স্বপ্ন - রতন লাল বসু: ষষ্ঠ অধ্যায় | Shopno - A Bengali Novel by Dr. Ratan Lal Basu - Chapter 6 | WBRi Bangla Online Magazine

"Shopno" is a novel by Dr. Ratan Lal Basu published serially in the WBRi Bangla Magazine section in unicode Bangla font. Links to previous and following chapters are posted at the bottom of every episode.


স্বপ্ন

রতন লাল বসু

ষষ্ঠ অধ্যায়



কলকাতা ধীরে ধীরে মিটিং, মিছিলপোস্টার আর দেয়াল লিখনে সরগরম হয়ে উঠছে। কারখানায় কারখানায় ঘেরাও চলছে। চলছে স্ট্রাইক, লক-আউট আর ছাঁটাই। পথের মোড়ে মোড়ে , রেলের টিকিট কাউন্টারের পাশে কৌটো হাতে ছাঁটাই হওয়া শ্রমিক ভিক্ষায় নেমেছে। সারা পশ্চিমবঙ্গ যুক্তফ্রন্ট এর শরিকদের মধ্যে লড়াই আর খুনোখুনিতে উত্তাল হয়ে উঠেছে। সি.পি.এম. তার হার্মাদ বাহিনীর সাহায্যে অন্য শরিকদের এলাকা দখল শুরু করে দিয়েছে। এদিকে বিশেষ বিশেষ এলাকায় নকশালদের কার্যকলাপ দিনের পর দিন বেড়েই চলেছে। ওদের অধিকাংশ গ্রুপই এখন চারু মজুমদারের দলে যোগ দিয়েছে। চারু মজুমদারের নেতৃত্বে গঠিত হয়েছে সিপিয়াই (এম-এল) দল। এখন চারু মজুমদারের বক্তব্যই ওদের আন্দোলনের শেষ কথা। কলকাতার দেয়ালে দেয়ালে চারু মজুমদারের টুকরো টুকরো বাণী লেখা।সি.পি.এম. এর সাথে নকশালদের বিরোধ তীব্রতর হয়েছে।

সব মিলিয়ে পশ্চিমবঙ্গে মারামারি খুন জখম ক্রমাগত বেড়েই চলেছে।সি.পি.এম. এর অনেক নেতা দাবী করছেন কেন্দ্রের ইন্দিরা কংগ্রেস সরকার এবং যুক্তফ্রন্ট এর কিছু শরিক সি.পি.এম. এর বিরুদ্ধে নকশালদের মদত দিচ্ছে। হার্মাদ দিয়ে এলাকা দখলের নীতি নিয়ে সি.পি.এম. এর ভিতরেই শুরু হয়েছে তীব্র অন্তঃদ্বন্দ্ব। পড়াশুনা করা সৎ সি.পি.এম. নেতাদের মতে এভাবে সমাজ বিরোধীদের দিয়ে, সাধারণ মানুষের উপর নৃশংস অত্যাচার চালিয়ে এলাকা দখল সম্পূর্ণ ভাবে কমিউনিষ্ট নীতি বিরোধী। এভাবে চলতে থাকলে দলটা শেষে সমাজ বিরোধী আর গুণ্ডাদের কবলে চলে যাবে। তাদের অনেকেই দল ছেড়ে বেরিয়ে যাচ্ছেন অথবা দলের মধ্যে থেকেও প্রকৃতপক্ষে সরে থাকছেন। এদিকে সি.পি.এম. এ শুণ্যস্থান পূরণ হয়ে যাচ্ছে খুব সহজেই।
সব মিলিয়ে পশ্চিমবঙ্গ এখন অপরাধীদের স্বর্গ রাজ্য। সারা ভারত থেকে অপরাধীরা পশ্চিমবঙ্গে এসে জুটছে আর ঢুকে পড়ছে সি.পি.এম. এর হার্মাদ বাহিনীতে। আর সেখানে অসুবিধা হলে রয়েছে ইন্দিরা কংগ্রেস আর নকশালদের বিভিন্ন দল উপদল।
নকশালরা এখন দলকে বড় করতে, সারা ভারত জুড়ে আন্দোলন ছড়িয়ে দিতে ব্যস্ত। দলের আকার দ্রুত বাড়িয়ে তোলার জন্য তারা বেকার যুবক, লুম্পেন ও নানান জাতীয় বিক্ষুব্ধ মানুষকে দলে অবাধ প্রবেশাধিকার দিচ্ছে। অপরাধী ও গুণ্ডারাও সহজে দলে ঢুকে পড়ছে নিজেদের স্বার্থ সিদ্ধির উদ্দেশ্য নিয়ে। এদিকে দেশব্রতীর পাতায় পাতায় বিপ্লবী স্বপ্নের প্রচার।, তাদের লাল ঘাঁটির সংখ্যা বৃদ্ধি ও লাল এলাকার প্রসারের খবর। চারু মজুমদার ও অন্যান্য নকশাল নেতারা প্রচার চালাচ্ছেন তাদের গেরিলা এলাকা নাকি বেড়েই চলেছে, অন্ধ্রপ্রদেশের শ্রীকাকুলাম আর মেদিনীপুরের গোপিবল্লভপুর ও ডেবরায় নাকি লাল মুক্ত এলাকা গড়ে উঠেছে।এবং এই এলাকাগুলর স্বাধীন কমিউনিষ্ট সরকার নাকি চীনের স্বীকৃতি পেয়েছে,রেডিও পিকিং থেকে নাকি সেকথা ঘোষণা করা হয়েছে। ভারতের রাজনৈতিক ক্ষমতা দখল করার দিন বুঝি সমাগত।

তাই চারু মজুমদার দলের কাছে আহবান জানিয়েছেন, ‘সত্তরের দশককে মুক্তির দশকে পরিণত করুন’।
চারু মজুমদারের দল নির্বাচন বয়কট করেছে, বয়কট করেছে ট্রেড ইউনিয়ন সংগঠন, ছাত্র সংগঠন ও সব রকমের আইনগত আন্দোলনের পথ।
নকশাল বলতে সাধারণ মানুষের মনে ভীতির সৃষ্টি হওয়া এবং এর ফলে নকশালদের সাধারণ মানুষের থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার সম্ভাবনার কথা চারু মজুমদারপন্থী নকশালরা আদৌ ভাবছেনা। বিপ্লবী স্বপ্ন আর রোমাঞ্চের জোয়ারে ভেসে চলেছে তরুণ নকশালরা। ধীর স্থির ভাবে ভাববার, পরিস্থিতির বিচার বিশ্লেষণ করবার সময় তাদের আদৌ নেই। তারা এখনি, এই মুহূর্তেই রাষ্ট্র ক্ষমতা দখল করতে চায়। চায় কেবল একশান। আর নকশাল নেতারা? তারাও বুঝি একই উচ্ছাসের জোয়ারে গা ভাসিয়েছেন। আর মত পার্থক্য থাকলেও তা প্রকাশ করার দুঃসাহস নেই। একবার সামান্য সন্দেহ প্রকাশ করলে, চারু মজুমদারের মত সম্পর্কে সামান্য প্রশ্ন তুললেই প্রতিক্রিয়াশীল হিসাবে চিহ্নিত হবেন ও খতমের তালিকায় নাম উঠে যাবে।
প্রকৃতপক্ষে নকশাল আন্দোলন চূড়ান্ত অরাজকতার রূপ নিতে চলেছে। আর তাই নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে কেন্দ্রীয় সরকার। এই অবস্থায় হার্মাদদের উপর থেকে কেন্দ্রীয় সরকারের নজর সম্পূর্ণ সরে যাওয়ায় সি.পি.এম. সুযোগটার পরিপূর্ণ সদ্ব্যবহার করে নিচ্ছে। হার্মাদ বাহিনীর এলাকা দখল, লুটপাট ও অন্যান্য অপরাধমূলক কাজ অবাধ গতি লাভ করেছে।


সি.পি.এম. বন্ধ ডেকেছে। সকাল থেকেই কলকাতার দোকানপাট সব বন্ধ।সমর আর তড়িৎ বন্ধের কলকাতা ঘুরে দেখতে বেরোল। রাস্তায় গাড়ি চলাচল বন্ধ,একদম ফাঁকা। সার্কুলার রোডের উপর ইঁটের সাহায্যে স্টাম্প খাঁড়া করে বাচ্চা ছেলেরা ক্রিকেট খেলছে। ফুটপাথ দিয়ে অল্প কিছু লোক হেঁটে চলেছে। মাঝে মাঝে সাংবাদিকদের দু একটা গাড়ি, কখনোবা পুলিশের জিপ আর ভ্যানগাড়ি হুসহাস চলে যাচ্ছে। সারা কলকাতা যেন শ্মশান এ পরিণত হয়েছে। কর্মব্যস্ততার কোথাও লেশমাত্র চিহ্ন নেই। অন্যান্য সময় এই সকাল দশটার কলকাতা কি ভয়ঙ্কর কর্মব্যস্ততায় মুখর হয়ে ওঠে। আজ যেন কোন যাদুকর তার যাদুকাঠির স্পর্শে সারা কলকাতাকে ঘুম পাড়িয়ে দিয়েছে। খাঁ খাঁ হ্যারিসন রোড ধরে হেঁটে চলল সমর আর তড়িৎ। কলকাতার ঘুমন্ত শরীরের উপর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে ওরা পৌঁছে গেল হাওড়া ব্রীজ। গঙ্গায় এখন জোয়ার চলছে। গঙ্গার জল দুকূল ছাপিয়ে ফুঁসে উঠেছে।হাওড়া ব্রীজ সম্পূর্ণ নিথর। সারাদিন গাড়িঘোড়ার দাপটে থরথরিয়ে কাঁপে যে হাওড়া ব্রীজ তারও হৃদস্পন্দন এই বেলা এগারোটার সময় একদম স্তব্ধ।
সমর আর তড়িৎ থমথমে হাওড়া ব্রীজের রেলিংএ ঝুঁকে গঙ্গার জলের খেলা দেখতে থাকে। পিঠে হাতের ছোঁয়া পড়তেই সমর সচকিত হয়ে ফিরে তাকাল। দাড়ি ভর্তি একটা মুখ, মিটিমিতি হাসছে রোগা ছেলেটা।
‘কি সমর চিনতে পারলেনা? দাড়ি রাখার জন্য আমার মুখের জিওগ্রাফী অনেক বদলে গেছে’।
সমর ছেলেটার মুখের দিকে কিছুক্ষন তাকিয়ে থেকে সোৎসাহে চেঁচিয়ে উঠল, ‘আরে, অভীকনা! প্রায় দু বছর পরে দেখা হল’।
অভীক বলল, ‘তুমি কি করছ আগে বল’।
‘আমি এম.এ. পড়ছি। ফাইন্যাল ইয়ার’।
তড়িৎকে দেখিয়ে সমর বলল, ‘আমার বন্ধু তড়িৎ। আমরা একই হোস্টেলে থাকি। বোটানীতে এম.এসসি. পড়ছে’।
অভীক আর তড়িৎ নমস্কার বিনিময় করল। সমর হেসে বলল, ‘এবার অভীকবাবু তোমার খবর বল’।
‘আমি বি.এ. পাশ করেই স্কুলে চাকরি নিয়েছি। বাবা হঠাৎ মারা যাওয়ার ফলে আমাকে চাকরি নিতে হল। বন্ধের কলকাতা ঘুরে দেখতে বেরিয়েছি। তোমরাও নিশ্চই একই মহৎ উদ্দেশ্যে বেরিয়েছ। কেমন দেখছ?’
‘বন্ধতো দারুণ সাকসেসফুল’।
‘ঘোড়ার ডিম। লোকে ভয়ে পথে বেরোচ্ছেনা, দোকানপাট খুলছেনা। ভালোকথা সি.এম. যে নতুন আইডিয়া গুলো দিচ্ছেন তা পড়েছ?’
নকশালরা এখন চারু মজুমদারকে সংক্ষেপে সি.এম. বলে। সমর বুঝতে পারল অভীক এখন প্রত্যক্ষভাবে নকশাল রাজনীতিতে যোগ দিয়েছে। অভীকের প্রশ্নের উত্তরে সমর বলল, ‘হোস্টেলে একটা নকশাল ইউনিট আছে। ওদের কাছ থেকে দেশব্রতী নিয়ে পড়ি। চারু মজুমদারের লেখাগুলোও পড়ি, তবে সবসময় ঠিক বুঝতে পারিনা’।
‘তুমি নিজে কিছু ভাবছনা? এই যে সারা ভারত জুড়ে নকশাল আন্দোলন এমন দ্রুত প্রসার লাভ করছে সেটা তোমাকে ভাবাচ্ছেনা? শ্রীকাকুলামের লালএলাকা কিরকম শক্তিশালী হয়ে উঠছে দেখেছ? ওরা বোধ হয় রেড আর্মিও গঠন করে ফেলেছে। শ্রীকাকুলামই ভারতের ইয়েনান হবে’।
‘হ্যাঁ, এসব বিষয় দেশব্রতীতে পড়েছি। তবে কতদূর সত্যি কে জানে?’
‘তুমিকি বলতে চাও সি.এম. মিথ্যা প্রচার চালাচ্ছেন? পিকিং রেডিওতো এখন নিয়মিত শ্রীকাকুলামের লাল এলাকা সম্বন্ধে প্রচার করছে, সেখানকার স্বাধীন কমিউনিষ্ট সরকারকে স্বীকৃতির কথা ঘোষণা করেছে’।
‘আসলে আমি পরস্পর বিরোধী খবর পড়তে পড়তে ভীষণ কনফিউজড হয়ে পড়ছি। কোনটা সঠিক আর কোনটা বেঠিক বুঝে উঠতে পারছিনা’।
‘কনফিউজড হওয়ারতো কোনো কারণ নেই। তুমি আমাদের লেখাগুলো ভালোকরে পড়, সব বিভ্রান্তি কেটে যাবে, সবকিছু জলের মত পরিষ্কার হয়ে যাবে’।
অভীক পোর্টফোলিও ব্যাগ থেকে একরাশ নকশালী পত্রপত্রিকা বের করে সমরের হাতে দিল। লাল রঙের স্বচ্ছ প্লাস্টিকে বাঁধানো তিনচার ইঞ্চি লম্বা সুন্দর একটা রেডবুক বের করে বলল, ‘এটাতে মাওএর মুল বক্তব্যগুলো সব দেওয়া আছে। সব সময় রেফারেন্সের জন্য কাছে রাখতে হয়। কোনো প্রশ্ন দেখা দিলেই এটা থেকে সঠিক সমাধান পেয়ে যাই। সি.এম. এখন আমাদের শুধুমাত্র রেডবুক ছাড়া বড় বড় অন্যসব মার্কসীয় সাহিত্য পড়ে সময় নষ্ট করতে বারণ করেছেন। আসলে সব মার্কসীয় সাহিত্যের সারকথাইতো রেডবুকে রয়েছে। আমার একটা মাত্র কপি রয়েছে, তাই তোমাকে এটা দিতে পারলামনা। তুমি হোস্টেলের ইউনিটের ছেলেদের বলে অবশ্যই একটা রেডবুক সংগ্রহ করে নেবে’।
সমর পত্রিকাগুলো ভাঁজ করে পকেটে পুরে নিল। অভীককে প্রশ্ন করল, ‘তুমি এখন কোন দিকে যাবে?’
‘এখন বাসার দিকেই ফিরব। বন্ধতো বেশ দেখা হল। নয়া শোধনবাদীদের মানুষকে বিভ্রান্ত করার কত কায়দা!’
সমর বলল, ‘আমরাওতো হোস্টেলে ফিরব। চল একসাথে ফেরা যাক’।
ওরা হ্যারিসন রোড ধরে গল্প করতে করতে ফিরে চলল।


কলকাতায় শীত আরো জাকিয়ে এল। সুবল নাটকের দল নিয়ে কোন্এক গ্রামে রেডগার্ড একশান করতে চলে গেছে। এটা সি.এম. নির্দেশিত একটা বিপ্লবী কাজ।রেডগার্ড একশান মানে হল গ্রামেগঞ্জে রেডবুক হাতে ঘুরে ঘুরে সাখারণ মানুষ বিশেষ করে দরিদ্র কৃষকদের মধ্যে বিপ্লবের বাণি প্রচার করতে হবে। সুবল বলেছে, ‘আইডিয়াটা আমার খুব ভালো লেগেছে। আমাদের দেশের কৃষকদের কাছের থেকে জানার পক্ষে এর চেয়ে ভালো রাস্তা আর নেই। এভাবে রেডগার্ড একশানের মধ্য দিয়ে কৃষকদের নিয়ে নাটক লেখার অনেক মালমশলা পেয়ে যাব’।
অনিরুদ্ধ, প্রকাশ আর বাদল রোজ রাত জেগে শহরের দেয়ালে দেয়ালে নানান রঙে দলের শ্লোগান লেখেঃ
‘চীনের চেয়ারম্যান আমাদের চেয়ারম্যান, চীনের পথ আমাদের পথ’, ‘সত্তরের দশককে মুক্তির দশকে পরিণত করুন’, ‘শ্রেণীশত্রু খতম করুন’, ‘জোতদারের মাথা কাটা চলছে চলবে’ ‘সি.এম. যুগযুগ জিও’, ‘শ্রীকাকুলামের লাল সরকার জিন্দাবাদ’, ‘নয়া শোধনবাদীদের কালো হাত গুঁড়িয়ে দাও’, ‘মাকু’ (মার্কিন কুত্তা) সি.পি.এম.মুর্দাবাদ’, মার্কস-এঙ্গেলস-লেনিন-স্তালিন-মাও-চারু মজুমদারের নানান বাণী।কখনো ওরা স্টেন্সিল করে দেয়ালে দেয়ালে মাও এর ছবির ছাপ আঁকে। সারা কলকাতা ভরে উঠেছে নকশালদের দেয়াল লিখনে। সমর কলকাতার যেখানেই যায় দেখতে পায় নকশালদের দেয়াল লিখন।
একদিন সমর শুনল প্রকাশ আর বাদল কলকাতা ছেড়ে মেদিনীপুরের কোন্গ্রামে চলে গেছে। ওরা আপাততঃ রেডগার্ড একশান করে অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করবে।তারপর হয়তো কোনো গ্রামে নকশাল ঘাঁটি করার চেষ্টা করবে। ওরা আর পড়াশুনা করবেনা। ওরা চলে যাওয়ার পর এখন হোস্টেলের নকশাল ইউনিট চালায় অনিরুদ্ধ। পাড়ার কয়েকটা ছেলেও ওদের ইউনিটে যোগ দিয়েছে। কয়েকটা মস্তানও হোস্টেলে প্রায়ই যাতায়াত করে। নকশাল ছেলেদের সাথে গোপনে বৈঠক করে।
কলকাতায় আজকাল সি.আই.এ. (Central Intelligence Agency) একটা প্রচলিত শব্দ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এক পার্টি আর এক পার্টিকে সি.আই.এ.র দালাল বলে গালি দেয়। আমেরিকার বিদেশের ব্যাপারে গুপ্তচর বৃত্তির এই সংস্থার নাম সমর আগেও অনেক শুনেছে। কিন্তু এখন যেন কথাটা সকলের মুখে মুখে ফিরছে। শোনা যাচ্ছে সি.আই.এ. নাকি ভারতে এখন খুব জাঁকিয়ে বসেছে। সারা পৃথিবী জুড়েই সি.আই.এ.র নানান অপকীর্তির কথা সমর পড়েছে। ভিয়েৎনামের যুদ্ধে সি.আই.এ.বিরাট ভূমিকা নিয়েছে। আফ্রিকা, এশিয়া ও ল্যাটিন আমেরিকার অনেক সরকারের পতন ঘটিয়ে আমেরিকার দালাল সরকারকে ক্ষমতায় বসিয়েছে। সারা বিশ্বে কমিউনিষ্ট আন্দোলনের প্রসার বন্ধ করা সি.আই.এ.র একটা প্রধান লক্ষ্য। ভারতে কমিউনিষ্ট আন্দোলন রোখার জন্য সি.আই.এ. নাকি উঠে পড়ে লেগেছে। ওরা নাকি অশ্লীল বই, অশ্লীল সিনেমা এসবের মধ্য দিয়ে অপসংস্কৃতির প্রচার করে তরুণ সমাজকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করছে। ওরা প্রচুর টাকার প্রলোভন দেখিয়ে পণ্ডিত লোকদের, শিল্পি-সাহিত্যিকদের কিনে নিয়ে নিজেদের কাজ হাসিল করার জন্য ব্যবহার করছে। নকশাল আর সি.পি.এম. পরস্পরের বিরুদ্ধে সি.আই.এ.র সাথে যোগসাজসের অভিযোগ তুলছে।
সমরের প্রায়ই প্রকাশ আর বাদলের কথা মনে পড়ে যায়। দুজনেই খুবই হাসিখুশী আর বিনয়ী ছিল। সমরের সাথে ওদের খুব ভালো আলাপ ছিল। সমর ওদের দল সম্বন্ধে কত প্রশ্ন করেছে, ওদের কাজের সমালোচনা করেছে। ওরা যথাসম্ভব যুক্তি দিয়ে উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করেছে। সঠিক উত্তর দিতে না পারলে বলেছে, ‘আমারা এখন ঠিক বলতে পারছিনা। পড়াশুনা করে পরে বলব’। অনিরুদ্ধ ছেলেটা একটু অন্য ধরণের। কথা কম বলে। চোখে মুখে কাঠিন্যের ছাপ। সমরের ছেলেটাকে বিশেষ পছন্দ হয়না। এখন হোস্টেল ইউনিটের বাকি নকশাল ছেলেগুলো সবই বাইরের। সমরের সাথে কারো পরিচয় নেই। তবে এদের মধ্যের দুজন মস্তান ছেলেকে সমর আগে দেখেছে। সুবলের কাছে ওদের ভয়ঙ্কর কার্যকলাপের কথা শুনেছে। সমর ভাবে, ‘ওরা কি নকশালদের সংস্পর্শে এসে সত্যি ভালো হয়ে গেছে,না আগের মতই আছে?’ আগে দেশব্রতী দিতে এসে প্রকাশ আর বাদল সমরের সাথে অনেক আলাপ করত। সমরের পড়া হয়ে গেলে পত্রিকার দাম আর পত্রিকাটা দেয়ালে সাঁটার জন্য চেয়ে নিয়ে যেত। আজকাল অনিরুদ্ধ টাকা নিতে আসে, পিছনে অচেনা ছেলেগুলো দাঁড়িয়ে থাকে। মস্তান দুটোও থাকে। সমরকে দেশব্রতী দিয়ে ওরা চলে যায়। পরে এসে দাম আর পড়া দেশব্রতীটা ফেরত নিয়ে যায় কোনো কথা না বলেই। ওরা এলেই সমরের গা ছমছম করে। অনিরুদ্ধ ভাবলেশহীন চোখে তাকিয়ে থাকে। মস্তানদুটো কটমট করে তাকিয়ে সমরের ঘরের এদিক ওদিক দেখতে থাকে।
সুবল, বাদল, প্রকাশ কেউই এখন কলকাতায় নেই। তাই সমর এরা এলে ভীষণ অসহায় বোধ করে। ভাবে পরীক্ষা শেষ হওয়া মাত্র হোস্টেল ছেড়ে পালাবে।আরতো মাসখানেক বাকি। কিন্তু এরকম পরিবেশে পড়াশুনাইবা করবে কি করে?একএকবার ভাবে দিদির বাড়ি চলে যাবে। কিন্তু সেখানেতো সবসময় হৈহুল্লোড়,ভিড়ভাট্টা। ওর মধ্যে পড়াশুনা একদম হবেনা। হোস্টেলেত কেউ এমনি ডিস্টার্ব করেনা আর নকশাল ছেলেদের সাথে কোনো শত্রুতাও নেই। ওরাতো সমরের কোন ক্ষতি করছেনা, কোনো জুলুম করছেনা। সমর ভাবে ‘মিছিমিছি ওদের নিয়ে ভাবছি কেন, ভয় পাচ্ছি কেন!’
একদিন সমর দিদির সাথে দেখা করতে গেল। সন্ধ্যা বেলা ফিরে এসে দেখে হোস্টেলে লাইট নেই। হোস্টেলের কয়েক হাজার টাকার ইলেকট্রিক বিল নাকি বকেয়া। তাই সি.ই.এস.সি.(Calcutta Electric Supply Corporation) লাইন কেটে দিয়েছে। সমর চোখে অন্ধকার দেখল। সামনেই পরীক্ষা। নানান কারণে মনের উপর চাপ পড়েছে। তার উপর লাইট না থাকলে পরীক্ষারতো বারোটা বেজে যাবে।সুপারিনটেন্ডেন্ট হোস্টেলে থাকেননা। সমর, তড়িৎ, বিপিন, তারাশঙ্কর, অবিনাশ আর অর্দ্ধেন্দু শ্যামবাজারে সুপারের বাড়িতে গেল। সুপার রাত্রি নটায় বাড়ি ফিরলেন।বললেন, দুচার মাসের মধ্যে এত টাকার বিল মেটানো সম্ভব নয়। সমর কাঁদোকাঁদো স্বরে বলল, ‘তাহলে পরীক্ষা দেব কি করে?’
সুপার বললেন ‘আমি এখন বড়জোর লণ্ঠনের ব্যবস্থা করে দিতে পারি’।
হোস্টেলে ফেরার পর অনিরুদ্ধর সাথে দেখা। সব শুনে অনিরুদ্ধ রেগে আগুন।বলল, ‘শালা সুপার বিল কেমন না মেটায় দেখছি। কাল আমি আপনাদের সঙ্গে নিয়ে সুপারের বাড়ি যাব’।
পরদিন সকালে আবার ওরা সুপারের বাড়ি গেল। আগের দিন যে সুপার হম্বি তম্বি করেছিলেন আজ তিনিই অনিরুদ্ধকে দেখে সিঁটিয়ে গেলেন। একঘণ্টার কথোপকথনের পর বিল মেটানোর চেকের ব্যবস্থা হয়ে গেল। প্রেসিডেন্সী কলেজে ওদের সঙ্গে করে নিয়ে সুপার প্রিন্সিপ্যালের ঘরে কিছুক্ষণ কথা বলে প্রিন্সিপ্যালের সই করা চেক ওদের হাতে দিয়ে বললেন, ‘এখনই জমা দিয়ে এস’। ওরা চেক নিয়ে সটান ভিক্টোরিয়া হাউসে গিয়ে জমা দিয়ে এল। অনিরুদ্ধ সমরকে নিয়ে অফিসারের সাথে দেখা করে কথা বলে এল যাতে ছাত্রদের আসন্ন পরীক্ষার কথা মনে রেখে আজকের মধ্যেই লাইনটা দেওয়া যায়। সেদিন সন্ধ্যার মধ্যেই লাইন এসে গেল।
অনিরুদ্ধর সাথে সমরের এই প্রথম ভালো করে আলাপ হল। ছেলেটাকে বাইরে থেকে যতটা রুক্ষ্ম বলে মনে হয়, আদতে ছেলেটা মোটেই সেরকম নয়। সমর কথা বলে বুঝতে পারল ছেলেটা অন্য অনেকের মত হুজুগে পার্টি করেনা, ছেলেটার মার্কসিজ্মের উপর যথেষ্ট পড়াশুনা আছে।
একদিন অনিরুদ্ধ সমরের ঘরে এল। কিছুটা দ্বিধা করে অবশেষে বলল, ‘সমরদা, একটা উপকার করতে পারলে খুব ভালো হয়’।
‘কি করতে হবে বলো’।
‘আমি জানি আপনার সামনে পরীক্ষা। তাই আপনার যদি পড়ার ক্ষতি হবেনা মনে করেন তাহলেই উপকারটা করবেন’।
‘ব্যাপারটা কি একটু স্পষ্ট করেই বলে ফেল’।
আজ রাত্রে একটা ছেলেকে আপনার ঘরে থাকতে দিলে খুবই উপকার হয়। কাল খুব ভোরেই চলে যাবে। ছেলেটা মেঝেতেই মাদুর পেতে শোবে, আপনাকে একটুও ডিস্টার্ব করবেনা’।
‘সেটা আর এমন কঠিন কি। রাত্রে ছেলাটাকে নিয়ে আমার ঘরে চলে এস’।
‘আর একটা ব্যাপার আপনাকে একটু ফ্র্যাঙ্কলি বলা দরকার। ছেলেটার বিরুদ্ধে খুনের কেস আছে। আজ রাত্রের মত একটা শেল্টার পেলেই কালকে ওকে অন্য কোনো নিরাপদ জায়গায় পাঠানোর ব্যবস্থা করতে পারব। আপনার ওকে ভয় পাওয়ার কিছু নেই। গুণ্ডা বা প্রফেশনাল খুনী নয়। রাজনৈতিক কারণে কেসে জড়িয়ে পড়েছে। আজ ওকে শেলটার না দিতে পারলে ধরা পড়ে যাবে। হোস্টেলের দিকে পুলিশের এখনো নেকনজর পড়েনি। তাই এটা নিরাপদ জায়গা। আপনার সিঙ্গল সিটেড রুম, তাছাড়া আপনাকে বিশ্বাসও করা যায়’।
‘ঠিক আছে পাঠিয়ে দিও, আমিত আগেই কথা দিয়েছি’।
‘কি বলে যে আপনাকে ধন্যবাদ জানাব!’


কথাতো দিল, বিন্তু সারাদিন ধরে ব্যাপারটা সমরকে উত্যক্ত করে চলল। কেনই বা অনিরুদ্ধকে কথা দিতে গেল। ও তো কোনো জোরাজোরি করেনি। অবশ্য অনিরুদ্ধ এমন ভাবে বলল যে কথা না দিলেও অমানবিক স্বার্থপরতা বা মেরুদন্ডহীন কাপুরুষতার পরিচয় দেওয়া হত। যখন কথা দিয়েই ফেলেছে, চিন্তা করে আর কি লাভ? একটাত মাত্র রাত, কোনোরকমে কেটে যাবে। সমর চিন্তামুক্ত হতে চেয়েও পারেনা। ছেলেটা খুনের আসামী। নিশ্চই অনেক খুন করেছে। চেহারা কেমন হবে কে জানে। ওই মস্তানগুলোর মতই হয়ত, আর ওরকম ভয়ঙ্কর কাটখোট্টা ব্যবহার।সমরের সাথে কি রকম ব্যবহার করবে কে জানে? অনিরুদ্ধ অবশ্য কথা দিয়েছে ছেলেটা নিজের মতই থাকবে, সমরকে সামান্য ডিসটার্ব করবেনা। তবুওতো খুনী,কখন মাথায় কি মতলব চাপবে কে জানে। একটা চাপা ভয় আর অস্বস্তি সমরকে প্রতিমুহূর্তে উত্যক্ত করে চলল। সারাদিন কিছুতেই পড়াতে মন বসাতে পারলনা।
সন্ধ্যার দিকে তড়িতের সাথে শিয়ালদা স্টেশনে গেল। তড়িতের সাথে কথা বলে দুশ্চিন্তাটাকে ভুলেথাকার চেষ্টা করতে লাগল। শিয়ালদা স্টেশনে বিচিত্র মানুষের প্রবাহ নিরবচ্ছিন্ন ভাবে চলেছে। সমর আর তড়িৎ একটা বেঞ্চে বসে যাত্রী প্রবাহ দেখতে লাগল। ওদের বেঞ্চটাও মানুষে ঠাসাঠাসি। সুন্দরী মেয়ে দেখলেই তড়িৎ হাঁ করে তাকিয়ে থাকে। সমরও তাকায়। তড়িৎ বলে, ‘গুরু, তুমিত খুব মেয়েদের সাথে মিশতে পার’।
‘তাতে তোমার কি দরকার? ওসব বুদ্ধি মাথায় ঢুকিয়োনা বাছাধন। পড়াশুনা একদম গোল্লায় যাবে। পথে ঘাটে চলন্ত মেয়ে দেখছ ঠিক আছে। ওদের কাছে ঘেঁষতে গেলেই বিপদ। একদম উম্বের মধ্যে পুরে নেবে’।
তড়িত হাসতে হাসতে বলল, ‘তোমার গুরু নিশ্চই সেরকপম অভিজ্ঞতা হয়েছে?’
‘হবেনা মানে। ওরে বাবা সে কি বিপদ! একটা তাগড়াই মেয়ে আমাকে একদম ভিতরে পুরে নিয়েছিল। সে কি অন্ধকার। কোনোরকমে পিছলে বেরিয়ে চোঁচাঁ দৌড়’।
তড়িতের সাথে সাথে বেঞ্চের আর সবাইও হো হো করে হাসতে লাগল। সমর এরকম রসিকতা সুবলের কাছ থেকে শিখেছে। এমনকি অনেক সময় সুবলের মুদ্রাদোষ গুলোও অনুকরণ করে। একজন বলল, ‘দাদা আর একটা ছাড়ুন না’।
সমর হেসে বলল, ‘আজ আর সময় পাবনা’। বলে উঠে পড়ল। প্ল্যাটফর্মের গেটের কাছে একটা ঝাঁকাওয়ালার সাথে টিকিট কালেক্টরের বচসা বেধেছে।সম্ভবতঃ বখরার পয়সা কম দিয়েছে। আর একটা ঝাঁকাওয়ালাকে দেখে ‘দূর শালা’বলে আগেরটা ছেড়ে নতুন ঝাঁকাওয়ালাটার দিকে ছুটল।
শিয়ালদা স্টেশন থেকে বেরিয়ে আসার পর সমরের আবার মনে পড়ল আজ রাতে ছেলেটা আসবে। একটা খুনি। সমরের জীবনে বুঝি ভয়ঙ্কর কিছু ঘটতে চলেছে।একজন খুনির সাথে রাত্রি যাপন করতে হবে। পথ চলতে চলতে তড়িৎ বকবক করে চলে। সমরের কানে কোনো কথা ঢোকেনা। সেই দুঃস্বপ্নটা সমরের সমস্ত সত্তাকে গ্রাস করেছে।
রাত্রি এগারোটার পর ছেলেটা আসবে যাতে অন্য ছেলেদের চোখে না পড়ে যায়।আবার খুব ভোরে উঠে চলে যাবে। রাত্রের খাওয়া সেরে সমর ছাতে পায়চারি করতে লাগল। সেই ভয়ঙ্কর মুহূর্তটা ক্রমে এগিয়ে আসছে। ছেলেটা যদি কোনো কারণে না আসে সমর তাহলে এই ভয়ঙ্কর অবস্থা থেকে মুক্তি পায়। না, রেহাই পাওয়ার কোনো রাস্তাই নেই। ছেলেটা আসবেই। ওর পক্ষে আজ রাতে অন্য কোথাও যাওয়া সম্ভব নয়।
দমবন্ধকরা অস্বস্তি নিয়ে সমর ছাত থেকে ঘরে ফিরে একটা সিগারেট ধরাল।একটা নবকল্লোলের পাতা খুলে এলোমেলো চোখ বুলিয়ে চলল। কিন্তু বইয়ের পাতায় কিছুতেই মন বসাতে পারছেনা। একটা জমাটবাধা অন্ধকার যেন ওকে গ্রাস করতে ছুটে আসছে। সমর অনুভব করে একটা ভয়ঙ্কর কিছু ঘটতে চলেছে।
‘সমরদা পড়ছিলেন?’
অনিরুদ্ধের গলার স্বরে সমর চম্কে চোখ তুলে দেখে অনিরুদ্ধ আর তার পাশে একটা কিশোর। রুক্ষ্ম চুল, রুগ্ন চেহারা। সবে গোঁফের রেখা দেখা দিয়েছে। হাতে একটা ছোট ফোলিও ব্যাগ।
সমর অনিরুদ্ধকে সম্বোধন করে বলল, ‘তোমরা ভেতরে এস’।
অনিরুদ্ধ বলল, ‘না আমি আর ভেতরে যাবনা। এই সেই ছেলেটা, নাম হারু।আপনাকে কোনরকম বিরক্ত করবেনা’।
তারপর ছেলেটাকে উদ্দেশ্য করে বলল, ‘দাদার কিন্তু সামনে পরীক্ষা। রাতটা চুপচাপ কাটিয়ে দিবি, কোন রকম অসুবিধা সৃষ্টি করবিনা। আমি ভোরে এসে তোকে ডেকে নিয়ে যাব’।
ছেলেটা একটু দ্বিধা করে ঘরে ঢুকল। অনিরুদ্ধ বলল ‘সমরদা আমি চলি এবার।আপনি দরজা বন্ধ করে দিন’। ঘরে ঢুকে হারু জড়ো সড়ো ভাবে দাঁড়িয়ে ছিল। সমর দরজা বন্ধ করে হারুকে বলল, ‘তুমি খাটে এসে বোস’। ছেলেটা জড়োসড়ো হয়ে খাটের কোণে এসে বসল। মৃদু স্বরে বলল, ‘আপনাকে অনেক বিরক্ত করছি দাদা’।সমর অন্যমনস্ক ভাবে বলল, ‘বিরক্তটা করলে কোথায়?’
বিস্ময় সমরের চিন্তাকে তোলপাড় করে চলেছে। এই সেই খুনি ছেলে যার চিন্তা সমরকে এক আতঙ্ক হয়ে সারাদিন তাড়িত করেছে! অনিরুদ্ধকি অন্যকোনো ছেলেকে পাঠাল নাকি? সমরের দিকে তাকিয়ে হারু মৃদু স্বরে বলল, ‘দাদা আমি একটু পোশাক বদলে নিচ্ছি। আপনি বোধহয় পড়াশুনা নিয়ে খুব চিন্তা করছেন?’
হারু ব্যগ খুলে পাজামা বের করে প্যান্ট ছেড়ে পাজামা পরল। একটা ছোটো সতরঞ্চি বের করে মেঝেয় পাতল, তারপর বলল, ‘দাদা আপনি পড়াশুনা করুন,আমি মেঝেতে শুয়েই রাত কাটিয়ে দেব। আমার অভ্যাস আছে’।
‘মাথার বালিশ লাগবেনা?’
হারু হেসে বলল, ‘আমাদের কি আর অত বিলাসীতা করলে চলে? বনে জঙ্গলে ঘুরতে হয়, তখনতো সতরঞ্চিও পাইনা। কতদিন না খেয়ে না ঘুমিয়ে কাটে’।
হারু দেয়ালে হেলান দিয়ে সতরঞ্চির উপর বসল। তারপর কয়েকটা পত্রিকা বের করে পাতা ওলটাতে লাগল। সমর সিগারেট ধরাল। বলল, ‘হারু, সিগারেট খেতে পার ইচ্ছা করলে’। হারু হেসে বলল, ‘দাদা আমি ওই নেশাটা এখনো ধরতে পারিনি, তবে খইনির অভ্যাস আছে। আপনি খইনি খাবেন দাদা, আমি বানাচ্ছি?’
সমর হেসে বলল, ‘খুব একটা অভ্যাস নেই, তবে কেউ দিলে খাই মাঝে মাঝে’।
হারু কাগজের মোড়ক থেকে তামাক পাতা আর চূণ বের করে খইনি টিপতে শুরু করল। হারুকে দেখে কেমন করুণ মনে হচ্ছে। সমর কেন যেন ওর ওপর মমতা বোধ করতে থাকে। সমর প্রশ্ন করল, ‘হারু তুমি পড়াশুনা করতে?’
‘ইলেভেন ক্লাশে পড়তাম, ছেড়ে দিয়েছি। বুর্জোয়া শিক্ষা নিয়ে কি লাভ?’

‘তুমি নিশ্চয় মার্কসিজম নিয়ে পড়াশুনা কর কিছু কিছু’।
‘পড়ে আর কতটুকু বুঝব বলুন? সি.এম. সবকিছু আমাদের জন্য সহজ করে লিখেছেন। সেগুলোই আমরা পড়ি। তা ছাড়া মাওএর রেডবুকও পড়ি’।
‘তোমার বাড়ির লোকেরা তোমার কথা চিন্তা করেননা?’
‘বাড়ির সবাইতো ধরে নিয়েছে আমি আদৌ বেঁচে নেই’। হারু জানলার কাছে গিয়ে খইনিতে কয়েকবার চাটি দিয়ে ফিরে এসে সমরের সামনে খইনি এগিয়ে দিয়ে বলল, ‘আপনার যেটুকু লাগে তুলে নিন’। সমর যৎসামান্য খইনি তুলে থোঁটের ফাঁকে গুঁজে দিল। বাকিটা হারু ছুঁড়ে থোটের ফাঁকে ফেলে দিল। সমর বলল, ‘তোমার বাড়িতে কে কে আছেন?’
‘বাবা-মা ভাই-বোন সব আছে। আমি বাড়ির বড় ছেলে। বাবা ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টে গার্ডের চাকরি করেন’।
‘তোমার বাবা-মা ভাই-বোনের কথা মনে পড়েনা?’
‘মাঝে মাজে মনে পড়ে। তবে ঐসব বুর্জোয়া সেন্টিমেন্টকে মন থেকে তাড়ানর চেষ্টা করি সব সময়। আপনি পড়ুন। আপনার অনেক সময় নষ্ট করলাল’।
হারু একটা পত্রিকার পাতা উলটে আনমনে কি ভাবতে লাগল। মুখটা কেমন করুন হয়ে এল। সমর একটা নোট খাতা খুলে মনোযোগ দেওয়ার চেষ্টা করল। হারু খইনির থুথু ফেলতে জানলার কাছে গেল। জানলার গরাদ ধরে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকল। ফিরে এসে সমরকে বলল, ‘আপনাকে একটা জিনিস দেখাব। অনিরুদ্ধদাকে আবার বলে দেবেননা’।
হারু একটা মাণিব্যাগের ভিতর থেকে একটা ছোট ফটো বের করল। সমর দেখে একটা বছর পাঁচেকের ছোট্ট ছেলে। বেশ আদুরে চেহারা। পরণে হাফপ্যান্ট আর সার্ট,কাঁধের উপর প্যান্টের বকলস।
হারু মৃদু হেসে বলল, ‘এটা আমার ছোট ভাইএর ফটো। খুব আল্লাদী আর দারুন বুদ্ধি। আমি যেদিন বাড়ি থেকে শেষ চলে আসি, তা প্রায় তিনচার মাস হবে, অপু বলল, “দাদা এবার আসার সময় আমার জন্য পুতুল কিনে আনবে, ওইযে টিপলে হাঁসের মত প্যাঁক প্যাঁক করে”। আমাকে খুব ভালো বাসত, হয়ত কেঁদে কেঁদে রোগা হয়ে গেছে’। হারু চোখের জল আড়াল করতে জানলার কাছে চলে গেল – এসব বুর্জোয়া সেন্টিমেন্ট বিপ্লবীদের বুঝিবা নিষিদ্ধ।
পরদিন ভোরে অনিরুদ্ধ হারুকে ডেকে নিয়ে গেল। হারু সমরকে জাগিয়ে বলল, ‘চললাম দাদা। আপনার উপকার কখনো ভুলবনা’। সমর আবার ঘুমিয়ে পড়ল।
এম্.এ. পরীক্ষা শুরু হয়ে গেল। প্রথম কয়েকটা পেপার নির্বিঘ্নেই হল। তারপত ইউনিভার্সিটি নানান অজুহাত দেখিয়ে পরীক্ষা পিছোতে শুরু করল। কিছু কিছু ছাত্রও পরীক্ষা পিছোনোর দাবি তুলল। সমর বার বার প্রিপারেশন নেয় আর পরীক্ষা আবার পিছোয়। এদিকে অজয় মুখার্জী পদত্যাগ করার ফলে যুক্তফ্রন্ট আবার ভেঙ্গে গেল।আবার রাষ্ট্রপতির শাসন শুরু হল পশ্চিমবঙ্গে।
সমরদের পরীক্ষা গড়িয়ে গড়িয়ে শেষে মে মাসে শেষ হল। পরীক্ষার পর সমর দেশের বাড়ি ফিরে গেল।


Next: Chapter 7 >

Previous: Chapter 5 >


Dr.Ratan Lal BasuRatanlal Basu, Ph.D. (Economics) is an ex-Reader in Economics and Teacher-in-Charge, Bhairab Ganguly College, Kolkata, India. Dr. Basu has written & edited several books on Economics.

Apart from his passion for the field of Economics, Dr. Basu's other interests are Boxing & Small Game Hunting (gave up the nasty games during college life); Swimming in Turbulent Rivers (physically impossible now); Himalayan Treks, Adventure in Dense Forests, Singing Tagore Songs and also writing travelogues and fiction in Bengali and English.

Dr. Ratan Lal Basu can be reached at rlbasu [at] rediffmail.com.




blog comments powered by Disqus

SiteLock