বাদলের প্রথম অন্বেষণ - অধ্যাপক (ড:) জি .সি. ভট্টাচার্য, বারাণসী, উত্তর প্রদেশ | Short Story - WBRi Bengali Online Magazine

DR G C BhattacharyaDr. G C Bhattacharya is a teacher at BHU, Varanasi, Uttar Pradesh, India and has been writing for over 15 years. His writings have been published in Ichchhamoti, Joydhak, Diyala, A-Padartha and other Bengali magazines. Besides Bengali, he writes in Hindi and English (UK short fiction) too. His published books includes Badal Kotha in Hindi. Dr. Bhattacharya can be reached at dbhattacharya9 [at] gmail [dot] com.

Submit your creative writing, story, poem, travelog etc. for publication on WBRi by e-mail to submissions@washingtonbanglaradio.com.


বাদলের প্রথম অন্বেষণ

অধ্যাপক (ড:) জি .সি. ভট্টাচার্য, বারাণসী, উত্তর প্রদেশ


আমার পরীর দেশের রাজকুমার পরম সুন্দর ভাইপো চঞ্চলের একমাত্র পরম বন্ধু বাদলের কথা আজ অনেকেই জানে তবে সে অনেক ছোট বয়সে যে অন্বেষণের জন্যে বালক অন্বেষক বা লিটল ডিটেক্টিভ বলে বেশ পরিচিত হয়ে উঠে ছিলো প্রচার মাধ্যমের কল্যাণে, সেই ঘটনার কথা হয়তো অনেকে জানেই না, তাই আজ সে গল্প বলছি।

তখন বাদল মাত্র সাত কি আট বছরের ছেলে।

চঞ্চলের জন্মদিন উপলক্ষ্যে সেবার খুব ধুমধাম হয়েছিল ।

বলা বাহুল্য যে আমাকে সেদিন বিকেলের দিকে একটু তাড়াতাড়িই যেতে দাদা হুকুম জারি করেছিলো কেননা বিশিষ্ট অতিথিদের আদর আপ্যায়নে নিজে ব্যস্ত থাকবে বলে আমাকেই অন্য সবাইকে অভ্যর্থনা করতে হবে আর বৌদি যে তার সাত বছরের রূপকুমার অতি সুন্দর ছেলেকে সাজাতে আর নিজে সাজতেই ব্যস্ত থাকবে তা তো জানাই কথা ।

আমি ও তাই বাদলকে সঙ্গে নিয়ে যাবো ঠিক করেছিলাম.

এমনিতেও বাদলকে যেতেই হতো ঠিকই তার একমাত্র বন্ধুর জন্মদিনের নেমন্তন্নে আর খোদ আই. জি . সাহেব আসবেন, ডি. এম. সাহেব ও, তাই পাহারার কড়াকড়ি ব্যবস্থা ও থাকবেই পুলিশের।

দারুণ সুন্দর ছেলে বাদল ও আর আমি তাকে নতুন কেনা দামি সুট বুট টাই জুতোর সাহেবী পোশাক পরিয়ে ও বেশ ভালো করে প্রসাধন করে একেবারে রাজকুমার সাজিয়ে নিয়ে গিয়েছিলাম, হাতে দামি ঘড়ী, আংটি সব পরিয়ে দিয়ে।

সে অবশ্য আপত্তি করেছিলো আমার এই বাজে খরচ করা নিয়ে।

বলেছিলো – ‘কাকু, একটা গরিবের ছেলেকে তুমি আজ বড়লোক সাজাচ্ছ যে? আমি যেমন আছি তাই থাকি না কেন, এই সব পোষাকের কি দরকার?’...

আমি বললাম –‘ তবে কি আমি তোমাকে ল্যাংট করে নিয়ে যাবো নাকি নেমন্ত্তন্ন খাওয়াতে? বাদল, এ’ হলো গিয়ে বড় লোকেদের পার্টি আর সেখানে সবাই আসল হিরে মুক্তর গয়না পরে আসবে, তাই গরিবের স্থান তো সেখানে নেই প্রবেশ ও নিষেধ। বাদল, তুমি তো জাননা ...সেখানে দামী পোশাক ও সাহেবী কেতা দিয়ে মানুষের পরিচয় হয় আর একজন সম্পূর্ণ অপরিচিত ও যদি সেজে গুজে আসে তবে স্যালুট পায় আর গরিবের পোশাকে নিজের আত্মীয় ও গলাধাক্কা খেতে পারে...অবশ্য এখানে নিমন্ত্রণ পত্র বা কার্ড দেখা হবে গেটে তবে সে আর একটা যোগাড় করা কঠিন কাজ কি? একজন চোর ও তা অনায়াসে সংগ্রহ করে নিতে পারে’।

আমার কথা শুনে বাদল অপরূপ সুন্দর ভ্রুভঙ্গি করে বললো –‘তার মানে কাকু? তুমি কি বলতে চাও যে সেখানে চোর ডাকাতের প্রবেশ নিষেধ নেই পুলিশ সাহেবের ছেলের জন্মদিনের পার্টিতেও ? হি: হি: হি: ...দারুণ মজা তো’।

‘আরে আমি তা বলছি না বাদল, তবে পুলিশদের ওপরে অনেক চোর ডাকাতের রাগ থাকতেই পারে আর বড়কর্তার সামনে অপদস্থ করবার এমন সুন্দর সুযোগ কি কেউ ছেড়ে দেয় নাকি? হাতে নাতে অকর্মন্য প্রমান হ’লে বদলি হয়ে দেশ ছাড়া হতে দেরি যে হবে না কোনো পুলিশ কর্মচারীর তা তো জানা কথাই আর সে যদি আবার ঘুষ না খেতে চাওয়া পাগলা পুলিশ অফিসার হয় তাহলে তো কথাই নেই ...টাকা দিয়ে পুলিশ কেনা তো আলু মুলো কেনার চেয়ে ও সহজ এই দেশে, বাদল’।

‘আলু মুলোর মতন পুলিশ কেনা? সে আবার কি, ও কাকু?... হি: হি: হি: তুমি না কাকু, নির্ঘাৎ করে লেখক হবে পরে’।

তা জিনিয়াস ছেলে বাদলের বালক বয়সের কথা যে সত্যি হয়েছে আজ তা অনেকেই জানে তবে লেখার নেশা বড়ই বাজে জিনিশ ....নাওয়া খাওয়া ভুলিয়ে দেয়, চাকরি করা মাথায় ওঠে...কম্পুটারে লেখা তো আরো বিচ্ছিরি কাজ আর কি, তার চেয়ে বসে সিগারেট ফোঁকা এমন কি গন্জিকা সেবন করা ও ঢের ভালো নেশা। ...

সে যাক গিয়ে. আমরা সেদিন দু’জনে সেজে গুজে চঞ্চলের জন্মদিনের নেমন্ত্তন্ন খেতে গেলুম তাও আবার গাড়ী করে ...বরুণা ট্র্যাভেল্স কে ফোন করে গাড়ী আনাচ্ছি দেখে বাদল আবার ও ভ্রু কুঁচকে ছিলো।

তবে সেখানে আমাদের যা অভ্যর্থনার ঘটা গেটেতে তা দেখে ও বাদল একবার আড়চোখে আমার দিকে তাকিয়ে ছিলো ...অবশ্য দাদা পরিচয় দিয়ে বলে রেখেছিলো হয়তো আমাদের আসবার সময় জানিয়ে...পুলিশে পুলিশে চারদিক একেবারে ছয়লাপ ...বাগানে সাজানো প্যান্ডেলে তখন নানা রঙের লাইট ফিট করা হচ্ছিলো ...সেখানে নাচ গান আবৃত্তি নাটক কত কি হবে।লজেন্স ভরা বেলুন ফাটানো হবে, রাংতা মোড়া কৃত্তিম গাছে ঝোলা প্ল্যাস্টিকের ফল তুলে এনে তাকে ভেঙে তার মধ্যে থেকে নম্বরলেখা কুপন বার করে নিয়ে এসে উপহার নেওয়া হবে, সব শেষে চঞ্চলকে উপহার দেবার প্রোগ্রাম ছিলো আর অন্য পাশে বিরাট শামিয়ানার নীচে ভোজনের স্থান তৈরী হচ্ছিলো। সর্বত্র ফুল আর বেলুন, ফেস্টুন দিয়ে ও সাজানো হচ্ছিলো যার মধ্যে ত্রিবর্ণ পতাকার রঙের সাধারণ আর রামধনুর সাত রঙের গ্যাস বেলুন ও ছিলো ...সে এক এলাহী কান্ড কারখানা আর কি ।

আমি গিয়ে বৌদির সাথে দেখা করলাম।

দাদা সাহেবদের আনতে যাবার জন্যে তৈরী হচ্ছিলো ড্রেসিং রুমে গিয়ে।চঞ্চল ঘরের পোশাকেই ছিলো তখন। এক ছুট্টে সে এসে বাদলকে জড়িয়ে ধরে বললো –‘ বাদল, আজ তুই আমার ম্যানেজার কিন্তু, আমি যত সব দামী দামী উপহার পাবো আজ সে সবের লিস্ট করে তোকে সাজিয়ে রাখতে হবে ভাই’।

বৌদি এসে বললো –‘ঠাকুরপো, তোমার অতিথিদের অভ্যর্থনা যত পারো করো কিন্তু আজ আমার ছেলেটাকে রক্ষা করবার দায়িত্ব কিন্তু তোমার ওপরে রইলো কেননা আমাকে তো লেডিজদের সাথে কথা বলতে হবে, তোমার ওই কার্তিক ঠাকুর কে দেখবে কে?’

বাদল বললো –‘আমি দেখবো মাসিমা এই মানে আন্টি, আপনি এক থালা আবির আনিয়ে রেখে দেবেন স্টেজের সামনে ধুপের সাথে ...লোকে মনে করবে সাজ সজ্জার অঙ্গ আর কেউ যদি দুষ্টুমি করতে আসে তো আমি ধুলোর বদলে তার চোখে আবির দিয়ে দেবো ...হি: হি: হি: ...’

এই ভাবে খানিকক্ষণ যেতেই দাদা বেরিয়ে গেলো গাড়ী নিয়ে আর বৌদি চঞ্চলকে নিয়ে সাজ ঘরে গিয়ে ঢুকে পড়লো। আমরা বেরিয়ে এসে চারদিক ভালোকরে দেখে নিলাম যে কারো অবান্ছিতভাবে এসে ঢুকে পড়বার কোনো পথ আছে কি নেই।

না: সে পথ নেই দেখে নিশ্চিন্ত হওয়া গেলো একটু।

ঠিক সন্ধ্যা ছ’টাতে অতিথিরা আসতে শুরু করলেন একে একে আর একটু পরেই আলো ঝলমলে স্টেজে এসে প্রধান অতিথিরা আসন নিলেন ।প্রোগ্রাম শুরু হয়ে গেলো ।আমরা দর্শকের আসনে রইলাম, মঞ্চে এস. পি ও ডি. এম. সাহেবেরা সস্ত্রীক, দাদা বৌদি আর চঞ্চলের আসন ছিলো।

দীপ প্রজ্জলন ও স্বাগত গান শুরু হলো। চঞ্চলের স্কুলের বন্ধুরা মিলে খুব ভালো গান গেয়ে স্বাগত জানালো সবাইকে।তারপরে আবৃত্তি, কবিতে পাঠ, গান সব একে একে চলতে লাগলো ।প্রোগ্রামে একটু বদল করে দেওয়া হলো যে সব শেষে নাটিকাটি অভিনিত হবে আর চঞ্চলকে উপহার দেওয়াটা আগে হবে।তারপরে চায়ের বিরতি আর লঘু নাটিকার শেষে পান ভোজন এর পালা।

তা সব নির্বিঘ্নে হতে লাগলো।

বাদল উপহারের সময় গিয়ে মঞ্চে বসে চঞ্চলের হাত থেকে উপহারগুলো নিয়ে লিস্ট করে সামনের বড় টেবিলে রাখতে লাগলো যখন সে নিচু হয়ে উপহারদাতাকে প্রনাম করছিলো।

গল্পের বই থেকে শুরু করে হাত ঘড়ি, ম্যুজিকাল ক্লক, টাই আর রুবি বসানো টাই পিন, সুটের কাপড়, সোনার আংটি, সোনার হার এমনকি কয়েকটা মোহর আর হীরের বোতাম লাগানো দামি পাঞ্জাবি ও উপহার পেলো চঞ্চল আর সব উপহারের সাথেই ছিলো মোটা খামে ভর্তি টাকা ।বড়লোকের কারবারই আলাদা।

তারপরে চায়ের বিরতি হতে সবাই মঞ্চ থেকে নেমে এসে অন্য প্যান্ডেলে চলে গেলেন।

আলো ঝলমলে মঞ্চে সুন্দর সেতার বাজনা শুরু হলো।না: সি. ডি.তে নয়, একটি ছেলে এসে বাজাতে বসলো। খুব ছোট ছেলে, চঞ্চলের চেয়েও দু’ তিন বছরের ছোট হবে সে তবে ওই বয়সেই বাজনার হাত যা চমত্কার, সবাই জলখাবার ভুলে বাজনা শুনতে লাগলো।

চা, কেক, পেস্ট্রি ও নোনতা খাবার অনেক ছিলো সাথে কোল্ড ড্রিন্ক আর ফ্রুট জুস, বাচ্ছাদের জন্যে দামি আইসক্রিম ছিলো চার রকমের ...বড়দেরও খেতে নেই মানা ...দারুণ আনন্দে ছিলো সবাই।

জলখাবার হয়ে গেলে সব সরিয়ে ফেলে ডিনারের আয়োজন শুরু হবে সেখানে।

তবে হঠাৎ করে ছন্দ পতন হ’লো।দপ করে সব সব আলো নিভে গেলো আর অন্ধকারে ছোটরা ভয় পেয়ে চিত্কার করে উঠলো ...লাইট ...লাইট রব উঠে গেলো।

দশজন পুলিশ ছুটলো আলোর ব্যবস্থা দেখতে তবে একটু সময় তো লাগেই আর তার মধ্যেই এক জন মহিলা কন্ঠে চিত্কার শোনা গেলো ...’আরে.. আরে... কে? কে? আমার হার আরে একি? চোর চোর’।

দপ করে আলো জ্বলে উঠলো তার তিন মিনিটের মধ্যেই তবে তখন জানা গেলো যে কেউ বা কারা ডি. এম. সাহেবের স্ত্রীর গলার আসল মুক্তোর দামী নেকলেস বা হারটা ছিঁড়ে নিয়ে পালিয়ে গেছে... কি কান্ড ... ব্যাস, হই চৈ শুরু হলো দারুণ।

তবে ডি. এম. সাহেব সবাইকে শান্ত করে বললেন –‘ আপনারা গিয়ে বসুন দয়া করে, চারিদিকে পাহারা আছে, একটি ছুঁচ নিয়ে ও কেউ পালাতে পারবে না আর প্রোগ্রাম হয়ে গেলে সব তল্লাসী ও করা হবে তখন হার পাওয়া যাবেই’।

কোনমতে প্রোগ্রাম শেষ হলো আর খাওয়া দাওয়া ও মিটল তবে সে আনন্দের ভাব আর রইলো না...ইতিমধ্যে এস.পি. সাহেব দাদাকে হুকুম দিলেন অনুসন্ধানের জন্যে ...দলে দলে পুলিশ চারিদিক খুঁজে ও কিন্তু না পেলো কারুর দেখা না পেলো জিনিস ...বামাল সমেত চোর যেন শূন্যে মিলিয়ে গেছে।

দাদা চুপি চুপি উঠে এসে আমাকে ডেকে নিয়ে গিয়ে বললো –‘ সিদ্ধার্থ, শিগগির করে তুই লেগে পড় এবারে। এ’ ঠিক মনে হয় যে আমাকে জব্দ করবার জন্যে কেউ এই কাজ করেছে এবং সে আমাদের চেয়ে ও বেশি বুদ্ধি রাখে কেননা লাইট ফিউজ হয়নি কেউ মেন সুইচটাকেই অফ করে দিয়েছিলো আর অন্য কেউও এখানে ছিলো যে হারটাকে ছিনিয়ে নিয়ে এমনভাবে পাচার করে দিয়েছে তিন মিনিটের মধ্যে যে হাজার তল্লাশি করেও পাবো না আমরা আর মাননীয় অতিথিদেরকে কি সারা রাত আটকে রাখা যাবে?’

বাদলকে এসে ধরলো চঞ্চল আমি কি করবো তাই ভাবছি দেখে, বেশ করুণ কন্ঠে বললো –‘বাদল, তুই দেখ একটু না হয়, ভাই ...’

বাদল বললো –‘ আরে পরীর দেশের রাজকুমার, তোর ফুলের মতন মুখটা এইটুকুতেই যে শুকিয়ে উঠেছে।আচ্ছা, তুই একটু আমার সাথে আয় আর সেই জায়গাটা একটু দেখিয়ে দে তো যেখানে হারটাকে কেউ ছিনিয়ে নিয়েছিলো ...তা হলেই হবে’।

এই বলে সে নিজের কোটটাকে খুলে আমার হাতে দিলো। বাদলের টাইটা ঝুলে পড়লো দেখে চঞ্চল তাড়াতাড়ি নিজের হীরের টাই পিনটা খুলে বাদলের টাইয়েতে আটকে দিলো জামার সাথে।

বাদল দেখে মৃদু হেসে এগিয়ে গেলো আর আমি ও পিছনে গেলাম ছেলেটা কি করে তাই দেখবো বলে।

‘ঠিক এইখানে, বাপী দেখেছিলো ...’

বাদল সেইখানে নীচু হয়ে শেষে হামা গুড়ি দিয়ে ভালো করে ঘাস জমি দেখতে ও শুঁকতে লাগলো ...দু’ মিনিট পরে উঠে বললো –‘চঞ্চল, আয় আমার সাথে’ ।

সব্বাই নাটিকা দেখছে আর ওরা দু’জনে লন পেরিয়ে চলছে সিড়ির দিকে। চারিদিকে পুলিশের কাজ ও চলছে দিব্বি তবে কেউ আর বাচ্ছাদের দিকে নজর দিলো না দেখে আমি নিশ্চিন্ত হ’লাম একটু। গিয়ে একটা চেযারে বসলাম বাদলের কোট হাতে নিয়ে। তা সে বসে আছি তো আছিই, সময় আর কাটে না। নাটিকার কিছুই তো ছাই মাথাতে ঢুকছে না আর ছেলে দুটোর ও পাত্তা নেই, কি যে করছে তা কে জানে?

নাটিকা শেষ হ’তে ডিনার শুরু হলো যথারীতি তবে সব চুপচাপ একেবারে,গান নেই, সেই আনন্দ নেই।

তারপরে তো একে একে সবাইকে সার্চ করবার অপ্রীতিকর ঝামেলা ও শুরু হলো। এর মধ্যে কেউ বাথরুমে ও যায়নি তাই জিনিস পাচার করবার সুযোগ ও কেউ পায়নি। পুলিশে কর্ডন করে ঘিরে রেখেছিলো তবে চোর কি আর বসে থাকে সেখানে যে কিছু পাওয়া যাবে।কিছুই মিললো না দেখে ডি. এম. সাহেব নিজেই সবাইয়ের কাছে মাফ চেয়ে নিয়ে বললেন –‘যাক গিয়ে, আপনারা কেউ কিছু মনে করবেন না যেন, এটা তো পুলিশের কাজই আর এটা আরো আগেই হওয়া উচিত ছিলো কিন্তু আমি বারণ করেছিলাম নইলে এই সুন্দর প্রোগ্রামটা মাটি হয়ে যেত একটা তুচ্ছ নেকলেসের জন্যে...’

সবাইকে আবার বসতে বলা হ’লো আর পুলিশ ও গেট ছাড়লো না।দাদা বললেন- ‘আপনারা যে যা পান করতে চান নিয়ে নিন প্লিজ, চা, কফি, কোল্ড ড্রিন্ক, কোকো, মালটোভা, বোর্ন ভিটা... যার যা ইচ্ছে... পান টান ও আছে, কেউ চাইলে ড্রিন্ক ও নিতে পারেন’।

তার একটু পরেই বাদল নীচে নেমে এলো চঞ্চলের সাথে। বাদল আমার হাত থেকে কোটটা নিয়ে পরতে পরতে ক্লান্ত ভাবে বললো –‘ কাকু, নেকলেসটাতে, কটা মুক্তো ছিলো তা কি জানতে পারা যাবে একটু? যদি সম্ভব হয়, প্লিজ ...’

চমকে উঠলাম বাদলের কথা শুনে – ‘ তার মানে? তুমি কি জানো যে হারটা কোথায়?’

ছেলে একটু সুন্দর করে হাসলো মাত্র মুখ নীচু করে ।

আমি চুপ, তবে দাদাকে গিয়ে জিজ্ঞাসা করতেই হলো কথাটা।

দাদা হতভম্ব হয়ে রইলো কিছুক্ষণ বাদলের প্রশ্ন শুনে কিন্তু গিয়ে ডি.এম. সাহেবের স্ত্রীকে বিনীত কন্ঠে জানতে চাইলো, কি করবে আর?

তিনি ঘাড় নেড়ে বললেন –‘ তা কি ঠিক মনে আচ্ছে আমার? তবে কুড়ি পচিশটা হ’তেই পারে? কেন খোঁজ পাওয়া গেছে কি কিছু?’

‘না, তবে হয়তো এখনি পাবো ...’

তিনি রাগত মুখে চুপ করে রইলেন ...দামী গয়না চুরি গেলে কোন মহিলা না রেগে থাকেন আবার? তাও আবার শত শত পুলিশের কড়া পাহারার মধ্যে থেকে ... ডি. এম. সাহেবের বরাতে যে দু:খু আছে তা বোঝা গেলো বেশ।

বাদল উত্তর শুনে হাত উল্টে বললো –‘কি কান্ড? পাঁচ পাঁচটার তফাৎ, একেকটার দাম কয়েক হাজার টাকা ...রোজ না হলেও প্রায় যে জিনিষ লোকে ব্যবহার করে থাকে তার বিষয়ে এই উত্তর, কাকু? সব আচ্ছা নন সিরিয়াস বড়লোক যা হোক। আমি কি করি এখন? আচ্ছা, সবাই কে যেতে বলে দাও এবারে কাকু’।

তা একে একে সবাই গেলেন বিদায় নিয়ে, পুলিশের দল ও চলে যেতে চঞ্চল বাদলকে চেপে ধরলো –‘ বল বাদল, তুই কি ভাবে আর কি জেনেছিস, বলতেই হবে তোকে নইলে আজ রাতে আমার ঘুম হবে না আর বাপির ও না’

বাদল স্মিত হেসে বললো –‘বলবো, তবে এখন নয়। কালকে. নইলে চোর ধরতে

পারবো না’

‘তবে তোকে আজ রাতে আমার সাথে এখানেই থাকতে হবে আর কাকু ও থাকবে’।

বাদল ঘাড় নেড়ে চুপ করে রইলো একটু তারপরে বললো –‘ একটা কাজ কিন্তু বাকি, তোকে এই তালাটা এখনই মেরামত করাতে হ’বে, কি রে পারবি?’

চঞ্চল বললো –‘ পুলিশের কাছে কোনো কিছুই না পারবার কথা নয় ...বাপী ..ও বাপী, একটু শোনো তো এদিকে ...’

দাদা এসে বললো –‘ কি রে? কি চাই এখন আবার?’ ’

চঞ্চল তালাটা এগিয়ে দিয়ে বাদলের কথাটা বলে দিলো।দাদা চুপ করে কি যেন বুঝে নেবার চেষ্টা করলো একটু, শেষে হাল ছেড়ে দিয়ে একজন পাহারাদারকে ডেকে হুকুম দিলো আর কি আশ্চর্য কান্ড? সে ও ঠিক আধ ঘন্টার মধ্যে তালা চাবি সমেত ঠিক করিয়ে এনে হাজির।এদিকে তখন কিন্তু রাত দশটা বেজে গিয়েছে ঘড়িতে।

দাদা এসে আমাকে তালা ফেরৎ দিয়ে বললো –‘নে তোর তালা, ঠিক হয়ে গিয়েছে. তুই মরুভূমিতে গিয়ে জল চাইলেও পুলিশ ঠিক এনে দিতে পারবে তা জানিস কিছু? দেখ আমাদের ক্ষমতা, তবে মালা গেলেন চুলোয় তালা নিয়ে অনুসন্ধান করছেন মিস্টার হোমস এই আর কি?’

শুনেই রূপকুমার চঞ্চল খিল খিল করে হেসে উঠল আর দাদা কটমট করে ছেলের দিকে চেয়ে এক চড় তুললো মারবে বলে ...সে ছুট্টে গিয়ে বাদলের পিছনে লুকোলো ...তবে জন্মদিনের সব আনন্দটা মাটি হলো এই যা কষ্ট আমার রইলো।

দাদা আবার এসে বললো-‘আমাদের ডিনার রেডি, চলে আয় তোরা, যা হোক কিছু মুখে দিতে তো হবেই। ভালো এক চোর আপদ এসে জুটে একটা দিন একটু যে আনন্দ করবো সবাই মিলে তার ও বারোটা বাজিয়ে ছাড়লো আজ...কি গেরো রে বাবা আমার কপালে’।

বৌদির ও মুখ ভার তবে চঞ্চলের যেন কোনো চিন্তা নেই এমনি ভাব আর বাদল? তার মনের কথা বোঝবার সাধ্যি আমারও নেই, এত চাপা ছেলে।

বৌদি খেতে খেতে একবার দাদারদিকে আড়চোখে তাকিয়ে বললো –‘তা তোমার বদলিটা কোথায় হতে পারে বলে মনে হয়? মালকানগিরি না উদয়গিরি?’

দাদা রাগ করে বললেন-‘জাহান্নমে?’

বাদল একটু হেসে বললো –‘কোথাও না, তবে প্রোমোশান ট্রান্সফার হলে সে কিন্তু আলাদা কথা’।

‘তার মানে’?

‘তার মানে কাল সকালে, কাকু’।

‘রাতে চঞ্চল আমার সাথে বাদলকেও টেনে নিয়ে এসে শুয়ে পড়লো।তা ঘুম আর আসে না, এমন কি উপহারগুলো ও দেখা হলো না ঠিক করে তবে চঞ্চল বললো –‘ও সব বাদল রেকর্ড করে রেখেছে, লকারে তোলাও হ’য়ে গেছে আর চুরি হবার ভয় নেই, কাকু তবে তোমার এই সুন্দর দুষ্টু ছেলেটাকে আমার খুব করে চড় মারতে ইচ্ছে করছে কিন্তু তা জানো’

‘কেন চঞ্চল?’

‘কেন আবার? এই ছেলেটা সব সব জানে তবু ও চুপ করে আছে হুতুম পেঁচার মতন তা দেখছ না তুমি?’

‘সবটা জানিনা আমি তাই চুপ করে আছি চঞ্চল, সকাল না হলে চোর যে কে তাই জানা যাবার কোনো উপায় যে নেই’।

যা হোক, খানিক পরে আমি ঘুমিয়ে পড়লাম, অনেক রাতে একটু চটকা ভেঙ্গে ছিলো, দেখি চঞ্চল অঘোরে ঘুমোচ্ছে শুয়ে কিন্তু বাদল নেই।গেলো কোথায় ছেলেটা? বাথরুমে কি?

কিন্তু না:, মিনিট কয়েক পরে দেখি বাথরুম নয়, টর্চ হাতে দরজা খুলে চুপি চুপি উঠে এসে খাটে দিব্বি শুয়ে পড়লো বাদল, তার রাতের অভিযান সেরে।

আমি ও চুপ করে শুয়ে রইলাম।

পরদিন সকালে উঠে ও বাদল চুপ চাপ ছিলো।

যে যার প্রাত:কর্ম শেষ করে ব্রেকফাস্ট টেবিলে গিয়ে বসলাম আমরা।

এস. পি. সাহেব ফোন করে তখনি জানতে চাইলেন-‘কি হলো প্রোগ্রেস?’

দাদা বললো –‘দশটার পরে জানাতে পারবো স্যার।

তিনি বললেন- ‘তা বেশ, আমি অপেক্ষ্যা করবো তবে দায়িত্ব সব তোমার’ ... এই বলে লাইন কেটে দিলেন তিনি।

বেলা দশটার পরে সত্যি কাজ শুরু করলো বাদল।

ডেকোরেটারের লোকজন একে একে সব আসতে শুরু করলো ...কেউ বাসন পত্র নিয়ে যাবে, কেউ চেয়ার টেবিল তুলবে কেউ বা খুলবে প্যান্ডেল, কেউ বাসি ফুলমালা, বেলুন আর ফেস্টুন খুলে নিয়ে যাবে।কাজ আরম্ভ হয়ে গেলো তাদের জোর কদমে।বাদল নির্বিকার ভাবে গিয়ে চঞ্চলের মোপেড খানা চালু আছে কিনা তা পরখ করে দেখতে বসলো তখন। স্টার্ট করা আর বন্ধ করা শুরু করলো বারবার।দেখলে মনে হবে যে বাচ্চার খেলা আর কি? তবে দাদা তার প্রতি সতর্ক দৃষ্টি রেখেছিলেন যে তা বলাই বাহুল্য।

একে একে গাড়ী চলে যেতে শুরু করলো।

বাসন পত্র গেলো ...চেয়ার টেবিল গেলো ...প্যান্ডেলের কাঠ কাপড় গেলো শেষে যেই ফুল মালা ফেস্টুন বেলুন নিয়ে শেষ গাড়ীটা এগিয়ে গেলো অমনি বাদল জেমস বন্ডের মতন লাফিয়ে উঠে মোপেড স্টার্ট করে ছুট দিলো তাদের পিছনে আর দাদা ও তাই না দেখে ফোন তুলে বলল-‘হ্যালো, ০০৯ স্পিকিং, বি কুইক, ফলো বাদল য়্যান্ড প্রোটেক্ট হিম, ওভার’।

ও রে বাবা। দেখি সে এক কালো রঙের বিরাট পুলিশের ওয়ারলেস ভ্যান ...কোথায় যে লুকিয়ে ছিলো কে জানে, ছুটে এসে বাদলের পিছন ধরে নিলো।দাদা ঠিক জানতো যে বাদল এমনি কিছু একটা কান্ড করবেই সকালে আর সে চায় না যে তার প্ল্যান দ্বিতীয় কেউ জানুক তাই কিছুটি কাউকে বলেনি, কেননা সর্ষের মধ্যেই তো ভূতের বাস হয় অনেক সময় আর দাদাও সেই সন্দেহ যে করেনি তা নয়, তা না হলে অত কড়া পাহারার ভেতরে চোর ঢোকার সাধ্য কি?

প্রায় এক ঘন্টা পরে দাদার ফোন বেজে উঠলো –‘হ্যালো ০০৬ স্পিকিং, অপারেশন সাক্সেসফুল স্যার, দি পার্সন ইজ ইন আওয়ার কাষ্টডি...ওভার’।

তারপর ...তারপর আর তো নেই কিছুই ...চোর ধরা পডে গেলো, পুলিশের দাওয়াই খেয়ে অপরাধ স্বীকার না করে কি আর সে পার পায় নাকি, আর আমার কথাটিও ফুরুলো...

কি? শেষটা ও জানা চাই? ...

এই তো মুস্কিলে ফেললে বাপু, শেষ আবার কি?

তা শোনো, বাদল কে তো ডি. এম. সাহেব নিজেই সেদিন বিকেলে তার বাংলো তে ডেকে পাঠালেন...

বাদল তা আগে থেকেই জানতো বৈ কি কেননা তখনি সেই জিনিয়াস ছেলে লজিক্যাল ডিডাক্সন বেশ শিখে ফেলেছিল আমার কাছে থেকে।

আসল জিনিস তো পাওয়াই যায়নি তখন পর্যন্ত। বৌয়ের গাল মন্দ আর কত খাবেন তিনি? হলেই বা ডি.এম. সাহেব, আর চোররা মার খেয়েই বলবে কি?

তাদের ও তো চোখ ছানা বড়া ...হার উধাও...চোরের ওপরে কেউ বাটপাড়ির নির্দোষ কর্মটি যে ইতিমধ্যে সুসম্পন্ন করে ফেলেছে কখন তা তারা ও বলতে পারে নি হাজার মার খেয়েও ...

আমি আবার ছেলেটাকে বেশ করে সাজিয়ে গুজিয়ে নিয়ে গেলুম। গেট খুলে গেলো আমরা যেতেই সাঁ করে বিনা বাধায়।সব পাহারাদারেরা দেখি স্যালুট ঠুকছে খটাস করে। মজা মন্দ নয় তো। লাঠি নিয়ে তাড়া করে যারা তারা যদি স্যালুট ঠোকে দেখামাত্র তাহ’লে কার না মজা লাগে বাপু?’

সেখানে স্বয়ং ডি.এম. সাহেব এসে আমাদের অভ্যর্থনা করে নিয়ে গিয়ে ড্রয়িং রুমে বসালেন। সে কি জল খাবারের ঘটা রে বাবা। উর্দি পরা চাপরাসীরা দল বেঁধে আনছে তো আনছেই। চার জনের জন্যে দশ জনেরও বেশি জিনিষ আসছে।ডি.এম.সাহেবের টি পার্টি বলে কথা। সে কি সোজা কান্ড হয় কখনো?

বাদল উঠে শুধু বললো –‘স্যার, আমি কিন্তু ভেরী সরি। মালাটাতে পঁচিশটা মুক্তো ঠিক ছিলনা হয়তো, মানে আমি খুঁজে পাইনি... মাত্র তেইশটা পেরেছি উদ্ধার করতে। এতে যদি অপরাধ না নেন আপনি স্যার’…

এই বলে পকেট থেকে একটা আসল ঝকঝকে মুক্তোর মালা বার করে এগিয়ে দিলো ডি.এম.সাহেবের দিকে ডান হাতে করে। দ্যাখো ছেলের কান্ড।

তিনি তো তাই না দেখে এক্কেবারে চমত্কৃত, সাথে আমরাও ।

মিসেস ডি.এম. ও আল্হাদে আটখানা যেন।বললেন -‘তবে তাই ছিলো মাই সন, ডোন্ট ওয়ারী, নাও আগে খেয়ে নিয়ে সব বলে ফেলো তো দেখি লিটল বন্ড কি করে কি অন্বেষণ করলে’।

শুধু একটু জুস পান করে বাদল বললো -‘আমি তো বেশী কিছু জানিনা, করিও নি। আমার এই কাকুর কাছে যা শিখেছি, সেই মতন একটু খুঁজে দেখেছি মাত্র আমি।চঞ্চল যখন আমাকে সেই জায়গাটা দেখিয়ে দিলো যেখানে হারটা চুরি হয়, সেখানে বসে পড়ে দেখলাম যে এক টুকরো পেস্ট্রি মাত্র পড়ে আছে আর কিছুটি নেই। তখন চারদিকে হামা দিয়ে খুঁজতে লেগে গেলুম অনেক খুঁজে উত্তর দিকে একটা মুক্তো পেয়ে সেই দিকে চললাম লনের ঘাস জমি পার হয়ে, হারটা ছিঁড়ে পড়ে গিয়েছে মনে করে।

লন পেরিয়ে ও কোথাও একটু ধুলো নেই বলে পায়ের দাগ ও নেই কিন্তু পেস্ট্রিটার দাগ ছিলো খুব হালকা তবে চটচটে ভাবটা ছিলো বলে অনুসরণ করা সহজ হয়ে ছিলো। আমি সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠে যাই সোজা চঞ্চলের সাথে ও একটা ঘরের সামনে গিয়ে দাঁড়াই।

দরজা তালা বন্ধ দেখে চন্চলকে চাবি আনতে পাঠাই কিন্তু সে ওই ঘরের তলার চাবিটা রিঙ থেকে খুঁজে আনতে পারেনি, কেননা চাবি উধাও। তাই কিছু একটা ভারী জিনিস আনতে বলি তালা ভাঙ্গবার জন্যে।চঞ্চল একটা বড় খুরপি মতন কি নিয়ে এল তাই দিয়ে অনেক কষ্টে তালা ভেঙ্গে আমরা তো ঘরে ঢুকে গেলাম কিন্তু তারপরে হাঁ করে থাকতে হলো।

ঘর শূন্য, শুধু আছে প্যান্ডেল সাজিয়ে বেঁচে থাকা গাস বেলুন গোটা তিরিশেক আর একটা গাস সিলিন্ডারমাত্র ।

কি যে করি তা মাথাতেই এলো না, দু’জনে ঘরে চক্কর দিতে লাগলাম আমরা

হঠাৎ সেই ঘরের এক কোনে একটা সুতো পেলাম। কিসের যে সুতো তা মাথাতে না এলেও মনে হলো যে এই কেসের হয়তো এটাই একমাত্র সূত্র।তখনি ইনসাইট ফ্ল্যাশ করলো মাথাতে মায়ের কৃপাতে। চঞ্চলকে বললাম –‘তুই শিগগির বাইরে যা আর পাহারা দে দরজাতে। কেউ আসছে দেখলেই শিষ দিবি। আমাকে একটা দারুণ এক্সপেরিমেন্ট করতে হবে এবারে এখুনি ...কুইক’।

চঞ্চল চলে যেতেই আমি টর্চের আলোতেই একটা বেলুন টেনে নিয়ে তার সুতো খুলতে লাগলাম খুব সাবধানে ....বেলুনের মুখ চেপে রেখে ধীরে করে সব গ্যাস বার করে দিলাম আর চোপসানো বেলুনের মধ্যে থেকে তখন আমি খুঁজে পেলুম একটা মুক্তো।

এইভাবে বাইশটা মুক্তো পেতে অনেক সময় গেলো আমার।সব বেলুন খুলতে হলো, শেষে সে’গুলোতে আবার করে গ্যাস ভরে দিয়ে যেমন ছিলো বেলুনের ঝাঁকটা ঠিক তেমনি করে রেখে দিলাম আমি।

কিন্তু তালাটা নিয়ে মুস্কিল হ’লো যে সেটা আর তখন বন্ধ করা গেলো না তাই একটা অন্য তালা চঞ্চলকে দিয়ে আনিয়ে নিয়ে তাই বন্ধ করে দিলাম আর রাতে সেই তালাটা চাবি সমেত ঠিক হবার পরে আমি গিয়ে সবাই ঘুমিয়ে পড়লে বদলে দিয়ে এলাম নইলে সকালে ঘর খুলতে না পারলে কারো ঠিক সন্দেহ হবে এই ভয়ে আর মালাটাও একটা অন্য সক্ত মজবুত সুতোতে গেঁথে ফেললাম নইলে মুক্তো গুলো হারিয়ে যাবার ভয় তো ছিলই ...তারপরে এসে শুয়ে পড়লাম রাতে।

সকালে যেই ট্রাক নিয়ে এসে অন্য সব জিনিসের সাথে বেলুনও তুলে নিয়ে তারা এগিয়ে গেলো আমি ও চঞ্চলের মোপেড নিয়ে তাদের পিছু নিলাম।অনেক দূর গিয়ে যে বাড়িতে কথা ঠিক করা ছিলো যে তারা গ্যাস বেলুন গুলো সব কিনে নেবে, সেখানে গিয়ে বেলুনের পুরো ঝাঁকটাই বেচে দিলো নগদ একশো টাকাতে আর ট্রাক নিয়ে চলে গেলো।তাদের আর আপত্তির কি হবে বেলুন কেউ কিনে নিলে?

তবে তখনি পুলিশের ভ্যান এসে গেলো সেখামে আর পুরো বাড়িটা ঘেরাও করে ফেলে বাড়ির সব্বাইকে গ্রেফতার করে নিয়ে গেলো।সেই হই হই কান্ড দেখে আমি আমার মোপেড নিয়ে পালিয়ে এলুম বাড়িতে, পুলিশের ডান্ডার ভয়ে।

তারপরের কথা তো সবাই জানেই’।

বাদল চুপ করলো। মিসেস ডি. এম. এসে বাদলকে খুব আদর করতে লাগলেন আর ছেলে লজ্জা পেয়ে এসে আমার পিছনে শরণ নিলো।ডি. এম. সাহেব হো হো করে হেসে উঠলেন তাই দেখে।

বললেন –‘ জিনিয়াস ছেলে বটে তুমি নইলে আমার স্বীকার করতে লজ্জা নেই যে পুলিশ তো কি এই দুর্বুদ্ধি ধরতে আমি নিজে ও পারতাম না কিছুতেই।কি চালাক চোর রে বাবা? সে ঠিক জানতো যে চুরি করে পালানো যাবে না কোনো মতেই হার সঙ্গে নিয়ে আর তার দরকারই বা কি? পরের দিন বেলুন গুলো তিন ডবল দাম দিয়ে কিনে নিলেই তো হয়ে গেলো।

একটা হয়তো চর সব নজরে রেখে ছিল যে বেলুন ঠিকমতন পাওয়া গিয়েছে কিনা।

ডেকোরেটরের কে পুলিশে কখনই আটকাবার কথা ভাবতেও পারবে না শুধু শুধুই বিনা কারণে।তারা তো নিজেদের জিনিষপত্র নিয়ে যাবেই। বড়ো জোর তল্লাশি করা হবে তা হোক গিয়ে।মানুষ বা ট্রাকের অন্য সব জিনিসেরই না তল্লাশি হয়? বেলুনের তল্লাশির কথা কে কবে শুনেছে বা জানে?’

‘আমি কাল বাদলকে নিজে থেকেই একটা বিশেষ পুরস্কার দেবো সভা করে ও সরকারকে রিকমেন্ড করবো পড়বার জন্যে এই ছেলেকে স্কলারশিপ দিতে আর এস. পি. সাহেব কে বলবো যেন বিশেষ পদোন্নতি দেওয়া হয় এই ছেলের কাকাকে’।

হায় রে বরাত আমার?

ডি. এম. সাহেব বাদলকে চঞ্চলের খুড়তুতো ভাই টাই ভেবে নিয়ে আমাকে এক্কেবারে বাদ দিয়ে দিলেন তবে প্রেসের কল্যাণে পরদিন বাদল আমার পরিচয় টয় সব দিতে আমারও খুব নাম হয়েছিল।

কাগজে ছবি ও ছেপেছিলো আমার আর তারপরে তো একের পর এক কি বলে যে সেই এন. জি. ওর. দল এসে বাদলকে পুরস্কার দিতে শুরু করে দিয়েছিলো এমনকি কয়েকটা টি. ভি. চ্যানেল ও এসে পর পর বাদলের আর সেই সঙ্গে আমার ও ইনটারভিউ নিয়ে ফটো তুলে এমন জ্বালাতন শুরু করে দেয় যে নামের ঠেলায় নাওয়া খাওয়া ভুলিয়ে ছাড়লো আমার।

তখন বাবা রে মা রে ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি একটু ভ্যাঁ করে এই না বলে অপরূপ সুন্দর ছেলে বাদলকে সঙ্গে নিয়ে আমি দে’ চম্পট।

দিন দশেকের মতন গা ঢাকা দিয়ে আমাদের পালিয়ে গিয়ে থাকতে হয়েছিল সেবারে এক্কেবারে সেই নিশিকান্তপুরে, যেখানে চঞ্চলের মামার বাড়ি সেই অজ গ্রামেতে গিয়ে।কি আর করা? ...


অধ্যাপক (ড:) জি. সি .ভট্টাচার্য, বারাণসী ,উত্তর প্রদেশ



Enhanced by Zemanta