যদি হতাম - রতন লাল বসু (Jodi Hotam - A Bengali Short Story by Dr Ratan Lal Basu) | WBRi Online Magazine

Jodi Hotam by Ratan Lala Basu. This is a Bengali short story published in Unicode Bangla Font. 

যদি হতাম

রতন লাল বসু


মহানন্দা ব্রীজ পেরিয়ে হিলকার্ট রোড ধরে শিলিগুড়ি নর্থ স্টেশনের দিকে কিছুটা এগিয়ে রিক্সা ছেড়ে দিলাম। এবার হাঁটতে হবে। উত্তরের আকাশ মেঘ শুন্য। পড়ন্ত সূর্যের আলোয় কাঞ্চন জংঘার চূড়োগুলো ঝিকমিক করছে। তেনজিং নোরগে বাস স্ট্যান্ডের পাশের বট্ল পামের সারির ফাঁক দিয়ে পড়ন্ত সূর্যটা উঁকি ঝুঁকি মারছে আর হাওয়ায় দোদুল্যমান পামের পাতার সাথে লুকোচুরি খেলা জুড়েছে। রাস্তার বাঁ-ধার জুড়ে অসংখ্য ছোটবড় জামা কাপড়ের দোকান। একটা সুঁড়ি রাস্তা এঁকে বেঁকে ঢাল বেয়ে নিচের দিকে নেমে গেছে। সমীরদের বাড়ি যেতে হলে আমাকে এই রাস্তাটা ধরেই যেতে হবে।

ও-হো, আমি কে আর সমীরই বা কে তাতো বলা হয়নি। বিখ্যাত টি-ম্যাগনেট মৃগাঙ্ক চৌধুরীর নাম নিশ্চই শুনেছেন। আমি তাঁর একমাত্র সন্তান শৌভিক। শিলিগুড়ি ইস্টার্ন বাইপাসের কাছের একটা বিখ্যাত ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের দশম শ্রেণির ছাত্র। আমার মাকেও নিশ্চই চিনবেন। বিখ্যাত সমাজ সেবিকা নন্দিতা চৌধুরী। জলপাই মোড়ের কাছে বর্ধমান রোডের ঠিক পাশেই বিঘা খানেক জায়গা জুড়ে প্রাসাদের মত যে বিশাল বাড়িটা, সামনের বাগানে দেশি বিদেশি গাছপালা আর ফুলের সমারোহ, মাঝে একটা মার্বেলের পরীর মূর্তির চারপাশে ফোয়ারা – ওটাই আমাদের বাড়ি। বাড়িতে অসংখ্য চাকর-বাকর আর মালি রয়েছে। তবে আমার কোনো প্রাইভেট শিক্ষক নেই। শুনে হয়ত অবাক হচ্ছেন, কিন্তু কথাটা সত্যি। ক্লাশের পড়া শোনার পর আমি নিজেই সব পড়া তৈরি করে নিতে পারি। স্কুলের শিক্ষকরা বলেন, আমার মত ব্রিলিয়ান্ট ছাত্র নাকি আগে এ স্কুলে আর কেউ আসেনি। পড়াশুনা ছাড়াও আরো কিছু কারণে আমি বাবার পরিচয় ছাড়াই নিজের পরিচয় দিতে পারি। সর্ব ভারতীয় কুইজ, ডিবেট, আবৃত্তি, ছবি আঁকা ও রচনা প্রতিযোগিতার দৌলতে আমার বেশ নাম হয়ে গেছে। কয়েকটা টেলিভিশন চ্যানেল থেকে আমার ইন্টারভিউও নিয়েছে, আপনারা অনেকে দেখে থাকতে পারেন। নাঃ, নিজের সম্বন্ধে এত বশি বলা ঠিক না।

ছোট বেলা থেকেই আমি আদর যত্ন আর প্রাচুর্যের মধ্যে মানুষ হয়েছি। আমার যে কত জামা-কাপড়, জুতো আর খেলনা রয়েছে আমি নিজেও তা জানিনা। বাবা-মা নিজেদের কাজে ব্যস্ত থাকলেও আমার সুখ স্বাচ্ছন্দের দিকে নজর রাখতে কখনো ভোলেননা।

নিজের কথাত অনেক বললাম। এবার সমীরের কথায় আসা যাক। সমীরের সাথে কি করে পরিচয় হল সেটা আগে বলে নি। কয়েক বছর আগের ঘটনা। আমি তখন সপ্তম শ্রেণিতে পড়ি। শক্তিগড়ের কাছে মহানন্দার চরে একটা বিরাট মেলা বসেছিল। স্কুলের বন্ধুদের সাথে মেলা দেখতে গিয়েছিলাম। একটা মাউথ অরগানের দোকানের সামনে দোকানদার একটা সুন্দর বিদেশি মাউথ অরগান বাজাচ্ছিল আর সহকারি ছেলেটা ক্রমাগত হেঁকে চলেছিল, ‘মাত্র একশ টাকায় দামী চাইনিজ মাউথ অরগান’। হঠাত বাজনা থামিয়ে লোকটা চিতকার করে উঠল, ‘মারব এক চড়’।

লোকটার চিতকার শুনে সবাই লোকটার দিকে ফিরে তাকালাম। দেখি নোংরা আধছেঁড়া জামা পরা প্রায় আমার বয়সী একটা ছেলেকে উদ্দেশ্য করে লোকটা কথাটা বলেছে। ছেলেটার কাঁদোকাঁদো করুণ মুখ দেখে আমার বড় মায়া হল। আমি এগিয়ে গিয়ে ধমকে উঠলাম, ‘ওকে শুধু শুধু মারবেন কেন?’ আমার কথা বলার ধরন আর দামী পোশাক পরা এতগুলো ছেলেকে দেখে লোকটা ভড়কে গেল। কাঁচুমাঁচু হয়ে বলল, ‘দেখোতো ভিখিরির ছেলের কি আস্পর্দা। বলে কিনা, আমাকে ওটা একটু বাজাতে দেবেন?’
আমি রোগা ছেলেটাকে বললাম, ‘তুমি মাউথ অরগান বাজাতে পার?’
ছেলেটা আগ্রহের সংগে উত্তর দিল, ‘একটু একটু শিখেছি। আমার একটা সস্তা দামের আছে। এটা অনেক ভালো’।

আমি বললাম, ‘তুমি এটা বাজাতে পারবে?’
ছেলেটা একটু সাহস পেয়ে সপ্রতিভ ভাবে বলল, ‘কেন পারবনা?’
আমি একশ টাকা বের করে দোকানিকে বললাম, ‘একটা মাউথ অরগান দিন’।
দোকানি একটা মাউথ অরগান দিয়ে বলল, ‘একটু দেখে নাও’।
আমি ছেলেটার হাতে ওটা দিয়ে বললাম, ‘বাজাওতো’।
ছেলেটা একটা হিন্দি সিনেমার গান সঠিক সুরে বাজাতে লাগল।
আমি বললাম, ‘তোমার নাম কি?’
‘সমীর দাস। নর্থ স্টেশনের কাছে মহানন্দা বস্তিতে আমাদের বাড়ি’।
‘তুমি এটা নাও’।
‘ঠাট্টা করছেন নাতো?’
‘ঠাট্টা করব কেন?’

ছেলেটার চোখ আনন্দে ঝিক মিক করে উঠল। আমি এক বন্ধুর ডায়রির পাতা ছিঁড়ে আমার নাম, ঠিকানা আর মোবাইল নম্বর লিখে দিয়ে বললাম, ‘কোথা থেকে এটা পেয়েছ কেউ জানতে চেলে আমাকে ফোন করতে বলবে। না হলে ভাবতে পারে তুমি এটা চুরি করেছ’।

ছেলেটা কাগজটা পকেটে পুরে ছুটতে ছুটতে ভিড়ের মধ্যে মিশে গেল। আমি ওর কথা সম্পূর্ণ ভুলে গেলাম।

মাস কয়েক আগে পাড়ার একটা চায়ের দোকানের সামনে দিয়ে যাচ্ছি, হঠাত ‘বাবু’ ডাক শুনে থমকে দাঁড়ালাল।চায়ের দোকান থেকে আমার বয়সি একটা আদুল গা ছেলে বেরিয়ে এসে বলল, ‘আমাকে চিনতে পারছেন?’
‘তুমি কে বলতো?’
‘আমি সমীর। মেলা থেকে আপনি আমাকে মাউথ অরগান কিনে দিয়েছিলেন। এখনো আমি রোজ্ ওটা বাজাই।‘
আমার এবার সব কথা মনে পড়ে গেল। বললাম, ‘এখানে কি করছ?’
‘গত মাস থেকে এই চায়ের দোকানে চাকরের কাজ পেয়েছি’।

এর পর থেকে প্রায় রোজই ওর সাথে দেখা হত। ওর বাবা মা দুজনেই একোটা দোকানে বিড়ি বাঁধার কাজ করেন। নর্থ স্টেশনের কাছে একটা জবরদখল বস্তিতে ওরা থাকে। ধীরে ধীরে সমীরের সাথে আমার বন্ধুত্ব জমে উঠল।

বেশ কয়েকদিন ধরে সমীর কে চায়ের দোকানে না দেখে দোকানীকে ওর কাথা জিজ্ঞাসা করলাম। দোকানী বলল, ‘কয়েকদিন আগে একটা সাইকেলের ধাক্কায় ওর পায়ে চোট লেগেছে। সারতে মাসখানেক লাগবে। সব কিছু একা সামলে ওর বাড়িতে যাওয়ার সময়ও পাচ্ছিনা’।

দোকানদারের কাছ থেকে সমীরদের বাড়ি কিকরে যেতে হবে ভালো করে জেনে নিলাম। পরের রবিবার স্কুল ছুটি। মা-বাবাও দুপুরে বেরিয়ে যাবেন ও একটা পার্টি সেরে রাত করে ফিরবেন। সমীরের সাথে দেখা করার এই সুযোগ। রবিবার মা-বাবা বেরিয়ে গেলে একটা রিক্সা নিয়ে নির্দিষ্ট জায়গায় এসে রিক্সা ছেড়ে দিয়ে পায়ে হাঁটা সুঁড়ি পথ ধরে নিচে নেমে চললাম। দোকানগুলো পার হয়ে কাঞ্চনভিউ হোটেলের পেছন দিয়ে পথটা সোজা মহানন্দার দিকে চলে গেছে। কিছুটা এগিয়ে নির্দিষ্ট মুদির দোকানটা দেখতে পেলাম। পেছনেই গায়ে গায়ে ঠেস দেওয়া একরাশ টালির চালের বাড়ি। আমাকে দেখে কয়েকটা নোংরা জামা পরা ছোট ছেলেমেয়ে হাঁ করে তাকিয়ে ছিল। সমীরের কথা বলতেই একটা ছেলে সপ্রতিভ ভাবে বলল, ‘আমার সাথে আসুন। সমীরদারতো পা ভেঙ্গে গেছে’।
‘সব জানি আর সেজন্যেইতো ওর সাথে দেখা করতে এসেছি’।

ছেলেটা নাচতে নাচতে অলি গলি আবর্জনার স্তুপ, বাড়ির উঠোন আর ছোটছোট ড্রেন পেরিয়ে দ্রুত এগিয়ে চলল আর আমি প্রায় ছুটতে ছুটতে ওকে অনুসরণ করে চললাম। একটা বাড়ির সামনে এসে ‘এটাই সমীরদাদের বাড়ি’ বলে ছেলেটা ছুটে চলে গেল।

বাঁশের ছোট্ট বেড়া দিয়ে ঘেরা জায়গায় দুটো টালির চালের ঘর, বাঁশের বেড়ার দেয়াল, উঁচু করা মাটির মেঝে। বাঁশের দরজা সরিয়ে ভেতরে ঢুকে কি করব ভাবছি, এমন সময় আমাকে দেখে সমীরের মা এগিয়ে এলেন, ‘তুমি নিশ্চই শৌভিক। সমুর কাছে তোমার কথা অনেক শুনেছি। আমাদের কি সৌভাগ্য তুমি এই বস্তি বাড়িতে এসেছ’।

পরনে লাল পেড়ে সস্তা শাড়ি, রোগাটে শরীর, প্রায় চুপসে যাওয়া মুখে অদ্ভুত স্নেহ মাখানো হাসি। আমার মনটা কেন যেন অজানা খুশিতে ভরপুর হয়ে উঠল। মনে হল ইনি যেন আমার কত দিনের চেনা।

আমাদের কথা শুনে সমীরের বাবা বেরিয়ে এলেন আর ঘরের ভেতর থেকে সমীর আনন্দে চেঁচিয়ে উঠল, ‘শৌভিক তুমি এসেছ!’

আমি চটি ছেড়ে ঘরের মধ্যে ঢুকে পড়লাম।

ঘরের মাটির মেঝে গোবর দিয়ে লেপা, দেয়ালে কয়েকটা দেবদেবীর ছবি। সমির একটা খাটিয়ায় কাত হয়ে শুয়ে আছে। বাঁ পায়ের নিচের দিকটা প্লাস্টার করা। আমাকে কোথায় বসতে দেবেন তাই নিয়ে ওর মা-বাবা ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়লেন। আমি একটুও দ্বিধা না করে সোজা সমীরের বিছানার কোণে বসে পড়লাম। সমীর খুশিতে নির্বাক ডগমগ হয়ে পড়েছে, মুখে কোনো কথা সরছেনা। আমিই কথা শুরু করলাম। বললাম, ‘কি করে এটা হল?’
‘তাড়াতাড়ি রাস্তা পার হতে যাচ্ছিলাম, একটা সাইকেল পেছন থেকে ধাক্কা মারে। শক্ত রাস্তায় পড়ে গিয়ে গোড়ালির হাড়ে চিড় ধরেছে। পনেরো দিন হয়ে গেল। প্লাস্টার খুলবে আরো সাতদিন পর। সম্পূর্ণ সেরে উঠতে কত সময় লাগবে কে জানে’।
‘কোনো চিন্তা করিসনা ঠিক সেরে উঠবি’।
‘মালিক খুব ভালো। আমি কাজে না গেলেও মাইনে কাটবেনা। তাছাড়া চিকিতসার জন্য কিছু টাকাও পাঠিয়েছে’।

সমীরের বাবা আমার জন্য মিষ্টি আনতে যাচ্ছিলেন। য়ামি বারণ করলাম। ওর মাকে বললাম,
‘বাড়িতে মুড়ি পেঁয়াজ, লংকা থাকলে ভালো করে মেখে দিন। আমি মুড়ি মাখা খেতে খুব ভালো বাসি’।

সমীরের মা খুশি হয়ে মুড়ি মাখতে রান্না ঘরে চলে গেলেন।

মুড়ি খেতে খেতে সমীরের সাথে অনেক গল্প করলাম। মনে হল যেন অমৃত খাচ্ছি।

সন্ধ্যার আগেই বাড়ি ফিরতে হবে। স্কুলের কিছু টাস্ক সেরে রাখতে হবে। ওদের বিদায় জানালাম। সমীর আর ওর মা-বাবা বললেন ‘আবার এস’।
‘নিশ্চই’।

কথাটা আমি মন থেকেই বললাম। আমি জানি আমাকে বার বার এখানে আসতে হবে, সমীর সেরে ওঠার পরও।

সঙ্গে একহাজার টাকা এনেছিলাম। অনেক দ্বিধা করার পর ওর মায়ের হাতে টাকাটা দিয়ে মিথ্যা করে বললাম, ‘টাকাটা মা পাঠিয়ে দিয়েছেন’।
সমীরের মা-বাবা আপত্তি জানাতে বললাম, ‘টাকাটা ফেরত নিয়ে গেলে মা খুব রাগ করবেন’।
সমীরের মা টাকাটা নিয়ে উদ্ভাসিত হয়ে বললেন, ‘তোমার মা দেবীতুল্য। লোকে বলে গরীব লোকদের উপর উনার খুব দয়ামায়া’। আমার মুখে নিজের অজান্তে একটু হাসি খেলে গেল।

এখনো সন্ধ্যা হতে কিছুটা বাকি আছে। ওদের বাড়ি থেকে বেরিয়ে মহানন্দার পাড়ে এসে দাঁড়ালাম। নদীটা এখানে দুভাগ হয়ে গেছে। মাঝখানে একটা বিরাট চড়া। নদীতে জল নেই বলতে গেলে। হেঁটে পার হলে হাওড়া পেট্রোল পাম্পের কাছে পৌঁছন যাবে। আমি নদীর প্রথম অংশটা পেরিয়ে চড়ার উপর এসে দাঁড়ালাম। সূর্যটা লাল হয়ে পশ্চিমে পামের পাতার আড়ালে হেলে পড়েছে। সামনে নদীর জলে রঙ্গিন আকাশের ছায়া পড়েছে। পাহাড়ের নিচের অংশ গভীর কৃষ্ণ বর্ণ ধারণ করেছে। উপরে কাঞ্চন জঙ্ঘার বড় চূড়াটায় এখনো শেষ সূর্যের আলো খেলা করছে। একটা মিষ্টি হাওয়ায় ঝোপড়া রুদ্রাক্ষ গাছটার পাতায় মৃদু দোল উঠছে। আমার মনটা এক অদ্ভূত খুশিতে ভরপুর হয়ে উঠছে। জীবনে আগে যা পাইনি তার অনাস্বাদিতপূর্ব স্বাদ আজ পেলাম।

মনে হল আমি যদি সমীরের মত হতাম, যদি কোনো উপহার আর প্রাচুর্য না থেকেও ওর মত অনেক বড় কিছু পেতাম।


Dr.Ratan Lal BasuRatan Lal Basu, Ph.D. (Economics) is an ex-Reader in Economics and Teacher-in-Charge, Bhairab Ganguly College, Kolkata, India. Dr. Basu has written & edited several books on Economics. Dr Basu us a valued and regular contributor to Washington Bangla Radio.

Check out WBRi Online Bookstore Recommendatiuons on books by Dr. Ratan Lal Basu: CLICK HERE >

Apart from his passion for the field of Economics, Dr. Basu's other interests are Boxing & Small Game Hunting (gave up the nasty games during college life); Swimming in Turbulent Rivers (physically impossible now); Himalayan Treks, Adventure in Dense Forests, Singing Tagore Songs and also writing travelogues and fiction in Bengali and English.

Dr. Ratan Lal Basu can be reached at rlbasu [at] rediffmail.com.




blog comments powered by Disqus

SiteLock