স্বপ্ন - রতন লাল বসু: সপ্তম অধ্যায় | Shopno - A Bengali Novel by Dr. Ratan Lal Basu - Chapter 7 | WBRi Bangla Online Magazine

"Shopno" is a novel by Dr. Ratan Lal Basu published serially in the WBRi Bangla Magazine section in unicode Bangla font. Links to previous and following chapters are posted at the bottom of every episode.


স্বপ্ন

রতন লাল বসু

সপ্তম অধ্যায়


এম.এ. পরীক্ষার রেজাল্ট বেরোনোর পর সমর কলকাতা ইউনিভার্সিটিতে একটা জুনিয়ার রিসার্চ ফেলোশিপ পেল। এদিকে কিছুদিন যাবৎ নকশাল আন্দোলন সারা কলকাতায় ভয়ঙ্কর রূপ নিয়েছে। ওদের মতে বিদ্যাসাগর, রামমোহন, নেতাজী,বিবেকানন্দ এরা সব বুর্জোয়া, আর ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদীদের দালাল। তাই যেখানে যেখানে ওই সব দেশনেতার মূর্তি আছে নকশালরা তাদের মুণ্ড কেটে ফেলার বা সেসব মূর্তিতে আলকাতরা লেপে দেওয়ার কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। ওদের মতে স্কুল,কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থা হল বুর্জোয়া শিক্ষাব্যবস্থা। সুতরাং স্কুল-কলেজ পুড়িয়ে দেওয়া, স্কুল-কলেজ দখল করে লাল পতাকা টাঙ্গিয়ে দেওয়াও ওদের কর্মসূচির অঙ্গ। তাছাড়া পুলিশ ও সরকারী কর্মচারিদের হত্যা করে সরকারী প্রশাসন যন্ত্রকে অচল করে দেওয়ার লক্ষ্যও ওরা গ্রহণ করেছে। নকশালদের এইসব কার্য্যকলাপ রোধ করার জন্য যমদূতের মত আকৃতির সি.আর.পি (Central Reserve Police) বাহিনী দিয়ে সারা কলকাতা ছেয়ে ফেলা হয়েছে। পুলিশ আর সি.আর.পি.দের সাথে নকশালদের সংঘর্ষ বাধছে প্রতিদিন। রাস্তায় রাস্তায় বোমাবাজি হচ্ছে; পাইপগান, রাইফেল, পিস্তল থেকে গুলি ছুটছে।
এদিকে নকশাল আর সি.পি.এম. হার্মাদদের মধ্যেও কলকাতার বিভিন্ন এলাকা দখলের জন্য জোর লড়াই বেধে গেছে। খুন-খারাপি লেগেই আছে। সারা কলকাতায সন্ত্রাসের রাজত্ব। সারা কলকাতা সি.পি.এম. আর নকশালদের এলাকায় টুকরো টুকরো হয়ে গেছে। আইন শৃঙ্খলা ব্যবুস্থা সম্পূর্ণ ভেঙ্গে পড়েছে। পুলিশ আর সি.আর.পি. আইন শৃঙ্খলা রক্ষা করতে বিফল হয়ে মরীয়া হয়ে উঠেছে। যেখানেই গণ্ডগোল হচ্ছে, সি.আর.পি. আর পুলিশ ছুটে গিয়ে আসল অপরাধীদের ধরতে না পেরে বাড়িঘর সব তল্লাসী করছে, নির্দোষ লোকেদের উপর অত্যাচার চালাচ্ছে।যুবক-যুবতীদের দেখলেই বিনা কারণে গ্রেপ্তার করছে। সারা কলকাতায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। লোকে পারতপক্ষে আর সন্ধ্যার পর বাড়ি থেকে বের হয়না।ছেলেমেয়েরা বাড়ির বাইরে গেলে ফিরে না আসা পর্যন্ত কারো মনে স্বস্তি থাকেনা।


এতদিন সমর খুনের খবর খবরের কাগজেই পড়েছে। এবার সচক্ষে দেখতে পেল। সমরের দিদির বাড়ির পাড়াটা একটু নিরিবিলি। তখনো গণ্ডগোল ওদিকে ছড়িয়ে পড়েনি। হোস্টেলে পুলিশি হাঙ্গামা থাকায় সমর দিদির বাড়িতেই থাকত।সেদিন ভোরে পাড়ার এক ভদ্রলোক বললেন রাস্তার মোড়ে একটা মৃতদেহ কে ফেলে রেখে গেছে। ব্রেকফাস্ট সেরে সমর দেখতে গেল। অনেক লোক মৃতদেহের চারদিকে ভিড় জমিয়েছে। ভিড় ঠেলে সমর সামনে এগিয়ে গেল। দেখে লঙ্কাশিরা গাছের জঙ্গলের উপর একটা লোক চিৎ হয়ে পড়ে আছে। জামাপ্যান্টে রক্ত মাখা।গলার নলীর কাছটা খোঁদল করে কাটা, কোনো ধারালো অস্ত্র দিয়ে নলীর মাঝখানটা কেউ কুরিয়ে কেটে নিয়েছে। মৃতদেহের পাশে একজোড়া স্যান্ডেল পরিপাটি করে সাজানো। অনেকে বলল ছেলেটা অন্যপাড়ার। গত সন্ধ্যায় কয়েক বন্ধু ওকে বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে যায়। তারপর খুন করে এপাড়ায় ফেলে রেখে গেছে। সম্ভবতঃ রাজনৈতিক মতভেদের ফলে এটা হয়েছে।
সেদিন থেকে সমরের মনের আতঙ্ক শতগুণ বেড়ে গেল। সারারাত ঘুম হলনা।এতদিনে এমনিই কলকাতার জীবন অসহ্য হয়ে উঠেছিল। বাইরে বেরোলেই ভয় হয় কখন গায়ে বোম পড়ে, পাইপগানের গুলি এসে লাগে কিংবা সি.আর.পি. ধরে হেনস্থা করে। ইউনিভার্সিটি প্রায়ই বন্ধ থাকে। সেখানেও নানান দলের সমর্থক ছাত্রদের মধ্যে সংঘর্ষ লেগেই আছে। ইউনিভার্সিটির গেটের বাইরে সি.আর.পি.র পিকেটিং।
এত অসুবিধার মধ্যেও প্রাণ হাতে করে সমর রিসার্চের কাজ যতটা সম্ভব এগিয়ে নিয়ে চলল। সমর ভাবে, এ দুর্দিনতো চিরস্থায়ী হবেনা। একদিন নিশ্চয় শান্তি ফিরে আসবে। সমরকে ভবিষ্যতের কথা, নিজের ক্যারিয়েরের কথা ভাবতে হবে।এখন ভয়ে রিসার্চ ছেড়ে দিলে ভবিষ্যতে আর সুযোগ মিলবেনা। হা পিত্যেশ করে মরতে হবে।
একদিন এক বন্ধুর কাছে শুনল অভীক আর অনিরুদ্ধ মারা গেছে। প্রকাশ, বাদল আর সুবলকে কলকাতা পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চ হন্যে হয়ে খুঁজে বেড়াচ্ছে। অনিরুদ্ধ আর অভীকের মৃত্যু মোটামুটি একই ধরণের। সি.আর.পি. ভ্যানে তুলে একটা নির্জন জায়গায় নিয়ে ওদের ছেড়ে দেওয়া হল। ওদের চলে যেতে বলা হল। ওরা যেই কিছুদূর গেছে ওদের পিছন থেকে গুলি করে মেরে রটনা করা হল যে ওরা পালাতে গিয়ে মারা পড়েছে।
ওদের পাড়ায় মৃতদেহ আমদানির কয়েকদিন পরের ঘটনা। সমর সন্ধ্যার দিকে মাসীর বাড়ি যাচ্ছিল। মাসীদের পাড়ার গলির মুখটা অন্ধকার। বেশ কিছুটা দূরে লাইটপোস্টের মৃদু আলোতে একটা বারান্দা দেখা যাচ্ছে আর তার উপর বসে কয়েকটা ছেলে সিগারেট টানছে। সমর হনহনিয়ে অন্ধকার জায়গাটা পার হতে গেল।হঠাৎ যেন মাটি ফুঁড়ে তিনটে ছেলে উঠে ঘিরে ধরল সমরকে। রুক্ষ্ম স্বরে একজন বলল, ‘দাঁড়ান দাদা’। হাতে পাইপ গান। সমর থমকে দাঁড়িয়ে গেল। শুনতে পেল নিজের দ্রুত হৃদস্পন্দনের আওয়াজ। ততক্ষণে রকের বাকি ছেলেগুলোও সমরের চারদিকে জড়ো হয়েছে। একটা মস্তান শক্ত হাতে সমরের সার্টের কলার চেপে ধরল।চিৎকার করে বলল, ‘শালা, বাঞ্চত কোথায় চল্লি?’। মস্তানটার আঙ্গুলের চাপে সমরের দম বন্ধ হয়ে এল। চোখে অন্ধকার দেখল। একজন মন্তব্য ছুঁড়ল, ‘নিশ্চয়ই এটা পুলিশের চর!’ আর একজন বলল, ‘দেখেছিস কেমন গোবেচারা চেহারা, যেন ভাজা মাছ উল্টিয়ে খেতে জানেনা!’ আগের ছেলেটা বলল, ‘খোচড়গুল ওরকম গোবাচারাই দেখতে হয় যাতে কেউ বুঝতে না পারে’। সমর বলতে গেল ও পুলিশের চর না, মাসীর বাড়ি চলেছে। কিন্তু মস্তানটার আঙ্গুল এমন ভাবে গলায় চেপে বসেছে যে ওর গলা দিয়ে একটা ‘চিঁ-চিঁ’ শব্দ বেরোল শুধু। মস্তানটা বলল, ‘এটাকে গলাটিপেই শেষ করে দি। শুধু শুধু গুলি নষ্ট করার দরকার নেই। তা ছাড়া গুলি করলে আওয়াজও হবে।
হঠাৎ যেন কতদূর থেকে একটা গম্ভীর স্বর সমরের কানে ভেসে এল, ‘তোরা কি আরম্ভ করেছিস বলত! গাব্বু ছাড় বলছি ওর কলার’। গলার কাছ থেকে হাতের বাঁধন আলগা হতেই সমর বুক ভরে দম নিল। অবাক হয়ে সামনে তাকাল। ভিড় ঠেলে কে যেন এগিয়ে আসছে। ছেলেটা রাগে গরগর করছে, ‘তোরা যদি ভালোকরে না জেনে সকলের সাথে এরকম রাফ ব্যবহার করিস তাহলে লোকের কাছে আমাদের ইমেজ থাকে কি করে; সি.পি.এম. এর হার্মাদদের সাথেই বা আমাদের পার্থক্য কোথায়? দাদা আপনি এখানে কার বাড়ি যাবেন?’ ভারক্কি ছেলেটা সমরের দিকে তাকালো আর তখনি প্রায় চেঁচিয়ে উঠল, ‘আরে সমর তুই?’ সমর তাকিয়ে দেখে শিশির, বেচুদের পার্টি করত। শিশির সমরের হাত ধরে ভিড়ের বাইরে এনে বলল, ‘তোর লাগেনিত? কোথায় যাচ্ছিলি এই সন্ধ্যাবেলা?’
সমর গলার স্বর যথাসম্ভব স্বাভাবিক করে মিথ্যা করে বলে ‘লাগবে কেন, ওতো আলগা করে ধরেছিল। যাচ্ছিলাম মাসীর বাড়ি, ওইত সামনেই’।
‘বোকা কোথাকার। আজকালকার দিনে ভালো করে খোঁজখবর না নিয়ে কোথাও যেতে আছে? তাও আবার সন্ধ্যা বেলা? আর এই মস্তানগুলোকে কিছুতেই পলিটিকালাইজ করা যাবেনা। আমি সময়মত এসে না পড়লে তোর আজ কি হত বলত?’
সমর ম্লান হেসে বলল, ‘অপঘাতে মৃত্যু’। শিশির গম্ভীর স্বরে বলল, ‘সত্যিই তাই হত। আজ এখানে ভীষণ টেনশান। আমাদের একটা ঘাঁটি সি.আর.পি. রেড করেছে। তোর মাসীর বাড়ি যেতে হবেনা। ফিরে যা এখনি। চল বাসে তুলে দিচ্ছি’।
সমর আর পারলনা। কয়েকদিন বাদে রিসার্চ শিকেয় তুলে কলকাতা ছেড়ে দেশের বাড়ি ফিরে চলল। যাওয়ার আগে অনেক ঝুঁকি নিয়ে বীণাদের খোঁজ করেছিল। সুবলের খবর জানার জন্য দু বোনকে পুলিশ ধরে নিয়ে যায়। সোনা লকআপে মারা গেছে। ধর্ষিতা বীণা আত্মহত্যা করেছে।


দেশের বাড়ি ফিরে সমর দেখে ভাটুইপুরের অবস্থাও খুব ভালো নয়। এখানেও সন্ত্রাসের রাজত্ব। ভাটুইপুরের আশপাশে কিছু খুন হয়েছে। স্কুলে স্কুলে নকশালদের লাল পতাকা উড়ছে। সি.আর.পি. পিকেটিং বসেছে। চোর-ছ্যাঁচোড়, ওয়াগন ব্রেকাররা নাকি নকশালদের নাম করে নিজেদের দুষ্কর্ম চালিয়ে যাচ্ছে। এক স্কুলের কেরানী তহবিল তছরুপ করেছিলেন। তারপর একদিন দেখা গেল তিনি হাত পা বাঁধা অবস্থায় স্কুলের অফিসে পড়ে আছেন আর কারা অফিসের সব কাগজপত্র পুড়িয়ে লাল পতাকা টাঙ্গিয়ে দিয়েছে। দেয়ালে কিছু নকশাল শ্লোগানও লিখে দিয়েছে।অনেকেই বলল সব ব্যাপারটাই ওই ক্লার্কের সাজানো, তহবিল তছরুপের তথ্য চেপে দেওয়ার জন্য।
একটা বাড়িতে দুটো ছেলে মাঝরাতে নারকেল চুরি করতে গাছে উঠেছিল।বাড়ির মালিক শব্দ শুনে বেরিয়ে আসতেই ওরা চিৎকার করে নকশাল স্লোগান দিতে লাগল। বাড়ি ওয়ালা ভয়ে ঘরে ঢুকে পড়লেন আর চোর দুজন গাছ ফাঁকা করে চলে গেল।
জলপাইগুড়ি-শিলিগুড়ি শহর দুটোর অবস্থা আরো ভয়াবহ। কলকাতার মতই প্রতিদিন খুন-খারাপি চলছে ওখানে। সমর খবরের কাগজ থেকে কলকাতার খবর পায়। প্রতিদিন অন্ততঃ দশ-বারোটা খুন হচ্ছে কলকাতায়।শিলিগুড়ি-জলপাইগুড়িতেও প্রতিদিন তিন-চারটে করে খুন হচ্ছে।
সেদিন সমর আর অনিল ম্যাটিনি শোতে মেঘদূত হলে সিনেমা দেখার জন্য শিলিগুড়ির কাছারী রোড ধরে চলেছিল। অনিল বলল, ‘চল তিলক ময়দানের মধ্য দিয়ে যাই, তাহলে শর্টকাট হবে’। তিলক ময়দানের দিকের সরু রাস্তার দুপাশে দোকানপাট বিশেষ নেই। দুপুরের থমথমে নির্জনতা বিরাজ করছে। তিলক ময়দানের চারিদিক টিনের বেড়া দিয়ে ঘেরা। ছোট গেট দিয়ে ভিতরে ঢুকে ওরা এগিয়ে চলল ওপাশের গেটের উদ্দেশ্যে। হঠাৎ দুটো নেপালি ছেলে ছুটে এসে ওদের হাত ধরে টানতে লাগলো আর কি যেন বলতে লাগল। ওরা প্রথমে ভেবেছিল ছেলেদুটো ভিক্ষা চাচ্ছে। কিন্তু ছেলেদুটোর কথা ভালোকরে শোনার পর ওদের ভুল ভাঙল। ‘বাবু, আদমিলাই মারা’। ব্যাপারটা কি বোঝার জন্য একটু এগিয়ে যেতেই চোখে পড়ল খত-বিক্ষত একটা মৃতদেহ। ‘ছোরাসে মারকর ডাকুলোগ ভাগ গিয়া,হামিলে দেখা বাবু’, ছেলে দুটোর গলার স্বরে আতঙ্ক।
সমর আর অনিল সময় নষ্ট না করে দ্রুত পায়ে মাঠ থেকে বেরিয়ে আসার পর ওদের ধড়ে প্রাণ এল। বাচ্চা ছেলেদুটোও গলির মধ্যে দৌড় লাগাল। পুলিশ এসে ওদের দেখলে সন্দেহ করে ধরে নিয়ে যেত। ওরা আর সিনেমা না দেখে বাসে করে ফাটাপুকুর হয়ে ভাটুইপুর ফিরে গেল। আতঙ্কে সে রাতে সমরের ঘুম এলনা।


ঘরে আবদ্ধ থাকতে সমরের আর ভালো লাগেনা। কিন্তু কি করবে। বাইরে মৃত্যু ওৎ পেতে বসে আছে। যেখানেই যায় সেখানেই হিমশীতল আতঙ্ক জমাট বেঁধে আছে। এই অসহনীয় দুঃসময়ের কি অন্ত নেই, ফুরোবেনা কি এই অন্ধকার রাত্রি!সমরের রিসার্চ, ক্যারিয়ার সবই কি এমনি করে শেষ হয়ে যাবে! সমরের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙ্গে পড়তে থাকে। হতাশা এসে ওকে আচ্ছন্ন করে তোলে। কলকাতায় খুন,মূর্তিভাঙ্গা, বোমাবাজি, সি.আর.পি. আর হার্মাদদের তাণ্ডব সব একই ভাবে চলেছে।বুঝি এই দুঃসময় যুগযুগান্ত ধরে চলবে, এমনি বিরামহীন ভাবে। বুঝি এই ভয়াল রাত শেষ হয়ে ভোরের আলো ফুটবেনা আর কোনদিন।
বেচুর নাম প্রায়ই খবরের কাগজে পুলিশের বিজ্ঞাপনে দেখা যায়, ‘জীবিত বা মৃত ধরে দিতে পারলে মোটা টাকার সরকারি পুরষ্কার মিলবে’। সুবলের কোনো খবর পায়না সমর। কি হল কে জানে? হয়ত এরেস্ট হয়েছে, হয়ত আর বেঁচে নেই।
একদিন খবরের কাগজে কলকাতায় নিহতদের তালিকায় সাইক্লোন বিশ্বাস নামটা দেখে সমর চমকে উঠল। এম.এ. ক্লাশে এই নামে সমরের একজন সহপাঠী ছিল। শান্তশিষ্ট ভালোছেলে। এম.এ.তে বেশ ভালো রেজাল্ট করেছিল। এমন বিদঘুটে নাম কি দ্বিতীয় কারো থাকতে পারে? পদবীটাও মিলে যাচ্ছে। কিন্তু ওতো রাজনীতির ধার ঘেঁষতনা, খুন হল কেন সমর ভেবে পায়না।
পরে কলকাতায় ফেরার পর সমর সাইক্লোনের ঘটনাটা শুনেছিল। এম.এ.পরীক্ষার পর থেকে ও নৈহাটীর একটা স্কুলে চাকরি করত। মৃত্যুর ঠিক কয়েকদিন আগে এক কলেজ থেকে এপয়েন্টমেন্ট লেটার পেয়েছিল। সেদিন স্কুলের শেষে ক্লান্ত শরীরে বাড়ি ফিরছিল। ট্রেন জার্নিতে শরীরের উপর খুব ধকল যায়। তার উপর স্টেশন থেকে বাড়ির দূরত্ব এক মাইলের উপর। গলি দিয়ে গেলে শর্টকাট হয়।সাইক্লোন তাই গলিপথ ধরে চিন্তা করতে করতে বাড়ি ফিরছিল। সন্ধ্যা নেমেছে,গলির এখানে সেখানে ছায়াছায়া অন্ধকার। স্কুলে প্রচণ্ড ক্লাশের বোঝা। যাক এবার স্কুলের চাকরি ছাড়তে পারবে। কলেজে জয়েন করে এই বিশ্রী ট্রেন জারণি আর ক্লাশের বোঝা থেকে মুক্তি পাওয়া যাবে। কলেজের মাইনেও স্কুলের চেয়ে ভালো;তাছাড়া বাড়ি থেকে বাসে দশ মিনিটের পথ। স্কুলে চাকরি ছেড়ে দেওয়ার চিঠি দিয়েছে, হেডমাস্টারও সে চিঠি এক্সেপ্ট করেছেন। আগামী মাস থেকেই কলেজে জয়েন করছে। বাস্, তারপরই মিনতির সাথে বিয়েটা সেরে ফেলতে হবে। মিনতির বাবামার সম্পূর্ণ মত আছে। এসব কথা ভাবতে ভাবতে সাইক্লোন প্রায় বাড়ির কাছে এসে পড়েছিল। হঠাৎ থমকে দাঁড়িয়ে পড়তে হল ।
‘এই শালা নকশাল, দাঁড়া’। কর্কশ চিৎকারে সাইক্লোনের চিন্তার জাল ছিন্ন ভিন্ন হয়ে গেল। সামনের মারমুখী মস্তানগুলোর দিকে তাকিয়ে একটা ভয়ের শীতল স্রোত ওর মেরুদন্ড বেয়ে প্রবাহিত হয়ে চলল। সাইক্লোন ভাবল ওরা কোনো ভুল করে থাকবে। আশা জাগল ভুল ভাঙ্গিয়ে দিলে ছেড়ে দেবে। কাঁপা কাঁপা স্বরে সাইক্লোন বলল, ‘ভাই আমিত কোনো রাজনীতি করিনা, নৈহাটী স্কুলে পড়াই। একটা কলেজে চাকরি পেয়েছি। স্টেট ব্যাঙ্কে প্রবেশনারী অফিসারের পরীক্ষাও দিয়েছি। এই দেখুন কলেজের এপয়েন্টমেন্ট লেটার, এই যে স্টেট ব্যাঙ্কের এডমিট কার্ড’।
সাইক্লোন নিচু হয়ে পকেট থেকে কাগজগুলো হাতড়িয়ে বের করল। হঠাৎকোমরের কাছে তীব্র যন্ত্রণা, সার্টপ্যান্ট ছাপিয়ে রক্ত ছড়িয়ে পড়ছে। ‘বাঁচাও-বাঁচাও’আর্ত চিৎকার করতে করতে ও কাছের সিগারেটের দোকান লক্ষ্য করে ছুট মারল।আর একটা ছোরার আঘাত পড়ল হাতে। এদিকে দোকানের ঝাপ ঝপ করে বন্ধ হয়ে গেল। সারা শরীরে ছোরার আঘাত পড়ছে। আশপাশের বাড়িগুলোর দরজা-জানলা সব দুমদাম করেবন্ধ হয়ে যাচ্ছে। রক্তাক্ত সাইক্লোন রাস্তার ড্রেনের পাশে গড়িয়ে পড়ল। কে যেন হঠাৎ বলে উঠল, ‘বিনয়দা, বিরাট ভুল হয়ে গেছে। তপুরতো চোখের পাশে একটা কাটা দাগ ছিল’।
বিনয় এগিয়ে এসে বলল, ‘একি, তোরা কাকে মারলি! হায় হায় এতো একটা নিরীহ ছেলে। চল পালাই, খোচড়ের গাড়ির শব্দ পাচ্ছি’।
সাইক্লোন ‘জল, জল’ বলে গোঙাতে লাগল। হাতে ড্রেনের জল লাগতেই মুখে তুলে নেওয়ার চেষ্টা করল। তারপর একরাশ অন্ধকার ধেয়ে এল। তারপর দেখল একটা ফুলবাঁধানো রাস্তা দিয়ে মিনতির হাত ধরে হেঁটে চলেছে, হেঁটে চলেছে------
সমরের দিন কাটে ভাটুইপুরে একরকম বন্দী হয়ে। কিছু ভালো লাগেনা।জীবনটা বুঝি শেষ হয়ে গেছে। আর বুঝি এই ভয়াবহ সময়, এই মৃত্যু আর আতঙ্কের যুগ শেষ হবেনা। প্রথম দিকে নিজের ক্যারিয়ার আর রিসার্চের বিষয় নিয়ে সমর উদ্বিগ্ন ছিল। এখন সেসব নিয়ে আর চিন্তা করেনা। এখন চারিদিকে এক জমাট বাঁধা অন্ধকার। একটা আতঙ্ক সমরের চেতনাকে আচ্ছন্ন করেছে। সমর ভাবে আর কিছুদিন পর হয়ত সে সম্পূর্ণ উন্মাদ হয়ে যাবে। তবু সমর আপ্রাণ চেষ্টা করে মানসিক ভারসাম্য বজায় রাখতে। নিজের মনকে বোঝানোর চেষ্টা করে এ দুর্দিন কেটে যাবে, সবকিছু আবার স্বাভাবিক হয়ে যাবে। তখন জীবনটা আবার নতুন করে শুরু করা যাবে।


Next: Chapter 8 >

Previous: Chapter 6 >


Dr.Ratan Lal BasuRatanlal Basu, Ph.D. (Economics) is an ex-Reader in Economics and Teacher-in-Charge, Bhairab Ganguly College, Kolkata, India. Dr. Basu has written & edited several books on Economics.

Apart from his passion for the field of Economics, Dr. Basu's other interests are Boxing & Small Game Hunting (gave up the nasty games during college life); Swimming in Turbulent Rivers (physically impossible now); Himalayan Treks, Adventure in Dense Forests, Singing Tagore Songs and also writing travelogues and fiction in Bengali and English.

Dr. Ratan Lal Basu can be reached at rlbasu [at] rediffmail.com.



blog comments powered by Disqus

SiteLock