গ্রামের নাম অকালপোষ - তাপসকিরণ রায় | Gramer Naam Akalposh - A Short Story by Tapas Kiran Ray - WBRi Online Bengali Magazine

The Bengali short story "Gramer Naam Akalposh" is perhaps of special interest to children, tweans and teens, writes the author Tapas Kiran Roy. Roy is writing for a couple of years now and he has been published across various online Bengali magazines including Ichchamati, Joydhak, Diala Kochikancha, Banglalive, Tilottama Bangla, Madhukari, Parabaas and our own WBRi Online Bengali Magazine. The author can be reached at tkray1950 [at] gmail [dot] com. This Bengali story (Bangla Golpo) is reproduced in Unicode Bengali font.

You can send your stories, poems and creative writing for publication in our online magazine section by e-mail to submissions [at] washingtonbanglaradio [dot] com.


গ্রামের নাম অকালপোষ

তাপসকিরণ রায়


আমি আর আমার মাসতুত দাদা পৌঁছালাম অকালপোষ গ্রামে।

গ্রীষ্মের অবকাশ ছিলো।আমি ক্লাশ ফাইব,খোকনদা ক্লাশ সেভেনে পড়ে।আগে থেকেই সব ঠিক ছিলো।আমি কালনায় খোকনদার  বাড়ি,মানে,বড় মাসির বাড়ি যাবো।তারপর সেখন থেকে যাবো ছোট মাসির চাকরির স্থলে--অকালপোষ গ্রামে।

গরমের ছুটি পড়ে গেলেও আমরা যাবো বলে ছোট মাসি চার পাঁচ দিন থেকে গেলেন সেখানে।

যথা সময় দুজনে দুই সাইড ব্যাগ আর এক ঝোলায় খাবার জল,গামছা এসব গুটিয়ে পৌঁছালাম গ্রাম অকালপোষে।

প্রকৃতির কোলে সবুজ গাছ পালায় ঘেরা গ্রামখানি।এ জাগার মাটিও নাকি খুব উর্বর।সে কারণে ফসল খুব ভালো হয়।গ্রামের ঘরগুলির আশপাশের খেতে ভরে থাকে নানা রকমের তরিতরকারি।

বেশ সম্বৃদ্ধ গ্রাম।নামেই তার ইঙ্গিত পাওয়া যায়।সব জাগায় যখন অকাল,মানে অভাব,তখন চলতে থাকে এ গ্রামে পোষ মাস,মানে সম্বৃদ্ধি--খাওয়া পড়ার কোনো অভাব নেই।তবে একেবারে অজ পাড়াগাঁ বলা যায়।অনেক দূর পর্যন্ত যাতায়াতের সাধন নেই বললেই চলে।

আমরা বাস থেকে নেমে টানা এক কিলোমিটার হেঁটে পৌঁছালাম গ্রামে।

ছোট মাসি আমাদের অপেক্ষাতেই ছিলেন।যেতেই বলে উঠলেন,পথে কিছু অসুবিধা হয় নি তো?তোরা একটু বিশ্রাম কর।তারপর স্নান করে খেয়ে নে।অনেক বেলা হোয়ে গেছে।তোদের নিশ্চয় খিদে পেয়ে গেছে!

--কোনো অসুবিধা হয় নি,বলে আমরা মাসিকে প্রণাম করলাম।

খেয়ে দেয়ে দশ মিনিট বিশ্রাম করে দুজনে বেরিয়ে পড়লাম গ্রাম দেখতে।

সত্যি,ছবির মত গ্রাম!যেমন খেত ভরে আছে ফসলে,তেমনি ঘরের আশপাশের জাগা ভরে আছে নানা শাকসবজি তরিতরকারিতে!জমির আল জুড়ে এখানে ওখানে দাঁড়িয়ে আছে অনেক খেজুর গাছ।খেজুর গাছে এসময় রস হয় না।তবু দেখলাম,কোনো কোনো গাছের আগায় টানানো মাটির হাঁড়ি!আমরা তাকিয়ে থাকলাম হাঁড়ির দিকে,দেখার চেষ্টা করতে লাগলাম রসের ফোঁটা হাঁড়িতে পড়ছে কি না!

--হ্যাঁ,দেখ,দেখ,রস পড়ছে,উত্সাহ নিয়ে বলে ওঠে খোকন দা।

--কিন্তু দিনের রস নাকি তাড়ি হয়?আমি প্রশ্ন করি।

--আমরা দিনের রস খাবো কেনো?খোকন দা বলে।

আমি বলি,আমাদের রস দেবে কেনো!

--কি রে তুই,তোর আনন্দ লাগছে না!মনে হচ্ছে না গাছে চড়ে রস খাই?খোকন দা উত্সাহ ভরে বলে ওঠে।

--আমি গাছে উঠতে জানি না,বলে চুপ করে থাকলাম।

--আমি তো জানি!দ্বিগুন উত্সাহ নিয়ে বলে ওঠে খোকন দা।

--কিন্তু না বলে রস খেলে চুরি করা হবে না?আমি বলি।

--আরে তুই জানিস না,ছোট মাসি এখানকার টিচার না!তাঁর বোনপোদের গ্রামের লোক কেউ কিছু বলতে পারে!আমায় ব্যাখ্যা করে বলে খোকন দা।

আমি বলি,কে জানে বাবা,আমার ভয় লাগছে খোকন দা!

--দূর,তুই ভীতুর ডিম!তুই কেবল আমার সঙ্গে সঙ্গে থাকবি।যা করার করবো তো আমি।

জল্পনা কল্পনা করে ঘরে ফিরছিলাম,দেখলাম,আরে বাস,ঘরের পাশের  জমিতে কত বড় বড় মুলায়েম মূলো হোয়ে আছে!এক জাগায় জমিতে অনেক লাউ,কুমড়ো হোয়ে আছে।সেগুলি দেখলে কত সতেজ,হৃষ্টপুষ্ট মনে হচ্ছে।খেত ভরা এমন ঢাউস ফুলকফি,বাঁধাকফি হোয়ে আছে যা কোনো দিন চোখে দেখিনি!আমাদের চোখ,মন যেন জুড়িয়ে গেলো!আমরা রাণাঘাট,কালনা,ছোট শহরে থাকি।বাজারে এত ভালো টাটকা সবজি কখনও দেখি নি!যত দেখছি ততই যেন মন ভরে যাচ্ছে।

হঠাৎ খোকন দা বলে ওঠে,বড় লোভ হয় রে!মনে হয় নিজের হাতে তুলি।

--বললে গ্রামের লোকে তুলতে দেবে?আমার প্রশ্ন।

--কেন দেবে,কেউ বললে তুলতে দেয় ?খোকন দা আমার দিকে প্রশ্ন ছুঁড়ে মারে।

--না বলে কি করে তুলব?আচ্ছা মাসির নাম করে যদি তুলতে দেয়,তা হলে?আমি প্রশ্ন করি।

--আরে ওসব লেঠা ছাড়,আমরা আজ রাতেই আমাদের ইচ্ছা পূর্ণ করবো।হেসে খকনদা বলে।

আমি আবার বলে উঠি,তার মানে চুরি!

--আবার এক কথা,বলেছি না আমাদের মাসি একানকার টিচার,কেউ কিছু বলার নেই,খোকনদা বুক চিতিয়ে লেকচার দিয়ে যেতে লাগলো,দেখ সব জিনিস সোজাসুজি করতে ভালো লাগে?ঘরে যেমন আমরা চুরি করে খেতে বেশী ভালো বাসি--এখানেও তাই,নিজের কৃতিত্ব না ফলিয়ে সোজাসুজি কিছু করতে ভালো লাগে না!

রাতে আমাদের অভিযান শুরু হোয়ে গেলো।আমার হাতে তিনটে ব্যাগ।মাসিকে না বলে খুঁজে পেতে বের করে ছিলাম।

আগে খেজুর গাছে হানা দিলাম।লম্বায় ছোট খেজুর গাছ,তাও দশ বারো ফুট উঁচু তো হবেই।খোকনদা তরতর করে গাছে উঠে গেলো।আমি নিচে,দেখি হাঁড়ি উপুড় করে রস খাবার চেষ্টা করছে খোকন দা।আমি বললাম,সব খেয়ে নিও না যেন!দেখি দু পা ফাঁসিয়ে দু হাতে হাঁড়ি ধরে ধক ধক করে সবটা মেরে দিলো!তারপর আমার দিকে তাকিয়ে বলল,তুই অমন হাঁ করে আছিস কেনো?দাঁড়া,আরও গাছ আছে তো!

কোনো হাঁড়িতেই বেশী রস নেই।তিন হাঁড়ি মিলিয়ে আমি এক গ্লাসের মত রস পেলাম।চোঁ চা করে সবটা মেরে দিলাম।গরমের দিনের রস হলেও মিষ্টি ছিলো খুব!

খোকনদা নিজের কাজের জন্যে গর্ব ভরে বলে উঠলো,কি,কেমন লাগলো--এ অসময়ের মিষ্টি রস?

আমি হাসলাম শুধু।

--এবার চল,তোর ব্যাগ ভরি,বলে আমার হাত থেকে দুটো ব্যাগ নিল।

আমি চললাম খোকনদার পেছন পেছন।মাঝে মাঝে এদিক ওদিক তাকাচ্ছিলাম,আমাদের কেউ দেখছে না তো!চোর,চোর বলে কেউ তাড়া করবে না তো!ভয় এ জন্যে আরও বেশী ছিলো,কারণ,আমাদের কারো পেছনে টিচার মাসির লেবেল আঁটা নেই!

তবু বুঝতে পারলাম,অকালপোষ বড় শান্ত গ্রাম।রাতের ঘুম গ্রামবাসীরা বড় শান্তিতে ঘুমায়।

নরম মাটির মূলো,টপাটপ ধরো আর গোড়া উপড়াও।লাউ,কুমড়ো চার পাঁচটা ছিঁড়লাম।দুটো ব্যাগ ভরে গেলো।বাকী রইল আর একটা ব্যাগ।আমার মনে পড়ল,বললাম,আরে,ফুল কফি,বাঁধা কফি তো বাকী থাকলো!

--আরে,তাই তো,খোকন দা বলে উঠলো।

আমরা ছুটলাম ফুল কফি,বাঁধা কফির খেতে।ফটাফট গাছের গোড়া শুধু চার পাঁচটা কফি উপড়ে তুলে ঠেসেঠুসে ব্যাগে ভরলাম।খোকন দা আমার এক হাত খালি দেখে আর একটা ফুল কফি ছিঁড়ে ধরিয়ে দিলো আমার হাতে।

দুলতে দুলতে,কুঁথতে কুঁথতে,ভয়ে ভয়ে চোরের সতর্ক দৃষ্টি নিয়ে পৌঁছে গেলাম মাসির ঘরে।ব্যাগ থেকে বের করে সব কিছু মাসির খাটের নিচে রেখে দিলাম।সব কাজই চলছিল মাসিকে না জানিয়ে।

রাতে নাক ডেকে ঘুমালাম।পর দিন বেলা নটায় ঘুম ভাঙ্গলো।তাও মাসির চেঁচামেচিতে,তোরা করছস কি?আমারে চোর সাজাইবি!এখনি গ্রামের লোকজন আইবো।মাসি তো মাথায় হাত দিয়ে পড়লেন,বলে ওঠেন,আমার সম্মান ধূলায় লুটাইলো রে!তোরা কি কাম করলি রে!

অনেক হা হুতাশের পর একটা সমাধানে আসা গেলো।ঠিক হলো যার যার ঘরের জিনিস তার তার ঘরে গিয়ে আমাদের ফেরত দিতে হবে।তাও হাত জোড় করে,নিজেদের ভুল স্বীকার করে।

মাসির ভালো মানুষীর শিকার যে এমনি ভাবে হতে হবে আমাদের জানা ছিলো না।খোকনদার উপর খুব রাগ হচ্ছিল।অগত্যা তরিতরকারির ব্যাগ নিয়ে মাসির সঙ্গে আমাদের বেরোতে হলো।যে যে ঘর থেকে চুরি করেছি সব ঘরেই যেতে হবে।

এক এক ঘরে যাচ্ছি,আমার বোনপোরা অপরাধ করেছে,নিজগুনে ক্ষমা করে দেবেন ওদের!মাসি হাত জোড় করে বলে ওঠেন।সে সঙ্গে হাত জোড় করে আমরা ব্যাগ থেকে মূলো,লাউ,কুমড়ো বের করে রাখি।এমনি তিন তিন জাগায় হাত জোড় করে মাসি আর আমরা সবজি,তরিতরকারি সব ফেরত দিলাম।

মাসির অমায়িক ব্যবহার দেখে গ্রামের লোক আমাদের সবার ওপর গদ গদ হোয়ে গেলো!

সবাই বলল,ওরা বাচ্চা,ওদের নেওয়াটা কি আর চুরি করা হয়?

আমরা সবে মাত্র এসব কান্ড কারখানা করে ঘরে ফিরেছি,দেখি সব সবজি তরিতরকারি নিয়ে হাত জোড় করে ওরা ফেরত দিয়ে গেলো।

এর পর থেকে যত দিন ওই গ্রামে মাসি ছিলেন তাকে কোনো দিন শাক সবজি তরকারি কিনে খেতে হয়নি!

সমাপ্ত

Enhanced by Zemanta