কাল্টু, আমার কুকুর - তাপসকিরণ রায় | My Dog Kaltu - A Bangla Short Story by Tapas Kiran Ray - WBRi Bangla Online Magazine

The Bengali short story "Kaltu - Amar Kukur" (My Dog Kaltu) is partially based on his own real-life experience and written with teenagers in mind, writes the author Tapas Kiran Roy. Roy is writing for a couple of years now and he has been published across various online Bengali magazines including Ichchamati, Joydhak, Diala Kochikancha, Banglalive, Tilottama Bangla, Madhukari, Parabaas and our own WBRi Online Bengali Magazine. The author can be reached at tkray1950 [at] gmail [dot] com. This Bengali story (Bangla Golpo) is reproduced in Unicode Bengali font.

You can send your stories, poems and creative writing for publication in our online magazine section by e-mail to submissions [at] washingtonbanglaradio [dot] com.



কাল্টু, আমার কুকুর

তাপস কিরণ রায়

শিক্ষকতা করতাম উড়িষ্যার মালকানগিরি নামক এক জাগায়।দন্ডকবন প্রকল্পের ভিতরেই বাঙালী বসতির বেশ কিছু গ্রাম ছিলো এখানে।জাগাটা কোরাপুট জেলার মালকানগিরি নামক স্থানে অবস্থিত।স্থানীয় অঞ্চলের নাম পটারু।বহু বছর আগে থেকে এ নাম চলে আসছে--স্থানীয়  আদিবাসীদের দেওয়া নাম।

সুন্দর জাগা।চারিদিকে ঘেরা জঙ্গলের মাঝখনে মাঝখানে বসে আছে একেকটা গ্রাম।সবুজের সমারোহ।গাছের মধ্যে আছে সাল, সেগুন,মহুয়া, বহেরা,হরীতকী,তেন্দু--মাঝে মধ্যে এক আধটা ঝর্ণা ঝরঝর কুলকুল রবে বয়ে চলেছে।গ্রাম থেকে কাছে ও দূরে,প্রায় চারিদিক ঘিরে আছে ছোট বড় পাহাড়।কাছের পাহাড়গুলি ঘিরে আছে নানা গাছ-গাছলায়।আর বহু দূরের যে সব পাহাড়গুলি দেখা যাবে সে গুলির রং প্রায়ই কালচে,আসলে অনেক দূরের পাহাড় বলে তার ওপরের গাছ-পালা, নদী-নালা,ঝর্ণা কিছুই ঠাওর করা যায় না।

আমরা আর পাঁচ শিক্ষক পরিবার স্কুল বাউন্ডারির মধ্যে কুয়াটার্সে থাকি।জাগার প্রাকৃতিক পরিবেশ খুব সুন্দর।আঁকা বাঁকা পথ কোনটা বনবীথি,কোনটা শুধু পা চলার লাল মাটির সরু পথ বন বনান্তরে চলে গেছে।একটা মাত্র পাকা রাস্তা উঁচু নিচু পাহাড় পর্বত কেটে কখনো  সমতলে,কখনো ঢেউ খেলে চলে গেছে দূর দূরান্তের শহর,গ্রামে।

স্কুলের অনতি দূরে সুন্দর পাহাড়ী এক নদী--নাম তার পটারু।জল তার পাথর নুড়ি ভেঙে ভেঙে কোথাও ঠুং ঠাং আবার কোথাও কল কল,ছল ছল শব্দ করতে করতে এগিয়ে চলেছে ঢালানের দিকে।এ নদী কোথাও ঝর্ণা হোয়ে গড়িয়ে চলেছে পাহাড়ের নীচে,কোথাও সে ছুটে চলেছে দুর্গম বন্ধুর পথ ধরে।অবশেষে সে মিশে গেছে গোদাবরী নদীতে।

পটারু নদীতে প্রত্যেক ছুটির দিনগুলিতেই স্নান করতে যেতাম সপরিবারে। জল বেশী নেই--এমনি হয়--দেখা গেলো সকালের নদী প্রায় সুকনো,আবার বিকেলে ভরা নদী বয়ে চলেছে!পাহাড়ী নদীর এমনি  চরিত্র!সুদূর এলাকায় কোথাও সামান্য বৃষ্টি হলো,তাতে জলস্তর তার বেড়ে যেত।বর্ষার নদী থাকত বেশ স্বাস্থ্যবান--ফোলা ফাঁপা।কখনো  উচ্ছ্বলতায় পার ভাঙত, আশপাশের নীচু গ্রামগুলি ভাসিয়ে নিয়ে যেত।গ্রামের লোকেরা পাশেই কোনো উঁচু জাগায় তাদের ঘরের জিনিস পত্র রেখে দিত,বেশী দূরে তাদের স্থানান্তরিত হতে হতো না।এক আধ দিন রংগ রস করে আবার যেই কে সেই,নদীর জল যায়কমে।গ্রামের জীবন যাত্রা আবার স্বাভাবিক হোয়ে ওঠে।নদী যেন এখানে হেসে খেলে নেচে গেয়ে ফুলে ফেঁপে--আবার কখনো অনাহারী চিমসে পেট নিয়ে বয়ে যায়।সেই নদী থেকে স্নান সেরে আমি আমার স্ত্রী,আর ছোট দুই মেয়ে ঘরে এসে পৌঁছালাম।

দেখি ছোট্ট একটা কুকুরের বাচ্চা।আমাদের তালা লাগা বন্ধ ঘরের দরজায় শুয়ে আছে।আমাদের দেখেই ও উঠে দাঁড়ালো।আর বেশ পরিচিতের মত কুঁই, কুঁই,করতে লাগলো।

সময়টা ছিলো বর্ষাকাল,গত কাল নদীতে বেশ জল বেড়ে গিয়ে ছিলো, আশপাশের কয়েকটি গ্রাম ভেসে গিয়েছিল।আজ সে জল নেই নদীতে,সারা দিন বর্ষাও হয়নি,হালকা রোদ উঠে এসেছে। কুকুরের বাচ্চাটা নিশ্চয় কোনো ডুবে যাওয়া ঘরের হবে,বেচারা জল প্লাবন দেখে অন্ধের মত ছোটা ছুটি করে অবশেষে এই অজ্ঞাত বাসে এসে পৌঁছেছে!

কুঁই,কুঁই,কুঁই,মনে হলো বাচ্চাটার খিদে পেয়েছে।কেমন অসহায়ের মত আমাদের মুখের দিকে তাকিয়ে কাঁদছে।আমার দুই মেয়ের খুব আনন্দ হলো কুকুরের বাচ্চা দেখে।ওরা কাছে এগিয়ে গেল ধরতে।

--এই না,না,ধরবি না,কামড়ে দেবে,আর বন বাদার কোথা থেকে না কোথা থেকে এসেছে--নোংরা!আমার স্ত্রী তাড়াতাড়ি বলে ওঠেন।

আমি গৃহপালিত পশু পাখী খুব পছন্দ করি।আমি দেখলাম ছোট্ট বাচ্চা, দেখতেও খুব সুন্দর।চেহারা নাদুস নুদুস।গায়ের রং সাদায় কালোয়।যদিও কালোর ভাগ বেশী,পেটের দিক সাদা।পায়ের নীচের দিক সাদা,বাকি শরীর মুখ কালো।তবে একটা বৈশিষ্ট ছিলো কপালে,কালোর মধ্যে কপালে তার  সাদা বৈষ্ণব তিলক আঁকা!সব কিছু মিলিয়ে সত্যি কুকুরের বাচ্চাটা খুব সুন্দর!

বাচ্চাটার দিকে এগিয়ে গেলাম আমি।স্ত্রী আবার কিচ কিচ করে উঠলেন,কি করছ,কি করছ তুমি! নোংরাটাকে ধরতে যাচ্ছ কেন?

কুঁই কুঁই কুঁই,বাচ্চাটা আমার দিকে মুখ উঁচু করে এগিয়ে এলো, আমি স্ত্রীর কথা আর মানতে পারলাম না,তার গায়ে হাত দিলাম।মেয়েরা বাচ্চার কাছে এসে বলল,বাবা,কি কিউট,আমরা বাচ্চাটা রাখতে পারি?বাচ্চাটা আমাদের সবাইকে ঘিরে ঘুরতে লাগলো আর লেজ নাড়তে লাগলো।

--না ,না,ওসব হবে না,আমর স্ত্রী বলে উঠলেন,ও সব ঘরে তুলতে পরবো না,কথা কটি বলে স্ত্রী আমার সোজা বাথরুমে ঢুকে গেলেন। তিনি কুকুর, বিড়াল পালতে চান না।তাঁর কাছে কুকুর বিড়াল ভালো,কিন্তু তাদের গু ভালো না।কথাটা তিন সত্যি সন্দেহ নেই।

আর এদিকে আমরা বাপে মেয়েতে, কিউট বাচ্চাকে আদর করে চটকাচটকি করে ওর গলায় পরিয়ে দিলাম ফাঁস।আমার তত্পরতা দেখে মেয়েরা খুব খুশি হলো,মেয়েরা বাবার মত পশু পাখী খুব ভালোবাসে।

ঘরে টেনে তুললাম কুকুরের বাচ্চাকে।জালানার শিকে রশি দিয়ে বেঁধে দিলাম।এর পরের সমস্যা এখন সামাল দিতে হবে,মেয়েদের মার উপর নির্ভর করছে বাচ্চাটা আমাদের ঘরে থাকতে পারবে কি না!বাচ্চাটা তখন পেছন দিকের গলার রশির টান সামলে আমাদের কাছে আসার জন্যে সামনের দুপা তুলে লাফাচ্ছে।কখনো গোঁ,গোঁ, কখনো উঁ,উঁ,আবার কখনো কান্নার মত ডেকে উঠছে।

স্ত্রীকে দেখালাম,এই দেখ,বাচ্চাটা কত সুন্দর,নাদুস নুদুস,মুখটা লম্বাটে ধরণের,কেমন তিলক ধারী দেখ! আমার কথার সঙ্গে সঙ্গে অদ্ভুত ভঙ্গি করে বাচ্চাটাও মুখ ঘুরিয়ে আমাদের দেখে যাচ্ছে!মাঝে মাঝে একটু একটু লাফাচ্ছে আর কুঁই,কুঁই,করছে.ছোটো বাচ্চা--কার না ভালো লাগে,স্ত্রী কিছু সময় বাচ্চাটাকে দেখতে লাগলো,ওর লাফ ঝাপ,নানা রকম বাচ্চামি খেলা আর আওয়াজে ওর প্রতি কি ভাবে যেন তাঁর দয়ামায়া এসে গেল। 

বললেন,রেখেছ,ঠিক আছে,ওর গু কিন্তু তুমি পরিষ্কার করবে!

স্ত্রীর এক কথায় আমি রাজি হয়ে গেলাম।মেয়েরা আমার নেচে উঠলো, তাদের মাকে জড়িয়ে ধরল।আহ্লাদে বলে উঠলো,তুমি না আমাদের খুব ভালো মা!

ছোটো কুকুরের বাচ্চা এখনো মার দুধ খায়,আমাদের দেওয়া খাবার তো অনেক খেয়ে নিয়েছে।একবার আমি,একবার বড় মেয়ে,এক বার ছোটো মেয়ে,যে যেখান থেকে যা যোগার করতে পারছি--দুধ,রুট,মাংসের টুকরো সব কিছু দেওয়া হলো তাকে।

দিন ভর ভালো ছিলো--আমাদের কারো না কারো সঙ্গে খেলে বেরিয়েছে। রাত্রে ওর কান্না আর থামে না,একা ঘরে ও থাকবে না। বেচারা মায়ের কুন্ডলী পাকানো শরীরের মাঝে এখন শুয়ে থাকার কথা,আর সেখানে একা গলায় রশি বাঁধা, ও আর কি এ ভাবে থাকতে চায়!যেই একা ঘরে ওকে ছেড়ে আমরা শুতে যাচ্ছি,ওমনি কেঁই,কেঁই ,কান্না জুড়ে দিচ্ছে।আমাদের দেখতে পেলেই আবার চুপ,আনন্দে লেজ নাড়তে থাকে।

ছোটো মেয়ে,তার চার বছর বয়েস,আধো মুখে বলল,বাবা, আমি আমার কাছে ওকে বিছানায় শুয়াবো?

--না বাবা, বিছানা খারাপ হয়ে যাবে,আমি বলে উঠি।

--কেন খারাপ হবে,ওকে তো সাবান দিয়ে স্নান করানো হয়েছে!আমার ন বছরের বড় মেয়ে বলে উঠলো।

--শত হলেও কুকুর কুকুরই হয়,বুঝেছ?ও হাগু করলে তুমি পরিষ্কার করবে?মা বলে উঠেন।তারপর আমায় বললেন,বুঝলে ওকে শোয়ার জন্য পুরনো কাপড় চোপড় দিয়ে বিছানা করে দাও।

স্ত্রীর এ কথায় আনন্দ পেলাম আমি,যে কুকুর ঘরের ধারে কাছে ঘেঁষতে দেন না,সব সময় দূর,দূর করেন, তিনি বাচ্চাটাকে শোয়াবার জন্য এ হেন যত্নবান!

বাচ্চার শোয়ার জন্য কাপড় চোপড় এনে ভাঁজ করে ওর ছোটো বিছানা করে দেওয়া হলো।ওকে বললাম,এবার শুয়ে পড়গে।কে কার কথা শোনে, যতক্ষণ কেউ ওর সামনে বসে থাকে ও চুপ।যেই কাউকে দেখতে না পায়, কান্না জুড়ে দেয়।এও এক লেঠা,থাকবি থাক,খাবি খা,স্নান করাচ্ছি, খাওয়াচ্ছি,বিছানা পেতে দিয়েছি তারপর একি বিরক্তি!

রাত বাড়তে লাগলো আর তার অনবরত চিল্লিয়ে যাওয়া আর ভালো লাগছিল না।মনে হচ্ছিল ওর কান ধরে ঘরের বাইরে বের করে দিয়ে আসি।

কাগজের বাক্সে ওর বিছানা পাতা হোয়ে ছিলো।ওটা টেনে টেনে আমাদের খাটের কাছে নিয়ে এলাম,যাতে বাচ্চাটা আমাদের সবসময় দেখতে পায়।

এবার কাজ হলো--বাচ্চা চুপ হলো।দেখে মনে হলো চিল্লিয়ে ক্লান্ত হোয়ে পড়েছে।ঐটুকু বাচ্চা আর কত চীত্কার করতে পারে!

এভাবে সকাল হলো।আমরা একে একে সবাই ঘুম থেকে উঠে গেলাম। বাচ্চা বাবু দিব্বি ঘুমোচ্ছে আরামের বিছানায়!রাত ভর আমায় জালিয়ে দিন ভর এখন ঘুমাবে।

আজ ছুটির দিন,রবিবার,কি করা যায় ভাবছি,বড় মেয়ে এসে বলল, বাবা, কুকুরের বাচ্চার একটা ভালো নাম দাও।কি বলে ডাকব ওকে?

--হ্যাঁ,তা তো বটেই,নাম তো একটা চাই।চিন্তা করলাম,কুকুরের তো কত নাম হয়,জিমী,কালু,ডগী, লালু, আরও কত সব--রাজ্যের নাম।বড় মেয়ে বলে উঠলো,ওর নাম ব্লেকী রাখো।

দেখি স্ত্রীও এসে হাজির, আমাদের দেখে বলে উঠলেন,কি হচ্ছে বাপ মেয়েতে মিলে?

--একটা নাম রাখতে হয় কুকুরের বাচ্চার,বলত দু একটা নাম, স্ত্রীকে বলি।

স্ত্রী ঠাট্টা করে বললেন,নাম রাখার আগে পুজো টুজো করাও, ব্রাক্ষ্মণ ডাকাও,লোকজন নেমন্তন্ন করো,তবে না !

আমি বললাম,বলো না একটা নাম!

স্ত্রী বললেন,ছোট্ট,রাখো।

আমি বললাম,ঠিক ছিলো,কিন্তু ও তো কদিন পরেই বড় হোয়ে যাবে তখন!বোলে ভাবতে লাগলাম,কি নাম রাখা যায়।অনেক নাম মনে পড়ল,লাকী,ব্লেকী,জেকী--এসব নাম সব সময় পাওয়া যায়। ভাবছিলাম নতুন কোনো নাম হলে ভালো হয়।মনে মনে খুঁজতে লাগলাম--আচ্ছা,ব্লেক মানে কালো,আর কপালে ওর বৈষ্ণব তিলক,তিলক মানে টিপ জাতীয় কিছু।তাহলে মিলিয়ে হয়--কালো টিপ.না এটা নামের মত হলো না।কালো ভাবতে ভাবতে মনে হলো কালটা,না তাও ভালো লাগছে না।আবার ভেবে নিলাম কালো আর টি..প..টু..আচ্ছা কাল্টু ,হলে কেমন লাগছে?কানে মন্দ লাগছে না তো!তার মানে ধরে নিলে ক্ষতি নেই কালোর কাল,আর ওর কপালের বৈষবী টিপ মানে টিপকে বাচ্চারা কখনো বলে টুক,যেমন বলে চাঁদের কপালে চাঁদ টুক দিয়ে যা।সেই টুকের টু,নিয়ে হলো কাল্টু।শব্দার্থ, ব্যাকারণ আর ঘাঁটতে গেলাম না, সবাইকে বলে উঠলাম,আচ্ছা ওর নাম কাল্টু ,হলে কেমন হয়?মেয়েদের ভলো লেগে গেলো,ছোট মেয়ে হাততালি দিয়ে বাচ্চাটাকে ডেকে উঠলো,কাল্টু ,বলে। বাচ্চাটা ঘুম ভেঙে আমাদের দিকে তাকিয়ে থাকলো।

আমার স্ত্রী আমার দিকে তাকিয়ে বলে উঠলেন,নামটা তুমি ভালো দিয়েছ কিন্তু !

এই ভাবে আদরে আহ্লাদে কুকুরের বাচ্চা বড় হতে লাগলো।ও বাইরে থাকে না,ঘরে ওর বিছানা হয়।রোজ রাতে।রাতে আর কান্নাকাটি করে না।রাতে কেউ ঘরের আশপাশে এলে চীত্কার চেঁচামেচি করতে থাকে। কুকুরের রাতে পাহারা দেবার কাজ,সে ডিউটি সে নিয়মিত করে চলে। জঙ্গলের  জাগা,রাতে কোনো জন্তু জানোয়ারের চলাফেরার আভাস পেলে ও ঘেউ, ঘেউ করে সবাইকে জানান দেয়।

কেউ কাল্টু ,বলে ডাকলে,সঙ্গে সঙ্গে কাছে চলে আসে,কেন ডাকলে?--এমনি একটা প্রশ্নচিহ্ন নিয়ে তার চোখের দিকে তাকিয়ে থাকে।

আমার স্ত্রী কাল্টুকে মাঝে মোধ্যে শাসন করতে ছাড়তেন না।সে জন্য কাল্টু তাঁকে বিশেষ সমীহ করে চলতো।প্রায়ই খাবার সময় মজার ব্যাপার হতো,আমরা খাচ্ছি,কাল্টু রান্নাঘরের দরজার সামনে শুয়ে আমাদের খাওয়া নীরিক্ষণ করছে।আমার স্ত্রীর সেটা খুব খারাপ লাগলো,কুকুর লোভ দিলে নাকি খাওয়া হজম হবে না।তাই কাল্টুকে জোরে ধমক দিয়ে ওঠেন,কাল্টু ! সঙ্গে সঙ্গে ও  তার চোখদুটো বন্ধ করে থাকে,অর্থাৎ সে খাওয়ার দিকে তাকাচ্ছে না।একটু পরেই আমরা দেখি ও একটু একটু চোখ খুলে মিটিমিটি তাকাচ্ছে--আমরা ওকে দেখছি দেখলেই আবার চোখ বন্ধ করে নিচ্ছে। আমরা কাল্টুর  রগড় দেখে হাসতে থাকি, হাসিতে আমার স্ত্রীও যোগ না দিয়ে পারেন না।

কাল্টুর ঠাকুরের ঘরে প্রবেশাধিকার ছিলো না।ছোট থেকে এ বাধা নিষেধ তার ওপর আরোপ ছিলো।ছোট বেলায় ভুলে ঢুকে পরত,বড় হোয়ে সে ভুলটা সে কোনো দিন করেনি।এক দিনের ঘটনা মনে আছে,আমি ওকে স্নান করলাম,আমার সে দিন তাড়াহুড়ো ছিলো--টিচার্স মিটিঙে যেতে হবে।কাল্টুকে স্নান করিয়ে নিয়ে যাচ্ছি,ও যে ঘরে থাকে বাথরুমের দিকের সে দরজা কোনো কারণে বন্ধ ছিলো।আমি তাড়াতাড়িতে ওকে অন্য ঘর দিয়ে টেনে নিয়ে যেতে চাইলাম।কিন্তু একি!এত টানছি ও আসতে চাইছে না কেন! উল্টো আরও যাবে না বলে আমার ওপর গোঁ,গোঁ করছে।সাধারণ ভাবে কাল্টুকে যেখানে নিয়ে যাও লক্ষ্মীটির মত চলে যায়!এ ক্ষেত্রে এমন ব্যতিক্রম কেন!

এখন বেশ বড় হয়েছে,গায়ে জোর এসেছে,কিন্তু যত তার শিকল টানছি ও আসবে না,ঘরে ঢুকবে না।রাগ হলো আমার,শিকল ধরে গায়ের জোরে টেনে হেঁচড়ে মাঝ দরজা দিয়ে ওর ঘরে নিয়ে আসলাম।ও বেচারা শুয়ে ছেঁচড়ে ছেঁচড়ে প্রতিবাদের ভঙ্গিতে গলায় আওয়াজ তুলে অগত্যা নিজের ঘরে পৌঁছালো!

কাল্টুর চীত্কার চেঁচামেচি শুনে আমার স্ত্রী রান্নাঘর থেকে,কি হলো, কি হলো,বলে তাড়াতাড়ি বেরিয়ে এলেন।তখন কাল্টু নিজের ঘরে পৌঁছে গেছে।ঘটনা শুনে আমার স্ত্রী মাঝের রহস্য উজাগর করলেন,কাল্টু  ঠাকুর ঘরে কখনো ঢোকে না,আর আমি তাড়াহুড়োয় ওকে ঠাকুর ঘরের মেঝে দিয়ে নিয়ে আসতে গিয়েই ঘটল এই বিভ্রাট!ও নিজেই জানিয়ে দিল যে ঠাকুর ঘরে তার প্রবেশ অধিকার ছিলো না--ও অনধিকার প্রবেশ করতে চায়নি--আমরাই তাকে জোর করে তা করিয়েছি !

সত্যি অবাক হোয়ে গেলাম,ওর প্রতি আমার,বিশেষতঃ আমার স্ত্রীর ওর প্রতি অনেক স্নেহ,মমতা বেড়ে গেলো।

ওর নিয়মিত স্নানের অভ্যাস হোয়ে গিয়ে ছিলো।শনি,রবিবার আমরা নদীতে গেলে ও যাবার জন্য ব্যস্ত হোয়ে যেত।আর সবচে মজার কথা হলো,আমি যখন জলে নাবতে যাই ও নাবার জন্য তৈরী হোয়ে যায়।আমি জলের ভিতর একপা,দু পা নাবছি,তেমনটি করে ও জলে এক পা,দুপা করে নাবতে থাকে।আমি কাল্টুকে বেশ জলে টেনে নিয়ে নেমে যেতাম,ও ভয়ের বদলে আনন্দ বেশী পেত। বেশী জলে ছেড়ে দিলে সাঁতার দিয়ে উপরে উঠে যেত,ও যখন সাঁতার দিত আমার মেয়েরা হাততালি দিয়ে উঠতো।কাল্টু  তাতে খুব আনন্দ পেত।পারে সাঁতরে এসে আবার  সাঁতার দেবে বলে ঘেউ ঘেউ,করত--মানে আবার তাকে বেশী জলে ছেড়ে দিয়ে আসো। একবার করলাম কি ওকে তুলে নিয়ে ছুঁড়ে মারলাম বেশ জলে,প্রথম তো দেহের ভারে ও তলিয়ে গেলো জলের অনেক নীচে,মুহূর্তের মধ্যে মেয়েরা কাল্টু ডুবে গেছে ভেবে আঁতকে উঠলো,পর মুহুর্তে কাল্টু জেগে উঠলো জলের উপর।আর বাহাদুরের মত আমাদের দিকে তাকিয়ে সাঁতরে উঠে আসলো পারে।এমনি করে আমাদের স্নান খেলায় ওর যোগদান মহত্বপুর্ণ  স্থান নিয়ে ছিলো।

সব চে খারাপ লাগত আমরা যখন কখনো বাইরে বেড়াতে যেতাম।চাল ডাল কাজের লোকের কাছে দিয়ে যেতাম ওকে রেঁধে খাওয়াবার জন্য।ওকে বিস্কুট,পাউরুটি খায়ানোর জন্য কিছু পয়সাও দিয়ে যেতাম। স্কুলের চৌকিদারকে বলা থাকত ওর দেখা শোনার জন্য। সামার ভেকেশনের দীর্ঘ সময় ওকে কুয়াটারে রেখেই যেতে হত।

ও দেখত আমরা যাচ্ছি।প্রথমে আমাদের দিকে তাকিয়ে চীত্কার করত।তার পর ছোটো বাচ্চাদের মত ছোটো ছোটো শব্দ করে কাঁদত।কাঁদতে কাঁদতে পরিশ্রান্ত হয়ে গেলে চুপ করে যেত,কেবল চোখ দুটো জলে টলটল করত!

ছুটি কাটিয়ে কুয়াটারে ফিরে আসতাম।কাল্টু আনন্দে আত্মহারা হয়ে যেত, একটা বাচ্চা ছেলের মত নেচে নেচে আমাদের গায়ে লাফিয়ে উঠার চেষ্টা করত।আমরাও খুব আনন্দিত হতাম।ওর দিকে তাকিয়ে দেখতাম ও বেশ রোগা হয়ে গিয়েছে।আমাদের চিন্তায় আর খাওয়া দাওয়ার অনিয়মে ওর শরীর অনেক ভেঙে পড়ত।যতই হোক,কাজের লোক,চৌকিদার এরা কি নিজের লোকের মত দেখা শোনা করতে পারে!ওর দিকে তাকিয়ে আমার স্ত্রীও বলে উঠতেন,ইস বেচারা ঠিক মত খাওয়া দাওয়া না পেয়ে শুকিয়ে গেল,এর পর আমরা এত লম্বা টুরে যাবো না গো!

তারপর একদিন পটারুতে থাকার সময় ফুরিয়ে এলো।দণ্ডকারণ্য প্রকল্প বন্ধ হয়ে গেল।স্টাফদে সারপ্লাস করে কেন্দ্রীয় সারপ্লাস সেলে পাঠানো হলো।সেখান থেকে আমায় পুনর্বহাল করা হলো কেন্দ্রীয় সরকারের আয়কর বিভাগে।পোস্টিং হলো সুদূর মধ্য প্রদেশের জবলপুরে।আমায় চলে যেতে হবে বহু দূরে--অন্য আরেক রাজ্যে--আমারদের নিজেদের স্থিতি-স্থায়িত্ব নিয়ে বড় চিন্তিত ছিলাম।তার ওপর কাল্টুকে সেখানে নিয়ে যাওয়ার কথা চিন্তা করতে পারিনি।

তলে তলে মানসিক যন্ত্রণায় আমরা সবাই কাল্টুর জন্য কাতর হচ্ছিলাম। যাবার দিন যত কাছে আসতে লাগলো ততই বুকের ভেতর একটা বেদনা অনুভব করতে লাগলাম।গ্রামের অনেকেই কাল্টুকে রাখবে বলেছে।আমি একজনকে বলে রেখে ছিলাম আমরা চলে গেলে সে যেন ওকে রেখে নেয়।

সময় কারো জন্যে বসে থাকেনা,আমাদের যাবার দিন এসে গেল। ব্যাগ এন্ড ব্যাগেজের সঙ্গে পটারু থেকে চির বিদায়ের ক্ষণ এসে গেল।

কিন্তু এ কি!কাল্টু এত চুপ কেন!ও কেন কাঁদছে না,ও কেন শুধু আমাদের মুখের দিকে তাকাচ্ছে!ওর চোখ কি ছল ছল করছে? তাকিয়ে দেখলাম ওর চোখ সত্যি ছল ছল করছে।ও কিছু বলল না,বার বার আমাদের শুঁকতে লাগলো।লোক জন নিয়ে মালপত্র গোছ গাছ  করিয়ে বাসস্ট্যান্ড  পৌঁছালাম।যথারীতি কাল্টু আমাদের সাথে এলো,ও আজ এত নীরব কেন! কেন কাঁদছে না ও!ও তো জানে আমরা কদিনের জন্যই যাই,তখন ওর চীত্কারে আমরা টিকতে পারি না,কিন্তু আজ !

কাল্টুর গায়ে হাত বুলাতে বুলাতে মেয়েরা আমার কাঁদতে লাগলো।আমার স্ত্রী,কাল্টু,বলে ডেকে চোখে আঁচল চাপা দিলেন।

আমি হৃদয়হীন,বুকের যন্ত্রণায় ভিতরে ভিতরে ছটফট করতে লাগলাম। নীরবে কাল্টু আমাদের দিকে তাকিয়ে আছে,চোখের দুকুল বেয়ে তার জলের ধার নেমেছে।

বাস এসে গেল।আমরা উঠে গেলাম।বাসের পিছনের কাঁচ দিয়ে আমরা দেখতে লাগলাম--তাকিয়ে আছে কাল্টু আমাদের দিকে--সে কি করুণ  তার চাহনি!চোখে তার জলের ধারা!

আমাদের বাস ছেড়ে দিল।আমি দেখলাম,কাল্টু ছুটছে--বাসের পেছন পেছন...এক সময় আর না পেরে ও থেমে গেল...দেখলাম দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ও তখন নির্নিমেষে বাসের দিকে তাকিয়ে আছে…

সমাপ্ত

Enhanced by Zemanta