে থাক ব্যাটারা ওই ঘরে বন্দী হয়ে, দু’বেলা দু’মুঠো ভাত জল দেওয়া যাবে না হয়। ক’দিন আর  বাঁচবেই বা? কি আর হবে ওদের বুকে বাঁশ ডলে বা কম্বল ধোলাই দিয়ে?’

‘অর্থাত যাবজ্জীবন কারাদন্ড?’

‘তা মনে করলে তাই, তবে বিনা পরিশ্রমে তারা ভালই থাকতো, খেত কিন্তু মরতো প্রায় পাগল হয়েই একা থাকতে থাকতে। ওই ঘরে নাকি সেই পাগলদের প্রেতাত্মারা আজ ও ঘুরে বেড়ায় রাতে, তাই ভয়ে আমরা ওই ঘরটা কেউ খুলি ও না আর থাকি ও না’।

ব্যাস, আর যায় কোথায়? শুনেই পরদিন অয়নাংশ বলে পাঠালো যে তাহলে ডায়েরিতে লেখাটা  হয়তো সাজাঘরই ছিলো, অনেক কালের লেখা তো ঠিক পড়ে ওঠা কঠিন তাই সে নাকি ওই ঘরে রাতে থাকতে চায়, অনুমতি দিতে হবে তাকে।

জমিদারবাবুর তো মাথায় হাত-‘ও রে বাবা, এ’ ছেলেটা বলে কি? এ’ ঠিক মাথা গোল, পা গোল আর রইলো না তো। শেষে কি তিনি খুনের দায়ে পড়বেন  নাকি রে বাবা? জমিদার গিন্নি তো আরো নারাজ কিন্তু অয়নাংশ কিছু শুনলে তো। নইলে সে কাজ ছেড়ে দিয়ে চলেই যাবে বলে বসলো। তখন আর কি করা? অনুমতি দিতেই হলো তবে সেই ঘর খুলে পরিষ্কার পরিছন্ন তো করাতে হবে। সেই বা করে কে? ভয়ে কেউ দিনের বেলাতেও ঢুকতে রাজি নয় সেই ঘরে।

শুনে দ্রাঘিমাংশ বাবু বললেন –‘কুছ পরোয়া নেহী হ্যায়, ও সব ঠিক আছে। ভূগোলের টিচারের কি ভূতের ভয়  করলে চলে নাকি? আমি নিজেই গিয়ে ঝুলঝাড়া আর ঝাঁটা দিয়ে ঘরখানাকে দু’মিনিটে সাফ করে ফেলছি, বলং বলং বাহু বলং’।

তা তাই করলেন তিনি সে দিনে। বিকেলের মধ্যে ঘরখানা  বেশ বাসের উপযোগী হয়ে উঠলো তাঁর ঝ্যাঁটাঘাতে।

সেই ঘরে ছিলো একটা খাট, একটা শ্বেত পাথরের টেবল, একটা আরাম কেদারা একটা আলনা একটা দেরাজের মতন থাক করা দেয়াল আলমারি, দু’টো বড় জানালা  আর একখানা বিশাল বড় বেল্জিয়ম কাঁচের আয়না খাটের ঠিক সামনের দেওয়ালে বসানো। ব্যাস, তাই দেখে অয়নাংশ তো বেজায় খুশি।

বলে- ‘এতেই বেশ চলে যাবে আমার’।

কেননা সেই ঘরের সংলগ্ন একটা বাথরুম ও ছিলো। থাকতেই হবে যে,  কয়েদিদের ব্যবহারের জন্যে বিশেষ ভাবে তৈরী করানো হয়েছিল সেই কালেতে। সেটাকেও সে  দিব্বি ব্যবহার যোগ্য করে নিলো তার বাবার সাহায্যে।

অয়নাংশ বললে –‘বাব্বা , বাঁচা গেলো। ওই বাড়িতে থাকেটা কে এমন সুন্দর ঘর ফেলে? সকাল হ’তেই তো মাঠে যেতে হবে প্রাত:কৃত্য সারতে আর তারপরেতে তো আরো মুস্কিল, বাবা কুয়োতলাতে রোজ রোজ আমাকে এক্কেবারে ল্যাংট করে টেনে নিয়ে গিয়ে চান ও করাবেই, আমি না হয় ভূতের বাথরুমে চান করবো তার চেয়ে’।

তা সে’রাতে খেয়ে দেয়ে এসে খাটে শুয়ে দিব্বি ঘুম লাগলো বাপ বেটাতে। কিছুটি হ’লনা ক্ষতি তাদের।

গ্রামে তো তখন আর বিদ্যুতের বাতি ছিলো না, অনেক শহরেতেও ছিলো না। সেজবাতিই  জ্বলতো রাতে তার মানে হলো পিলসুজে মানে দীপাধারে বসানো বড়  রেড়ির তেলের প্রদীপ আর কি।

তাও তেল ফুরুলে রাতে প্রায়ই নিভে ও যেত।

তৃতীয় রাতে তাই হলো। প্রদীপ নিভে গেলো তাদের ঘরে তবে জানালা দু’টোই খোলা ছিলো গরমের রাত বলে। আকাশে গোল মতন চাঁদ ও উঠেছিলো একটা আর বেশ সুন্দর জ্যোত্স্না ও আসছিলো।

খট করে কি একটা শব্দ হতেই ঘুমটা ভেঙ্গে গেলো দ্রাঘিমাংশ বাবুর সেই রাতে। খাটে দেওয়ালের দিকে তাঁর ছেলে শুয়েছিলো আর তিনি ছিলেন ধারের দিকে। মাথার কাছে টেবিলে কাঁচের গ্লাসে জল রাখা ছিলো, একটা কুঁজো ও ছিলো নীচে।  তেষ্টা পেয়েছে দেখে উঠতে যাচ্ছেন হঠাৎ স্পষ্ট মনে হলো যে পাশের আরাম কেদারাতে কে যেন বুড়ো মতন লম্বা দাড়িওয়ালা লোক বসে রয়েছে সাদা জামা পরা। পুরোটা দেখবার আগেই তিনি উঠে পড়লেন আর উঠে কাউকেই কোথাও দেখতে পেলেন না।

তাড়াতাড়ি জল খেলেন ঢক ঢক করে আর তারপরে ছেলেকে ডাকলেন। সে উঠে বললো –‘ কি হলো? কই কেউ তো নেই? তুমি হয়তো চাঁদের আলোতে ভুল দেখেছ বাবা। নাও, এখন শুয়ে পড়। আমি নাহয় সজাগ থাকবো রাতে একটু, আজ জোর ঘুমিয়ে পড়েছিলাম, কিন্তু রহস্যভেদীর এত ঘুম ঠিক নয়’।

সে রাতে আর ভালো ঘুম হ’লো না দু’ জনের কারোই তবে আর অন্য কিছু দেখতেও পেলেন না কেউ।

পরদিন বাড়ির অন্য সব ঘর ও জায়গায় খোঁজাখুঁজির পালা শেষ হয়ে গেল আর অয়নাংশ সেই ডায়েরী খানা নিয়ে মাথা ঘামানো শুরু করে দিল।

তাতে ফল কিছুই হ’লো না অবশ্য তবে রাতে সেই ঘরে থাকতে কেমন যেনএকটু অসুবিধা শুরু হ’ল দু’জনের। বেশী রাতে কখনো বা বেশ শীত শীত করে অত গরমের সময়েতেও,  আবার কখনো বা মনে হয় যেন দমবন্ধ হয়ে আসছে।  শোবার সময়ে গরম থাকে বলে অয়নাংশ মাত্র গেন্জী, জাঙিয়া পরেই  শোয়। তাই পরদিন সকালে জমিদারবাবুকে বলে একখানা বড় কম্বলের ব্যবস্থা করে রাখল তারা।

রাতে শোবার সময় অয়নাংশ মাথার কাছে ব্র্যাকেটে রাখা বুড়োমানুষদের ভ্রমনসঙ্গী একখানা রুপোর হাতল বাঁধানো ছড়ি পেল দেখতে।

‘এ’টা কী কোন কয়েদির নাকী? কিন্তু যে বা যারা আজীবন ঘরে আটক, সে বা  তারা বেড়াবার ছড়ি দিয়ে কী করবে?  আর তারা কী রুপো বাঁধানো ছড়ি ব্যবহার করবে?

সে যাই হোক লাঠিটা আবার রেখে দিলো অয়ন যথাস্থানে ।

সেই রাতে ও আচমকা ঘুম ভেঙে উঠে বসলেন দ্রাঘিমাংশবাবু।

দেখেন যে যথারীতি ঘর নিস্প্রদীপ আর জোৎস্নায় ভাসছে। দমবন্ধভাবটা ও যেন বাড়ছে আর বেশ শীত করছে। পাশে রাখা কম্বলখানা টেনে নিতে গিয়ে চাঁদের আলোয় নজরে পড়ল পাশে শুয়ে অয়নাংশ ঘুমোচ্ছে তবে সে কিছুই পরে আছে বলে মনে হ’ল না তাঁর যদিও তিনি ঠিক জানেন যে অয়ন এইভাবে শুয়ে থাকবার মতন ছেলেই নয়।

পরক্ষণেই জোৎস্না মিলিয়ে ঘর অন্ধকার হয়ে গেল। মেঘ করলো নাকী? তবে তিনি হাত বাড়িয়ে অয়নকে স্পর্শ করে দেখলেন যে তিনি যা দেখেছিলেন তা ঠিক নয় কিন্তু কেননা অয়নের পরনে দিব্বি পোশাক আছে।

তিনি বেশ বিভ্রমে পড়ে গেলেন। তবে কি মাথা খারাপ টারাপ কিছু হলো নাকি রে বাবা ভূতের ঘরে শুয়ে?

একরাতে দেখছেন যে এক বুড়ো লোক দরজা বন্ধ করা ঘরে ঢুকে দিব্বি আরাম করে বসে আছে আর এক রাতে নিজের ছেলেকেই দেখছেন যে এক্কেবারে ল্যাংট হয়ে শুয়ে আছে যে নাকি চানের সময়েতেও আজকাল  ল্যাংট হতে লজ্জা পায়। বলে আমি বড় হয়েছি না বাবা? আমার বুঝি লজ্জা করেনা?

না: কিছু গন্ডগোল হচ্ছে কোথাও ভাবলেন বটে তবে অয়নকে আর ডাকলেন না।

তারপরের রাতে তিনি আরো একটু ভয় পেয়ে গেলেন।

সে রাতে ঘুম যখন ভাঙ্গলো রাত তখন ঠিক দু’টো বেজেছে ঘড়িতে তবে উঠে বসে দেখেন যে ঘরখানা একদম যেন ছোট্ট হয়ে এসেছে আর একটাও জানলা দেখা যাচ্ছে না। নীচে নেমে এসেছে যেন ঘরের চাল ও অনেকটা। ভূগোলের টিচার হয়েও ঘরের ভূগোল পাল্টে যাওয়াকে তিনি একটুও পছন্দ করলেন না আর উল্টে এমন চিত্কার দিলেন একখানা যে অয়ন তো –‘কি? কি হয়েছে বাবা?’ বলে ঘুম ভেঙ্গে উঠে বসলো বিছানাতে।

তিনি হাত তুলে দেখালেন যে ঘরের সামনের দেওয়ালটা এগিয়ে এসেছে অনেকখানি বিশাল আয়্নাখানা সমেত যেন।

অয়ন উঠে গিয়ে প্রদীপ জ্বাললো  তাড়াতাড়ি করে। তখন কিন্তু দেখা গেলো যে ঘর ঠিকই আছে আর জানলা ও আছে তবে হাওয়াতে না কিসে দু’টো জানালাই বন্ধ হয়ে গিয়েছে বলে ঘরে অত গুমোট দমবন্ধ ভাব লাগছিলো।

সে রাতে ও আর কারো ঘুম হলো না তাদের, তবু ঘর বদলালেন না তিনি।

দু’ তিন দিন আর কিছু হ’লো ও না রাতে তবে তারপরে হলো বড় বিচ্ছিরি কান্ড।

এক জোর ধাক্কা খেয়ে সে’ রাতে ঘুমটা ভেঙ্গে গেলো দ্রাঘিমাংশ বাবুর। চমকে উঠে বসে তিনি অবাক হলেন বেশ।

না:, জানালার দেখা নেই, হয়তো বন্ধ হয়ে গিয়েছে আজও আর সামনের যেন দেওয়ালটা  এক্কেবারে কাছে চলে এসেছে।

শুধু কি তাই, সেই এগিয়ে আসা দেওয়ালের জোর চাপ এসে পড়েছে খাটের গায়ে আর সেটা চড়মড় করে উঠছে। আরো আরো বাড়ছে সেই চাপ আর বিছানা সমেত খাটখানা যেন ধনুকের মতন বেঁকে যাচ্ছে। এই সাথে ছাদ ও নীচু হয়ে এসে যেন মাথায় ঠেকছে।

এককথায় তাদের যেন পিষে মেরে ফেলবার চেষ্টা করা হচ্ছে। 

তিনি ভয়ে চিত্কার ও করতে পারছেন না তখন। গলা শুকিয়ে কাঠ। কোনো আওয়াজই বেরোচ্ছে না গলা দিয়ে। বসে বসে দর দর করে ঘামতে ঘামতে তিনি যেন দম বন্ধ হয়ে  মরবার প্রতিক্ষা করছেন সব ভূগোল জ্ঞান ভুলে গিয়ে।

ব্যাপারটা কি যে দাঁড়াতো তারপরে তা বলা কঠিন তবে তাঁর ছেলের কল্যাণে পরিস্থিতি বদলে গেল কেননা হঠাৎ অয়ন ও উঠে বসলো ঘুম ভেঙ্গে গিয়ে।

সাধারনত ঘুম চোখে উঠে কিছু ঠাহর করা যায় না .

অয়ন ও কয়েক সেকেন্ড স্থির হয়ে বসে রইলো কিন্তু সেই দম বন্ধ করা ঘরের অবস্থা বুঝে নিতে তার বেশি সময় লাগলো না যে পরিস্থিতি বেশ ঘোরালো হয়ে উঠেছে ...কয়েক পলকের মধ্যে সেই দারুণ বুদ্ধিমান ছেলে বুঝে নিলো যে আর কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে মৃত্যু আসন্ন, আর  তা বুঝেই সে চারপাশে তাকালো একবার কিন্তু কোথাও কিছু দেখতে না পেয়ে অন্ধকারের ভিতরেই সে মাথার কাছ থেকে  হাত বাড়িয়ে তুলে নিলো সেই রূপোর হাতলঅলা ছড়িখানা।

দেরি করবার বা বেশি ভাবনা চিন্তা করবার  মতন সময় তো নেই তাই পরক্ষনেই সে সেটাকে ছুঁড়ে দিলো সামনে সেই দেওয়াল সমেত এগিয়ে আসা বিশাল আয়না খানার দিকে, ডানহাতের পুরো জোর দিয়ে।

ঝন ঝন ঝনাত ঝন করে দারুণ জোরে শব্দ হলো একটা আর সেই বিশাল আয়না খানার আধখানা প্রায় ভেঙ্গে পড়লো মেঝেতে সশব্দে, রুপোর হাতলের বাড়ির চোটে।

সেদিন টর্চ নিয়ে শুয়েছিলো অয়ন।

বালিশের তলা থেকে টর্চ টেনে নিয়ে মেঝেতে লাফিয়ে নেমে প্রদীপ জ্বালতে সচেষ্ট হলো সে। আলো জ্বালতে দেখা গেলো যে ঘরের ভূগোল ঠিকই আছে তবে জানলা দু’টোই বন্ধ হয়ে গিয়েছে  আর বাইরে ঝম ঝম করে বৃষ্টি পড়ছে। দারুণ গরমের পরে বৃষ্টি হতে কেমন যেন ভিজে মাটির গরম গন্ধযুক্ত ভাপে হাওয়া ভারী হয়ে উঠেছে বন্ধ ঘরে 

অয়ন চপ্পল পরে নিয়ে প্রথমে একটা জানলা একটু খুলে দিলো আর তারপরে আয়না খানা দেখতে এগিয়ে গেলো।

সে দেখতে পেল যে আয়নার নিচে ভাঙ্গা কাঁচের সাথে লাঠিখানা পড়ে আছে আর আয়নার ফ্রেমের মধ্যে দিয়ে উঁকি মারছে এক খানা মোটা মতন খামের কোনা।

খামখানাকে অয়ন টেনে বার করে আনলো আর টর্চ জ্বেলে দেখলো যে সেটাতে কি আছে। দেখে মনে হ’লো যে সেটা একটা দলিল।

অয়ন ভাবলো -তবে কি এটাই সেই হারানো দলিলের তৃতীয় কপি নাকী?

হ্যাঁ,  তাই মনে হচ্ছে বটে। সে বুঝে নিলো যে দুইয়ের চেয়ে যে তিন ভালো তা ঠিকই বটে।

বিছানায় এসে বসে অয়ন ডাকলো –‘বাবা ...’

শুকনো গলায় তিনি কোনমতে বললেন –‘জল...’

অয়ন জলের গ্লাস এগিয়ে দিতে তিনি ঢক ঢক করে সব জলটা খেয়ে বললেন  ‘অয়ন, খুব হয়েছে অন্বেষণ করা।  আর কাজ নেই। শেষে কি এই ভূতের ঘরে থেকে পৈত্রিক প্রাণটুকু ও খোয়াবো না কি? আমি কালই এখান থেকে ভাগলবা হবো তা কিন্তু  ঠিক কথা। মাথায় থাকুন আমার পঞ্চাশ হাজার টাকা।’

অয়ন বললো –‘ বাবা, আমরা কালকেই যাব চলে তা ঠিকই কথা তবে প্রথমত জোর বৃষ্টি পড়ছে, গ্রামের পথে এত কাদা হবে যে গাড়ী ও চলবে না আর প্রাপ্য টাকাটাও নিয়ে যেতে হবে সাথে। এত দিন ধরে যে জঞ্জাল হাতড়াচ্ছি, আর ভূতের দমবন্ধ করা ঘরেতে পড়ে আছি তা কি এমনি নাকী?

এই নাও,... দলিল পেয়েছি মনে হয়, আয়নার ফ্রেমের মধ্যে তৃতীয় কপিখানা লুকিয়ে রাখা ছিল বলে কেউ খুঁজে পায়নি। আয়নাখানা পরে লাগিয়ে দেওয়া হয়েছিল বলে মনে হয় কেননা কেউ কয়েদিদের ঘরে এত বড় আর দামি আয়না লাগাতে যাবে কোন দু:খে? আমার এই ঘর খানার ওপরে ঘোর সন্দেহ হয় ঢুকে ওই আয়নাখানাকে দেখা মাত্র...আর এই রূপো দিয়ে বাঁধানো ছড়িটাও কিন্তু হলো গিয়ে দ্বিতীয় সন্দেহ জনক বস্তু

এবারে দুই আর দুইয়ে মিলে বেশ চার হয়ে গিয়েছে না,বাবা? ঠিক যেমন দেশান্তর বা দ্রাঘিমা রেখারা সবাই গিয়ে নর্থ আর সাউথ পোলে গিয়ে মিলে যায় গুট গুট করে

এ’দিকে তখন ভোর হয়ে আসছে প্রায়।

মেঘের জন্যে অন্ধকার হয়ে আছে আকাশ তাই বোঝা যায় না যে আলো ফুটলো কিনা। ‘তবে আমরা তৈরী হতে পারি বাবা এখন থেকেই কেননা ঘুম তো আর হবে বলে মনে হয় না’, অয়ন বললো।

‘তবে তাই হোক অয়ন’ বলে দ্রাঘিমাংশ বাবু উঠে পড়লেন।

- অধ্যাপক (ড:) জি. সি. ভট্টাচার্য, বারাণসী, উত্তর প্রদেশ, ভারতবর্ষ ,০৯৪৫২০০৩২৯০   


Enhanced by Zemanta