আনুগত্য - শুকদেব চট্টোপাধ্যায়, রহড়া | Anugatya - An Essay in Bengali by Sukdeb Chattopadhya - WBRi Online Bengali Magazine

SUKDEB CHATTOPADHYAY "Anugatya" is a Bengali essay by Sukdeb Chatterjee of Rahara in unicode Bangla font published in WBRi Bengali Online Magazine section. You can send your creative writing to submissions@washingtonbanglaradio.com for consideration towards publication.


আনুগত্য

শুকদেব চট্টোপাধ্যায়, রহড়া


অনেক সময় লোককে বলতে শুনি, “ও আমার খুব অনুগত”। উক্তিতে কখনো প্রচ্ছন্ন থাকে বক্তার আত্মম্ভরিতা আবার কখনো পূণর্তা ও তৃপ্তি। কিন্তু বাস্তব হলেও আমি কারো অনুগত, এমন কথা খুব কমই শোনা যায়। কারণ, তাতে প্রকাশ পেতে পারে হীনমন্যতা। একমাত্র আধ্যাত্মিক ক্ষেত্রে এর ব্যতিক্রম দেখা যায়।

শক্তি, বিত্ত, জ্ঞান, বুদ্ধি ইত্যাদির তারতম্যের ফলে তৈরি হয় আনুগত্য।  আনুগত্য কেবলমাত্র ব্যক্তিতেই সীমাবদ্ধ নয়। এক রাষ্ট্রের প্রতি অন্য রাষ্ট্রের আনুগত্য, মানুষের প্রতি মনুষেতর জীবের আনুগত্য এবং সবোর্পরি ঈশ্বর বা অতিমানবিক কিছুর প্রতি মানুষের আনুগত্য লক্ষ্য করা যায়।

আনুগত্য আসে মূলতঃ ভালবাসা, প্রত্যাশা, ও ভয় থেকে। ভালবাসা থেকে উদ্ভূত আনুগত্য অত্যন্ত নিমর্ল। এখানে পাওয়ার ভাবনা থাকে না, তাই হারানর সম্ভাবনাও থাকে না। যেমন, সন্তানের পিতামাতার প্রতি আনুগত্য। অবশ্য কখনো কখনো যে এর অন্যথা হয় না তা নয়।

কোন বিশ্বাস, মতবাদ বা আদর্শকে ভালবেসেও সেগুলির প্রতি আনুগত্য আসে। আবার নতুন কোন দর্শন, তত্ত্ব, বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার ইত্যাদি  মানুষের চিন্তা ভাবনাকে প্রভাবিত করলে তৈরি হয় নতুন আনুগত্য।

প্রত্যাশা যে আনুগত্যের জন্ম দেয় তা কখনই দীঘর্স্থায়ী  হয় না। কারণ, স্বার্থ এখানে প্রায় সবটা  জুড়ে থাকে। প্রত্যাশা পূরণ না হলে তো কথাই নেই। আর প্রাথমিক পযার্য়ে তা পূরণ হলেও প্রত্যাশা ক্রমশঃ বাড়তে থাকে। ফলে স্বাভাবিক ভাবেই কিছু সময় পরে চাওয়া আর পাওয়ার মধ্যে একটা ব্যবধান এসে যায়। আর তখনই মানুষ “অনুগত” থেকে হয়ে যায় “বিক্ষুব্ধ”। আমাদের দেশের পাইয়ে দেওয়ার রাজনীতিতে যা হামেশাই দেখা যায়।

ভয়ের ক্ষেত্রে আনুগত্য অনেকটাই বাধ্যতামূলক। বাস্তব ঘটনা বা পরিস্থিতি ছাড়াও ভয়ের কারণ কল্পনা প্রসূত এবং অনুমানভিত্তিকও হয়। মানবজাতির ইতিহাসের গোড়ার দিকে প্রকৃতির ( বজ্র, বিদ্যুত, প্লাবন ইত্যাদি ) ভয় থেকে শুরু হয় বিভিন্ন রূপে (মূলতঃ প্রকৃতি কেন্দ্রিক ) অতিমানবিক কিছু বা ঈশ্বরের ভজনা। যাকে আমরা ভক্তি বলি তা প্রকারান্তরে ভয়। ভক্তি আসে (বিশ্বাসীদের ক্ষেত্রে) ঈশ্বরের করুণা থেকে বঞ্চিত হওয়া অথবা কোপ দৃষ্টিতে পড়ার ভয় থেকে। বিজ্ঞানের উন্নতির সাথে সাথে প্রকৃতির অনেক অজানা তথ্য জানা গেলেও আজও মানুষকে মাঝে মাঝেই তার কাছে বড় অসহায় মনে হয়। যতদিন এই অসহায়তা থাকবে ততদিন এই ভয় ভক্তিও থাকবে।

বাস্তবের ভয়ের কারণগুলো আসে সমাজের বিভিন্ন সম্পর্কর মধ্য থেকে। যেমন, মনিব-ভৃত্য, জমিদার-প্রজা, উচ্চবর্ণ-নিম্নবর্ণ, বিত্তবান-দরিদ্র ইত্যাদি। সম্পকর্গুলো মূলতঃ শোষক এবং শোষিতের হওয়ায় শোষণের কারণগুলো সমূলে উৎপাটিত না হওয়া পযর্ন্ত এই ভয় ও আনুগত্য চলতে থাকে। সমাজ ব্যবস্থায় আমূল পরিবতর্ন না হলে এর থেকে পরিত্রাণ নেই।  তাই এই আনুগত্য অনেক সময় বংশ পরম্পরায় চলতে থাকে।

সঠিক আনুগত্য মানুষের জীবনকে বিকশিত হতে সাহায্য করে। পৌরাণিক যুগ থেকেই গুরুশিষ্যের সম্পর্কের মূল মন্ত্রই হল আনুগত্য। সবার্ত্মক  ও নিঃশ্বার্থ অনুগমনের ফল স্বরূপ আমাদের সমাজ পেয়েছে আরুণি, একলব্যদের মত বরেণ্য মহাপুরুষদের। শৈশব থেকে বেড়ে ওঠার প্রতিটি মুহূর্তে বাবা-মা, শিক্ষক, গুরুজনদের স্নেহ, ভালবাসা, শিক্ষা মানুষের জীবনকে সমৃদ্ধ করে, দেয় পূণর্তা। শুভার্থী ও গুণীজনের অনুগামী হয়েই তো মানুষ খুঁজে পায় জীবনের সঠিক পথের সন্ধান।

Enhanced by Zemanta