সুদীপ উড্ডীণ শ্রীরামপুরীর গল্প বাদামী মনির চোখ

বাদামী মনির চোখ

শুঁড়েকালনা থেকে তারকেশ্বর আসব। বাস স্ট্যান্ডে এসে শুনলাম বাস আসার তখনো কিছু সময় বাকি। বাস স্টান্ডের লাগোয়া চায়ের দোকান। এগিয়ে গেলাম দোকানের দিকে। দোকানের ঠিক সামনে বাঁশের বেঞ্চি, বেশ লম্বা পাঁচ ছয় জন ভালো করে বসা যায়। জনা দুই আপেক্ষারত বাসের যাত্রী বসে চা খাচ্ছিলেন। আমিও অদের পাশে বেঞ্চির এক ধারে বসে, দোকানিকে এক কাপ চা দিতে বললাম। তেলচিটে বয়ামে লোকাল বেকারীর তিন-চার রকমের বিস্কুট দেখে, রং ছাড়া খাস্তা লেড়ো বিস্কুটটা দিতে বললাম।

দোকানির চা বানাবার ফাঁকে এদিক ওদিক তাকিয়ে দেখছি। আমার ডানদিকে পায়ের কাছে চোখ পড়তেই খেয়াল করলাম সাধারণত এই অঞ্চলে রাস্তায় থাকে রকম একটা বড়সড় কুকুর শুয়ে আছে। ভাল করে তাকাতেই দেখলাম লালচে মেটে রঙের লোমওলা কুকুরটা পেটে ভর দিয়ে, সামান্য কেত্রে প্রসারিত সামনের দুটো পায়ের ওপর মাথা রেখে বাদামী মনির চোখে আমায় লক্ষ্য করছে। দৃষ্টিটা আমার দিকেই নিবদ্ধ।

দোকানি আমায় চা-বিস্কুট এগিয়ে দিলে, আমি হাত বাড়িয়ে নেবার সময় স্পষ্ট দেখলাম; বিন্দুমাত্র শরীর না নাড়িয়ে, শুধু চোখের পেশী ভ্রু বেঁকিয়ে আমার হাত বাড়িয়ে চা-বিস্কুট নেওয়া লক্ষ্য করছে কুকুরটা। চায়ের গ্লাসে চুমুক দিলাম। গরম চা গলা দিয়ে নেমে গেল। বেশ আরাম বোধ হল। ফের আর এক দফা চায়ের গ্লাসে চুমুক দিতে গিয়ে আবার আমার চোখ পড়ল লালচে মেটে লোমের কুকুরটার দিকে। দেখি আগের মতই স্থির দৃষ্টিতে বাদামী মনির চোখ দিয়ে আমার তারিয়ে তারিয়ে চা-পান করা লক্ষ্য করছে। ভীষণ অস্বস্তি হতে শুরু করল। কুকুরটা আমায় অমন করে দেখছে কেন? আমায় কি চেনে? কুকুরটার তো আমাকে চেনার কথা নয়। মনে হয় চিনেছে ... আগে হয় তো দেখেছে অন্য কোথাও ... মুখটা মনে করতে পারছে না; তাই ডেকে উঠে আমাকে বিব্রত করতে চাইছে না ... তবে মনে হয় চিনতে পেরেছে, নইলে অমন করে এক ভাবে আমাকে দেখবে কেন? সাত পাঁচ ভাবছি আর অস্বস্তি বেড়েই চলছে।

নাঃ, এভাবে অচেনা দৃষ্টির সামনে নিজেকে নিয়ে বিব্রত হবার থেকে মুক্তি পেতে হবে। বাদামী মনির দৃষ্টি থেকে নিজের চোখ সরাবার জন্য সামান্য দূরে এক গ্রামের বউ তার বাচ্চা সামলাচ্ছিল , সে দিকে চোখ ফেরালাম। তবু কি অস্বস্তি যায়? কুকুরটা কি এখনো আমাকে দেখছে? আড়চোখে তাকালাম। দেখি আমার দৃষ্টি অনুসরণ করে, ওর বাদামী মনির চোখ দুটো আমার দিক থেকে, গ্রামের বউ তার বাচ্চাটাকে দেখে নিল; এবং তারপরই আবার আমার দিকে বাদামী মনি দুটো ঘুরে এসে স্থির হয়ে গেল। এবার মনে হল, বাদামী মনি দুটোর দৃষ্টি যেন আরো গভীর হয়েছে।

উফ্‌, কি সাংঘাতিক অস্বস্তি আচ্ছা, এত গভীর ভাবে আমার দিকে তাকানোর কারণ কি হতে পারে? কি ভাবছে ? চায়ের গ্লাসে আবার চুমুক দিয়ে বিস্কুটটা কামড়াতে গিয়ে বেশ কিছুটা বিস্কুটের টুকরো ভেঙ্গে পড়ল কুকুরটার মুখের কাছে। ওর নাকের থেকে ইঞ্চি দুই দুরে। ওর মুখের পাশের শক্ত খাড়া লোমগুলো, মানে মুখের পাশের গোঁফগুলো একটু কেঁপে নড়ে উঠল। ভাবলাম, মুখটা এগিয়ে নিয়ে ওই টুকরো গলার্ধকরণ করবে; কিংবা হয়ত, এবার উঠে আসবে আমার আরো কাছে আরো একটা বিস্কুটের আশায়। কি আশ্চর্য্য! ব্যাটা নড়লই না; ... না উঠলো, ... না করল বিস্কুট নেবার চেষ্টা। কেবল ওর ল্যাজটা মাটি ঝাড়ণ দেওয়ার মত করে ঠিক দুবার দুলে উঠলো, ... ডান থেকে বাঁয়ে ... আবার বাঁ থেকে ডাইনে ... ব্যাস্‌ ... ঐটুকু! ব্যাটা বড়লোকের কুকুর বোধহয়, খাস্তা লেড়ো মূখে রোচে না ! আবার আমার দিকে প্যাঁট্প্যাঁট্করে তাকিয়ে আছে। আমার দিকে তাকানো অবস্থায় ওর মুখের মাংসপেশী টান টান হল, গোঁফগুলো ছড়িয়ে গেল, কয়েকটা দাঁত বেড়িয়ে এল মনে হল আমার অস্বস্তি, চা-পান বিস্কুট খাওয়া দেখে বেশ মজা পেয়েছে, তাই হাসবে কি হাসবে না বুঝতে না পেরে ... হাসবে না ভেবেও ফিক্করে হেসে নিল। ওর হাসি দেখে, সত্যি বলছি, আমার কেমন একটু লজ্জা হলো। আমিও ঠোঁট দুটো ফাঁক করে লাজুক মানুষের হাসি হেসে দিলাম। কুকুরের ভদ্রতা জ্ঞান দেখলাম মানুষের চেয়ে কম কিছু নয়। চোয়ালের মাংসপেশী আরো টান্‌-টান্করে দাঁতগুলো আরো একটু বেশী উন্মোচিত করে আমার হাসির প্রত্যুত্তরে আরো একবার হেসে নিল। ইংরেজীতে যাকে বলে রেসিপ্রকেট করা। বাঃ, ভারি ভদ্র বলতে হবে! এবার আমার অস্বস্তি হওয়াটা আরো একটু কমলো। কিন্তু এত কিছুর মধ্যেও আমার দিক থেকে ওর দ্রৃষ্টি একবারের জন্য সরাতে দেখলাম না। কি অদ্ভুত না?

অচেনা কুকুর দেখলে সাধারণতঃ আমি তার গায়ে হাত দিয়ে কখন আদর করি না। তবে ব্যতিক্রমী এবং আমিও আমার স্বভাব বিরুদ্ধ কাজ করলাম। অবশ্য গায়ে হাত না দিয়ে, জুতো পড়া একটা পা বাড়িয়ে ওর প্রসারিত সামনের পায়ে আলতো করে ছোঁয়ালাম। খুব ভয় ছিল। কারণ কুকুরটা যেমন জ্ঞানী মনে হলো, তাতে যদি পা ঠেকানোর জন্য অপমানিত বোধ করে এবং আমায় রাগ দেখিয়ে কামড়ে দেয়, ... তাহলে তো চোদ্দোটা ইংজেক্শন! আমার এই আচরণের জন্য ওর কোন ভ্রুক্ষেপ লক্ষ্য করলাম না। আমার দিকে এক ভাবে তাকিয়ে থাকলো।

আমার চা খাওয়া হয়ে গিয়েছিল। বেঞ্চির তলায় গ্লাসটা রাখতে গিয়ে একটু নীচু হতেই দেখলাম, কুকুরটার ডান কানের কাছে একটা ডাঁশ কামড়ে বসে আছে, রক্ত শুঁষে খাচ্ছে। ওর পিছনের ডান পাটা তুলে এনে কুকুরদের স্বভাবসিদ্ধ কায়দায় ডাঁশটাকে কানছাড়া করল। ডাঁশটা কানছেড়ে উড়ে ওর ঘাড়ে আসীন হল। এবার ঘাড়টাকে ঘড়ির পেন্ডুলামের মত এপাশ ওপাশ ঝাঁকিয়ে ডাঁশটাকে ঘাড়চ্যুত করে পিঠ থেকে লেজ অবধি দাঁত দিয়ে কুচ্কুচ্শব্দ তুলে কামড়ে কামড়ে চুল্কে নিল। তারপর শরীরটাকে ধনুকের মত বেঁকিয়ে আড়মোড়া ভেঙ্গে সজোরে গাঝাড়া দিয়ে চার পায়ে উঠে দাঁড়াল। এবার আমার দিকে একটু এগিয়ে এসে পিছনের পা মুড়ে, সামনের পায়ের উপর ভর করে সোজা হয়ে আমার মুখোমুখি বসে, আমার দিকে দুই চোখের বাদামী মনি তুলে তাকিয়ে রইল। এবার চোখের ভাষা যেন সামান্য বদল হয়েছে। আমার সঙ্গে চোখচুখি হতে ওর মাথাটা আমার হাঁটুর দিকে এগিয়ে দিল। আমি বুঝতে চেষ্টা করলাম কি চাইছে? আমি ওর কানের গোড়ায়, যেখানে ডাঁশটা বসেছিল, ধীরে ধীরে চুল্কে দিলাম। ওর চোখ আরামে বুজে এল, তারপর চোখ দুটো খুলে আমার দিকে তাকিয়ে, মুখের উপর দিকের মাংসপেশী টান্টান্করে কয়েকটা দাঁত কিঞ্চিত বার করে যেন ছোট্ট করে কৃতজ্ঞতার হাসি হাসল।

ইতিমধ্যে বাস স্ট্যান্ডে একজন দুজন করে কিছু লোক জড়ো হয়েছে। বুঝলাম বাস আসার সময় হয়েছে। আমি দোকানীকে বললাম দুটো বিস্কুট দিনতো দোকানী জানতে চাইল বিস্কুট কার জন্য চাইছি আমার নিজের জন্য, না কুকুরটার জন্য। আমি জানালাম কুকুরটার জন্য। দোকানী বলল বাবু ওকে বিস্কুট দিলেও খাবে না। নষ্ট হবে। নিজের উর্পাজন করা অন্ন ছাড়া অন্য কিছু খায় না। আমার দোকান পাহারা দেয়; সকাল থেকে রাত্রি অব্ধি যতক্ষণ দোকান খলা থাকে, এক জায়গায় বসে থাকে। আমি দোকানে থাকলে, হয়তো এদিক ওদিক ঘুরে আসে। দোকানে আমি না থাকলে ওই খানে ঠায় বসে থাকবে কোথাও যায় না। আমি সকালে দোকান খুলে ওকে একটা গোটা পাউরুটি আর চা দিই ওর বাটিতে, দুপুরে আমার সঙ্গেই ডাল, ভাত, মাছ খায়, রাতে আমার বাড়ী গিয়ে দুটো রুটি দুধ দিয়ে খেয়ে আমার চাতালে সারারাত শুয়ে থাকে। আবার সকাল হলে আমার সঙ্গে দোকান খুলতে আসে। বাব্বু আপনাকে কি বলব, ওর জন্য আমি ছেলেমেয়েদের নিয়ে ওদের মামাবাড়ী যেতেও পারি না আমি শুনে অবাক স্তব্ধ। যাকে নিয়ে এত কথা, দেখলাম বাদামী মনির চোখ দুটো আমার দিকে শান্তভাবে তাকিয়ে।

দূরে বাসের ইঞ্জিনের আওয়াজ শুনে আমি বেঞ্চি ছেড়ে উঠে দাঁড়ালাম। চা বিস্কুটের দাম মিটিয়ে দিয়ে কুকুরটার দিকে একবার তাকালাম। আমাকে তখনো দুটো বাদামী মনির চোখে আমায় দেখছে। ওর গলায় মাথায় হাত বুলিয়ে বিদায় নিলাম। আহ্লাদ জানালো ঘর্ঘর্শব্দ করে। আমার হাঁটুতে মুখ কানের লতি ঘষে যেন প্রত্যুত্তর জানাল। ইতিমধ্যে বাসটা দৃষ্টিগোচর হয়েছে। দূর্গাপুর তারকেশ্বর বাস আসছে। বাস স্ট্যান্ডে দাঁড়ানো যাত্রীরা একটু চঞ্চল হয়ে উঠল। কুকুরটাও দেখলাম উঠে বাসের কাছে এল এগিয়ে

বাস এসে দাঁড়াতে, কন্ডাক্টর দরজা খুলে দিল। অন্যান্যদের সঙ্গে আমিও বাসে উঠলাম। বাসে ওঠার মূহুর্তে একবার পিছন ফিরে তাকাতেই দেখি বাদামী মনির আমার দিকে তাকিয়ে আছে। স্থির দৃষ্টিতে আমার চলে যাওয়া দেখছে। আমার চোখে ওর চোখ পড়তেই, আস্তে আস্তে লেজটা নাড়িয়ে আমায় বিদায় জানাল।

 বাস ছেড়ে দিতে, আমি এগিয়ে গিয়ে জানালার ধারে বসে পড়লাম। চলন্ত বাসের জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে আছি। একে একে সরে যাচ্ছে সবুজ ধানক্ষেত, নারকেল গাছের সারি, পুকুরের ধার, রাস্তার পাশে কুঁড়ে ঘরের উঠোন, সূর্য্য ডোবা আকাশের সিঁদুরে মেঘ। মেঘের দিকে চোখ পড়তে মনে হল এক জোড়া বাদামী মনির চোখ আমার দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। মূহুর্তে আমার সারা শরীরে একটা শিহরণ খেলে গেল, হয়ত সেটা শুধু ভাললাগার নয় ... ভালবাসারও।