প্রতিবিম্ব - তারক ঘোষ (ছোট গল্প) Pratibimba (Reflection) Bengali Short Story by Tarak Ghosh (WBRi Bengali Online Magazine)

"Pratibimba" by Tarak Ghosh of Kolkata is a short story in unicode Bangla font published in WBRi Bengali Online Magazine section. Tarak is a writer and a journalist, managing editor of NEWS3, and former journalist for the Bartaman, the Telegraph and other dailies and journals.

You can send your creative writing to submissions@washingtonbanglaradio.com for consideration towards publication.


Tarak Ghosh

প্রতিবিম্ব


তারক ঘোষ


খোলা দরজা দিয়ে চোখে পড়লো বারান্দায় দাঁড়িয়ে রয়েছে সমুদ্র। লতিয়ে ওঠা মাধবীলতাটার গা ঘেঁষে।  নিশ্চুপ, নিশ্চল। শুধু মৃদু হাওয়ায় তিরতির করে কাঁপছে মাধবীলতার পলকা শরীরটা। এক চিলতে রাত আলো অন্ধকারের পটভূমিতে আধো-আলোকিত করে রেখেছে সমুদ্রকে।দেওয়াল ঘড়িটার দিকে তাকালাম।রাত তিনটে।এই গভীর রাতে এত  বিভোর হয়ে কী দেখছে সমুদ্র ! বিছানা থেকে নেমে পায়ে পায়ে গেলাম বারান্দায়।দূরে অন্ধকারের বুকে মাথা উঁচিয়ে দুটো ইউক্যালিপটাস।

সমুদ্রকে ছুঁয়ে দাঁড়ালাম। ও আগের মতই নিশ্চল ।আমার পায়ের শব্দ,পাশে গিয়ে দাঁড়ানো কোন কিছুই ওর তন্ময়তাকে ভাঙতে পারে না।বললাম , ‘ঘুম আসছে না?’

আমার কণ্ঠস্বরে ফিরে তাকাল সমুদ্র। গভীর চোখে কিচুক্ষণ তাকিয়ে রইল আমার দিকে। তারপর হঠাৎ বলে উঠল, তুমি শিশিরের শব্দ শুনতে পাও তমসা? উত্তর নয়,শুধু প্রশ্নের বদলে পালটা প্রশ্ন।তবে কেন জানিনা, রাত শেষের পটভূমিতে সমুদ্রের এই প্রশ্নটা আমার মন ছুঁয়ে গেল।

বললাম, ‘কই না তো।’

সমুদ্র বলল, ‘ আমি পাই।জান তমসা, আমি শুনতে পাই শিশিরের শব্দ।দিনের কাছে নিজেকে সঁপে দেওয়ার আগে রাত্রি কাঁদে।ওর কান্না ঝরে পড়ে শিশির হয়ে।‘

সমুদ্র আমার চোখে চোখ রাখে। ওর দু চোখে এক আশ্চর্য স্বপ্ন।ঘুমভাঙ্গা চোখে কি স্বপ্নরা জেগে থাকে ! জানি না।

আমি ওর হাত ধরে আলতো টান দিলাম।

- ঘ্ররে চল। রাত শেষ হতে এখনও বাকি।

বদলে গেছে সমুদ্র।নিজের চারদিকে টেনে দিচ্ছে এক অদ্ভুত অচেনা গণ্ডী।পরিচিত জগৎ থেকে এ যেন এক স্বেচ্ছা নির্বাসন।

আমার ভীষণ কান্না পাচ্ছে। কিছুতেই চেপে রাখতে পারছি না বুকের মধ্যে জমে থাকা কষ্টটাকে। চোখ ভিজে গেল জলে। আমি কাঁদতে লাগলাম।এক বরফ শীতল কান্না।

আমি তো তমসা। আমার কান্নাতেও কি শিশির ঝরে? সমুদ্র জেগে থাকলে হয়ত বলতে পারত। আজ বিকালে মাকে ফোন করেছিলাম।অনেক কথাই হল।সংসার নিয়ে, শরীর নিয়ে।মা ঘুরে ফিরে শুধু বাচ্চা না হওয়ার কথাই বলতে লাগলেন।একবার ভাবলাম,মাকে বলি সমুদ্রের এই বদলে যাওয়ার কথা। কিন্তু কী বলব। ওর মধ্যে খোলা চোখে খুঁজে পাওয়ার মত আস্বাভাবিকতা কোথায় ! অফিস যায়,সময়মত বাড়ি ফেরে।বাড়ির কাজকম্মও করে।উইক এন্ডে একটু আধটু বাইরে যাওয়া।তাও করে।

রাতের বিছানাতেও একই রকম চঞ্চল সমুদ্র। তার উদ্দাম তরঙ্গে আমার শরীরে ঝর্ণা জাগে পাহাড় ভেঙ্গে নদী বয়ে যায়। তবু মনে হয় তার মন কোথাও ছু্ঁযে থাকে না। শুধু ফাগুনের বাউল বাতাসের মত এলোমেলো বয়ে যায়। মাঝে মাঝে মনে হয়, পাশাপাশি থেকেও আমি আর সমুদ্র বিচ্ছিন্ন দুটো দ্বীপের মত। দুজনকে বেঁধে রাখার মত নেই কোন সেতুও ।বিয়ের পরই গিয়েছিলাম চাঁদিপুর, হানিমুনে। সারা শরীরে তখন নতুন মিলনের গন্ধ।

ও আর আমি পাশাপাশি বসেছিলাম বালুতটে। আমাদের সামনে উত্তাল সাগর। বিরামহীন ঢেউ।ঢেউ এর মাথায় অস্তুরাগের ছোঁয়া। আমার হাতে হাত রেখেছিল সমুদ্র ।তারপর বুকে টেনে নিয়ে ঠোঁটে এঁকেছিল একের পর এক চুম্বনের আলপনা।আমার শরীর কেঁপে উঠেছিল অনাবিল উত্তেজনায়।

অন্তহীন সাগর আর সুবিশাল সাগরের ক্যানভাসে আমরা তখন ছবি। দুটো নুলিয়া বালকের হাসিতে ক্যানভাস ছিঁড়ে আমরা আলাদা হয়েছিলাম।

সেদিন রাতে সমুদ্রে সাইক্লোন উঠেছিল। পালছেঁড়া এক নৌকার মত ভেসে গিয়েছিলাম আমি। কখনো ডুবছিলাম,কখনো ভাসছিলাম। একসময় থেমেছিল সামুদ্রিক ঝড়। গভীর চোখে আমার দিকে তাকিয়ে সমুদ্র বলেছিল, ‘তুমি খুশি তমসা?

আমার সিক্ত শরীরে তখন আনন্দের রেণু। বলেছিলাম, ‘খুব……খুউব…..ভীষণ।’

ও চুপ করে খোলা জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়েছিল। তারপর ধীরে ধীরে বলেছিলে, ‘জান তমসা , আমি আর কাউকে চিনতে পারি না’

ওর কথায় চমকে উঠেছিলাম। কেন বলল একথা?

সেদিন রাতে স্বপ্ন দেখেছিলাম, আমার পা কেটে রক্ত ঝরছে। পায়ের তলায় গেঁথে আছে ঝিনুকের টুকরো।


সমুদ্রের কথা


তমসার সঙ্গে আমার বিয়ে হয়েছে প্রায় পাঁচ বছর। পরস্পরকে চেনার পক্ষে এটা নেহাৎ কম সময় নয়। কিন্তু আদৌ কি চিনতে পেরেছি ওকে? ওর হাসি,ওর চোখের চোরা চাউনিতে এখনও অ্জানা মেঘের ছায়া। আগে ওর হাসিতে ঝরতো রামধনু। চোখের মধ্যে লুকিয়ে থাকত ভালোবাসার রাজপ্রাসাদ। হয়ত সেই প্রাসাদও রয়েছে,শুধু বদলে গেছে প্রাসাদের অধীশ্বর।

মাঝে মাঝে ভাবি,এক বিছানায় পাশাপাশি থেকেও কি সত্যিই চেনা যায় পরস্পরকে? যায় না। কেননা মনের ভাষা পড়ার ক্ষমতা ভগবান আমাদের দেননি। তাই নারী পুরুষ চিরদিনই পরস্পরের কাছে অধরাই থেকে যায়। হয়ত কোন লগ্নে মনের মধ্যে গড়ে ওঠে অন্য প্রেমের দোচালা।

একদিন অফিস থেকে ফিরে বসে আছি। কখন যে তমসা ঘরে ঢুকেছে টের পাইনি। ওর কণ্ঠস্বরে সম্বিৎ ফিরল। শুনলাম তমসা বলছে, ‘অনেকক্ষণ থেকে লক্ষ্য করছি তুমি যেন অন্য জগতে। দিনরাত কী এত ভাব বলত?’

আমি শান্ত কন্ঠে বললাম, ‘কই কিছু ভাবিনি তো।‘

তমসা বলে, ‘বেশ কয়েকমাস ধরে দেখছি তুমি আর আগের মত হাস না। কী হয়েছে?’

-শুধু শুধু হাসব?

-শুধু শুধু হাসবে কেন? হাসির কথা শুনে হাসবে, হাসির কথা বলে হাসবে, আন্যকেও হাসাবে।

-আমার হাসি আসে না।

-কেন? অফিসে কোন ঝামেলা?

-না।

-তবে?

-এমনি।

এমনি নয়, নিশ্চয় কোন ব্যাপার আছে।মুখটাকে হাঁড়ির মত করে বড় বড় পা ফেলে রান্নাঘরে চলে গিয়েছিল তমসা,রাতে বহু চেষ্টাতেও স্বাভাবিক হয় নি।

হয়ত তমসাই ঠিক। আমিই রামগড়ুরের ছানা হয়ে যাচ্ছি।ভেবে দেখেছি অন্যকে হাসানোর চেয়ে নিজে অন্যের হাসির পাত্র হওয়া অনেক সোজা।

অফিসে প্রায়ই অন্যের জমে থাকা ফাইল আমাকেই সারতে হয় আর আমাকে সিঁড়ি করে ওপরে উঠে যায় অসিত,দীপঙ্কররা।

আমি বুঝি, ‘মানুষ মানুষের জন্য’ এই আপ্তবাক্যটাকে মানুষ তার প্রয়োজনে সময়োপযগী করে নিয়েছে। মানুষ এখন মানুষের দৈনন্দিন ব্যবহারের সামগ্রীবিশেষ। হয়ত তমসাও তাই ভাবে। ও ঘুমিয়ে পড়লে আমি চুপি চুপি বারান্দায় গিয়ে দাঁড়াই। বাড়ির সামনে খোলা মাঠ। মাঠের শেষে রামবাবুদের বাগান। বাড়ির গেটের কাছে দুটো ইউক্যালিপটাস, আকাশ ছুঁয়ে। আমি তাকিয়ে থাকি দূরের অন্ধকারে। গাছে গাছে জোনাকি জ্বলে। মাঝে মাঝে ডেকে যায় রাতচরা।দূর আকাশে ঝিকমিকে নক্ষত্র। আমি কান পেতে শুনি শিশিরের শব্দ………. টুপটাপ….টুপটাপ,   যেন তমসা কাঁদছে।

ভালোবাসা কি পুরানো হয়ে যায়, নাকি পুরানো হয়ে যায় নতুন করে দেখার ইচ্ছাটাই? মনের মধ্যে কে যেন বলে ওঠে, বাইরের চোখ দিয়ে শুধু বহির্জগতকে দেখ সমুদ্র, আর মনের চোখ খুলে দাও অন্তর দেখার জন্য। দেখবে কুয়াশার মত মিলিয়ে যাবে সন্দেহের চোরা স্রোত।


তমসার কথা


সমুদ্র সেদিন বলেছিল ও হাসতে ভুলে গেছে। ইদানিং ওর নাকি হাসি আসে না। ডাহা মিথ্যে কথা। ও যেদিন আমাকে এই কথাগুলো বলেছিল তার পরদিনই সমুদ্রকে হাসতে দেখলাম। সন্ধ্যা সাতটা। রান্নাঘরেই ছিলাম। হঠাৎ শোবার ঘর থেকে সমুদ্রের হাসির আওয়াজ ভেসে আসতে বেশ অবাক হয়ে গেলাম। পায়ে পায়ে ওর ঘরে ঢুকলাম।

দেখলাম সোফায় বসে সমুদ্র, হাতে একটা খোলা ম্যাগাজিন। কী যেন পড়ছে আর দমক দিয়ে হাসছে। সেদিনের চাপা রাগটা ফোঁস করে উঠল। একটু ঝেঁঝেই বললাম, ‘তুমি নাকি হাসতে ভুলে গেছ? এখন কি করে বইছে হাসির এই ঝরণাধারা? আমার মুখে তীব্র শ্লেষ’

দেখলাম আমার ঝঙ্কারে ওর মুখের হাসিটা আসতে আসতে মরে গেল। সমস্ত মুখে বেদনার এক অদ্ভুত ছায়া ভেসে উঠেই দ্রুত হারিয়ে গেল। কিচুক্ষণ দুজনেই চুপ। মুখটাকে স্বাভাবিক করে সমুদ্রই বলে উঠল, ‘জান তমসা,এই মজার গল্পটা পড়ে হাসি চেপে রাখতে পারিনি।’

কর্কশ গলাতে বললাম, ‘ কি গল্প?’

সমুদ্র হাসিমুখে বলল, ‘ আমার পাশে বোসো, পড়ছি।’

বললাম, ‘আমি দাঁড়িয়েই শুনব। তবে পড়তে হবে না , সংক্ষেপে বল’।আমার কথায় সমুদ্র কি আঘাত পেল? ও একবার মাত্র আমার চোখের দিকে তাকাল, তারপর বলতে  শুরু করল………………..এক স্বামী-স্ত্রী পরস্পরকে লুকিয়ে মোবাইল ফোনে প্রেম করছে। স্ত্রী অন্য এক পুরুষের সঙ্গে, স্বামী অন্য এক মহিলার সঙ্গে। দীর্ঘ কয়েকদিন কানে কানে এই প্রেমালাপ চলার পর দুজনেই দেখা করতে গেছে নব্য প্রেমিক প্রেমিকার সঙ্গে। কলামন্দিরের সামনে গিয়ে স্বামী চমকে ওঠে। দেখে তার স্ত্রী বেশ সাজুগুজু করে কার জন্য যেন অপেক্ষা করছে ; অথচ সেদিন সকালেই বউ বলেছিল বাপের বাড়ি যাবে। বাবার নাকি এখন তখন অবস্থা।

এদিকে আড়চোখে স্ত্রীও দেখে নিয়েছে তার বুড়ো বরটা মাথায় মাঞ্জা দিয়ে, চেকনাই প্যান্ট-শার্ট পড়ে এদিক ওদিক ঘুরঘুর করছে। অথচ এই সময় ওর অফিসে নাকি জরুরী মিটিং। এটেন্ড না করলে নাকি চাকরী থাকবে না।

যাইহোক, একটু আড়ালে গিয়ে দুজনেই দুজনের প্রেমাস্পদকে ফোন করে।…. এইটুকু বলে বেদম হাসতে থাকে সমুদ্র।

রেগে গিয়ে বললাম , শেষটা বলবে তো।

হাসতে হাসতে বইটা পাশে রাখে সমুদ্র। তারপর বলে, কি হল জানো তো, দুজনের মোবাইল দুটোই ‘ তুমি যে আমার ‘ বলে বেজে উঠল। এতদিন স্বামী- স্ত্রী সিম বদল করে পরস্পরকেই ‘নয়া লাভার’  ভেবে প্রেম চালিয়ে এসেছে। ব্যাস আজ ক্যাচ, কট ,কট।

গল্প বলা শেষ করে হাসি হাসি মুখে আমার দিকে তাকিয়েছিল সমুদ্র। আমি একটুও হাসিনি। মুখটাকে কঠিন করে দাঁড়িয়েছিলাম। মনের মধ্যে রাগের পোকাটা তখনও কট কট করে কামড়াচ্ছে।

সমুদ্র বলল, ‘ তোমার হাসি পায় নি?’

ওর প্রশ্নটাকে পাশ কাটিয়ে পালটা প্রশ্ন করলাম, ‘ধর, ওই মহিলাটি যদি তার নিজের স্ত্রী না হত? তা হলে?’

সমুদ্র কেমন অবাক হয়ে আমার দিকে তাকাল।

বললাম, ‘ভাবতে হবে না। উত্তরটা আমিই দিয়ে দিচ্ছি। অন্য মহিলা হলে স্বামীটা তখন চুটিয়ে প্রেম করে যেত।’

কথাটা ছুঁড়ে দিয়ে আমি আর দাঁড়াই নি, সোজা রান্নাঘরে।

আমাদের বাড়ির একতলায় মিলুরা থাকে। বিয়ের আগে ওর বরের সঙ্গে মিলুর সে কি ফোনালাপ ! ভোর থেকে গভীর রাত। কতবার যে মোবাইল বেজে উঠত তার ইয়ত্তা নেই। ভারি ভারি ক্যাশকার্ড শেষ হয়ে যেত, কথা কিন্তু ফুরাতো না। সেই মিলু এখন আসে। কিন্তু আর শুনিনা মোবাইলের সেই বাজনা।কথা নয় মোবাইলে এখন গান শোনে মিলু।মান্না দের গাওয়া ….. তুমি কি সেই আগের মতই আছো……………………………….

এভাবেই কি প্রেম ফুরিয়ে যায়? নতুন খেলনা পুরানো হলে এভাবেই কি পড়ে থাকে অবহেলা আর অযত্নে….. ঘরের কোণে??

এভাবেই কি নতুন বই এর গন্ধ ম্লান হয়ে আসে…………….. মলাটের রঙ ফিকে হয়ে জমতে থাকে ধূলোর আস্তরণ?

রাতে খুব কেঁদেছিলাম।আমি কি ইচ্ছা করেই কষ্ট দিলাম সমুদ্রকে! গল্প তো গল্পই।

সমুদ্র ঘুমিয়ে পড়লে চুপি চুপি বেরিয়ে এসেছিলাম বারান্দায়। দাঁড়িয়েছিলাম দূরের অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে, দেখছিলাম জোনাকির নড়চড়া।

আর কী আশ্চর্য ! সে রাতে আমি স্পষ্ট  শুনেছিলাম শিশিরের শব্দ। সমুদ্রের বুকে তমসার কান্না যেন শিশির হয়ে ঝরে পড়ছে…………….. টুপটাপ……….টুপটাপ।


সমুদ্রের কথা


গল্পটা শোনার পর তমসা যে ইঙ্গিতটা ছুঁড়ে দিয়ে গেল তার মানে আমি বুঝি। আমার কিন্তু একটুও রাগ হয়নি। আমিও পালটা প্রশ্ন ছুঁড়ে দিতে পারতাম, ওই লোকটা যদি মহিলাটির স্বামী না হত? প্রশ্নটা করিনি। আসলে অন্তরের দৃষ্টিতে বিশ্বাস মিশিয়ে দেখলে কোথাও মালিন্য জমে না, জমে না অস্পষ্টতার হলুদ পাতাও।

রাত্রির কান্না শিশির হয়ে ঝরে পড়ে ঠিকই, কিন্তু দিনের আলো তাকে ভালোবেসে কাছে টেনে নেয়। শিশির মিলিয়ে যায় আলোর শরীরে।

দিন যাপনের গ্লানিতে  আমরা ক্রমশঃ ক্লান্ত হয়ে পড়ছি। মনের মধ্যে জমা হচ্ছে ব্যর্থতার জীর্ণ পাতার স্তুপ। ঘাটের সিঁড়ির মত একটু একটু করে ক্ষয়ে যাচ্ছি আমরা ।সংস্কার না করলে আমরা আরো ক্ষয়ে যাব তমস।

একবার ট্রেনে আসার সময় এক তরুণীকে দেখে তমসাকে বলেছিলাম, ‘ ঠিক হিন্দি সিনেমার নায়িকা মধুমালিনীর মত দেখতে না?’

তমসা মেয়েটির দিকে একপলক তাকিয়ে আমার দিকে ঘুরেছিল…’বাইরে বেরিয়ে এসবই দেখ নাকি?’

কষ্ট পেয়েছিলাম।

অথচ ওই তমসাই একদিন একটা নামী বাংলা ম্যাগাজিন আমার সামনে ছুঁড়ে দিয়ে বলল, ‘অমিতাভদার লেখাটা পড়ে দেখ। অ…সা..ধা.রণ।‘

গল্পটার উপর একবার চোখ বুলিয়ে বলেছিলাম, ‘ অমিতাভদা কে?’

তমসা অবাক।

-    সে কী ! তুমি অমিতাভদার নাম ই শোন নি? এ যুগের শক্তিমান কথাসাহিত্যিক অমিতাভ মিত্র। সে কী?’

আমি ঘাড় নেড়ে নিজের অজ্ঞতা প্রকাশ করলাম।

তমসা কিছুক্ষণ আমার দিকে স্থির ভাবে তাকিয়ে রইল, তারপর বলল, ‘তুমি তো লেখালিখির ধার দিয়েও হাঁটো না, তুমি কি করে অমিতাভদার মর্ম বুঝবে বলো ? জান সমুদ্র, অমিতাভদা বাংলা অনার্সে আমাদের সিনিয়র ছিল। কলেজ ম্যাগ এ দারুণ লিখতো। আমি বলেছিলাম, আমিতাভদা একদিন কেউকেটা হবে’।

আমার কি রাগ হয়েছিল তমসার উপর?     কি জানি !


তমসার কথা


সেদিন সমুদ্রকে ওইভাবে বলা ঠিক হয় নি। ভীষণ কষ্ট পেয়েছিল ও। বাইরে প্রকাশ করেনি  ঠিকই, কিন্তু আমি ওর দুচোখে দেখেছিলাম মৃত শব্দের যন্ত্রণা। বিয়ের পর শুনেছিলাম বড় ভাল লিখত সমুদ্র। কিন্তু কেউ ছাপেনি ওর লেখা।

আশাভঙ্গের যন্ত্রণা আমি বুঝি সমুদ্র, তবু কেন যে সেদিন তোমায় আঘাত দিলাম ! তুমি আবার লেখ সমুদ্র, তোমার দুচোখের লবণাক্ত জল দিয়ে মুছে দাও অমিতাভ মিত্রের নাম।

আমার বাবা প্রায়ই বলতেন, ‘ দেখ মা, ভগবান প্রতিটি মানুষকে দুটি করে বাক্স দিয়ে মর্ত্যে পাঠিয়েছেন। সুখ আর দুঃখের বাক্স। চাবিও দিয়েছেন দুটি। কিন্তু তুই যদি সুখের চাবি দিয়ে সুখের বাক্স খুলিস, সুখ পাবি না। দুঃখের চাবি দিয়ে সুখের বাক্স খুলিস। সুখ চিরস্থায়ী হবে।‘

আমি ভুলে গিয়েছিলাম বাবার কথাগুলো।

আমি শুনতে পাচ্ছি সমুদ্রের উথাল-পাথাল ঢেউ এর আর্তনাদ। বেলাভূমিতে  আছড়ে পড়া ঢেউ এর কান্না। সমুদ্র তুমি কেঁদো না। আমি তোমার নদী  হব। দেখ আমি কাঁদছি, আমার দুচোখে তোমার নোনাজল।


সমুদ্রের কথা


কাল রাতে তমসা আমার কাছে আবদার করেছিল। বলেছিল, ‘ মা বলছে দাদুভাই এর কথা।‘

আমি কিছুক্ষণ ওর মুখের দিকে তাকিয়েছিলাম। ওর মুখে সমুদ্রের স্নিগ্ধতা, দুচোখে ফুলশয্যার লজ্জা।

বাইরে তখন উথাল-পাথাল বৃষ্টি। আকাশ জুড়ে বিদ্যুতের ঝলকানি। মাধবীলতা গাছটা বৃষ্টির আদরে থরথর। ঘনঘন মাথা দোলাচ্ছে ইউক্যালিপটাস দুটো, আমার বুকে তমসার মত।

তমসার চোখের দর্পণে তখন আমার প্রতিবিম্ব আর আমার দুচোখে ফুটে উঠেছে তমসার প্রতিবিম্ব। বাইরে তখন বৃষ্টির প্রতিবিম্বে জীবনের গান।